Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৩

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৩

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৩
ছায়া

বিকেলের সোনাঝরা রোদ যখন সিলেটের পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছে, তখন ইলা ধীরে ধীরে বাংলোর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। পরনে তার একটি হালকা সুতির নীল শাড়ি, যা তাকে এই ফুলেল পরিবেশে এক অপার্থিব স্নিগ্ধতা দিয়েছে। শাহরিয়ার নিচে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। ইলাকে আসতে দেখে সে এগিয়ে গিয়ে সম্মানের সাথে একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল।
শাহরিয়ারঃ- আসুন ম্যাম এই সময়টা হাঁটলে আপনার মন এবং শরীর দুটোই ভালো থাকবে।
তারা দুজন পাথুরে পথ ধরে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল।চারপাশের ল্যাভেন্ডার আর ডালিয়ার সুবাসে ইলার মনের মেঘগুলো যেন মুহূর্তের জন্য কেটে গেল। ইলা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল।
ইলাঃ- শাহরিয়ার ভাই আরিয়ান তো এখানে আসতে পারেনি তাহলে এত সুন্দর করে এই বাগানটা সাজালো কে?
শাহরিয়ার একটু হাসল এই হাসিতে মিশে ছিল আরিয়ানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
শাহরিয়ারঃ- আরিয়ান স্যার এটা ২-৩ মাস আগে থেকেই রেডি করছিলো সম্ভবত স্যার যেদিন জানতে পেরেছে ১ বছর ধরে যে মেয়েকে খুজেছে সেটা আপনি তখন থেকেই। স্যার চেয়েছিলো আপনাকে ৮ মাসে যতটা কষ্ট দিয়েছে তার বদলে ৮ যুগের ও বেশি আপনাকে ভালোবাসা দিবে। তাই গোপনে এখানে এই সব করেছে তিনি আমাকে বলতেন,

“শাহরিয়ার কোনো একদিন আমি এই চাকরি থেকে রিটায়ার্ড হয়ে ইলাফুলকে নিয়ে এখানে চিরদিনের জন্য চলে আসব। এখানে আমার নিজের হাতে লাগানো ফুল গাছের সমাহার থাকবে । ওনার অবর্তমানে আমি মালীদের নির্দেশ দিয়ে রেখেছি ঠিক ওনার মতোই যেনো যত্ন নিয়।
ইলার চোখে জল টলমল করে উঠল। সে গাছটির একটি পাতায় হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনি সব সময় গোছানো ছিলেন ভয়েজ কিং, শুধু নিজের চলে যাওয়াটা অগোছালো করে দিয়ে গেলেন।”
ঠিক সেই মুহূর্তে শাহরিয়ারের ঘড়িটা বিপ বিপ করে উঠল।তার কপালে আবার ভাঁজ পড়ল। সে দ্রুত তার পকেট থেকে একটি ছোট ডিভাইস বের করে চেক করল।
শাহরিয়ারঃ- ম্যাম আমাদের ভেতরে যেতে হবে।বাড়ির আশেপাশে কিছু ড্রোন মুভমেন্ট লক্ষ্য করছি।মনে হচ্ছে কেউ আকাশপথে আমাদের লোকেট করার চেষ্টা করছে।
ইলা আঁতকে উঠল

ইলাঃ- ড্রোন তার মানে কি বাবা আব্বু আমাদের খুঁজে পেয়েছে?
শাহরিয়ার ইলাকে দ্রুত বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসতে আসতে বলল,
শাহরিয়ারঃ- এটা এটা ঠিক বলা যাচ্ছেনা স্যার জব সেক্টরে অনেক শত্রু বানিয়েছিলেন, তার ওপর আমার ডিপার্টমেন্টের কিছু লোকও আপনার হদিস পেতে মরিয়া। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না এই বাড়িটি ‘সিগন্যাল জ্যামার’ দিয়ে সুরক্ষিত। ড্রোনটা এখানে ঢোকার আগেই ক্রাশ করবে।
শাহরিয়ারের কথা শেষ হতে না হতেই পাহাড়ের ঢালে কিছু একটা ভেঙে পড়ার শব্দ শোনা গেল। শাহরিয়ারের ঠোঁটে সেই রহস্যময় বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে ইলাকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে দিয়ে নিজে রাইফেল হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
অন্যদিকে আত্রাইতে,

খান বাড়িতে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।মেহেরাব খান সোফায় বসে আছেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদিব এবং ডিবি-র একজন অফিসার।
অফিসারঃ- স্যার আমরা সিলেটের ওই আরিয়ান এর এর কিনা জোনটায় আমাদের ড্রোন সিগন্যাল হারিয়ে ফেলছে।ওখানে হাই-লেভেলের কোনো জ্যামার বসানো আছে। যার কারণে ড্রোন ডুকতে পারছে না।আমাদের সন্দেহ যে ইলাকে যে নিয়ে গেছে সে সাধারণ কেউ না।
মেহেরাব খান গর্জে উঠলেন
মেহেরাবঃ- আমার কাছে সাধারন অসাধারণ এর কিছু নেই আমার বউমাকে আমার ফেরত চাই। আদিব এখনই গাড়ি বের করো। আমি নিজেই সিলেটে যাব। দেখি কে এই মানব।
নোহা কোণার টেবিল থেকে সবটা শুনছিল। তার বুক দুরুদুরু করছে। সে জানে শাহরিয়ার যা করছে তা ইলার ভালোর জন্যই, কিন্তু তার বাবা এখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছেন। নোহা গোপনে ফোন বের করে দ্রুত একটি টেক্সট পাঠাল শাহরিয়ারকে:

> “বাবা সিলেটে যাচ্ছে সাথে বিশাল ফোর্স। তোমরা দ্রুত ওখান থেকে সরার ব্যবস্থা করো। প্লিজ সাবধানে থেকো।”>
সিলেটের বাংলোতে শাহরিয়ার মেসেজটা দেখেই চোয়াল শক্ত করল। সে ইলাকে বলল
শাহরিয়ারঃ- আপনাকে একটা ছোট ভিডিও ক্লিপ রেকর্ড করতে হবে
ইলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল
ইলাঃ- কেনো শাহরিয়ার ভাই কি হয়েছে।
শাহরিয়ার জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল
শাহরিয়ারঃ- মেহেরাব খান আমাদের এড্রেস যেনে ফেলেছে। তাই আপনাকে একটা ভিডিও রেকর্ড করে এমন কিছু বলতে হবে যাতে তারা আর আপনার খোজে এখানে না আসে।
শাহরিয়ারের কথা শুনে ইলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে। জানালার বাইরে পাহাড়ের ঢালে কুয়াশা নামতে শুরু করেছে, আর সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নিভে আসছে।ইলা ধীরে ধীরে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল।

ইলাঃ- একটা ভিডিও…?কিন্তু আমি কি বলব?
শাহরিয়ার শান্ত গলায় বলল,
শাহরিয়ারঃ- ম্যাম আপনি শুধু সত্যিটা বলবেন। বলবেন যে আপনি নিরাপদে আছেন, ভালো আছেন। কেউ যেন আর আপনাকে খুঁজতে এখানে না আসে। কারণ তারা যত আসবে তত বিপদ বাড়বে।
ইলা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন নিজের ভেতরের সাহসটা খুঁজে নিচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল
ইলাঃ- ঠিক আছে।
শাহরিয়ার ফোনটা বের করে ক্যামেরা অন করল।ড্রয়িংরুমের নরম আলোয় ইলা সোফায় বসে পড়ল। তার চোখে এখনও অশ্রুর আভা, কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত শান্তি।ক্যামেরা অন হতেই কয়েক সেকেন্ড নীরবতা রইল। তারপর ইলা ধীরে ধীরে কথা বলা শুরু করল

ভিডিও বার্তাঃ
“আসসালামু আলাইকুম”
আব্বা,আব্বু,আম্মা,আম্মু,রায়েদ ভাইয়া, আদিব ভাইয়া… আর বাড়ির সবাই…
আমি জানি আপনারা এখন খুব চিন্তায় আছেন। আমাকে খুঁজতে হয়তো অনেক জায়গায় চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমি আপনাদের একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই আমি নিরাপদে আছি।
আমার সাথে কেউ খারাপ কিছু করেনি, কেউ আমাকে জোর করে কোথাও নিয়ে যায়নি। আমি নিজের ইচ্ছাতেই এখানে আছি।আমি জানি আপনারা আমাকে অনেক ভালোবাসেন, তাই আমার জন্য এতটা চিন্তা করছেন। কিন্তু দয়া করে আমার জন্য আর কোনো ঝামেলায় জড়াবেন না। আপনারা যদি এখানে আসেন, তাহলে আমি সত্যি হারিয়ে যাবো আর কখনো খুজে পারেন না।
আমি এখন একটু সময় চাই নিজের জন্য, নিজের মনটা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য।

আব্বু,
তুমি সবসময় বলতে মানুষকে তার নিজের মতো করে বাঁচতে দিতে হয়। আজ আমি শুধু সেই সুযোগটাই চাইছি।তোমরা যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাদো, তাহলে আমাকে বিশ্বাস করো।আমি ভালো আছি। সত্যিই ভালো আছি।
আর একটা কথা,
আব্বা,
দয়া করে কেউ সিলেটে আসবেন না আমাকে খুঁজতে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাবে।আমি সত্যি চলে যাবো অন্য কোথাও।আমি যখন মনে করব সময় হয়েছে তখন নিজেই আপনাদের সামনে গিয়ে হাজির হব।
ততদিন পর্যন্ত আমার জন্য দোয়া করবেন।
আমি ভালো আছি।আমাকে আমার মত থাকতে দিন।
ভিডিও শেষ হতেই ইলার চোখ বেয়ে একটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।
শাহরিয়ার ফোনটা ধীরে বন্ধ করল। তার চোখেও যেন অদ্ভুত এক সম্মান ফুটে উঠল।
শাহরিয়ারঃ- ম্যাম আপনি খুব সাহসী।
ইলা মৃদু হেসে বলল

ইলাঃ- সাহসী না শুধু চাই না আর কেউ আমার জন্য কষ্ট পাক।
শাহরিয়ার সেই ভিডিওটা সাথে সাথে মেহেরাব খান কে পাঠিয়ে দিল।
আত্রাই এর বাড়িতে,
মেহেরাব খান তখন বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত। বাইরে ইতিমধ্যে কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে।ঠিক তখনই ফোনে ভিডিওটা এল।
মেহেরাবঃ- আদিব একটা ভিডিও এসেছে ইলার।
সবাই থমকে গেল ভিডিওটা চালু হতেই পুরো ঘরে নীরবতা নেমে এল। ইলার কণ্ঠস্বর ঘরের ভেতর ভেসে উঠল শান্ত, ধীর, কিন্তু দৃঢ়।
ভিডিও শেষ হওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।মেহেরাব খান ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লেন। তার চোখে কঠিন রাগটা যেন একটু নরম হয়ে এল।
আদিব নিচু গলায় বলল

আদিবঃ- মনে হচ্ছে ও সত্যিই ভালো আছে।
ঘরের অন্যরাও ধীরে ধীরে বলল
নাফিযাঃ- যদি ভালো থাকে তাহলে থাক।
সাবিহাঃ- ওকে জোর করে আনা ঠিক হবে না।
পরিঃ- ও নিজে ফিরতে চাইলে ফিরবে।
মেহেরাব খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
মেহেরাবঃ- ঠিক আছে যদি আমার বউমা ভালো থাকে তাহলে থাক। কিন্তু মনে রেখো
এই বাড়ির দরজা তার জন্য সবসময় খোলা থাকবে।
নোহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল তার চোখে স্বস্তির জল জমে উঠল।
সিলেটের বাংলোতেঃ
রাত নেমে এসেছে দূরের পাহাড়ে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে। ইলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হলো, আজ প্রথমবারের মতো যেন চারপাশটা একটু শান্ত।আর কোথাও যেন বাতাসে ভেসে আসছে আরিয়ানের সেই অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি
“ইলাফুল… তোমাকে আমি সবসময় আগলে রাখব।”

Time Skip….
সিলেটের পাহাড়ের কোলে ‘ইলারিয়ান এর স্বপ্নবাগান’ এ ইলার দুটি দিন কেটে গেল এক অপার্থিব শান্তিতে। আরিয়ানের স্মৃতিমাখা এই বাড়িটি যেন ইলার শরীরের সব ক্লান্তি শুষে নিয়েছে। শাহরিয়ারের কঠোর নিরাপত্তায় বাইরের জগতের কোনো অশান্তি এখানে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু তৃতীয় দিন সকালে হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটল।
সকাল থেকে শাহরিয়ারকে নিচে দেখা যাচ্ছে না। ইলা লক্ষ্য করল বাগানে আজ শাহরিয়ার হাঁটতে বের হয়নি, এমনকি নাস্তার টেবিলেও তার দেখা নেই। চিন্তিত হয়ে ইলা নিচে নেমে এল। শাহরিয়ারের ঘরের দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সে ধীরে ধীরে দরজা ধাক্কা দিল।
ভেতরে ঢুকতেই ইলার বুকটা কেঁপে উঠল। সুঠাম দেহের সেই শক্তপোক্ত মানুষটা আজ বিছানায় কুঁকড়ে পড়ে আছে। শাহরিয়ারের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, নিশ্বাস বইছে খুব দ্রুত। গত কয়েকদিনের প্রচণ্ড মানসিক চাপ, না ঘুমিয়ে রাত পাহারা দেওয়া আর ইলার সুরক্ষায় বনের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ছোটাছুটি করার ধকল সইতে পারেনি তার শরীর। প্রচণ্ড জ্বরে শাহরিয়ার আচ্ছন্ন হয়ে আছে।

ইলা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে শাহরিয়ারের কপালে হাত রাখল। আগুনের মতো গরম গা সে দ্রুত বাটি ভর্তি জল আর তোয়ালে নিয়ে এল জলপট্টি দেওয়ার জন্য। কিন্তু ইলা যখনই তোয়ালেটা শাহরিয়ারের কপালে ছোঁয়াতে চাইল, ঠিক তখনই শাহরিয়ার জ্বরের ঘোরেও সতর্কভাবে ইলার হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিল।
শাহরিয়ারঃ- (জড়জড়ানো গলায়) ম্যাম আপনি এখানে কেন? উপরে যান। আমি ঠিক আছি আপনি আমার সামনে আসবেন না। এটা প্রোটোকলের বাইরে।
ইলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই অবস্থায়ও ছেলেটা নিজের কর্তব্যের কথা ভাবছে। সে আবার জলপট্টি দিতে চাইল, কিন্তু শাহরিয়ার এবার বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করে বাধা দিল।
শাহরিয়ারঃ- প্লিজ ম্যাম আমি একজন সামান্য মানুষ মাত্র। আপনি আরিয়ান স্যারের আমানত। আপনার সেবা নেওয়া আমার সাজে না। আপনি রুমে যান আমি মেডিসিন খেয়ে নিয়েছি।
ইলার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। গলার স্বর কিছুটা উঁচিয়ে আবেগের সাথে বলল

ইলাঃ- কিসের ম্যাম? কিসের সাধারণ মানুষ শাহরিয়ার ভাই? এই যে গত কয়েকটা দিন আপনি নিজের খাওয়া, ঘুম, নিজের সবটুকু সুখ বিসর্জন দিয়ে আমার ছায়া হয়ে আছেন তা কি শুধু প্রোটোকলের জন্য? আরিয়ান আপনাকে আমানত রক্ষা করতে বলেছিল, কিন্তু আপনি যা করছেন তা কেবল দায়িত্ব দিয়ে হয় না।
শাহরিয়ার চুপ করে রইল জ্বরের ঘোরে তার চোখ বুজে আসছে। ইলা তোয়ালেটা নিংড়ে শাহরিয়ারের কপালে বসিয়ে দিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল
ইলাঃ- আজ যদি আপনার নিজের বোন হতাম তাহলে কি এভাবে দূরে ঠেলে দিতেন।দিতে পারতেন না তো তাহলে আজ আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি আপনার নিজের বোন হয়ে। বড় ভাইকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে রেখে বোন কি কোনোদিন নিজের ঘরে শান্তিতে ঘুমাতে পারে?
শাহরিয়ার এবার চোখ মেলে তাকাল। জ্বরে লাল হয়ে যাওয়া চোখে বিস্ময়।
ইলাঃ- আপনি আমার কাছে শুধু একজন অফিসার নন শাহরিয়ার ভাই। আপনি আমার সেই বড় ভাই, যে নিজের জীবন বাজি রেখে আমাকে আর আমার অনাগত সন্তানকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে এনেছেন। পর হয়ে থাকতে চাইলেই কি পর হওয়া যায়? আপনি যদি আজ সেবা করতে না দেন, তবে আমি নাস্তা করব না, এক পা-ও নড়ব না এখান থেকে।

ইলার কথাগুলো তীরের মতো শাহরিয়ারের বুকে বিঁধল। যে ছেলেটি সারা জীবন একাকীত্ব আর এতিমখানার অবহেলায় বড় হয়েছে, তার কাছে এই ‘বোন’ ডাকটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাওয়া। তার পাথরের মতো শক্ত চোখ দুটো ভিজে উঠল। সে আর বাধা দিল না।
পরের কয়েক ঘণ্টা ইলা পরম মমতায় শাহরিয়ারের সেবা করল। বারবার জলপট্টি বদলে দেওয়া, লেবুর শরবত বানিয়ে খাওয়ানো সবই সে করল একজন আপন বোনের মতো। শাহরিয়ার নিশ্চুপ হয়ে ইলার সেবা গ্রহণ করছিল আর মনে মনে ভাবছিল,
“স্যার আপনি আমাকে শুধু চাকরি দেননি, আপনি আমাকে একটা পরিবার দিয়ে গেছেন। আপনার ঋণ আমি এই জীবনে শোধ করতে পারব না।”
বিকেলের দিকে শাহরিয়ারের জ্বর কিছুটা কমলে সে ধীর গলায় মনে মনে বলল
শাহরিয়ারঃ- আজ যদি নোহা এখানে থাকত, খুব খুশি হতো। ও সবসময় বলত, ইলা ভাবি খুব ভালো। আজ বুঝলাম ও কেন এমনটা বলত।
শাহরিয়ারের মুখে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। বাইরের ঝোড়ো হাওয়া যেন আজ কিছুটা শান্ত হয়ে এসেছে।

Time Skip….
একদিন বিকেলে শাহরিয়ার আর ইলা পাহাড়ি বাজার থেকে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনতে বের হলো। কেনাকাটা শেষে যখন তারা বাংলোর দিকে ফিরছিল, রাস্তার মোড়ে ছোট এক পুরোনো জুয়েলারি শপ ইলার নজরে পড়ল।
দোকানটির কাঁচের শো-কেসে রাখা একটি মাটির নকশা করা গয়নার সেট দেখে ইলা হঠাৎই খুব খুশি হয়ে উঠল।তার চোখেমুখে সেই পুরনো চঞ্চলতা ফিরে এল। সে প্রায় দৌড়ে দোকানটির দিকে গেল। শাহরিয়ার দূর থেকে অবাক হয়ে দেখছিল,
কতদিন পর ইলার মুখে এমন হাসি দেখল সে।

কিন্তু মিনিট কয়েক পর ইলা যখন দোকান থেকে বেরিয়ে এল, তার সেই হাসিটা কর্পূরের মতো উবে গেছে। মুখটা ম্লান, চোখে একরাশ শূন্যতা। শাহরিয়ারের দিকে না তাকিয়েই সে গটগট করে সামনে হাঁটতে লাগল। শাহরিয়ার কিছু বলতে চেয়েও পারল না, ইলার বিষণ্ণতা তাকে থামিয়ে দিল।
বাংলোতে ফেরার পর শাহরিয়ার কিচেনে সব বাজার গুছিয়ে রাখল। কিন্তু তার মাথায় ঘুরছিল ইলার ওই হঠাৎ বদলে যাওয়া মুখটা। সে নিজের ঘর থেকে একটি বড় লাগেজ আর বাজার থেকে নিয়ে আসা সেই লাগেজটি নিয়ে ইলার রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় মৃদু নক করে অনুমতি চাইল
শাহরিয়ারঃ- ম্যাম ভেতরে আসতে পারি?
ভেতর থেকে খুব নিচু স্বরে সাড়া এল, “আসুন শাহরিয়ার ভাই”

শাহরিয়ার ভেতরে ঢুকে দেখল ইলা জানালার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জানালার কাঁচের প্রতিবিম্বে দেখা যাচ্ছে ইলার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। সে যে মাত্রই প্রচুর কেঁদেছে, তা স্পষ্ট। শাহরিয়ারের মনটা খচখচ করে উঠল। সে লাগেজটা একপাশে রেখে বিচলিত কণ্ঠে প্রশ্ন করল
শাহরিয়ারঃ- ম্যাম… কী হয়েছে? হঠাৎ এভাবে কান্না করছেন কেন?
ইলা চোখ মুছে কোনোমতে বলল
ইলাঃ- কিছু না শাহরিয়ার ভাই আপনি কেন এসেছেন?
শাহরিয়ারঃ- ম্যাম প্লিজ কিছু লুকাবেন না। বাজারে ওই জুয়েলারি শপ থেকে ফেরার পর থেকেই আপনি এমন করছেন। আমি কি কোনোভাবে আপনাকে কষ্ট দিয়েছি? আমার কোনো আচরণে কি আপনি বিরক্ত?
ইলা এবার শাহরিয়ারের দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখের বাঁধ ভেঙে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। সে কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় বলল

ইলাঃ- না শাহরিয়ার ভাই আপনি কেন কষ্ট দেবেন? আসলে ওই দোকানে একটা আংটি দেখছিলাম। ঠিক ওরকম একটা আংটি আরিয়ান আমাকে দিতে চেয়েছিল। আজ আংটিটা দেখে আরিয়ানের কথা মনে পড়ে গেলো। বাজার থেকে ফেরার সময় প্রতিটি মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল আরিয়ান বুঝি আমার পাশে হাঁটছে। আমার শুধু আরিয়ানের কথা মনে পড়ে গেল শাহরিয়ার ভাই… আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
শাহরিয়ার স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে জানে এই ক্ষতটা কোনো মলমে সারবে না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে আনা সেই লাগেজটা এগিয়ে দিলো।

শাহরিয়ারঃ- ম্যাম, আরিয়ান স্যার আপনার জন্য শুধু এই বাড়িটা রেখে যাননি। আজ এই লাগেজটা খোলার সময় এসেছে। স্যার বলেছিলেন আপনি যখন খুব একা বোধ করবেন, তখন যেন আমি এটা আপনাকে দিই।
ইলা কৌতূহলী চোখে লাগেজের দিকে তাকাল। শাহরিয়ার লাগেজটা খুলতেই ইলা দেখল ভেতরে থরে থরে সাজানো ছোট-বড় অনেকগুলো গিফট বক্স।প্রতিটার ওপরে তারিখ লেখা।
শাহরিয়ারঃ- আরিয়ান স্যার এক বছর আগে থেকে এই সব গিফট কিনে রেখেছে। ওই জুয়েলারি শপে আপনি যা খুঁজছিলেন, হয়তো তার চেয়েও সুন্দর কিছু এই বক্সে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
ইলা হাত দিয়ে গিফট বক্সগুলো স্পর্শ করল। তার মনে হলো আরিয়ান নেই তাতে কী? তার ভালোবাসা তো প্রতিটি নিশ্বাসে, প্রতিটি উপহারে বেঁচে আছে।
ইলাঃ- (ফিসফিস করে) আপনি আসলেই একটা জাদুকর ছিলেন ভয়েজ কিং। কোনো ভাবেই আমাকে একা হতে দিচ্ছেন না।
শাহরিয়ার রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলল
শাহরিয়ারঃ- ম্যাম আরিয়ান স্যার চেয়েছিলেন আপনি সবসময় হাসুন। ওনার উপহারগুলোর অমর্যাদা করবেন না প্লিজ।

অন্যদিকে,
মেহেরাব খানরা এখন অনেকটা শান্ত। তারা বুঝতে পেরেছেন, জোর করে ইলাকে ফিরিয়ে আনা মানে তাকে আরও দূরে ঠেলে দেওয়া। অন্তত ইলা আর তার অনাগত সন্তান যে নিরাপদ আছে, এই স্বস্তিটুকু নিয়েই তারা দিন পার করছেন।
রাশেদ তালুকদার, সাবিহা বেগম, রায়েদ সবাই দিনাজপুর ফিরে গেছে, আদিব আর পরিও তাদের বাড়ি চলে গেছে। নাফিযা বেগম ছেলের ছেলের বউ এর শকে চুপ হয়ে গেছে তারা দুইজন আবার যে যার প্রফেশনে ফিরে গেছে।
যাওয়ার আগে বাজার থেকে আনা লাগেজটা শাহরিয়ার আলতো করে ইলার পায়ের কাছে এগিয়ে দিল। ইলা বিস্ময় নিয়ে তাকালো শাহারিয়ার চোখের ইশারায় লাগেজটা খুলতে বলল ইলা তার কথা মত সেটা করলো কিন্তু চেইনটা খুলতেই ইলার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
লাগেজের ভেতর মখমলের ছোট-বড় অসংখ্য বক্স।প্রতিটি বক্সে বাজারের সেই জুয়েলারি শপের দামী দামী গয়না আংটি, ব্রেসলেট, কানের দুল আর গলার হারের এক বিশাল সমারোহ।ইলা অবাক হয়ে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল। তার কান্নার রেশ তখনো কাটেনি।
ইলাঃ- শাহরিয়ার ভাই, এতো কিছু আপনি ওই দোকানের সব গয়না নিয়ে এসেছেন? কিন্তু কেন?
শাহরিয়ার একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাল। তার সুঠাম দেহের সেই কঠোর অফিসার ভাবমূর্তি এখন যেন এক সরল বড় ভাইয়ের আদলে ঢাকা পড়ে গেছে।
শাহরিয়ারঃ- আসলে ম্যাম মানে আপনি দোকানে ঢোকার সময় যে হাসিটা দিয়েছিলেন, সেটা বেরিয়ে আসার সময় একদম উধাও হয়ে গিয়েছিল।আমি দূর থেকে দেখছিলাম আপনার কোন জিনিসটা পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আপনি যখন ম্লান মুখে বেরিয়ে এলেন, আমি কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম। তাই ভাবলাম রিস্ক না নিয়ে দোকানের সব ভালো কালেকশনই নিয়ে আসি।

ইলা স্তব্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। এই মানুষটা তার চোখের এক ফোঁটা জল আটকানোর জন্য পুরো একটা দোকান তুলে নিয়ে এসেছে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
ইলাঃ- তাই বলে এতো কিছু? এতো কিছুর তো দরকার ছিল না ভাই। আর তাছাড়া বিধবাদের সাজতে নেই। সমাজ এসব দেখে খারাপ বলবে। লোকে বলবে স্বামীর শোক ভুলে গয়না নিয়ে মেতেছে।
ইলার গলায় একরাশ বিষণ্ণতা। শাহরিয়ারের চোয়াল এবার শক্ত হলো। সে ধীর পায়ে ইলার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এক গভীর মমতা আর অধিকারবোধ।

শাহরিয়ারঃ- কে বিধবা আর কোন সমাজের কথা বলছেন আপনি? আরিয়ান স্যার আপনাকে যে ভালোবাসা দিয়ে গেছেন, তার কোনো মৃত্যু নেই। আর লোকে কী বলবে, তা দেখার দায়িত্ব আমার। আমি তো আমার বোনের এই ছোট্ট একটা আবদার পূরণ করতে চেয়েছি। এতে অন্যায়ের কী আছে?
ইলা হঠাৎ থেমে গেল শাহরিয়ারের মুখে ‘বোন’ শব্দটা শুনে তার হৃদয়ের এক কোণে উষ্ণতা অনুভব করল সে। সে একটু দুষ্টুমিভরা চোখে শাহরিয়ারের দিকে তাকিয়ে বলল
ইলাঃ- আচ্ছা শাহরিয়ার ভাই, আপনি যদি সত্যিই আমাকে নিজের ছোট বোন মনে করেন, তবে এই ‘ম্যাম-ম্যাম’ করাটা কি ঠিক? ছোট বোনকে বুঝি কেউ ‘ম্যাম’ বলে ডাকে? আর আপনি আপনি করে দূরত্ব বজায় রাখে?
শাহরিয়ার এবার সত্যিই থতমত খেয়ে গেল। সে অভ্যাসবশত সব সময় ইলাকে সম্মান দিয়ে কথা বলে এসেছে। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল

শাহরিয়ারঃ- না… মানে… ম্যাম ওটা তো অভ্যাসে হয়ে গেছে। তাছাড়া আপনি আরিয়ান স্যারের স্ত্রী।
ইলা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল
ইলাঃ- আবার ম্যাম খবরদার এরপর যদি একবারও ম্যাম বা আপনি বলেছেন, তবে আমি কিন্তু এই গয়নাগুলোতে হাতও দেব না। বোনের আদর পেতে হলে আগে বড় ভাইয়ের মতো শাসন আর ভালোবাসা দিতে শিখুন।
শাহরিয়ার এবার হা হা করে হেসে উঠল। সেই মনখোলা হাসি যা পাহাড়ের নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে গেল। সে একটু সময় নিয়ে নরম গলায় বলল

শাহরিয়ারঃ- আচ্ছা রে বাবা, মাফ করে দে। আজ থেকে আর ম্যাম বলবো না। তুই তো আমার সেই ছোট্ট বোন, যাকে আগলে রাখা এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্রত। এবার খুশি তো?
ইলা হাসিমুখে মাথা নাড়ল। এই প্রথম আরিয়ানের চলে যাওয়ার পর তার মনে হলো, সে সত্যিই একা নয়। তার মাথার ওপর এক বটবৃক্ষের মতো বড় ভাই আছে।শাহরিয়ার ইলার মাথায় হাত রেখে দোয়া করে বলল
শাহরিয়ারঃ- এই গয়নাগুলো আরিয়ান স্যার থাকলে তোকে নিজ হাতে পরাতেন। উনি নেই বলে কী হয়েছে? তোর খুশিতেই ওনার আত্মা শান্তি পাবে। তুই একটু সেজেগুজে থাকলে পাহাড়ের এই নির্জনতাও আনন্দময় হয়ে উঠবে। যা এবার ফ্রেশ হয়ে আয়। তোর প্রিয় কফি বানাচ্ছি আমি।
ইলা গয়নার বাক্সগুলো হাতে নিয়ে আরিয়ান কে কল্পনা করলো তার মনে হলো আরিয়ানও যেন মুচকি হাসছে আর বলছে,
“দেখেছ ইলাফুল? শাহরিয়ারকে পাঠিয়ে আমি ঠিক করেছি না?”

Big Time skip….
দেখতে দেখতে ‘ইলারিয়ান এর স্বপ্নবাগান’ এ সময়ের চাকা আরও পাঁচ মাস ঘুরে গেল। এখন ইলার প্রতিটি দিন কাটে এক অদ্ভুত শিহরণে। তার শরীরে বেড়ে উঠছে আরিয়ানের প্রতিচ্ছবি, তাদের ভালোবাসার শেষ চিহ্ন। পাঁচ মাসের সেই ছোট্ট প্রাণটি এখন মাঝে মাঝেই জানান দেয় তার অস্তিত্বের।
সকালবেলা রোদেলা বারান্দায় বসে ইলা যখন উল দিয়ে ছোট ছোট মোজা বুনছিল, হঠাৎ সে অনুভব করল পেটের ভেতর এক হালকা ধাক্কা। ইলার চোখমুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে উত্তেজনায় পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা শাহরিয়ারকে ডেকে উঠল
ইলাঃ- ভাইয়া…ভাইয়া জলদি এদিকে আসো দেখো বেবিটা কিক করছে।
শাহরিয়ার হাতের ল্যাপটপ রেখে দ্রুত এগিয়ে এল।তার চোখেমুখেও এক অনন্য আনন্দ। সে ইলার পাশে বসে একটু নিচু হয়ে পরম মমতায় ইলার পেটের দিকে তাকাল। যদিও সে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে সংকোচ বোধ করছিল, কিন্তু তার খুশিতে ভরা মুখই বলে দিচ্ছিল সে কতটা আনন্দিত।
শাহরিয়ারঃ- সত্যি রে বনু ও কি সত্যিই নড়াচড়া করছে?

ইলা শাহরিয়ারের হাতটা টেনে ধরে পেটের ওপর রাখল।শাহরিয়ার অনুভব করল সেই জীবনের স্পন্দন। আরিয়ানের সেই বীর রক্ত এখন এক নতুন প্রাণের ধুকপুকানিতে রূপ নিয়েছে।ইলা শাহরিয়ার এর হাত ধরেই বলল
ইলাঃ- এইযে পিচ্ছি সোনা দেখ তোর মামা তোকে খুজতে এসেছে
শাহরিয়ারের চোখ ভিজে এল। সে মনে মনে বলল
“দেখুন স্যার আপনার ছোট আরিয়ান বা ছোট ইলাফুল আমাদের মাঝে আসার জন্য কতটা ছটফট করছে। আমি কথা দিচ্ছি ওকে এই পৃথিবীর সবটুকু সুন্দর পরিবেশে রাখবো।
শাহরিয়ার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক চিলতে হেসে বলল
শাহরিয়ারঃ- এই তো আর কয়েকটা মাস, তারপর সারা বাড়ি এই ছোট মানুষের কান্নায় আর হাসিতে ভরে উঠবে। তুই চিন্তা করিস না বনু আমি আরিয়ান স্যার এর মত না পারলেও নিজের মতো ওকে সবটুকু দিয়ে আগলে রাখব।
ইলা ম্লান হাসল সে জানে শাহরিয়ার পাশে আছে বলেই আজ সে এই সুন্দর মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে পারছে।কিন্তু দিনের আলো ফুরিয়ে যখন রাতের অন্ধকার পাহাড়ের গায়ে জেঁকে বসে,তখন ইলার চারপাশটা আবার শূন্যতায় ভরে যায়।।

রাত তখন গভীর শাহরিয়ার নিজের ঘরে ল্যাপটপে অফিসের কিছু কাজ সারছিল। হঠাৎ তার কানে এল পাশের ঘর থেকে চাপা কান্নার শব্দ।সে নিঃশব্দে উঠে গিয়ে ইলার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল।
ভেতরে ইলা আরিয়ানের একটা ইউনিফর্ম জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে আছে। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর ইউনিফর্মের গন্ধ শুঁকছে।
ইলাঃ- (কান্নাজড়িত কণ্ঠে) ভয়েজ কিং, আপনি তো বলেছিলেন আমাদের বাচ্চা হলে আপনি ওকে কোলে নিয়ে সারা বাগান ঘুরে বেড়াবেন। ওকে ফুটবল খেলা শেখাবেন। আজ আপনার বাচ্চাটা আমাকে কিক করে আপনাকে খুঁজছে… আমি কী জবাব দেব ওকে? কেন আপনি আমাকে এইভাবে একা রেখে চলে গেলেন?

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬২

ইলার এই বুকফাটা কান্না শাহরিয়ারের পাথর হৃদয়টাকেও চিরে ফেলছিল। সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে সে হাজার চেষ্টা করলেও আরিয়ানের অভাব পূরণ করতে পারবে না এই একাকীত্ব কেবল ইলার একার।
শাহরিয়ার মনে মনে বলল
“দুঃখিত বনু তোকে সব সুখ দিলেও আমি তোর ভয়েজ কিং-কে ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু কথা দিচ্ছি এই অনাগত প্রাণের জন্য আমি নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ব।”

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৪