মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১
তাসনিয়া নুর
নিস্তব্ধ রুমে বসে আছে চার জন । সকলে গভীর চিন্তায় মগ্ন। তাদের ভাবনার মূল বিষয় হচ্ছে মেহু। মেয়েটাকে কিছুদিন যাবৎ অন্য রকম লাগছে। যে মেয়ে এতো চন্ঞ্চল ছিল সারাদিন টইটই করে সবার মাথা খেতো হুট করে এইভাবে নিরব হয়ে যাওয়ার মানে কি?? আবার যে এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতোনা এখন সে পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ পরছে ।শুধু কী তাই বাহ্যিক দিক ছাড়া আরও কিছু পরিবর্তন এসেছে। যে মেয়ে ঝাল খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকতো বম্বে মরিচ দেখলে লোভ সামলাতে পারতোনা এখন সে সামান্য পরিমাণ ঝাল খেতে পারছেনা কেনো কেনো কেনো???
— জ্বীন
কথাটা কানে আসতেই সকলে একদৃষ্টিতে তাকালো চিত্রার দিকে । মাহির চিত্রার কথা বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করল,
— মানে??
— আমার মনে হয় আমাদের মেহুকে জ্বীন ধরেছে ।
চিত্রার উত্তরে সবায় একটু সিরিয়াস হয়ে বসল কারণ এই মুহূর্তে চিত্রার কথা সকলের যুক্তিযুক্ত বলে মনে হচ্ছে। পাশ থেকে মাইরা বলে উঠে
— আমার মনে হচ্ছে মেহুপুকে আশিক জ্বীন ধরেছে আমি রিলসে দেখছিলাম যে মেয়েদের পছন্দ হয় এই আশিক জীন এদের ধরে ফেলে । আর আমাদের মেহুপু তো অনেক সুন্দর তাই হয়তো আপুকে ও…
মাইরার কথায় সকলে মাথা দুলালো মেহুর চালচলন দেখে তো এমনই মনে হচ্ছে। আহির এবার সবার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো
— তাহলে এখন উপায়?? গিয়ে কি বড় আব্বুকে বলবো??
— না এখন কথাটা বড় আব্বুকে বা কাওকে গিয়ে বলা উচিত হবেনা কারণ আমরা নিজেরাই এখনও ব্যাপারটা শিউর না তাহলে উনাদের কিভাবে বলবো? এইভাবে সন্দেহের বসে অপবাদ দেওয়াটা ঠিক হবে না।
একটু ভাবুক হয়ে কথাটা বলল মাহির। মাহিরের সাথে তাল মিলিয়ে চিত্রা বলে উঠে
— আর এখন মেহুর পরিবর্তনে বড়রা অনেক খুশি এর মধ্যে আমরা যদি এইসব বলি দেখা গেলো ঝাঁটা নিয়ে আমাদের পিছন লাগলো।
— কথা সত্য।
বলে উপর নিচ মাথা দুলালো আহির । মাইরা এবার বসা থেকে দাঁড়িয়ে এপাশ ওপাশ পায়চারি করতে করতে বলে,
— তাহলে এখন উপায়?? কি করব আমরা??
এর মধ্যে আহির মাহিরকে পাশ থেকে জরিয়ে ধরে ভয় মিশ্রত কন্ঠে বলে উঠল,
— যা করবি তাড়াতাড়ি করিস। আমার তো ভাবতেই খুব ভয় লাগছে এখন আমি একা কিভাবে আমরা রুমে যাবো। এই মাহির তুই আমাকে নিয়ে যাবি আমি একা যেতে পারবোনা।
আহিরের কথায় নাক মুখ কুঁচকায় চিত্রা,
— তুই একটা আস্ত ভিতুর ডিম উনিশ থেকে বিশ হলেই প্যান্ট এ হিশু করে দিস।
— এই চিতার বাচ্চা আলুর ডাব্বা তোকে কে বলেছে আমি প্যান্ট এ হিশু করি আমি কি তোকে দেখিয়েছি হ্যাঁ??
— এই টাহির বাহির তোকে না করেছি না আমাকে এই নামে ডাকবি না। তোর কত বড় সাহস তুই আবার আমাকে এই নামে ডেকেছিস। আরেকবার যদি ডেকেছিস তাহলে তোকেকককক…..
আহির এবার গা ছাড়া একটা ভাব নিয়ে বলে উঠে,
— কি করবি হ্যাঁ?? আমি কি তোকে ভয় পাই হ্যাঁ?? গুণে গুনে তোর চেয়ে পাঁচ বছরের বড় আমি। সো সম্মান দিয়ে কথা বলবি আলু একটা ।
চিত্রা কিছু বলতে নিবে তার আগেই মাহির ওদের থামিয়ে দিয়ে বলে
— চুপ করবি তোরা? এইখানে একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসেছি আমরা আর তোরা দুইটা কিনা এইভাবে বাচ্চাদের মত ঝগরা করছিস??
ওইদিন তাদের আলোচনা এটুকু পর্যন্ত ছিল তারপর যে যার যার রুমে চলে গেলো।
রাত দশটা কিংবা এগারোটা ছাদে এক সাইড আহির দাঁড়িয়ে চন্দ্রবিলাস করছে। অন্য দিকে মাহির ফোন নিয়ে ঘাটা ঘাটি করছে । কিছু সময় অতিবাহিত হয় হঠাৎ নূপুরের রিনিঝিন আওয়াজ ভেসে আসে আহির বিষয়টা খেয়াল করে সেদিকে মাথা তাক করে একটু ভালো করে তাকাইতে একটি কালো অবয়ব দেখতে পায়। আহির একটা শুকনো ঢুক গিলে আর ভাবে হয়ত তার মনের ভুল তাই সেদিকে আর না তাকিয়ে সামনের দিকে তাকায়। কিন্তু যতো সময় যাচ্ছে নূপুরের আওয়াজ আরও তীক্ষ্ণ হচ্ছে।
এইবার বোধ হয় আহির একটু ভয় পেলো শুকনো একটা ঢুক গিলে আহির পিছে তাকাতেই দেখতে পেলো একটা মেয়ে দাঁত বের করে তার দিকে তাকিয়ে আছে চোখ গুলো লাল হয়ে জ্বলজ্বল করছে । আহিরের হাওয়া টাইট হওয়ার জন্য এইটাই বুঝি যথেষ্ট ছিল আহির এক চিৎকার দিয়ে মাহিরের কোলে উঠে পরে। হঠাৎ আহির এইভাবে কূলে উঠায় মাহির তাল সামলাতে না পেরে পিছিয়ে যায়। পরতে পরতে নিজেকে বাঁচিয়ে মাহির বিরক্তি নিয়ে বলে,
— এতো যখন কোলে উঠার শখ তাহলে যানা একটা বিয়ে করে ফেল শুধু শুধু আমার বউয়ের সম্পদ কেনো ধ্বংস করতে কেনো উঠে পরে লেগেছিস ।
আহির আবার জুড়ে চিৎকার দিয়ে বলে,
— আরে আমার বুঝি ঠেকা পড়েছে রে তোর কোলে উঠার সামনে দেখ রে সামনে দেখ তোর নানী দাঁড়ায় আছে।
আহিরের কথা শুনে মাহির সামনের দিকে তাকাতেই শরীর তরতর করে ঘামতে লাগে কিছু সময় হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে থেকে আহিরকে কোল থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিলো মাহির । হুট করে চিৎকার দিয়ে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় এলোমেলো ভাবে দৌড়াতে শুরু করে,
—. ও মাগো ভূত গো ভূত বাঁচাও।
— আমায় এই ভূতের মুখে ফেলে কোথায় পালাচ্ছিস তুই আমি এর রাতের আহার হতে চাই না।
কথাটা বলে আহির ও এলোমেলো ভাবে দৌড়াতে লাগলো। কিছুক্ষণ উদ্ভ্রান্তের মত এলোমেলো ভাবে দৌড়ানোর পর মাহির ক্লান্ত হয়ে কার কাঁধে হাত রেখে হাঁপাতে লাগলো। দূর থেকে ভেসে আসলো আহিরের কন্ঠ
— ভাই এইদিকে আয় এইদিকে আমার কাছে আয় কই তুই??
আহিরের কন্ঠস্বর পেয়ে মাহির সামনে তাকালো আর ভাবলো যদি আহির সেখানে হয় তাহলে এইটা কে?? মাহির কাপা চোখে তাকাতেই আবার সেই লাল চোখের দেখা মেললো। মাহির সে দিকে তাকিয়ে মাগো বলে চিৎকার দিয়ে দিলো এক দৌড় হঠাৎ শক্ত কিছুর সাথে বারি খেয়ে ওল্টে নিচে পরে গেলো। মাথা ঘষতে ঘষতে উঠে বসে সামনে তাকিয়ে দেখে আহির চিতপটাং হয়ে পা ছড়িয়ে পরে আছে।
মাহির এগিয়ে গিয়ে আহিরের গালে থাপ্পড়িয়ে বলতে লাগে
— এই আহির উঠ উঠ বলেছি এখন কি ঘুমানোর সময় আরে বেটা উঠ।
— আমি কে?? আমি কোথায়? আমার কি হয়েছে? আমি কি মরে গেছি? ওই ভূত কি আমাকে খেয়ে ফেলেছে??
— তুই এখন ভূতের পেটের দুই নং গলিতে আছিস তাড়াতাড়ি উঠ হাদা একটা।
ইতোমধ্যে ওদের চিৎকার এর শব্দ শুনে বাড়ির সবায় ছুটে এসেছে।
