খান সাহেব পর্ব ২১
সুমাইয়া জাহান
সমুদ্রের পাড়টা আজ অদ্ভুত সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে। তাজা লাল গোলাপ দিয়ে হার্ট সেইপের একটা বড় আর্চ সাজানো হয়েছে। তার সামনে তাজা গোলাপের পাপড়ি বিছিয়ে রাস্তা বানানো হয়েছে। গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বানানো রাস্তার দুইপাশে জায়গা জায়গা থেকে অল্প অল্প বালি সরিয়ে মোমবাতি বসানো হয়েছে। সমুদ্র পাড়টা কৃত্রিম আলো আর মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। আর্চের দুইপাশে একটু দূরে দূরে আরো দুটো হার্ট বানানো হয়েছে। হার্ট দুটো বালি সরিয়ে মোমবাতি দিয়ে বানানো হয়েছে। আর্চের ডানপাশের হার্টটার মাঝে চেয়ার টেবিল বসিয়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর্চের বামপাশের হার্টের মাঝে বড় কিছু একটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে চোখ ধাধানো সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে সবকিছু দেখছে। স্যান্ডি তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে এখানে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে। সে বলেছে, “কিছুক্ষণ ওয়েট করতে। সকলে এখানেই আছে।”
সবকিছু এতো সুন্দর করে সাজানো হলেও, চারপাশে একটা কাকপক্ষীকেও দেখতে পেল না সুমু। ভয়ে হাত-পা জমে যাচ্ছে তার। হঠাৎ, সুমু খেয়াল করল একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে। সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন চলছে তার, “এইটার কি তার খান সাহেবের ভালোবাসার মানুষ?”
মেয়ে একদম সুমুর নিকটে চলে এসেছে। মেয়েটার ঠোঁটে লেগে আছে মুচকি হাসি আর হাতে তাজা লাল গোলাপ। হঠাৎ মেয়েটা সুমুকে ভুল প্রমাণিত করে, তার হাতে গোলাপটি দিয়ে অন্ধকারে তলিয়ে। সুমু মেয়েটার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আরেকটি মেয়ে এসে সুমুর সামনে দাঁড়াল। সুমু কিছু বলতে যাবে, তার আগেই মেয়েটি গোলাপ সুমুর হাতে দিয়ে চলে গেল। সুমু শুধু বোকার মতো তাকিয়ে রইল। একইভাবে আরও একটা মেয়ে সামনে আসতেই সুমু আর কৌতুহল দমিয়ে রাখতে না পেয়ে প্রশ্ন করল,
“কারা আপনারা? আর এই ভাবে আমাকে গোলাপ দিচ্ছেন কোনো?”
মেয়েটি কোনো উওর না দিয়ে গোলাপটি হাতে দিয়ে চলে গেল। একই ভাবে মোট দশটি মেয়ে এসে দশটি ফুল দিয়ে গেল। সকলকেই সুমু একই প্রশ্ন করেছে, তবে কেউ কোনো উওর দেয়নি। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল ওরা যেন রোবট। সুমু আর থাকতে না পেরে পা বাড়াল মেয়েগুলোর যাওয়ার দিকে। তখনই কিছু বাইক এসে ঘিরে ধরল সুমুকে। ভয়টা আবারও ফিরে এলো তার। বাইকগুলো তার চারপাশ দিয়ে গোল গোল ঘুরছে। সকলের পরনে রাইডিং কস্টিউম, মাথায় হেলমেট। সুমু ভয় পেলেও নিজের ভয়টা প্রকাশ করল না বাহিরে। কোনো প্রশ্ন না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। সে প্রস্তত হলো পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাওয়ার জন্য। হঠাৎ একটা ধোঁয়া এসে চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার করে দিল তার। হাত দিয়ে চোখ ডেকে ফেলল সে। ততক্ষণে বাইকার গুলো বাইক থামিয়ে ফেলেছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই ধোঁয়ায় সুমুর কোনো সমস্যা হলো না। চোখ থেকে ধীরে হাত সরালো সে। ধোঁয়াটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতেই সে দেখল, ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে কেউ একজন এগিয়ে আসছে তার দিকে। পরনে সাদা ব্লেজার, পায়ে স্নির্কাস, হাতে ব্লাক ওয়াচ, চোখে সানগ্লাস, চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করে রাখা। কিন্তু ধোঁয়ার ফলে মুখটা অস্পষ্ট। তবে সুমুর চিনতে অসুবিধা হলো না মানবটিকে। মানবটি এসে সুমুর পাশে দাঁড়াল। সুমু অপলক তাকিয়ে রইল মানবটির দিকে। মুখ খুলে কিছু বলতে নিবে, তখনই মানবটি সুমুর ঠোঁটে নিজের আঙুল চেপে ধরে সুমুকে থামিয়ে দিল। সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে সে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমার ভালোবাসার মানুষটিকে দেখার জন্য তোমাকে আরও একটু কষ্ট করতে হবে।”
হঠাৎ সামিয়া এসে শেরাজের হাতে একটা লাল কাপড় দিয়ে চলে গেল। সামিয়াকে দেখে সুমু কিছু বলতে নিলে, তাকে বাধা দিল শেরাজ। সুমু তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ কাপড়টা দিয়ে সুমুর চোখ বেঁধে দিল। সুমুও আর কিছু বলল না। সে চুপচাপ তার খান সাহেবের কাজকর্ম দেখতে লাগল। অচমকাই শেরাজ সুমুকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। এইপর্যায়ে এসে সুমু মুখ খুলল,
“কি করছেন খান সাহেব? আমি জানি আমাকে আপনি কোলে তুলে নিয়েছেন। প্লিজ, নামান। এখানে আপনার ভালোবাসার মানুষটি আছে হয়তো। সে দেখলে কি ভাববে? প্লিজ, নামান বলছি। আমি বুঝতে পারছিনা, আপনি ঠিক কি করতে চাইছেন। প্লিজ, এইসব বন্ধ করুন, আর আমাকে নামান।”
শেরাজ সুমুর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। সে সুমুকে কোলে করেই নিয়ে গেল আর্চের বাম পাশের হার্টের মধ্যে। সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা জিনিসটার সামনে দাঁড়িয়ে নামিয়ে দিল সুমুকে। সুমু চোখ খুলতে নিলে, তাকে চোখ খুলতে দিল না সে। সুমুকে চোখ বন্ধ রাখা অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রেখে সাদা কাপড়টা টান দিয়ে নামিয়ে ফেলল সে। তারপর গিয়ে দাঁড়াল আবারও সুমুর পাশে। সুমুর চোখের ওপর থেকে কাপড়টা খুলে দিয়ে, তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি দেখতে চেয়েছিলে আমার ভালোবাসার মানুষটিকে? এখন চোখ খুলে দেখো। সে তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। দেখো তো, আমাদের দুজনকে পাশাপাশি কেমন মানিয়েছে?”
শেরাজের কথায় আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকাল সুমু। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জিনিসটিকে দেখে অবাকের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেল সে। চোখের সামনে দেখা জিনিসটিকে সত্যি মনে হচ্ছেনা তার। এটা কীভাবে সম্ভব হলো বুঝতে পারছেনা সে। তার চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে একটি আয়না, যার ভেতরে নিজের আর তার খান সাহেবের প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছে সে।
শেরাজের ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে আছে। কিন্তু সুমু যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। শেরাজ আয়নার মধ্যে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি মহারানি! হিংসা হচ্ছে?”
সুমু ভ্রু কুঁচকে ফেলল। শেরাজ তার ভ্রু কুঁচকানো দেখে ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“হচ্ছে জানি! আর হবেই তো। আমার ভালোবাসার মানুষটা এতো সুন্দর যে, আকাশের চাঁদটাও তাকে দেখে হিংসা করবে। সেখানে তুমি তো সামান্য একজন নারী। আচ্ছা! তুমিই বলো, নিঃসন্দেহে কি আমার ভালোবাসার মানুষটা সুন্দর না? তার সৌন্দর্যের কি সত্যি কোনো তুলনা হয়? আমার সাথে কি তাকে মানাইনি? নিঃসন্দেহে কি আমি একজন ভাগ্যবান পুরুষ নই? তার মতো করে কি, গোটা দুনিয়ার কোনো নারী আমাকে ভালোবাসতে পারবে? বলো সুমু! তোমার মতামত কি?”
সুমু আয়না থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল শেরাজের দিকে। চোখ দুটো ছলছল করছে তার। সে দু’পা উঁচু করে জোরে জড়িয়ে ধরল শেরাজের গলা। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল সে। শেরাজ সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আরও একটু উঁচু করে ফেলল। সুমু কেঁদেই চলেছে। কান্নার ফলে গলা দিয়ে কথা বেরোচ্ছেনা তার। হঠাৎ শেরাজের গলা ছেড়ে দিল সে। শেরাজও সুমুকে নিচে নামিয়ে দিল। কাঁদতে কাঁদতে সে শেরাজের পায়ের সামনে বালির ওপর বসে পড়ল। এই কান্না কিসের কান্না জানে না সে। এক বুক ভরা কষ্ট শেষে, মানুষ যখন কষ্টের কারণটার বিনিময়ে আনন্দ খুজে পায়। সব আশা শেষ হয়ে যাবার শেষ সময়ে এসে, যখন একটা মানুষ একবিন্দু আশা নতুন করে দেখতে পায়, তখন হয়তো মানুষ খুশিতে বাচ্চাদের মতো এইভাবেই কাঁদে। এই কান্না মাধ্যমে হয়তো সব কষ্ট আর আনন্দ একত্রে বের হয়।
শেরাজ সুমুকে টেনে দাঁড় করালো। সে সুমুকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
“আজকের পর তুমি আর কাঁদবেনা, সুমু। তবুও যদি কাঁদতে হয়, শুধু আমার জন্য কাঁদবে। আমার বুকের মধ্যে এসে কাঁদবে। এর বাহিরে তোমার জন্য কান্না নিষিদ্ধ। তোমার চোখের পানি আর ঠোঁটের হাসি কারণ শুরুমাত্র আমি হবো, আর কেউ না।
হঠাৎ রাহিনরা সকলে হাত তালি দিয়ে উঠল। আইয়ুব সিঁটি মারল। সুমু লজ্জা পেয়ে শেরাজের থেকে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়াল।
আইয়ুব চেঁচিয়ে বলল,
“জিও, এস.কে জিও। ফাটিয়ে দিয়েছিস তুই।”
রাহিন চোখ মেরে বলল,
“এস.কে! আমি ওর ভাই হই। ও না হয় জানত না আমরা এখানে আছি। তুই তো জানতি। একটু তো লজ্জা শরম রাখ বড়ভাইদের সামনে।”
সারবাজ হেসে বলল,
“এখানে যে আমরা আছি ভুলে গেছিস? আমি কিন্তু তোর বড়ভাই শেরাজ।”
স্যান্ডি তার স্যারের অবস্থা থেকে শুধু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। ভালোবাসা যে একটা কঠোর মানুষকেও এতোটা বদলে দিতে পারে, তা আজ স্যান্ডি নিজের চোখে দেখল।
সুমুর লজ্জায় গাল লাল হয়ে গেছে। ছোট বোন, বড় ভাইদের সামনে কেমন একটা পরিস্থিতিতে পড়ল সে। শেরাজ বন্ধুদের কথার পাল্টা উত্তর না দিয়ে বরং সুমুর লজ্জা পাওয়া মুখটা দেখে ঠোঁট টিপে হাসছে। লজ্জা পেলে নাকি নারীর সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায়। শেরাজও আজ দেখছে তার প্রেয়সীর সৌন্দর্য। হঠাৎ শেরাজ সুমুর হাত ধরে তাকে নিয়ে গেল সমুদ্রের একদম পাড়ে। সুমু তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ চোখ দিয়ে ইশারা করে আঙুল তাক করে সুমুকে সামনের আকাশের দিকে তাকাতে বলল। শেরাজের হাতের ইশারা বরাবর সুমু তাকাল আকাশের দিকে। আকাশে ফায়ারওয়ার্কস ভেসে উঠেছে। সেখানে বড় বড় করে লেখা,
“আই লাভ ইউ, সুমু”
সুমুর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। শেরাজ সুমুর কানে কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি, সুমু।”
সুমু তাকাল তার খান সাহেবের দিকে। আজ শুধু তার অবাক হওয়ার দিন। সে মুখ ফুটে কিছু বলতে নিলে, শেরাজ আবারও থাকে চুপ করিয়ে দিল। হাত ধরে আবারও নিয়ে গেল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বিছানো রাস্তার সামনে। চোখ দিয়ে তাকে ইশারা করল পা বাড়ানোর জন্য। সুমু শেরাজের হাতটা জোরে চেপে ধরল। শেরাজ বুঝতে পারল সুমুর ইচ্ছা। দুজনে একসাথে পা বাড়াল। গোলাপের আর্চের সামনে এসে দাঁড়াল দুজনে। অমিত এসে একটা লাল গোলাপের বুকে দিল শেরাজের হাতে। শেরাজ বুকেটা হাতে নিল। অমিত সুমুর হাতের ফুলগুলো নিয়ে চলে গেল। শেরাজ কিছুক্ষণ সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে গোলাপ ফুলের বুকে নিয়ে সুমুর সামনে হাঁটুমুড়ে বসল। তারপর ফুলের বুকেটা সুমুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ব্যাচেলর পার্টির রাতে তোমার সাথে যখন আমার প্রথম দেহের সংস্পর্শ হলো, সেদিন তোমার ছোঁয়াতে আমি অন্যরকম কিছু অনুভব করেছিলাম। নিজের ওই অনুভূতিটাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে এরপর আস্তে আস্তে আরও অনেকবার তোমাকে ছুঁয়েছি আমি। তখনও সেম অনূভুতিগুলো হচ্ছিল আমার। আমি বুঝতে পারছিলাম না, ওগুলো কেমন অনূভুতি। বারবার নিজের মনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতাম আমি। কিছুতেই আমার মনের কথাগুলোকে মেনে নিতে পারছিলাম না। এরপর আস্তে আস্তে মনের কথাগুলোকে মেনে নিতে শুরু করলাম। তারপরও কোথাও একটা কিন্তু থেকেই গেল। বাট যেদিন এই কক্সবাজারের সমুদ্রের পানিতে তোমাকে তলিয়ে যেতে দেখছিলাম, সেদিন কোনো জানো মনে হচ্ছিল, আমার খুব কাছের কেউ আমার থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। যাকে ছাড়া আর নিজেকে ভাবা সম্ভব না। নিজেকে ভালো রাখতে হলেও, অন্তত তাকে একান্তই নিজের করে রাখতে হবে। তুমি জানো সুমু, সেদিন আমার পুরো দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেয়েছিল। শেরাজ খান কোনোদিনও কাউকে হারানোর ভয় পায়নি। কিন্তু সেদিন পেয়েছিল। আমার তোমাকে চাই সুমু। নিজেকে ভালো রাখার জন্য হলেও চাই। তুমি কি সারাজীবনের জন্য পুরো তুমিটাকে আমার নামে লিখে দিবে?”
সুমু হাত বাড়িয়ে ফুলের বুকেটা নিল। আনন্দে আজ সুমু ট্রমার মধ্যে চলে গেছে, যার ফলে কথা বলতে ভুলে গেছে। শেরাজ বসে থাকা অবস্থায় পকেট থেকে একটা বক্স বের করল। বক্স থেকে একটা ডায়মন্ড রিং বের করে, বক্সটা আবারও পকেটে রেখে দিল। সে নিজের বা হাতটা বাড়িয়ে দিল সুমুর দিকে। সুমু একটু সময় নিয়ে নিজের বা’হাতটা শেরাজের হাতের ওপর রাখল। শেরাজ খুব যত্নসহকারে রিং’টা সুমুর বা’হাতের অনামিকা আঙুলে পরিয়ে দিল। তারপর সুমুর হাতের ওপর আলতো করে ঠোঁট ছুয়ে দিল।
রাহিন, আইয়ুব, সারবাজ আর নিহাল পার্টি পোপার ফাটাল। বাকি সকলে একসাথে হাত তালি দিয়ে সিঁটি মারল। শেরাজ উঠে দাঁড়াল সুমুর সামনে। সুমু আবারও দিক-বেদিক, লজ্জা-শরম সব ভুলে গিয়ে জড়িয়ে ধরল শেরাজকে। এতেই শেরাজ নিজের উত্তর পেয়ে গেল। রাহিন, সামিয়ার চোখ আর আইয়ুব নাজমিনের চোখ তাদের হাত দিয়ে ঢেকে দিল। সামিয়া চুপ করে থাকলেও নাজমিন নিজের কনুই দিয়ে আইয়ুবকে একটা গুতো মারল। ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেললেও, আইয়ুব চোখ ছাড়ল না নাজমিনের। শেরাজ সুমুকে বুক থেকে সরিয়ে আলতো করে সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। পকেট থেকে বাইকের চাবি বের করে সুমুর সামনে ধরল। তারপর ভ্রু নাচিয়ে সুমুকে কিছু বোঝাল। সুমু আলতো হেসে মাথা ওপর নিচ নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। শেরাজ সামিয়াদের ইশারা করতেই সামিয়া আর নাজমিন এসে সুমুকে নিয়ে চলে গেল। মিনিট বিশেকের মধ্যেই তারা সুমুকে চেঞ্জ করিয়ে হাজির করল শেরাজের সামনে। পাশেই অন্ধকারের মধ্যে আগে থেকে চেঞ্জের করার জায়গার ব্যবস্থা করিয়ে রেখেছিল শেরাজ। সুমুর চেঞ্জ করা হয়ে গেল শেরাজ গেল চেঞ্জ করতে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে চেঞ্জ করে ফিরে এলো সে। এখন দুজনের পরনে রাইডিং কস্টিউম। রাহিন বাইক এনে সামনে রাখল। শেরাজ সুমুকে হেলমেট পরিয়ে দিল। তারপর নিজে গিয়ে বাইকে বসে হেলমেট পরে নিল। সে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল সুমুর দিকে। শেরাজের হাতের ওপর হাত রেখে সুমুও বাইকে উঠে পড়ল।
হঠাৎ আইয়ুব এসে শেরাজকে বলল,
“ডিনারের ব্যবস্থা করলি। ডিনার করে যাবি না?”
শেরাজ একটু নিচু কন্ঠে আইয়ুবকে বলল,
“ওটা তোরা করে নে। আমি এখন অন্য ডিনার করতে যাচ্ছি।”
আইয়ুব কিছু বলতে নেবে তার আগেই শেরাজ বাইক স্টার্ট দিয়ে স্থান ত্যাগ করল।
বাইক চলছে ফুল স্পিডে। সুমু সাথে থাকায় শেরাজ প্রথমে নরমাল স্পিডে চালালেও এখন সুমুর আশকারায় ফুল স্পিডে চালাচ্ছে। সুমুর ভাষ্যমতে, “বাইক যদি গরুর গাড়ির স্পিডে চালাবেন, তাহলে বাইক বাদ দিয়ে গরুর গাড়ি আনতেন।”
কথাটাশুনে শেরাজ হেসে ফেলেছিল। তারপর বাইকের স্পিড ফুল বাড়িয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ সুমু দাঁড়িয়ে দুইহাত মেলে দিল। উপভোগ করতে লাগল এমন সুন্দর মুহূর্ত। হঠাৎ কি যেন মনে করে আবারও সে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল শেরাজকে। আচমকাই শেরাজ বাইক থামিয়ে দিল। সুমু কিছু বলতে নিবে, তার আগেই সুমুর দিকে তাকিয়ে সুমুর কোমর চেপে ধরে তাকে উঁচু করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে সামনে এনে বসাল। সুমুর দু’পা শেরাজের দুই উরুর ওপর। শেরাজ আরও জোরে সুমুর কোমর চেপে ধরে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নিল তাকে। সুমুর হাইট এখন শেরাজের থেকে দুই-তিন ইঞ্চি বেশি হয়ে গেল। শেরাজ যত্নসহকারে সুমুর হেলমেট খুলে দিয়ে নিজেরটাও খুলে ফেলল। তারপর সে নেশাগ্রস্ত দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখন আমি এমন একটা কিছু করব, যার জন্য তুমি নিজেকে দু’সেকেন্ডের মধ্যে প্রস্তুত করো।”
কথাটা বলতে দেরি হলেও, সুমুর ওষ্ঠজোড়া নিয়ে ওষ্ঠের আয়াত্তে নিতে দেরি করল না শেরাজ। ওভাবেই কেটে গেল মিনিট খানেক সময়। সুমু দম নেওয়ার জন্য হাঁসফাঁস করছে। শেরাজ তবুও ছাড়ল না সুমুকে। মনে হচ্ছে অনেকদিনের পিপাসা একবারে মিটিয়ে নিচ্ছে সে। সুমুর ছটফট আরও বেশি বাড়তেই শেরাজ ছেড়ে দিল সুমুকে। ছাড়া পেতেই প্রাণ ভরে জোরে জোরে শ্বাস নিল সে। সুমুর ওষ্ঠজোড়া রক্তের মতো লাল হয়ে গেছে। তিরতির করে কাঁপছে তার ওষ্ঠজোড়া।
সুমুর অবস্থা দেখে শেরাজ বড় করে ঢোক গিলে ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“আরও একবার হবে নাকি সুইটহার্ট?”
সুমু শেরাজের কথা শুনে দুইহাত দিয়ে নিজের ওষ্ঠ ডেকে ফেলল। শেরাজ জোর করে সুমুর হাতদুটো সরিয়ে দিয়ে আলতো করে চুমু খেলে তার ওষ্ঠে। সুমু শেরাজকে জড়িয়ে ধরে মুখ লুকাল শেরাজের বুকে। শেরাজ মুচকি হেসে বাইক স্টার্ট করল।
রিসোর্টে ফিরতে ফিরতে রাত তিনটা বাজলো সুমুদের। রাহিনরা সকলে শুয়ে পড়েছে। রুমে ঢুকেই শেরাজ হতভম্ব হয়ে গেল। পুরো রুমটা তাজা ফুল আর ক্যান্ডেল দিয়ে সাজানো। শেরাজ খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, এগুলো তার বন্ধুদের প্ল্যান। সে একটু হেসে সুমুকে বলল,
“চলো, বাসরটাও সেরে ফেলি।”
সুমুর লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সে। শেরাজ সুমুর অবস্থা দেখে বলল,
“চিন্তা নেই। আজ আর বাসর করব না। এমনিতেই তোমার যেই শরীর। এই শরীরে আমার গভীর ব্যাড টাচ পড়লে, তুমি একমাসের আগে বেড ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। আগে তোমাকে আমার টাচের যোগ্য করব। তারপর তোমার সাথে বাসর করব। সেদিন আর কোনো ছাড় পাবেনা তুমি। এখন গিয়ে চেঞ্জ করে নাও। আমার অনেক ঘুম পাচ্ছে। আমি একটু ঘুমাব।
খান সাহেব পর্ব ২০
সুমু লজ্জায় মাথা নিচু করে ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। চেঞ্জ করে সে মিনিট দশেকের মধ্যে ফিরে এলো। শেরাজ রুমের মধ্যেই চেঞ্জ করে ফেলেছে। সে বেড থেকে ফুলগুলোও পরিষ্কার করে ফেলেছে। সুমু বেরোতেই সুমুকে হেচকা টান দিয়ে বেডের ওপর ফেলল। পায়ের কাছে থাকা ব্লাঙ্কেটটা দিয়ে দুজনের গায়ে জড়িয়ে নিল। তারপর সুুমুর বুকের মধ্যে মুখ গুজে চোখ বন্ধ করল। সুমু শেরাজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাবল, “এই সবকিছুই স্বপ্ন। সকালে ঘুম থেকে উঠলে হয়তো স্বপ্নটা ভেঙে যাবে। আজ ঘুমাতে চায়না সে। যদি স্বপ্নটা ভেঙে যাই।”
তারপরও চোখ দুটোকে আটকে রাখতে পারল না সুমু। আলতো করে শেরাজের চুলের ওপর ঠোঁট ছুঁয়ে পরম আবেশে চোখ বন্ধ করল সুমু।
