ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫০
ছায়া
ডাইনিং টেবিলে এক রাজকীয় ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। রকমারি সব খাবার সবাই মিলে একসাথে খেতে বসেছে। নওরিন ইলার ঠিক উল্টো পাশে বসেছে তার দৃষ্টি বারবার ইলার গয়না আর সাজগোজের ওপর দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে। নওরিন পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
নওরিনঃ- আরিয়ান তোমাদের এই বাড়িটা তো বেশ লাক্সারিয়াস।কিন্তু তোমার পাশে বসা এই ইলা কেমন যেন একটু বেমানান লাগছে না? গ্রামের সহজ-সরল মেয়েদের আসলে এই সব হাই-সোসাইটির পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে বেশ কষ্ট হয়।
ইলা মাথা নিচু করল ইলার বাবা রাশেদ তালুকদার আর বড় বাবা করিম উদ্দিনের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়ান চামচ দিয়ে ইলিশের একটা টুকরো নিজের প্লেটে নিতে নিতে বলল,
আরিয়ানঃ- সোসাইটি উঁচু না নিচু সেটা মানুষের রুচি দিয়ে বোঝা যায়। আর আমার রুচি কতটা উন্নত তা তুমি খুব ভালো করেই জানো,কারণ তুমি অনেক চেষ্টা করেও এই বাড়ির ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারোনি। আমার বেড রুম তো দুরের কথা। গেস্ট হিসেবে এসেছ গেস্টের মতো থাকো। বেশি কথা বলে নিজের লেভেলটা সবার সামনে আরও নিচু করো না।
নওরিন রাগে লাল হয়ে গেল। আরিয়ান তাকে সবার সামনে সরাসরি ‘লো লেভেল’ বলে দিল! ঠিক তখনই নাফিযা বেগম একটি বড় ইলিশ মাছের টুকরো ইলার প্লেটে দিতে গিয়ে বললেন,
নাফিযাঃ- ইলা মা এই বড় টুকরোটা তুমি নাও ইলিশ মাছটা খুব ফ্রেশ।
রাশেদ তালুকদার মুখ খুলতে গেলেন
রাশেদঃ- বেয়াইন আসলে ইলা তো ইলিশ মাছ…
কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরিয়ান ইলার প্লেট থেকে মাছের টুকরোটা আলতো করে সরিয়ে নিজের প্লেটে নিয়ে নিল। পুরো টেবিল নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নাফিযা বেগম অবাক হয়ে তাকালেন।
আরিয়ানঃ- আম্মু ইলা এই মাছ খাবে না ও ইলিশ মাছ পছন্দ করলেও কাটার ভয়ে এটা খেতে চায় না। ছোটবেলা থেকেই ইলিশের কাটায় ওর বড় অনীহা।
আরিয়ানের কথা শুনে ইলার বাবা আর মা একদম স্থবির হয়ে বসে রইলেন। তাদের মেয়ের এই ছোট অভ্যাসটা আরিয়ান জানল কী করে? ইলার পরিবার আর আরিয়ানের পরিবারের সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে।নওরিন অবাক হয়ে বলল,
নওরিনঃ- তুমি তো দেখি ওর ডায়েট চার্টও মুখস্থ করে ফেলেছ আরিয়ান এত আদিখ্যেতা আগে তো দেখিনি তোমার মাঝে।
আরিয়ান এবার নওরিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা ঠান্ডা হাসি দিল।
আরিয়ানঃ- এটা আদিখ্যেতা নয় একে বলে ‘কানেকশন’। যে মানুষটার অস্তিত্ব আমার প্রতিটি নিশ্বাসের সাথে জড়িয়ে আছে, তার ছোট্ট খাটো অনিহা জেনে রাখা অস্বাভাবিক?
নওরিন জেলাস হয়ে
নওরিনঃ- এত ভালো বাসা ,তো এটা কত দিনের প্রজেক্ট?
আরিয়ান ইলার দিকে তাকিয়ে বলল
আরিয়ানঃ- ইলাফুল আমার কোনো প্রজেক্ট নয় যে ডায়েট চার্ট মুখস্থ করতে হবে ও আমার জীবন।ওর প্রতিটা অপছন্দই আমার কাছে গুরুত্ব পায়।
ইলা আরিয়ানের দিকে তাকাল। তার দুচোখ তখন কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠেছে। আরিয়ান নিজের হাতে মাছের কাটাগুলো খুব সতর্কতার সাথে বেছে নিয়ে একটা পরিষ্কার মাছের টুকরো ইলার মুখে তুলে দিল।
ইলা ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- আপনি… আপনি কী করে জানলেন?
আরিয়ান ইলার কানের কাছে মুখ নিয়ে মাত্র তারা শুনতে পায় এমন স্বরে বলল,
আরিয়ানঃ- “ভুলে যেও না ইলাফুল,বিয়ের আগে আমি তোমার সোশ্যাল প্রোফাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটিয়েছি। তোমার কোন পোস্টে কী কমেন্ট ছিল, কোথায় তুমি কাটাহিন ইলিশ চেয়েছিলে… সব এই তোমার ভয়েজ কিং-এর মেমোরিতে সেভ করা আছে।
ইলা লজ্জায় আর আবেগে লাল হয়ে গেল।এদিকে নওরিন রাগে টেবিলের নিচে নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে। তার মনে হচ্ছে সে এখানে অপমানিত হতেই এসেছে। রাশেদ তালুকদার খুশি মনে বললেন,
রাশেদঃ- আরিয়ান বাবা তুমি সত্যিই আমাকে অবাক করলে। আমি আজ নিশ্চিত যে আমার মেয়েটাকে সঠিক হাতেই তুলে দিয়েছিলাম সেদিন।
খাওয়া শেষ হতেই আরিয়ান নওরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- নওরিন তোমার ডিনার তো শেষ? এবার আশা করি তুমি নিজের রাস্তাটা খুঁজে নিতে পারবে।আমার তিলবতীকে আর কতক্ষণ অপলক দেখবে? ওর নজড় লেগে যাবে তো।
নওরিন আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না ব্যাগটা ঝটকায় নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল। নোহা আর নেহা পেছনে দাঁড়িয়ে তালি বাজিয়ে হাসছে। ইলা আরিয়ানের হাতটা একটু শক্ত করে চেপে ধরল।আরিয়ান মুচকি হেসে ইলার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। আজকের অপমানটা নওরিনের জন্য সারাজীবনের শিক্ষা হয়ে রইল।
Time skip….
রাত তখন প্রায় দুইটা পেরিয়ে গেছে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ইলা আর আরিয়ানের রুমের জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছে।আরিয়ান বিছানায় উঠে বসল ইলার হাতটা আলতো করে ধরে টান দিল।
আরিয়ানঃ- ইলাফুল…উঠো চলো ছাদে যাই।
ইলা চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসল।
ইলাঃ- এত রাতে? কী হলো হঠাৎ?
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- চাঁদটা আজ খুব সুন্দর তোমার সাথে দেখতে ইচ্ছে করছে।
ইলা লাজুক হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়াল আরিয়ান তার হাত ধরে আস্তে আস্তে দরজা খুলে বেরোল। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে উঠতে ইলা আরিয়ানের হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ছাদের দরজা খুলতেই ঠান্ডা হাওয়া এসে দুজনের মুখে লাগল। আকাশটা পরিষ্কার, পূর্ণিমার চাঁদটা যেন সাদা আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো ছাদে।
দুজনে ছাদের এক কোণায় গিয়ে দাঁড়াল। আরিয়ান ইলাকে সামনে টেনে নিয়ে তার পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। দুজনের চোখ চাঁদের দিকে।ইলা ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- কী সুন্দর… যেন স্বপ্নের মতো।
আরিয়ান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- তুমি যতটা সুন্দর, চাঁদ তার কাছে কিছুই না।
ইলা লজ্জায় মাথা নিচু করল আরিয়ান পকেট থেকে একটা কিটকেট চকলেট বের করে ইলার সামনে ধরল।
আরিয়ানঃ- এটা তোমার জন্য।
ইলার চোখ চকচক করে উঠল।
ইলাঃ- কিটকেট?! আরে… আপনি জানেন না আমি এটা কতটা পছন্দ করি! কবে থেকে খাইনি!
সে খুশিতে লাফিয়ে উঠল, আরিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে চুমু দিল গালে। আরিয়ান হেসে চকলেটটা খুলে দিল। ইলা একটা স্টিক নিয়ে মুখে দিল। চকলেট গলে যাচ্ছে তার ঠোঁটে, চোখ বন্ধ করে মজা নিচ্ছে।
আরিয়ান চুপচাপ তাকিয়ে আছে ইলার দিকে। তার চোখে একটা গভীর মায়া, ভালোবাসা আর একটু দুষ্টুমি মিশে আছে। ইলা চোখ খুলে দেখল আরিয়ান এভাবে তাকিয়ে। লজ্জা পেয়ে হাসল।
ইলাঃ- কী দেখছে এভাবে?
আরিয়ানঃ- তোমাকে তুমি যখন খুশি হও, পুরো দুনিয়াটা আলো হয়ে যায়।
ইলা আরেকটা স্টিক মুখে নিল কিন্তু এবার ঠোঁটের কাছে ধরে রাখল। তারপর দুষ্টু হাসি দিয়ে আরিয়ানের দিকে এগিয়ে গেল।
ইলাঃ- খেয়ে দেখুন কত ইয়ামি এটা
আরিয়ান হেহে করে হাসল ইলা চকলেটটা তার ঠোঁটের কাছে ধরতেই আরিয়ান আলতো করে বাইট দিল।চকলেটের অর্ধেকটা তার মুখে চলে গেল বাকিটা ইলার মুখে।ইলা চোখ বড় করে জিজ্ঞেস করল,
ইলাঃ- কেমন লাগলো?টেস্টি না??
আরিয়ান চকলেট চিবিয়ে একটু থেমে বলল,
আরিয়ানঃ- বুঝতে পারলাম না দাঁড়াও, আবার টেস্ট করে দেখি।
এই বলে সে ইলার কোমর ধরে টেনে নিল খুব কাছে।ইলা চমকে উঠল। আরিয়ান তার ঠোঁটে আলতো করে চুমু দিল প্রথমে নরম, তারপর একটু গভীর। চকলেটের মিষ্টি স্বাদ মিশে গেল দুজনের ঠোঁটে। ইলার হাত থেকে চকলেটটা পড়ে গেল, কিন্তু দুজনের খেয়ালই নেই।চুমু ভাঙতেই ইলা লজ্জায় মুখ লুকাল আরিয়ানের বুকে।
ইলাঃ- বজ্জাত… চকলেটের টেস্ট নাকি এভাবে নেওয়া হয়?
আরিয়ান হাসতে হাসতে তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- চকলেটের না… তোমার টেস্ট নিলাম। আর এটা পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি।কোনো চকলেট এই মিষ্টির কাছে আসতে পারবে না।
ইলা মুখ তুলে তার চোখে চোখ রাখল চাঁদের আলোয় দুজনের মুখ ঝকঝক করছে। ইলা ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- আপনি আমার সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ ভয়েজ কিং
আরিয়ান তার কপালে চুমু দিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আর তুমি আমার পুরো দুনিয়া ইলাফুল।
ছাদের সেই মায়াবী মুহূর্তের পর আরিয়ান আর ইলা বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল।চারিদিকের নিস্তব্ধতা আর চাঁদের আলো যেন শুধু তাদের জন্যই আজ সাজানো হয়েছে।
ইলা আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ আরিয়ান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
আরিয়ানঃ- “ইলাফুল” রাত তো অনেক হলো এবার নিচে চলো, কাল সকালে আবার তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।
ইলা একটু আলসেমি করে বলল,
ইলাঃ- আর একটু থাকি না এই বাতাসটা খুব ভালো লাগছে।
আরিয়ান মুচকি হেসে ইলার কপালে নাক ঘষে দিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- নিচে না গেলে কিন্তু বাকি চকলেটগুলো আমি একাই সাবাড় করে দেব।
ইলা চোখ বড় বড় করে বলল,
ইলাঃ- না না! চলুন চলুন!
দুজনে হাত ধরাধরি করে সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। রুমে ঢোকার পর আরিয়ান দরজাটা লক করে দিয়ে ইলার দিকে তাকাল। আরিয়ানের দৃষ্টিতে এখন আবার সেই নেশা জেগে উঠছে। ইলা বুঝতে পেরে একটু দূরে সরে যেতে চাইল, কিন্তু আরিয়ান এক ঝটকায় ওকে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল।
আরিয়ানঃ- চকলেটের স্বাদ তো শেষ হয়নি “ইলাফুল”
আরিয়ানের গলার স্বর এখন অনেক বেশি গভীর। ইলা কাঁপাকাঁপা স্বরে বলল,
ইলাঃ- এখন তো রাত অনেক হয়েছে… ঘুমাবেন না?
আরিয়ান ইলার ঘাড়ের কাছে নিজের নাক ডুবিয়ে দিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আজ আমার চোখের ঘুম আর শরীরের ক্লান্তি সব তুমি কেড়ে নিয়েছ ইলাফুল। এত সুন্দর বউ পাশে রেখে আমি কি ঘুমাতে পারি?
আরিয়ান আলতো করে ইলার কানের লতিতে ঠোঁট ছোঁয়াল। ইলার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। ও নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে আরিয়ানের শার্ট আঁকড়ে ধরল। আরিয়ান ইলার সারা মুখে ছোট ছোট অজস্র চুমু দিতে লাগল। ওর প্রতিটি স্পর্শ ছিল ভালোবাসার এক একটা পরশ।আরিয়ান ইলাকে নিয়ে বেডে এসে শুয়ে পড়ল। ও ইলার গায়ের চাদরটা ঠিক করে দিয়ে ওর বুকের ওপর মাথা রেখে শুলো।আরিয়ান ডাকল।
আরিয়ানঃ- “ইলাফুল”
ইলা মৃদু আওয়াজ করল।
ইলাঃ- উমম…
আরিয়ানঃ- সারাজীবন এভাবেই থেকো আমার পাশে।
ইলাঃ- সারাজীবন না প্রতিটা শ্বাসে, প্রতিটা হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকে আমি আপনার পাশে থাকব।
আরিয়ানের কণ্ঠে এক ধরণের আকুতি ঝরে পড়ল
আরিয়ানঃ- কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাববে না তো?
ইলা আরিয়ানের চুলে বিলি কেটে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
ইলাঃ- আপনার এই ‘ইলাফুল’ আপনাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। আপনি না থাকলে তো আমি শুকিয়ে ঝরে যাব।
আরিয়ান ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেল। তারপর ইলার পেটের ওপর হাত রেখে ইলাকে নিজের আরও কাছাকাছি টেনে নিল। দুজনের নিশ্বাসের শব্দ এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল ঘরের নিস্তব্ধতায়। কিছুক্ষণ পর ইলার নিয়মিত নিশ্বাসের শব্দ শুনে আরিয়ান বুঝল ও ঘুমিয়ে পড়েছে।
আরিয়ান ইলার কপালে শেষবারের মতো একটা আলতো চুমু দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “গুড নাইট মাই লাইফ”
পরদিন সকাল…
ভোরের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ইলার চোখে পড়তেই ওর ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ মেলে ও দেখল আরিয়ান তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওর হাতটা ইলার কোমরের ওপর খুব শক্ত করে রাখা, যেন ঘুমের মধ্যেও ও ইলাকে ছাড়তে চাইছে না।
ইলা খুব সাবধানে আরিয়ানের হাতটা সরিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। তখনই আরিয়ান চোখ না খুলেই ওকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল।আরিয়ান ঘুমু ঘুমু গলায় বলল
আরিয়ানঃ- কোথায় যাওয়া হচ্ছে এত সকালে?
ইলাঃ- ছাড়ুন না…আম্মুরা উঠে পড়েছে যে কেউ ডাকবে সকাল হয়ে গেছে।
আরিয়ানঃ- আম্মু জানে যে তার ছেলে এখন ব্যস্ত তাই কেউ বিরক্ত করবে না।
ইলা হেসে ফেলল আরিয়ান চোখ খুলে ইলার হাসির দিকে তাকিয়ে রইল। সকালের আলোয় ইলার এই নিষ্পাপ হাসিটা যেন ওর সারা দিনের ক্লান্তি দূর করে দিল।
আরিয়ান ইলার হাত ধরে টেনে ওকে আবার নিজের বুকের ওপর নিয়ে এল।
আরিয়ানঃ- আজ সারাদিন আমরা কোথাও বের হবো না শুধু তুমি আর আমি।
ইলা লজ্জা পেয়ে বলল,
ইলাঃ- আব্বু আম্মু বড় মা বড় বাবা রায়েদ ভাই সবাই আছে। কী ভাববে?
আরিয়ান ইলার নাকে একটা টোকা দিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আমাদের নতুন বিয়ে হইছে এটা স্বাভাবিক তাই ভাবাভাবির কিছু নেই।
ঠিক সেই সময় দরজায় টোকা পড়ল নাফিযা বেগমের গলা শোনা গেল বাইরে থেকে।
নাফিযাঃ- আরিয়ান, ইলা তোরা কি উঠেছিস? নিচে নাস্তার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে।
ইলা আরিয়ানের দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে উত্তর দিতে চাইল,কিন্তু আরিয়ান ইলার ঠোঁটের ওপর হাত রেখে ওকে চুপ করিয়ে দিল ও নিজে জোরে বলল,
আরিয়ানঃ- আম্মু আমাদের একটু দেরি হবে তোমরা খেয়ে নাও।
বাইরে থেকে নাফিযা বেগমের মুচকি হাসির শব্দ পাওয়া গেল। তিনি আর কিছু না বলে চলে গেলেন। ইলা আরিয়ানের বুকে কিল মেরে বলল,
ইলাঃ- আপনি একটা আস্ত বদমাইশ এখন সবাই কী ভাববে বলুন তো?
আরিয়ান হাসতে হাসতে বলল,
আরিয়ানঃ- ভাববে যে আমরা আমাদের হানিমুনটা ঘরেই কাটাচ্ছি।
Time skip…
বিকেলের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে তিনটে গাড়ি নিয়ে সবাই মিলে রওনা হলো গ্রামের ধারের সেই বিশাল সরিষা ক্ষেতের দিকে। মাইলে পর মাইল যেন হলুদের গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে। সরিষা ফুলের উগ্র অথচ মিষ্টি ঘ্রাণে চারপাশটা ম ম করছে।
গাড়ি থেকে নামতেই নোহা আর নেহা আনন্দে চিৎকার করে উঠল। পরি তো আদিবকে টেনে নিয়ে সোজা ক্ষেতের আইল দিয়ে দৌড় দিল। রায়েদ একটু পেছনে থেকে ইলা আর আরিয়ানকে দেখছিল। ইলা আজ একটা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরেছে, কপালে ছোট্ট একটা টিপ। হলুদের এই সাগরে ওকে যেন ঠিক কোনো এক বনদেবীর মতো লাগছে।
ইলার বাসন্তী রঙের শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে আরিয়ান পরেছে গাঢ় বাসন্তী রঙের একটি স্টাইলিশ পাঞ্জাবি, যার কলার আর হাতার বর্ডারে সূক্ষ্ম কালো সুতোর কাজ করা। পাঞ্জাবির ওপরের দুটো বোতাম খোলা থাকায় ওর চওড়া বুকের পুরুষালি গঠনটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
আরিয়ানের পরনে ছিল ধবধবে সাদা কাবলি প্যান্ট আর পায়ে কালো চামড়ার রাজকীয় নাগরা, যা ওর ব্যক্তিত্বে এক আভিজাত্যের ছাপ এনে দিয়েছে। চোখের ওপর দামী রে-ব্যান সানগ্লাসটা যখন ও খুলে পাঞ্জাবির কলারে ঝোলাল, তখন রোদের আলোয় ওর তীক্ষ্ণ চোখের মণিগুলো হীরের মতো চিকচিক করে উঠল।
রোদে আরিয়ানের গায়ের রংটা যেন আরও বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।আরিয়ানের ডান হাতে দামী মেটাল ঘড়ি আর চুলে সেই চিরচেনা কেয়ারলেস স্টাইল সব মিলিয়ে আরিয়ানকে এতটাই হ্যান্ডসাম লাগছিল যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইলাও বারবার মুগ্ধ হয়ে আড়চোখে নিজের স্বামীকে দেখছিল।
নেহা আর নোহা তো ফিদা হয়ে মুখ টিপে হাসছিল। আদিব পর্যন্ত বলেই ফেলল,
আদিবঃ- তুমি আর ইলা তো আজকের দিনের ‘পাওয়ার ফুল কাপল’ তোমার এই লুক দেখে তো যে কেউ ক্রাশ খাবে।
আরিয়ান মুচকি হেসে ইলার দিকে তাকাল। ইলা নিচু স্বরে বলল,
ইলাঃ- আপনাকে আজ বড্ড বেশি সুন্দর লাগছে।
আরিয়ান ওর চোখের ওপর ঝুঁকে এসে খুব নিচু স্বরে বলল, আরিয়ানঃ- সুন্দর কি আর এমনিতে লাগছে তোমার এই বাসন্তী রূপের ছায়া পড়েছে তো তাই।
ইলা লজ্জায় নিজের শাড়ির আচলে আঙুলে পেঁচাতে লাগল। আরিয়ানের এই মোহময়ী লুক আর গভীর কণ্ঠস্বর যেন ইলার হৃদস্পন্দন মুহূর্তেই কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। সরিষা ক্ষেতের ওই হলদে সমুদ্রে আরিয়ান যেন এক রাজকুমার, যে কেবল তার রাজকন্যাকে আগলে রাখার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।আরিয়ান ইলার হাতটা শক্ত করে ধরে হাটা শুরু করলো। ইলা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে চারদিকে।
ইলাঃ- দেখুন কত হলুদ মনে হচ্ছে পৃথিবীটা আজ শুধু আমাদের জন্যই সেজেছে।
আরিয়ান মুচকি হেসে ইলার দিকে তাকাল। ওর চোখে আজ অন্যরকম এক নেশা। নোহা দূর থেকে চেঁচিয়ে বলল,
নোহা:- ভাইয়া পরিবেশটা তো সেই লেভেলের রোমান্টিক একটা গান না হলে তো জমছে না।
আদিব ,রায়েদ আর পরিও সায় দিল।সবাই মিলে একটা গোল হয়ে দাড়ালো সরিষা ক্ষেতের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায়।
সবাই জোরাজুরি শুরু করল আরিয়ানকে গান গাওয়ার জন্য। আরিয়ান প্রথমে একটু না করলেও ইলার আবদার দেখে আর না করতে পারল না। ও ইলার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ধীর লয়ে গাইতে শুরু করল
“এই ভালোবাসা… তোমাকেই পেতে চায়
এই ভালোবাসা… তোমাকেই পেতে চায়
ওই দুটি চোখ… যেন কিছু বলে যায়
ওই দুটি চোখ… যেন কিছু বলে যায়…”
আরিয়ানের সেই ভরাট আর দরদী কণ্ঠস্বর বাতাসের সাথে মিলেমিশে এক অপূর্ব সুর তৈরি করল। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে। ইলা যেন নিজের অজান্তেই আরিয়ানের চোখের মনিতে হারিয়ে গেল। আরিয়ান গান গাইতে গাইতে ইলার খুব কাছে সরে এল। ওর চোখের দৃষ্টিতে এক তীব্র টান, যেন গানের প্রতিটি শব্দ ও শুধু ইলার জন্যই বলছে।গান শেষ হতেই চারদিকে হাততালির রোল পড়ে গেল।
নেহা:- উফ ভাইয়া তোমার ভয়েজটা সত্যিই জাদুকরী ভাবি তো পুরো ফিদা।
ইলা লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে হাসছিল। আরিয়ান আলতো করে ইলার কানের পাশে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
আরিয়ানঃ- গানটা গাওয়া তো শুধু শুরু ইলাফুল পুরো জীবনটা তোমাকেই এভাবেই গান গেয়ে শোনাবো।
সবাই যখন ছবি তুলতে ব্যস্ত,আরিয়ান সুযোগ বুঝে ইলার হাত ধরে একটু আড়ালে নিয়ে গেল।লম্বা সরিষা গাছগুলোর আড়ালে দুজন একদম একা। আরিয়ান ইলার কোমর জড়িয়ে ধরল।
ইলাঃ- কি করছেন?সবাই দেখে ফেলবে তো।
আরিয়ানঃ- দেখুক আমি আমার বউকে ভালোবাসছি, এতে লুকানোর কিছু নেই।
আরিয়ান ইলার চিবুক ধরে মুখটা একটু উঁচু করল।হলদে ফুলের পরাগ ইলার নাকে লেগে আছে। আরিয়ান নিজের আঙুল দিয়ে সেটা মুছে দিতে দিতে খুব কাছে চলে এল। ইলার নিশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। সরিষা ক্ষেতের সেই নির্জনতায় আরিয়ান ইলার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু আঁকল।
ঠিক তখনই আদিব দূর থেকে চিৎকার করে উঠল,
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৪৯
আদিবঃ- ভাইয়া তোমরা কোথায়?
ইলা তড়িঘড়ি করে আরিয়ানের বুক থেকে সরে দাঁড়াল। আরিয়ান একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে হাসল।
আরিয়ানঃ- এই ছেলেটা সবসময় আমার রোমান্সে জল ঢেলে দেয়।
ইলা খিলখিল করে হেসে আরিয়ানের হাত ধরে আবার সবার কাছে ফিরে এল। আজকের দিনটা তাদের স্মৃতির পাতায় এক সোনালী হলুদ দিন হিসেবে লেখা হয়ে রইল।
