খান সাহেব পর্ব ২০
সুমাইয়া জাহান
শহরে ব্যস্ত মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। সকলে যার যার কাজের জায়গায় ছুটছে। গাড়ির হন শোনা যাচ্ছে। দূর থেকে ফেরিওয়ালার ডাক মাঝে মাঝে ভেসে আসছে। রাহিনদের তিনটা গাড়ি নিজ গতিতে ছুটছে। শেরাজরা ভোরের আলো ফোটার আগেই কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। সুমু আর শেরাজকে আলাদা গাড়িতে যেতে দেওয়া হয়েছে। শেরাজের ভাষ্যমতে, “তারা নিউ কাপাল, তাদের প্রাইভেসির প্রয়োজন।” রাহিনরা সকলে বাকি দুইটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে। ইফতিয়া আর রাইশা যাওয়ার জন্য অনেক বাহানা করেছিল। শেরাজের আলাদা ভাবে কিছু বলতে হয়নি। রাহিন নিজেই আগে আগে ওদের ব্যাপারটা ম্যানেজ করে নিয়েছে। মা, খালা, আর বোনদের জন্য বন্ধুদের জন্য অনেক মাথা হেট হয়েছে রাহিনের। রাহিন জানে, ওরা দুজন গেলে আবারও কোনো না কোনো গন্ডগোল পাকাবে, তাই ওদের দুজনকে পড়াশোনার কথা বলে বাসায় রেখে এসেছে।
রাহিনদের গাড়িতে নাজমিন, আর সামিয়াও আছে। আইয়ুব আর নাজমিন মাঝে মাঝেই কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া করছে। ওদের দেখলে, মাঝে মধ্যেই রাহিনের মনে হয়, ওদের দুজনের ঝগড়া না করলে পেটের ভাত হজম হয়না হয়তো।
রাহিন ড্রাইভিং সিটে বসেছে। রাহিনের পাশের সিটে আইয়ুব বসেছে। পেছনের দুইসিটে নাজমিন আর সামিয়া বসেছে। বাকি পেছনের দুই সিটে সারবাজ আর নিহাল। অমিত, আরবাজরা অন্য গাড়িতে। স্যান্ডিকে শেরাজ লোকেশন দিয়ে কালকেই কক্সবাজার পাঠিয়ে দিয়েছে। রাহিন ভিউ মিররে ড্রাইভিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে সামিয়াকে দেখছে। রাহিন শুধু সামিয়ার মাধ্যমিক শেষ করার অপেক্ষায় আছে। সামিয়ার মাধ্যমিক শেষ হলেই বাসায় বিয়ের কথা বলবে সে। এই মেয়েটার জন্যই রাহিনের বেঁচে থাকা। বাহিরে যখন থাকে, তখন এই মেয়েটাকে একপলক দেখার জন্য একটু কথা বলার জন্য মনটা ছটফট করে রাহিনের। সামিয়া কি বোঝে রাহিনের এই অনুভূতিগুলো? উহুম! বোঝেনা। কীভাবে বুঝবে? সামিয়া তো আর রাহিনকে ভালোবাসে না। হুম! ভালোবাসে, তবে ভাইয়ের মতো। রাহিন খুব করে চায় সামিয়া তাকে বুঝুক, ভালোবাসুক। সে কি কোনোদিনও সামিয়াকে বোনের নজরে দেখেছে? উহুম! দেখেনি। যদি কোনো নজরে দেখে থাকে, তাহলে সেটা হলো বউয়ের নজরে। পিচ্চি বউ হবে সামিয়া তার।
গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। সুমু জানালার সাথে মাথা হেলিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। শেরাজ দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে। চোখে ব্ল্যাক সানগ্লাস। ডানহাতে রেড বুল ক্যানের বোতল। মুখটা গম্ভীর করে রাখা। ডাইভিংয়ে ফাঁকে ফাঁকে সুমুকে ফলো করছে সে। সুমু অপলক তাকিয়ে আছে বাহিরের দিকে। হঠাৎ শেরাজ গান প্লে করল,
“কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে,
ফুলে পাইলা ভ্রমরা
ময়ূর বেশেতে সাজুইন রাধিকা
ময়ূর বেশেতে সাজুইন রাধিকা!”
গানটা দুই লাইন হতেই সুমুর গানটা বন্ধ করে দিল পুনরায় একই রকমভাবে বসে রইল সে। শেরাজ সুমুকে জ্বালানোর জন্য আবারও নিউ গান প্লে করল,
“রাতেরই… আধারে…
অজানা… ছোঁয়া…
মায়াবী, চোখে কি মায়া,
যেন গোধূলি আবির মাখা..
কি নেশা জরালে..
কি মায়ায় জড়ালে…”
সুমু গানটা আবারও অফ করে দিল। বিরক্তি নিয়ে তাকাল শেরাজের দিকে। শেরাজ ড্রাইভিং করতে ব্যস্ত। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছেনা সে রেগে গেল কিনা। শেরাজের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে সুমু পুনরায় মাথা হেলিয়ে দিল। সি চোখ বন্ধ করতেই শেরাজ আবারও গান প্লে করল,
“চাতক প্রায় অহ….নি…শি
চেয়ে আছে কালো…শশী
আমি হবো বলে চরণদা…সী
হবো বলে চরণদা…সী
ও তা, হয়না কপাল গুনে…
ও তা, হয়না কপাল গুনে….
আমার মনের মানুষের সনে
আমার মনের মানুষের স…নে
মিলন হবে কতো দিনে….
ও মিলন হবে কতো দিনে..
আমার মনের মানুষের সনে
আমার মনের মানুষের স…নে”
সুমু মহাবিরক্ত হলো। রাগে, কষ্টে বুক ঠেলে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে তার। “সে কষ্ট পাচ্ছে আর তার খান সাহেব একের পর এক মিউজিক প্লে করেই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আজ তার বিয়ে। যার জন্য তিনি এতো খুশি তিনি। অবশ্য খুশি হবে নাই বা কেনো, আজতো তার ভালোবাসার মানুষটার সাথে দেখা হবে। তার খুশি থাকাটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু খান সাহেব কি বুঝতে পারছে না আমার মনের অবস্থা। আমার সামনে অন্তত এমন না করলে কি হচ্ছে না ওনার।”
কথাগুলো মনে মনে বলে গানটা অফ করে দিল সুমু। বিরক্তির সাথে সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“গাড়ি থামান। আমি অন্য গাড়িতে যাব।”
শেরাজের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সে আপন মনে গাড়ি চালাতে ব্যস্ত। সুমু আরও বিরক্ত হয়ে একটা অদ্ভুত কান্ড ঘটিয়ে ফেলল। নিজ থেকে গাড়ির ব্রেক কষলো সে। রাস্তা পুরোপুরি ফাঁকা হওয়াতে ভয়াবহ দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেল তারা।
শেরাজ একটা রামধমক মারল সুমুকে। সে চেঁচিয়ে বলল,
“আর ইউ ক্রেজি, সুমু? কি করলে তুমি এটা? তুমি জানো, তোমার এই কাজে আজ কতো বড় দুর্ঘটনা হতে পারতো? নেহাত রাস্তা পুরো ফাঁকা তাই। নয়তো কি হতো তোমার কোনো আইডিয়া আছে?”
সুমু কোনো কথা বলল না। সে গাড়ির থেকে বের হবার জন্য গাড়ির দরজা খুলতেই শেরাজ হেঁচকা টান মেরে সুমুকে নিজের কোলের ওপর নিয়ে এলো। ভয়ে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে রইল সুমু। নিজের অবস্থান বুঝতেই চোখ মেলে তাকাল সে। শেরাজ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে একহাতে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরল, অন্যহাত স্টিয়ারিংয়ে রাখল। পুনরায় গাড়ি চলতে শুরু করল।
সুমুর দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। হার্টবিট বেড়ে গেছে। শেরাজের হাতে জড়িয়ে রাখা কোমরের অংশে সুরসুর করছে তার। অন্যরকম একটা অনুভূতি শরীরে কাজ করছে তার ভেতরে। শরীর গরম হয়ে আসছে। অবাকের চোটে সুমু নড়াচড়া করতে ভুলে গেছে। এক আকাশ সমান লজ্জা ভর করেছে সুমুর মধ্যে। কিন্তু সেই লজ্জাটা বেশিক্ষণ থাকল না। “তার খান সাহেবের অন্যকেউ আছে” কথাটা মনে পড়তেই কোলের মধ্যেই নড়াচড়া শুরু করলো সে।
শেরাজ বিরক্ত হয়ে বলল,
“কি সমস্যা? এতো নড়ছো কেনো?”
সুমু রাগিস্বরে বলল,
“এইসব কি? যখন তখন আমার শরীরে হাত দেন। আমাকে কোলে তুলে নেন। এইসব কেনো করেন আপনি? আমাকে নামান, বলছি।”
শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,
“শুধু কোলে আর শরীরে হাত দিয়েছি, তাতেই এমন করছো? কিন্তু এখন তো তোমার ওপর আমার পুরো অধিকার আছে। মানে শুধু কোলে তোলা, শরীরে হাত দেওয়া ছাড়াও আরও অনেক কিছুই করার অধিকার আছে।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল শেরাজের দিকে। শেরাজের মুখে তখনও দুষ্টু হাসি। কিন্তু আজ এই হাসিতে ঘায়েল হবে না সুমু। সে একটু উচ্চস্বরে বলল,
“বিয়েটা তো আপনি নিজের ইচ্ছে থেকে করেও, মেনে নেননি। তাহলে কিসের অধিকার? আর, আপনার না ভালোবাসার মানুষ আছে? তাহলে এগুলো কি তাকে ঠকানো হচ্ছেনা?”
“উহুম! হচ্ছেনা। কারণ, আমি আমার বিয়ে করা বউকে কোলে নিয়েছি। আর, এক্ষেত্রে আমার ভালোবাসার মানুষটা আমাকে অবশ্যই বুঝবে। আর রইল বিয়েটা মেনে না নিয়ে অধিকারের প্রশ্ন। তাহলে শোনো, বিয়েটা মানি আর না মানি, অধিকারটা আমার আছে। আর তাই ভাবছি যে….”
“কি ভাবছেন?”
“ভাবছি এই যে, বিয়েটা যখন করেই ফেলেছি। অধিকারটা যখন আছেই, তাহলে বাসরটা কেনো করব না? বাসরটাও করে ফেলি, কি বলো? শুধু শুধু লস কেনো করব। বিয়েটার কিছুতো একটা ফায়দা হোক।”
“মানে? এইসব কি বলছেন আপনি?”
“মানে হলো, আমাদের এই কক্সবাজার যাওয়াটাকে তুমি হানিমুন হিসাবে নিতে পারো।”
“আপনি থামবেন? আর প্লিজ, আমাকে নামান।”
শেরাজ আর কোনো কথা না বলে সুমুর কোমরটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সুমু একরাশ ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে রইলো তার খান সাহেবের দিকে। সে মনে মনে বলল,
“কখনো পাওয়া হবে না। তবুও তার প্রতি এতো কেনো মায়া?”
সুমু দোটানায় পড়ে গেল এই মানুষটাকে নিয়ে। সে বুঝতে পারছেনা, আসলে এই মানুষটা কি চায়।
ঘড়ির কাঁটায় রাত একটা ছুঁই ছুঁই। শেরাজদের কক্সবাজার পৌঁছাতে অনেকটা সময় বেশি লেগেছে। পুরো রাস্তায় তিন থেকে চার বার গাড়ি থামিয়েছে তারা। সারবাজ ভিডিও শুট করেছে। আইয়ুব আর রাহিন মারামারি করেছে। ভালো ভালো রেস্টুরেন্ট চোখে পড়লেই খেতে চলে গেছে। তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর খুব একটা তাড়া ছিল না ওদের। শেরাজ সারাটা রাস্তা সুমুকে ওভাবে কোলের মধ্যে বসিয়েই এনেছে। সুমু অনেকবার নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারেনি। যতো নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেছে, ততোই শেরাজের হাতের বাঁধন শক্ত হয়েছে। সুমু পেরে ওঠেনি শেরাজের ওই বলিষ্ঠ হাতের সাথে।
পুরো রাস্তা সকলে অনেক আনন্দ করতে করতে আসলেও, সুমুর মনটা খারাপ ছিল। কখনও কখনও জোরপূর্বক হাসলেও, সেই হাসি দীর্ঘমেয়াদী হয়নি। সারা রাস্তা দুষ্টুমি আর জার্নি করে সকলেই এখন ক্লান্ত। তাই সকলে যার যার রুমে চলে গেছে। ঘুরাঘুরি কাল হবে তাদের।
সুমু আসার পর থেকে কাঙ্ক্ষিত একজন মানবীকে খুঁজছে। কিন্তু শেরাজের গতিবিধি দেখে বুঝতে পারছে না এখানে তারা ছাড়া অন্য কেউ আছে কি না। শেরাজ আসার পর স্যান্ডিকে নিয়ে কোথাও একটা বেরিয়েছিল। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আবারও ফিরেও এসেছে। এখন বাহিরে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতেছে। রিসোর্টে আসার পর রুম থেকে বের হয়নি সুমু। ফ্রেশ হয়ে এসে বেলকনিতে দাঁড়িয়েছে সে। আজকাল আপন মনে অনেক বেশি কিছু ভাবে সে। যেই ভাবনার কোনো শেষে নেই। নিজেই নিজেকে অনেক বোকা বোকা প্রশ্ন করে, আবার নিজেই নিজেকে উত্তর দিয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে হাসে। ভাগ্যের পরিহাসের কাছে জিতেও হেরে গেছে সে। যে মানুষটাকে সবসময় গোপনে ভালোবেসে এসেছে, সেই মানুষটা আজ তার স্বামী। কিন্তু তা ক্ষনিকের। সে পেয়েও হারাতে চলেছে তার খান সাহেবকে।
“পেয়েছিল?”
প্রশ্নটা নিজের মনকে নিজেই করে আফসোসের সাথে হাসল সুমু। “পেয়েছিল” কথা খুব হাস্যকর। সুমু তো পায়নি তার খান সাহেবকে। যদি পেত, তাহলে হারানোর প্রশ্ন আসতো। যাকে পায়নি, তাকে হারানোর কোনো প্রশ্নই আসে না। সুমু নিজের হাতে তার খান সাহেবকে ওই ভাগ্যবতী মেয়েটার হাতে তুলে দেবে।
শেরাজ রুমে এলো। এসেই সে ওয়াশরুমে ঢুকলো ফ্রেস হতে। সুমু বেলকনিতে ঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একবারও পেছনে ঘুরে তাকাল না। ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে শেরাজ বেরিয়ে এলো। সে বেডের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে বলল,
বউ! এই ঠান্ডার মধ্যে বাহিরে দাঁড়িয়ে থেকোনা। ভেতরে আসো।”
সুমু জানে না, এই বউ ডাকটার মধ্যে কি ছিল। ডাকটা কর্ণ পযর্ন্ত যেতেই অদ্ভূত এক শিহরণ বয়ে গেল তার শরীরের ওপর দিয়ে। অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করল তার ভেতরে। আপনা আপনি ঘুরে দাঁড়াল সে। বেলকনি থেকে এসে গিয়ে বসল রুমের সোফার ওপর।
শেরাজ সুমুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“এইসব বউ টউ ডেকে তোমার আমার প্রতি মায়াটা আর বেশি বাড়িয়ে লাভ নেই, তাই না বলো সুমু?”
সুমু মাথা তুলে তাকাল শেরাজের দিকে। সে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“আপনি জানেন খান সাহেব? সবকিছুর একটা শেষ সিমা থাকে। দুনিয়ার কোনো কিছুই অফুরন্ত নয়। সবকিছু কোথাও না কোথাও গিয়ে আটকাবে। যেমন ধরেন, আপনি হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতে একদিন আপনার রাস্তাও একদিন ফুরিয়ে যাবে। রাস্তা কিন্তু অফুরন্ত নয়। তারও একটা শেষ আছে। তো, আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা কিংবা মায়া বলুন। সেটা যেতে যেতে এখন শেষ সীমানায় গিয়ে ঠেকেছে। সেখান থেকে এখন আমায় ফিরে আসতে হলে, হয়তো আবারও আমাকে সেই একই পথ পিছিয়ে হেঁটে আসতে হবে। কিন্তু আমি ফিরে আসতে চাইনা। বলতে পারেন, এখন আমি আপনার প্রতি মায়ার শেষ সীমানার দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছি। আমি যে অনেক ক্লান্ত। এখন আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি। তার তাই এখন ক্লান্ত হলেও মনে একটা শান্তি আছে। আপনি দেখেন না, একজন মানুষের পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার একটা কাঙ্ক্ষিত সীমানা থাকে। তার সেই সীমানাটা একদম পাহাড়ের চূড়ায়। অতো ওপরে উঠতে উঠতে মানুষ হাঁপিয়ে যায়। অনেক বার হোঁচট খায়, তবুও কিন্তু ওঠে। আর সীমানা পযর্ন্ত পৌঁছে গেলে, সেই কি শন্তি। আমার ও ঠিক সেম।”
শেরাজ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। সে দুষ্টুমি করে বলল,
“এতোই যখন ভালোবাসো, তাহলে বউয়ের সব দায়িত্ব পালন করছো না কেন? সে তো এখনও আমার বউ হয়নি। তাই সে যতোদিন বউ না হয়, তুমি অভিনয় করে হলেও দায়িত্বটা পালন করো। আচ্ছা! যাও বউয়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে না। কিন্তু কিছুদিন অভিনয় করে হলেও আমার সাথে প্রেম করো। বিয়ে করলাম বউটার সাথে যদি কিছুই করতে না পারি, তাহলে কি আমার ফলোয়াররা আমাকে মেনে নিবে, বলো?”
সুমু পুনরায় হাসল। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। বেড থেকে একটা বালিশ হাতে নিয়ে বলল,
“এই মরা দেহে প্রেম নামক অভিনয় আর আসবে না, খান সাহেব। দেহ হত্যা মহাপাপ, তাই মন হত্যা করেছি। আর নিজেকে আটকেছি অনুভূতিহীনতার বেড়াজালে।”
বালিশটা নিয়ে গিয়ে সে শুয়ে পড়ল সোফার ওপর। শেরাজ শুধু তাকিয়ে রইলো আজ আর সুমুকে বেডে শোয়ার জন্য জোর করল না সে। রুমের লাইট অফ করে দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বেডের ওপর বসল। সুমু শেরাজের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ বন্ধ করল। শরীর খুব ক্লান্ত, তাই ঘুমের রাজা খুব তাড়াতাড়ি সুমুর চোখে ভর করল।
শেরাজ অনেক রাত পযর্ন্ত ল্যাপটপে কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করল। চোখে ঘুম ভর করাতে ল্যাপটপটা বন্ধ করতে গিয়ে চোখ পড়ল সুমুর ওপর। ল্যাপটপের মৃদু আলোয় রুমের সবকিছু আবছা;আবছা দেখা যাচ্ছে। শেরাজ বেড থেকে নেমে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। সুমুর দেহের ওপর থেকে ব্লাঙ্কেটটা সরিয়ে পাঁজাকোলে তুলে নিল সুমুকে। ঘুমের ঘোরে কিছুটা নড়ে উঠল সুমু। সুমুর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল শেরাজ। তবে সুমুর ঘুমটা ভাঙলো না। শেরাজের বুকের মধ্যে মুখ গুজে আবারও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে। সুমুকে বিড়াল ছানার মতো গুটিয়ে ঘুমাতে দেখে আলতো হাসল শেরাজ। বেডে নিয়ে শুইয়ে ব্লাঙ্কেটটা গলা পর্যন্ত জড়িয়ে দিল তার। সুমুর পাশে বসে কিছুক্ষণ সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর আলতো করে সুমুর কপালে একটা চুমু খেল। ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে সেন্টারটেবিলের ওপর রাখল। তারপর নিজে গিয়ে শুয়ে পড়ল সোফার ওপর। মাথার নিচে এক হাত রেখে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। কিছুক্ষণ তার প্রেয়সীকে অপলক দেখে চোখ বন্ধ করল সে।
পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে ঘুম ভাঙলো সুমুর। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল সে। চোখ খুলে নিজেকে বেডের ওপর দেখে কিছুটা অবাক হলো সে। সোফার দিকে চোখ পড়তেই শেরাজকে চোখে পড়ল তার। শরীরটা উন্মুক্ত। ব্লাঙ্কেটটা মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শীতের দিনেও এক লোকটাকে উন্মুক্ত শরীরে শুতে হবে কেনো সুমু বুঝে পায় না। দানবের মতো বিশাল শরীরটা নিয়ে যে ওইটুখানি সোফায় শুতে কষ্ট হচ্ছে, তা সুমু খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। বেড থেকে নেমে দাঁড়াল সে। এগিয়ে গেল শেরাজের কাছে। মেঝে থেকে ব্লাঙ্কেটটা তুলে জড়িয়ে দিল শেরাজের গায়ে। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল জানালার কাছে। জানালা থেকে পর্দা সরিয়ে রুমটাকে আলোকিত করে দিল। পেছন ঘুরে তাকাতেই দেখল, শেরাজ ঘুমের মধ্যে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলেছে। শেরাজের অস্বস্তির কারণটা বুঝে চটজলদি পর্দাটা আবারও টেনে দিল। ধীর পায়ে হেঁটে পুনরায় শেরাজের কাছে গেল। শেরাজের সামনে দাঁড়িয়ে মেঝেতে বসল সে। শেরাজের সিল্কি চুলগুলো চোখের সামনে এসে পড়েছে। একদম বাচ্চাদের মতো দেখতে লাগছে সুমুর খান সাহেবকে। কি মিষ্টি, নিষ্পাপ চেহারার দেখতে তার খান সাহেব। এভাবে কত সময় গেলো কে জানে। হঠাৎ শেরাজ নড়েচড়ে উঠল। সুমু ঝটপট উঠে দাঁড়াল। সে চলে যেতে নিবে তখনই শেরাজের কন্ঠ ভেসে আসলো সুমুর কর্ণে। চোখ বন্ধ রাখা অবস্থাতেই শেরাজ বলল,
“কি কি দেখলে?”
পা থমকে গেল সুমুর। পেছনে ঘুরে তাকাল সে । ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”
চোখ মেলে তাকাল শেরাজ। ব্লাঙ্কেটটা সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“মানে? এই যে একভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে। তো বলো, কি কি দেখলে এতোক্ষণ আমার কিউট ফেসে। বাই এনি চান্স, তুমি আমার ঘুমিয়ে থাকার সুযোগ নিচ্ছিলে না তো বউ?”
রেগে গেল সুমু। কোমরে দুইহাত রেখে বলল,
“সুযোগ নিচ্ছিলাম মানে? আপনি কি বোঝাতে চাইছেন? ক্লিয়ার করে বলুন।”
শেরাজ দুইহাত দিয়ে নিজের মুখটা ডেকে বলল,
“বোঝাতে চাইছি যে, আমি এখনও পিওর ভার্জিন বউ। তুমি ঘুমের ঘোরে আমার সাথে এমন কিছু করো না, যাতে আমার ভার্জিনিটি নষ্ট হয়। তোমার জন্য আমার ভার্জিনিটি নষ্ট হলে বাসর রাতে আমি আমার ভালোবাসার মানুষটাকে কি উত্তর দিব?”
সুমু আঙুল তাক করে শেরাজকে কিছু বলতে গিয়েও বলল না। কথা বলার মুডটাই নষ্ট গেছে তার। “এই লোকটা কাল থেকে অসভ্য মার্কা সব কথা বলছে। অবশ্য বলবে নাই বা কেনো। এখন তো এখানে আবার ওনার ভালোবাসার মানুষটা এসেছে। এখন তো অলওয়েজ ওনার মুড রোমান্টিক থাকবেই।”
কথাগুলো মনে মনে বলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল সুমু। শেরাজ সুমুর যাওয়ার পানে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসল।
ঘড়ির কাঁটায় সময় দশটা, সাড়ে দশটা হবে হয়তো। রিসোর্টের চারপাশটা আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। রিসোর্টের বারান্দায় সুমু একা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা চিরকুট। তার চোখে পানি। ডিনারে সকলে হালকা পাতলা কিছু খেয়েছে। সুমু বিকালে কোথাও বেরোয়নি। সকলে চারপাশটা ঘুরে দেখলেও সুমু কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়েছে। তার ভাষ্যমতে, “সে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য এসেছে। তাই এইসব ঘুরতে যাওয়ার কোনো মানেই হয়না।”
সন্ধ্যায় ঘুম থেকে ওঠার পর শেরাজকে রুমে দেখতে পায়নি সুমু। বেডে ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে যাবার সময় চোখ পড়ে সোফার ওপর থাকা একটা প্যাকেটের দিকে। প্যাকেটটা হাতে নিতে যাবে, তখনই একটা চিরকুট দেখতে পেল সে। প্যাকেটটা রেখে চিরকুটটাই আগে হাতে তুলে নিল। চিরকুটটা খুলতেই তাতে বড় বড় করে লেখা,
“আমি আর রুমে আসব না। তোমার সাথে আর দেখা হবে রাত বারোটার পর। তখন আমার পাশে আমার প্রিয়তমা থাকবে। এই প্যাকেটটার মধ্যে কিছু অর্নামেন্টেস আর একটা ড্রেস আছে। আমার ভালোবাসার মানুষের সামনে তো তোমাকে একটু সেজেগুজে যেতে হবে। ওর সামনে তো তোমাকে পাগলের মতো নিতে পারিনা। সারাদিন থাকোতো পাগলের মতো, তাই এগুলো দিয়ে গেলাম। এগুলো পড়ে এগারোটা ত্রিশের মধ্যে রেডি থেকো। বাহিরে গাড়িতে স্যান্ডি ওয়েট করবে তোমার জন্য। রেডি হয়ে চলে এসো।”
চিরকুটটা আবারও পড়ল সুমু। প্যাকেটটা এখনো খুলে দেখেনি সে। সোফার ওপর থেকে প্যাকেটটা হাতে তুলে নিল। প্যাকেটা খুলতেই দেখল, একটা হোয়াইট কালারের লং গাউন। পুরো গাউনটাতে স্টোনের কাজ করা, সাথে ম্যাচিং অর্নামেন্টস।
খান সাহেব পর্ব ১৯ (২)
গাউনটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল সে। ড্রেস চেঞ্জ করে এসে ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়াল। শেরাজের দেওয়া অর্নামেন্টসগুলো একে একে পড়ে নিল। রাত হওয়ায় চুলগুলো পনিটেল করে বেধে নিল। সাজতে ইচ্ছা না করলেও হালকা সাজলো সে। নিজেকে ভালো করে একবার আয়নাতে দেখে নিল। দেখতে সুন্দর লাগলেও, এই সৌন্দর্য সুমুর কাছে আজ অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। ঘড়িতে সময় একবার চেক করে বেরিয়ে পড়ল রুম থেকে।
