হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
সাঞ্জেনা শাজ
মেহরাদ বাড়ি আসলো প্রায় বারোটার দিকে। এসেই শুভ্রতার খুঁজ করতে জানতে পারলো মেয়েটা তার পেয়ারি মায়ের সাথে হসপিটাল গিয়েছে। মেহরাদের কেন যেনো এতো মাথা গরম হলো! তবুও চুপ রইলো কিয়ৎক্ষন। শান্ত শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো মা’য়ের দিকে কিছুক্ষণ।
জাহানারা বেগম ছেলের কাছে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে সুন্দর করে বললেন,
“তোর ছোট চাচি,নিজেই সেধে সাথে নিয়ে যেতে বললেন। মানা করলে আবার ফুসে যেতো। আর এমনিতেও যা হওয়ার হয়েছে। আগে ভালোই ভালো সব ভালো হলেই হয়। সব কিছুই ঠিক করার সুযোগ দিতে হয়। মনে করো এটা হয়তো প্রথম ধাপ!”
মেহরাদ কিছু না বলে স্থীর থাকলো কতক্ষণ। এই মহিলাকে তার ভুলেও বিশ্বাস হয়না। খানদের রক্ত ভালো হবে! এটা অবিশ্বাস্য! তার চাচু কিভাবে যে ফাসলো! সে মা’কে জিজ্ঞেস করলো,
“কোন হসপিটালে নিয়ে গিয়েছে? জানো? বাড়ির গাড়িতে গিয়েছে না?”
“হু। বাড়ির গাড়ি নিয়েই গিয়েছে। ” সেই সাথে হসপিটালের নামও জানালো। মেহরাদ দেরি করলো না। আবারও বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,
“তোমাদের মতো জনদরদী মন আমার না মা। এই মহিলার ক্ষেত্রে তো ভুলেও না। উনাকে বিশ্বাস করা দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা সেইম আমার কাছে। আসছি।”
জাহানারা বেগম ছেলের কথায় বাকরুদ্ধ হলো। ছেলেটা মনে মনে কতো বিদ্বেষ রাখে! এরকম হলে শাশুড়ী জামাইয়ের মতের মিল হবে কবে?
মেহরাদের গাড়ি এসে পৌছলো হাসপাতালের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে হসপিটালের ভিতরে রিসিপশনের মেয়েটির কাছ থেকে ঠিকানা জেনে চলে গেলো তিন তলায়। সেখানে গিয়ে দেখলো শুভ্রতা একা বসে বাহিরে চেয়ারে। মেহরাদ এগিয়ে যেতেই শুভ্রতা কিছুটা ভয়ে আরষ্ঠ হয়ে এলো। এমনিতেই ব্যাথা তারউপর ভয়ে মেয়েটা জুবুথুবু। কিন্তু মেহরাদ তেমন কিছুই বললো না। কারণ, সে এখন মনে প্রানে বিশ্বাস করে, তার ঘরে সব জনদরদী বসবাস করে। এরা মানুষের মুখশ দেখেই গলে গলে পরে।
আর এই আরেক মেয়ে! এই মেয়ে পারলে জান দিয়ে দেয়। এদের আর আটকানো যাবে বলেও মনে হয় না। আসলে, অচেনা মানুষকে কলিজা কেটে খায়িয়ে ফেলতে মন চাইবে এটাই স্বাভাবিক। এরা তো আর আসল খবর জানে না! তাই সে তপ্ত গরম শ্বাস ফেলে রাগকে উড়িয়ে দিতে চাইলো। শুভ্রতার সামনে গিয়ে প্রথম কিছুক্ষন চুপ করে তাকিয়ে থেকে শুধালো,
“পেইন এখনো আছে? ডাক্তার দেখানো হয়েছে? তোর অলি আউলিয়া মা কোথায়? একা কেন? ”
শুভ্রতা মেহরাদের স্বাভাবিক ঠাট্টা স্বর শুনে ভিতরের ভয় কমিয়ে এনে মুখ গুজু করলো। অলি আওলিয়া মানে কি? এভাবে কে কাউকে বলে? তবুও আস্তে করে বললো,
“কমেছে কিছুটা। উনি ভিতরে। কি কথা যেন বলছে ডক্টরের সাথে।”
মেহরাদ কপালে ভাজ ফেললো। ফেলে জিজ্ঞেস করলো,
“ঔষধ দেইনি? কি বলেছে?”
শুভ্রতা ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো। বলেছে কতো কিছুই। একদম প্রাইভেট কথাবার্তা। সে কিভাবে বলবে ওনাকে এগুলো ? তাই সে চুপ করেই রইলো। শুধু বললো,
“তেমন কিছু না। ঔষধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
একটু পরেই বের হলো রিমা খান। মেহরাদকে দেখে কিছুটা অবাকই হলো। এখানেও এসে পড়েছে! তালুকদারের ছেলেরা জান দিয়ে ভালোবাসতে পারে আর কিছু পাড়ুক আর না পাড়ুক! বেশ, বেশ! এ ভালোবাসা কতদিন থাকে সে-ও দেখবে।
মেহরাদ ওনাকে দেখে কিছু বললো না। শুধু হাত বাড়িয়ে দিলো প্রেসকিপশনের জন্য। রিমা খান দিলেন না। করিডর ছেড়ে নিচে নেমে যাওয়া পথের দিকে হেটে যেতে যেতে বললো,
“এনেছি আমি। কিনেও আমিই দিতে পাড়বো।”
ব্যাস! মেহরাদের দমিয়ে রাখা রাগ যেন আকাশ ছুলো। ভস্ম করে দেওয়া চোখে শুভ্রতার দিকে তাকালো। শুভ্রতা চেহারা চোখে মুখে আকুতি ভরে ইশারায় বুঝালো, ‘প্লিজ প্লিজ। এখন রেগে যাবেন না। বাদ দিন। ‘
মেহরাদ বাদ দিবে? ভুলেও না! সে জবাব দিয়ে ছাড়বে। তবে এখন না। সে শুভ্রতাকে সাথে করে নিচে নেমে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগেই আরেকটি গাড়ি এসে থামলো তাদের গাড়ির একটু দূরে। মেয়র রায়হান খানের। মেহরাদের চাহনি তীক্ষ্ণ হলো। সেই চাহনিতেই শুভ্রতাকে নিজের গাড়ির ভিতরে নিয়ে বসিয়ে দিলো।
রিমা খান এসে দেখলো ভাতিজাকে। হাতে ঔষধের ছোট ব্যাগ। দেখেই খুশি হলো। এ খুশি তালুকদার বাড়িতে থাকলে তার মুখে বছরান্তে দেখা যায় কি-না সন্দেহ। সে কোন দিক না তাকিয়েই রায়হানের গাড়ির কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো,
“এসেছিস তুই? ”
“হুম এইমাত্র এলাম। এখানে কেন?”
“শুভ্রতাকে নিয়ে এসেছিলাম ডক্টরের কাছে। একজন গায়নোকলজিস্ট দেখালাম।”
রায়হানের মস্তিষ্ক হটাৎ করেই কেমন চিলিক দিয়ে উঠলো। গায়নোকলজিস্ট? সে চোখে খুঁজে খুঁজে শুভ্রতাকে আর মেহরাদকে বের করলো। শুভ্রতাকে দেখতে বেশ রুগ্নই লাগলো তার কাছে। সর্ব প্রথম মাথায় একটা কথাই আসলো, প্রেগন্যান্ট?
তার ফুপি এটা হতে দিলো? তাদের তো ভিন্ন প্ল্যান ছিলো! প্ল্যান ফ্ল্যাপ যাবে যেমন তেমন শুভ্রতা প্রেগন্যান্ট এটা মাথায় আসতেই ভিতরে কেমন চুরমার হলো সব। চোয়াল শক্ত হলো তীক্ষ্ণ চাহনির মেহরাদকে দেখে গাড়টির সামনে।
রিমা খানও তাকালেন মেহরাদের দিকে। রায়হানের সাথে দাড়িয়ে থেকেই বললো,
“আমরা ওর গাড়িতে যাবো বাসায়।”
“আমরা মানে কি? পিছনে দেখুন?” বৃদ্ধা আঙুলের ইশারায় শুভ্রতাকে দেখালো গাড়ির।
রিমা খান বড়ই নাখুশ হলেন। ছেলেটা সামনে আসলে মেয়েটা যেমন দিন দুনিয়া কিছু বুঝেনা। এসেছে তার সাথে কিন্তু এখন আগে আগে গিয়েই ওই গাড়িতে উঠে বসে আছে।
“তুমি আমার সাথে এসো। আমরা এক গাড়িতেই যাবো। আমি ওই গাড়িতে উঠবো না।”
“না উঠার হলে না উঠবেন! ওঁকে ডাকছেন কেন? হোয়াইইই?” বড়ই শান্ত স্থীর তার কন্ঠঃ।
“ও আমার সাথে এসেছে, আমার সাথে যাবে না?”
“নোপ।”
রিমা খানের মুখ অপমানে লাল হলো। কিভাবে মুখের উপর ছুড়ে ছুড়ে কথা বলে ছেলেটা! এই কারনেই তো এটাকে দেখতে পাড়ে না সে! সে নিজেই গিয়ে রায়হানের গাড়িতে উঠে বসলো। ভুলেও এ ছেলের সাথে যাবে না সে। তাইতো ড্রাইভার যখন নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো অফিসের জন্য সে বাধা দেয়নি। ভেবেছি রায়হানকে বলে দেবে নিয়ে যেতে। তার এক ফোনে ছেলেটা এসেছেও দৌড়ে। নয়তো একজন মেয়র হয়ে বললেই কি চলে আসতে পাড়ে! উঁহু, পারেনা। কিন্তু ছেলেটা এসেছে। ফুফুকে ভালোবাসে দেখেই তো! আহারে তার ভাতিজাটা!
রায়হান আজ গাড়িতে উঠলো না। এগিয়ে গেলো মেহরাদের দিকে। চোখে মুখে বিতৃষ্ণা, তাচ্ছিল্যতা। মেহরাদ এক ভ্রু উঁচু করে পরখ করলো তা। মনে মনে ভাবলো, বাবাহ, এই পীর আওলিয়ার ভাতিজার আবার কি বাকি আছে!
রায়হান এগিয়ে এসে একবার ঘার কাত করে শুভ্রতার দিকে তাকালো। শুভ্রতা জমে গেলো যেন রায়হানের মুখের চোখের তাচ্ছিল্যতা দেখে। এরকম কেন চাহনি?
মেহরাদ আঙুলের তুড়ি বাজালো। নিজের দিকে আঙুল তাক করে বললো,
“আ’ম হেয়ার। টক টু মি।( আমি এখানে, আমার সাথে কথা বল) ”
রায়হান নিজের বস্তিপচা মনোভাব নিয়ে তিরস্কার করে দুর্গন্ধযুক্ত কয়েকটি বাক্য ছুড়ে দিলো মেরাদের দিকে।
নিজের ভিতরের রাগ ইর্ষাকে দমাতে না পেড়ে মুখকে করলো হাতিয়ার। বলা হয়, কাপুরষরা সব সময় তাই-ই করে।
“প্র্যাগনেন্ট? বাবাহ! সো ফাস্ট! তা বিয়ের আগেই বেডে নিয়েছিলি না-কি বিয়ের প….”
এক শক্ত মুঠোর ঘুষি পড়লো রায়হানের চোয়ালে। এক হাতে রায়হানের গলা চেপে ধরলো মেহরাদ। চারদিক যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। শুভ্রতা চেচিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আসলো দৌড়ে, আল্লাহ বলে। রিমা খানও তাই। আশেপাশের মানুষজনও জরো হতে থাকলো। একটা সুনামধন্য হাসপাতালে তো আর কম মানুষ থাকে না।
“কি বললি? আবার বল? জানো/য়ার আবার বল বলছি? ”
রিমা খান এসে ওকে আটকাতে চাইলো। রায়হান নিজের শক্তিতে নিজেকে ছুটিয়ে নিয়ে মুখের রক্ত মুছে আবারও বলে উঠলো,
“একশো বার বলবো। তুই শ্লা, করতে পাড়বি আর আমি বললেই দোষ? দুনিয়া চিনাস আমায়? আকাম কুকাম না করেই বিয়ে করে ফেলেছিস?”
মেহরাদ হুংকার দিয়ে উঠলো। ওর দিকে তেড়ে যেতে নিলে রিমা খান আটকাতে চাইলো। মেহরাদ গর্জে উঠে বললো,
“গড সোয়্যার, আপনি এসবের মাঝখানে আসলে আমি ভুলে যাবো আপনি কে। এই নোংরা কিট টাকে আজ এখানেই পুতে দিবো। এটার কলিজা কতো বড় দেখি….”
“কি হচ্ছে কি? কেন এমন করছো তুমি? নিজের উগ্রতার পরিচয় সব যায়গায় দিতে হবে?”
“ফর গড সেক, আপনি যান আমার চোখের সামনে থেকে। এক্ষুনি যান। ”
রিমা খান কিছুই বুঝতে পারলেন না। কিন্তু রায়হানের শেষ বাক্য শুনে মনে হলো মেহরাদকে খেপেয়েছে ও। তাই বলে কি এখন মারামারি হতে দিবে?
“ভুল বলেছি কিছু? অপকর্ম না করলে কেউ কিভাবে অন্যের বাগদত্তা জেনেও বিয়ে করে ফেলে? কিভাবে? ক্ষমতা তোর একার আছে? আমার নেই। কাওয়ার্ড!”
“হ্যাঁ? কি বললি? কাওয়ার্ড?”
মেহরাদ দাতে দাত চেপে শুনে গেলো সব। ক্রুধে তার চোখ মুখ দিয়ে আগুন ঝরছে৷ ইন করা শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুললো, হাতা দুটো ফোল্ড করে গাড়ির ডিকির কাছে এগিয়ে গেল। শুভ্রতা তার পিছু পিছু ছুটলো। মেহরাদ সবার আগে ওঁকে গাড়িতে ঢুকিয়ে গাড়ি লক করলো। মুখের কাছে আঙুল এনে ইশারায় দেখালো, ‘চুপ, একদম চুপ’
শুভ্রতার ঠোঁট ভেঙে আসছে কিন্তু কোন শব্দ বের করলো না। মিনিটের মধ্যে কি হয়ে গেলো এখানে? কে আটকাবে এখন এ পাগল লোকটাকে?
মেহরাদ গাড়ির ঢিকি থেকে একটা হকিস্টিক নামিয়ে আনলো। রায়হান দাঁড়িয়ে আছে, বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে ঠোঁটের কোনার রক্ত মুছছে। মেহরাদকে হকিস্টিক হাতে দেখে তার কোনো ভাবান্তর হলো না। সে তার ছেলেদের আসতে বলে দিয়েছে। আজ একদম ভালো ভাবে শেষ করে যাবে এটাকে। বেশি বড় বড় কথা বলে।
মিনিটের মধ্যেই আরও একটা জিপ গাড়ি এসে থামলো হাসপাতালের সামনে। উপস্থিত সকলের মধ্যে আতংক। তবে কেউ এগিয়ে আসছে না কাউকে থামাতে। কেউ বা ভিডিও করতে ব্যাস্ত। শুভ্রতা এযাত্রায় চেচিয়ে কান্না করতে থাকলো। লক খোলার চেষ্টা করলো। এতগুলো ছেলের সাথে উনি কিভাবে পারবে? তার এ ডাক্তারের কাছে আশাই কাল হয়ে দাড়ালো। সে যেখানে যায় সেখানেই সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।
মেহরাদ ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। সামনের চুল গুলো পিছনে ঠেলে হকিস্টিক তাক করে বললো,
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫ (৪)
“আজ তোদের মেয়রের বা/মে কতো দা/ম সেটাই দেখবো তোদের সামনে। লেটস সি?”
তারপর হকিস্টিক এর ঠকঠক শব্দ গ্রাওন্ড ফ্লোরে। তারপর ….তারপর …. দু পক্ষের মানুষ এগিয়ে গেলো দু’জনের দিকে ক্ষিপ্ত ভাবে। এরপর…..
