ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৫
ছায়া
ভোরের আলো তখন হাসপাতালের করিডোরে এসে পড়েছে। অপারেশন থিয়েটারের সেই লাল আলোটা নিভে গেছে অনেকক্ষণ হলো। শাহরিয়ার তখনো বাইরে দাঁড়িয়ে। ওর ভেজা শার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। নার্সের কোলে থাকা সেই ছোট্ট নবজাতিকা যেন এক লহমায় শাহরিয়ারের সব ক্লান্তি শুষে নিয়েছে।
নার্স বাচ্চাটিকে শাহরিয়ারের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। শাহরিয়ারের হাতদুটো কাঁপছিল। যে হাত দিয়ে সে নিখুঁত নিশানায় ট্রিগার টেপে, আজ সেই হাত একটা কয়েক কেজি ওজনের শিশুকে ধরতে গিয়ে থরথর করে কাঁপছে।
শাহরিয়ারঃ- আমি… আমি কি ওকে ধরতে পারি?
নার্স হাসলেন,
নার্সঃ- অবশ্যই ও আপনার ভাগ্নি তবে খুব সাবধানে ধরুন।
শাহরিয়ার আলতো করে বাচ্চাটিকে কোলে নিল।তুলতুলে নরম একটা শরীর, চোখ দুটো বন্ধ কিন্তু মুখাবয়ব যেন অবিকল আরিয়ানের প্রতিচ্ছবি। শাহরিয়ারের চোখের কোণ আবার ভিজে উঠল।সে নিচু স্বরে বাচ্চাটির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল
“স্বাগত রাজকন্যা তোর আব্বু তোর কাছে নেই, কিন্তু তোর মামা আছে। আমি কথা দিচ্ছি এই দুনিয়ার কোনো রোদ-বৃষ্টি তোকে স্পর্শ করতে পারবে না।
গেটে দারিয়ে শাহরিয়ার ছোট বাবুকে দেখছিলো সেই সময় ইলা চোখ মেলল, তার চারপাশটা সাদা ধবধবে। ওষুধের কড়া গন্ধে তার মাথা ঝিমঝিম করছে। হঠাৎ পেটের দিকে হাত দিতেই সে শূন্যতা অনুভব করল। এক মুহূর্তের জন্য তার কলিজাটা যেন শুকিয়ে গেল।
ইলাঃ- শাহরিয়ার ভাইয়া আমার বাচ্চা?
দরজার পাশেই শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে ছিল। ইলার আওয়াজ শুনে সে দ্রুত এগিয়ে এল। তার মুখে এক প্রশান্তির হাসি।
শাহরিয়ারঃ- শান্ত হ বনু তুই মা হয়েছিস। তোর কোলে এক রাজকন্যা এসেছে।
নার্স তখন বাচ্চাটিকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন এবং ইলার বুকের কাছে আলতো করে শুইয়ে দিলেন। ইলা যখন তার মেয়ের মুখটা দেখল, তার দুনিয়া যেন থেমে গেল। সব ব্যথা সব কষ্ট মুহূর্তেই উধাও।সে তার কাঁপাকাঁপ হাতে বাচ্চাটির কপালে চুমু খেল।
ইলাঃ- দেখেছো ভাইয়া ওর চোখ দুটো একদম আরিয়ানের মতো। নাকটা ঠিক ওর মতো হয়েছে।
ইলার চোখের পানি বাচ্চার গাল স্পর্শ করল। শাহরিয়ার দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল।সে জানে এই মুহূর্তে ইলার সাথে আরিয়ানের সেই অদৃশ্য উপস্থিতি কথা বলছে। সেখানে শাহরিয়ারের থাকাটা এক প্রকার অনধিকার প্রবেশ।
বিকেলের দিকে ইলার শরীর কিছুটা স্থিতিশীল হলো।শাহরিয়ার কেবিনে এসে ইলার পাশে বসলো।
শাহরিয়ারঃ- বনু রাজকন্যার নাম কী রাখবি ভেবেছিস? আরিয়ান স্যার কি কোনো নাম বলে গিয়েছিলেন?
ইলা জানালার বাইরে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসল।
ইলাঃ- আমাদের মেয়ে হলে নাম হবে “ইলিয়ানা”।
শাহরিয়ার বিড়বিড় করল,
ইলা+আরিয়ান=ইলিয়ানা চমৎকার নাম।ইলা হঠাৎ শাহরিয়ারের হাত ধরল।
ইলাঃ- ভাইয়া খান বাড়িতে আব্বু-আম্মুদের কি খবর দেবে না? উনারাও তো এই দিনটার জন্য হয়তো অপেক্ষা করছিলেন।
শাহরিয়ার একটু গম্ভীর হলো। সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
শাহরিয়ারঃ- এখনই না বনু মেহেরাব খান আর তোর বাবার কাছে খবর পৌঁছানো মানেই তোকে আবার সেই খাঁচায় বন্দি করা। আমি চাই তুই আরও কয়েকটা দিন এই শান্তিটা ভোগ করিস। যখন তুই মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ হবি, তখন আমি নিজেই তোকে ওদের কাছে নিয়ে যাব। তার আগে ইলিয়ানাকে আমি বাইরের পৃথিবীর কোনো কালো ছায়া ছুতে দেব না।
ইলা আর প্রতিবাদ করল না। সে জানে শাহরিয়ার যা করছে তা তাদের সুরক্ষার জন্যই। কিন্তু শাহরিয়া কিছু একটা ভেবে ইলিয়ানার কয়েকটা ছবি তুলে মেহেরাব খান আর রাশেদ তালুকদার কে পাঠিয়ে দিলো।
সন্ধ্যার আলো মিশে গেছে নরম আলোক সজ্জায়।ইলিয়ানা ঘুমাচ্ছে ইলার বুকের কাছে, ছোট্ট হাত দুটো মুঠো করে।শাহরিয়ার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে একটুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনে দুটো মেসেজ এসেছে একটা রাশেদ তালুকদারের, আরেকটা মেহেরাব খানের। প্রথমে রাশেদের মেসেজ খুলল।
রাশেদ তালুকদার:
তুমি কে আমি জানিনা ছবিগুলো দেখলাম। আমার নাতনি আল্লাহর রহমতে এত সুন্দর হয়েছে। ইলা কেমন আছে? আমরা সবাই খুব অস্থির হয়ে আছি। অন্তত একবার দেখতে দাও না বাবা?
শাহরিয়ার কোনো উত্তর দিল না।পরের মেসেজটা খুলল মেহেরাব খানের।
মেহেরাব খান:
অদৃশ্য মানব তোমাকে অনেক ধন্যবাদ অন্তত ছবি দেখতে দিয়েছো আমরা ছবি পেয়েছি। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে। এই মুহূর্তটা আমি কয়েকমাস অপেক্ষা করেছি। আমার নাতনিকে একবার কোলে নিতে দাও। শুধু একবার।আমি তোমার কাছে হাত জোড় করে বলছি।
শাহরিয়ারের থুতনি শক্ত হয়ে গেল। সে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে টাইপ করতে শুরু করল।
শাহরিয়ারঃ- আঙ্কেল, আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা। কিন্তু এখনই সম্ভব না। ইলা এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ওকে আর কোনো চাপ দিতে চাই না।
মেসেজ পাঠানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মেহেরাব খানের রিপ্লাই এল।
মেহেরাবঃ- আমরা কি এতটাই অপরাধী হয়ে গেছি? আমরা তো কোনো দোষ করিনি বাবা। যা হয়েছে যা করেছে ইলার বাবা মা করেছে। আমাদের এভাবে শাস্তি দিচ্ছ কেন? আমার নাতনিকে দেখার অধিকারও কি আমার নেই?
শাহরিয়ার ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর আঙুলগুলো আবার চলতে শুরু করল।
শাহরিয়ারঃ- আঙ্কেল দোষের কথা আমি বলছি না। কিন্তু সেদিন আমি সময় মত না গেলে ইলার সন্তান আমাদের মাঝে থাকতো না।আর বাচ্চাটাও তো আর ফিরে আসতে পারতো না। ইলা এখনো প্রতিদিন রাতে তার স্বামীর নাম নিয়ে কাঁদে। আমি ওকে আর কোনো ঝুঁকিতে ফেলতে চাই না। আপনারা যদি সত্যিই ইলিয়ানার ভালো চান, তাহলে এখন ওকে শান্তিতে থাকতে দিন। যখন আমি নিশ্চিত হব যে ও মানসিকভাবে প্রস্তুত, আর কোনো বিপদ নেই তখন নিজে থেকেই আপনাদের খবর দেব। এখন অনুরোধ করছি আর ফোন করবেন না, মেসেজ করবেন না।
মেসেজ পাঠানোর পর শাহরিয়ার ফোন থেকে সিমটা খুলে ভেঙে দিলো। ইলা তখনো ঘুমাচ্ছে ইলিয়ানাকে বুকে জড়িয়ে। শাহরিয়ার আলতো করে ইলার কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল
শাহরিয়ারঃ- তোরা দুজনেই এখন আমার দায়িত্ব বনু। আমি বেচে থাকতে কেউ তোদের ছায়াও মাড়াতে পারবে না।
রাত গভীর হয়ে এসেছে হাসপাতালের করিডোরে পায়ের আওয়াজ কমে গেছে। শাহরিয়ার চেয়ারে বসে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল যেন কেউ এসে দরজায় টোকা দিতে পারে। তার চোখে একটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
অন্যদিকে, খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে মেহেরাব খান ফোনটা হাতে নিয়ে চুপ করে বসে আছেন। একটু পরে রাশেদ তালুকদার কে ফোন করলেন দুজনের চোখেই জল। মেহেরাব খান কাঁপা গলায় বলল
মেহেরাবঃ- ইলা আমাদের মাফ করতে পারেনি,বেয়াই হয়তো কখনোই পারবে না।
রাশেদঃ- আমরা অপেক্ষা করব বেয়াই। যতদিন লাগুক ইলিয়ানা আমাদের রক্ত। একদিন ও নিজেই আমাদের কাছে আসবে ইনশাআল্লাহ।
Time skip…
৩ দিন পর,
হাসপাতালের ডাক্তার শেষবার চেকআপ করে মৃদু হেসে বললেন,
ডাক্তারঃ- ইলা এখন পুরোপুরি সুস্থ। বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন। শুধু বিশ্রাম আর যত্নের দরকার।
শাহরিয়ারের মুখে একটা স্বস্তির হাসি ফুটল। সে ইলার দিকে তাকিয়ে বলল,
শাহরিয়ারঃ- চল বনু এবার বাড়ি যাই।তোর রাজকন্যার জন্য একটা নতুন জগত অপেক্ষা করছে।
ইলা ইলিয়ানাকে কোলে নিয়ে আলতো করে চুমু খেল। তার চোখে আনন্দ আর একটু ভয় মিশে আছে। কিন্তু শাহরিয়ারের পাশে থাকায় সেই ভয়টা কমে যাচ্ছে।
হসপিটাল থেকে বের হয়ে শাহরিয়ার পাহাড়ের কোলে “ইলারিয়ান এর স্বপ্ন বাগান “ এর উদ্দেশ্যে গাড়ি ছোটলো। যেখানে দূরে সবুজ গাছপালা পাহাড়ের সারি। আর বাড়ির আশে পাশে ফুলের সমাহার আর বাতাসে ফুলের গন্ধ। গাড়ি থামতেই ইলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
ইলাঃ- ভাইয়া এটা কি স্বপ্ন? আমি আমার ইলিয়ানাকে নিয়ে এখানে এসেছি।
শাহরিয়ার হেসে বলল,
শাহরিয়ারঃ- না বনু এটা তোদের নিরাপদ আশ্রয়। এখানে কোনো ছায়া পৌঁছাতে পারবে না। এটাই তোদের আসল ঠিকানা।
ভেতরে ঢুকতেই ঘরটা দেখে ইলার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। লিভিং রুমে নরম আলো, এক কোণে ছোট্ট দোলনা সাজানো সেখানে সাদা মশারি ঝুলছে, পাশে ছোট ছোট খেলনা। শাহরিয়ার আগেই সব রেডি করে রেখেছে। “Welcome Home “ লিখে
ইলা ইলিয়ানাকে দোলনায় শুইয়ে দিল। বাচ্চাটা চোখ মেলে একটু অবাক হয়ে চারপাশ দেখছে। শাহরিয়ার পাশে এসে দাঁড়াল।
শাহরিয়ারঃ- এবার বল নামটা কি রাখবি?
“ইলিয়ানা” তো আরিয়ান স্যারের দেওয়া। কিন্তু তুই একটা পূর্ণ নাম দিতে পারিস।
ইলা একটু ভেবে হাসল।
ইলাঃ- ভাইয়া ওর নাম হোক “ইলিয়ানা খান আরিয়া” আরিয়ানের স্মৃতি, আমার ভালোবাসা আর তোমার সুরক্ষা সব মিলিয়ে।
শাহরিয়ারের গলা আটকে গেল সে চোখ সরিয়ে নিল কিন্তু ঠোঁটে হাসি।
শাহরিয়ারঃ- আরিয়া… মানে সম্মানিত, মহৎ। হ্যাঁ, পারফেক্ট ইলিয়ানা খান আরিয়া আমার ছোট্ট রাজকন্যা।
সে আলতো করে ইলিয়ানার কপালে চুমু খেল। বাচ্চাটা যেন বুঝতে পেরেছে, ছোট্ট হাত বাড়িয়ে শাহরিয়ারের আঙুল ধরে ফেলল। ইলা হেসে বলল,
ইলাঃ- দেখো ভাইয়া ও তোমাকে চিনে ফেলেছে।
শাহরিয়ার হাতটা সরাল না। বরং আলতো করে বাচ্চাটির হাতে চুমু দিয়ে বলল,
শাহরিয়ারঃ- তোর মামা সারাজীবন তোর হাত ধরে থাকবে, রাজকন্যা। কোনো ঝড় এলে আমি তোদের দুজনকে বুকে আড়াল করে রাখব।
সন্ধ্যা নামছে বাংলোর বড় জানালা দিয়ে সূর্যাস্তের আলো ঢুকছে। ইলা শাহরিয়ারের পাশে বসে ইলিয়ানার দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের মাঝে একটা নীরব প্রতিজ্ঞা এই ছোট্ট প্রাণটাকে তারা সবকিছু থেকে রক্ষা করবে।
হঠাৎ ইলিয়ানা ছোট্ট একটু ঠোঁট নড়ানো যেন প্রথম হাসির চেষ্টা। ইলা আর শাহরিয়ার দুজনেই হেসে উঠল।
ইলাঃ- ভাইয়া ও হাসছে!
শাহরিয়ারঃ- হ্যাঁ বনু আমাদের ইলিয়ানা হাসছে। এই হাসিটাই তো আমাদের সবচেয়ে বড় জয়।
Time Skip….
দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো কেটে যাচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে ইলিয়ানা বড় হচ্ছে, আর প্রতিটা মুহূর্ত যেন নতুন একটা অধ্যায়। শাহরিয়ার আর ইলা দুজনে মিলে তার প্রতিটা ধাপ উদযাপন করছে।
তিন মাস পর…
ইলিয়ানা সারাদিন ঘুমায় আর খায়। তার ছোট্ট শরীরটা আরও নরম, আরও তুলতুলে হয়ে উঠেছে। রাতে যখন কাঁদে শাহরিয়ার নিজে উঠে কোলে নেয়।ইলা বিশ্রাম নেয় আর শাহরিয়ার ফিসফিস করে গান গায় যে গান গুলো শাহরিয়ার ইউটিউব দেখে শিখেছে ইলিয়ানাকে শুনানোর জন্য।
ইলা একদিন বলল,
ইলাঃ- ভাইয়া ওর চোখ দুটো দেখো যেন আরিয়ানের আত্মা লুকিয়ে আছে।
শাহরিয়ার হেসে বলল,
শাহরিয়ারঃ- হ্যাঁ বনু ও আমাদের সবার আলো।
তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ইলিয়ানার প্রথম হাসি।তিন মাস বয়সে এক সকালে। শাহরিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঠোঁট কুঁচকে, চোখ সরু করে তারপর ফাটল একটা মিষ্টি হাসি। দাঁতহীন মাড়ি বের করে, ছোট্ট গাল দুটো লাল হয়ে গেল।
ইলাঃ- ভাইয়া ও হাসল দেখো দেখো
শাহরিয়ারের চোখ ভিজে গেল সে ইলিয়ানাকে কোলে তুলে নাক ঘষল নাকের সাথে।
শাহরিয়ারঃ- আমার রাজকন্যা তোর হাসিটা পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস।
৫ ডিসেম্বর…
আজকের এই দিনটা অন্যসব দিনের মতো না। বাংলোর চারপাশে পাহাড়ি হাওয়ায় ফুলের গন্ধ ভাসছে, কিন্তু ইলার মনটা যেন আজ অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে ইলা। তার কোলে ছোট্ট ইলিয়ানা ঘুমাচ্ছে।
আজ ইল্লার আর আরিয়ানের বিয়ের ১ বছর হলো। প্রতিটা মেয়েই তার বিবাহ বার্ষিকী নিয়ে কত স্বপ্ন দেখে। কেউ ঘুরতে যায়,কেউ স্বামীর হাত ধরে কেক কাটে।
কিন্তু ইলার ভাগ্যে আজ শুধু স্মৃতি আর অশ্রু।ইলা আলতো করে ইলিয়ানার কপালে চুমু খেল।
ইলাঃ- জানিস মামনি আজ তোর আব্বু থাকলে অনেক সুন্দর করে সেলিবেট করতো।
কথাটা বলতেই ইলার গলা কেঁপে উঠল। চোখের কোণ ভিজে গেল।ঠিক তখনই
গেটের বাইরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল। শাহরিয়ার তখন বাইরে ছিল না, তাই ইলা একটু অবাক হয়ে নিচে তাকাল।
গেটের সামনে একজন ডেলিভারি ম্যান দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে অনেকগুলো গোলাপ ফুলের তোড়া আর সাথে দুটো সুন্দর ঝুড়ি।
একটা ঝুড়ি ভরা সাদা শিউলি ফুল।
আরেকটা ঝুড়ি ভরা ছোট ছোট বকুল ফুল।ইলা ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল।ডেলিভারি ম্যান ভদ্রভাবে বলল,
ডেলিভারি ম্যানঃ- ম্যাম এখানে কি মিসেস ইলা আছেন?
ইলা একটু অবাক হয়ে বলল,
ইলাঃ- জি আমি ইলা।
ডেলিভারি ম্যান হাসল
ডেলিভারি ম্যানঃ- তাহলে এগুলো আপনার জন্য।
ডেলিভারি ম্যান গাড়ি থেকে আরও কয়েকটা বড় গোলাপের তোড়া নামাল।
লাল গোলাপ,গোলাপি গোলাপ,সাদা গোলাপ, চারপাশ মুহূর্তেই ফুলের গন্ধে ভরে গেল।
ইলা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তার বুকের ভেতর হঠাৎ করে জোরে ধুকপুক শুরু হলো।ফুলের মাঝখানে একটা ছোট্ট খাম ছিল।কাঁপা হাতে ইলা খামটা খুলল।ভেতরে ছোট্ট একটা কার্ড সেখানে খুব পরিচিত হাতের লেখায় লেখা
“শুভ বিবাহ বার্ষিকী ইলাফুল” যতদিন আমি বেঁচে আছি এভাবেই তোমার সাথে আমার কাটানো দিন গুলো সুন্দর করে তুলবো।
“তোমার ভয়েজ কিং”
কার্ডটা পড়তেই ইলার পুরো শরীর কেঁপে উঠল।তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।ঠোঁট কাঁপছে হঠাৎ সে ডেলিভারি ম্যানের দিকে ছুটে গেল।
ইলাঃ- কোথায়??
ডেলিভারি ম্যান একটু চমকে উঠল।
ডেলিভারি ম্যানঃ- ম্যাম?
ইলা প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল,
ইলাঃ- কোথায় আমার ভয়েজ কিং?আমি জানতাম আমি জানতাম ও বেঁচে আছে। বলুন কোথায় ও?
ইলার চোখে তখন উন্মাদ আনন্দ আর কান্না মিশে গেছে।সে চারপাশে তাকিয়ে যেন কাউকে খুঁজছে।ডেলিভারি ম্যান একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল ডেলিভারি ম্যান ধীরে বলল,
ডেলিভারি ম্যানঃ- সরি ম্যাম মনে হয় কোথাও ভুল হচ্ছে।
ইলা হতবাক হয়ে তাকাল।
ইলাঃ- কি বলছেন আপনি?
লোকটা একটু শান্ত গলায় বলল,
ডেলিভারি ম্যানঃ- এই অর্ডারটা আজকের না ম্যাম। এটা ১১ মাস আগে করা হয়েছে।
ইলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
ডেলিভারি ম্যান আবার বলল,
ডেলিভারি ম্যানঃ- স্যার আমাদের ফুলের শপে এসে বলেছিলেন প্রতি বছর ৫ ডিসেম্বর এই ঠিকানায় যেন ফুল পৌঁছায়।
আর উনি ১০ বছরের অগ্রিম টাকা দিয়ে গেছেন। সে বলেছেন সে আর্মিতে জব করে কখন কোথায় থাকে ঠিক নেই তাই আমাদের বুক করে রেখেছে।
কথাটা শেষ হতেই যেন পুরো পৃথিবী থেমে গেল।ইলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তার চোখ দিয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
সে ধীরে ধীরে কার্ডটা বুকের সাথে চেপে ধরল।ঠোঁটে কাঁপা কাঁপা হাসি ফুটল।
ইলাঃ- তোমরা দেখেছো…আমি বলেছিলাম না…আমার ভয়েজ কিং আমাকে ভুলতে পারে না। কিন্তু আমি যদি আত্রাইতে থাকতাম।
ঠিক তখনই পেছন থেকে শাহরিয়ারের কণ্ঠ শোনা গেল।শাহরিয়ার গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।তার চোখেও এক অদ্ভুত অনুভূতি।
শাহরিয়ারঃ- ঠিক সেম ভাবে দিনাজপুর এ এবং রাজশাহীতে ডেলিভারি ম্যান চলে গেছে। স্যার তোর জন্য সব ঠিক করে রেখেছিলো তুই যেখানেই থাকিস না কেনো তোর সারপ্রাইজ যেনো তোর কাছে সঠিক সময় চলে যায়।
ইলা আকাশের দিকে তাকাল।পাহাড়ের ওপরে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে।হাওয়ায় শিউলি ফুলের গন্ধ।ইলা ফিসফিস করে বলল
ইলাঃ- ভয়েজ কিং আপনি যেখানেই থাকুন
আমি জানি আপনি আমাকে এখনো ভালোবাসেন ঠিক আগের মত।
তার পাশে দোলনায় শুয়ে থাকা ছোট্ট ইলিয়ানা তখন হালকা শব্দ করল।
মনে হলো যেন সেই ছোট্ট প্রাণটাও তার বাবার ভালোবাসার গল্প শুনছে।আর বাংলোর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গোলাপ, শিউলি আর বকুল ফুল নীরবে সাক্ষী হয়ে রইল এক ভালোবাসার যেটা সময়ও শেষ করতে পারেনি।
ডেলিভারি ম্যান আত্রাইতে আর দিনাজপুর এর যাওয়ার পরে সবাই ইলার মত সেম ভাবে অবাক হয়েছিলো পরে ডেলিভারি ম্যান এর থেকে সব জানার পড়ে তারা আরো বেশি ভেঙে পড়ে।
Time Skip….
দিন যায় ইলিয়ানা এখন হাত-পা ছুড়ে একটু খেলা করে, ইলা ওকে কোলে নিয়ে বারান্দায় বসে পাহাড় দেখায়। শাহরিয়ার কাজ শেষ করে প্রতিদিন ওকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
একদিন ইলিয়ানা হামাগুড়ি দিতে শুরু করল। মেঝেতে পড়ে থাকা খেলনা টেনে নেয়, হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। ইলা আর শাহরিয়ার দুজনে মিলে ওকে উৎসাহ দিতে থাকে।
ইলাঃ- যাও বাবু আরেকটু… মামার কাছে যাও।
শাহরিয়ার মেঝেতে বসে হাত বাড়িয়ে ডাকে। ইলিয়ানা হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে তার কোলে এসে পড়ে দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়ে।
এক বছর বয়স ইলিয়ানা এখন দাঁড়াতে শিখেছে।শাহরিয়ারের আঙুল ধরে টলটল করে হাঁটে।প্রথম পা ফেলার দিনটা ছিল বিশেষ। ইলা কেক বানিয়েছে শাহরিয়ার বেলুন সাজিয়েছে।ইলিয়ানা দুটো পা ফেলে শাহরিয়ারের দিকে এগিয়ে এল। শাহরিয়ার কোলে তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে দিল।
শাহরিয়ারঃ- আমার রাজকন্যা হাঁটতে শিখেছে আর কোনোদিন পড়তে দেব না।
দিনগুলো এভাবেই কাটছে। ইলিয়ানার বেড়ে ওঠা যেন তাদের জীবনের নতুন অর্থ দিয়েছে। শাহরিয়ার আর ইলা দুজনেই জানে, এই ছোট্ট মেয়েটা তাদের সবকিছু। আর তারা ওকে সবকিছু থেকে রক্ষা করবে চিরকাল।
ইলিয়ানা এখন প্রায় দেড় বছরের। তার ছোট্ট পা দুটো এখন দৌড়াতে শিখেছে, কথা বলার চেষ্টা করে প্রতিদিন নতুন নতুন শব্দ ফুটিয়ে তোলে। বাংলোর লিভিং রুমে সকালের নরম আলো পড়েছে। শাহরিয়ার মেঝেতে বসে ইলিয়ানার সাথে খেলছে রঙিন ব্লক দিয়ে টাওয়ার বানাচ্ছে। ইলা রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে এসে সোফায় বসল দুজনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে।
ইলিয়ানা হঠাৎ ব্লকটা ফেলে দিয়ে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল।তার বড় বড় চোখ দুটো যেন কিছু বলতে চাইছে।সে ছোট্ট হাত বাড়িয়ে শাহরিয়ারের গাল ছুঁল,তারপর ঠোঁট কুঁচকে, একটু থেমে.. ইলিয়ানা ছোট্ট, স্পষ্ট গলায়
ইলিয়ানাঃ- বা… বা….বা…”
ঘরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
শাহরিয়ারের হাত থেকে ব্লকটা পড়ে গেল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল, মুখটা ফ্যাকাশে। সে ইলিয়ানার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।ইলিয়ানা আবার বলল,
এবার একটু জোরে হাসি মুখে:
“বাবা”
শাহরিয়ারের চোখের কোণ ভিজে উঠল। সে কাঁপা হাতে ইলিয়ানাকে কোলে তুলে নিল। তার গলা আটকে গেছে কথা বেরোচ্ছে না। শুধু বারবার ইলিয়ানার কপালে চুমু খাচ্ছে।
শাহরিয়ার ফিসফিস করে গলা ভেঙে বলল
শাহরিয়ারঃ- বাবা… তুই বাবা বললি? আমার রাজকন্যা…তুই বাবা বলতে শিখে গেলি…”
ইলা তখনো সোফায় বসে আছে, চায়ের কাপ হাতে।কিন্তু তার হাত কাঁপছে। কাপটা টেবিলে রাখতে গিয়ে ঝনঝন করে শব্দ হলো। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে উঠে এসে শাহরিয়ার আর ইলিয়ানার পাশে দাঁড়াল।
ইলাঃ- ভাইয়া ও বাবা বলল আরিয়ান কে বাবা বলছে। আজ ও বেচে থাকলে পৃথিবীর সব থেকে খুশি মানুষ সে হত।
শাহরিয়ার ইলার দিকে তাকাল। তার চোখেও জল।সে এক হাতে ইলিয়ানাকে জড়িয়ে ধরে, আরেক হাত বাড়িয়ে ইলাকে কাছে টেনে নিল। তিনজন একসাথে।শাহরিয়ার কাঁপা গলায় বলল,
শাহরিয়ারঃ- বনু ও জানে না… কিন্তু ওর হৃদয় জানে। আরিয়ান স্যার যেখানেই থাকুক উনার আত্মা এখানে।
ইলা শাহরিয়ারের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছে। তার কান্না আর হাসি মিশে গেছে।
শাহরিয়ার ইলিয়ানাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করল। তার গাল বেয়ে পানি গড়াচ্ছে, কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত শান্তির হাসি।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৪
শাহরিয়ারঃ- আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কোনো রোদ-বৃষ্টি তোকে স্পর্শ করবে না। আজ থেকে আমি তোর মামা তো অদৃশ্য মানব হয়ে গেলাম। তোর সাথে ছায়ার মত থাকবো।
ইলা তাদের দুজনকে জড়িয়ে ধরল। ঘর ভরে গেল কান্না, হাসি আর অফুরন্ত ভালোবাসায়। বাইরে পাখির ডাক ভেতরে একটা পরিবার যেখানে অতীতের ক্ষত সারছে নতুন একটা শুরুর স্পর্শে। এভাবে দিন কাটতে লাগলো কিন্তু ইলা এত দিনেও তার ভয়েজ কিং কে ভুলতে পারেনি। ইলা এখনো আরিয়ানের সেই টিকটক আইডি তে গিয়ে বার বার সেই ভিডিও গুলো দেখে। আর কান্না করে শাহরিয়ার অনেক বার চেয়েছে আইডি ডিলিট করে দিতে কিন্তু ইলার রিকুয়েষ্ট এ এটা করতে পারেনি।
