ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪
ছায়া
বিকেল বেলা ইলার রুমটা যেন একেবারেই ভারী হয়ে আছে। চারপাশে হালকা অন্ধকার জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে ঝিরঝিরে বাতাস।ইলা একা বসে মোবাইল নিয়ে গ্যালারির ছবি দেখছে সেই সময় পরি আসলো। পরি এসে বলল
পরিঃ- কি রে এখনো মন খারাপ করে বসে আছিস?
ইলাঃ- 😔😔😔
পরিঃ- কথা আছে না এক বার না পারিলে দেখো শতবার।
ইলা অবাক হয়ে পরি দিকে তাকিয়ে থাকে, পরি ইলার এমন ভ্যাবলা কান্ত চেহারে দেখে হেসে দেয়। পরি বলল
পরিঃ- আরে নতুন আইডি খুল তাহলেই তো হয়, এত মন খারাপ করার কি আছে।
ইলাঃ- এই বুদ্ধি টা আমার আগে কেনো এলো না। তাহলে তো এত কান্না করতে হত না।
পরিঃ- তুই বোকা যে তাই এমন করে কান্না করিস।
ইলা দ্রুত একটা নতুন আইডি খুলে ফেললো, একাউন্ট খোলার সাথে সাথেই শাওনকে ফলো দিলো। তারপর সাহস সঞ্চয় করে একটা মেসেজ টাইপ করল
ইলাঃ-
“আপনি হয়তো আমাকে চিনবেন না। আমি কিছু ভুল করলে মাফ করবেন।শুধু বলছি প্লিজ আমাকে আনব্লক করুন। আমি কিছু চাই না শুধু আপনার ভিডিওগুলো দেখতে চাই আগের মতো।
মেসেজটা পাঠিয়ে বুক ধড়ফড় করতে লাগলো কিছুক্ষণ মোবাইল হাতে নিয়ে বসে রইল কিন্তু রিপ্লাই এলো না ঘণ্টা খানেক পর শাওন নতুন একটা ভিডিও দিল।ফুলের বাগানের ভিতরে বসে আছে শুধু হাতেটা দেখাচ্ছে কণ্ঠ ভারী অথচ শান্ত।
শাওনঃ-
“জীবনে অনেক সম্পর্ক আসে যায় আমি একটা কথা সবসময় মানি যাকে একবার ব্লক করি, তাকে আর ব্লক থেকে খুলি না। কারণ আমি বিশ্বাস করি, যদি দূরে সরাই তার কোনো না কোনো কারণ থাকে। আর উল্টো পালটা কমেন্ট করবেন না। আমার নিজের ও খারাপ লাগে আপনাদের ব্লক করতে।
ভিডিওর ক্যাপশন
“Sorry”
ভিডিওটা দেখে ইলার চোখে পানি চলে এলো সে জানল তার অনুরোধও বৃথা। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে হঠাৎ স্টোরি দিলো নিজের আইডিতে সেখানে লিখল
ইলাঃ-
“ঠিক আছে আপনার ব্লক খুলতে হবে না।”
মিনিট কয়েক পরেই নোটিফিকেশন শাওন আপনার স্টোরি দেখেছেন ইলা এক মুহূর্ত চুপচাপ হয়ে রইল তারপর বুক ভেঙে কান্না এসে গেল। রাতে আবার সাহস করে ইলা ফেসবুক খুলল নিজের থেকে শাওনকে আরো একটা মেসেজ দিলো
ইলাঃ-
“আপনার কি কোনো ফেসবুক আইডি আছে? থাকলে শেয়ার করবেন?
আরো অনেক কিছু বলে ইলার লাইফের অনেক কষ্ট অনেক কিছু শেয়ার করে। কিন্তু কোনো রিপ্লাই নেই বরং কিছুক্ষণ পর শাওন আরেকটা ভিডিও দিলো। কণ্ঠ দৃঢ় ভেতরে যেন হালকা ব্যথা লুকানো রাগ শাওন রাগ করে অনেক কিছুই বলল আবার ভালো করেও বুঝাইলো।
নিচে ক্যাপশন দিলোঃ
নিজের কি হইছে না হইছে কি করছেন এগুলো নিজের ভিতরে লুকিয়ে রাখুন এগুলো বলার দরকার আছে।
কিন্তু ইলার বুক ভেঙে গেল তার মনে হলো শাওন হয়তো সবার জন্য বলছে, কিন্তু আসলে কোনো বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা। ইলা আর কোনো কিছু না ভেবে ঘুমিয়ে পড়েছে।
সকালে উঠে ইলা কলেজে চলে গেলো কলেজ ইলা ভীষণ মন খারাপ নিয়ে ক্লাসে বসল। বুকের ভেতর এখনো গত রাতের কথাগুলো বাজছে ক্লাসে কোনো মনোযোগ নেই। ম্যাডাম রোল নাম ডাকলেন ইলা দাঁড়িয়ে থেকে উত্তর দিলো ঠিকই, কিন্তু চোখ ফোলা গলায় কোনো জোর নেই।
ক্লাস টিচারঃ- কি ব্যাপার ইলা মনোযোগ নেই কেনো বোর্ডে যাও একটা ম্যাথ করে দেখাও।
ইলা বোর্ডের সামনে দাঁড়াল চক হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইল কিন্তু কিছুই লিখতে পারছে না ক্লাসে খিলখিল করে হাসি।
টিচার ইলার এমন অবস্থা দেখে রাগ করে বলল
ক্লাস টিচারঃ- তোর এই কি অবস্থা ইলা পড়ায় মনযোগী না কেনো? যা পুরো রুমে ১০ বার কান ধরে ঘুরে আয়।
সবাই হেসে উঠল ইলা মাথা নিচু করে হাঁটতে শুরু করল চলতে চলতে হঠাৎ একবার হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল।ক্লাস ভরে হাসাহাসি শুরু হলো। এক বন্ধু ফিসফিস করে বলল
বন্ধুঃ- দেখ দৌড় প্রতিযোগিতা করতে নামছে।
অন্যজন বললঃ- ম্যাডাম ওকে শাস্তি না দিয়ে অলিম্পিকে পাঠান।
হাসির শব্দে ইলার মন খারাপ হলেও মুখে হালকা এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। কারণ ভেতরে ভেতরে সে জানে কষ্ট লুকানোর জন্য হাসিই একমাত্র ওষুধ। ক্লাস শেষে বান্ধবীরা তাকে ঘিরে ধরল।
বান্ধবীঃ- ইলা তোর কি হয়েছে বলতো? সবসময় এত হাসিখুশি থাকিস কিন্তু দুইদিন থেকে এত চুপ কেন?
ইলাঃ- কিছু না রে… হয়তো আমি একটু অন্যরকম হয়ে গেছি।
বান্ধবীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কেউ বুঝল না ভেতরে ইলার ভাঙা হৃদয় তখন শাওনের এক টুকরো ভিডিওর জন্য কাঁদছে।
কলেজ থেকে ক্লান্ত মন নিয়ে ফিরে এলো ইলা ব্যাগটা এক কোণে ছুঁড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে রইল। ভেতরে ভেতরে কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সারা দিন চেষ্টা করেও শাওনকে ভুলতে পারলো না বুকের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো একবারে লিখে ফেলতে মন চাইলো। হাত কাঁপছিল তবুও মোবাইলটা হাতে নিয়ে লম্বা একটা মেসেজ লিখতে শুরু করলো
ইলার মেসেজঃ
“আসসালামু আলাইকুম ভয়েজ কিং
আজকে শেষবারের মতো লিখছি হয়তো এই মেসেজ পড়বেন হয়তো পড়বেন না। আমি জানি আপনি আমাকে ব্লক করেছেন আমার হয়তো ভুল হয়েছে।হয়তো আমি আপনার কাছে অকারণে বিরক্তিকর হয়ে গেছি।কিন্তু বিশ্বাস করুন কখনো কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে লিখিনি। শুধু আপনাকে শ্রদ্ধা করতাম আপনার ভিডিওগুলো আমার অন্ধকার জীবনে আলো জ্বালাতো।
আপনি হয়তো বুঝবেন না তবে একদিন আপনার একটা ভিডিও আমার কান্না থামিয়ে ছিল।আমার মনে হয়েছিল আমি একা নই কিন্তু যখন ব্লক করলেন তখন ভেবেছিলাম আমি খুব বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছি। আজকে আর কিছু চাই না প্রতিশ্রুতি দিলাম আর কোনোদিন আপনাকে বিরক্ত করবো না।আপনার লাইফ আপনার মতো সুন্দর থাকুক আপনি আরও অনেক মানুষের মুখে হাসি ফোটান আমি আমার জায়গা থেকে চুপচাপ আপনার জন্য দোয়া করবো।
আমাকে মাফ করবেন,
বিদায়।
মেসেজটা সেন্ড করার পর হাত কেঁপে উঠলো বুকের ভেতর ভারী পাথরের মতো একটা চাপা ব্যথা। ফোনটা বন্ধ করে রেখে দিলো ড্রয়ারে যেন আর কোনো নোটিফিকেশন দেখতে না হয়।
বিকেলটা নামতেই ইলার মন টিকলো না একা একা বেরিয়ে গেলো নদীর ধারের দিকে চার পাশে সোনালী রোদ হালকা বাতাস গ্রামের বাচ্চারা হইচই করে খেলছে। কারো হাতে ঘুড়ি, কারো হাতে কাগজের নৌকা ইলা তাদের কাছে গিয়ে বসল। ছোট একটা মেয়ের কাগজের নৌকাটা ভেসে যাচ্ছিলো পানিতে ইলা নিজের হাত বাড়িয়ে সেটাকে আবার ঠিক করে দিলো বাচ্চারা হেসে উঠলো
বাচ্চারাঃ- ইলা আপু তুমি খেলবা আমাদের সাথে?
ইলা এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো নদীর ঢেউয়ের দিকে, তারপর আস্তে হাসলো কয়েক দিন পর মুখে এমন হাসি ফুটলো।
ইলাঃ- হ্যাঁ খেলবো।
তারপর বাচ্চাদের সাথে দৌড়ঝাঁপ লুকোচুরি খেলতে লাগলো। মনটা হালকা হয়ে গেলো কিছুটা কিন্তু ভেতরে ভেতরে এখনও অস্থিরতা রয়ে গেলো শাওন কি সেই মেসেজ পড়েছে? উত্তর দেবে নাকি সত্যিই সব শেষ হয়ে গেলো?
ইলার মেসেজ সেন্ড করার পর থেকে ঠিক দুইদিন কেটে গেছে। কোনো রিপ্লাই নেই। ফোনের স্ক্রিন বারবার খুলেও আবার বন্ধ করে দেয় ইলা মনের ভেতরে একরাশ কষ্ট জমতে থাকে।
কিন্তু… অন্যদিকে শাওন চুপচাপ সেই মেসেজটা পড়েছিল কিছু না লিখে চুপ করে গেলেও, তার পরদিনের ভিডিওতে হঠাৎ একটা অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেলো। ভিডিওতে শাওন সবসময় যেমন প্রাণবন্ত থাকে তেমন ছিল না। কণ্ঠে চাপা এক দুঃখের ছাপ মাঝখানে সে একটা লাইন
শাওনের ভিডিওঃ
“কখনও কখনও আমরা যাদের কাছ থেকে ভালোবাসা পাই, তাদের থেকে দূরে থাকতে হয়। কারণ নিজের জীবনের নিয়ম সবসময় নিজের হাতে থাকে না…।”
তারপর আবার স্বাভাবিক কণ্ঠে মোটিভেশনাল কথাবার্তা চালিয়ে গেলো। ভিডিওটা স্ক্রল করতে গিয়ে পরি থমকে দাঁড়ালো বুকটা হালকা কেঁপে উঠলো। মনে হলো কথাটা ইলার জন্যই বলা কিন্তু তৎক্ষণাৎ নিজের মনে নিজেই বললো
পরিঃ- না না, আমি ভাবছি বেশি।
তৃতীয় দিনের সকালে ইলা ক্লাস শেষ করে বাসায় এসে বসেছিল খুব বেশি কথা বলছিল না। ঠিক তখনই পাশ থেকে পরি এসে বললো
পরিঃ- কিরে তোর ভয়েজ কিং এর মন খারাপ কেনো?
ইলাঃ- মানে কি?
পরি হাসলো একটু খোঁচা মেরে বললো
পরিঃ- শাওন ভাইয়া ওর ভিডিও দেখিস নি একদম অন্যরকম লাগছিলো মনে হচ্ছিলো কারো জন্য মন খারাপ করেছে।
ইলাঃ- আমি কি জানি আমি কি ওর ভিডিও দেখি নাকি।
পরিঃ- ওরে বাবা তুই নাকি ভিডিও দেখিস না? হুম তাহলে আমার আর কিছু বলার নাই।
পরি অভিমানী ভঙ্গিতে চলে গেলো ইলা চুপ করে বসে রইলো। বুকের ভেতরে আবারও ঢেউ তুললো শাওনের কথাগুলো।
দুপুরে তালুকদার বাড়ির সবাই একসাথে বসলো লাঞ্চ করতে। টেবিলে ছিল গরম ভাত, মাছ, মুরগি আর সবজি ইলার বাবা রাশেদ তালুকদার, ইলা, পরি আর আজকে তাদের সাথে যোগ দিয়েছিলো ইলার বড় বাবা করিম উদ্দিন তালুকদার। খেতে খেতে করিম উদ্দিন হঠাৎ ইলার দিকে তাকিয়ে বললেন
করিম উদ্দিনঃ- ইলা মা তোর মুখটা এমন গম্ভীর কেনো রে কী হয়েছে অসুখ-বিসুখ নাকি?
ইলা চমকে উঠে মুচকি হাসলো তারপর মাথা একটু নুইয়ে বললো
ইলাঃ- না বড় বাবা কিছু হয়নি আসলে একটা ড্রেস চোখে লেগেছে অনলাইনে কিনতে পারিনি তাই একটু মন খারাপ।
করিম উদ্দিনঃ- আহা এই জন্য এত মুখ ভার করে বসে আছিস? বড় বাবার কাছে চাইলেই তো পারতি আচ্ছা আমি তোকে সেই ড্রেস কিনে দিব।
ইলাঃ- না বড় বাবা লাগবে না আমি তো এমনি বললাম।
রাশেদ তালুকদার মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছুটা চিন্তিত হলেও কিছু বললেন না। ইলার মা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্লেটে ভাত তুলে দিলো টেবিলের পরিবেশটা একটু অদ্ভুত হয়ে গেলেও সবাই আবার খেতে শুরু করলো।
খাবার শেষ করে ইলা ঘুমিয়ে পড়লো ঘুম থেকে উঠে কিছু ভালো লাগছিলো না তাই ছবি আকতে বসে গেলো পরি রুমে এসে ইলাকে বললো
পরিঃ- চল আমরা বিলে যাই একটু হাওয়া খাবি তোর মনও ফ্রেশ হবে।
দুজনেই হেঁটে গেলো বিলের দিকে চারপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত দূরে জেলেরা জাল ফেলছে বিলের পানি ঝিলমিল করছে রোদে। হঠাৎ ইলার চোখ পড়লো পানির ওপরে ভাসতে থাকা লাল শাপলার কলির দিকে। মুহূর্তের জন্য সব ভুলে গিয়ে ইলা বললো
ইলাঃ- পরি আমি শাপলা তুলবো।
পরিঃ- এই পাগলি নামিস না পানিতে পড়ে গেলে আবার বিপদ হবে।
কিন্তু ইলা কোনো কথা শুনলো না হাসতে হাসতে ওড়না গুটিয়ে নামলো পানিতে। হাত বাড়িয়ে একের পর এক শাপলার কলি ছিঁড়তে লাগলো। পরি প্রথমে ভয় পেলেও পরে মোবাইল বের করে ভিডিও করা শুরু করলো বললো
পরিঃ- আরে বাহ তুই তো একদম সিনেমার হিরোইন হয়ে গেছিস।
ইলাঃ- ভিডিও করিস পরে দেখব।
সন্ধ্যার আগে দুই বোন বাসায় ফিরলো হাতে ইলার গুচ্ছ গুচ্ছ শাপলার কলি। বাড়িতে ঢুকতেই ইলার মা ধমকে উঠলো
সাবিহাঃ- ইলা তুই আবার পানিতে নামলি মাথা খারাপ নাকি তোর যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটতো।
ইলা জুতো খুলে রাখতেই বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো
ইলাঃ- আম্মু বাদ দাও তো আমি তো মরে যাইনি তাই না?
এ কথা বলে গুচ্ছ শাপলা হাতে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো পেছনে দাঁড়িয়ে মা চিৎকার করে গালাগালি করতে লাগলেন কিন্তু ইলা যেন কিছুই শুনলো না। পরি আস্তে আস্তে ফিসফিস করে বললো
পরিঃ- এই মেয়ে তুই যে আস্তে আস্তে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিস।
ফ্রেশ হয়ে এসে ইলা তার নতুন আইডি থেকে একটা ছোট স্টোরি দিল হাসি, কিছু শাপলার ছবি আর ক্যাপশনে ছোট্ট একটা লাইন:
“কখনো কল্পনাও করিনি ছোট ছোট জিনিসগুলোই খুশি দেয়।”
তারপর ইলা ফোন নিয়ে বসে পড়লো শাওনের ভিডিও দেখতে গত তিন দিনের সব ভিডিও একটা একটা করে দেখলো প্রতিটা ভিডিও মনোযোগ দিয়ে দেখলো, প্রতিটিতেই এক করে কমেন্ট করলো।
ঘরের ডুকে ইলার মা ফোন ধরা দেখে আবার রাগ ধরে
সাবিহাঃ- আবার ফোনে ধরেছিস পড়াশোনা কর না।
এই কথা বলতে বলতে তিক্ত চেহারা নিয়ে বেড়িয়ে গেলো ইলার মা ইলা রেগে দরজা বন্ধ করে ফোন পাশে রেখে বই খুলে পড়ে দুই ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়লো। পড়াশোনা শেষে অচেনা উত্তেজনায় ফোনটা হাতে নিল শাওন নতুন কোনো ভিডিও দিল কি না দেখার জন্য। টিকটক খুলতেই প্রথমেই চোখ ফেলল নিজ স্টোরির ওপর আর একসাথে তার বুকটা থেমে গেল।
স্ক্রিনে লেখা: শাওন তার ছবিতে রিয়েক্ট দিয়েছে।
ইলার চোখ বড় বড় হয়ে যেতে লাগলো পাঁচ মিনিট ধরেই সে একটানা বুকে হাত রেখে বসে রইল হৃদয়টা পেতলে উঠল। নিজেকে জোরে করে একটু চিমটি কেটে দেখলো “স্বপ্ন না? সত্যি দেখি তো?” চিমটি কাটা মুখে সামান্য ব্যথা আসলে হালকা হেসে উঠে বুঝতে পারলো না, এটা স্বপ্ন নয়, এটা সত্যি।
ঘরে হঠাৎ আচমকা একটা সাউন্ড বাড়ি তীব্র বেজিং হোম থিয়েটারের ওত ভলিউমে গান বাজতে লাগলো। ঘরে সবাই চমকে উঠল। কিচেনে চামচ পড়ে গেল, মনে হচ্ছে ভুমিকম্প হচ্ছে পরি হাসি ধরে রাখতে পারল না, এই অবস্থা দেখে ইলার বাবা রাশেদ ইলার রুমের দিকে তাকালো আর ইলার মা সাবিহা প্রথমে চিৎকার করে বললেন
সাবিহাঃ- এ ইলা কী আওয়াজ করছে?
ঘড়িতে দেখা গেল সন্ধ্যা ৭:৩৫ ঠিক এই মুহূর্তেই ট্যুইন স্পিকারের বেজ গলা বাড়িয়ে এল।গানটা পুরানো ঝকমক রিফ হলেও ধারাবাহিক ছন্দে বাজছে ইলা হঠাৎ কাঁধ মেলে হাসি মিছকি দিলো।মায়ের কষ্টখানা উঁচু করে ঝাড়ু হাতে নিয়ে ঝনঝন করে উঠলেন ঘরের মাঝখানে। ইলার মা চিৎকার করে বলল
সাবিহাঃ- ইলা আবার কি করছিস তুই এত জোরে কেউ গান বাজায় এ কী অশালীন আচরণ।
ইলা মা কে দেখে আরো একটু মুখ তুলে কণ্ঠে মৃদু হাসি এনে ঠোঁট মেলাতে শুরু করলো
“mehbooba, mehbooba…”
গানটা ঠোঁট মিলিয়ে উচ্চারণ করছিলো ধীরে ধীরে তাল মেলে ডান্স করতে লাগলো। মা প্রথমে ঝাড়ু উঁচিয়ে ধরেছিলেন কিন্তু ইলার অদ্ভুতভাবে আত্মবিশ্বাসী নাচ দেখে আচমকা অবাক হয়ে পড়লেন ইলা মা’র হাত থেকে ঝাড়ু ছিনিয়ে নেয় এবং মাকে টানতে টানতে নাচ শুরু করলো। ইলা ঠোঁট মিলিয়ে গান গাইতে গাইতে
“Mehbooba, mehbooba, tu hay mere dik ka ajooba…”
মায়ের গলার মধ্যে রাগ আর স্তম্ভিত হওয়ার এক মিশ্র ভাব একটু হাসি, একটু চুপিটি। ইলা মায়ের হাতে ধরে নাচ চালিয়ে গেল হালকা সুরে নতুন করে বিট মেলে কুর্নিশ করে নেচে যাচ্ছিলো আর চোখে-মুখে এমন এক অদ্ভুত ব্যথা ও মুক্তির সংমিশ্রণ। পরি এসে দাঁড়িয়ে হেসে ফেললো
পরিঃ- তুই কি একেবারে ঝুঁকেছিস দেখলে মনে হয় তুই অভিনব নাটক করছিস।
বাড়ির সবাই একে একে চরম অবাক তারপর শেষে সবাই হেসে উঠলো দুর্গন্ধঠাসা রাগটা হঠাৎই হাসিতে বদলে গেল।ইলার বাবা প্রথমে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন
রাশেদঃ- এইটা কি দেখলাম! ইলা, তোর মাধুর্যই তো আমাদের বাড়ির বাতাস মিষ্টি করে দিল।
ইলার মা যিনি একেবারে কিছুক্ষণ আগে ঝাড়ু হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন হঠাৎ করে হেসে ফেললেন। তিনি ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি লুকিয়ে বললেন
সাবিহাঃ- এভাবে সব সময় হাসি খুশি থাকিস।
ইলা ক্লান্ত করে হাসলো তার চোখে তখনও সেই ঝিলিক তার ফোনে শাওনের রিয়েক্ট দেখতে পাওয়া রোমাঞ্চ আর এখন পরিবারের উষ্ণ হাসি সব মিলিয়ে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩
পরিঃ- কি হঠাৎ এত খুশি কেনো??
ইলাঃ- শাওন আমার স্টোরিতে রিয়েক্ট দিয়েছে।
এটা বলে ইলা লজ্জা করে মাথা নিচু করল তার মনে একদিকে স্তব্ধতা, অন্যদিকে আশার আলো ফোটে। ঘরের আনন্দময় হেসে-গান আর মায়ের হালকা খোঁচা মিশে গলির মতো ঘরটা তেতো-মিষ্টি হয়ে গেল।
