ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ১০০
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
সপ্তদশী কন্যা থিরা ভীতিত্রস্ত চিত্তে জড়োসড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জং ধরা ছোট্ট টিনের চালাটার নিচে।
মরচে পড়া টিনের ফুটো চালা বেয়ে যত্রতত্র পানি চুইয়ে পড়ছে। বারবার সরে সরে দাঁড়াচ্ছে থিরা। সে মহা বিরক্ত। বিগত ঘণ্টা চারেক যাবৎ একটানা মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে যায়, তমসাচ্ছন্ন হয়ে আসছে চারপাশ; কিন্তু এখনও এই মরার বৃষ্টি কমার জো নেই। বরং উল্টো সেকেন্ড সেকেন্ডে বৃষ্টির ছাঁট বাড়ছে।
এই বর্ষাস্নাত বিকেলে শুনশান সড়ককিনারে একাকী দাঁড়িয়ে আছে থিরা।
আকাশে গোমোট ভাব। এতক্ষণ শুধু বৃষ্টি থাকলেও এখন ঝড়-বাতাস বইতে শুরু করেছে। দক্ষিণের শোঁ শোঁ বাতাসের বেগ কানে এসে লাগছে; মনে হচ্ছে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তুমুল ঝড় শুরু হবে।
আতঙ্কিত হয় থিরা, আরো গুটিয়ে যায়। সামনে চওড়া কালো পিচঢালা রাস্তা, দুই পাশে সারি সারি শাল-সেগুন গাছ আর নিচে বিস্তৃত অন্ধকার ধানজমি।
থিরা হাতের কবজি তুলে ঘড়িতে সময় দেখে নেয়—বিকেল ৫টা ২৫।
গরমের দিনে সন্ধ্যা একটু দেরিতেই হয়, কিন্তু পরিবেশের গুমোট ভাব আর মেঘাচ্ছন্ন আকাশের জন্য মনে হচ্ছে এখুনি সন্ধ্যা নেমে আসছে।
ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের আজ শেষ বিষয়ের পরীক্ষা ছিল। ১টার মধ্যেই কলেজ শেষ হয়ে যায়। আজ বাড়ির গাড়ি নিয়ে আসেনি থিরা। ভেবেছিল কলেজ লাইফের শেষ দিনটা স্মরণীয় করবে, সারাদিন বান্ধবীদের সাথে ঘোরাঘুরি করবে, অনেক মজা করবে; কিন্তু কে জানতো এভাবে স্মরণীয় হবে। আকাশ সকালেও পরিষ্কার ছিল।
কপালমন্দ হলে যা হয়। তাড়াহুড়োয় বাসায় ফিরতে গিয়ে এখানে আটকা পড়েছে থিরা।
এই মাঝ রাস্তায় এসেই ট্যাক্সিওয়ালার বউটাকে মরতে হলো। যত্তসব উটকো ঝামেলা; আজকাল মানুষের বিবেক নেই।
একটা যুবতী মেয়েকে এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে গেছে। এখানে নেটওয়ার্কও নেই যে একটা ফোন করবে। আর কেউ ফোন করলেও পাবে না।
“মুশকিল…”
এসব হিজিবিজি ভাবতে ভাবতে হঠাৎ “আহ্” করে উঠলো থিরা। তাশ করে ডান হাতের বাহুতে একটা থাবড়া মারলো। সাথে সাথেই রক্ত চুষে জয়ঢাক হয়ে যাওয়া মশাটা ঠাস করে ফেটে গেলো।
জায়গাটা চুলকাতে চুলকাতে লাল করে ফেললো থিরা।
বিরক্তিতে চিকন নাকটা উঁচু হয়ে গেলো। রাগে গজগজ করতে করতে বলল—
— “শালা বেয়াদব মশা, রক্ত চুষার জন্য আর মানুষ পেলি না? বেছে বেছে আমাকেই! ওরে শোন হতচ্ছাড়া, আমি শিকদার বংশের মেয়ে। আমার রক্ত চুষে হজম করা অত সহজ না।”
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে মশার উপদ্রব বাড়ছে হুহু করে।
থিরা বিড়বিড় করে কিছু বলছিল। এর মধ্যেই আকস্মিক বিকট শব্দে পিলে চমকে উঠলো থিরার। চকিতে সামনে তাকালো। সামনের দৃশ্য মানসপটে ভাসতেই হৃৎপিণ্ডের গতি বিপদসীমা ছাড়িয়ে গেলো মেয়েটার। না, এটা বাজ পড়ার শব্দ নয়।
তার চোখের সামনেই একটা কালো রঙের রেসিং বাইক ঝড়ের বেগে ছুটে এসে একপাশে কাত হয়ে উল্টে গেলো। স্লিপ করে চলে গেল অনেক দূর।
দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করতেই টানানো চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে গেল থিরার।
সে আরো দেখলো মাথায় হেলমেট পরিহিত লোকটা মুহূর্তেই বাইকের নিচে চাপা পড়ে গেলো।
আতঙ্কে উঠলো থিরা।
সে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দ্রুত নেমে পড়লো রাস্তায়। দৌড় লাগালো বাইকটার দিকে।
বাইকটা স্লিপ করে প্রায় কয়েক হাত দূর গিয়ে থেমেছে। থিরার আকাশি রঙা কলেজ ইউনিফর্মটি প্রবল বৃষ্টির ছাঁটে দুই সেকেন্ডে ভিজে শপশপে হয়ে গেলো।
থিরা লোকটার কাছে গিয়ে দেখলো লোকটা কেমন বেকায়দায় পড়ে আছে। দুই হাতের কনুই ছিঁড়ে রক্ত পড়ছে। নড়াচড়া করার চেষ্টা করছে হয়তো লোকটা। মুখে কালো হেলমেট, গায়ে স্কিন-টাইট টি-শার্ট, উপরে লেদার জ্যাকেট।
লোকটার রক্ত কালো পিচের উপর পড়ছে, আবার প্রায় সাথে সাথেই বৃষ্টির পানিতে মিলিয়ে যাচ্ছে।
হয়তো কাঁধ, হাঁটু আর পিঠও মারাত্মকভাবে ইনজার্ড হয়েছে, কিন্তু পোশাকের আবডালে তা দেখা যাচ্ছে না।
কিছু না ভেবে আচমকা অপরিচিত লোকটার বাহু টেনে ধরলো থিরা। ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে উদ্বেগ ফুটিয়ে তুলে বললো—
— “ইশ, আপনার তো রক্ত পড়ছে! আমাকে ধরে উঠার চেষ্টা করুন।”
বলে নিজের কোমল ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিলো থিরা।
অপরিচিত নারীকণ্ঠ শুনে লোকটা বোধহয় ফিরে তাকালো থিরার পানে। তার চোখে-মুখে ব্যথা কতটুকু তা হেলমেটের জন্য ঠাওর করতে পারলো না থিরা। তবে ধরে নিলো লোকটা অনেক ব্যথা পেয়েছে।
থিরা এবার লোকটার পা শক্ত করে ধরে বাইকের নিচ থেকে টেনে বের করার চেষ্টা করলো। ৪৬ কেজির এতটুকু মেয়ে কী আর পারে; তবু অনেক টানা-হেঁচড়ার পর সফল হলো থিরা।
লোকটার হাতের বাহু নিজের ছোট্ট কাঁধে তুলে বললো—
— “সাবধানে, ধীরে ধীরে উঠুন।”
হেলমেটের আড়ালে আবদ্ধ চোখ দুটো বুঝি এতক্ষণে বিস্ময়ে রহস্য হারিয়ে ফেলেছে। মেয়েটা কী পাগল, নাহলে কেউ একজন অপরিচিত মানুষকে ধরে এভাবে টানা-হেঁচড়া করে?
আর কী আশ্চর্য যে নিজেই ছোট্ট-খাটো একটা খরগোশের বাচ্চার মতো। তার কাঁধে আবার ভর দিয়ে নাকি দাঁড়াবে ৮১ কেজির নির্ভান শাহরিয়ার মির্জা?
নির্ভানের ভাবনার মধ্যেই থিরা ফের বললো—
— “কী হলো? বালির বস্তার মতো এভাবে লেটকা মেরে পড়ে আছেন কেন? এখানেই পাকাপাকি থাকার ইচ্ছা নাকি? উঠুন তারাতারি।”
মেয়েটার কথায় অপমানিত বোধ করলো নির্ভান; তবে মেয়েমানুষের সাথে ঝামেলায় জড়াতে চায় না।
থিরার কথায় পাত্তা দেয় না নির্ভান। ওর হাত সরিয়ে নিজে নিজে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হাঁটুতে বল প্রয়োগ করার প্রায় সাথে সাথেই আবার মুখ থুবড়ে পড়ল নির্ভান।
ঠোঁট ছুঁটে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো—
— “উফফ্…”
আবারও চিৎ হয়ে পড়লো নির্ভান।
লোকটার কাণ্ডে ভ্রু কুঁচকে ফেললো থিরা। কী খারাপ লোক, সে যেচে পড়ে উপকার করতে চাচ্ছে আর তাকেই নাকি ইগনোর করছেন। মুহূর্তেই ইগো হার্ট হয়ে গেলো থিরার। ব্যঙ্গ করে বলল—
— “শেষ বীরপুরুষের দম ফুরিয়ে গেলো? আমার চোখের সামনে ছাল ছড়ানো মুরগির মতো পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন। তাহলে এত কিসের তেজ?”
কথাগুলো বেশ অপমানের সুরেই বললো থিরা।
মেয়েটার চটাং চটাং কথার ফুলঝুরিতে এবার বিরক্ত হলো নির্ভান। প্রকাণ্ড ধমক দিতে গিয়েও পারলো না। কারণ মেয়েটা দয়ালু। একজন অপরিচিত মানুষকে বিপদে দেখে কিছু না ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
থিরা আর লোকটার প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা করলো না। নিজেই পুনরায় বাহু তুলে নিজের কাঁধে রাখলো।
নির্ভানও আর কিছু বললো না। এক হাত থিরার কাঁধে রেখে অন্য হাতের তালু রাস্তাতে চেপে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
থিরার অনুভব হলো তার কাঁধের নরম নরম হাড়গুলো বুঝি এখুনি মটমট করে ভেঙে পড়বে। প্রকাণ্ড চাপ অনুভূত হলো কাঁধে; তবে টু শব্দ করলো না থিরা। ধীরে ধীরে নির্ভানকে নিয়ে ওই টিনের চালার দিকে এগোতে ধরলো।
নির্ভান হাঁটতে পারছে না। সে দাঁড়াতেই থিরা দেখতে পেল প্যান্টের নিচ দিয়ে পা গড়িয়ে গড়িয়ে রক্ত নামছে। আর বৃষ্টির ছাঁটে সেটা ধুয়ে মুছে যাচ্ছে দ্রুত।
নির্ভান চলতে পারছে না। প্রতিটা পদক্ষেপে মনে হচ্ছে তার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। কাটা-ছেঁড়া জখম জায়গাগুলো দিয়ে পানির স্রোতের মতো রক্ত বের হচ্ছে। তবু পুরুষালী দম্ভ ভেঙে ব্যথাতুর আর্তনাদ করতে পারছে না নির্ভান।
থিরা ধীরে ধীরে নিয়ে গেলো সেই ছোট্ট টিনের ছাউনিটার নিচে। ব্যথায় চোখ-মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে নির্ভানের। চেহারা ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না নির্ভান।
থিরা নিজেকে সামলে আশেপাশে দেখতে লাগলো। লোকটাকে বসানোর কোনো উপযুক্ত জায়গা নেই। সব জায়গায় পানি পড়ছে। এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে লোকটার জ্বর চলে আসবে।
দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা হজম করছে নির্ভান—
— “আমাকে ছাড়ো মেয়ে, আমি একদম ঠিক আছি। সামান্য কেটেছে, সামলে নেবো আমি।”
সব মিলিয়ে থিরা এমনিতেই মহা বিরক্ত। তাই নির্ভানের সাধারণ কথায় চেঁটে গেলো। সুমিষ্ট কণ্ঠে ঝাড়ি মেরে বললো—
— “একদম চুপ করুন তো মিয়া, নাহলে এখানে আছাড় মেরে ফেলে আপনার অন্য পাটাও ভেঙে দেবো।”
মেয়েটার ঝাড়ি খেয়ে বেকুব বনে গেলো নির্ভান। এই পুঁচকে মেয়েটা তাকে ধমকাচ্ছে। মনে মনে বললো—নির্ভান শাহরিয়ার মির্জা, তোমার এত দুর্দিন চলে এলো। তবে আর তর্ক করতে পারলো না নির্ভান। মেয়েটাকে ধমকানোর শক্তিও নেই।
পায়ের হাড় ভেঙেছে কিনা কে জানে। প্রচণ্ড ব্যথায় মুখ দিয়ে গোঙানি বেরোতে চাচ্ছে।
ঝুম বর্ষণ হচ্ছে। বৃষ্টির চাটে দূরের সবকিছু ঝাপসা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে ধরিত্রীর বুকে অন্ধকার নেমে আসছে ধীরে ধীরে। ঝড়ের তান্ডবে আশেপাশের গাছগুলো দুলছে।
থিরা পেছনে তাকিয়ে দেখলো একটা কাঠের দরজা লোহার জিঞ্জির দিয়ে আটকানো।
নির্ভানের প্রকাণ্ড শরীরের ভরে কাঁধ-পিঠ টনটন করছে থিরার।
লোকটারও নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হচ্ছে। ব্যাটা বহুত খারাপ ভাঙবে, তবু মচকাবে না। কথা ভাবতেই মনে মনে মুখ ঝামটা দিলো থিরা।
ধীরে এগিয়ে গেলো দরজার কাছে। জিঞ্জিরটা বেশি উপরে নয় বিধায় হাত বাড়িয়ে খুলে দিল থিরা। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার দেখেই বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে উঠলো থিরার।
বাহিরে সন্ধ্যা মিলিয়ে রাত হয়ে যাচ্ছে। দূরের ধানজমির অপার থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে।
দুজন যুবক-যুবতী ভেজা অবস্থায় কেউ দেখলে কী বকবে—কথাগুলো ভাবতেই হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেলো থিরার। তবুও আর উপায় নেই।
ভয় পেলেও ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে গেলো থিরা।
কোনো মতে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে ফ্ল্যাশলাইট অন করলো।
ঘরের চারপাশ জরাজীর্ণ, যত্রতত্র মাকড়সার জালে ঘেরা। মনে হয় অনেকদিন কেউ থাকে না।
ঘরে একটা আসবাবপত্রও নেই। কেবল এক কোণে বেশ খানিকটা খড়ের স্তূপ।
খড়ের স্তূপ দেখে খুশি হয়ে গেলো থিরা। আর যাই হোক, মাটিতে তো বসাতে হবে না নির্ভানকে। ধরে ধরে নিয়ে খড়ের গাদায় বসালো থিরা।
বসার সময় পায়ের ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠলো নির্ভান। পা দিয়ে এখনো রক্ত পড়ছে। থিরা দেখলো লোকটা এখনো হেলমেট পরে আছে।
লোকটার পাশে কলেজ ব্যাগ খুলে রাখলো থিরা।
নিজেও পাশে বসে পড়লো। ব্যাগ থেকে রুমাল বের করতে করতে খোঁচা মেরে বলল—
— “আপনি কি পর্দাশীল পুরুষ নাকি?”
— “মানে?”
— “মানে এই যে এমন দমবন্ধকর পরিস্থিতিতেও পর্দা করে বসে আছেন! মানে হেলমেট পরে বসে আছেন।”
থিরার কথায় খেয়াল হলো নির্ভানের। এই জন্যই তার অস্বস্তি এতো বাড়ছে, এতো স্যাফোকেশন হচ্ছে। মাথার হেলমেটটা টেনে হিঁচড়ে খুলে ফেললো নির্ভান। গায়ের সাথে লেগে থাকা ভিজে চুপচুপে রাইডিং জ্যাকেটটাও খুলে ছুড়ে ফেললো।
ভেতরের কালো স্কিন-টাইট টি-শার্টটাও ভিজে আটোসাটো হয়ে লেগে আছে গায়ের সাথে।
ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় জ্বলে বিন্দু বিন্দু ফোঁটাগুলো শিশিরকণার ন্যায় চকচক করছে গলায়।
পেছনে মাথা এলিয়ে দিলো নির্ভান। দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হা করে নিঃশ্বাস ছাড়লো।
শ্বাসের তালে তালে অনবরত ওঠানামা করছে তার অ্যাডামস অ্যাপল।
মুখটা দেখতে পেলো না থিরা। তবে গলায় চোখ পড়তেই থমকে গেলো।
লোকটার গলা ভয়ানক ম্যানলি। অ্যাডামস অ্যাপলের দৌড়াদৌড়ি দেখতে দেখতে সে অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে যেতে নিলেই ঝড়ো বাতাসের ধাক্কায় নড়বড়ে চালের পুরোনো জংধরা টিন গড়াং করে শব্দ করে উঠলো।
হঠাৎ কেঁপে উঠলো থিরা। মায়াবী জগৎ থেকে ছিটকে পড়লো। নিজের কাণ্ডে নিজেই বেকুব বনে গেলো থিরা।
নিজের কাছেই নিজে লজ্জিত হলো। ছিঃ, সে এসব কী করছিল।
নিজেকে কঠোরভাবে ধমকালো থিরা। আবারো মনোযোগ দিলো নির্ভানের পায়ে। রক্তপড়া বন্ধ করা দরকার। ঘরে ফ্ল্যাশলাইটের আলো ব্যতীত আর কোনো আলো নেই। কোনা কোনাগুলো ঘুটঘুটে অন্ধকার।
এদিক-সেদিক তাকাতেও ভয় লাগছে।
থিরা কম্পিত হাতটা বাড়িয়ে দেয় নির্ভানের পায়ে। প্যান্টটা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে। ফর্সা পায়ের আঙুলগুলো, বড়ো বড়ো নখগুলো একদম ক্রিস্টাল ক্লিয়ার।
থিরা ঢোক গিলে প্যান্টে হাত দিতেই চমকে উঠলো নির্ভান। তড়াক করে চোখ মেলে তাকালো থিরার পানে।
ভড়কে গেলো থিরাও।
— “আসলে আমি…”
কিছু বলার উদ্দেশ্যে মাথা তুলে তাকাতেই চোখে চোখ মিলে গেলো দুজনের। লোকটার চোখে চোখ পড়তেই সাজানো বাক্যগুলো গলায় উঠে ঝটপাকিয়ে গেলো থিরার।
হৃৎস্পন্দন কেমন তুমুল শব্দে বাড়তে লাগলো। কিশোরীর সতেরো বছরের জীবনে এটা বোধহয় প্রথমবার যে কোনো পুরুষের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে এমন হলো।
রুদ্ধ দরজার অন্দরে সময়টা যেন থমকে গেছে।
হালকা আলো আর টিনের চালে ঝুমঝুম করে একটানা বৃষ্টি পড়ার শব্দ পরিবেশটাকে করে তুলেছে মোহনীয়। ঝড়ের তান্ডবে চালের মরচে পড়া টিনগুলো দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেসব ধ্যান নেই কিশোরীর।
— “কী করছো?”
থমথমে ভারী পুরুষালী কণ্ঠে ঘোর কেটে গেলো থিরার। চোর ধরা পড়ার মতো করে দৃষ্টি লোকালো। আমতা-আমতা করে বললো—
— “আপনার রক্ত পড়ছে। কোথাও হয়তো গভীর জখম হয়েছে। সে-সেটাই দেখতে চাচ্ছিলাম।”
অস্থির দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে প্রত্যুত্তর করলো থিরা।
— “এসব কিছু না। কিছুই করতে হবে না। বাদ দাও।”
বলে আবারো দেওয়ালে মাথা এলিয়ে দিলো নির্ভান। এবার তার চোখ-মুখ ব্যথায় ফুটে উঠছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যথার প্রকোপ বাড়ছে।
লোকটার চেহারায় ফুটে ওঠা ব্যথার চাপ স্পষ্ট অবলোকন করতে পারে থিরা। তাই এমন ঘাড়তেড়া স্বভাবে বিরক্ত হয়।
থিরা এবার আর অনুমতির তোয়াক্কা করে না। নিজেই ব্ল্যাক জিন্সটা গোড়ালি থেকে টেনে উপরে তুলতে শুরু করে।
— “আরে আরে, কী করছো? এমন হাতাহাতি করছো কেনো?”
— “একদম চুপ। এই মুহূর্তে আপনার থেকে আমার শক্তি বেশি। বেশি পকপক করলে যে পাটা ভালো আছে, ডান্ডার বাড়ি মেরে ওটাও ভেঙে দেবো।”
মেয়েটার আচরণে হতবাক হয়ে গেলো নির্ভান। একজন অপরিচিত মানুষের জন্য মেয়েটা এত কেনো করতে চাচ্ছে?
— “এটা কী? জোর যার মুল্লুক তার?”
নির্জীব কণ্ঠে শোধালো নির্ভান।
— “বলতে পারেন।”
হাঁটুর নিচের মাংস থেঁতলে গেছে নির্ভানের। আর ওই ক্ষতস্থান চুইয়ে চুইয়ে অনবরত রক্তপাত হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠে থিরা।
তবুও কাঁপা হাতে শুকনো রুমালটা পেঁচিয়ে আস্তে করে বেঁধে দেয়।
কুঁকিয়ে উঠে নির্ভান। অস্ফুটে ব্যথাতুর শব্দ বেরিয়ে আসে মুখ দিয়ে—
— “ওহ্… উফফফ!”
হাঁটু, কোমর, পিঠ, কাঁধ—এসবের ব্যথায় চোখ মেলে রাখতে পারছে না নির্ভান। ধীরে ধীরে গোঙানি বের হচ্ছে।
ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ।
থিরার মায়া লাগে লোকটার প্রতি। কতোই না কষ্ট পাচ্ছে।
— “পানি খাবেন?”
জবাব দেয় না নির্ভান।
খয়েরি ঠোঁটের রুক্ষ ভাব দেখে থিরা নিজেই বুঝে নেয়। ব্যাগ থেকে নিজের ওয়াটার বটেল বের করে নির্ভানের সামনে ধরে। কিন্তু লোকটা কী আর সেই অবস্থায় আছে।
থিরা নিজেই বোতলের ছিপি খুলে নির্ভানের মুখের সামনে পানির বোতল ধরে—
— “হা করুন!”
নির্ভানও হা করে। ধীরে ধীরে কয়েক ঢোক পানি খাওয়ায় থিরা।
এর মধ্যেই হঠাৎ বিকট শব্দে আকাশে মেঘ গর্জে উঠে। হয়তো কাছেপিঠে কোথাও বাজ পড়ে।
ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। নির্ভানকে ঝাপটে ধরে থিরা। হাত থেকে বোতলটা পড়ে যায় নিচে।
— “এই ঝড়-বাদলার রাতে কারারে ওখানে?…”
হিম শীতল বদ্ধ ঘরে চার দেয়ালের বন্দী দশায় থমকে গেছে জীবনটা। বাইরের রোদ-বৃষ্টি, চাঁদ-সূর্য কিংবা ঘড়ির কাঁটার ছন্দ এখানে অর্থহীন। ঘরের একমাত্র পরিচিত ভাষা মনিটরের একটানা শব্দ—পিপ… পিপ… পিপ…।
মাথার ওপর ঝুলন্ত স্ক্রিনগুলোতে নরম সবুজ বা লাল আলো নিভে নিভে জ্বলে, নিঃশব্দে এঁকে চলে জীবনের টানাপোড়েনের একেকটা ঢেউ। সেন্ট্রাল এসি থেকে ঝরে পড়া হিমশীতল বাতাসে অ্যান্টিসেপটিক আর ব্লিচিং পাউডারের কড়া গন্ধ।
এই যান্ত্রিক কক্ষে যন্ত্রপাতির ভীড়ে মৃতের মতো শোয়ে আছে প্রিয়স্মিতা। চোখ দুটো বন্ধ, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, আঙুলের মাথায় লাগানো ছোট্ট আলোটা জ্বলছে নিভছে। যেনো নিরব থেকে চিৎকার করে বলছে, প্রাণটা এখনো সচল আছে। আইসিইউ-এর প্রতিটি স্পন্দন মৃত্যুর সাথে এক স্বঘোষিত লড়াই।
মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ডক্টর, দৃষ্টিতে চাপা উদ্বেগ।
আইসিইউ থেকে বেরিয়ে এলেন ডক্টর। বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন অন ডিউটি অফিসার তুরান জাওয়াদ। ডক্টর বেরোতে দেখে তুরান এগিয়ে এলো—
— “পেশেন্টের কী অবস্থা ডক্টর? জ্ঞান কবে নাগাদ ফিরতে পারে? পাঁচ মাস ধরে ও ওভাবে পড়ে আছে। ওর কথা বলার খুব জরুরি।”
কয়েক সেকেন্ড নিরব থাকলেন ডক্টর। অতপর ধীরে বললেন—
— “দেখুন অফিসার, উনি যে বেঁচে আছেন এটাই মিরাকল। উনার তো এতদিনে মরে যাওয়ার কথা, কিন্তু কোন প্রাণশক্তিতে এখনো টিকে আছেন জানি না। সুখবর হলো, পেশেন্টের বাঁচার তীব্র ইচ্ছা আছে। সে লড়ছে। একমাত্র তার মনবলই পারে তাকে কোমা থেকে ফিরিয়ে আনতে। আমি তো বলেইছি, উনি কখন জেগে উঠবেন এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। হয়তো এক্ষুনি, নয়তো কখনো নয়। এটা পেশেন্টের উপর নির্ভর করে।”
— “ডক্টর প্লিজ।”
— “সরি অফিসার। আপনি ভেতরে যান, কথা বলুন। চেষ্টা করুন। এখন মনবল, উৎসাহমূলক বাণীই একমাত্র মেডিসিন।”
চলে গেলেন ডক্টর।
তুরানের বড্ড অসহায় লাগছে নিজেকে। ক্রিমিনালকে এতো কাছ থেকে পেয়েও ধরতে না পারার গ্লানিতে ঘুম-নিদ্রা সব উড়ে গেছে। নিজের জান লাগিয়ে দিয়েছে এসএসআরকে খোঁজার মিশনে। একটা জলজ্যান্ত মানুষ কিভাবে কর্পূরের মতো মিলিয়ে যায়—ড্যাম ইট।
বিগত পাঁচ মাস পুলিশ, গভর্নমেন্ট, আইন, নিরাপত্তা কর্মীদের জন্য কেমন দুষ্কর কেটেছে সেটা কেবল তারাই জানে। জনসাধারণের আক্রোশে অনেক পুলিশ কনস্টেবল প্রত্যেকদিন নিহত হচ্ছে। প্রত্যেকটা দেশের গভর্নমেন্ট ভয়ংকর চাপের মুখে আছে। অপরাধী আইডেন্টিফাই হওয়ার পরেও পুলিশ তাকে ধরতে পারছে না।
তীব্র বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ পড়ে তুরানের। মুখ থেকে সূচক শব্দ বেরিয়ে আসে। আইসিইউ-এর দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে তুরান। ধবধবে সাদা বিছানার উপর আধমরার মতো পড়ে আছে প্রিয়স্মিতা। হাত-পা অচল, কেবল ধীরে নিঃশ্বাস টানছে।
তুরান ধীরে এগিয়ে যায় প্রিয়স্মিতার নিকট। নাক, মুখ, চোখ, ঠোঁট—সব অবিকল সেদিনের দেখা মেয়েটার মতো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই মেয়েটাকে দেখে কিছুই অনুভূত হয় না তুরানের। অথচ ওই মেয়েটাকে দেখে বুকের অনলে কী এক জ্বালা-পোড়া শুরু হয়েছিল। এখনো জ্বলে। অথচ এদের দুজনকেই সে তেমনভাবে চেনে না। অথচ ভালোলাগার মানুষটাকে মন ঠিক আলাদা করে চিনে নেয়।
প্রিয়স্মিতার পাশে টুল টেনে বসে তুরান। নিচু কণ্ঠে ডাকে—
— “জুনিয়র অফিসার, আপনি আমার সমস্ত কথা শুনতে পাচ্ছেন অথচ সাড়া দিচ্ছেন না। এটা কিন্তু আমাদের প্রটোকলের খেলাপ।
আমি আপনার সিনিয়র আমি আপনাকে ডাকছি অতছ আপনি নিশ্চুপ।
আপনি জানেন, আপনার এই নিরবতা দেশের জন্য কত বড় বিনাস ডেকে আনছে। সর্বনাশের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব।
সবাই আপনার মুখ চেয়ে আছে, আর আপনি সবার ভরসা এভাবে নষ্ট করছেন?
শুনছেন প্রিয়স্মিতা? আপনি দেশের গৌরব, সমাজের গৌরব। মায়েদের গৌরব মেয়েদের গৌরব। আপনি একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।
সমাজের বেঁকে যাওয়া শিরদাঁড়াটা আপনাকেই টেনে সোজা করতে হবে।
আপনি অগ্নিকন্যা, আপনি জাসির রাণী। আপনাকে উঠে দাঁড়াতেই হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে আপনাকে দাঁড়াতেই হবে। অপরাধীদের মস্তক ছিন্ন করতে আপনাকে অস্ত্র তুলতে হবে।
আপনি বীর যোদ্ধা। আপনার জীবনের লক্ষ্য স্মরণ করুন। জীবনের মহৎ লক্ষ্য ভুলে এমন অসাড় হয়ে শোয়ে থাকা কি আপনাকে মানায়?
আপনি সব শুনতে পাচ্ছেন প্রিয়স্মিতা। স্পিক আপ। জবাব দিন। আপনাকে জবাব দিতেই হবে। আপনাকে রুখে দাঁড়াতেই হবে। প্রিয়স্মিতা”
নাহ্, কোনো সাড়া এলো না। আজকেও কপালে ঝুটলো একরাশ হতাশা।
পুরো কক্ষে তুরানের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ আর আর যান্ত্রিক পিপ-পিপ শব্দের মিশেলে পরিবেশটা ঘোমট।
বুক চিরে ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তুরানের। বিগত পাঁচ মাস যাবৎ এই একই রুটিন সে ফলো করছে। প্রতিদিন আশা নিয়ে আসে—আজ হয়তো মেয়েটা জেগে উঠবে। কিন্তু প্রতিদিন নিরাশ হয়ে ফিরতে হয় তাকে।
পুনরায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো তুরান। পেছন ঘুরে যেতে নিলেই হঠাৎ ঝনঝন করে কিছু পড়ার শব্দ হলো। তীক্ষ্ণ শব্দটা কানে পৌঁছতেই পা দুটো জমে গেলো তুরানের। কেবল দুই পা এগিয়েছিল।
চমকে পেছন ফিরে তাকালো তুরান। প্রিয়স্মিতার চোখের পাপড়ি কাঁপছে, আঙুলগুলো নড়ছে। বিস্ময়ে চোখ দুটো কোটর চালানোর উপক্রম হলো তুরানের। গলা ছেড়ে চিৎকার দিয়ে ডাকলো—
— “ডক্টর…!”
রাত ২টা বেজে ৪৫ মিনিট। রজনীর মধ্য প্রহর চলমান। পুরো শহর নিঝুম নিস্তব্দতার আবরণে ঢাকা।
হালকা শীতল কক্ষে কেবল ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ শোনা যায়। আলোআঁধারিপূর্ণ ঝাপসা অন্ধকারে বিছানার উপর গুটিশুটি মেরে তন্দ্রামগ্ন দুজন নরনারী। নারীটি ঘুমের মধ্যেও শক্ত করে ঝাপটে ধরে রেখেছে তার সঙ্গীকে। বিড়ালছানার ন্যায় মুখ গুঁজে দিয়েছে পুরুষটির উষ্ণ বুকের গভীরে। পুরুষটিও তার বিশাল দুই হাতে আকড়ে ধরে রেখেছে। যেন সব পরিস্থিতিতেই একে অপরকে আকড়ে ধরে রাখতে শিখে গেছে।
— “আহ্!”
নিঝুম কক্ষের পিনপতন নিস্তব্দতাকে চূর্ণ করে আচমকা ব্যাথাতুর আর্তনাদ করে উঠলো প্রিয়তা। বুকে মুখ গুঁজে অবস্থাতেই ফুঁপিয়ে উঠলো শব্দ করে।
প্রণয়ের ঘুম পাতলা। প্রিয়তার সামান্যতম আওয়াজ পেয়ে ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠলো প্রণয়। শোয়া থেকে এক লাফে উঠে বসলো। প্রিয়তার চোখ-মুখ হাতড়ে হাতড়ে অন্ধকারে বুকে টেনে নিলো। আতঙ্কিত কণ্ঠে হড়বড় করে বললো—
— “কী কী কী হয়ে জান? পেট ব্যাথা করছে? ডক্টরের কাছে যাবি? আমি কি অ্যাম্বুলেন্স ডাকবো?”
প্রণয়ের বুকে মুখ গুঁজে রেখে এবার বাচ্চাদের মতো ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠলো প্রিয়তা। ঠোঁট উল্টে অভিযোগ করলো—
— “আপনার ছোট্ট শয়তানটা অনেক দুষ্টু হয়ে গেছে, প্রণয় ভাই! শুয়ে শুয়ে আমাকে আবার লাথি মারছে!”
নাক টানতে টানতে ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল প্রিয়তা।
প্রিয়তা স্বাভাবিক আছে বুঝতে পেরে কলিজা যেন পানি এলো প্রণয়ের। দীঘল চুলের ভাঁজে ধীরে আঙুল চালাতে লাগলো। আদুরে বুলিতে বললো—
— “ফিলিং বেটার, রক্তজবা?”
— “অহুহ্…”
প্রণয়ের বড়ো হাতটা টেনে নিয়ে নিজের বাড়ন্ত উঁচু পেটের উপর রাখলো প্রিয়তা। গাল ফুলিয়ে বললো—
— “নিজেই ফিল করুন।”
নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করতে লাগলো প্রণয় নিজের একরত্তি অংশকে অনুভব করার।
বাবার উপস্থিতি টের পেতেই নড়াচড়া করা বন্ধ করে দিলো ক্ষুদে প্রাণটা। হয়তো বুঝতে পারে বাবা বকবে, তাই লুকিয়ে লুকিয়ে ইচ্ছা মতো লাথি মারে মায়ের পেটে।
নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেছে উপলব্ধি করতে পেরে চোখ বড়ো বড়ো করে ফেললো প্রিয়তা। গালে হাত দিয়ে বললো—
— “মনে হচ্ছে আমার মতোই আপনাকে ভয় পায়! অহু… ওহু… কার ছানা দেখতে হবে নাহ্? মনে হচ্ছে মায়ের মতোই বুদ্ধিমতী হবে।”
বলেই খিকখিক করে হেসে উঠলো প্রিয়তা।
— “মায়ের মতো মাথামোটা গোবরপোড়া হলে দেখতে হবে নাহ্।”
হাসি থামিয়ে দিলো প্রিয়তা। অন্ধকারে চোখ সরু করে থাকলো।
— “আপনি কী ইনডিরেক্টলি আমাকে অপমান করলেন?”
— “সরাসরি করলাম।”
প্রিয়তা পুরো ঝগড়ার মুডে চলে এলো। নাক উঁচু করে যথাযোগ্য জবাব মুখের উপর ছুড়ে দিতে গেলেই আবারো—
— “আহ্!”
চোখ-মুখ কুঁচকে ব্যাথাতুর আর্তনাদ করে উঠলো প্রিয়তা। সহ্য করতে না পেরে কামড়ে ধরলো প্রণয়ের বাহু।
প্রণয়ের ভেতর কেমন অসাড় হয়ে এলো অনুভূতির তোড়ে। তার হাতের তালুতে ক্রমাগত অনুভূত হচ্ছে তার ক্ষুদে অংশ—তার নিজের অংশ। কথাটা ভাবতেই বুকটা ভরে উঠল প্রণয়ের। পিতৃত্বের সুখ বুঝি এতো মধুর হয়?
ছোট্ট বাচ্চাটা অনবরত হাত-পা ছুঁড়ছে, নড়াচড়া করছে। প্রেগন্যান্সির পাঁচ মাস পর থেকেই শুরু হয়েছে এই জিমনাস্টিক প্রতিযোগিতা—হাত-পা ছুঁড়াছুঁড়ি, লাথি-লাথি। রাতের বেলা একটুও ঘুমাতে পারে নাহ্ প্রিয়তা। যখন-তখন চিৎকার দিয়ে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠে।
হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিল প্রণয়। সাথে সাথেই মোহনীয় হলদে আলোয় ভরে উঠলো চারপাশ।
প্রণয়কে আকড়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে কাঁদছে প্রিয়তা। প্রণয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তার হালকা হালকা স্ট্রেস মার্ক যুক্ত পেটের উপর ছোট্ট ছোট্ট দুটো পা ভেসে উঠছে হঠাৎ হঠাৎ। প্রেয়সীর ব্যাথায় বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো প্রণয়ের। পেটটাকে ফুটবল খেলার মাঠ বানিয়ে ফেলেছে।
টি-শার্ট উঠিয়ে আট মাসের উঁচু পেটে ঠোঁট চেপে ধরলো প্রণয়। ছোট্ট ছোট্ট চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলো নিজের অনাগত অংশকে। আদুরে কণ্ঠে ধমকের সুরে বললো—
— “Stop, baby… stop hurting my love! You’re not a naughty little boy or girl, are you?”
বাচ্চাটা যেন আবার লাথি দিলো—প্রণয় যেখানে ঠোঁট চেপে ধরেছিল ঠিক সেখানেই। মৃদু হাসলো প্রণয়। ফিসফিসিয়ে বললো—
— “Do you like talking to Papa? Say, ‘Yes, my baby.’”
বাচ্চাটা নড়লো। ঠোঁটের হাসি যেন আরো চওড়া হলো প্রণয়ের। কণ্ঠে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বললো—
— “Did you say yes? Do you want to be in Papa’s arms, my baby?”
আবারো প্রণয়ের ঠোঁটের উপর পা ছুঁড়ে দিলো বাচ্চাটা। যেন বাবার সাথে কথা বলতে পেরে সেও খুশি। চোখের কোনে স্বচ্ছ পানি ঝিলিক দিয়ে উঠলো প্রণয়ের। পায়ের ছাপ ফোটে ওঠা জায়গাটার উপর অসংখ্য চুমু আঁকতে আঁকতে আবেগী স্নেহমাখা কণ্ঠে বললো—
— “Papa is excited too, my baby. Papa can’t wait to hold you in his arms too.”
— “Just a little longer, my sweetheart… Papa will hold you in his arms very soon. So be a good baby for Papa, okay?”
— “বাবা-ছেলের গোপন শলা পরামর্শ শেষ হলে আমাকে কী একটু পাত্তা দেওয়া যাবে, প্রণয় ভাই?”
গাল ফুলিয়ে কথাটা বললো প্রিয়তা।
— “হিংসে করছিস?”
কপাল কুঁচকে বললো প্রণয়।
— “হুঁহ্… আমার বয়েই গেছে।”
অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ঝাড়ি মেরে বললো প্রিয়তা।
ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রণয়। প্রিয়তার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো—
— “সে তো আমি দেখতেই পাচ্ছি কেউ কীভাবে হিংসার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে। কেমন পোড়া-পোড়া গন্ধ বের হচ্ছে—তুই কী পাচ্ছিস?”
এবার রেগে গেলো প্রিয়তা। মুখ ঘুরিয়ে আচমকা প্রণয়ের কলারবোনের পাশে জুড়ে কামড় বসিয়ে দিলো। রাগে দাঁত চেপে বললো—
— “একদম চুপ! আপনি শুধু আমার! আপনাকে শুধু আমি ভালোবাসবো। আর আপনি সব থেকে বেশি ভালো আমাকে বাসবেন।”
মুখের লালা সমেত গলায় দুই পাটি দাঁতের দাগ বসিয়ে দিলো প্রিয়তা। তবুও টুঁ শব্দ করলো নাহ্ প্রণয়।
এবার প্রিয়তা নিজের পেটের উপর হাত রেখে নিজের অনাগত শিশুকে নিজের সীমা বুঝিয়ে দিলো। চোখ গুলগুল করে ধমকে বললো—
— “কদিন পর যখন আসবে, একদম আমার প্রণয় ভাইয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করবে নাহ্। He is my husband. তার সব ভালোবাসা একা আমিই নেবো। পরে যদি এট্টু বাঁচে তাহলে নাহয় তোমাকে দেবো।”
বাচ্চাটা যেন এহেন সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা জানালো। তৎক্ষণাৎ সজোরে লাথি দিয়ে আবার কান্না করিয়ে দিলো প্রিয়তাকে।
অন্ধকার কক্ষে শব্দ করে হেসে উঠলো প্রণয়। তার ভারী স্বরের উচ্চধ্বনিতে ব্যাথা ভুলে গেলো প্রিয়তা। তার মাথায় আলতো টোকা দিলো প্রণয়। ফুলকো গাল দুটো টেনে দিয়ে বললো—
— “আমার হিংসুটে বুড়ি। নিজের বাচ্চা-কাচ্চার উপর এতো হিংসা? ১৯-২০ হলে তুই তো আমার বাচ্চাগুলোকে গলা টিপে মারবি।”
— “ওয়েইট…গুলো? কতোগুলো?”
চোখ সরু করে শুধালো প্রিয়তা।
— “আমার মুরগি যতগুলো ডিম পাড়তে পারবে ততগুলো।”
— “আমি মুরগি?”
— “অবশ্যই তুই মুরগি আর আমি নেউল।”
— “নেউল? কেনো? কেনো নেউল কেনো? সবাই তো শিয়াল হয়ে চায়।”
— “শিয়াল শুধু মুরগি খেতে পারে। আর নেউল সাপের হাত থেকে নিজের মুরগিকে রক্ষাও করে।”
— “সত্যি?”
— “দেখিসনি?”
— “দেখেছি।”
চোখ বুজে হাসলো প্রিয়তা। দুই হাতে পেট জড়িয়ে ধরলো। প্রশস্ত বুকে মাথা এলিয়ে সস্তির নিঃশ্বাস ফেললো রমণী।
— “হুম হুম… অনেক হয়েছে। দেখি এখন ঘুমা।”
প্রিয়তার তুলতুলে কায়া শক্ত পাঁজরে জড়িয়ে পুনরায় শোয়ার প্রস্তুতি নিলো প্রণয়।
চট করে সোজা হয়ে বসলো প্রিয়তা। তৎক্ষণাৎ দুই পাশে মাথা নাড়ল—যার অর্থ সে আর ঘুমাবে নাহ্।
— “তাহলে কী করবি?”
চোখের মণি ঝিলিক দিয়ে উঠলো প্রিয়তার। আচমকা থুতনি চেপে ধরে টুক করে প্রণয়ের খোঁচা-খোঁচা দাড়িযুক্ত গালে গোটা দশেক চুমু খেলো।
আদরের বাহার দেখে কপাল কুঁচকে গেল প্রণয়ের। এক ভ্রু উঁচিয়ে সন্দিহান কণ্ঠে শুধালো—
— “কী মতলব?”
জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তা। আহ্লাদী কণ্ঠে বলল—
— “ঘুরতে যাবো। আপনার সাথে রাতের শহর দেখবো। শহরের নিস্তব্ধতা উপভোগ করবো। সবাই ঘুমাবে, শুধু আমরা জেগে থাকবো।”
— “এখন অনেক রাত, জান।”
— “তবুও যাবো।”
মেয়েটার কণ্ঠে স্পষ্ট জেদ। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো প্রণয়—
— “ভেবে বলছিস?”
— “হুম… একদম ভেবে বলছি।”
প্রণয়ের বাহু চেপে ধরলো প্রিয়তা।
— “ঠিক আছে।”
উঠে গিয়ে ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে দিলো প্রণয়। বিছানার এক কোণে রাখা সাদা পাঞ্জাবিটা তুলে গায়ে জড়িয়ে নিলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাদা-কালো রঙের কেফিয়েহ দিয়ে মুখটা কভার করে নিলো প্রণয়।
প্রিয়তা হাঁটুর ভাঁজে থুতনি রেখে একদৃষ্টিতে হা করে তাকিয়ে আছে নিজের একান্ত পুরুষের পানে। লোকটাকে সর্বক্ষণ এতো দেখে এতো দেখে তবুও পরান জোড়ায় নাহ্, নয়নের তৃষ্ণা মেটে নাহ্। আচ্ছা, মানুষটাই কী এতো সুন্দর, নাকি সে পাগল হয়ে গেছে?
পাঁচ মাসে প্রিয়তার শারীরিক পরিবর্তন এসেছে ব্যাপক। ছিপছিপে গড়নের আদুরে মেয়েটা গুলুমুলু হয়ে গেছে অনেকখানি। সারা শরীর জুড়ে মাতৃত্বের চাপ। চেহারায় লাবণ্য উপচে পড়ছে। ধবধবে ফর্সা পা দুটোতে পানি এসে ফুলে গেছে। দুই কদম হাঁটলেই হাঁপিয়ে যায় মেয়েটা। মানসিকভাবেও নাজুক হয়ে গেছে—অল্পতেই কেঁদে ফেলে। রাতবিরেতে আজব আজব বায়না করে। প্রণয়ও হাসিমুখে সবটা মেটায়।
প্রিয়তার চুলের লেন্থ কয়েক মাসে আরেকটু বেড়েছে—হাঁটুর অনেকটা নিচে নেমে গেছে কেশরাশি। প্রিয়তা লম্বা চুলগুলোতে তেল দিয়ে সুন্দর করে বেণী করে দিলো প্রণয়। নিজের হাতে কালো বোরখা আর নিকাবে আবৃত করলো নিজের দুর্বলতাকে।
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৯
— “আমরা অনেকক্ষণ ঘুরবো, প্রণয় ভাই।”
— “আচ্ছা।”
প্রিয়তাকে কোলে নিয়ে নীরব শহরের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা গলিতে হাঁটছে প্রণয়। শুনশান রাস্তাঘাট, মাথা-উঁচু উঁচু অট্টালিকা। কপোত কপোতির কথোপকথন আর খিলখিল হাসির শব্দে মুখরিত হচ্ছে পরিবেশ। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে জোড়া শালিকের প্রেমালাপে।
কাবুল শহরের অলিগলিতে প্রেমের বৃষ্টি নামে নিবৃত্তে। কিছু কথা কিছু স্মৃতি ঢাকা পড়ে ধুলোবলি মাখা ইট পাথরের শহরে।
