Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৮

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৮

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৮
ছায়া

আজ শুক্রবার বলে আজ আর তেমন তাড়াহুড়ো নেই ভোরে উঠলেও ইলা বিছানায় গড়াগড়ি করতে লাগলো, তারপর একটু দেরি করেই ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেলো। মা আজও রাগে চুপচাপ তাই ইলাও কিছু বললো না। নাস্তা শেষ করে বাইরে বের হওয়ার সময় পরিকে ডাকলো
ইলাঃ- চল না খেলতে যাই আজ তো ছুটির দিন।
পরি হেসে মাথা নাড়লো “না রে আজ আমার ইচ্ছে করছে না।” বাধ্য হয়ে ইলা একাই নদীর পাড়ে গিয়ে হাজির হলো। দেখলো ছোট ছোট সব বাচ্চা এসেছে শুধু মামুনি নেই। ইলা কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
ইলাঃ- কি রে মামুনি কই আজ?
বাবলা ঠোঁট কামড়ে একটু দ্বিধা করলো তারপর বললো
বাবলাঃ- আপু মামুনি আপু তো আজ বিয়ে কালকে ছেলে পক্ষ দেখতে এসেছিলো পছন্দ করেছে তাই আজই নাকি বিয়ে।

শুনেই ইলার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো বিস্মিত চোখে বললো
ইলাঃ- কি মামুনির বয়স তো কেবল ১৩ এই বয়সে কিভাবে বিয়ে দিবে এটা তো আইনেই নিষেধ।
বাবলাঃ- আমরা কি জানি আপু তবে আজ সকালে মামুনি আপু আমাদের চুপিচুপি বলেছে।
ইলাঃ- চল আজ খেলাধুলা না মামুনিদের বাড়ি যাই।
বাচ্চারা চুপ হয়ে গেলো ইলা সবার দিকে তাকিয়ে আছে তখন বাবলা সাবধান করে দিলো
বাবলাঃ- আপু মামুনি আপুর আব্বা নাকি কাউকে কিছু জানতে দিতে চান না পুরো ব্যাপারটা গোপনে হচ্ছে।
ইলাঃ- চল আমি যাচ্ছি আমি না দেখলে শান্তি পাবো না।
ইলার পরিবার কে গ্রামের সবাই খুব সম্মান করে তাই মামুনিদের বাড়িতে ঢুকতেই সবাই ভদ্রভাবে অভ্যর্থনা জানালো ইলাকে ইলা সালাম দিলো মামুনির বাবা সালাম নিলেন ইলা সরাসরি প্রশ্ন করলো
ইলাঃ- চাচা এত আয়োজন কিসের?

মামুনির বাবা গম্ভীর মুখে বললেন “মেহমান আসবে মা একটু প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
ইলা কিছু না বলে ভেতরে ঢুকে মামুনির ঘরে গেলো সেখানে মামুনি লাজুক হয়ে মেঝেতে বসে আছে হাত-পা গুটিয়ে। ইলা চট করে জিজ্ঞেস করলো
ইলাঃ- কি রে তোকে নাকি আজ বিয়ে দিচ্ছে?
মামুনি লজ্জা পেয়ে ফিসফিস করে বললো “হ্যাঁ আপু।”
ইলা মুখ ভেংচি কাটলো রাগে ফেটে যাচ্ছে ইলার মেজাজ কোথায় কাল নিজের বিয়ে ভাঙলো আর আজ নাকি এই ১৩ বছরের পিচ্চির বিয়ে
ইলাঃ- বিয়ে মানে জানিস কি এই বয়সে বিয়ে মানে পড়া শোনার ইতি স্বপ্নের ইতি তুই রাজি হলি কেন?
মামুনিঃ- আপু বাড়ির সবাই বলছে ছেলেপক্ষ ভালো এক টাকাও যৌতুক নেবে না তাই আমি রাজি হয়ে গেছি।
ইলাঃ- তোর তো বয়স অল্প রে এই বয়সে…..

মামুনিঃ- আপু আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরয় দুইবেলা ঠিক মত খেতে পাই না। আমার পরেই আরো দুই বোন সংসারের অভাব অনেক। আমি যদি বিয়ে করি একটা পেট কমবে আমার বোনেরা ঠিক মত খেতে পারবে।
এমন কথায় ইলার বুক হাহাকার করে উঠলো কিছু বলতে পারলো না, শুধু মামুনির চুলে হাত বুলিয়ে চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে এলো। বাচ্চারা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো সবাই মিলে মামুনিদের বাড়ি থেকে বের হয়ে একটা গাছের উপরে বসে গম্ভীর হয়ে আছে। বাচ্চারা জিজ্ঞেস করলো “আপু কি এত ভাবছো? ইলা হালকা হেসে মাথা নেড়ে বললো” কিছু না” তারপর হঠাৎ বাবলাকে জিজ্ঞেস করলো
ইলাঃ- কোন সময় আসবে ছেলেপক্ষ রে বাবলা?

বাবলাঃ- আজ বিকেল নামাজের পরে।
ইলার চোখ চকচক করে উঠলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে কিছু একটা ভাবলো তারপরে সবার উদ্দেশ্য বলল
ইলাঃ- ঠিক আছে তোমরা সবাই বাড়ি যাও নামাজ পড়ে খাওয়া করে আবার এখানে আসো।
সবাই বাড়ি গেলো ইলা তড়িঘড়ি গোসল করে খাওয়া করেল। তারপর গাছের নিচে আবার এসে বসলো। বাচ্চারা সবাই আগেই চলে এসেছে বাবলা দৌড়ে এসে খবর দিলো
বাবলাঃ- আপু ছেলেপক্ষ নাকি চলে এসেছে।
ইলাঃ- তুই সিওর?
বাবলাঃ- হ্যাঁ আপু একদম সিওর।
ইলা সঙ্গে সঙ্গে নিজের ফোন বের করলো দ্রুত ৯৯৯ নম্বরে ডায়াল করলো
ইলাঃ- হ্যালো আমাদের এখানে একটা ১৩ বছরের মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে প্লিজ আপনারা কিছু করুন। আমি ঠিকানা দিচ্ছি।

ডিউটি অফিসার তথ্য নিলেন এবং আশ্বাস দিলেন “আমরা ২০ মিনিটের মধ্যে আসছি।
ইলা ফোন রেখে গভীর শ্বাস নিলো মুখে কঠোরতা ফুটে উঠলো। ঠিক ১৫ মিনিট পর দূরে সাইরেন বাজতে বাজতে পুলিশ গাড়ি আর একটা আর্মির গাড়ি এসে দাঁড়ালো গ্রামের লোকজন দৌড়ে বাইরে বের হলো। দুইজন আর্মি এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো
আর্মিঃ- “আপনি কি ইলা?
ইলাঃ- জ্বি আমি ফোন করেছিলাম।
আর্মিঃ- চলুন আমাদের নিয়ে চলুন ওদের বাড়িতে।
ইলা ধীরপায়ে মামুনিদের বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো সাথে পুলিশের দল আর আর্মির অফিসার। ছোট বাচ্চারাও ইলার পেছনে আসতে চাইলো কিন্তু ইলা হাত তুলে থামিয়ে দিলো
ইলাঃ- না তোরা এখানেই থাক এ কাজটা বড়দের। আর একটু ঝামেলাও আছে আমি চাইনা তোদের সমস্যা হক।
মামুনিদের দরজার সামনে পুলিশ-আর্মির গাড়ির হর্ণ বাজতেই পুরো গ্রাম হাহাকার করে উঠল। গ্রামের লোকজন এক ঝাঁকে বেরিয়ে দাঁড়াল। মামুনিদের বাড়ির উঠোনে ঢুকতেই পুলিশ আর আর্মির দুইজন ইউনিফর্মধারী অফিসার সোজা দাঁড়িয়ে কাজটি সামলালেন সৌম্য কণ্ঠে একে একে নির্দেশ দিলেন।
অফিসারঃ- সবাই চেষ্টা করুন শান্ত থাকা আর তা না হলে আমরা ধরেই নেব এখানে কোনো আইন-উলঙ্ঘন কাজ হচ্ছে।

ইলার বুক কেঁপে উঠছে কিন্তু মুখে দৃঢ়তা সে পুলিশ অফিসার দের সাথে এগোলো আর দরজা ঠেসে একজন বলল
মামুনির চাচাঃ- স্যার আপনারা হঠাৎ আমগো বাড়িত কেন?
অফিসারঃ- আমরা বিয়ের দাওয়াত পেয়ে এসেছি। কই জামাই বউকে দেখি।
মামুনির চাচাঃ- না স্যার আপনাগো ভুল হইতাছে এহানে কোনো বিয়া হইতাছে না এইডা তো সুন্নতের অনুষ্টান।
অফিসারঃ- তা সুন্নত টা কি আপনার হচ্ছে নাকি?
ইলাঃ- মিথ্যা কথা এই ঘরে একটি ১৩ বছরের মেয়ে বাধ্য করা হচ্ছে বিয়ে হওয়ার জন্য।
আর কোনো কথা না শুনে বাড়ির ভেতরে ডুকলো ডুকেই দেখা গেলো ঠাণ্ডা ভাবেই সাজিয়ে রাখা মালা-ফুল সবকিছু যেন কোনো আনন্দের জন্য কেবল কক্ষের এক কোণে সঙ্কোচে বসে থাকা মামুনি। তার চোখ লজ্জায় নিমজ্জিত ভীত হয়ে কাঁপছে ছেলেপক্ষও ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছেন ভয়ে। একজন নারী পুলিশ অফিসার নরম কণ্ঠে মামুনির হাতে নিয়ে বললেন

“তুমি কোনো pressure এ আছো কি? এই বিয়ে কি তুমি নিজের ইচ্ছায় করছো নাকি তোমার বাবা মা বাধ্য করেছে।
মামুনিঃ- না মেডাম আমি চাই না এই বিয়ে করতে কিন্তু বাড়ির অবস্থা খারাপ আমার ছোট দুইটা বোন আছে এ জন্য আমাকে বিয়ে দিলেই বলে…।
তার শব্দ থেমে গেল মামুনি আর কিছু বলতে পারলো না পুলিশ অফিসার তৎক্ষণাৎ নোট নিলেন আর্মির কর্মকর্তা আশ্বাস দিলেন
আর্মি অফিসারঃ- এখানে কোনোভাবেই বাল্যবিবাহ ঘটতে দেব না। আর যদি কেউ বাড়াবাড়ি করে আমরা আইনের আওতায় এনে তার বিচার করব।

সাথে সাথে তারা বরের পরিবারকে আলাদা করে থামিয়ে দিলো। কাকা-চাচাদের প্রশ্ন করে আইনি ভাবেই জিজ্ঞাসা করা হলো, নথি চাওয়া হলো, পরিচয়পত্র যাচাই করা হলো। গ্রামের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো লোকেরা তখন চুপচাপ। কেউ সামান্য নতুন করে ফিসফিস করলেও অফিসাররা দৃঢ় ছিলেন।
ওই সময় ইলার পিছুটান করে ছোট-বাচ্চারা দূর থেকে তাদের নীরব সমর্থন জানালো। ইলা চেয়ে দেখলো মামুনির চোখে এখন আর লজ্জা নেই সেখানে এখন এক অদম্য বার্তা, মুক্তি পাওয়ার আশা।প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে না হতে পুলিশ আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করলেন
পুলিশঃ- এ বিয়েটি আপাতত স্থগিত করা হলো। কারণ মামুনি এখনো অনেক ছোট এই বয়সে বিয়ে দেয়া যাবে না। আমরা যাওয়ার পরেও যদি এই বিয়ে হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই খবর শুনে গ্রামের বেশ ক’জন মানুষের মুখে বিব্রত হাসি ভেসে এলো কেউ ইলাকে নিয়ে গর্ব করলো, আবার কেউ অস্থিরতা প্রকাশ করলো। মামুনির পরিবারের সিনিয়ররা একসঙ্গে নেমে এসে ইলাকে প্রশ্ন করলো
মামুনির বাবাঃ- তোমার পরিবার কে তো আমরা গ্রাম বাসি সবই সম্মান করি। তুমি আমার এত বড় ক্ষতি কেনো করলে মা।

ইলাঃ- চাচা আমি ক্ষতি করিনি আপনি যা টা করছিলেন সেটা ভুল। যে বয়স টা মামুনির খেলার বয়স সেই বয়সে আপনি তার হাতে রান্নার রাড়ি পাতিল ধরিয়ে দিচ্ছেন। কিছু দিন পড়ে তার পেটেও বাচ্চা আসলে সে কিভাবে সামলাবে সেতো নিজেই বাচ্চা। আর বড় কত ও তো বিয়ে সম্পর্কে কিছুই জানে না।
ইলা কথা গুলো বলে চুপ হয়ে গেলো আর কিছু বলল না পুলিশ অফিসাররা তখন ইলাকে মাথায় হাত রেখে বলে উঠলেন
পুলিশ অফিসারঃ- তুমি সাহসিকতা দেখিয়েছ ছোট্ট মেয়ে হলেও ঠিক কাজ করেছো। সমাজকে বদলাতে যারা এগিয়ে আসে তাদের আমরা স্যালুট জানাই।
আর্মির একজন অফিসারও অগ্রভাগে এসে যোগ দিল ইলার কাছে এসে নিজের মাথার ক্যাপ খুলে ইলার মাথায় পড়িয়ে দিয়ে বলল
আর্মি অফিসারঃ- তোমার ওপর অত্যন্ত গর্ব হচ্ছে আমার তুমি যা করেছ তা ঠিক মানবিক ও আইনী। আমরা চাই এমন কেষ্টরা গড়ে ওঠুক।
এই ঘটনা দেখে মামুনির পরিবারের কিছু সদস্য, বিশেষ করে বাড়ির কাকার ঘনিষ্ঠরা, ইলার উপর ক্ষোভ উগরে তুলল।তারা ভীষণ খেপে কণ্ঠে বললো

“এভাবে ঘরে টপকে এসে আমাদের সম্মান লাঞ্ছিত করেছো এটা কি ধরনের বেয়াদবি আর আমাদের লাভ-ক্ষতি কি হবে?
এই কথাগুলো ইলার কানে এসে লাগলে তার বুক ভেঙে গেল। পুলিশের একজন অফিসার কড়া ঠোঁট কুঁচকিয়ে বললেন
অফিসারঃ- আপনারা আইন নিজের হাতে নেবেন না। অভিভাবক অভিভাবক এর দায়িত্ব পালন করুন। আর যদি বাল্যবিবাহের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়,আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেবো বার বার বলে দিলাম।
ইলার কাছে তখন প্রচণ্ড ক্লান্তি আসল সে দেখল এত সাহস দেখানোর পরও লোকজনের রাগ তাকে স্পর্শ করছে। তবু পুলিশের ও আর্মির কড়াকড়ি বদ্রীচোখ কেটে ইলাকে শক্তি দিলো। সব কিছুর লিখিত নিয়ে অফিসারেরা বিদায় নেবার সময় ইলার সাথে কথা বললেন
অফিসারঃ- তোমার এই সাহস অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে। তুমি যেই কাজ করেছো সেটাই আমাদের সমাজ বদলের সূচনা।

ইলা হাঁটতে হেঁটে বাড়ির দিকে যাচ্ছে লোকেরা তার দিকে ঘুরে তাকাল কেউ “ধন্যবাদ” জানালো কেউ অশ্রু ঝরিয়ে চেপে কণ্ঠে বলল “ভাল কাজ করেছিস” কিন্তু মামুনির পরিবারের কিছু লোক এখনো তাকে অপছন্দ করে বিদ্রুপের চোখে দেখলো তারা চিন্তা করলো এ মেয়েটা আমাদের পরিবারকে হেয় করেছে। তাদের ইলার প্রতি ক্ষোভ তৈরি হল।
ইলা সেইসব কথাগুলো শুনতে পেল, তবে তার ভেতর বড় একটা শান্তি ছিল সে জানে আজ সে কোনও ছোট্ট প্রাণের ভবিষ্যৎ রক্ষা করলো।সে ক্লান্ত নয় ভেতরে শক্তি পুলিশ-আর্মি সুত্রে অ্যাডভাইস দিয়ে গেলেন, মামুনি নিরাপত্তা দেয়া হলো কৃতজ্ঞতার চোখে ইলা তাকালো। বাড়িতে পা রাখতেই কেউ কাঁধে কাঁধ দিল পরি এসে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বলল

পরিঃ- তুই মহান ইলা
ইলাঃ- তুই কি করে জানলি এই সব।
পরিঃ- বাবলার থেকে শুনেছি।
সব ঠিক মনে হলেও গ্রামের ক্ষোভ এখনও মলিন হয় নি মামুনির পরিবারের সদস্যরা ইলার কাছে চরম রাগে কথাবলার মাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশ করলো কিন্তু আইনের ওপর মানুষের বিশ্বাসই আজ সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ালো।
রাত নামতেই ইলা বিছানায় শুয়ে থাকলো মনের মধ্যে দুশ্চিন্তাও ছিল স্বস্তিও ছিল আজকে সে সাহস করে ভালোকিছুর নির্মাণের জন্য প্রথম পা বাড়িয়েছে।
মামুনির বিয়ে ভাঙা আর পুলিশের হস্তক্ষেপ নিয়ে পুরো গ্রামে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে।সেই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে মামুনির পরিবারের কিছু লোক শরীর কাঁপানো মন্তব্য করতে থাকে। তাদের মধ্যে ছিল মামুনির বাবা,চাচারা, গোঁড়ামি আর লজ্জার অনুভবে তারা একটু টেনশনে পরে। তাদের ক্ষোভের লক্ষ্যে এবার তারা নজর দিলো তালুকদার পরিবারের দিকে বিশেষ করে ইলার দিকে।
কয়েকজন বদমেজাজি চাচা রাতের দিকে তালুকদার বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারা ভেতরে ঢুকেই উচ্চস্বরে বলে উঠলেন

” আমরা তো তালুকদার বাড়িকে অনেক সম্মান করতাম আজ তাদের মেয়ে সম্মানের এই প্রতিদান দিলো আমাদের
তাদের এমন কথা শুনে দারোয়ান বাইরে দাঁড়িয়ে সর্তকভাবে বললেন
দারোয়ানঃ- আপনারা শান্ত থাকুন এখানে চিল্লাচিল্লি করবেন না।
কিন্তু মামুনির চাচারা সেটা না করে দারোয়ান কে ঠেলে গৃহস্থালির ভেতর ঢুকে উচ্চস্বরে ইলাকে অভিযুক্ত করল, অপমান করা শুরু করল।তাদের গলায় গর্জন, চোখে লজ্জা ও ক্ষোভ সব মিলিয়ে এমন হাইপে তৈরি করলো যেনো ইলা কাউকে খুন করেছে।
ইলার মা সাবিহা বেগম শুনে চুপ হয়ে রইলেন তার গলায় ভেসে উঠল চোখে অগ্নি দেখা দিল ইলার মাকে দেখে মামুনির চাচারা বলা শুরু করলো
“আমাদের বাড়ির মেয়ে আমাদের বাড়ির মান সম্মান সব শেষ করে দিলো” বলে চেঁচাতে লাগলেন। “সেনাবাহিনীর কাছে হার মেনে না নিয়েছি বলে মনে করবেন না আপনার মেয়েকে ছেড়ে দিবো।
এভাবে বাড়ির সম্মান নিয়ে যে কত কথাই বলল হিসাব নেই। ইলার মা মাথা নিচু করে বলল

সাবিহাঃ- ওর হয়ে আমি মাফ চাচ্ছি আর অর ব্যবস্থা আমি করছি। ইলার বাবা আসলে আমি তার সাথে এ বিষয়ে কথা বলবো
তারা ভাবলেন ইলাকে কিছু “শাস্তি” দিয়ে চুপ করিয়ে দিবে। তাই তারা সবাই চলে গেলেন
রাগ যখন মাথার উপর উঠে আসে তখন মানুষ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায়। সাবিহাও সেই সেম কাজ করলো বাড়ির ভেতর দৌড়ে ঢুকলেন। ইলা তখনো নিজের রুমে বাইরে এমন আওয়াজ,কিন্তু ইলার কানে কানে সেই কড়া হুঁশিয়ারি কিছুই আসলো না।
হঠাৎ দরজার জোরে খুলে দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে বিকট শব্দ হলো ইলার মায়ের পদক্ষেপ ভিতরে ঢুকেই চেঁচিয়ে উঠলেন
সাবিহাঃ- তুই কি আমাদের মান-সম্মান নষ্ট করার জন্য জন্মেছিস। তোর সাহস কি করে হয় এত বড় কাজ করার।
ইলা শান্তভাবে উঠে দাঁড়ালেন চোখে ভয় ও কষ্ট মিলানো, কণ্ঠ নরম কিন্তু স্থির
ইলাঃ- আমি যা করেছিলাম মামুনির ভালো করার চেষ্টা করে করেছিলাম।

সাবিহা রেগে অত্যন্ত অনর্গল গালাগালি শুরু করলো তার অসহ্য রাগ দেখে ইলা কাঁপতে লাগলো। ইলার মা হাত তুলে লাঠিটা ধরলেন এক মুহূর্তের রাগ তিনি থামেননি। কিছু রাগ পরশুদিনের আর কিছু রাগ আজকের মিলিয়ে তীব্র অভিমান দিয়ে লাঠি দিয়ে মারা শুরু করলো। ইলা ভয়ে চিৎকার করে পিছিয়ে গেল
ইলাঃ- মা….. মা রে মারিও না ব্যাথা পাচ্ছি।
কিন্তু সাবিহা থামাতে রাজি হলেন না গালি আর হাতের লাঠির আঘাত থামছে না। রাগে অন্ধ হয়ে তিনি বারবার লাঠি চালালেন,কড়া শব্দে কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ করলেন শব্দগুলো জমে রুমের কোণে ধরলো।
পরি ইলার কান্নার শব্দ শুনে পা দৌড়ে এসে ইলার মাকে ধরে ইলাকে বাচাতে চাইলো,
পরিঃ- ছোট মা থামো এভাবে মেরো না।

কিন্তু সাবিহা গম্ভীর হয়ে পরিকে রুমের বাইরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিলেন পরিকে। ইলার বড় মা মেঝো মা এসে দরজায় চিল্লাতে লাগলো কিন্তু ইলার মা কিছুতেই শুনছে না।
ইলা আরো জোরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো আর্তনাদ করলো,
ইলাঃ- আব্বু…আব্বু রে মাকে কেউ বাচাও রে..!!
কিন্তু বাড়ির ভেতর তখন স্তব্ধতা কেউ কিছু করতে পারছে না। ইলার মায়ের বকাঝকা আর আঘাতে ইলার শরীর কাঁপছে। ইলার রুমে প্রতিটা জিনিস কেঁদে উঠছে ইলার আর্তনাদ দেখে। বাইরে ইলার বড় মা মেঝোমা পরির কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে।পরি বাইরে ছুটে গিয়ে ইলার বাবাকে ফোন করলো
পরিঃ- চাচ্চু বাবা মেঝো মা তোমরা একসঙ্গে তাড়াতাড়ি বাড়ি আসো ইলাকে মারছে ছোট মা।
ভয়ের কণ্ঠে সে সবকিছু জানালো ফোন পাওয়ার সাথে সাথে রাশেদ তালুকদার ছুটে আসেন সাথে ইলার বড় বাবা, মেজো বাবা সবাই ছুটে এসেছে।দরজা এদিকে ভেতরে থেকে লাগানো কিন্তু তাদের পদধ্বনি শুনে সাবিহা হঠাৎ থমকে গেলেন বহু বছর পরে রাশেদের কণ্ঠে আজ একধরনের কঠোরতা। রাশেদ দরজায় ঠেস দিয়ে বললেন
রাশেদঃ- সাবিহা দরজা খোল

রাশেদের কঠোর কণ্ঠ শুনে ভেতরে থেকে ঝিমুনি নামে।সাবিহা কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে দিলো ।রাশেদ ঢুকে পড়লেন ইলার রুমে চোখে তীব্র অভিযোগ, হাত দিয়ে লাঠিটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন
রাশেদঃ- অকে কি চোর পেয়েছো কেনো এভাবে মারছো আমার মেয়েটাকে।
ইলার মেজো বাবা, বড় বাবা সবাই ভীড় করে ভেতরে ঢুকল। প্রত্যেকের কণ্ঠে রেগে ওঠা, কষ্ট, কিন্তু সমঝোতার ভাষা ছিল। তারা ইলার মাকে চাপ দিলেন না। কিন্তু বললেন এভাবে মারা ঠিক হয়নি। ইলাকে দেখে সবাই থমকে গেল রক্ত-চিহ্ন, কাপড় ভর্তি। রাশেদ মেয়ের কাছে এসে বুকে চেপে ধরে বললেন
রাশেদঃ- ইলা মা তুই কষ্ট পেয়েছিস আমি আসছি। আর কেউ তোকে মারতে পারবে না।
ইলার অবস্থা দেখে রাশেদ ইলার মায়ের দিকে কড়া চোখে তাকালেন
রাশেদঃ- তোমার আচরণ অগ্রহণযোগ্য সাবিহা এভাবে কেউ কাউকে মারে।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭

সাবিহা তখন সরলতা ও লজ্জা নিয়ে থমকে গেলেন তিনি নিজের রাগ আর হতাশা দেখে খানিকটা কাঁপলেন। পরিবারের বড়রা অবস্থা সামলালেন ইলা কাঁদতে কাঁদতে বাবার কোলে ঢুকে পড়ল।সবাই মিলে ইলার মা-কে বাইরে নিয়ে গেলো। ইলার মা বাইরে গিয়ে নিজেও কান্না করে দেয় ইলাকে এভাবে মারার জন্য নিজের হাত দেয়ালের সাথে বাড়ি মারে আর কান্না করে।
রাশেদ তালুকদার দ্রুত ইলার চিকিৎসা করার জন্য ডাক্তার কে ফোন করলো। ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে গেলো, বড়বাবা ও মেজো বাবা সাবিহাকে বুঝালেন অচিরেই তার আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে, নাহলে বড় কোনো অঘটন ঘটে যাবে।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৯