ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৩
ছায়া
রাত গভীর হয়েছে আগুনটা এখনো জ্বলছে, কিন্তু শিখা ছোট হয়ে গেছে শুধু লালচে কয়লা আর মাঝে মাঝে ফুঁসে ওঠা ছোট ছোট আগুনের ফুলকি সবাই গল্পে মশগুল।মেহেরাব খান তাঁর যৌবনের গল্প বলছেন,নাফিযা আম্মু মাঝে মাঝে “আরে ওসব ছাড়ো” বলে হাসছেন। নোহা আর নেহা দুজনে মিলে আগুনে আলু পোড়া খাচ্ছে। আর ইলা সে চাদরে মোড়ানো অবস্থায় বসে আছে চোখে এখনো একটু জলের চকচকে ভাব, কিন্তু ঠোঁটে হাসি।হঠাৎ নোহা একটা বড় আলু তুলে ইলার দিকে এগিয়ে দিল।
নোহাঃ- ভাবী নাও গরম গরম আলু পোড়া খাও তাহলে শীত কাটবে।
ইলাঃ- ধন্যবাদ নোহা।
নেহাঃ- আরে ভাইয়া তো বলেছে কালকে ভাইয়া নাকি “জোরু কা গুলাম” তাই ভাইয়ার পিছে পিছে আমরাও “জোরু কা গুলাম”
আরিয়ান যে এতক্ষণ চুপচাপ আগুনের দিকে তাকিয়ে ছিল, হঠাৎ মাথা তুলে নোহার দিকে তাকাল চোখ সরু করে
আরিয়ানঃ- নোহা তোর বয়স কত হয়েছে?
নোহাঃ- কেন ভাইয়া উইল করতে চাও নাকি?
আরিয়ানঃ- না শুধু জানতে চাইছি কারণ কতদিন বাঁচবি তুই সেটা হিসাব করতাম।
সবাই হো হো করে হেসে উঠল নোহা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আলুটা নিজের মুখে পুরে দিল ইলা মুখ নিচু করে হাসছে।আরিয়ান ইলার দিকে একবার তাকিয়ে আবার আগুনের দিকে চোখ ফিরাল।কিন্তু আরিয়ানের মনের ভেতর একটা যুদ্ধ চলছে।
আরিয়ান (মনে মনে)ঃ- এই মেয়ে যদি সত্যি সত্যি আমাকে ভাই ভাবে তাহলে আমি ক্যাপ্টেন আরিয়ান খান শেষ । না না, এটা হতে দেয়া যাবে না ওকে কিছু বলতে হবে যে… যে… আচ্ছা বলব টা কি ভাই?
আগুনের শিখা ধীরে ধীরে নিভে গেছে শুধু কয়লাগুলো লালচে হয়ে জ্বলছে সবাই হাসি-গল্প করে উঠে পড়ল। মেহেরাব খান হাই তুলে বললেন,
মেহেরাবঃ- চলো এবার ডিনার করি অনেক রাত হয়ে গেছে।
নাফিযাঃ- হ্যাঁ রহিমা ভাবি সব গরম করে রেখেছে বউমা চলো।
ইলা হেসে মাথা নাড়ল ডাইনিং টেবিলে সবাই বসতেই খাবারের গন্ধে পেটটা আরও খিদে পেয়ে গেল।গরম ভাত, মুরগির রোস্ট, মাছের কালিয়া, ডাল, শাকভাজি আর সালাদ সবকিছু সাজানো। রহিমা চাচি হাসিমুখে পরিবেশন করছে।
নোহাঃ- ভাবী আজ তোমার পায়েস রান্নাটা অসাধারণ ছিলো।
নেহাঃ- ভাইয়া তো পুরো বাটি শেষ করে ফেলেছে দেখলি না?
আরিয়ান গম্ভীর মুখে ভাত তুলতে তুলতে বলল,
আরিয়ানঃ- তোরা আজ কাল একটু বেশি কথা বলছিস।
মেহেরাব খান হালকা হেসে বললেন,
মেহেরাবঃ- যাক শুনলাম তো বউমা রান্না করতে পারো।এটা শুনে আমার মনটা ভরে গেল।এখন মাঝে মাঝে তোমার হাতের রান্না খাবো।
ইলা মাথা নিচু করে হাসল খাওয়া শেষ হতে হতে রাত প্রায় ১০ টা বেজে গেল সবাই উঠে পড়ল। আরিয়ান একটা কল আসাতে উপরে চলে গেলো নাফিযা বললেন,
নাফিযাঃ- এবার ঘুমানোর সময় বউমা তাহলে তোমরা রেস্ট নাও।
নোহা আর নেহা চোখ টিপে ইলাকে বলল,
নোহাঃ- ভাবী আজ আমাদের সাথে কার্টুন দেখো।
নেহাঃ- হ্যাঁ হ্যাঁ শিনচ্যান দেখবো ভাইয়া তো দেখতে দেয় না।
ইলাঃ- অকে চলো আমিও অনেকদিন শিনচ্যান দেখিনি।
তিনজনে মিলে ড্রইংরুমে গিয়ে বসল টিভি অন করে নোহা রিমোট হাতে নিয়ে শিনচ্যানের এপিসোড খুঁজতে লাগল।ইলা মাঝে বসেছে আর দুপাশে নোহা আর নেহা।তিনজনেই চিপসের প্যাকেট খুলে হাসাহাসি করছে।ঠিক তখনই আরিয়ান সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। কালো টাউজার এর সাথে কালো হুডি পরা চোখে একটা গম্ভীর ভাব।সোফার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- রিমোটটা দে আজ ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের ম্যাচ আছে।
তিনজন একসাথে চোখ বড় করে তাকাল তারপর একসাথে চিৎকার করে উঠল,
ইলা,নোহা,নেহাঃ- নায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া।
আরিয়ানঃ- মানে কী রিমোট দে বলছি আর সব কয়টা ঘুমাইতে যা।
নোহাঃ- ভাইয়া প্লিজ আজ শিনচ্যান দেখবো ক্রিকেট কাল দেখো তুমি
নেহাঃ- হ্যাঁ আর তুমি তো অসুস্থ ভাইয়া তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।
ইলাঃ- (হালকা হেসে) আপনি তো কাল সকালে দেখতে পারবেন হাইলাইটস।
আরিয়ান মুখ ভোজবাজ করে বলল,
আরিয়ানঃ- তোমরা তিনজন মিলে আমাকে হারিয়ে দিলে? ঠিক আছে… দাঁড়াও, তোমাদের দেখাচ্ছি মজা।
বলে আরিয়ান উপরে চলে গেল তিনজনে আবার হাসাহাসি করে কার্টুন দেখতে লাগল।কিছুক্ষণ পরে ইলা বলল চোখে আলো লাগছে তাই নোহা গিয়ে লাইট অফ করে দিলো এখন শুধু টিভির আলো জ্বলছে।তিনজন মজা করে শিনচ্যান দেখছে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল ঘর অন্ধকার।
নোহাঃ- এই রে লোডশেডিং কিন্তু আই,পি,এস এর কি হলো লোডশেডিং হলেও তো বাড়ি অন্ধকার হয় না।
নেহাঃ- ভাবী ভয় পেয়ো না আমরা আছি।
ইলাঃ- আমি ভয় পাই না
ঠিক তখনই ডাইং এর কাছ থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ “উউউউউউ” আর একটা সাদা ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ইলাদের দিকে সাদা কাপড়, হাত উঁচু করে তিনজন চিৎকার করে উঠল,
ইলা,নোহা,নেহাঃ- ভূউউউউতততত।
কিন্তু ভূতটা এসে কাছে দাঁড়াতেই হালকা আলোতে দেখা গেল সাদা চাদরে মোড়া,মুখে সাদা পাউডার,চোখে কাজল পড়া এটা আরিয়ান।
কিন্তু আরিয়ান নিজেই তিনজনের চেহারা দেখে থমকে গেল। তিনজন চালের গুড়ো আর মুসুরের ডাল এর ফেস প্যাক দিয়েছে।আরিয়ান নিজেই এদের এই চেহারা দেখে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলো
আরিয়ানঃ- আহুউউউউউউউউউউ(জাপানি হরর মুভির মতো চিৎকার)
চাদর ফেলে দৌড়ে পালাতে গিয়ে টেবিলে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল!
এদিকে আরিয়ানের চিৎকার শুনে পুরো বাড়ি জেগে উঠল। মেহেরাব খান, নাফিযা, রহিমা চাচি সবাই দৌড়ে ড্রইংরুমে চলে এল।ফোনের লাইট জ্বালাতেই দেখা গেল আরিয়ান মেঝেতে পড়ে আছে চাদর ছিঁড়ে গেছে,মুখে পাউডার লেপ্টে।আর তিনজন মেয়ে সোফায় বসে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে
নাফিযাঃ- এই কী হচ্ছে এসব?
মেহেরাবঃ- আরিয়ান তোর এই অবস্থা কেনক তুই কী করছিস?
আরিয়ান উঠে বসে মুখ মুছতে মুছতে বিরবির করল,
আরিয়ানঃ- আমি ভূত সেজে ওদের ভয় দেখাতে এসেছিলাম। কিন্তু ওরা তিনজন মিলে আমাকেই ভয় দেখিয়ে দিলো!
নোহাঃ- ভাইয়া তোমার সাজটা দেখে আমরা ভাবলাম সত্যি ভূত এসে গেছে।
নেহাঃ- আর তুমি কি না নিজেই আমাদের দেখে চিৎকার করে পালালে।
ইলাঃ- আপনি তো বলেছিলেন মজা দেখাবেন দেখালেন তো আমরা আপনাকে মজা দেখিয়ে দিলাম।
সবাই হেসে উঠল আরিয়ান লজ্জায় মুখ শক্ত করে বলল,
আরিয়ানঃ- ঠিক আছে আজকের মতো হার মানলাম।কিন্তু তিনটাকেই আমি দেখে নিবো।
নোহা আর নেহা একসাথে বলল,
নোহা-নেহাঃ- অকে আমরা সেই অপেক্ষায় আছি।
আরিয়ান আবার বিরবির করে উঠে গেল পেছনে সবার হাসির শব্দ।ইলা হাসতে হাসতে ভাবল এই বাড়ি এই মানুষগুলো সত্যিই তার হয়ে গেছে।সবাই কত সুন্দর মিশুক আমার কাছে এটা স্বপ্নের মত।
একটু পরে আরিয়ান এসে নিজেও তাদের সাথে কার্টুন দেখতে বসে পড়েছিলো। কার্টুন দেখতে দেখতে রাত প্রায় ১২টা বেজে গেছে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।তখন ড্রইংরুমে লাইট নিভে গেলো শুধু দোতলার করিডোরে হালকা নাইট ল্যাম্প জ্বলছে। ইলা আর আরিয়ান দু’জনেই ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠছে।কিন্তু কেউই প্রথমে কথা বলছে না ইলা সামনে হাঁটছে, আরিয়ান পেছনে হঠাৎ ইলা থেমে পিছনে ফিরে বলল,
ইলাঃ- আপনি এখনো আমার পেছনে পেছনে কেন? ভূতের ভয় এখনো কাটেনি নাকি?
আরিয়ান গম্ভীর মুখ করে বলল,
আরিয়ানঃ- না ভূতের ভয় না আপনার ভয়। যদি আবার তেলাপোকা দেখে আমাকে জড়িয়ে ধরেন তাহলে আমার কন্ট্রোল সিস্টেম আবার ধ্বংস হয়ে যাবে।
ইলা চোখ পাকিয়ে বলল,
ইলাঃ- আপনার মত ভূত থাকতে তেলাপোকা কে ভয় পেতে হবে না। আপনার তো মুখে এমন গম্ভীর ভাব যেন সত্যি ভূত আপনি।
আরিয়ানঃ- ভূত সাজলাম আমি কিন্তু আপনারা তিনজন মিলে আমাকে ভয় দেখিয়ে দিলেন। আর আমার চিৎকার শুনে পুরো বাড়ি জেগে উঠল এখনো লজ্জা লাগছে।
ইলাঃ- লজ্জা লাগারই কথা আর্মির মেজর হয়ে ভূত সেজে নিজেই ভয় পেয়ে চিৎকার করছেন।গ্রামের বাচ্চারা এ কথা শুনলে কাল থেকে আপনাকে “ভূত ক্যাপ্টেন” বলে ডাকবে।
আরিয়ান হাত তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
আরিয়ানঃ- ঠিক আছে তাহলে কাল থেকে আমি ভূত সেজে গ্রামের সব তেলাপোকা ধরে আপনার বালিশের নিচে রেখে দেবো দেখি তখন কে চিৎকার করে।
ইলাঃ- একদম না প্লিজ আপনি এমন করবেন না?
আরিয়ান দুষ্টু হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- করবো কি না সেটা আপনার উপর নির্ভর করছে। যদি কাল রিমোট দেন তাহলে হয়তো এসব করবো না।
ইলাঃ- রিমোট আপনি পাবেন না শিনচ্যান দেখবো আমরা তিনজন আপনি আপনার ক্রিকেট দেখে নেবেন মোবাইলে।
কথা বলতে বলতে দুজনে ঘরের দরজায় পৌঁছে গেছে। আরিয়ান দরজা খুলে ইলাকে ভেতরে যেতে দিল।ঘরে ঢুকেই ইলা থমকে দাঁড়াল বিছানার উপর কম্ফর্টারটা সুন্দর করে বিছানো, কিন্তু মাঝখানে একটা বড় বালিশের দেয়াল।ইলা চোখ বড় করে বলল,
ইলাঃ- এটা কী?
আরিয়ান নিরীহ মুখে বলল,
আরিয়ানঃ- চায়না ওয়াল “দ্যা গ্রেট ওয়াল অফ চায়না” এবার আর কোনো তেলাপোকা আসলেও বর্ডার ক্রোস করতে পারবেন না।
ইলাঃ- আপনি সত্যি পাগল এত বালিশ কোথায় পেলেন?
আরিয়ানঃ- নোহা আর নেহার ঘর থেকে চুরি করেছি।
ইলা বালিশের দেয়ালটা দেখে হাসি চাপতে চাপতে বলল,
ইলাঃ- এটা তো অনেক উঁচু হয়ে গেছে আমি কীভাবে ওপারে যাবো? আজ তেলাপোকার কামর খেতে হবে।
আরিয়ান দুষ্টু চোখে বলল,
আরিয়ানঃ- লাফ দিয়ে চলে আসবেন তাহলে।
ইলাঃ- একদম না আজ আর ভুল করবো না
বলে ইলা বেডে গিয়ে শুতেই বালিশের দেয়াল পড়ে গেল। বালিশ গুলো ছিটকে গেল চারপাশে।আরিয়ান (মনে মনে) বলল এই মেয়ে আমাকে পাগল করে ছাড়বে কন্ট্রোল সিস্টেম ধ্বংস আজ আমি শেষ।আরিয়ান হাসতে হাসতে দৌড়ে এসে ইলাকে তুলে দাঁড় করাল।
আরিয়ানঃ- দেখলেন চায়না ওয়াল ধ্বংস হয়ে গেল।এবার আর কোনো বর্ডার নেই।
ইলা লজ্জায় লাল হয়ে বলল,
ইলাঃ- আপনার জন্যই পড়ে গেল এত উঁচু করে রেখেছেন কেন?
আরিয়ান হাসতে হাসতে বালিশগুলো তুলে বলল,
আরিয়ানঃ- ঠিক আছে এবার আর বর্ডার বানাবো না। কিন্তু একটা শর্ত আছে।
ইলাঃ- কী?
আরিয়ানঃ- যদি রাতে আবার তেলাপোকা আসে তাহলে আপনি আমাকে জড়িয়ে ধরবেন না।আমার কন্ট্রোল আবার ভেঙে যাবে।
ইলা খিলখিল করে হেসে উঠল।
ইলাঃ- ডিল তবে তেলাপোকা এলে আমি চিৎকার করলে তেলাপোকা আপনাকেই তাড়াতে হবে।
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আরিয়ানঃ- আমার জীবনটা এখন তেলাপোকার উপর নির্ভর করছে আল্লাহ মালিক।
দুজনে বিছানায় শুয়ে পড়ল এবার কোনো বালিশের প্রাচীর নেই। কম্ফর্টার একটা মাঝখানে ফাঁকও খুব একটা নেই। আরিয়ান শক্ত হয়ে শুয়ে আছে। ইলা পাশ ফিরে তার দিকে তাকিয়ে।
ইলাঃ- আপনি এখনো পিটি প্যারেডে আছেন নাকি?
আরিয়ানঃ- না এটা এটা হাই অ্যালার্ট মোড।
ইলাঃ- একটা কথা জিগ্যেস করবো??
আরিয়ানঃ- অবশ্যই কি প্রশ্ন বলুন??
ইলাঃ- আপনার কি সত্যি সত্যি আমার উপর ভরসা নেই? নাকি নিজের উপর?
আরিয়ান চুপ করে রইল তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- দুটোতেই না আমার ভয় হয় যদি কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলি আর আপনি ভয় পান আমাকে আর আমাদের মাঝে আর ১০ টা কাপল এর মত নরমাল না।
ইলা কিছুক্ষণ চুপ তারপর ধীরে ধীরে আরিয়ানের দিকে একটু এগিয়ে এল।তার মাথাটা আরিয়ানের কাঁধের কাছে রাখল। অনেকটা কাছাকাছি কিন্তু স্পর্শ না
ইলাঃ- আমি ভয় পাব না কারণ আমি জানি আপনি কখনো আমাকে আঘাত করবেন না। আর আমরা তো হালাল ভাবে স্বামী স্ত্রী তাই কন্ট্রোল হারালেও সমস্যা নেই।
আরিয়ানের বুকটা ধক করে উঠল সে নড়ল না শুধু খুব আস্তে বলল,
আরিয়ানঃ- ইলাফুল আস্তে আস্তে আপনি আমার সবচেয়ে বড় দুর্বল জায়গা হয়ে যাচ্ছেন আর সবচেয়ে বড় শক্তি জায়গা ও।
ইলা হালকা হেসে চোখ বন্ধ করল।
ইলাঃ- তাহলে দুর্বলতাকে একটু কাছে রাখুন শক্তি বাড়বে।
আরিয়ানঃ- গুড নাইট ইলাফুল।
আরিয়ান আর কিছু বলল না শুধু আর একটু কাছে এলো বাইরে শীতের রাত ভেতরে দুটো হৃদয় প্রথমবার একটু কাছাকাছি এল।
ইলাঃ- গুড নাইট… ভূত ক্যাপ্টেন।
আরিয়ান বালিশ ছুড়ে মারল ইলার দিকে।ইলা হাসতে হাসতে বালিশ ধরে ফেলল ঘরে হাসির শব্দ মিলিয়ে গেল। বাইরে শীতের হাওয়া বইছে, কিন্তু ঘরের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠেছে দু’জনের হাসি আর কাছাকাছি থাকার শান্তিতে।ইলা ঘুমিয়ে পড়লো কিন্তু কোনো তেলাপোকা এল না কিন্তু আরিয়ানের ঘুম এল না। সে সারারাত ইলার শ্বাসের ছন্দ শুনল।
আরিয়ান (মনে মনে বলল)ঃ- কাল সকালে রাফায়েল আর সামিরকে ফোন করে বলব ভাই আমি হার মানলাম।আমি আর কন্ট্রোল করতে পারতেছি না ।
সূর্যের প্রথম আলো বাগানের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পাখির কিচিরমিচির সুর ভেসে আসছে।ঘুম ভাঙতেই আরিয়ান দেখল ইলা তার বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে।ইলার হাতটা তার শার্ট আঁকড়ে ধরা। আরিয়ানের মুখে হাসি সে আস্তে করে ইলার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।ঠিক তখনই দরজায় টোকা নোহার গলা,
নোহাঃ- ভাইয়া ভাবী উঠেছো? নাস্তা রেডি।
আরিয়ান চমকে উঠল ইলা এখনো ঘুমাচ্ছে সে তাড়াতাড়ি ইলাকে ছেড়ে উঠে বসল।আরিয়ান ফিসফিস করে ইলাকে ডাকলো।
আরিয়ানঃ- ইলাফুল উঠুন নোহা এসেছে।
ইলা চোখ কচলে উঠে বসল চুল উশকোখুসকো ইলাকে এভাবে দেখেই আরিয়ানের হাসি পাচ্ছে।
ইলাঃ- কী হয়েছে হাসছেন কেনো?
আরিয়ানঃ- কিছু না আপনাকে এভাবে খুব সুন্দর লাগছেন।
ইলা লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেলো ইলা কম্ফর্টার টেনে মুখ ঢাকল।দরজার ওপাশ থেকে নোহা চিল্লাতে লাগলো
নোহাঃ- ভাইয়া তুমি কি ভাবীর সাথে রোমান্স করছো? দরজা খুলতে এত দেরি হচ্ছে কেনো?
আরিয়ানঃ- নোহা এক্ষুনি এখান থেকে যা না হলে তোকে আর্মি ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিব!
নোহা হাসতে হাসতে পালাল ইলা কম্ফর্টার সরিয়ে হেসে ফেলল।
ইলাঃ- আপনারা ভাইবোনগুলো অসাধারণ।
আরিয়ানঃ- হ্যাঁ আর আপনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ।
Time skip….
ডাইনিং টেবিলে সবাই জড়ো হয়েছে গরম পরোটা, ডিমের ভাজি, ডাল, আলুর দম, আর রহিমা চাচির হাতের স্পেশাল হালুয়া।চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে।নোহা আর নেহা ইলাকে ঘিরে বসে গল্প করছে মেহেরাব খান চুপচাপ চা খাচ্ছেন। নাফিযা সবাইকে পরিবেশন করছেন। ইলা আরিয়ানের প্লেটে পরোটা তুলে দিলো আরিয়ান হালকা হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- আজ তো দেখি আমার সার্ভিসটা বেশ ভালো হচ্ছে।
ইলাঃ- কালকে ভূত দেখে ভয় পেয়েছিলেন তাই স্পেশাল ট্রিটমেন্ট পাচ্ছেন।
নোহাঃ- হ্যাঁ ভাইয়া কাল তো তুমি নিজেই ভয়ে চেঁচিয়েছিলে!
নেহাঃ- আমরা তো ভেবেছিলাম সত্যি ভূত এসেছে!
সবাই হাসতে লাগল আরিয়ান মুখ ভোজবাজ করে বলল,
আরিয়ানঃ- তোরা দুইটা খুব পেকে গেছিস তোদের হোস্টেলে রাখতে হবে।
ঠিক তখনই নাফিযা হাসিমুখে বললেন,
নাফিযাঃ- আরিয়ান নওরিন তোকে আর ইলাকে দাওয়াত করেছে। ও তোকে বলতে ভয় পাচ্ছিলো তাই আমাকে সকালে ফোন করে বলেছে।
এক মুহূর্তে টেবিলের হাসি থেমে গেল আরিয়ানের হাত থেকে চামচটা টেবিলে পড়ে টুং করে শব্দ হলো।তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল চোখে হঠাৎ একটা কঠিন ছায়া পড়ল।চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।ইলা অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ান কিছু না বলে শুধু চুপ করে বসে রইল।নাফিযা একটু অবাক হয়ে বললেন,
নাফিযাঃ- কী হলো বাবা যাবি না?
আরিয়ান ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
আরিয়ানঃ- না আম্মু যাবো না।
নাফিযাঃ- কেন? নওরিন তো তোর ছোটবেলার বন্ধু। তুই তো ওর শশুর বাড়িতে যাসনি।আর এই উপলক্ষে ইলাকেও তো পরিচয় করিয়ে দিতে পারবি।
“নওরিন” নামটা আবার শুনে আরিয়ানের চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। সে চামচটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল। গলার স্বর কঠিন,
আরিয়ানঃ- আমি বললাম যাবো না। আর আমার বউ কি কোনো পন্য নাকি যে তাকে মানুষ কে দেখিয়ে বেরাতে হবে।
মেহেরাব খান ভ্রু কুঁচকে বললেন,
মেহেরাবঃ- কী হলো হঠাৎ? নওরিনের সাথে তোর কী সমস্যা?
আরিয়ান কিছু না বলে শুধু ডাইনিং থেকে উঠে বেরিয়ে গেল। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ইলার বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। নওরিন এই নামটা শুনে আরিয়ানের এমন রাগ করলো কেন?নাফিযা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন,
নাফিযাঃ- ও কী জন্য হঠাৎ রেগে গেল।নওরিন তো ওর ফুফাতো বোন, ছোটবেলায় ওরা খুব কাছাকাছি ছিল।
ইলা চুপ করে রইল তার মনে হাজার প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। নওরিন কে? আরিয়ানের অতীতে কী ছিল? তাহলে কি এটা সেই মেয়ে যার কথা বিয়ের দিন আরিয়ান বলেছিলো। নোহা ফিসফিস করে নেহাকে বলল,
নোহাঃ- ভাইয়ার মুখ দেখে মনে হচ্ছে নওরিন নামটা শুনলেই এখন ভাইয়ার রাগ হয়।
নেহাঃ- ছোটবেলায় তো দেখতাম ভাইয়া আর নওরিন আপা এক সাথে অনেক মজা করতো।
ইলা কান খাড়া করে শুনছিল তার বুকের ভেতর একটা অজানা চাপা কষ্ট জমে উঠছে।অন্যদিকে বাগানে আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।হাত মুঠো করে দাঁত চেপে চোখে পুরোনো স্মৃতির ঝড়। নওরিন সেই মেয়ে যাকে সে একসময় পুরোটা দিয়ে ভালোবেসেছিল। যার জন্য সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। যে তার সব কিছু ছিল তার মায়াবতী। কিন্তু এই নওরিন তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল অন্য কারো জন্য।
আরিয়ানের মুঠো আরও শক্ত হলো সেই এই কষ্টে আজও জ্বলছে। আর এখন ইলার সামনে সেই নামটা আবার ফিরে এল।ইলা ধীরে ধীরে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল।আরিয়ানকে দেখে থমকে দাঁড়াল আরিয়ান পিছন ফিরে তাকাল না।
ইলাঃ- আপনি… ঠিক আছেন?
আরিয়ান চুপ করে রইল তারপর ধীরে বলল,
আরিয়ানঃ- যান ভেতরে।
ইলা আর কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইল তার চোখে প্রশ্ন, কষ্ট আর একটা অদ্ভুত টান।
দুপুরের পরে আরিয়ান একা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।হাতে ফোন চোখে চাপা রাগ আর পুরোনো কষ্টের ছায়া।নওরিনের নামটা শুনেই তার মনের ভেতর ঝড় উঠেছে।সে ফোন বের করে আদিবের নাম্বার ডায়াল করল। কয়েক বার রিং হওয়ার পর আদিব ফোন ধরল।
আদিবঃ- হ্যালো, ভাই কেমন আছো? গ্রামের হাওয়া খেয়ে রোমান্টিক হয়ে গেলি নাকি?
আরিয়ান সিরিয়াস গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- আদিব শোন নওরিন ফোন করেছে।
ওপাশে এক মুহূর্তের নীরবতা তারপর আদিবের গলায় অবাক ভাব,
আদিবঃ- নওরিন কী বলল?
আরিয়ানঃ- দাওয়াত করেছে পরশু ওদের বাড়িতে আমাকে আর ইলাকে।
আদিবঃ- উফ ভাই তা তুমি কী বললা?
আরিয়ানঃ- কিছু বলিনি আম্মুকে ফোন করে বলেছে এইসব। আমি তো যাবো না।
আদিব হালকা হেসে বলল,
আদিবঃ- ভাই এত বছর পর ও ফোন করল কেন? ও তো তোমাকে মানে সেই ঘটনার পর তো আর কোনো যোগাযোগ করেনি
আরিয়ানের গলা কঠিন হয়ে গেল,
আরিয়ানঃ- জানি না হয়তো শুনেছে আমার বিয়ে হয়েছে। তাই কৌতূহল আমার বউকে দেখার অথবা দেখাতে চায় ওর জীবন কত সুন্দর। তবে আমার কোনো আগ্রহ নেই।
আদিবঃ- ভাই তুমি এখনো রাগ করিও না ওর উপর? সেই ঘটনা তো অনেক বছর আগের। ও তো তোমাকে ছেড়ে অন্য ছেলের সাথে…
আরিয়ান বাধা দিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আদিব সেই কথা আর বলিস না।ও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আমি ওকে আমার সব দিয়েছিলাম। ভালোবাসা, সময়, বিশ্বাস আর ও? সব ছুড়ে ফেলে চলে গেল আমি ওর মুখ দেখতে চাই না।
আদিব ধীরে বলল,
আদিবঃ- ঠিক আছে ভাই কিন্তু এই সব কি ইলা জানে?
আরিয়ানঃ- না আর জানতে হবে না সেই অধ্যায় অনেক আগেই শেষ।আর এখন আমার জীবনে শুধু ইলা।
আদিবঃ- তাহলে ঠিক আছে যাবে না বলে দাও কিন্তু সাবধান, নওরিন তো অনেক জেদি ও যদি নিজে ফোন করে?
আরিয়ানঃ- ব্লক করে দেব।
আদিব হেসে বলল,
আদিবঃ- ওয়াও মেজর সাহেব রাগে ফুঁসছেন। ঠিক আছে, পরিকে এসব বলব না কিন্তু ভাই ইলার সামনে সামলে নিও নিজেকে ও যদি বুঝে ফেলে।
আরিয়ানঃ- বুঝতে দেব না থ্যাঙ্কস আদিব তোর সাথে কথা বলব পরে।
ফোন কেটে দিল আরিয়ান ফোনটা পকেটে রেখে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।পুরোনো কষ্টটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ইলা রান্নাঘরে নাফিযার সাথে গল্প করছে।হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।স্ক্রিনে “Unknown Number” ইলা ধরল না কয়েক সেকেন্ড পর আবার বাজল একই নাম্বার। ইলা অবাক হয়ে ধরল,
ইলাঃ- হ্যালো?
ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই শুধু হালকা শ্বাসের শব্দ। ইলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
ইলাঃ- হ্যালো? কে?
আবার নীরবতা তারপর লাইন কেটে গেল ইলা ফোনটা দেখে অবাক। মিনিট খানেক পর আবার একই নাম্বার থেকে কল। এবার ইলা ধরতেই ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি গলা, খুব মিষ্টি কিন্তু কেমন যেন অচেনা অচেনা,
মেয়েলি গলাঃ- হ্যালো ইলা?
ইলাঃ- জি কে বলছেন?
মেয়েলি গলাঃ- আমি নওরিন আরিয়ানের ফুফাতো বোন।
তোমাদেরকে দাওয়াত করতে ফোন করেছি।পরশু আমাদের বাড়িতে আসবে তো?ইলার বুকটা ধক করে উঠল।নওরিন যার নাম শুনে আরিয়ান এত রেগে গেল। ইলা গলা ঠিক করে বলল,
ইলাঃ- জি থ্যাঙ্ক ইউ কিন্তু আরিয়ান…
নওরিন হেসে বলল,
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪২
নওরিনঃ- আরিয়ানকে আমি ম্যানেজ করব তুমি চাপ নিও না অনেকদিন পর ওকে দেখব আর তোমাকেও।
ইলা কিছু বলার আগেই লাইন কেটে গেল ইলা ফোনটা হাতে ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। নওরিনের গলায় কেমন একটা আত্মবিশ্বাস, কেমন একটা দাবি। ইলার মনে হাজার প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।
অন্যদিকে আরিয়ান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তার ফোনে একটা মেসেজ আসল অজানা নাম্বার থেকে।
“ তোকে দেখতে চাই”
ইতি “ নওরিন”
আরিয়ানের চোখ লাল হয়ে উঠল সে ফোনটা মুঠোয় চেপে ধরল।
