ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৬
ছায়া
লিয়ানের চোখে লালভাব চুল এলোমেলো চেহারা কাঁচের মতো ঠাণ্ডা একটা দম বন্ধ করা নীরবতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আর তার চোখ সরাসরি আরিয়ানের চোখে গিয়ে ঠেকে। লিয়ান তাদের কাছে আসে
লিয়ানঃ- এক্সকিউজমি… ইলা তোমাকে খুঁজছিলাম।
আরিয়ান লিয়ানের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকায় চোখে সামান্য বিরক্তিকর ভাব অধিকার আর স্পষ্ট সতর্কতা দেখা যাচ্ছে লিয়ান এটা বুঝেও না বুঝার ভান করে চোখে চোখ রেখে ইলার পাশে দাঁড়ায়।দুইজনের মাঝে মুহূর্তে অদৃশ্য আগুন জ্বলে ওঠে।
লিয়ানঃ- তোমার ডান্স দেখলাম ভালো ছিলে।
পরিস্থিতি যেন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে ইলা দেখতে পায় আরিয়ানের চোখ লাল হয়ে গেছে হাতের রগ ভুলে উঠেছে। আর লিয়ান কিছু না বুঝার ভান করে চুপচাপ কথা বলছে আরিয়ান ঠাণ্ডা স্বরে লিয়ান কে বলল
আরিয়ানঃ- আপনি আবার এসেছেন।
লিয়ানঃ- ও সরি আসলে আমি লিয়ান ইলার… ফ্রেন্ড।
এই ‘ফ্রেন্ড’ শব্দের ভেতর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় সরাসরি লিয়ান। আরিয়ান ভ্রু কুচকে তাকায় লিয়ানের দিকে
আরিয়ানঃ- আপনাকে তো দেখে মনে হয় না আপনি ইলার ফ্রেন্ড। আপনাকে আগে দেখিনি আমি আর আপনার কোথাও শুনিনি।
লিয়ানঃ- দেখবেন কি করে আমি আর ইলা তো ৫ বছর থেকে গেম ফ্রেন্ড।তাই হয়তো চিনতে পারেন নি।
এবার আরিয়ান হালকা হাসে
আরিয়ানঃ- আমি কাউকে চেনার দরকার মনে করি না।সে যদি আমার ফ্যামিলির কেউ না হয়।
আরিয়ান আর লিয়ানের এমন কথা শুনে ইলার বুক কেঁপে ওঠে। লিয়ান চোখ সরু করে
লিয়ানঃ- তো ইলা কি আপনার ফ্যামিলি?
আরিয়ান ধীরে ইলার দিকে তাকায় তারপর লিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে “হ্যাঁ” লিয়ান মুঠি শক্ত করে,মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই কিন্তু চোখে যুদ্ধের ঘোষণা।
লিয়ানঃ- তা আপনি কি ওর ভাই হোন।
ইলাঃ- কি হচ্ছে কি এই সব লিয়ান
লিয়ানঃ- আমি চিনিনা তাই তো জিগ্যেস করলাম।
আরিয়ান কড়া ভাবে তাকায় লিয়ানের দিকে মুখে আর কথা নেই কিন্তু চোখে আগুন। ইলা দুইজনের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এতটাই ভয় পাচ্ছে যে ইলার মনে হচ্ছে এই বুঝি যুদ্ধ লাগলো বলে।
কারণ দুইজনের চোখেই একটা কথা লেখা দেখতে পাচ্ছে “ইলা… আমার”
তার পরে লিয়ান আর কিছু বলল না স্টেজে ডাকা হলো লিয়ান কে নেক্সট পারফর্ম লিয়ান করবে।লিয়ান ধীরে ঘুরে চলে যায় তার চুল উড়ছে মুঠি শক্ত মনে মনে সিদ্ধান্ত “আমি ইলাকে ছাড়বো না ওকে যে কোনো ভাবে আমার করে নেবো”
ইলা শ্বাস নিতে পারছে না দুই পুরুষের চোখ তার শরীর ভেদ করে চলে গেছে ইলা কাঁপা গলায় বলে
ইলাঃ- আমাকে যেতে হবে।
আরিয়ান ইলার কণ্ঠ শুনে মৃদু কিন্তু গভীর স্বরে বলে
আরিয়ানঃ- আপনি কোথাও যাবেন ইলা।
ইলাঃ- আমি হলে ফিরে যাবো আমার খারাপ লাগছে।
আরিয়ানঃ- আপনি যাকে ভালোবাসেন এই কি সেই ছেলে?
ইলাঃ- আমি কাউকে ভালোবাসি না এই সব কথা কে বলেছে আপনাকে।
হালিমা এই বুঝি ঝড় শুরু হলো এখানে আমার থাকাটা ঠিক হবে না হালিমা ইলাকে বলল তোরা থাক আমি একটু আসছি কে জানি ডাকছে আমাকে হালিমা চলে গেলো।
আরিয়ান ধীরে ধীরে ইলার দিকে এগিয়ে এল দূরত্বটা কমে মাত্র এক হাত।ইলা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আরিয়ান হঠাৎ হাত বাড়িয়ে তার কবজি ধরে ফেলল গরম, শক্ত, পজেসিভ চেপে ধরার মতো একটা স্পর্শ ইলার নিঃশ্বাস থেমে গেল চোখ বড় বড় আরিয়ান নিচু গলায় বলল
আরিয়ানঃ- তাহলে এই ছেলে এমন অধিকার বোধ কেনো দেখাচ্ছে যে সে আপনার ফ্রেন্ড এর থেকেও বেশি কিছু।
ইলাঃ- আমি জানি না সে কেনো এমন করছে আমি তাকে কালকে বলে দিয়েছি আমার বিয়ে হয়ে গেছে।
আরিয়ান আরও কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো
আরিয়ানঃ- মানে ঐ ছেলে এতদিন জানতো না আপনার বিয়ে হয়েছে।
ইলার আরিয়ানকে এই চেহেরায় অনেক ভয় লাগছে তাই ইলা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল,কিন্তু আরিয়ান ইলার হাতটা শক্ত করে ধরে উল্টো নিজের বুকে টেনে নিল “দাঁড়াও” আরিয়ানের কণ্ঠে আদেশ আর ইলার এই আদেশ শুনে শ্বাস আটকে গেল।আরিয়ান নিচু স্বরে বলল
আরিয়ানঃ- আপনাকে দেখে আমার মধ্যে যে অনুভূতি গুলো জাগে সেটা আমি কন্ট্রোল করতে পারি না।যদি না বুঝে থাকেন তাহলে আমার কিছু করার নেই। আর
আমি চাই না অন্য কারও দৃষ্টি আপনার গায়ে পড়ুক।
এমন কথা শুনে ইলা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকালো আরিয়ানের চোখের দৃষ্টি এতটাই গাঢ় ছিলো যে ইলা চোখ সরিয়ে নিল।
দূর থেকে স্টেজে লিয়ান শেষ পিপারেশন নিচ্ছিলো কিন্তু তার চোখ আটকে ছিল দূরে ক্যাম্পাসের সেই পিছন দিকটায়।স্টেজ থেকে সে স্পষ্ট দেখলো আরিয়ান ইলার হাত ধরে আছে আর কাছাকাছি ঝুঁকে কথা বলছে। লিয়ানের বুকটা ধক করে উঠল মনে হলো যেন কেউ তার ভেতরের সবটা দুমড়ে মুচড়ে চেপে ধরেছে।
লিয়ানের চোখ গরম হয়ে উঠলো হৃদপিণ্ডের ভিতর অজানা ঈর্ষা ছটফট করতে লাগল। লিয়ান ফিসফিস করে বলল “ইলা তোমার হাতটা ধরার অধিকার তার নেই এর শাস্তি তাকে পেতে হবে” মুঠি শক্ত করে দাঁড়ানো লিয়ানের চোখে ব্যথা আর হারিয়ে ফেলার ভয় জেগে উঠলো “আমি আর হারাতে চাই না এবার… তোমাকে নিজের করেই নেবো প্রমিস সিজুকা”
এদিকে আরিয়ান এবার আরও কাছে এসে ইলার কানের পাশে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল
আরিয়ানঃ- আপনি কি ভয় পাচ্ছেন আমাকে??
ইলার ঠোঁট শুকিয়ে গেলো আরিয়ানের এত কাছ থেকে কন্ঠ শুনে।
ইলাঃ- …জি… একটু…
আরিয়ান হালকা হাসল চোখে সেই অদ্ভুত উষ্ণ আধিপত্যের ঝলক।আরিয়ান খুব আস্তে করে ইলার গালের খুব কাছাকাছি হাত তুলল স্পর্শ করলো না কিন্তু এতটাই কাছে যে ইলার পুরো শরীরে শিহরণ ছড়িয়ে গেল।
আরিয়ানঃ- আমাকে ভয় পাবেন না আমি যত দূরেই থাকি না কেনো সব সময় আপনার খেয়াল রাখবো। এটা আমি আপনার বাবাকে কথা দিয়েছি।
ইলা আর কিছু বলতে পারল না গলা শুকিয়ে গেলো হাত কাঁপছে সে শুধু মাথা নেড়ে দাঁড়িয়ে রইল।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে লিয়ানের চোখে তখন কেবল একটাই জ্বালা আর অধিকারবোধ “তুমি ওকে স্পর্শ করলে? এর মানে… তুমি ভাবছো তুমি ওকে পাবে… কখনো না এই স্পর্শই তোমার শেষ স্পর্শ করা ইলাকে” গভীর নিশ্বাস নিয়ে চোখ শক্ত করলো “ইলা আমার হবে আমি নিজে থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে আসবো আমার কাছে” যার জন্যই হোক আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হারিয়ে যেতে দেব না তাকে।
“লিয়ান…লিয়ান…লিয়ান…” মেয়েদের চিৎকারে পুরো ক্যাম্পাস গমগম করছে। কিন্তু লিয়ান সেই ভিড়ের দিকে তাকায় না।তার চোখ আটকে আছে শুধু এক জায়গায় সেই কোণায় যেখানে আরিয়ান ইলার হাতটা ধরে কথা বলছে খুব কাছে দাঁড়িয়ে। ইলার চোখে লাজ, ভয়, আর অদ্ভুত অস্বস্তির ছাপ আরিয়ানের চোখে অদৃশ্য দখলদারির ছায়া। এই দৃশ্যটা দেখেই লিয়ানের বুক ঝাঁকুনি খেলো তার মনে হচ্ছিলো “ইলাকে অন্য কারো কাছে এতটাই কাছে যেতে দেখবো আমি না… এটা আমি সহ্য করতে পারছি না…”
লিয়ান গান শুরু করবে কিন্তু আজ লিয়ানের সেই পুরোনো আত্মবিশ্বাস নেই বরং ভিতরে চাপা কষ্টের ঢেউ। গিটারটা কাঁধে তুলে নিতেই চারদিক চুপ হয়ে গেল।তার চোখের রাগা কষ্টা ঝিলিক সবাই দেখতে পেল।
স্ট্রিংয়ের প্রথম তানেই সবাই নিস্তব্ধ তারপর লিয়ান সেই কণ্ঠে গাইল প্রথমবার… এত ব্যথা নিয়ে…
গানঃ
এ কার জীবন আমার কাঁধে?
আমি বইতে আর পারছি না
বেকার এ মন আবেগে বাঁধে
আমি সইতে আর পারছি না
বেকার এ মন আবেগে বাঁধে
আমি সইতে পারছি না
এ কেমন ভালোবাসা?
কইতে পারছি না
মায়া মায়া মহামায়ার ভিতর
আমি কে, আমি কে, আমি কে তোর?
মায়া, মায়া, মহামায়ার ভিতর
আমি কে আমি কে আমি কে তোর?
নেশাতে ডুবে গেলেও দেখি তোর ছবি
দূর আকাশের চাঁদেও একি তোর ছবি
নেশাতে ডুবে গেলেও দেখি তোর ছবি
দূর আকাশের চাঁদেও একি তোর ছবি
তোর প্রেমে ফুল হয়ে ফোঁটে ভুল সবই
তোর প্রেমে ফুল হয়ে ফোঁটে ভুল সবই
মায়া, মায়া, মহামায়ার ভিতর
আমি কে আমি কে আমি কে তোর?
মায়া, মায়া, মহামায়ার ভিতর
আমি কে, আমি কে, আমি কে তোর?
মায়া, মায়া, মহামায়ার ভিতর
আমি কে আমি কে আমি কে তোর?
লিয়ানের এই গান শুনে পুরো ক্যাম্পাস স্তব্ধ।মেয়েরা যারা একটু আগেও চিৎকার করছিল তারা এখন চোখের পানি মুছছে। কারণ লিয়ান কোনদিন এমন ব্যথা নিয়ে গান গায়নি। তার গলায় আজ কষ্টের কাঁটা।হৃদয়ভাঙা অভিমান আর এক অদম্য অপেক্ষা যার নাম ইলা।
এক মুহূর্তের জন্যও লিয়ান চোখ সরায়নি সেই দিক থেকে যেখানে ইলা দাঁড়িয়ে ছিল।।আরিয়ান তখনও ইলাকে কাছে দাঁড় করিয়ে কথা বলছে। ইলা গান শুনেছে না মন তার এতটাই নার্ভাস ছিল যে ব্যাকগ্রাউন্ডের গানের কথাগুলো শুধু ঢেউয়ের মতো কানে এসে ফিরে যাচ্ছিল।
আরিয়ানঃ- আপনি কাঁপছ কেন?
ইলাঃ- না… কিছু না…।
আরিয়ানঃ- হয়তো আমার আজ আসাটা ঠিক হয় নি বা আপনার উপরে বেশি একটু অধিকার বোধ খাটাচ্ছি আমি।
ইলা মাথা নিচু করে আছে আরিয়ান আলতো করে ইলার চিবুক তুলে বলল
আরিয়ানঃ- আমি জানি না আপনার প্রতি এটা আমার কেমন অনুভূতি কিন্তু ঐছেলেকে আমি আপনার সাথে সহ্য করতে পারতেছি না।
দূরে লিয়ানের সেটা দেখে ভিতর থেকে দমবন্ধ হয়ে গেল লিয়ান শেষ স্ট্রাম টেনে চোখ বন্ধ করলো স্টেজ ফাটা তালির শব্দ উঠলো চারদিকে “OMG লিয়ান”
“Such a painful song He never sang like this…”
কিন্তু লিয়ানের চোখ শুধু একজনকে খুঁজছিল ইলা।তার চোখে ছিল প্রশ্ন ” সিজুকা তুমি কি শুনেছো আমার গান তুমি কি আমার ব্যথা বুঝতে পারলে?
কিন্তু ইলা তখনও আরিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে তার দৃষ্টি লিয়ানের দিকে যায়নি। মাঝে শুধু এক সেকেন্ডের জন্য দেখেছিল ভারী চোখে লিয়ান তাকিয়ে আছে কিন্তু সেদিকে মন দিতে পারেনি।এটাই লিয়ানকে ভেঙে চুরমার করে দিল।সে মাথা নিচু করে স্টেজ থেকে নেমে গেল। সবাই হাততালি দিচ্ছে কিন্তু যার জন্য সে গান গেয়েছিল সে হাততালি বা ছোট একটা হাসি কিছুই পেল না পেল শুধু আকুল কষ্ট।
ব্যাকস্টেজে এসে গিটারটা নামাতেই লিয়ানের শ্বাস ভারী হয়ে উঠলো এক হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরল।
এক সেকেন্ডের জন্যও ইলা তার দিকে তাকালো না।
যার মুখ্র সে দেখতে চেয়েছিল ছোট্ট হাসি, সামান্য গর্ব কিন্তু সেটা পেল না।
লিয়ানঃ- তুমি সত্যি আমাকে দেখলে না সিজুকা?
লিয়ানের চোখের কোণে পানি জমে উঠলো সে জোর করে চোখ বন্ধ করল “এখন কান্না করা যাবে না” সবাই আছে আশেপাশে। তার বুকের কষ্ট আর প্রতিশোধ যেন একসাথে ঝড় তুলছে হৃদয়ে একটা শপথ গেঁথে যাচ্ছে “ইলা তোমাকে আমি হারাবো না
ওর কাছ থেকে আমি তোমাকে ছিনিয়ে নেবো”
এদিকে ইলার মন তখনো জমাট বাঁধা ভয় আর অস্বস্তিতে আটকে আছে আরিয়ানের হাত এখনো ইলার কবজিতে ইলা চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারছে না।
গলার ভিতর শুকনো অস্বস্তি নিয়ে ইলা বলল
ইলাঃ- আরিয়ান… প্লিজ… মানুষ দেখছে… ছাড়ুন…
আরিয়ান এবার ধীরে ধীরে ইলার হাত ছেড়ে দিল কিন্তু দৃষ্টি সরালো না এক ইঞ্চি।যেভাবে তাকিয়ে আছে সেটা দখলদারি।
আরিয়ানঃ- ঐ ছেলে ওই গান আপনার জন্য গাইল মনে হলো।
ইলা জানে না লিয়ান কেন এমন গান গাইল কিন্তু স্বীকার করার সাহস নেই।
ইলাঃ- আমি আগে তার গান শুনি নি কখনো আজ প্রথম।
আরিয়ান নিচু গলায় হেসে বলল
আরিয়ানঃ- মিথ্যে বলছেন ও আপনার দিকে তাকিয়ে গাইছিল আমি দেখেছি। এটা যে শুধু গান ছিল না সেটা বুঝতেও আমার চোখই যথেষ্ট।
ইলার শরীর আবার শিরশির করে উঠল সে এ দৃশ্য এখুনি শেষ করতে চায়।
এইদিকে ব্যাকস্টেজে লিয়ানকে পেয়ে যায় তার জিগরি বন্ধুরা” ভাই কি গান করলি ক্যাম্পাস তো কেঁপে উঠলো তুই কাঁদছিলি নাকি?
লিয়ান চোখ নিচু করে গলার স্বর ভারী
লিয়ানঃ- আজ অন্য কিছু ট্রাই করলাম।
বন্ধুরা চুপ কারণ তারা জানে এই ছেলেটা কখনো ‘কিছু না’ বলে যে সত্যি কিছু না বোঝায় তা হয় না এক বন্ধু প্রশ্ন করল
বন্ধুঃ- কেউ কিছু বলেছে?
লিয়ান চোখ বন্ধ করল তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দৃশ্য ইলার হাত আরিয়ানের হাতে ওরা খুব কাছে ইলা ভয় পেয়ে মাথা নিচু করে আছে আরিয়ান চিবুক তুলে দিচ্ছে তার ভেতরের সবটা চিৎকার করে উঠল “ওর জীবন থেকে ইলাকে আমি ছিনিয়ে নেবো”
কিন্তু ঠোঁট দিয়ে বের হলো শুধু “সে আমাকে দেখেনি
একবারও না” লিয়ানের কণ্ঠ ভেঙে গেল। বন্ধুরা একে অন্যের দিকে তাকালো তারা জানে আজ লিয়ানের ভিতরে কিছু ভয়ংকর জন্ম নিয়েছে।
ইলা হাঁটতে লাগল হলের দিকে তার গলা শুকিয়ে গেছেন হৃদস্পন্দন যেন কানে বাজছে। আরিয়ান ধীরে ধীরে ইলার পেছন পেছন হাঁটছে একটা ছায়ার মতো।
ইলাঃ- আপনি… প্লিজ… আমাকে একটু একা থাকতে দিন আমার কিছু ভালো লাগছে না।
আরিয়ানঃ- না
ইলাঃ- না মানে?
আরিয়ান সামনে এসে দাঁড়াল তার চোখে অদ্ভুত দখলদারি ঝিলিক।
আরিয়ানঃ- আজ আপনি ভয় পেয়েছেন বলে আমি আপনাকে একা যেতে দেব না। আপনার মুখে ভয় দেখেছি প্রথমবার আপনার হাত কাঁপছিল আমি দেখেছি।
ইলার চোখে পানি চলে আসল রাগে, ভয়, চাপ, লজ্জা সব মিশে।
ইলাঃ- আপনি এমন করছেন কেনো আজ আপনি তো এমন না।
আরিয়ান একটু নরম হলো খুব অল্প এক মুহূর্তের জন্য।
আরিয়ানঃ- ঠিক আছে আমি পাশে থাকছি না… দূরে থাকবো এতে আপনি কম ভয় পাবেন।
আস্তে করে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল কিন্তু দৃষ্টি সরালো না এক ইঞ্চিও না।
এত কিছু দেখে লিয়ান আর এক সেকেন্ডও জায়গায় দাঁড়াতে পারল না তার বুক ফেটে যাচ্ছে।সে সরাসরি ইলাদের কাছে এল। পদক্ষেপে শব্দ চোখে ঝড় চেহারায় ভাঙা যন্ত্রণা। ইলা তাকাতেই থমকে গেল।
লিয়ানের চোখ লাল ঠিক যেন কান্না চেপে রাখা একটা যোদ্ধা। লিয়ান সরাসরি ইলার সামনে দাঁড়ালো। এক সেকেন্ডে আরিয়ানও থমকে গেল। চুপচাপ খুব অসহায় গলায় লিয়ান বলল
লিয়ানঃ- সিজুকা… আমার গান তুমি শুনলে না।
ইলাঃ- লিয়ান… আমি… আমি আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম।
লিয়ান হেসে ফেললো (ওটা কোনো হাসি ছিল না
হৃদয় ফাটার পর যে হাসি আসে সেটা)
লিয়ানঃ- জানি তুমি আমাকে দেখ নাই কিন্তু আমি তোমাকে দেখেছি।
ইলা চোখ নামিয়ে নিল মনের ভেতর কিছু চাবুকের মতো আঘাত করল। আরিয়ান চোখ সরল না, লিয়ান এবার এক পা এগিয়ে এল ইলার দিকে দু’জন পুরুষের মাঝের বাতাস আগুনের মতো জ্বলে উঠল।
লিয়ানঃ- সিজুকা তুমি ভয় পাচ্ছো কেনো?
তার দৃষ্টি এবার সরাসরি আরিয়ানের চোখে চ্যালেঞ্জিং ও বিষাক্তা।
লিয়ানঃ- এ লোকটা কিছু করেছে তোমাকে।
ইলার হৃদস্পন্দন থেমে গেল আরিয়ান ঠাণ্ডা হাসল লিয়ানের এই কথা শুনে।
আরিয়ানঃ- “লোকটা” বেশ নাম দিয়েছো তো।
লিয়ানের চোখ দুটো রক্ত লাল হয়ে উঠল
লিয়ানঃ- ইলার হাতটা যেভাবে ধরে ছিলেন ওটা আবার করলে আমি সত্যি বলছি কিয়ামত শুরু করে দিবো।
আরিয়ান পরিমিত শান্ত কিন্তু ভয়ংকর স্বরে বলল
আরিয়ানঃ- ওর স্বামী আমি আপনি কে আমাদের মাঝে কথা বলার? ওর কী হন…সেটা আগে বলুন।
এই একটা বাক্য বাতাসে আগুনের মতো বিস্ফোরিত হলো ইলা ফিসফিস করে বলল
ইলাঃ- প্লিজ থামুন আপনারা
কিন্তু দুজনের কেউ শুনলো না লিয়ান নিঃশ্বাস টেনে বলল
লিয়ানঃ- সেটা সময় বলে দিবে আমি ইলার কে।
আরিয়ান সামান্য সামনে ঝুঁকে বলল
আরিয়ানঃ- আপনার স্বপ্ন ভাঙতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না তাই আমাদের থেকে দূরে থাকুন।
দুজনের চোখের মাঝে বজ্রপাত হচ্ছিল ইলা মাঝখানে দাঁড়িয়ে শ্বাস নিতে পারছে না। দূরে আবার স্টেজে ঘোষণা “লিয়ান… please come for photo session” কিন্তু লিয়ানের চোখে এখন শুধু এক যুদ্ধ
ইলাকে নিয়ে যুদ্ধ।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩৫
লিয়ানঃ- আমি যাবো না।
আরিয়ান আরেকটা পা এগিয়ে এল দুজনের নাক প্রায় ছুঁই ছুঁই পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠছে ইলার ঠোঁট কাঁপছে…
ইলাঃ- প্লিজ… কেউ কিছু করবেন না…প্লিজ…
আর তখনই হঠাৎ পিছন থেকে ক্যাম্পাসের সিকিউরিটি এসে বলল “এই আপনারা তিনজন ওখানে মারামারি করবেন না” যা করার বাইরে গিয়ে করুন।কিন্তু দুজনের চোখে চোখ আটকে রইল দুজনের চোখের ভাষাতে একটা কথা লেখা “ইলা… আমার”
