Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৪

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৪

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৪
ছায়া

বিকেলের রোদটা তখন হালকা হয়ে এসেছে,বাগানের ফুল গুলোতে সোনালি আলো পড়ে ঝলমল করছে।আরিয়ান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ফোনটা এখনো মুঠোয় চাপা। নওরিনের মেসেজটা দেখে তার বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠেছে। সেই পুরোনো ক্ষতটা আবার খুলে গেছে।সে ফোনটা পকেটে রেখে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।কিন্তু মন শান্ত হচ্ছে না।
অন্যদিকে, ইলা রান্নাঘরে নাফিযার সাথে চা বানাচ্ছে। কিন্তু তার মন পুরোপুরি এখানে নেই। নওরিনের ফোনটা তার মাথায় ঘুরছে। সেই মিষ্টি গলা সেই আত্মবিশ্বাসী কথা
“আরিয়ানকে আমি ম্যানেজ করব”
ইলার বুকের ভেতর একটা অজানা অস্বস্তি জমে উঠছে।হঠাৎ তার ফোনটা আবার বাজল সেই নাম্বার ইলা একটু ইতস্তত করে ধরল।

ইলাঃ- হ্যালো?
ওপাশ থেকে সেই মেয়েলি গলা এবার একটু নরম,
নওরিনঃ- ইলা আমি আবার ফোন করলাম তুমি কি আরিয়ানকে বলেছ?
ইলাঃ- জি… না এখনো বলিনি আরিয়ান একটু ব্যস্ত।
নওরিন হালকা হেসে বলল,
নওরিনঃ- ওর স্বভাব তো জানি রাগ করে থাকবে।আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই আরিয়ানের বউকে দেখতে চাই। অনেকদিন পর ওর জীবনে কেউ এসেছে, খুব জানতে ইচ্ছে করছে কিভাবে জাদু করলে আরিয়ানাকে।
ইলার গলা শুকিয়ে গেল সে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু নওরিন আবার বলল,
নওরিনঃ- প্লিজ ইলা আসবে তো? আমি অপেক্ষা করব।
লাইন কেটে গেল ইলা ফোনটা হাতে ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।নওরিনের কথায় কেমন একটা দাবি,কেমন একটা পুরোনো অধিকারের ছোঁয়া।
অন্যদিকে আরিয়ান ব্যালকনি থেকে নেমে বাগানে গেল। তার মনের ঝড় থামছে না।সে আদিবকে আবার ফোন করল। আদিব ফোন ধরতেই,

আদিবঃ- হ্যালো ভাই আবার কী হলো? নওরিনের সাথে কথা বলছো?
আরিয়ানঃ- হ্যাঁ ও মেসেজ করেছে বলে “তোকে দেখতে চাই”।
আদিবঃ- কী? ভাই, ও কী চায় এখন? এত বছর পর?
আরিয়ানঃ- জানি না হয়তো কৌতূহল হয়তো দেখাতে চায় ওর জীবন কত ভালো চলছে। আর না হয় দেখতে চায় ইলাকে আমি কেনো বিয়ে করেছি। কিন্তু আমি যাবো না ওর মুখ ও দেখার ইচ্ছে নেই।
আদিবঃ- ভাই তুমি ঠিক বলছো কিন্তু ইলা যদি জানতে চায় নওরিন এর বিষয় ?
আরিয়ানঃ- জানতে দেব না সেই অধ্যায় শেষ ও আমার অতীত ছিল, কিন্তু ও আমাকে ভেঙে দিয়েছে। এখন আমার জীবনে শুধু ইলা আছে ওকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেব না।
আদিবঃ- ঠিক আছে ভাই কিন্তু সাবধান নওরিন যে জেদি ও যদি নিজে আসে কোনক গন্ডোগোল করার জন্য ?
আরিয়ানঃ- আসলে কী করবে?আমি ওকে দেখতে চাই না।
আদিবঃ- ভাই তুমি রাগে অন্ধ হয়ে যেও না। ইলার সামনে সামলে নিও নিজেকে। ও যদি বুঝে ফেলে যে তোমার অতীতে নওরিন ছিল তাহলে ভেঙে পড়বে।
আরিয়ানঃ- বুঝতে দেব না

ফোন কেটে দিল আরিয়ান বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে পুরোনো স্মৃতি ঘুরপাক খাচ্ছে।নওরিনের হাসি, তার প্রতিশ্রুতি, আর তার বিশ্বাসঘাতকতা।
অন্যদিকে ইলার ফোন আবার বাজল সেই অজানা নাম্বার। এবার ইলা ধরল না।কিন্তু মেসেজ আসল,
“আমি অপেক্ষা করব তোমরা না এলে আমি নিজে আসব।_নওরিন”
ইলার হাত কেঁপে উঠল সে ফোনটা টেবিলে রেখে চুপ করে বসে রইল। তার মনে একটা অজানা ভয় জন্ম নিচ্ছে। নওরিন কে? আরিয়ানের অতীতে কী ছিল যে তার নাম শুনেই আরিয়ান এমন রেগে যায়?
সন্ধ্যা নামছে বাড়িতে লাইট জ্বলে উঠেছে। ইলা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।আরিয়ান ধীরে এসে তার পাশে দাঁড়াল।
আরিয়ানঃ- কী ভাবছেন?
ইলাঃ- কিছু না।
আরিয়ান ইলার চোখের দিকে তাকাল।সে বুঝল ইলা কিছু লুকাচ্ছে কিন্তু কিছু বলল না শুধু ধীরে বলল,
আরিয়ানঃ- যাই হোক কাল কোথাও ঘুরতে যাবেন?
ইলা হালকা হেসে বলল,
ইলাঃ- চলুন।

কিন্তু দু’জনের মনেই একটা ছায়া পড়ে আছে নওরিনের ছায়া।ইলা আর আরিয়ান দুইজন চুপ নাফিযা মেহেরাব মনে করেছে হয়তো বাবা মার কথা মনে পড়েছে তাই মন খারাপ। ডিনার শেষে সবাই নিজের রুমে চলে গেলো।
রাত গভীর হয়ে এসেছে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। দোতলার ঘরে লাইট নিভে গেছে, শুধু ব্যালকনি দিয়ে চাঁদের আলো হালকা করে ঢুকছে। ইলা বিছানায় শুয়ে আছে চোখ বন্ধ কিন্তু ঘুম আসছে না আরিয়ান পাশে শুয়ে গভীর ঘুমে। তার শ্বাসের ছন্দ শুনতে শুনতে ইলার মনটা কেমন যেন শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু আজকের নওরিনের কথা, আরিয়ানের রাগ সব মিলিয়ে তার মন অস্থির।
হঠাৎ ইলার ফোনটা বেজে উঠল বিছানার পাশের টেবিলে রাখা ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। “Unknown Number”। ইলা চোখ কুঁচকে ফোনটা হাতে নিল। রাত ১টা বাজে। কে ফোন করবে এত রাতে? সে কলটা কেটে দিল কয়েক সেকেন্ড পর আবার বাজল। একই নাম্বার। ইলা এবারও ধরল না। ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখল। কিন্তু মিনিট দুয়েক পর আবার বাজল। তিনবার। ইলার বুকটা ধক করে উঠল। সে উঠে বসে ফোনটা ধরল।
ইলাঃ- হ্যালো?

ওপাশ থেকে একটা পুরুষের গলা। গভীর, পরিচিত, কিন্তু অনেকদিনের পুরোনো। গলাটা শুনেই ইলার শরীর জমে গেল।
পুরুষের গলাঃ- ইলা… আমি শাওন। তোমার ভয়েজ কিং।
ইলার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ বড় বড় শ্বাস আটকে এল। এই নাম এই নামটা যে তার জীবনের একটা বড় অংশ ছিল। যার জন্য সে বিয়ে ভেঙেছিল, মায়ের মার খেয়েছিল, রাত জেগে কেঁদেছে। যাকে না দেখেও ভালোবেসেছিল পাগলের মতো।ইলা কাঁপা গলায় বলল,
ইলাঃ- আ…আপনি… কী করে… আমার নাম্বার পেলেন?
শাওন ধীরে হেসে বলল,
শাওনঃ- অনেক খোঁজার পর তোমাকে অনেকদিন ধরে খুঁজছি।
ইলার চোখে পানি চলে এল সে ফিসফিস করে বলল,

ইলাঃ- আপনি আমাকে ফোন করেছেন কেন? আমি তো এখন আপনাকে আর বিরক্ত করি না।
শাওনঃ- বুঝো না করে কেনো ফোন করেছি ,আমি ও যে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
ইলাঃ- আমার জীবন এখন অন্যরকম আমি এখন বিবাহিত।
শাওনঃ- জানি শুনেছি তোমার বিয়ে হয়েছে। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি ইলা। তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।আমি এটা তুমি ছেরে যাওয়ার পরে বুঝতে পারি। আমি তোমার ভয়েজ কিং আর তুমি আমার শুধু আমার আমি জানি তুমি আমাকে ফিরাবে না।
ইলার বুকটা কেঁপে উঠল পুরোনো স্মৃতিগুলো একসাথে এসে ধাক্কা মারল কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
ইলাঃ- প্লিজ আর ফোন করবেন না আমি এখন সুখে আছি। আমার স্বামী আমাকে অনেক ভালোবাসে।
শাওন চুপ করে রইল কয়েক সেকেন্ড তারপর ধীরে বলল,
শাওনঃ- আমি এটা বিশ্বাস করি না। আমি জানি তুমি এই বিয়ে নিজের অনিচ্ছায় করেছো।
ইলা ফোন কেটে দিলো ফোনটা হাতে ধরে চুপ করে বসে রইল। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। পুরোনো ভালোবাসা, পুরোনো কষ্ট সব একসাথে ফিরে এল। কিন্তু তার পাশে শুয়ে থাকা আরিয়ানের শ্বাসের শব্দ শুনে সে নিজেকে সামলে নিল।

ইলা ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখে আস্তে করে আরিয়ানের পাশে শুয়ে পড়ল।আরিয়ান ঘুমের ঘোরে হাতটা ইলার কোমরে রাখল ইলা চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- আমি আর কাউকে হারাতে চাই না।
বাইরে চাঁদের আলোয় বাগান নিস্তব্ধ। কিন্তু ইলার মনে নতুন ঝড় উঠেছে শাওন ফিরে এসেছে। আর নওরিনের ছায়া এখনো রয়ে গেছে।
পরের দিন সকাল।
সূর্যের আলো বাগানে ছড়িয়ে পড়েছে ডাইনিং টেবিলে সবাই জড়ো হয়েছে।গরম পরোটা, ডিম ভাজি, আলুর দম, হালুয়া আর চা।নোহা আর নেহা ইলাকে ঘিরে বসে গল্প করছে। আরিয়ান চুপচাপ খাচ্ছে কালকের নওরিনের কথা এখনো তার মনে ঝড় তুলেছে সেটা থামেনি। মেহেরাব খান চা খেতে খেতে হাসিমুখে কথা বলছেন।
হঠাৎ ইলার ফোন বাজল স্ক্রিনে সেই “Unknown Number” ইলা চমকে উঠল সে ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখল।কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার বাজল। একই নাম্বার ইলা ফোনটা অফ করে রেখে দিল।
নাফিযাঃ- বউমা ফোন বাজছে ধরো
ইলা হালকা হেসে বলল,

ইলাঃ- না আম্মু ভুল নাম্বার হবে চিনি না আমি।
কিন্তু তৃতীয়বার ফোন বাজতেই মেহেরাব খান ভ্রু কুঁচকে বললেন,
মেহেরাবঃ- বউমা ফোন কেন ধরছ না? কে ফোন করছে হয়তো জোরাজুরি কিছু হতে পারে?
ইলার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল সে আর কিছু না বলে ফোনটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
ইলাঃ- আমি একটু আসছি।
বলে সে বাগানের দিকে চলে গেল ফোনটা কানে দিয়ে ধরল।
ইলাঃ- হ্যালো?
ওপাশ থেকে শাওনের গলা শান্ত কিন্তু জোরালো,
শাওনঃ- আমার সাথে দেখা করবে?
ইলার পা থেমে গেল সে চারপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হল কেউ শুনছে না।
ইলাঃ- না আমি দেখা করব না প্লিজ আর ফোন করবেন না।
শাওন হালকা হেসে বলল,
শাওনঃ- এত সহজে ছাড়ব না ইলা আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। শুধু একবার দেখা করো আমি ক্ষমা চাইব।তোমার চোখে চোখ রেখে বলব আমি ভুল করেছি।
ইলাঃ- না আমার এখন আর কোনো কষ্ট নেই। আর আপনাকে সরি বলতে হবে না এখন আমি সুখে আছি।প্লিজ আমাকে আর বিরক্ত করবেন না।
শাওনের গলা একটু কঠিন হয়ে গেল,

শাওনঃ- যদি না করো তাহলে আমি নিজে তোমার শশুরবাড়ি চলে আসব।তোমার স্বামীকে বলব আমি তোমার ভয়েজ কিং তোমার অতীত সব খুলে বলব।
ইলার শরীর কেঁপে উঠল এমনি লিয়ান কে নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছে এখন যদি আবার শাওন ঝামেলা করে ইলার শশুর বাড়ির লোক ইলাকে খারাপ ভাববে।ইলা ভয়ে কাঁপা গলায় বলল,
ইলাঃ- আপনি… এটা করবেন না প্লিজ।
শাওনঃ- তাহলে দেখা করো শুধু একবার।কাল বিকেলে আমি তোমাকে লোকেশন পাঠাব শুধু ক্ষমা চাইব।তারপর আর কখনো বিরক্ত করব না প্রমিস।
ইলা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল তার মনে হাজার ভয়।যদি শাওন সত্যি আসে? যদি আরিয়ান জানে?তার বাড়ির লোক জন জানে তাহলে অনেক খারাপ ভাববে সব শেষ হয়ে যাবে।
ইলাঃ- ঠিক আছে কাল আমি দেখা করবো কিন্তু শুধু একবার। আর তারপর আর কখনো না।
শাওনঃ- থ্যাঙ্ক ইউ কাল দেখা হবে।

লাইন কেটে গেল ইলা ফোনটা হাতে ধরে বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে পানি সে কী করবে? শাওনের সাথে দেখা করবে? না করলে সব জেনে ফেলবে আরিয়ান।কিন্তু দূর থেকে আরিয়ান ব্যালকনি থেকে ইলাকে দেখছে।তার মনে অজানা একটা অস্বস্তি ইলা কার সাথে কথা বলছিল?
ইলা কান্না করছে তার হাত কাঁপছে ফোনটা হাতে নিয়ে দ্রুত পরির নাম্বার ডায়াল করল।গ্রুপ কল করে হালিমাকেও যোগ করল।কয়েকটা রিংয়ের পর দু’জনেই ধরল
পরিঃ- হ্যালো ইলা কী রে এত সকালে? গ্রামের হাওয়া খেয়ে মিস করছিস নাকি?
হালিমাঃ- হ্যাঁ রে কী হলো? গলা শুনে মনে হচ্ছে কিছু হয়েছে।
ইলা গলা কাঁপিয়ে বলল,
ইলাঃ- পরি… হালিমা… আমি… আমি কী করব জানি না। শাওন ফোন করেছে।
ওপাশে দু’জনেই চুপ করে গেল তারপর পরি চিৎকার করে উঠল,
পরিঃ- কী সেই শাওন? তোর ভয়েজ কিং?
হালিমাঃ- কী বলল ও? কীভাবে নাম্বার পেল?
ইলা চোখ বন্ধ করে সব খুলে বলল রাতের ফোন,শাওনের কথা, দেখা করার জেদ, আর ব্ল্যাকমেইল।
ইলাঃ- ও বলল দেখা না করলে ও নিজে এখানে চলে আসবে। আমার শশুরবাড়িতে।আরিয়ানকে সব বলে দেবে আমি ভয় পেয়ে গেছি কী করব?
পরি আর হালিমা দু’জনেই চুপ তারপর পরি ধীরে বলল,

পরিঃ- ইলা তুই কি আরিয়ানের সাথে খুশি?
ইলা চুপ করে রইল কোনো উত্তর দিল না।
হালিমাঃ- ইলা বল না রে তুই কি শাওনের সাথে দেখা করতে চাস?
ইলা আরও চুপ তার চোখে পানি জমে উঠল তারপর ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- না আমি চাই না কিন্তু জানিস, কাল নাস্তার টেবিলে নওরিনের নাম শুনে আরিয়ান এত রেগে গেল।ওর চোখে যে রাগ দেখলাম তাতে আমি সিওর নওরিন আরিয়ানের অতীতে ছিল ও যাকে ভালোবেসেছিল। আর এখন ও ফিরে আসতে চায় হয়তো এখন আমি কী করব?
পরিঃ- কী বলছিস এসব নওরিন কে?
ইলা আবার সব খুলে বলল কাল সকালে নাফিযার কথা, আরিয়ানের রাগ, উঠে চলে যাওয়া।
ইলাঃ- আরিয়ানের চোখে যে কষ্ট দেখলাম মনে হলো ওর জীবনে কেউ ছিল যে ওকে অনেক আঘাত দিয়েছে।আর এখন সেই মানুষটা ফিরে আসতে চায়।আমি…..আমি কী করবো।
পরিঃ- তুই কি আরিয়ান ভাইয়াকে ভালোবেসে ফেলেছিস?
হালিমা ধীরে বলল,

হালিমাঃ- ইলা শোন তুই এখন কী চাস?শাওনের সাথে দেখা করবি?নাকি আরিয়ান ভাইয়াকে সব বলে দিবি?
পরিঃ- হ্যাঁ রে তুই কি এখনো শাওনকে… মানে…
ইলা চোখের পানি মুছে বলল,
ইলাঃ- না আমি শাওনকে আর ভালোবাসি না ও আমার অতীত কিন্তু আরিয়ান ও আমার বর্তমান।ওকে হারাতে চাই না কিন্তু যদি নওরিন ফিরে আসে?যদি আরিয়ানের মনে এখনো…!!!
হালিমাঃ- ইলা তুই আরিয়ান ভাইয়াকে বিশ্বাস কর।ভাইয়া তোকে ভালোবাসে তুই দেখেছিস কীভাবে ও তোর জন্য লড়েছে।
পরিঃ- হ্যাঁ রে আর শাওনের ব্ল্যাকমেইল? তুই যাস না।ও যদি আসে তাহলে আরিয়ান ভাইয়াকে সব বলে দে।ও ম্যানেজ করবে।
ইলাঃ- কিন্তু যদি আরিয়ান জেনে রাগ করে? যদি ভাবে আমি একটা খারাপ মেয়ে প্রথমে লিয়ান এখন শাওন
হালিমাঃ- না রে আরিয়ান ভাইয়া তোকে বোঝে।তুই শাওনকে ব্লক করে দে।আর নওরিনের কথা তুই আরিয়ান ভাইয়াকে জিজ্ঞেস কর সব খোলাখুলি হয়ে যাক।
ইলা চুপ করে রইল তার মনের ভেতর দু’টা ঝড়।একটা পুরোনো একটা নতুন।
ইলাঃ- ঠিক আছে আমি চেষ্টা করব থ্যাঙ্কস তোদের।
পরিঃ- আমরা আছি রে কিছু হলে ফোন করিস।
ফোন কেটে গেল ইলা বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে রইল।তার চোখে পানি কিন্তু মনে একটা জেদ সে আরিয়ানকে হারাবে না।

TIME SKIP…….
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। বাগানে হালকা রোদ পড়ে ফুলগুলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।আরিয়ান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে চোখে দূরের ধানের ক্ষেত।ইলা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল হাতে দুটো চায়ের কাপ। একটা আরিয়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে হালকা হেসে বলল,
ইলাঃ- চা খান।
আরিয়ান কাপটা নিয়ে মাথা নেড়ে ধন্যবাদ বলল।দু’জনে চুপ করে চা খেতে লাগল বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া। ইলার মনের ভেতর কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।অবশেষে সে সাহস করে বলল,
ইলাঃ- একটা কথা জিগ্যেস করব?
আরিয়ান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- বলুন।
ইলা একটু ইতস্তত করে বলল,
ইলাঃ- নওরিন… কে?
আরিয়ানের হাতটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।তার চোখে হঠাৎ একটা ছায়া পড়ল। সে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে চুপ করে রইল কোনো উত্তর দিল না।ইলা আবার বলল,

ইলাঃ- কাল নাম শুনে আপনি এত রেগে গেলেন কেন?
আরিয়ান এবার মুখ ফিরিয়ে বাগানের দিকে তাকাল।তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।সে ধীরে বলল,
আরিয়ানঃ- ওসব পুরোনো কথা জিগ্যেস করবেন না।
ইলার বুকটা ধক করে উঠল সে আরও একটু কাছে গিয়ে বলল,
ইলাঃ- কিন্তু আমি জানতে চাই ও কে আপনার? ছোটবেলার বন্ধু? না আরও কিছু?
আরিয়ান চুপ তার চোখে কষ্টের ছায়া, কিন্তু মুখ শক্ত। সে কিছু না বলে শুধু বলল,
আরিয়ানঃ- ইলা, প্লিজ এটা নিয়ে কথা বলতে চাই না।
ইলার চোখে পানি চলে এল সে ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- আপনি এখনো ওকে ভালোবাসেন তাই না?
আরিয়ান চমকে ইলার দিকে তাকাল তার চোখে আগুল জ্বলছে আরিয়ান একটা চড় বসিয়ে দেয় ইলার গালে
আরিয়ানঃ- কী বলছেন এসব? মাথায় সারাক্ষণ এই সব ঘুরে তাই না। কে বলেছে আপনাকে এই সব ফালতু কথা।
ইলা গালে হাত দিয়ে চোখ নামিয়ে বলল,
ইলাঃ- আমি আমার উত্তর পেয়ে গেছি।ওর নাম শুনেই আপনার এমন রাগ চুপ করে থাকা।আপনি এখনো ওকে ভালোবাসেন।আর আমার সাথে যা করেছেন এতদিন সব করুণা আমার বাবার কথা রাখতে টাইম পাস। আমি শুধু আপনার দায়িত্ব ছিলাম তাই তো।
আরিয়ানের চোখ বড় হয়ে গেল সে তৎক্ষণাৎ ইলার দুই গালে হাত দিয়ে ইলার চোখে চোখ রেখে বলল
আরিয়ানঃ- ইলা কী বলছেন এসব না একদম না আপনি ভুল বুঝছেন।
কিন্তু ইলা চোখের পানি মুছে আরিয়ানের হাত ছাড়িয়ে নিলতার গলা কাঁপছে,
ইলাঃ- তাহলে বলুন না কে ও কেন ওর নাম শুনে এত রাগ? কেন কথা বলতে চান না?কেনো তার বাসায় যেতে চান না।
আরিয়ান চুপ করে রইল তার মুখে কষ্ট সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু শব্দ বের হল না শেষে ধীরে বলল

আরিয়ানঃ- ইলা প্লিজ বিশ্বাস করুন আমার জীবনে এখন শুধু….
ইলাঃ- বলুন কি বিশ্বাস করবো বলুন চুপ করে থাকবেন না আমি শুনতে চাই। নাকি আপনি এখনো ওকে…
আরিয়ান ইলার চোখে চোখ রেখে বলল,
আরিয়ানঃ- না ইলা ও আমার অতীত আর আমি অতীতে ফিরে যেতে চাই না।
কিন্তু ইলার মনে সন্দেহটা রয়ে গেল সে মাথা নিচু করে বলল,
ইলাঃ- ঠিক আছে আমি আর জিগ্যেস করব না। আপনি যখন বলতে চাচ্ছেন না আমিও আর জোর করবো না।
আরিয়ান ইলার দিকে হাত বাড়াল কিন্তু ইলা ধীরে সরে গেল। তার মনে একটা চাপা কষ্ট।আরিয়ান এখনো নওরিনকে ভালোবাসে?আর তার সাথে যা হয়েছে সব করুণা? টাইম পাস?ইলা কিছু না বলে ঘরে চলে গেল আরিয়ান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রইল।তার মনে পুরোনো কষ্ট আর নতুন ভয়।
এভাবে আরো একটা রাত পার হয়ে গেলো কিন্তু দুটিমন নিজেদের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে ইলা ঘরে একা বসে আছে ফোনটা হাতে শাওনের কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। “দেখা না করলে আমি তোমার শশুরবাড়িতে চলে আসব”।ইলার বুকের ভেতর ভয় আর অসহায়ত্ব মিশে একটা ঝড় উঠেছে।সে আরিয়ানকে বলতে চায় না। বললে আরিয়ান রাগ করবে, হয়তো ভুল বুঝবে।আর নওরিনের কথা মনে পড়লে তার মন আরও ভারী হয় হঠাৎ এর মাঝে ফোন বাজল।সেই অজানা নাম্বার ইলা চোখ বন্ধ করে ধরল।

ইলাঃ- হ্যালো?
শাওনঃ- ইলা এখনো ভাবছ? কাল বলেছি শুধু একবার দেখা করতে আমি ক্ষমা চাইব। তারপর আর কখনো বিরক্ত করব না।
ইলা কাঁপা গলায় বলল,
ইলাঃ- ঠিক আছে দেখা করব কিন্তু শুধু একবার। আর তারপর আর কখনো ফোন করবেন না।
শাওনঃ- প্রমিস আজ বিকেলে আমি লোকেশন পাঠাচ্ছি।
ইলা ফোনটা হাতে ধরে বসে রইল চোখে পানি।সে জানে না এটা ঠিক না ভুল।কিন্তু আরিয়ানের জীবনে ঝামেলা আসুক চায় না ইলার ফোনে একটা মেসেজ আসলো ইলা মেসেজ চেক করে দেখে শাওন লোকেশন পাঠিয়েছে। সে উঠে দাঁড়াল কোনো কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।কেউ দেখেনি কিছু দূরে একটা নির্জন রাস্তার ধারে একটা গাছের নিচে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।কালো হুডি ক্যাপ আর মাস্ক দিয়ে মুখ ঢাকা। ইলা ধীরে এগিয়ে গিয়ে ডাকল,

ইলাঃ- আপনি… আর্মি শাওন?
ছেলেটা ধীরে ঘুরল মুখে হালকা হাসি কিন্তু চোখে অদ্ভুত চকচকে ভাব।
ছেলেটাঃ- হ্যাঁ আমি তোমার ভয়েজ কিং।কেমন আছো ইলা
ইলার দিকে এগিয়ে এসে
ইলার বুকটা ধক করে উঠল গলাটা শাওনের মতো না।কিন্তু সে ভয়ে কাঁপা গলায় বলল,
ইলাঃ- আপনি আমার কেউ না এখন আমার স্বামী আছে। কী বলতে চান প্লিজ তারাতাড়ি বলুন আমি চলে যাব।
ছেলেটা এক পা এগিয়ে এল আবার হাসিটা আরও চওড়া,
ছেলেটাঃ- ইলা প্লিজ আমার সাথে চলো আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি আর কখনো কষ্ট দিবো না।তুমি অনেক সুন্দর যেটা আমি কল্পনাও করিনি।
ইলা পিছিয়ে গেল,
ইলাঃ- দেখুন আমার স্বামী আছে আমি সুখে আছি।আপনি একসময় আমার অনুভূতি ছিলেন কিন্তু এখন কিছুই না।এখন আমি আপনাকে চিনি না।
ছেলেটার চোখে হঠাৎ একটা অন্ধকার ছায়া পড়ল সে হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল,
ছেলেটাঃ- চিনো না তাহলে এতদূর এলে কেন?
ইলা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল হঠাৎ রাস্তার পাশ থেকে একটা সাদা গাড়ি এসে থামল।দরজা খুলে দু’জন লোক নামল। ছেলেটা ইলার হাত ধরে টানল,

ছেলেটাঃ- চলো আর কথা না। আমি তোমাকে আর এক মূহুর্ত আলাদা থাকতে দিবো না।
ইলা চিৎকার করতে যাবে কিন্তু একজন লোক মুখ চেপে ধরল। জোর করে গাড়িতে তুলে নিল গাড়ি দ্রুত চলে গেল।
অন্যদিকে, আরিয়ান তার ঘরে বসে ফোন এ সব দেখছে। রাফায়েল আর সামিরের সাথে ভিডিও কলে।স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে ইলা আর ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। রাফায়েল আর সামির নকল শাওনের ফোনে মাইক লাগিয়ে দিয়েছিলো যাতে সব কিছু শুনতে পায় আরিয়ান।
আরিয়ানের চোখ লাল হয়ে গেছে সে সব দেখছে শুনছে।ইলা যখন বলল “আমি সুখে আছি”আরিয়ানের বুকটা হালকা হলো কিন্তু হঠাৎ মাইক্রোফোন অফ হয়ে গেল স্ক্রিনে শুধু ছবি কোনো শব্দ নেই আরিয়ান চিৎকার করে উঠল,

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৩

আরিয়ানঃ- রাফায়েল কী হলো শব্দ শুনা যাচ্ছে না কেন? আর ইলাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ও
রাফায়েলঃ- মাইকটা অফ হয়ে গেছে কিন্তু ও ইলাকে গাড়িতে তুলছে কেনক
আরিয়ান উঠে দাঁড়াল তার চোখে আগুন,
আরিয়ানঃ- তোরা গাড়ির পিছু নে এখনই আমি আসছি আমাকে লোকেশন পাঠিয়ে দে
ফোন কেটে দিয়ে আরিয়ান দৌড়ে নিচে নামল তার মুখে রাগ আর ভয় মিশে একটা ঝড়।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৫