ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৪
ছায়া
সিলেটের পাহাড়ে এখন বর্ষার আগাম মেঘেদের আনাগোনা।ডালিয়া আর ল্যাভেন্ডারের সুবাস ছাপিয়ে ভেজা মাটির একটা সোঁদা গন্ধ বাংলোর প্রতিটি কোণে মিশে আছে।ইলার প্রেগন্যান্সির এখন সপ্তম মাস চলছে।শরীরটা আগের চেয়ে অনেকটা ভারী হয়েছে, হাঁটাচলা করতেও এখন হাঁপিয়ে ওঠে সে। কিন্তু শরীরের এই পরিবর্তনের চেয়েও বড় পরিবর্তন এসেছে তার মনে। হরমোনের খেলায় ইলা যেন এক অন্য মানুষ।এই সে হাসছে, পরক্ষণেই তুচ্ছ কারণে তার দুচোখ বেয়ে শ্রাবণ নামে।
নতুন প্রাণের স্পন্দন, পুরনো শূন্যতা
সকালবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইলা নিজের প্রতিবিম্ব দেখছিল। ঢিলেঢালা মেক্সির ওপর দিয়ে তার স্ফীত উদরটি স্পষ্ট। পেটের ওপর হাত রাখতেই ভেতরে আবার সেই চেনা আলোড়ন একটু জোরেই আজ কিক করল ছোট্ট প্রাণটি। ইলার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলেও মুহূর্তেই তা মিলিয়ে গেল।ইলা বিড়বিড় করে বলল,
> “আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন ভয়েজ কিং? আপনার ইলাফুল আজ কতটা বদলে গেছে? কিন্তু এই বদলটা দেখার জন্য তো আপনি পাশে নেই।”>
হঠাৎ করেই এক অজানা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করল। সে আয়না থেকে সরে এসে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। তার মনে হলো, সে কি পারবে? একা একাই কি এই বিশাল দায়িত্ব পালন করতে পারবে? যদি সে ঠিকমতো মা হতে না পারে? যদি সে তার সন্তানকে আরিয়ানের মতো সাহসী করে গড়ে তুলতে না পারে? দুশ্চিন্তায় তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো।
নিচে ড্রয়িং রুমে শাহরিয়ার তখন একমনে ল্যাপটপে ডাটা এন্ট্রি করছিল। উপর থেকে ইলার দ্রুত নিশ্বাসের শব্দ আর অস্ফুট কান্নার আওয়াজ তার কানে পৌঁছাতেই সে এক সেকেন্ড দেরি করল না। সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উঠে এসে ইলার ঘরের দরজায় নক করল।
শাহরিয়ারঃ- বনু? কী হয়েছে? ভেতরে আসব?
ইলা কোনোমতে বলল,
ইলাঃ- ভাইয়া আমার খুব ভয় করছে। আমি মনে হয় নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।”
শাহরিয়ার দ্রুত ভেতরে ঢুকে জানলাগুলো সব খুলে দিল। সে ইলার পাশে বসে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
শাহরিয়ারঃ- শান্ত হ বনু লম্বা লম্বা শ্বাস নে দেখ, আমি আছি তো। ডাক্তার বলেছেন এই সময়টা একটু ভয় বা টেনশন হওয়া স্বাভাবিক। এটাকে ‘মুড সুইং’ বলে। তুই এক মুহূর্তের জন্যও ভাববি না যে তুই একা।
ইলা শাহরিয়ারের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
ইলাঃ- ভাইয়া আমি যদি বাচ্চাটাকে ঠিকমতো বড় করতে না পারি? আরিয়ান থাকলে হয়তো সব সহজ হতো। আমি খুব দুর্বল হয়ে পড়ছি ভাইয়া।
শাহরিয়ারের চোখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল। সে ইলার মাথায় হাত রেখে বলল,
শাহরিয়ারঃ- তুই দুর্বল নোস বনু। তুই একজন বীর অফিসারের স্ত্রী এবং একজন ভবিষ্যৎ বীরের সন্তানের মা। আরিয়ান স্যার তোকে এই দায়িত্ব দিয়ে গেছেন কারণ তিনি জানতেন তুই এটা পারবি। আর আমি? আমি তো তোর ছায়া হয়ে আছি। আমার শেষ নিশ্বাস থাকা পর্যন্ত তোদের কোনো অযত্ন হতে দেব না।”
Time Skip….
ভিডিও কনসাল্টেশন ও চিকিৎসকের পরামর্শ
বিকেলের দিকে ইলার অস্থিরতা কিছুটা কমলে শাহরিয়ার তার ল্যাপটপ নিয়ে এল। সে আগে থেকেই ঢাকার একজন নামী গাইনোকোলজিস্টের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করে রেখেছিল। ভিডিও কল কানেক্ট হতেই ওপাশে ডাক্তার হাসিমুখে ভেসে উঠলেন।
ডাক্তারঃ- কেমন আছো ইলা? শাহরিয়ার তো আমাকে সব জানাল। এই সময়টা একটু বেশি ইমোশনাল হওয়াটাই স্বাভাবিক। তোমার হরমোনাল চেঞ্জ হচ্ছে, তাই হুটহাট কান্না বা রাগ আসতে পারে।
ইলা নিচু স্বরে বলল,
ইলাঃ- ম্যাম, মাঝে মাঝে মনে হয় আমি সব সামলাতে পারব না।”
ডাক্তার অভয় দিয়ে বললেন,
ডাক্তারঃ- একদম এসব ভাববে না। শাহরিয়ার আমাকে তোমার ডায়েট আর এক্সারসাইজ চার্ট পাঠিয়েছে, ওটা একদম পারফেক্ট। তুমি শুধু খুশি থাকার চেষ্টা করো। মনে রাখবে, তোমার মনের ওপর বাচ্চার মানসিক গঠন নির্ভর করে। তুমি যদি কাঁদো, তবে ও-ও ভেতরে কষ্ট পাবে। তুমি কি চাও তোমার সন্তান জন্ম থেকেই বিষণ্ণ থাকুক?”
ইলা দ্রুত মাথা নাড়ল না, সে তা চায় না। সে চায় তার সন্তান যেন পাহাড়ের মতো অটল আর আরিয়ানের মতো প্রাণবন্ত হয়। ডাক্তার এর সাথে কথা বলে ইলা কিছুটা সুস্থ হয়েছে এখন। সন্ধ্যা টা ইলার শাহরিয়ার এর সাথে গল্প করে কাটলো। ডিনার শেষে ইলা ঘুমোতে চলে গেলো।
রাত বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টির বেগ বাড়ল। শাহরিয়ার ইলার জন্য গরম দুধ আর কিছু ফল নিয়ে এল। ইলা তখন আরিয়ানের সেই উপহার দেওয়া ডায়েরিটা পড়ছিল। ডায়েরির পাতায় আরিয়ানের হাতের লেখায় ছোট ছোট অনেকগুলো উপদেশ লেখা ছিল অনাগত সন্তানের জন্য।একটি পাতায় লেখা ছিল:
> “যদি আমি না থাকি, তবে আমাদের সন্তানকে বলো তার বাবা তাকে আকাশ থেকে তারা হয়ে দেখছে। সে যেন কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে।”>
ইলা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।শাহরিয়ার দুধের গ্লাসটা টি-টেবিলে রেখে বলল,
শাহরিয়ারঃ- বনু, আজ রাতের আকাশটা খুব সুন্দর। বৃষ্টি কমলে কাল সকালে আমরা বাগানে একটু হাঁটব। আরিয়ান স্যারের লাগানো সেই নীল ফুলগুলো ফুটেছে, দেখিস তোর মন ভালো হয়ে যাবে।”
ইলা ম্লান হেসে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল। এই মানুষটা নিজের জীবন তুচ্ছ করে তার এই পাগলামিগুলো সয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারে, শাহরিয়ারের বুকের ভেতরও একটা হাহাকার আছে তার আইডল কে হারানোর শোক, কিন্তু সে সব কিছু আড়াল করে ইলার জন্য এক শক্ত দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ইলা মনে মনে বলল,
“ভয়েজ কিং আপনি হয়তো নেই, কিন্তু আপনার পাঠানো এই মানুষটা আমাকে প্রতি মুহূর্তে বাঁচিয়ে রাখছে। আমি হার মানব না। আপনার অনাগত স্বপ্নের জন্য আমি লড়ে যাব।”
বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। পাহাড়ের নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে বাগানের গাছগুলো যেন মাথা দুলিয়ে ইলাকে বলছে,
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
পাহাড়ের ওপারে রূপালি চাঁদটা যেন শান্ত পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাংলোর চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর হিমেল হাওয়ার মৃদু শিহরণ। ইলা বিছানা থেকে উঠে বারান্দার ইজি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসলো। হঠাৎ করেই সে অনুভব করল পেটের একদম মাঝ বরাবর একটা তীব্র এবং জোরালো ধাক্কা। আগের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। ইলার পুরো শরীর যেন এক অদ্ভুত বিদ্যুতিক তরঙ্গে কেঁপে উঠল।
সে দুই হাত দিয়ে নিজের পেটটা আলতো করে জড়িয়ে ধরল। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনা জল। কিন্তু এই কান্না দুঃখের নয়, এ যেন এক পরম প্রাপ্তির।ইলা ধরা গলায় পেটের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল
> “কী রে সোনা?তুইও কি তোর আব্বুর মতো খুব জেদী হয়েছিস? অতো জোরে কেন কিক করলি? তোর আব্বু যখন রেগে যেত, তখন ওনার গলার স্বরটাও ঠিক এই কিকের মতোই জোরালো শোনাত।”>
ইলা থামল না সে যেন তার অনাগত সন্তানের মাঝে আরিয়ানকে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। সে আবার বলতে শুরু করল
> “জাসিস সোনা, তোর আব্বু খুব সাহসী ছিল। অনেক মানুষ তাকে ‘ভয়েজ কিং’ নামে চিনত। যখন উনি কথা বলতেন, তখন অন্যায়কারীরা ভয়ে কাঁপত। তুই কি ওর মতো হবি?”>
শাহরিয়ার তখন ইলার রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। ইলার এই আকুতিভরা কথাগুলো তার কানে যেতেই সে থমকে গেল। সে ভেতরে ঢুকল না। দরজার কপাটে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে।
ইলার অঝোর কান্না আর বাচ্চার সাথে তার এই কাল্পনিক কথোপকথন শাহরিয়ারের ভেতরের পাথরপ্রতিম মানুষটাকে চুরমার করে দিচ্ছিল। যে শাহরিয়ার শত্রুর বুলেটের সামনেও চোখের পলক ফেলে না, আজ এক মহিলার আর্তনাদে তার চোখের কার্নিশ ভিজে উঠছে।সে শুনতে পেল ইলা ডুকরে কেঁদে বলছে
> “ভয়েজ কিং… দেখো তোমার বাচ্চা আমাকে জ্বালাচ্ছে। তুমি থাকলে কি আজ আমাকে একা একা কাঁদতে দিতে? তুমি তো বলতে, ইলাফুলের চোখে জল মানে তোমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। আজ কেন আসছো না তুমি?”>
শাহরিয়ার নিজের চোখের জল মুছে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, সে ইলার জন্য নিজের জীবন দিয়ে দিলেও আরিয়ানের অভাব পূরণ করতে পারবে না। ‘ভয়েজ কিং’ এর জায়গা এই মহাবিশ্বে আর কেউ নিতে পারবে না। সে কেবল একজন সারথি মাত্র রাত কেটে গেলো।
পরদিন সকালে শাহরিয়ার খুব ভোরে একবার পাহাড়ের নিচের বাজারে গেল। ঘণ্টাখানেক পর যখন ফিরল, তার হাতে একটা কালো প্যাকেট।
ইলা তখন ড্রয়িং রুমে বসে ছিল। শাহরিয়ার গিয়ে নিঃশব্দে প্যাকেটের ভেতর থেকে একটা ছোট কালো-সাদা চামড়ার ফুটবল বের করল। সে ওটা ধীর পায়ে গিয়ে ইলার পাশের ছোট টেবিলটায় রাখল।
ইলা অবাক হয়ে তাকাল। শাহরিয়ারের মুখটা আজ খুব ম্লান, কিন্তু চোখে এক গভীর মমতা।
শাহরিয়ার শান্ত গলায় বলল
শাহরিয়ারঃ- কাল রাতে ও যখন কিক করছিল, তখন তোর কথাগুলো আড়াল থেকে শুনেছিলাম বনু।তাই আজই ওর জন্য প্রথম ফুটবলটা কিনে আনলাম।”>
ইলা ফুটবলের ওপর হাত রাখল। শাহরিয়ার তখন অন্যদিকে তাকিয়ে নিজের আবেগ সামলানোর চেষ্টা করছিল। সে আবার বলল
শাহরিয়ারঃ- তোর ভয়েজ কিং-এর জায়গা নেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই রে। কিন্তু তোর এই ভাইটা কথা দিচ্ছে, ছোট আরিয়ান বা ইলাফুলকে এই পৃথিবীতে আনার জন্য আর মানুষের মতো মানুষ করার জন্য সে নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।”>
ইলা দেখল শাহরিয়ারের কণ্ঠস্বর কিছুটা কাঁপছে। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা নিঃশব্দে কতটা ভার বয়ে বেড়াচ্ছে। ইলা শুধু এটুকুই বলতে পারল
ইলাঃ- ভাইয়া আরিয়ান তোমাকে শুধু নিজের সহকর্মী ভাবতেন না।>
শাহরিয়ার আর কোনো কথা না বলে দ্রুত কিচেনের দিকে চলে গেল। তার চোখে আবার জল জমছে। সে চায় না ইলা তার এই দুর্বলতা দেখুক। পাহাড়ের নির্জনতায় আজ আরিয়ান নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ভালোবাসা আর শাহরিয়ারের এই নীরব ত্যাগ ইলাকে এক নতুন জীবনের পথে এগিয়ে দিচ্ছে।
সিলেটের বাংলোতে এখন দিনরাত এক অদ্ভুত সতর্কতার চাদরে ঢাকা। ইলার প্রেগন্যান্সির সাত মাস পার হয়ে আট মাসে পা দিয়েছে। এই সময়টাতেই শাহরিয়ারের আচরণে এক আমূল পরিবর্তন এল। সে যেন এখন আর সাধারণ কোনো দেহরক্ষী বা বড় ভাই নয়, সে যেন এক অতন্দ্র প্রহরী যার চোখের পলক ফেলাও বারণ।
সকালবেলা ইলা তৈরি হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে যাচ্ছিল। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল শাহরিয়ার। তার পরনে কালো টি-শার্ট, চোখে ক্লান্তি কিন্তু চোয়াল শক্ত।
শাহরিয়ারঃ- বনু, কোথায় যাচ্ছিস?
ইলাঃ- নিচে যাচ্ছি ভাইয়া, বাগানে একটু হাঁটব।
শাহরিয়ারঃ- একদম না সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা এখন তোর জন্য রিস্কি। তুই রুমে থাক আমি নিচে থেকে নাস্তা নিয়ে আসছি।
ইলা অবাক হয়ে বলল,
ইলাঃ- কিন্তু ভাইয়া ডাক্তার তো বলেছেন অল্প হাঁটাহাঁটি করা ভালো।
শাহরিয়ার সোজাসুজি উত্তর দিল,
শাহরিয়ারঃ- হাঁটাহাঁটি বারান্দায় কর সিঁড়িতে পা পিছলে যেতে পারে। আমি কোনো ঝুঁকি নিতে পারব না।
শুধু তাই নয় বিকেলে ইলা যখন একটু বাইরের তাজা বাতাস পেতে বাইরে শাহরিয়ার সাফ মানা করে দিল। ইলাকে গেটের বাইরে এক পা-ও দিতে দেয় না। এমনকি রাতেও শাহরিয়ার নিজের ঘরে না ঘুমিয়ে ইলার দরজার বাইরে একটা ছোট সোফায় বসে থাকে।সামান্যতম শব্দ হলেই সে সতর্ক হয়ে দরজায় নক করে।
কিন্তু টানা কয়েকদিনের এই ‘অতিরিক্ত’ সুরক্ষায় ইলার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে তার মেজাজও আজ খিটখিটে। বিকেলে শাহরিয়ার যখন আবার এক গ্লাস ফলের রস নিয়ে রুমে ঢুকল, ইলা গ্লাসটা সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল।
ইলাঃ- থামো তো ভাইয়া তুমি কি আমাকে কয়েদি বানিয়ে ফেলেছ? আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারব না, আমি বাগানে যেতে পারব না, আমি বাজারে যেতে পারব না! আমি কি ছোট বাচ্চা?
শাহরিয়ার শান্ত গলায় বলল,
শাহরিয়ারঃ- বনু তোর শরীরটাও এখন ভারি…”
ইলা কথা কেড়ে নিয়ে রাগে ফেটে পড়ল,
ইলাঃ- আমি বন্দি নই ভাইয়া!তুমি আরিয়ানের আমানত রক্ষা করছো নাকি আমাকে জেলখানায় রাখছো? আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে তোমার এই শাসনে।
শাহরিয়ার স্তব্ধ হয়ে গেল। ইলার এই রূঢ় কথাগুলো তীরের মতো তার বুকে বিঁধল। সে হাতের গ্লাসটা ধীর পায়ে টেবিলে রাখল। তার হাতদুটো কাঁপছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে মাথা নিচু করে খুব নিচু স্বরে বলল
শাহরিয়ারঃ- আমি জানি রে বনু আমি হয়তো একটু বেশি করছি। কিন্তু কী করব বল? আমি তোকে হারানোর ভয় পাই…”>
ইলা থামল শাহরিয়ারের গলার স্বর ভারী হয়ে এসেছে। সে মুখ তুলে ইলার দিকে তাকাল, তার চোখ দুটো টলমল করছে।
শাহরিয়ারঃ- “আরিয়ান স্যার চলে যাওয়ার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে একটা কথাই বলেছিলেন ‘শাহরিয়ার, আমার ইলাফুলকে দেখে রাখিস ভাই’ আমি আমার ভাইকে হারিয়েছি, আমার আইডল কে হারিয়েছি। এখন যদি তোকে বা তোর বা ওই ছোট সন্তানের কিছু হয়, আমি কাকে মুখ দেখাব বল? আমার যে আর কেউ নেই রে বনু। এতিমখানায় বড় হওয়া এই ছেলেটার কাছে তুই-ই এখন একমাত্র পরিবার।”
শাহরিয়ারের গলার আওয়াজ ভেঙে গেল। সে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করল। ইলার ভেতরের সব রাগ এক মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, শাহরিয়ারের এই কঠোরতা আসলে তার গভীর ভালোবাসারই অন্য এক রূপ। ইলা ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে শাহরিয়ারের পাশে দাঁড়াল। তার কাঁধে হাত রেখে পরম মমতায় বলল
ইলাঃ- মাফ করে দাও ভাইয়া। আমি বুঝতে পারিনি তুমি কতটা দুশ্চিন্তা করছো। আমি সত্যিই তোমার একমাত্র বোন, আর বড় ভাইয়ের তো অধিকার আছেই বোনকে শাসন করার।
শাহরিয়ার এবার ইলার দিকে ঘুরে তাকাল। ইলা মুচকি হেসে বলল,
ইলাঃ- ঠিক আছে আমি সিঁড়ি দিয়ে নামব না। কিন্তু কাল সকালে আমাকে একবার বাগানের ওই নীল ফুলগুলোর কাছে নিয়ে যেতে হবে। তুমি সাথে থাকলে তো আর ভয় নেই, তাই না?”
শাহরিয়ার একটু হাসল এই হাসিতে ছিল স্বস্তি। সে ইলার মাথায় হাত রেখে দোয়া করল।
শাহরিয়ারঃ- তুই নাস্তা কর আমি তোর জন্য কফি বানাচ্ছি।
Time Skip….
দিনগুলো ক্যালেন্ডারের পাতা ছিঁড়ে দ্রুতবেগে ছুটছে, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ইলার পেটের আয়তন এবং ভেতরের সেই ছোট্ট প্রাণের চঞ্চলতা। বাংলোর নিস্তব্ধতা এখন এক আসন্ন উৎসবের প্রস্তুতিতে মুখর।
বিকেলের নরম রোদে বারান্দায় বসে ইলা একমনে নীল রঙের উল দিয়ে একটি ছোট্ট সোয়েটার বুনছে। মাঝেমধ্যেই সে বুনন থামিয়ে পেটের ওপর হাত রাখছে। তার চোখের কোণে জল চিকচিক করে ওঠে যখন সে ভাবে এই সোয়েটারটা পরিয়ে যখন বাবুকে কোলে নেবে, তখন পাশে আরিয়ান থাকবে না। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নেয়, নিজেকে শান্তনা দেয় আরিয়ানের অংশ তো তার ভেতরেই বড় হচ্ছে।
ড্রয়িং রুমে এখন আর শুধু বন্দুক আর জ্যামার নেই। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে একটি সুন্দর সাদা রঙের বেবি দোলনা। শাহরিয়ার নিজ হাতে সেটা সেট করেছে। দোলনার ওপর ঝুলছে ছোট ছোট রঙিন প্লাস্টিকের তারা আর চাঁদ। বাতাস লাগলে সেগুলো টুংটাং শব্দ করে বাজছে, যেন আগাম কোনো দেবদূতকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।
ইলার ঘরের এক পাশের দেয়ালে এখন ছোট ছোট কার্টুন স্টিকার আর পশুপাখির ছবি লাগানো হয়েছে। ইলা নিজেই আলমারির একটি পুরো ড্রয়ার খালি করে সেখানে পুতুলের মতো ছোট ছোট সুতির জামা, মোজা আর টুপি সারি সারি করে সাজিয়ে রেখেছে। প্রতিটি জামা হাতে নেওয়ার সময় সে যেন আরিয়ানের গায়ের গন্ধ পায়।
সবচেয়ে অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে শাহরিয়ারের মধ্যে। ল্যাপটপে অফিসের কাজের চেয়ে এখন তার ব্রাউজিং হিস্ট্রিতে বেশি থাকে
“How to hold a newborn baby,”
“What to do if a baby cries at night,” “Best baby massage oil.”
ইউটিউব চালিয়ে সে খুব মন দিয়ে দেখছে কীভাবে ডায়াপার পরাতে হয় বা ছোট বাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে গ্যাস বের করতে হয়। তার গম্ভীর মুখে তখন এক অদ্ভুত একাগ্রতা থাকে, যেন সে কোনো কঠিন সামরিক মিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এক রাতে ইলা দেখল শাহরিয়ার বারান্দায় বসে খুব মন দিয়ে একটা ছোট বেবি ব্ল্যাঙ্কেট ভাঁজ করছে। ইলা ধীরে ধীরে পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
ইলাঃ- ভাইয়া, তুমি এসব কী করছো? এগুলো তো আমিই পারতাম।
শাহরিয়ার একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। সে ব্ল্যাঙ্কেটটা আলতো করে রেখে বলল
শাহরিয়ারঃ- পারতিস তো বটেই কিন্তু আমি ভাবলাম, স্যার তো নেই বাবু যখন আসবে তখন ওকে কোলে নেওয়ার প্রথম অধিকারটা তো উনারই ছিল। এখন সেই বদলি ডিউটিটা তো আমাকেই করতে হবে। তাই আগেভাগেই সব প্র্যাকটিস করে রাখছি। আমি চাই না আমার ভাগ্নে বা ভাগ্নি এসে দেখুক তার মামা একজন আনাড়ি লোক।”>
ইলা মুগ্ধ হয়ে শাহরিয়ারের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটা নিজের সবটুকু দিয়ে আরিয়ানের অভাব ঢাকতে চাইছে।
ইলাঃ- ভাইয়া, তুমি কি জানো? তুমি এখন পৃথিবীর সেরা মামা হওয়ার মিশনে আছো।
শাহরিয়ারের চোখ জোড়া ভিজে এল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল
> “স্যার, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনার ইলাফুল আর বেবি-কে আমি একদম রাজকীয় যত্নে রাখছি। শুধু দোয়া করবেন যেন শেষ পর্যন্ত এই দায়িত্বটা পালন করতে পারি।”>
Time Skip…
গুমোট গরমে বাতাসের নড়াচড়া নেই বললেই চলে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত থমথমে ভাবটা যেন বাংলোর ভেতরের পরিস্থিতির সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। ইলার প্রেগন্যান্সির এখন নবম মাস চলছে সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। কিন্তু গত দুদিন ধরে ইলার শরীরটা খুব একটা সায় দিচ্ছে না।
সকাল থেকেই ইলার রক্তচাপ ওঠানামা করছিল। শাহরিয়ার ডিজিটাল বিপি মেশিন দিয়ে মেপে দেখল রিডিংটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ উপরে। সে সময় নষ্ট না করে ভিডিও কলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করল। ডাক্তার সব শুনে বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন।
ডাক্তারঃ- শাহরিয়ার ইলার কন্ডিশন এখন মোটেও অবহেলা করার মতো নয়। ওর পায়ে এডোমা (ফোলা) বাড়ছে আর বিপি কন্ট্রোলে আসছে না। ওকে এখনই ‘কমপ্লিট বেড রেস্ট’ দিতে হবে। সামান্যতম উত্তেজনা বা হাঁটাচলাও এখন ওর আর বাচ্চার জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। খুব সাবধানে থাকুন যেকোনো সময় ইমার্জেন্সি হতে পারে।
ফোনটা রাখার পর শাহরিয়ারের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হলো। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটা একবার দেখল চোখের নিচে কালি পড়েছে, গত কয়েক রাত সে ঠিকমতো ঘুমায়নি। কিন্তু নিজের ক্লান্তিকে প্রশ্রয় দেওয়ার সময় এখন তার নেই। সে দ্রুত ইলার ঘরে ঢুকল।
ইলা বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ছিল। তার মুখটা ফ্যাকাশে, চোখের কোণে এক অজানা আতঙ্ক। শাহরিয়ারকে ঢুকতে দেখে সে ম্লান হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।
ইলাঃ- ভাইয়া,ডাক্তার কী বললেন? খুব খারাপ কিছু?
শাহরিয়ার হাসি মুখে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল।
শাহরিয়ারঃ- আরে না রে বনু ডাক্তার শুধু বলেছেন তুই খুব অলস হয়ে গেছিস, তাই এখন থেকে একদম নড়াচড়া বন্ধ। শুধু রানী ভিক্টোরিয়ার মতো শুয়ে থাকবি আর আমি তোর সেবা করব।
কিন্তু ইলা অবুঝ নয় সে শাহরিয়ারের চোখের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই সূক্ষ্ম আতঙ্কটা ধরে ফেলল। সে ধীর হাতে শাহরিয়ারের হাতটা শক্ত করে ধরল। শাহরিয়ার চমকে উঠল। ইলার হাতটা আজ বরফের মতো ঠান্ডা।
ইলাঃ- ভাইয়া, একটা কথা রাখবে?”
শাহরিয়ার ভ্রু কুঁচকে বলল,
শাহরিয়ারঃ- কী বলছিস এসব? অবশ্যই রাখব।
ইলা জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল
ইলাঃ- ভাইয়া, যদি ডেলিভারির সময় আমার কিছু হয়ে যায় যদি আমি আরিয়ান এর কাছে চলে যাই… তবে তুমি এই বাচ্চাটাকে আগলে রাখবে তো? ওকে তোমার নিজের সন্তানের মতো মানুষ করবে? ও যেন কখনো না বোঝে যে ওর মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই।”>
শাহরিয়ারের মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সে দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু ইলা আরও শক্ত করে ধরল।শাহরিয়ার চিৎকার করে উঠল,
শাহরিয়ারঃ- বনু চুপ কর একদম এসব আজেবাজে কথা বলবি না! তোকে ছাড়া এই বাংলো, এই বাগান সব শ্মশান হয়ে যাবে। আরিয়ান স্যার আমাকে তোকে রক্ষা করতে পাঠিয়েছেন, তোকে একা করে দিতে নয়।
ইলার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরছে। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল
ইলাঃ- আমি খুব ভয় পাচ্ছি ভাইয়া। আজ বারবার মনে হচ্ছে আরিয়ান আমাকে ডাকছে। কিন্তু আমি তো আমার বাবুকে পৃথিবীতে না এনে মরতে পারব না। তুমি কথা দাও ভাইয়া…আমার কিছু হলে তুমি ওকে ফেলে দেবে না তো?
শাহরিয়ার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ইলার পাশে বসে ওর মাথায় হাত রাখল। তার নিজের চোখ দিয়েও আজ নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। এই প্রথম ইলা তার সাহসী ‘ভাইয়া’কে কাঁদতে দেখল।
শাহরিয়ার ফিসফিস করে বলল
শাহরিয়ারঃ- আমি কথা দিচ্ছি বনু। যদি আকাশের তারা খসে পড়ে, যদি পৃথিবী উল্টে যায় তবুও তোর আর আরিয়ান স্যারের আমানতকে আমি নিজের বুকের ভেতর আগলে রাখব। কিন্তু তোকে কোথাও যেতে দেব না আমি। যমরাজ এলেও তাকে আগে আমার বুলেটের জবাব দিতে হবে।
সেই রাতে বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে শাহরিয়ার অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরটা এক অজানিত ঝড়ের আশঙ্কায় কাঁপছে। সে জানে, সামনের দিনগুলো হবে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।একদিকে ইলার জীবন,অন্যদিকে আরিয়ানের শেষ চিহ্ন।
দুইদিন পরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব শুরু হয়েছে। সেপ্টেম্বর এর চার তারিখ বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার শব্দে মনে হচ্ছে পাহাড়গুলো বুঝি এখনই ধসে পড়বে। কিন্তু বাংলোর ভেতরের ঝড়টা বাইরের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ভয়াবহ। রাত তখন আড়াইটা। ইলার ঘর থেকে হঠাৎ এক বুকফাঁটা আর্তনাদ ভেসে এল।
শাহরিয়ার তখন পাশের সোফায় আধো ঘুমে ছিল।আর্তনাদ শুনে সে এক লাফে উঠে দাঁড়াল।ঘরে ঢুকে দেখল ইলা বিছানার চাদর খামচে ধরে কুঁকড়ে আছে। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ইলাঃ- ভাইয়া… অসহ্য ব্যথা… আমার মনে হয় সময় হয়ে গেছে।
শাহরিয়ারের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।সে দ্রুত বিপি চেক করল রিডিং ডেঞ্জার জোন পার করে গেছে। সে জানত এই মুহূর্তটা আসবে, কিন্তু এত দ্রুত আর এমন প্রতিকূল পরিবেশে, সেটা সে ভাবেনি।শাহরিয়ার ধীরস্থির হওয়ার চেষ্টা করে বলল
শাহরিয়ারঃ- বনু ভয় পাস না আমি আছি। এখনই তোকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। তুই শুধু সাহস হারাস না।”
সে ইলাকে চাদরে পেঁচিয়ে পাজাকোলা করে নিচে নামিয়ে আনল। বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি। শাহরিয়ার ইলাকে পেছনের সিটে শুইয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসল। তার হাত আজ প্রথমবার স্টিয়ারিং ধরতে গিয়ে সামান্য কাঁপছে। এ এক অন্য লড়াই এখানে শত্রু দৃশ্যমান নয়, এখানে শত্রু সময় আর প্রকৃতি।
গাড়িটা বাংলোর গেট পেরিয়ে পাহাড়ের ঢালু রাস্তা দিয়ে নামতে শুরু করল। হেডলাইটের আলোয় দেখা যাচ্ছে বৃষ্টির ঝাপটায় সামনের রাস্তা প্রায় অদৃশ্য। হঠাৎ এক জায়গায় গিয়ে শাহরিয়ার কষে ব্রেক ধরল।
সামনে একটা বিশাল গাছ উপড়ে পড়ে রাস্তা পুরোপুরি ব্লক করে দিয়েছে। শাহরিয়ারের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল।পাশেই গভীর খাদ, অন্যপাশে পাহাড়। গাড়ি ঘুরিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এখন নেই।
শাহরিয়ার দাঁতে দাঁত চেপে গাড়ি রিভার্স করল।সে জানে একটা মাটির কাঁচা রাস্তা আছে যা দিয়ে মূল সড়কে ওঠা যায়। কিন্তু এই বৃষ্টিতে সেই রাস্তা এখন কর্দমাক্ত পিচ্ছিল মরণফাঁদ।পেছন থেকে ইলার গোঙানি শোনা যাচ্ছে
ইলাঃ- ভাইয়া রে আমি আর পারছি না আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
শাহরিয়ার চিৎকার করে বলল
শাহরিয়ারঃ- বনু চোখ বন্ধ করিস না একটু সহ্য করে নে।
গাড়িটা মাটির রাস্তায় উঠতেই চাকা কাদার ভেতরে বসে যেতে চাইল। ইঞ্জিন গোঁ গোঁ শব্দ করছে।শাহরিয়ার এক্সিলারেটরে চাপ দিল।গাড়িটা একবার ডানে একবার বামে বিপজ্জনকভাবে স্লিপ কাটছে। একবার তো গাড়ির পেছনের চাকা খাদের একদম কিনারায় চলে গিয়েছিল। শাহরিয়ারের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সে জীবনে অনেকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু আজ সে নিজের জন্য নয়, ইলার জন্য সত্যিকারের ‘ভয়’ পেল।
অবশেষে আধঘণ্টার সেই রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের পর গাড়িটা মূল পিচঢালা রাস্তায় উঠল। শাহরিয়ার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। বৃষ্টির ঝাপটা উপেক্ষা করে সে ছুটছে।হসপিটালের ইমার্জেন্সি গেটে গাড়ি থামিয়ে সে চিৎকার করে স্ট্রেচার চাইল। নার্স আর ডাক্তাররা দ্রুত ইলাকে ভেতরে নিয়ে গেল। ইলা তখন প্রায় সংজ্ঞাহীন, শুধু তার ঠোঁট দুটো নড়ছে হয়তো আরিয়ানের নাম জপছে।
অপারেশন থিয়েটারের লাল আলোটা জ্বলে উঠল।শাহরিয়ারের জামাকাপড় কাদা আর বৃষ্টিতে মাখামাখি। সে হসপিটালের করিডোরে ধপ করে বসে পড়ল। তার দুহাত আজ থরথর করে কাঁপছে।
হঠাৎ নিস্তব্ধ করিডোর চিরে ভেতর থেকে এক নবজাতকের চিকন মায়াবী কান্নার শব্দ ভেসে এল। শাহরিয়ার চমকে উঠল। সে কান খাড়া করল।এক নার্স হাসিমুখে বেরিয়ে এসে একটি গোলাপি তোয়ালেতে মোড়ানো ছোট এক মানবশিশুকে নিয়ে দাঁড়ালেন।
নার্সঃ- “অভিনন্দন আপনার বোন একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান জন্ম দিয়েছেন। মা আর মেয়ে দুজনই এখন বিপদমুক্ত।”
শাহরিয়ারের দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে জল নামল। সে টলমলে পায়ে এগিয়ে গিয়ে সেই ছোট্ট মুখটার দিকে তাকাল। যেন এক টুকরো চাঁদ নেমে এসেছে পৃথিবীতে। ঠিক যেন ইলার প্রতিচ্ছবি, আর তার চোখ দুটো যেন আরিয়ানের মতোই গভীর।শাহরিয়ার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৩
”শুনেছেন স্যার? আপনার ইলাফুলের জন্য আজ পৃথিবীতে আরও একটি ছোট ফুল ফুটেছে। ও ঠিক আপনার মতোই সাহসী হবে স্যার, আবার মায়ের মতোই মায়াবী। আমি আমার কথা রেখেছি… আপনার আমানতকে আমি রক্ষা করেছি।”
করিডোরের জানালায় তাকিয়ে শাহরিয়ার দেখল বৃষ্টি থেমেছে। পুব আকাশে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ আলো ফুটছে। এক দীর্ঘ কালরাত্রি শেষে সিলেটে আজ এক নতুন রাজকন্যার অভিষেক হলো।
