Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৫

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৫

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৫
ছায়া

সাদা গাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে থাকে।চারপাশটা অচেনা নির্জন। জানালার বাইরে ঝাপসা গাছপালা দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। ইলার মুখ শক্ত করে বাঁধা, হাত দুটো দড়িতে বাঁধা। চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না।
তার বুকের ভেতর শুধু একটা নামই ধাক্কা মারছে “আরিয়ান”
“আমি ভুল করেছি”এই কথাটা হাজারবার মনে মনে বলছে ইলা।নকল শাওনের সাথে দেখা করতে রাজি হওয়াটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

সামনের সিটে বসা লোকটা আয়নায় একবার ইলার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। পাশে বসা ছেলেটা যাকে সে শাওন ভেবেছিল এখন আর মুখে সেই নরম হাসি নেই।চোখ দুটো ঠান্ডা ভয়ংকর।
ছেলেটাঃ- কাঁদছো কেন ইলা তুমি তো নিজেই এসেছ।
ইলাঃ- আপনার ঐ নংড়া মুখে আমার নাম উচ্চারণ করবেন না।
গাড়িটা একটা নির্জন এলাকার দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে।তার চোখে ভয় আর অশ্রু মিশে একাকার।ইলা কাঁপছে কিন্তু চিৎকার করার শক্তি নেই। সামনের সিটে ছেলেটা চুপচাপ বসে আছে তার চোখে একটা অদ্ভুত উন্মাদ ভাব।ইলা কাঁপা গলায় বলল
ইলাঃ- আপনি… আপনি এটা কী করছেন? আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ আমি কি ক্ষতি করেছি আপনার।
ছেলেটা মুখ ফিরিয়ে হাসল হাসিটা এবার আর মিষ্টি নয় বরং ভয়ংকর।
ছেলেটাঃ- তুমি কিছু করোনি যা করেছে সেটা তোমার স্বামী করেছে।
ইলা ছেলেটার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলো।ছেলেটা হুডি খুলে ফেলল মুখ থেকে মাস্ক সরিয়ে একটা ভয়ংকর মুখ বেরিয়ে এল। ইলার চোখ বড় হয়ে গেল।

ইলাঃ- ইলা কে আপনি
ছেলেটাঃ- আমার নাম রাহাত এই যে কাটা দাগটা দেখছো এটা তোমার স্বামীর দেয়া ঘা।
কথাটা শুনার পরে ইলার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল এ একটা পাগল সম্পূর্ণ উন্মাদ।
অন্যদিকে, কালো এসইউভি গাড়ি ছুটে চলেছে স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে হাত চেপে ধরে আছে আরিয়ান। চোখ লাল কপালের শিরা ফুলে উঠেছে ফোনটা স্পিকারে।
রাফায়েলঃ- আমরা পেছনেই আছি গাড়িটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ার দিকে যাচ্ছে।
আরিয়ান দাঁত কামড়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আজ ওরা কেউ পালাতে পারবে না কিন্তু ঐ বান্দির পুত এর এত বড় সাহস হয় কি করে আমার কলিজায় হাত দেয়ার।

রাফায়েলঃ- আমি নিজেও ভেবে পাচ্ছি না এই ছেলে আমাদের অনেক জুনিয়র ভালো সম্পর্ক আর তোদের এদিকেই বাসা তাই ভাবলাম অকে দিয়েই কাজ করাই।
এদিকে,গাড়িটা দ্রুত গতিতে শহরের বাইরের দিকে নির্জন এক গুদামের সামনে এসে থামল। ইলার হাত-পা বেধে মুখে টেপ মেরে রেখেছে।ইলার চোখের পানি বাঁধ মানছে না সে বুঝতে পারছে না কেন সে আরিয়ানকে সবটা বলল না! কেন সে একা এই বিপদ ডেকে আনল।
গাড়ির দরজা খুলে সেই ছেলেটি যে নিজেকে শাওন বলে পরিচয় দিয়েছিল সে ইলাকে টেনে নামাল। তার মুখে এখন আর সেই নকল ভালোবাসার মুখোশ নেই সেখানে এখন পৈশাচিক উল্লাস।ছেলেটি ইলার মুখের টেপটা টান মেরে খুলে দিয়ে কর্কশ গলায় বলল,
রাহাতঃ- শাওন তো কেবল একটা টোপ ছিল ইলা আরিয়ান আমার সাথে যা করেছে তার শোধ আমি নেব।তোমার স্বামী আরিয়ান অনেক বেশি উড়ছে এক সময় আজ তার সে ডানা আমি কেটে দিবো। আজ তোমাকে শেষ করে ওকে আমি তিলে তিলে মারব।
ইলা চিৎকার করে উঠল,

ইলাঃ- ছেড়ে দিন আমাকে আরিয়ান আপনাকে ছাড়বে না।
রাহাত ইলার এই কথা শুনে পৈচাশিক হাসি দিলো বিকট শব্দ করে।ইলাকে টেনে একটা গুদাম ঘরে ডুকালো।গুদামের ভেতরটা অন্ধকার, ধুলো জমে আছে। পুরোনো লোহার রড, ভাঙা বাক্স আর ছেঁড়া কাপড় ছড়িয়ে আছে। একটা পুরোনো চেয়ারে ইলাকে বসিয়ে বাঁধা হল।লোক দু’টা বাইরে গিয়ে দাঁড়াল।ইলা চিৎকার করে উঠল,
ইলাঃ- আপনার সাহস কী করে হয় আমাকে এখানে নিয়ে আসার? আমার স্বামী জানলে আপনাকে এখানেই কবর দিয়ে দিবে।
রাহাত ধীরে ধীরে এগিয়ে এল মুখের ক্যাপটা খুলে ফেলল। রাহাত ঠাস করে ইলার গালে চড় বসিয়ে দিলো। সাথে সাথে ইলার ঠোঁট কেটে রক্ত বের হতে লাগলো। এটা দেখে রাহাতের চোখে অদ্ভুত একটা পাগলামির ছায়া সে হাসতে হাসতে বলল,

রাহাতঃ- সাহস? সাহস তো তোমার স্বামী নিজেই দিয়েছে।
ইলার মাথায় যেন বজ্রপাত হল সে স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ বড় বড় শ্বাস আটকে এল।
ইলাঃ- কী… কী বলছেন আপনি?
রাহাত আরও কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
রাহাতঃ- আরিয়ান নিজেই তো এই কাজটা করিয়েছে।নাহলে একজন মেজর এর বউকে কিডন্যাপ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না।
ইলাঃ- না… না… এটা মিথ্যে…আমি বিশ্বাস করি না আরিয়ান এমন করতে পারে না।
রাহাত হাসতে হাসতে বলল,

রাহাতঃ- বিশ্বাস না হলে দেখো ওর বন্ধুর মেসেজের স্ক্রিনশট আছে আমার কাছে।
সে ফোন বের করে একটা স্ক্রিনশট দেখাল সেখানে একটা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে “প্রেমের অভিনয় করতে হবে কয়েক দিনের জন্য ”
ইলার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
ইলাঃ- না… না…এটা আরিয়ান করতে পারে না।
রাহাত অট্টহাসি দিয়ে উঠল ইলার দিকে এসে ইলার কবজি চেপে ধরে।
রাহাতঃ- আরিয়ান তোমার ওপর সন্দেহ করে তাই তো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শুধু দেখেছে নাহলে কি তুমি এখানে আসতে পারতে এত সিকিউরিটির পরেও।শুরুটা আরিয়ান করেছে শেষ টা আমি করবো আরিয়ান জানবেও না তুমি কোথায় আছ।
ইলাঃ- তাহলে আপনি আমাকে এখানে কেনো নিয়ে এলেন।
রাহাতঃ- কারণ ৩ বছর আগে আরিয়ানের জন্য আমার মানুষের কাছে অপমানিত হতে হয়েছে।
ইলাঃ- মানে????

রাহাতঃ- আমিও একজন সেনাবাহিনী ৩ বছর আগে একটা মেয়ের সাথে আমার প্রেম ছিলো কিন্তু ঐ মেয়ে যখন যাবে আমি বিবাহিত তখন অনেক সিনক্রিয়েট করে। আর তোমার স্বামী আরিয়ান আমাকে অনেক মারধর করে অন্য আর্মিদের সামনে। আর আজ ৩ বছর পরে আমি এটার সুযোগ পেয়েছি আরিয়ানাকে অপমান করার।
এটা হলে রাহাত ইলার সাথে জোরজবরদস্তি করা শুরু করে। ইলা কান্না করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে আর সাথের বাকি দুইজন ফোনে ভিডিও করে।
ঠিক তখনই গুদামের লোহার গেটটা প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল। একটা কালো গাড়িটা সজোরে ভেতরে ঢুকে পড়ল।টায়ার ঘষার বিকট শব্দ আর ধুলোর আস্তরণ ভেদ করে গাড়ি থেকে নামল এক যমদূত।পরনে কালো শার্ট, হাতা গোটানো, আর চোখে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি।আরিয়ানকে দেখেই রাহার এর হাত থেকে ইলার হাত ছুটে গেল। আরিয়ান এক মুহূর্ত দেরি করল না। বাঘের মতো গর্জন করে সে রাহাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আরিয়ানঃ- আমার ইলার গায়ে হাত তোলার সাহস কীভাবে হলো তোর বাস্টার্ড।
আরিয়ানের একেকটা ঘুষি যেন হাতুড়ির মতো রাহাতের মুখে আছড়ে পড়ছে। রাহাতের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে, কিন্তু আরিয়ানের রাগ থামার কোনো লক্ষণ নেই।

রাফায়েল আর সামিরও পৌঁছে গেছে। তারা বাকি দুজনকে সামলাচ্ছে কিন্তু আরিয়ান তখন উন্মাদ। সে রাহাতের কলার ধরে তাকে দেওয়ালে আছড়ে ফেলল এবং পা দিয়ে তার বুকে প্রচণ্ড জোরে একটা লাথি মারল।
আরিয়ানঃ- তুই ভেবেছিলি তুই ইলাকে এখানে নিয়ে আসবি আর আমি খুজে পাবো না। তোর ফোনের প্রতি সেকেন্ড এর লোকেশন আমি জানি।তুই ভেবেছিলি আমার ইলা একা? ওর পেছনে ওর স্বামী পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে সেটা ভুলে গেছিস?
আরিয়ান পাশ থেকে একটা লোহার রড তুলে নিল।ইলা কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করল,
ইলাঃ- আরিয়ান প্লিজ থামুন ও মরে যাবে প্লিজ ছেড়ে দিন।
আরিয়ান রডটা উঁচিয়ে ধরল রাহাতের আঙুলের ওপর।

আরিয়ানঃ- এই হাত দিয়ে তুই আমার ইলাফুলকে ছুঁয়েছিলি না?এই হাত আমি আর আস্ত রাখব না।
ক্র্যাক একটা বিকট হাড় ভাঙার শব্দ আর রাহাতের আকাশ ফাঁটা আর্তনাদে পুরো গুদাম কেঁপে উঠল।আরিয়ান থামল না সে রাহাতের মুখে পা দিয়ে চেপে ধরে ঠান্ডা গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- যতদিন এই আরিয়ান এর মত পাহাড় ইলাফুল এর মাথার উপরে থাকবে ইলাফুলের কেউ কিছু করতে পারবে না।আজ তোকে পুলিশে দেব না আজ তোকে এমন শিক্ষা দেব যে ‘ইলা’ নাম শুনলে তোর আত্মা কাঁপবে।
এরপর আরিয়ান ইলার দিকে ফিরল ইলা তখনও থরথর করে কাঁপছে।আরিয়ান দ্রুত গিয়ে ইলার বাঁধন খুলে দিল। ইলা বাঁধন মুক্ত হতেই পরে যেতে নিলো আরিয়ান শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
আরিয়ান ইলাকে নিজের বুকের ভেতর আড়াল করে নিল। ইলার কপালে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
আরিয়ানঃ- সরি লিটিলহার্ট খুব সরি আমি বুঝতে পারিনি এমন কিছু হবে ভয় নেই ইলাফুল আমি এসে গেছি।
ইলা আরিয়ানের এই কথা শুনে অবাক হয়ে যায় তার মানে আরিয়ান সত্যি সব জানে। এই সব কিছুর পিছনে আরিয়ানের হাত আছে।

গুদামঘরের সেই ভ্যাপসা অন্ধকারে আরিয়ানের বুকের ভেতর ইলা থরথর করে কাঁপছিল। কিন্তু সেই কাঁপুনি এখন আর ভয়ের নয়, বরং এক তীব্র অভিমানে আর অপমানে ফেটে পড়ার উপক্রম। আরিয়ানের “সরি” শব্দটা ইলার কানে বিষের মতো লাগল।তার মানে রাহাত যা বলেছে সব সত্যি আরিয়ান এই নাটকটা করিয়েছে?
ইলা প্রচণ্ড জোরে আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তার চোখে এখন আগুনের হলকা, জল টলমল করছে ঠিকই কিন্তু তাতে হাহাকার বেশি।আরিয়ান অবাক হয়ে গেল,
আরিয়ানঃ- ইলাফুল কী হয়েছে আপনি ঠিক আছে তো?
ইলা চিৎকার করে উঠল,

ইলাঃ- আমাকে ছোঁবেন না, একদম আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না মিস্টার আরিয়ান খান এত বড় একটা জঘন্য নাটক আপনি সাজাতে পারলেন?
আরিয়ান হতভম্ব হয়ে ইলার দিকে এগিয়ে যেতে চাইল,
আরিয়ানঃ- ইলাফুল আপনি ভুল বুঝছেন আমি পরিস্থিতি সামলানোর জন্য…
ইলাঃ- থামুন
ইলার গলার স্বরে গুদামঘরটা কেঁপে উঠল। ইলা কাঁদতে কাঁদতে হাসতে লাগল,
ইলাঃ- পরিস্থিতি সামলানোর জন্য? আমার ইমোশন নিয়ে খেলার নাম বুঝি পরিস্থিতি সামলানো? আপনি জানতেন শাওন সেজে রাহাত আমাকে ফোন করছে,আপনি জানতেন ও আমাকে এখানে নিয়ে আসবে।আপনি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলেন যখন আমি বিপদে পড়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিলাম? কেন আরিয়ান? কেন?
আরিয়ান কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই রাফায়েল আর সামির বাকি দুজনকে বেঁধে রেখে এদিকে এগিয়ে এল।রাফায়েল ইলার অবস্থা দেখে অপরাধবোধ নিয়ে বলল,

রাফায়েলঃ- ইলা আসলে আরিয়ান চেয়েছিল…”
ইলাঃ- আপনি চুপ করুন মিস্টার রাফায়েল
ইলা অগ্নিদৃষ্টিতে রাফায়েলের দিকে তাকাল।
ইলাঃ- আপনার ওপর আমার অনেক শ্রদ্ধা ছিল যখন আপনি আমার পরিস্থিতি বুঝে আমার থেকে দূরে সরে গেছিলেন।কিন্তু আজ বুঝলাম আপনিও এই নোংরা খেলায় অংশীদার। কী দোষ করেছিলাম আমি?এটাই কি আমার অপরাধ যে আমি আপনাকে রিজেক্ট করেছিলাম? সেই শোধ নিতে আপনি আরিয়ানের সাথে মিলে আমার সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেললেন? আমার ভয়, আমার কান্না সবই কি আপনাদের কাছে স্রেফ একটা গেম ছিল?
রাফায়েল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরল না। ইলা আবার আরিয়ানের দিকে ফিরল।
ইলাঃ- আপনার লাইফে নওরিন ফিরে এসেছে তাই তো? আপনি নওরিনকে ভালোবাসেন তাকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য আমাকে আপনার রাস্তা থেকে সরাতে চেয়েছেন? আমাকে একবার বলতেন আরিয়ান আমি তো এমনিতেই আপদ ছিলাম আপনার জীবনে।আমাকে শাওনের ভয় দেখিয়ে এত নাটক না সাজালেও পারতেন। আমি নিজ ইচ্ছায় আপনার জীবন থেকে চিরতরে চলে যেতাম।শুধু একটা বার বলতে তো পারতেন। কিন্তু আপনি আমার আত্মসম্মানে আঘাত করলেন?
আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল।সে ধীর পায়ে ইলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।তার চোখে জল কিন্তু কন্ঠস্বর গম্ভীর,
আরিয়ানঃ- ইলাফুল আপনি আমাকে এতটা নিচু ভাবলেন? আমি নওরিনের জন্য এসব করেছি আপনার তাই মনে হয়?

ইলাঃ- তবে কিসের জন্য?
ইলা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
ইলাঃ- আপনি তো আমাকে পরীক্ষা করছিলেন তাই না? আমি শাওনের কথা শুনে ঘর থেকে বের হলাম সেটা প্রুভ করতেই আপনি এই নাটক সাজালেন। আপনি দেখাতে চেয়েছিলেন আপনার বাড়ির লোককে আমি কতটা অসতী তাই তো।লিয়ান গেছে শাওন এসেছে এই তো আপনার মনের চিন্তা? ছিঃ আরিয়ান। আপনার ভালোবাসা কি এতই ঠুনকো যে একটা মিথ্যে টোপ দিয়ে আমাকে পরীক্ষা করতে হলো?
ইলা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না আলুথালু বেশে, ভাঙা মন নিয়ে সে গুদামঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে আরিয়ান স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।সে চেয়েছিল ইলার অতীত থেকে শাওন নামের অধ্যায়টা চিরতরে মুছে দিতে আর ইলার সাথে নতুন করে জীবন গড়তে কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, সত্য উদঘাটনের এই নেশায় সে তার ভালোবাসার মানুষটির বিশ্বাসটাই চুরমার করে দিয়েছে।
সামির আরিয়ানের কাঁধে হাত রাখল,

সামিরঃ- ভাই এবার পরিস্থিতি সত্যিই হাতের বাইরে চলে গেছে।
আরিয়ান কোনো কথা বলল না তার দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।সে জানত না ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে গিয়ে সে আজ নিজেকেই ইলার কাছে অপরাধী করে তুলেছে।
গুদামঘরের বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার নির্জন রাস্তার ঝোপঝাড়ের মাঝ দিয়ে ইলা পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে। তার পরনের কাপড় ধুলোয় মাখা,চোখের জল গালের রক্ত আর ঘামের সাথে মিশে এক বীভৎস রূপ নিয়েছে কিন্তু শরীরের ব্যথার চেয়ে মনের ভেতর যে দহন চলছে,তা যেন তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে।পেছন থেকে আরিয়ানের চিৎকার শোনা যাচ্ছে,
আরিয়ানঃ- “ইলাফুল দাঁড়ান একটা বার কথা শুনুন!”
আরিয়ান দৌড়ে এসে ইলার হাত চেপে ধরল ইলা ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল।তার চোখে এখন আর ভালোবাসা নেই আছে ঘৃণা আর সীমাহীন ঘৃণা।
ইলাঃ- কাছে আসবেন না বলেছি না আপনি কি ভেবেছেন, আপনি মেজর বলে যা খুশি তাই করবেন?মানুষের মন নিয়ে ফুটবল খেলবেন?

আরিয়ানঃ- ইলাফুল আমার কথা একটা বার ঠান্ডা মাথায় বোঝার চেষ্টা করুন।হ্যাঁ আমি শিকার করছি এটা আমার নাটক ছিলো কিন্তু এত কিছু হয়ে যাবে আমি ভাবিনি।কিন্তু পূরো কথাটা শুনুন আমার
ইলাঃ- (তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে) তাই? একবারও আপনার বুক কাঁপেনি যে আমার সাথে খারাপ কিছু হতে পারে? নাকি আপনি শিওর ছিলেন যে আপনার টিম তো পেছনেই আছে, তাই একটু ‘অ্যাডভেঞ্চার’ হোক?
আরিয়ান চুপ করে রইল তার নিরবতা ইলার সন্দেহে ঘৃতাহুতি দিল।
ইলাঃ- উত্তর নেই তো কারণ আপনি এটাই চেয়েছিলেন। আপনি দেখতে চেয়েছিলেন আমি ঐ লোকটার সাথে দেখা করতে গেছিলাম। আপনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন আমি এখনো ঐ শাওন নামের মায়াজালে আটকে আছি। অভিনন্দন মেজর আরিয়ান খান আপনি জিতে গেছেন।আমি গিয়েছি আমি ভুল করেছি। কিন্তু সেই ভুলের শাস্তি হিসেবে আপনি আমার চরিত্র নিয়ে যে ছিনিমিনি খেললেন তার বিচার কে করবে?
আরিয়ান ইলার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।তার মতো একজন শক্ত হৃদয়ের মানুষের চোখে আজ শ্রাবণের ধারা।
আরিয়ানঃ- আমি হার মেনেছি ইলাফুল আমি জানতাম না রাহাত এভাবে আমার উপরে শোধ নিবে ও একটা সাইকো, ও আপনাকে মারতে পারে এটা আমার ক্যালকুলেশনে ছিল না। আমি ভেবেছিলাম ও শুধু আপনার সাথে কথা বলবে যা আমি অকে বলেছিলাম।কিন্তু যখন দেখলাম ও আপনার গায়ে হাত তুলেছে… বিশ্বাস করুন, আমার কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল।

ইলাঃ- (চিৎকার করে) আপনার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছিল? আর আমার? আপনার মা, আপনার বাবা সবাই যখন জানবে আপনার বউ পরপুরুষের সাথে দেখা করতে গিয়ে কিডন্যাপ হয়েছে তখন তারা আমাকে কী ভাববে?
রাফায়েল আর সামির দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল।রাফায়েল সাহস করে সামনে এগিয়ে এল।
রাফায়েলঃ- ইলা আরিয়ান দোষ দিও না আরিয়ান কেবল তোমাকে নিজের করে নিতে চেয়েছিল।
ইলাঃ- আপনার লজ্জা করে না আপনি আমার বড় ভাইয়ের মতো ছিলেন।অথচ আপনি আমার সম্মানকে বাজি ধরলেন? আজ যদি আরিয়ান পৌঁছাতে একটু দেরি হতো যদি আমার সাথে খুব খারাপ কিছু হতো আপনারা কি পারতেন সেই সম্মান ফিরিয়ে দিতে?আপনাদের ইগো আর প্ল্যানের কাছে আমার জীবনটা সস্তা মনে হলো?
ইলা আর দাঁড়াল না রাস্তার পাশ দিয়ে একটা অটোরিকশা যাচ্ছিল সে হাত দেখিয়ে সেটা থামাল।
আরিয়ানঃ- ইলাফুল কোথায় যাচ্ছেন? গাড়িতে উঠুন আমি নিয়ে যাচ্ছি।

ইলাঃ- আমার সাথে আসার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি নিজের পথ চিনে নিতে জানি।আজ থেকে আপনার আর আমার মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই।আপনি আপনার অতীত নওরিনকে নিয়ে সুখে থাকুন আমার কাটা হয়ে দারাব না। আর আমি আমার এই ক্ষতবিক্ষত বর্তমান নিয়ে বেঁচে থাকব।
অটোরিকশাটা দ্রুত গতিতে চলে গেল আরিয়ান রাস্তার মাঝখানে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।সামির কাছে এসে বলল,
সামিরঃ- ভাই ওকে একা যেতে দিচ্ছিস কেন?
আরিয়ান ম্লান গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- যে বিশ্বাস একবার ভেঙে যায় তাকে জোর করে ধরে রাখা যায় না সামির।আমি ওকে হারাইনি আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি ওর চোখে।
ইলা অটোরিকশা চালককে বলল

ইলাঃ- স্টেশনে নিয়ে চলুন।
অটো চালক অবাক হয়ে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না।ইলা কাঁদছে তার মনে শুধু একটা কথা সে আর ফিরবে না।
অন্যদিকে আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে তার চোখে পানি।রাফায়েল এগিয়ে এসে বলল,
রাফায়েলঃ- ভাই ইলা চলে গেল ও ভুল বুঝেছে এখন অন্তত সত্যিটা বলে দে তুই ওর ভয়েজ কিং
আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
আরিয়ানঃ- আমার ভুল আমি ওকে পরীক্ষা করতে গিয়ে ওর বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছি। এখন যদি আমি বলি আমি সেই তাহলে ও আরো খারাপ কিছু করে বসবে।
সামিরঃ- এখন কী করবি?

আরিয়ানঃ- ওকে ফিরিয়ে আনব ও ছাড়া আমি বাঁচব না রে ও আমার আত্মা সাথে মিশে গেছে।
আরিয়ান গাড়িতে উঠে বসল রাফায়েল আর সামিরও।গাড়ি ছুটল ইলার পেছনে।ইলা স্টেশনে পৌঁছে টিকিট কাটল রাত ৯ টদিনাজপুর এর ট্রেন।ইল প্ল্যাটফর্মে বসে আছে। চোখ লাল মুখ ফ্যাকাশে তার মনে শুধু কষ্ট।আরিয়ানের সব কথা সব স্পর্শ সব মিথ্যে মনে হচ্ছে।
হঠাৎ তার ফোন বাজল আরিয়ানের নাম্বার ইলা ধরল না। আবার বাজল ইলা ফোনটা অফ করে দিল।ট্রেন এল ইলা উঠে বসল জানালার ধারে ৯:১৫ ট্রেন ছাড়ল। ইলার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে সে মনে মনে বলছে,

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৪

ইলাঃ- আরিয়ান আপনি আমাকে হারিয়ে দিলেন আমি আর ফিরব না।
অন্যদিকে আরিয়ানের গাড়ি স্টেশনে পৌঁছল আরিয়ান,রাফায়েল,সামির দৌড়ে প্ল্যাটফর্মে গেল। কিন্তু ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল তার চোখে পানি।
রাফায়েলঃ- ভাই কী করবি ট্রেন তো চলে গেলো।
আরিয়ানঃ- ওকে ফিরিয়ে আনব যেভাবেই হোক।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৬