ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২১
মুশফিকা রহমান মৈথি
স্নিগ্ধ তার সামনে হাটু গেড়ে এক পায়ে ভর দিয়ে বসে আছে। তার ঠোঁটের কোন বাঁকিয়ে তীর্যক হাসি উঁকি দিচ্ছে। ডান্স ফ্লোরে এভাবে স্নিগ্ধর বসে থাকার দৃশ্যে অর্ধেক পটনভী হতবাক, অর্ধেক উচ্ছ্বসিত। শিষ বাজছে। স্নিগ্ধ গাঢ় স্বরে বললো,
“মে আই আমার হাড্ডি?”
ঘটনা বুঝতে হলে সময় এক ঘণ্টা পেছাতে হবে। প্রীতির হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হলো ঠিক সাতটার সময়। ফুলে সাজানো স্টেজের একপাশে ডান্সফ্লোর বানানো হয়েছে। ডান্স ফ্লোরের উপর ঝুলন্ত হলুদ লাইট। হলুদ লাইটের আলোতে ডান্সফ্লোরের প্লাস্টিকের সাদা কালো ফ্লোরম্যাট চকচক করছে। দূর থেকে প্রচন্ড মোহনীয় লাগছে। প্রীতির পরণে হলুদ লেহেঙ্গা। ওড়নাটা ফুল দিয়ে বানানো। চুল বেণী করা। তাতে রজনীগন্ধার মালা জড়ানো। প্রীতি পটনভী পরিবারের সুন্দরী নারীদের একজন। আজ সেই সৌন্দর্য্য ঠিঁকরে পড়ছে। প্রীতিকে স্টেজে বসানো হলো বিশেষভাবে। একটা লাল ওড়না তার লম্বা লম্বা চার ভাই চার কোনায় ধরে দাঁড়ালো। মাঝে প্রীতি পটনভীদের ছোট ছোট সদস্যদের নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো স্টেজের দিকে। ডি জে আনানো হয়েছে ভাড়া করে। ডি জে কন্ট্রোলারে গান ঘুরালো। গান বাজতে লাগলো,
“লীলাবালি, লীলাবালি
বর অযুবাতী, সইগো
বর অযুবাতী, সইগো
কী দিয়া সাজাইমু তরে?”
প্রীতিকে বসানো হলো স্টেজে। তার সামনে টেবিলে খাবার সাজানো। একটা আনারস দিয়ে হাস বানানো হয়েছে। আম কাটা ফুলের মতো করে। কাবাবের ছোট ছোট বল থুথপিকে গেঁথে একটা আনারসে বসানো হয়েছে। মনে হচ্ছে ময়ুর পেখময় মেলেছে। পায়েশের বাটি রাখা। জর্দা বানানো হয়েছে। আর রাখা হলুদের বিশাল বড় বাটি। প্রীতি সবাইকে বলে দিয়েছে চেহারায় যেন হলুদ দেওয়া না হয়। কিন্তু কাজিনমহলের টার্গেট অন্য। তারা প্রীতির মুখেই হলুদ লাগাবে। এমন সময় লাগাবে যে প্রীতি কিছু বলতে না পারে। ন্যাকা নায়িকারা খলনায়িকা হতে পারে না। খলনায়িকা যখন তখন নায়িকা হয়ে যেতে পারে। প্রীতিকে স্টেজে বসানোর পর হল আফনানের এন্ট্রি। ডিজে গান ছাড়লো,
“আইলারে নয়া দামান
আসমানেরও তেরা
বিছানা বিছাইয়া দিলাম
শাইল ধানের নেরা
দামান বও দামান বও
আইলারে নয়া দামান
আসমানেরও তেরা”
আফনানের পরণে হলুদ পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা। বেশ মানিয়েছে ছেলেটাকে। আজকে তার রঙ কিংবা দৈহিক গঠনটা খুব বেমানান লাগছে না। মনে হচ্ছে প্রীতির সাথে এই ছেলেটার থেকে ভালো আর কাউকে মানানো সম্ভব নয়। কারণ সে স্টেজে বসতেই প্রীতিকে খুব আস্তে বললো,
“তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।“
প্রীতির গাল লাল হয়ে গেলো। ফলে তার সৌন্দর্য্য আরোও বেড়ে গেলো। নারীকে সুন্দর বানায় তার পুরুষের চাহনী। তার পুরুষ তাকে যতটা স্নেহের সাথে দেখবে সে ততটা সুন্দরী হয়ে উঠে।
ঝুলন্ত হলুদ আলো জ্বলছে ডান্স ফ্লোরের উপর। মাইক হাতে নিলো কাঞ্চন। প্রীতি এবং আফনান বসা স্টেজে। তাদের চোখ ডান্স ফ্লোরের দিকে নিবদ্ধ। কাঞ্চন তাদের উদ্দেশ্যে বললো,
“শুভ সন্ধ্যা। আজ একটা বিশেষ রাত। আমাদের প্রিয় অনুপমা অর্থাৎ প্রীতি আপু এবং আফনান দুলাভাইয়ের বিয়ে। আপনাদের সবাইকে স্বাগতম এই বিশেষ সন্ধ্যায় আমাদের সাথে যুক্ত হবার জন্য। আমাদের প্রীতি আপুর ছোটবেলা থেকেই একটা শখ ছিলো। সে একজন ভালো ওয়াইফ করবে। খুব ধুমধাম করে বিয়ে করবে। সেই বিয়েতে সবাই আনন্দ করবে। ভাইবোন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব তার ইচ্ছে পূরণ করা। আমি যে কি না এজ এ কিউপিড প্রীতি আপু এবং আফনান ভাইয়ের জুটিটাকে বানাতে সাহায্য করেছিলাম। যদিও আমি তার শাস্তি পেয়েছি। কিন্তু তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। আমি শুধু প্রীতি আপুকে সুখী দেখতে চাই। আজ এই হলুদ সন্ধ্যায় আমরা, দ্যা পটনভীস’ নিউ জেনারেশন প্রীতি আপুকে তার জীবনের শেষ থুক্কু বিশেষ আনন্দটা দিব। যেন আগামীকাল বিয়েতে তার জীবনে যাই ঘটুক তার আফসোস না থাকে। সো ডি জে ওয়ালে বাবু, যারা গানা চালাদো!”
সাথে সাথেই গান বেজে উঠলো,
“Bhangre di queen main taan
Kudi so haseen main taan
Meri hai gazab gal-baat”
ডান্স ফ্লোরে এগিয়ে এলো কাঞ্চন। গানের লাইনের সাথে সে তার নাচ শুরু করলো। শিষ এবং করতালির ধুম পড়লো।
“Nachange saari raat soniyo ve”
লাইনের সাথে সাথে বের হলো রিদম। চোখে কালো চশমা। পরণে মেজেন্টা কারুকাজ করা পাঞ্জাবি। একটা কুল পোজ নিয়ে দাঁড়ালো সে ডান্স ফ্লোরের শেষ কর্ণারে।
“Nachange saari raat soniyo ve”
লাইনের সাথে বের হলো কাঞ্চনের পেছন থেকে ডান্স ফোরের মিডলে এসে দাঁড়ালো ইকরাম। হাত রাখলো কাঞ্চনের কাঁধে। সে কাঞ্চন এবং রিদমের মাঝখানে দাঁড়ালো।
“Karle thoda sa pyar soniyo ve”
লাইনের সাথে সাথে তাকবীর বেড়িয়ে এলো। সামনে বসে থাকা সব পটনভীদের দিকে ফ্লাইং কিস ছুড়লো সে। সেই সাথে চিৎকার এবং করতালি দ্বিগুণ হলো। সে এসে দাঁড়ালো কাঞ্চনের ডান পাশে।
“Karle thoda sa pyar”
লাইনের সাথে সর্বশেষ ডান্স ফ্লোরে নামলো তাশদীদ। গান একটু স্লো হয়ে গেলো। তারপর ফুল বিটে বাজা শুরু হলো। আর পাঁচজন তাদের স্টেপ নাচা শুরু করলো। গানের তালে তারা নাচছে। মধ্যমনি কাঞ্চন। প্রতিটা মুদ্রা নিখুঁত। কেউ বলতে পারবে না কেউ তাদের মাথায় বন্দুক ঠেঁকিয়ে এই নাচার আয়োজন করিয়েছে। কাঞ্চন ভাইদের সাথে তাল মিলিয়ে নাচছে। তার চোখমুখ উজ্জ্বল। শিষ এবং করতালি বাজছে গানের সাথে সাথে। বসে থাকা পটনভীরা সে গানের সাথে শরীর দোলাচ্ছে। প্রীতি এবং আফনানও গলা মেলাচ্ছে। তালি দিচ্ছে। শুধু ডান্স ফ্লোরের সামনের মখমলের চেয়ারে বসে থাকা এক জোড়া কালো কুচকুচে চোখ কাঞ্চনের মুখশ্রীর উজ্জ্বলতায় আঁটকে আছে। যেন আশপাশের জগৎটা নেই। তার সরু নজর একবিন্দুও সরছে না। মুখখানা কঠিন। কাঞ্চন ভাইদের সাথে এতো উচ্ছ্বসিত থাকে যে কেউ বুঝতেই পারবে না এই মেয়েটি কখনো দুঃখীও হতে পারে।
প্রথম পারফোরমেন্স শেষ হলো। এটা আফনানের তরফ থেকে ছিলো। এর পর ডান্স ফ্লোরে নামলো পৃথুলা এবং সানিয়া। গান বাজছে,
“Badi Mushkil Baba Badi Mushkil
Gore Gore Gaalon Pe Hai Kala Kala Til.”
গানের তালে তালে বেশ হাত পা নাড়িয়ে দুজন নাচছে। কেউ দেখলে ভাববে এদের কেমেস্ট্রির চেয়ে সুন্দর কেমেস্ট্রি কারোর হতেই পারে না। অথচ পাঁচ মিনিট আগেও পৃথুলা সানিয়ার গলা চিপে ধরতে গিয়েছিলো। সানিয়ার কানের দুল তার জামার সাথে মিলছিলো না বলে সে কান্নাকাটি করছিলো। পৃথুলা প্রায় তার ঘাড় ধরে বসছিলো। অঞ্জনা থামিয়েছে। তাশদীদ রিদমের কাঁধে হাত রেখে হাসতে হাসতে বললো,
“এই দুটোকে এক ঘরে বিয়ে দিলে কেমন হবে? শাহরিয়ারের সাথে সানিয়ার বিয়ে হচ্ছে। কেনো না শাহরিয়ারদের পরিবারের কারোর গলায় শাকচুন্নীকে ঝুলিয়ে দেই? কি বলিস?”
রিদমের চোখে এখনো কালো সানগ্লাস। সে এই রাতের অনুষ্ঠানে কেন সানগ্লাস পড়ে আছে সেটার কারণ অবশ্য তাশদীদ বুঝতে পারছে না। সে যে কোথায় তাকিয়ে আছে সেটাও সানগ্লাসের কারণে বোঝা যাচ্ছে না। ফলে সে কিঞ্চিত বিরক্ত হয়ে বললো,
“এই কালা চশমা নামা, রাতের বেলায় কালা চশমা পড়ে ঢং করতেছিস কেন?”
“কালা চশমা পড়লে কারোর বোঝার সাধ্য নেই আমি কোথায় তাকায়ে আছি। এটা ট্রিক মাই ডিয়ার ব্রো।“
“পৃথুলাকে দেখতে হলে চশমা ছাড়াও দেখতে পারিস। আমি জাজ করবো না।“
“ওই শাকচুন্নীকে দেখার জন্য আমি মরে যাচ্ছি না। তুই আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না। নিজেকে নিয়ে কর। স্নিগ্ধ ভাই শকুনী মামার মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। একটু পর তার বউয়ের লগে কোমড়ে হাত দিয়ে নাচবা তুমি। মরার উপর খরা তোমার কাঁধে ঝুলতেছে।“
তাশদীদ হাসলো। জীবনে কোনো বিষয়েই সে খুব একটা সিরিয়াস নয়। তার বাবা যতটা হন্তদন্ত করেন সেক্ষেত্রে সে খুব বেশিই বেপরোয়া। হলুদের বিকেলেও বাবার থেকে গালি খেয়েছে। রফিকুল্লাহ পটনভী ছেলেকে বলেছিলেন বাবুর্চিদের দিকে লক্ষ্য করতে। বাবুর্চিদের দিকে নজর না রাখলে খাবার চুরি যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু তাশদীদ ফোনে গেম খেলছিলো। রফিকুল্লাহ পটনভীর ধারণা হলো লবণ চুরি হয়েছে। তাশদীদ বিকারহীন স্বরে বললো,
“লবণ চুরি তো সোনা চুরির মতো বড় কিছু না। চিল বাবা”
“অশিক্ষিত ছাগলের মত কথা বলবি না।“
“আজকাল ছাগলরাও লেখাপড়া করছে নাকি?”
রফিকুল্লাহ সাহেবের মেজাজ চড়ে গেলো। গমগমে স্বরে বললেন,
“দূর হ তুই।“
তাশদীদ দূর হলো। যেখানে বাবার বকাঝকায় সে নির্বিকার সেখানে স্নিগ্ধকে আর কতই বা ভয় পাবে সে? তবে একটু বেশি কোল্ড ডিংক্স খাওয়া হয়ে গিয়েছে। একটু বাথরুমে যাওয়া প্রয়োজন। ফলে রিদমকে বললো,
“আমি একটু আসতেছি। কাঞ্চনকে বলিস ফ্লোরে চলে যেতে, আমি পরে এন্ট্রি নিব।“
বলেই হনহনিয়ে চলে গেলো সে। দশ মিনিটের মধ্যে কাঞ্চন এসে বললো,
“রিদমের বাচ্চা, তাশদীদের বাচ্চা কই?”
“তাশদীদের বাচ্চা আসমানে, প্রসেসিং এ আঁটকা।“
“মার খাবি?”
“কি? ভুল বলছি?”
“তাশদীদ কই?”
“ট্যাংকি খালি করতে গেছে। তুই স্টেজে যা। ও আসতেছে।“
কাঞ্চন মাথা নেড়ে ফ্লোরে পজিশন দিলো। একমিনিট কাঁটলো এখনো তাশদীদ আসছে না। দু মিনিট। অথচ এখনো তাশদীদ নেই। এদিকে কাজিন যারা চেয়ারে বসা তারা “বু, বু” করা শুরু করেছে। আফনানের দল হেরে যাবে যদি এই নাচটা ঠিক মত না হয়। কাঞ্চন চিন্তিত চোখে তাকালো পেছনে। চোখ গরম করে ইশারা করল। রিদম ঠোঁট উলটে বুঝালো সে জানে না। সানিয়া বলতে লাগলো,
“কি রে কাঞ্চন তোর পার্টনার তোকে ডিচ করলো?”
পৃথুলা ওর মাথায় গাট্টা মেরে বললো,
“আক্কেলজ্ঞানহীন।“
সানিয়া কিছু বলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো ঠিক তখনই ডান্স ফ্লোরের লাইট বদলে গেলো। মিউজিক শুরু হলো। আর হিরোর মতো ডান্স ফ্লোরে এন্ট্রি নিলো সরফরাজ পটনভী স্নিগ্ধ। সাথে সাথে শিষ আর করতালি শুরু হলো। কাঞ্চনের মুখ হতবাক। সে কথা হারিয়ে ফেলেছে। জীবনে কখনো স্নিগ্ধকে কেউ এসব ফাতরামি করাতে পারে নি। সে যখন ছোট ছিলো তখনও না। এখন তো সে ত্রিশ বছরের একটা হাট্টাগোট্টা যুবক। ফলে তাকে জিজ্ঞেস করার প্রশ্নই উঠে না। সে এমন কঠিন চোখে তাকাবে যে ওখানেই কাজিনমহলের হেগে দেওয়ার অবস্থা হবে। সেখানে স্নিগ্ধ ডান্স ফ্লোরে? এটা কি স্বপ্ন না বাস্তব। মিউজিক শেষে গান শুরু হলো,
“Tumko Paya Hai To Jaise Khoya Hoon
Kehna Chahoon Bhi To Tumse Kya Kahon
Tumko Paya Hai To Jaise Khoya Hoon
Kehna Chahoon Bhi To Tumse Kya Kahon”
গান শুরু হতেই স্নিগ্ধ কাঞ্চনের হাত ধরে হ্যাচকা টান দিলো। টান সামলাতে না পেরে কাঞ্চন এসে ধাক্কা খেলো তার প্রশস্ত বুকে। কাঞ্চন হতভম্ব। তার হাতের আঙ্গুলগুলো নিজের আঙ্গুলের সাথে মিশিয়ে ফেললো স্নিগ্ধ। ধীর লয়ে এক পা সামনে, এক পা পেছনে। সুরের তালে তালে নাচছে তারা। নাচছে স্নিগ্ধ আর নাচাচ্ছে কাঞ্চনকে।
এই গানটা তো তাদের লিস্টে ছিলো না। একটা সাউথ ইন্ডিয়ান গান “Pavazah malli” তে উড়াধুরা নাচার কথা ছিলো কাঞ্চন এবং তাশদীদের। সেখানে এই গান কিভাবে এলো? আর তাশদীদ কোথায়? স্নিগ্ধ তার কোমড়ে রাখলো বলিষ্ঠ হাত। কাঞ্চনের হাতটা রাখলো নিজের কাঁধে। গানের তালে তালে কাঞ্চনকে ঘুরালো সে। কাঞ্চন মনে হলো ভাসছে। ঘূর্ণির সাথে সাথে তার খোলা চুলগুলো উড়লো। সে সাথে তার আনারকলির ঘের ছড়িয়ে পড়লো বাতাসে। মেজেন্টা রঙটা ফুটন্ত গোলাপের মতো ঠেকলো। স্নিগ্ধ তাকে যেভাবে ঘুরাচ্ছে, সে ঘুরছে। স্নিগ্ধের গাঢ় চোখে তার চোখ। স্নিগ্ধ তাকে নিজের দেহের সাথে মিশিয়ে ফেললো। তার নিঃশ্বাস আঁছড়ে পড়ছে কাঞ্চনের দেহময়। করতালি কিছুই কানে আসছে না। শুধু স্নিগ্ধের হৃদস্পন্দন শুনতে পারছে কাঞ্চনের। গাঢ় স্পর্শ শরীরময়। একটা মুহূর্তে যখন তার পিঠ ঠেকলো স্নিগ্ধের বুকে স্নিগ্ধ খুব মৃদু স্বরে বললো,
“আমাকে চ্যালেঞ্জ করা উচিত হয় নি।“
“Main Aagar Kahoon Tumsa Haseen
Kaynaat Mein Nahi Hai Kahin
Tareef Yeh Bhi To Sach Hai Kuch Bhi Nahi”
লাইনের সাথে সাথে স্নিগ্ধ তার থেকে দুকদম পেছালো। এক পায়ে ভর করে হাটু গেড়ে বসলো ফ্লোরে। হাত ছড়িয়ে দিলো। মনে হলো এটা একটা নাচের স্টেপ। কাঞ্চন তার দিকে বিস্মিত চোখে চেয়ে রইলো। স্নিগ্ধ হাত বাড়িয়ে দিলো কাঞ্চনের দিকে। তীর্যক হাসি হেসে বললো,
“মে আই আমার হাড্ডি?”
কাঞ্চনের বুঝতে বাকি রইলো না নাচের মাঝখানে তাশদীদের গায়েব হবার রহস্য। অনুষ্ঠানের আগে বলা কথাগুলো একটাও মাটিতে ফেলে নি এই সিমেন্টের বস্তা। স্নিগ্ধ ভ্রু নাচালো। কাঞ্চনও কম নয়। সে স্নিগ্ধের হাতে হাত রাখলো। তারপর মাথা ঝুকিয়ে আনারকলির ঘেড়টা তুলে বো করলো। গান শেষ হয়ে গেলো। স্নিগ্ধ তার ঘাড়ের কাছে মুখ এনে বললো,
“এবার তোর আঙ্গুলে আমার আংটি দেখতে চাই।“
“তুমি চিটিং করেছো।“
“এভ্রিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার। এটা তো বিশ্বযুদ্ধ ফোর।“
বলেই চোখ টিপ মারলো সে। কাঞ্চনের মুখ রাগে লাল হয়ে গিয়েছে।
এদিকে মেনসওয়াশরুমে দরজা ধাক্কাচ্ছে তাশদীদ। কে যেন বাহির থেকে আটকে গেছে। কি জ্বালা। ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে অবশেষে দরজা খুললো। তাশদীদ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। বাথরুমে এই গরমে এতোসময় থাকা যায়? দরজা খুললো অঞ্জনা। তার ওড়নায় কোনো এক বাচ্চা চকলেট লাগিয়ে দৌড় দিয়েছে। সেটা পরিষ্কার করতে এসেই দেখলো কেউ দরজা ধাক্কাচ্ছে। দরজা খুলতেই তাশদীদ বেরিয়ে এলো। তার গা তরতর করে ঘামছে। সে বের হয়েই জড়িয়ে ধরলো অঞ্জনাকে। অঞ্জনা জমে গেলো। তাশদীদ হাপাতে হাপাতে বললো,
“বিল্লি, তোকে আল্লাহ স্বয়ং পাঠিয়েছেন। তুই না থাকলে আমার কি হত?”
অঞ্জনা একটা ধাক্কা দিলো তাশদীদকে। তাশদীদ ধাক্কায় ছিটকে পড়লো। অঞ্জনার মুখ রক্তিম হয়ে গেছে। গজগজ করে বললো,
“অসভ্য”
বলেই উলটো দিকে হাটতে যেয়ে পা মচকে ধরাম করে পড়ে গেলো। তাশদীদ হা হয়ে দেখলো নিচে সটান হয়ে পড়ে আছে অঞ্জনা। তার চশমা ছিটকে ফেটে গেছে। অঞ্জনা চশমা ছাড়া কিছুই দেখতে পারে না। একেবারে সব ঝাপসা। এমনকি এক হাত দূরে তাশদীদকেও সে দেখতে পারে না। মনে হয় শুধু রঙ দেখছে। আকৃতিও বুঝে না। স্পেয়ার চশমাও কাছে নেই। এখন আবার রুমে যেতে হবে। কিন্তু রুম অবধি যেতে সে পারবে না। সিড়ি তো দেখবে না। তাশদীদ হাটু গেড়ে বসলো অঞ্জনার দিকে। মেয়েটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“তুইও কি মনে রাখবি, তাশদীদ কারোর উধার রাখে না। চল।“
বলেই তার হাত ধরতে নিলে অঞ্জনা হাত সরিয়ে নিলো। ফলে তাশদীদ বললো,
“বল গেলেও তেজ যায় না।“
তাশদীদও কম নয়। সে অঞ্জনার ওড়নাটা নিজের হাত বাঁধলো। তারপর বললো,
“আমি তোকে ছুবো না। এভাবে যাবি তো?”
বলেই উঠে দাঁড়ালো। অঞ্জনার ওড়নায় টান খেতেই সে উঠে দাঁড়ালো। তাশদীদ চললো সামনে, অঞ্জনা চললো পিছনে। তাশদীদের হাতে বাঁধা তার ওড়না। অঞ্জনা উপায়ন্তর না পেয়ে সে ওড়নার টানে টানে হাটতে লাগলো। লজ্জায় তার মুখ ভোঁতা হলেও তাশদীদের ঠোঁট থেকে হাসি সরলো না।
হলুদ অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। সবার হলুদ দেওয়া শেষ। এখন খাওয়া দাওয়ার পালা। বুফে সিস্টেম করা হয়েছে। কাঞ্চনের খুব ক্ষুধা লেগেছে। নাচতে নাচতে ক্ষুধা লেগে গেছে। প্লেট নিয়ে খাবারের লাইনে দাঁড়ালো সে। এর মধ্যেই একজন বললো,
“আপনি চাইলে আমি আপনার খাবারটা এনে দিতে পারি?”
পেছনে চাইতেই কাঞ্চন খেয়াল করলো একটা সুদর্শন যুবক দাঁড়ালো। পরণে মেজেন্টা রঙ্গের পাঞ্জাবি। ছেলেটা বোধহয় আফনানের আত্মীয়। কাঞ্চনের গায়ে পড়া মানুষ ভালো লাগে না। তবুও হাসি মুখে বললো,
“না না সমস্যা নেই। আমি নিজেই নিচ্ছি।“
“আপনার নাচ অনেক সুন্দর। আপনিও অনেক সুন্দর।“
কাঞ্চন ছেলেটার কথার গতি ঠিক কোথায় যেতে চলেছে বুঝতে পারলো। আফনানের আত্মীয়দের কিছু বলাটা অভদ্রতা হবে। চাচারা ঘেউ ঘেউ করে উঠবে। তাই খুব নরম গলায় বললো,
“ধন্যবাদ।“
“আপনার নাম্বারটা পেতে পারি? আত্মীয় তো আমরা হয়েই গেছি। চেনা পরিচিতি হলে তো ক্ষতি নেই।“
সাথে সাথেই একটা বলিষ্ঠ হাত আঁকড়ে ধরলো কাঞ্চনের কোমড়। ভারী স্বরে বলে উঠুন,
“লিখুন। ০১৮১”
ছেলেটা কাঞ্চনের পাশে স্নিগ্ধের এমন উপস্থিতিতে ভ্যাবাচেকা খেলো। মুখটা বিবর্ণ হয়ে উঠলো স্নিগ্ধের ধাঁরালো চাহনিতে। কোনোমতে বললো,
“আমি আসছি, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে।“
কাঞ্চন ছেলেটা যাওয়ার সাথে সাথে তার কোমড় থেকে স্নিগ্ধের হাত সরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। স্নিগ্ধ তার দিকে কোমল চোখে তাকিয়ে বললো কঠিন গলায় বললো,
“আমি যদি আরেকবার তোর আশেপাশে এমন মাছি ভিনভিন করতে দেখি তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।“
“তো আমি কি করতে পারি মহারাজ?”
“আমার নাম মাথায় খোঁদাই করে রাখতে পারিস। তবে আপাতত”
বলেই তার আঙ্গুলে সেই আংটিটা পড়িয়ে বললো,
“এটা দেখিয়ে বলতে পারিস, আই এম টেকেন। বুঝলেন মিসেস পটনভী।“
“আমার স্বাধীনতা তোমার সহ্য হয় না তাই না?”
স্নিগ্ধ মৃদু হাসলো। তার নাকে নাক ঘষে বললো,
“গা জ্বলে উঠে।“
স্নিগ্ধ কথাটা শেষ করার আগেই কাঞ্চন তার কলার টেনে ধরলো। স্নিগ্ধর চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। কাঞ্চন তীর্যক হেসে বললো,
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২০
“এই বর বর ভাবটা আগামী পরশু যেন অটুট থাকে। তোমার হতে যেয়েও না হওয়া বউয়ের জন্য একটা সারপ্রাইজ গিফট প্রস্তুত করেছি আমি। সে তেড়ে আমার টুটি ধরতে পারে। তখন যেন সত্যের মূর্তি না হওয়া হয়।“
স্নিগ্ধ তখন কিছু বুঝলো না। তবে বিয়ের দিন ঠিক ই বুঝলো। প্রীতি স্টেজে বসে আছে বধু রুপে। একজন নয় বরং বারোটা ছেলে এসেছে। তারা অপরিচিত। তারা স্টেজে যেয়ে আফনানের সাথে হাত মিলিয়ে বললো,
“ভাইজান, আপনে জিতছেন।“
