Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৭

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৭

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৭
মুশফিকা রহমান মৈথি

একটা মানুষ ঠোঁটকাটা হতে পারে। নির্লজ্জ হতে পারে৷ কিন্তু সেই মাপকাঠিটা কেমন? কোন লেভেলে সেটা অসহ্য হয়ে উঠে! এই প্রশ্নটা যদি কাঞ্চনকে শুধানো হয় তবে সে এক শব্দে উত্তর দিবে,
“স্নিগ্ধ”
স্নিগ্ধ নির্লজ্জ, বেশরম একটা পুরুষ। সে এক ঘর ভর্তি লোকের সামনে খটাশ করে এমন একটা কথা বলেছে যা শুনে উপস্থিত সকলেই কিঞ্চিত বিব্রত এবং থতমত খেয়েছে। আর কাঞ্চনের গাল লাল হয়ে উঠেছে। কান থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। কাজিনমহল ঠোঁট টিপে হাসছে। বিশেষ করে রিদম এবং তাশদীদ। এদিকে সাদা হসপিটাল গাউন পড়া ব্যক্তি নির্বিকার। তার ভাবমূর্তির কোনো বিশেষ পরিবর্তন নেই। ভাবটা এমন যেন কিছুই হয় নি।
জুলফিকার পটনভী এক পলক তাকালেন কাঞ্চনের দিকে। মেয়েটা এখনো সুস্থ হয় নি। মুখের ফোলাভাব কমে নি। রাতে যে নির্ঘুম ছিলো চোখজোড়া তা চোখের নিচের কালি সাক্ষী দিচ্ছে। তার বিশ্রামের প্রয়োজন। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার জো নেই স্নিগ্ধের এখন একজন মানুষকে সর্বক্ষণ তার আশেপাশে প্রয়োজন। এখনো সেলাই খোলা হয় নি। বেশি নড়াচড়া সে করতে পারছে না। তাই স্ত্রীর থেকে ভালো এটেন্টডেন্ট। তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“কাঞ্চন থাকুক। আমরা বাড়ির দিকে যাই। ওদের দুজনের খাবারও পৌছে দিতে হবে।”
কাঞ্চন কিছু বলার আগেই আয়েশা পটনভী তার চিকন হাতজোড়া ধরে বললো,
“খেয়াল রাখিস আমার দামড়া পোলাডার।”
কাঞ্চন আড়চোখে তাকালো। লোকটি চোখ বন্ধ করে আছে। পেটের কাছটায় মোটা ব্যান্ডেজ। হাতে ক্যানোলা। স্যালাইন বন্ধ করা হয়েছে। লোকটার মুখশ্রীতে এমন একটা ভাব যেন ভাজা মাছ উল্টাতে পারে না। অথচ এই সবকিছু ইচ্ছেকৃতভাবে করা। এই লোকের খেয়াল রাখার থেকে নিজের খেয়াল রাখা বেশি প্রয়োজন। ধুরন্ধর কিসিমের মানুষ সে। মাথায় ভর্তি কুটিল বুদ্ধি। কাঞ্চনকে দশবার বেঁচে দশবার কেনার ক্ষমতা রাখে এই লোক৷
রিদম এবং তাশদীদ যাবার আগে তাকে একটা খোঁচা দিলো,
“আমরা কি মামা হতে যাচ্ছি!”
কাঞ্চন কটমট করে তাকিয়ে হিনহিনে গলায় বললো,
“স্বপ্ন দেখতে থাক। স্বপ্ন দেখতে পয়সা লাগে না।”
“মামা হতেও পয়সা লাগে না। ফেম লাগে, ফেম। বরং মামা না হতে পয়সা লাগে! ইফ ইউ নো ইউ নো।”
তাশদীদের কথা শেষ হতে না হতেই তার পেটে একটা জোরে চিমটি মারলো কাঞ্চন। পেটে চিমটি খেয়ে সে আহ! আহ! করতে লাগলো। ব্যাথায় জ্বলে যাচ্ছে চামড়া। অঞ্জনা বলে উঠলো,
“ঠিক হয়েছে!”

তাশদীদ একবার তার দিকে তাকালো। অতঃপর চোখ মুখ কুঞ্চিত করে বললো,
“তোর বরের সেবায় রাতে রক্ত দান করেছি এখন তুই আমাকে আহত করছিস। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। আমার মত অসহায় একটা মানুষকে মারার জন্য আল্লাহ যেন তোকে শাস্তি দেয়। তুই যেন খুব দ্রুত আমাদের শ্রদ্ধেয় সরফরাজ পটনভী ভাইজানের মা হস। থুক্কু বাচ্চার মা হস! আর যে নারী আমার প্রহারে হেসেছে সে যেন আমার বাচ্চার মা হয়!”
অঞ্জনা সাথে সাথেই তাশদীদের পায়ে পাড়া দিলো। তাশদীদ সরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
“বিল্লি তোর পায়ে এতো জোর নেই যে আমাকে ব্যাথা দিবে।”

অঞ্জনা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো। অভদ্য একটা ছেলে।খামচি মেরে চামড়া তুলে ফেলতে পারলে শান্তি লাগতো।
কাজিনমহলের খুনসুটির মধ্যেও পৃথুলা নীরব। যা ব্যতিক্রম। রিদম একপলক থাকালো মেয়েটির দিকে। গতকালের ঘটনার গ্লানি থেকে এখনো নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না। তাই আগের মতো কাঞ্চনের সাথেও সে কথা বলতে ইতস্ততবোধ করছে। কাজিনমহলের মধ্যে পৃথুলা অভারথিংকার ধরনের মানুষ। অতিরিক্ত সে চিন্তা করে। চিন্তা করার কারণও আছে যথেষ্ট। হয়তো সে এখন চিন্তা করছে কাঞ্চন তার উপর রেগে আছে।
কথাটা মিথ্যে নয়। কাঞ্চনের মোবাইলে ইমার্জেন্সি কললিস্টে তার নাম্বার সবার প্রথমে রাখা। অথচ কঠিন সময়ে যখন তাকে ফোন করা হলো, সে কোনো কাজে আসে নি। সে ফোনটাই ধরে নি। ঘুমাচ্ছিলো। আত্মগ্লানির দাবদাহে সে জ্বলছে। ফলে কাঞ্চনের সাথে কথা বলতে লজ্জা করছে। রিদম কাঞ্চনের হাতে আলতো করে চাপ দিলো। কাঞ্চন তাকাতেই সে পৃথুলার দিকে ইশারা করলো। কাঞ্চন বিষয়টা খেয়াল করে নি গতকাল। তবে সকাল থেকে পৃথুলার নীরবতা তার নজর এড়ায় নি। ভেবেছে ফুপু হয়তো আবার তাকে কথা শুনিয়েছে বা ফুপু আর ফুফার মাঝে আবার ঝামেলা হয়েছে। তাই ঘাটায় নি। এবার মনে হচ্ছে বিষয়টা ভিন্ন। তাই নিজ থেকেই এগিয়ে গেলো সে। পৃথুলার হাত চেপে মৃদু স্বরে বললো,

“কথা আছে। সময় হবে!”
দামী হাসপাতালের একটা সুবিধা আছে। এদের রিসেপশনের পাশে একটা দামী ক্যাফে থাকে। মানুষ নিজের প্রিয়জনকে বাঁচাবে নাকি আয়েশ করে স্যান্ডউইচ খাবে। একেই চিকিৎসার দাম আকাশচুম্বী। উপর থেকে একটু যে পেট ভরে খাবে তার উপায় নেই। কফির দাম একশ চল্লিশ টাকা। স্যান্ডউইচ একশ ত্রিশ টাকা। কাঞ্চনের মাথায় আসে না এদের জিনিসপত্র কে খায়। অবশ্য এখন সে খাচ্ছে। একটা স্যান্ডউইচ কিনেছে সে, এক কাপ কফি। সকালে নাস্তা খাওয়ার সুযোগ হয় নি। যখন ঘুম ভেঙ্গেছে তখন দশটা বাজে। ঘর থেকে বের হতেই দেখলো সবাই জামাকাপড় পরে তৈরি। উচ্চবর্গীয় পটনভীকে কেবিনে শিফট করবে বলে কথা। তাই কাঞ্চন কোনমতে একটা আধোঁয়া টিশার্ট আর একটা ব্যাগি জিন্স পরে ছুটলো। এখন ক্ষুধা লেগেছে মারাত্মক। সে কফিটা পৃথুলার দিকে এগিয়ে দিলো। পৃথুলা মাথা নাড়িয়ে বললো,

“খাবো না।”
“তোকে পয়সা দিতে হবে না। আমি পে করেছি!”
“ইচ্ছে করছে না।”
“তুই আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিস! কারণ কি?”
অকপটে করা প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলো না পৃথুলা। দৃষ্টি সরিয়ে খুব বিব্রত গলায় বললো,
“এড়াচ্ছি না তো!”
“তুই কি কোনো কারণে গিল্টফিল করছিস?”
পৃথুলা চুপ করে রইলো। কোনো উত্তর দিতে পারলো না। মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো সে। কাঞ্চন স্যান্ডউইচ আর কফিটা রাখলো একটা পাশে। তারপর হুট করে জড়িয়ে ধরলো সে পৃথুলাকে। পৃথুলা চমকালো। তার চোখ টলমল করে উঠলো মুহূর্তেই। দলা পাকানো গ্লানির বিষাক্ত অনুভূতিগুলো উবে যেতে লাগলো। সেও জড়িয়ে ধরলো কাঞ্চনকে। ধরা গলায় বললো,

“আই এম সরি। আমি ফোনটা ধরলে তুই হয়তো এতো বড় বিপদে পড়তি না”
পৃথুলা এবং কাঞ্চনের বয়সের পার্থক্য দেড় বছর। কিন্তু কখনো তাকে আপু বলা হয় নি। পৃথুলাও তাকে কখনো বলে নি আমাকে আপু বলে ডাকবি। অথচ সবসময় বড় বোনের মতো তাকে আগলে রেখেছে। কাঞ্চনের জীবনে এমন অনেক সময় এসেছে যখন মনে হয়েছে এই জীবনটা খুব বিশ্রী। সে বেঁচে না থাকলেই ভালো হতো। অন্যের উপর পরগাছা হয়ে বাঁচাটা খুব তীক্ত লাগতো তখন৷ সেই সময়গুলোতে পৃথুলা এবং অঞ্জনা ছিলো তার বাঁচার উৎস।
পৃথুলার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ তার জন্মদাতা এবং জন্মদাত্রী। পটনভী মঞ্জিল তার কাছে বিষাক্ত লাগে। তখন এক দলা নিঃশ্বাসের খোঁজে সে কাঞ্চন এবং অঞ্জনার কাছে যায়। তারা একে অপরের পরিপূরক। কাজিনমহলের প্রতিটা প্রাণের একটা আলাদা গল্প আছে অথচ তাদের গল্পটা তারা শুধু নিজের মধ্যেই রাখে। একে অপরের সাথে বিলীন হয়ে আনন্দ খুঁজে বেঁচে থাকার।
পৃথুলার চোখ মুখ বসে গেছে। নোনাজল শুকিয়ে মুখখানা চ্যাটচ্যাট করছে। সে চোখ মুছেছে দুই দফা কিন্তু কাজে আসে নি। এখনো কান্না পাচ্ছে। পৃথুলা ছিঁচকাঁদুনে নয়। কিন্তু আজ তার খুব কান্না পাচ্ছে। কাঞ্চন আরেকটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বললো,

“আগে জানলে তোকে বুড়িগঙ্গার আছে নিয়ে যেতাম। এই চোটে বিশুদ্ধ নোনা পানির সাগর বানিয়ে দিতি৷ প্রথম বাঙ্গালী হিসেবে নোবেল জিতে নেওয়ার সুযোগ মিস করে গেলি তো!”
পৃথুলা তার বাহুতে একটা কিল দিয়ে বললো,
“রিদম রোগ হয়েছে তোর!”
“না ভাই, তোর রিদমের কিছুই আমি চাই না!”
পৃথুলা কপাল কুচকে বললো,
“রিদম আমার না”
“তাই নাকি? কিন্তু কাহিনী তো অন্যকিছু দেখছি আমদানীর মা। সত্যি সত্যি আমদানীর মা হবার শখ হয় নি তো তোর?”
পৃথুলা চেঁতে গেলো। নাকের পাটা ফুলিয়ে বললো,
“একেবারেই না। ওই কুত্তার নাম নিবি না। হি ইজ জাস্ট এ এক্স!”
“এক্স? আচ্ছা!”
বলেই কাঞ্চন উঠে দাঁড়ালো। অঞ্জনা এসেছে তাদের ডাকতে। সবাই চলে যাচ্ছে। এখন কাঞ্চনকে তার বরের কাছে ফিরতে হবে। পৃথুলা মৃদু স্বরে বলল,

“তুমি রাগ করিস নি তো?”
“জানের প্রতি রাগ করা যায় না ডার্লিং। যা, বড়চাচার মিছিল শুরু হবে নয়তো!”
কাঞ্চন বিদায় দিলো পটনভীদের। ভাগ্যক্রমে পৃথুলার পাশে একটা সিট খালি ছিলো। রিদম এসে ধপ করে বসে পড়লো। মাথা এলিয়ে দিলো পৃথুলার কাঁধে। ভারী মাথাটা কাঁধে রাখতেই একটা মৃদু গন্ধ থাকে বিঁধলো। গন্ধটা রিদমের বডি স্প্রের। ছেলেটা পারফিউমের থেকে বডিস্প্রে বেশি ব্যবহার করে। খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো কাঁধে ফুটলো। পৃথুলা কাঁধ সরাতে গেলে গাঢ় স্বরে বললো,
“ঘুম পাচ্ছে শাকচুন্নী। সারারাত মশাকে রক্ত ডোনেট করেছি। এখন ঘুমাতে দে।”
পৃথুলা নড়তে পারলো না। পুতুলের মতো বসে রইলো। রিদমের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গিয়েছে। কোঁকড়া চুলগুলোর জন্য মুখ দেখা যাচ্ছে না। পৃথুলা আড়চোখে একবার তার তাকালো। ঠোঁটের কোণ বাঁকালো ক্ষুদ্র সময়ের জন্য।

কেবিনে আসতেই কাঞ্চন দেখলো স্নিগ্ধ ঘুমাচ্ছে। ঘরটা ঠান্ডা হয়ে আছে। অথচ লোকটার গায়ে কোনো কম্বল নেই। কাঞ্চন একটা কম্বল কোমড় পর্যন্ত টেনে দিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলো। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধের দিকে। কাঞ্চন অস্বীকার করতে পারবে না, স্নিগ্ধের মতো সুদর্শন পুরুষ সে স্বচক্ষে জীবনে কম দেখেছে। এই যে মানুষটি ঘুমিয়ে আছে। তাকে অপার্থিব লাগছে। হয়তো সেটা কাঞ্চনের চোখের ধোঁকা। কিন্তু সে চোখ সরাতে পারছে না। স্নিগ্ধের সিল্কি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের উপর পরে আছে। পুরু ভ্রু, ঘন আখিপল্লব, তীক্ষ্ণ এবং ধাঁরালো চোয়াল, খাঁড়া নাক—সব মিলিয়ে পুরুষটি নিখুঁত। স্নিগ্ধের মধ্যে আদৌও কি কোনো খুঁত আছে? তার পড়াশোনা, চাকরি, দক্ষতা, চালচলন সব কিছুই নজরকাঁড়া। হয়তো একারণেই তার অহংকার আকাশচুম্বী। সেদিন যদি কাঞ্চনকে সে অপমান না করতো, কাঞ্চন যদি তার মুখ বলা সেই কথাগুলো না শুনতো তবে আজ কাঞ্চন বুঝি পৃথিবীর সবথেকে সুখী নারী হত যে কি না তার শখের পুরুষকে বিয়ে করতে পেরেছে। ভাগ্যিস, ভাগ্যিস সেই হাওয়াই মহল ভেঙ্গে গেছে। তবুও কোথাও না কোথাও সে দূর্বল। নয়তো সে কেন এতো বিচলিত ছিলো সারারাত। যা হয়েছে তাতে তার হাত নেই। লজিক্যালি চিন্তা করে দেখলে এই পুরো জিনিসটা স্নিগ্ধর নিজের হঠকারীতা। কাঞ্চন কিডন্যাপ হয়েছে কারণ তারা স্নিগ্ধকে দূর্বল করতে চেয়েছিলো, স্নিগ্ধ কোনো কারণ ছাড়া লটকনকে গুলি করেছে, প্রয়োজন ছিলো না। নিশ্চয়ই শুধু কাঞ্চনকে চড় মারার জন্য সে গুলি করে নি, নাকি করেছে! সে নিজেও গুলি খেয়েছে কারণ সে অর্ডার মান্য করে নি। এখানে কি কাঞ্চনের কোথাও দোষ আছে?

“এভাবে দেখবেন না মিসেস পটনভী, আবার প্রেমে পড়ে যাবেন?”
চিন্তার ঘোরের মধ্যে একটা ঠাস করে যেন কেউ থাপ্পড় মারলো। ফ্যালফ্যাল করে তাকাতেই দেখলো স্নিগ্ধ তার দিকে গাঢ়, শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। ফলে সব চিন্তাগুলোকে মুহূর্তের মধ্যেই ঝেড়ে ফেলল কাঞ্চন। সরিয়ে নিলো চোখ। চুল চুলকাতে চুলকাতে শুধালো,
“কিছু লাগবে?”
“যদি বলি আপনাকে, পাওয়া যাবে?”
কাঞ্চনের বুকটা ধক করে উঠলো। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলালো। খানিকটা অভিমানী স্বরে বললো,
“সবসময় মশকরা ভালো লাগে না।“
স্নিগ্ধ হাসলো। ক্যানোলা বিহীন হাতে ভর করে উঠতে চাইলো। ঠিক তখনই কাঞ্চন উঠে তাকে ধরলো। রাগী স্বরে বললো,
“উঠছো কেন? পাগল নাকি?”
“শুয়ে থাকতে কার ভালো লাগে?”
কাঞ্চন সাথে সাথে বাটনে চাপ দিয়ে বেডটা খানিকটা তুলে দিলো। স্নিগ্ধ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে খানিকটা আমতা আমতা করে শুধালো,

“এখন কেমন লাগছে?”
“যেমনটা একটা পেট কাঁটা মানুষের লাগা উচিত।“
“ব্যথা করছে?”
“করা তো উচিত।“
কাঞ্চন ঠোঁট কামড়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর বললো,
“ধন্যবাদ।“
“কেন?”
“আমাকে বাঁচানোর জন্য।“
স্নিগ্ধ ঘাড়টা কাত করে কাঞ্চনের চোখে চোখ রেখে গাঢ় স্বরে শুধালো,
“শুধু ধন্যবাদ?”
কাঞ্চন চোখ ছোট ছোট করে বললো,
“আরোও কিছু চাই নাকি?”
“আফটার অল তোর জন্য গুলি খেয়েছি।“
“এতোটা রেকলেস হতে কি আমি বলেছি? নাকি মাথার দিব্যি দিয়েছিলাম? কি প্রয়োজন ছিলো এসবের?”
কাঞ্চনের কণ্ঠ টা অভিমানে ভারী শোনালো। সে অন্যদিকে তাকিয়ে কথাটা বললো। স্নিগ্ধ হাসলো মেয়েটার কাজে। গাঢ় স্বরে বললো,

“এটা তো হবারই ছিলো, একরকম আমাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলো। আমার ওয়াইফকে কিডন্যাপ করে আমাকে ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করেছিলো। আফটার অল আমি সরফরাজ পটনভী। আমি খুব সহজ মৃত্যু দিয়েছি ওকে। এটুকু না করলে সেটা প্রমাণিত হবে কি করে?“
স্নিগ্ধের মুখে দর্প ফুটে উঠলো। তার কণ্ঠে অহমিকার ঢেউ। কাঞ্চন কিছুসময় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। লোকটার চোখের ভাষা কেমন নিষ্ঠুর লাগলো। কি ভাবছিলো কাঞ্চন? সরফরাজ পটনভী তার জন্য এতোটা রেকলেস হয়েছিলো! সে শুধু নিজেকে ভালোবাসে, আত্মদম্ভে অন্ধ এই লোক। কাঞ্চন অন্য কিছু আশা করছিলো কি? ফলে অজান্তেই হালকা ঠোঁট নাড়িয়ে বললো,
“তুমি তোমার ইগো স্যাটিসফাই করতে এতোটা মরিয়া?”
স্নিগ্ধর চোখের দৃষ্টি বদলালো। কেমন তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন তার দৃষ্টিকে পাত্তা দিলো না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“মাঝখান থেকে যে মানুষগুলো তোমাকে চিনে না তাদের ভুল ধারণা হচ্ছে। ভাবছে তুমি তোমার ওয়াইফের প্রতি অবসেসন থেকে এমন কাজ করেছে। মানুষের কাছে তোমার কাজ টুরু লাভ মনে হতে পারে, কিন্তু আমার কি মনে হচ্ছে জানো? তুমি একটা সাইকোপ্যাথ!”

“এম আই?”
বলেই ফিঁচেল হাসলো স্নিগ্ধ। মাথাটা বিছানায় এলিয়ে বলল,
“বাট আই ওয়াজ কুল, এইন্ট আই?”
নিঃসন্দেহে স্নিগ্ধর একশন গুলো যেকোনো সিনেমাকে হার মানাবে। ওই মুহূর্তে খুবই সুদর্শন লাগছিলো স্নিগ্ধকে। কিন্তু এই অহংকারী, দাম্ভীক পুরুষটার প্রশংসা করতেও ভালো লাগে না কাঞ্চনের। সে অহেতুক তার জন্য চিন্তিত ছিলো। অহেতুক গ্লানিতে ভুগছিলো। মানুষকে কি করে বোঝাবে এই লোকের আসল রুপ। তাই কঠিন গলায় বললো,
“নিকুচি করেছে তোমার কুলামি।“
“হাউ মিন মিসেস পটনভী। বড়ই অকৃতজ্ঞ আপনি। গুলি খাওয়ার পুরষ্কার হিসেবে আপনার যত্ন আশা করেছিলাম। আফটার অল আমি এতো বড় স্টান্ট আপনার জন্যই করেছি।”
কাঞ্চন তীক্ষ্ণ চোখে চাইলো স্নিগ্ধের দিকে। বিরক্তি গিলে বলল,
“তুমিও কি মনে রাখবে, পারিজাত পটনভী কারোর দয়া রাখতে পছন্দ করে না। যেহেতু সবার মতে আমার জন্য তুমি গুলি খেয়েছো, সেহেতু আমার দায় তোমার যত্ন করা। হিসেব ফিট্টুস।“
“আই অ্যাম অবলাইজড”

কাঞ্চন খুব জোশে কথাটা বললেও আধঘন্টার মধ্যে টের পেলো সরফরাজ পটনভী নামক মানুষটি কতটা যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। এক মিনিট বসার সুযোগ পেলো না সে। একটু পর পর সিমেন্টের বস্তা তাকে ডাকছে। কখনো পানি ঢালতে, কখনো এসির তাপমাত্রা বাড়াতে, কখনো বা তাকে খাইয়ে দিতে। কাঞ্চন বিনা অভিযোগে তা করছে। এমনকি এখন সিমেন্টের বস্তা নিজের হাতে ঔষধটাও খেতে পারছে না। একটু আগে নার্স এসে ঔষধ দেখিয়ে দিয়ে গেছে। এন্টিবায়োটিক ঔষধের ফাইলটা মাত্র শেষ হয়েছে। কাঞ্চনের উদ্দেশ্যে বললেন,
“এই ঔষধগুলো খাইয়ে দিবেন।“
কাঞ্চন মাথা নাড়লো। ঔষধ এগিয়ে দিতেই স্নিগ্ধ গাঢ় গলায় বললো,
“আমার হাত ব্যাথা করছে। খাইয়ে দে।“
কাঞ্চন চোখ মুখ কুচকে ফেললো। কিছুসময় তাকে ভস্ম করে দেবার চাহনী নিক্ষেপ করলো। কিন্তু চাহনীতে কাজ করলো না। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তাকে ঔষধ খাইয়ে দিলো। ভাবলো এবার হয়তো মুক্তি। কিন্তু পর মুহূর্তেই স্নিগ্ধ হাক ছাড়লো,
“মিসেস পটনভী শুনছেন?”
কানের এয়ারবাডটা আর কানে পরা হলো না কাঞ্চনের। চোখ বুঝে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“আবার কি?”
“আমাকে একটু স্পঞ্জ করে দিতে হবে, গরম লাগছে। প্লিজ এসিস্ট মি!”
কাঞ্চনের চোখ অক্ষিকোটর থেকে বেরিয়ে আসার যোগাড়। হতভম্ব হয়ে বললো,
“কিহ?”

“এমন ভাব করছেন মনে হচ্ছে আমি-ই বিশ্বের প্রথম যে কি না স্পঞ্জ নিতে চাইছি।”
“না মানে, আমি কিভাবে? আমি ওয়ার্ডবয়কে বলছি।”
স্নিগ্ধ সাথে সাথেই বলে উঠলো,
“সরি, আমি আমার শরীর পরপুরুষ বা পরনারীকে দেখাতে পছন্দ করি না। আমার শরীরের উপর শুধু আমার বউয়ের অধিকার।“
“তোমার মতো নকটা পুরুষ আমি দ্বিতীয়টা দেখি নি।“
“দেখার সুযোগও আমি দিব না।“
কাঞ্চনে ভ্রু কুচকালো। চোয়াল শক্ত করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো। দামী হাসপাতালের এই একটা সুবিধা। গিজারের ব্যবস্থা থাকে। কাঞ্চন একটা বালতিতে কয়েকমগ কুসুম গরম পানি আনলো। বালতিটা রেখেই হাত দিলো স্নিগ্ধের জামায়। অমনি স্নিগ্ধ বাঁকা হেসে ধীর স্বরে বললো,
“ধীরে ওয়াইফি, ডোন্ট বি ডেস্পারেট।“
“আমার বয়েই গেছে।“
কাঁপা হাতে জামাটা খুলতেই উন্মুক্ত হলো স্নিগ্ধের পেটানো শরীরটা। লোকটা এতো মেইনটেইন কি করে করে। এক বিন্দু মেদ নেই শরীরে। লোমহীন পেটানো শরীরটার দিকে তাকাতেই শিরদাঁড়া বেয়ে উষ্ণ রক্তস্রোত নেমে গেলো। একটা শুকনো ঢোক গিললো সে। কানটা কেমন গরম হয়ে যাচ্ছে। স্নিগ্ধ তীক্ষ্ণ চোখে অর্ধাঙ্গিনীকে দেখছে। কানের কাছটায় মুখ নিয়ে গাঢ় স্বরে বললো,

“আর ইউ লাস্টিং আফটার মাই বডি, মিসেস পটনভী?”
কথাটা শুনতেই জমে গেলো কাঞ্চন। সরে যেতে নিলেই স্নিগ্ধ তার হাতটা খপ করে ধরে বসলো। একটা হ্যাচকা টানে তাকে নিজের পায়ের উপর বসিয়ে ফেললো। একটুর জন্য তার সেলাইয়ে লাগে নি। কাঞ্চনের চোখেমুখে চিন্তার ছাপ দেখা গেলো। অথচ স্নিগ্ধ নির্বিকার। কাঞ্চন নড়াচড়া করতেই তার কটিদেশের বাঁধন শক্ত হলো। সিমেন্টের মতো হাতের চাপে পিষলো তার কোমড়। ফলে চাঁপা ক্ষোভ ফুঁটে উঠলো কাঞ্চনের গলায়,
“আমাকে না জ্বালালে তোমার শান্তি হয় না?”
“উহু, আমার একটামাত্র ওয়াইফ তুই। এটা আমার প্রিভিলেজ। তবে তুই চাইলে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পারিস। ডিলটা কিন্তু এখনো অন আছে।“
কাঞ্চন তীক্ষ্ণ চোখে চাইলো। রাগী স্বরে বললো,
“আমাকে পাগলে কামড়ায় নি।“
“ভয় পাচ্ছিস নাকি? আবার আমার প্রেমে পড়ার? অবশ্য আই এম টু পার্ফেক্ট। একবছর অনেক কম আমার খুঁত ধরার।“

কাঞ্চন হতভম্ব হয়ে গেলো। লোকটার এতো আত্মবিশ্বাস কি করে? এক বছর অনেক লম্বা সময় একটা মানুষের খুঁত ধরার। কাঞ্চন বিদ্রুপের স্বরে বললো,
“এতো ওভারকনফিডেন্ট হইয়ো না। মুখ থুবড়ে পড়বে“
“আমি তোর কাছেই মুখ থুবড়ে পড়তে চাই। আমাকে ভুল প্রমাণ কর। একটা বছর আমার প্রোপার ওয়াইফ হয়েই দেখ। হয় তুই জিতবি নয় আমি। যদিও আমি কখনো হারি না, এবারও হারবো না। তবুও তোকে একটা চান্স দিতে চাই।“

কাঞ্চন তার ব্যান্ডেজ ছাড়া হাতে মুঠোয় করে টেনে ধরলো স্নিগ্ধের পেছনের চুল। চুল টেনে ধরায় স্নিগ্ধের মাথাটা পেছনের দিকে হেলে গিয়েছে। তবে বিন্দুমাত্র বিকার দেখালো না সিমেন্টের বস্তা। ফলে কাঞ্চন তার ভুল গুলো আরোও জোরে টেনে পেছনের দিকে হেলিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো,

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৬

“আমিও হারতে শিখি নি পটনভী সাহেব। ভেবে দেখো, আমাকে হ্যান্ডেল করার মুরোদ তোমার নেই।”
কাঞ্চনের কোমড়টা আরোও জোরে চেপে ধরলো স্নিগ্ধ। তার নাকে নাক ঘষে খুব স্মিত স্বরে বললো,
“ওহ রিয়েলি! এই পৃথিবীতে আমি বাদে কোনো জাউড়া পয়দা হয়নি যে তোকে হ্যান্ডেল করতে পারে। তুই আমার হাড় দিয়ে বানানো কাঞ্চনজঙ্ঘা। SO, YOU ARE PART OF ME. BASICALLY YOU ARE ME”………………

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here