মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৩
তাসনিয়া নুর
মাহির খাবার গিলছে আর মনে মনে বলতে থাকে,
— সব কিছু ঠিক আছে কিন্তু আবইয়াজের ঔই ছোট মামাতো বোনটা তার একদম পছন্দ না । নাম কি যেনো নানী নাকি নুনতা যে মনে পড়ছে না, মেয়েটাকে তার একদম ভালো লাগেনা সারাদিন শুধু মাহির ভাই মাহির ভাই করে পিছনে ঘুরতে থাকে ।
— তাহলে আমরা কবে যাচ্ছি আব্বু?
চিত্রার উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে আনুয়ার মির্জা মুচকি হাসেন । খাবার খেতে খেতে বলে উঠেন,
— ওনারা বার বার করে বলে দিয়েছেন কালকে যেনো তোমরা সবাই উপস্থিত থাকো ।
খাবার টেবিলে তখন আনন্দে মেতে উঠে সবাই । কতদিন পর আবারো গ্রামে যাওয়া হচ্ছে। চিত্রা, মেহু, মাইরা তখনি ডিসাইড করা শুরু করে সেখানে কি কি করবে কি কি নিয়ে যাবে। বাচ্চাদের খুশিতে আনুয়ার মির্জার বুক প্রশান্তিতে ভরে উঠে ।
বিকেলের দিকে চিত্রা, মাইরা, মেহু হুট করে সিদ্ধান্ত নেয় আজকে নিজ হাতে তারা পকোড়া, চিকেন ফ্রাই এসব বানাবে । যে ভাবনা সে কাজ নিচে গিয়ে কথাটা ফিরোজা বেগমকে বলেন । ফিরোজা রাজি তো হয়ে গিয়েছেন কিন্তু মনে মনে বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন কেনোনা মেয়ে গুলো কোনোদিন রান্না ঘরের আশেপাশে যায়নি। কি অঘটন ঘটায় কে জানে।
ডাইনিং রুমে উপস্থিত থাকার ফলে আহির সব কথা শুনতে পায়। আহির হেসে ব্যাঙ্গ স্বরে বললো,
— শুনছিস আবইয়াজ, মাহির আমাদের ঘরের কিছু আকাইম্মাবতি নাকি কিচেনে যাচ্ছে চিকেন ফ্রাই করতে । দেখা গেলো ফ্রাই করতে গিয়ে আবার খিচুড়ি ফ্রাই বানিয়ে ফেলছে । আহারে বেচারা কিচেন আর চিকেনের যে আজ কি হাল হবে ভাবলেই আমার কষ্ট লাগছে ।
আহিরের কথায় চিত্রা ফোসে উঠে,
— তাই নাকি? নিজেরা কতটুকু পারো হ্যাঁ? আমরা তো খিচুড়ি হলে বানাতে পারি তোমরা তো তাও পারবেনা ।
মাহির চিপস চিবাতে চিবাতে বললো,
— তোর এতো বড় স্পর্ধা তুই আমাদের যোগ্যতায় হাত তুলিস । চল তোদের সাথে আমরা ও যাবো তোদের দেখিয়ে দিবো মির্জা বয় কারা ।
চিত্রা হাই তুলে হাতের ইশারা দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
— হুম চলো দেখা যাবে আজকে কার কত দম ।
— ইয়াহু মির্জা গার্লস vs মির্জা বয়েজ । ( মাইরা চিৎকার করে কথাটা বলে চিত্রার পিছু ছুটে)
সায়মা বেগম কপালে হাত দিয়ে হতাশ স্বরে বললেন,
— আজকে এই ঘরে কি হতে যাচ্ছে একমাত্র আল্লাহ জানে ।
সায়মার কথা শুনে মুন ও ফিরোজা বেগম হতাশ হয়ে ‘হুম’ বলেন ।
কিচেনে ঢুকে মাহির কুংফুদের মতো নেচে কাজে লেগে পড়ে । প্রথম দিকে ভালোই চলছিলো একটা সময় আবইয়াজ আহিরকে ডেকে বলে,
— আহির ফ্রিজ থেকে একটা ডিম দে তো ।
আবইয়াজ আবার নিজের কাজে মত্ত হয়। আহির ফ্রিজ থেকে একটা ডিম নিয়ে আবইয়াজকে বলে,
— আবইয়াজ নে ক্যাচ ।
আবইয়াজ কিছু বলার আগেই আহির ডিমটা আবইয়াজের দিকে ছুড়ে মারে । ডিমটা গিয়ে বরাবর আবইয়াজের মাথায় পরে। ডিম ফেটে আবইয়াজের চুল মাথা ভরে যায়, দৃশ্যটা দেখে আহির জিভ কাটে। মাইরা বলের ভিতর আটা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো আবইয়াজের এই অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে এক পর্যায়ে স্লিপ খায় যার ফলে তার হাতে থাকা সমস্ত আটা গিয়ে পড়ে চিত্রার মাথায় আর বল গিয়ে বারি খায় মাহিরের মাথায় । আটায় চিত্রার সমস্ত মাথা মাখামাখি অবস্থা, আর আটার বলটা গিয়ে মাহিরের মাথায় বেশ জুড়ে পড়ে। মাহির নিচে পড়ে থাকা আটায় স্লিপ খেয়ে নিচে ধপাস করে আছড়ে পরে যায়।
এদিকে এদের কান্ড দেখে আহির ও মেহু, মাইরা হেসে কুটিকুটি অবস্থা । চিত্রা, আবইয়াজ, মাহির এদের হাসি দেখে বললো,
— তবে রে দাড়াঁ দেখাচ্ছি তোদের মজা ।
আবইয়াজ পাশে থাকা এক জগ পানি আহিরের উপর ঢেলে দেয়। পানিতে ভিজে আহিরের অবস্থা একেবারে নাজেহাল। আবইয়াজ, মাহির, চিত্রা, আহির এবার মেহু ও মাইরার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
— তোরা কেনো বাকি থাকবি? আয় তোদের ও খাওয়াই ।
—নাআআআআআ..।
মেহু, মাইরার চিৎকার শুনে তারা শয়তানি হাসি দিয়ে পানি, আটা, ডিম দিয়ে একেবারে মাইরা ও মেহুর মাথায় ঢেলে দেয়। কিচেন থেকে ভেসে আসা চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ পেয়ে সালেহা সেদিকে যায়। গিয়ে সামনের দৃশ্য দেখতেই তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সালেহা এক চিৎকার দেয়, সালেহার চিৎকারে আবইয়াজ, আহির সকলে থতমত খায়।
— এই বুয়া এভাবে চিৎকার করছো কেনো?
আহিরের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগেই সেখানে এসে উপস্থিত হন মুন, সায়মা, ফিরোজা বেগম । তাদের পিছনে আসেন আনুয়ার, সাফিন ও আয়ুব মির্জা। সায়মা বেগম সালেহার দিকে প্রশ্ন করেন,
— সালেহা কি হলো? এভাবে চিৎকার করলে কেনো?
সালেহা নিজের হাত তাক করে সম্মুখে ইশারা করে। সালেহার ইশারাকৃত হাতের দিকে তাকিয়ে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। কিচেনের ফ্লোরে ময়দা, পানি, ডিম মিক্স হয়ে সাদা সমুদ্রের মতো লাগছে। তার উপর দাঁড়িয়ে আছে আবইয়াজ, আহির, মাহির, মেহু, মাইরা, চিত্রা। এদের এক এক জনের অবস্থা দেখে সবাই শিহরিত । প্রত্যেকের সারা শরীর আটা, পানি ডিম দিয়ে মাখামাখি হয়ে আছে। সায়মা বেগম মাথায় হাত দিয়ে,
—- আমি আগেই বলেছিলাম কিছু একটা তো এরা করবেই কিন্তু এতো বড় কিছু করবে ভাবতে পারেনি।
আনুয়ার মির্জা কাঠকাঠ গলায় জিজ্ঞেস করেন,
— এখানে হচ্ছেটা কি?
আনুয়ার মির্জার প্রশ্নের উত্তরে তারা ছয়জন নিজেদের হাত দুপাশে করে কাঁধ উচিয়ে ঠোঁট উল্টায় যার মানে তারা কিছুই জানে না। এদের দেখে এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে এদের মতো নিষ্পাপ দুনিয়াতে আর একটা ও নেই । সাফিন মির্জা হতাশ হয়ে দুদিকে মাথা নাড়ে, না এরা শুধু দেখতেই বড় হয়েছে। আয়ুব মির্জা সালেহা ও ওদের ছয়জনকে উদ্দেশ্যে করে বললেন,
— যা হয়েছে তা তো হয়ে গিয়েছেই। সালেহা যাও তুমি সবকিছু পরিস্কার করে ফেলো। আর তোমরা যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো ।
বেচারি সালেহার দুঃখে কষ্টে মন চাচ্ছে তার সামনে থাকা সাদা সমুদ্রে লাফ দিয়ে মরে যেতে। এতগুলো কাজ সে কিভাবে করবে? আজ বোধ হয় কোমরটা একেবারে ভেঙ্গেই যাবে। সালেহা মনে মনে হায় হুতাশ করতে থাকে । সেসময় হঠাৎ বাসার কলিংবেল বেজে উঠে। মন্টু গিয়ে দরজা খুলতেই ফিরোজা বেগম চিনতে পারেন এরা তো ওইদিনের মহিলাগুলো যারা চিত্রাকে দেখতে এসেছিলো। পাশে আবার আজকে একটা ছেলেকে ও দেখা যাচ্ছে । সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সময় মহিলাটি মুচকি হাসি বিনিময় করেন। ফিরোজা বেগম স্বামীর দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করেন এতেই তার যা বুঝার ছিলো বুঝে গিয়েছেন। ফিরোজা বেগম তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,
— আসেন আসেন এখানে বসেন। তা পাশের ছেলেটা আপনার ছেলে নাকি।
মহিলা মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন । সে মুহূর্তে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে ওরা ছজন । ওদের এই অবস্থায় দেখে চিত্রাকে দেখতে আসা ছেলেটা ভয়ে সোফার উপর লাফ দিয়ে উঠে বসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে । ছেলেটার মা হা হয়ে তাকিয়ে থাকেন সে সাথে ছেলের কান্ডে অস্বস্তিতে পড়ে যান । এদের দেখে চিত্রা ভালোই বুঝতে পেরেছে কেনো এসেছে এরা । তবে পাশের ছেলেটাকে দেখে নাক কুঁচকে ভাবে এটা উনার ছেলে?
চিত্রা কটমট দৃষ্টিতে আহিরের পানে চেয়ে রয়, আর ভাবে “ একটা গাধার কাছে সাহায্য চেয়েছিল কিছু তো করতে পারে নাই উল্টা একশতবার এক একজনকে বাথরুমে দৌড়ানি খাইয়েছে”।
মাইরা তো তখন থেকে ছেলেটার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে, তার মনে শুধু একটা কথাই আসতেছে এমন ছেলে ও বুঝি বাস্তবে হয়?
ছেলেটার পড়নে ব্লু শার্ট যার বোতাম গলা অবধি লাগানো। তার সাথে গুল একটা চশমা আর চুলে তেল দিয়ে মাঝে সিথি করা । মাইরা আস্তে ধীরে চিত্রার কানে কানে বলে,
— আপু দুলাভাই সুন্দর না একটু ও ।
— কিসের দুলাভাই? থাপড়ে একদম মাথার সব চুল ছিড়ে ফেলব।
— থাপ্পড়ে আবার চুল ছিড়ে নাকি? কি যা তা কথা বলো।
আনুয়ার সাহেব তাদের উদ্দেশ্যে বললেন,
— তোমরা যার যার রুমে যাও ফ্রেশ হও।
উনার কথা মতো তারা উপরে চলে যায়। আনুয়ার মির্জা এবার শান্ত স্বরে বলতে আরম্ভ করেন,
— দেখেন আমরা আসলে এখন মেয়ে বিয়ে দিতে চাচ্ছিনা। তাছাড়া আমদের মেয়ে এখনো যথেষ্ট ছোট ।
মহিলা অমায়িক হেসে উত্তর দিলেন,
— সমস্যা নেই আমরা না হয় পরেই ওদের বিয়ে দিলাম।
মহিলার কথা শুনে আনুয়ার মির্জা আবারো বুঝানোর প্রয়াশে,
— না এইটা আমি আপনাকে কথা দিতে পারছিনা তাছাড়া ছেলে মেয়েদের পছন্দের একটা ব্যাপার আছে। তাই ভালো হবে আমরা এইসব নিয়ে আর কথা না বলি।
মহিলাটি সেদিন অনেক চেষ্টা করেছিলো আনুয়ার মির্জাকে বুঝানোর কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, শেষমেষ আশাহত হয়ে বাসায় ফিরে যান।
শীতের আমেজ শুরু হয়েছে, ভোরের বাতাসে এক নরম শীতলতা। সকালের হালকা আলোতে শিশির ভেজা গাছপালা মুক্তা ন্যায় চিকচিক করছে । তবে প্রকৃতি এখনো কুয়াশার চাদরে মুড়িয়ে আছে। তখনই মির্জা বাড়িতে চলছে হলচল, সকাল সকাল তারা রওনা দিবে আবইয়াজ চিত্রার নানা বাড়ি যশোরের লেবুতলা গ্রামে । ঢাকা থেকে সেখানে পৌঁছাতে নূন্যতম পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা তো লাগবেই, যার জন্য এতো তারাহুড়া।
চিত্রা, মাইরার পড়নে টপস তার উপর উলের সোয়েটার। গলার চারপাশে ঘিরে আছে মখমলে সাদা স্কার্ফ । অপর দিকে মেহু পড়েছে সাদা টু-পিস তার সাথে সোয়েটার। আহির, মাহির, আবইয়াজের পড়নে ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট তার সাথে ডেনিম প্যান্ট। হাতে ব্ল্যাক লেদার ওয়াচ ও চুল জেল দিয়ে সেট করা। তিন ভাই আজকে সেম জিনিস পড়েছে।
চিত্রা খুশি মনে রুম থেকে বের হয়ে মাইরার উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করে,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১২
— আমাকে কেমন লাগছে দেখতে?
মাইরা কিছু বলা আগে চিত্রার পাশে রুমে থাকা আহির বের হওয়ার সময় বলে উঠে,
— মাইরা মির্জা ম্যানশনে কি এতিম শাঁকচুন্নিদের ভাড়া দেয়া হচ্ছে নাকি? আজকাল ঘরের ভিতর এসব চুন্নি দের দেখা যাচ্ছে যে?
