মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৯
তাসনিয়া নুর
সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করা দুজন মহিলার দিকে তাকিয়ে আবারো সোফায় গা এলিয়ে দেয় আহির ও মাহির । তাদের ঢোকতে দেখে এগিয়ে আসেন ফিরোজা বেগম, দেখে তো মহিলা গুলোকে পরিচিত ঠেকছেনা তিনি সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেন । মহিলা দুজন হয়ত তার মনের আশঙ্কা বুঝতে পারলেন তাদের মধ্যে একজন হেসে বলে উঠলেন
— আসলে আমরা আপনার মেয়েকে দেখতে এসেছি ।
ফিরোজা বেগম কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করেন
— কোন মেয়েকে??
— আপনাদের বড় মেয়েকে ।
কথার পিঠে তিনি কি বলবেন বুঝতে পারলেন না তার উপর বাড়ির কর্তারা আজকে অনুপস্থিত । এদিকে মহিলার কথা শুনে ধপ করে শোয়া থেকে বসে পরে আহির ও মাহির অন্যদিকে মাইরা সবে নিচে নেমেছিল কিন্তু মহিলার কথা শুনে তার আর বেশিক্ষণ সেখানে থাকা হলো না দৌড়ে চলে গেলো উপরে উদ্দেশ্য চিত্রার রুম ।
খাটের উপর আধশোয়া হয়ে মোবাইল ঘাটাঘাটি করছিলো চিত্রা। হুট করে দরজার বাহিরে মাইরার চিৎকার শুনে ধরফরিয়ে উঠে বসে, মাইরা চিত্রার সামনে দাঁড়িয়ে বলে
— আপুইইইইই জানো দুজন মহিলা এসেছে আর উনারা বলছে তোমার সাথে নাকি উনার ছেলের বিয়ে।
মাইরার কথায় বেশ অবাক হয় চিত্রা তার বিয়ে অথচ সেই জানেনা। আর কে সেই গাধার ঘরে হাতির নাতি যে তাকে বিয়ে করতে চায়? বেশ কিছুক্ষন চুপ থাকার পর চিত্রা কাপড়ের হাতা গুটাতে গুটাতে বলে উঠে
— চল দেখে আসি কোন দাদার ঘরের বাপের নাতি আমাকে বিয়ে করতে চায়….
— কিন্তু আপু দাদার ঘরে বাপের নাতি হয় কিভাবে?? তোমার ডায়লগ ভুল, যাও গিয়ে ডায়লগ বদ্লে আসো কার না কার থেকে শুনে এসে উল্টাপাল্টা ডায়লগ ছারছো ।
চিত্রা মাইরার মাথায় চাটা মেরে বলে
— ওইটা আমার বানানো ডায়লগ বলদি । এই চিত্রা কারোর থেকে ডায়লগ চুরি করে না বুঝেছিস?
মাইরা এবার মুখ ভেংচি মেরে বিড়বিড়য়ে আওড়ায়,
— দেয় ভুলভাল ডায়লগ তা নিয়ে তার আবার কত গর্ভ হুহ ।
— এই নিজে নিজে কি বিড়বিড় করছিস?
— বলছিলাম তাড়াতাড়ি চলো নাহলে এই বুঝি তোমাকে ছাড়া তোমার বিয়ে দিয়ে দিলো।
— আমাকে ছাড়া আমার বিয়ে কিভাবে দিবে??
— আরে তুমি চলো তো ।
উপর থেকে নিচে উকি মারে চিত্রা। নিচের দৃশ্য দেখে খানিকটা ঢুক গিলে এতক্ষণ সাহস থাকলে ও হুট করে কেমন যেনো সব গায়েব হয়ে গিয়েছে। বড়দের উপর কথা বলার অভ্যাস তার কোনো কালেই নেই কিন্ত এখন? এখন কি করবে? সে যে এখনই বিয়ে করতে চায় না। অবশ্য তার রাগ ও হয় তাকে কি একবারো জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করেনি কেউ ।
আহির বিরক্তি নিয়ে উপরে তাকায় চিত্রার সাথে তার দৃষ্টি মিলে। চিত্রা চোখের ইশারায় তাকে উপরে যেতে বলে, আহির সময় ব্যয় না করে সেদিকে পা বাড়ায় তার সাথে মাহির ও আসে। উপরে যেতেই আহির চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে? একটু আগের ঘটনা মনে পড়তেই আহিরকে দেখে কেমন হাসফাস লাগে চিত্রার ।তবে এখন এই মুহূর্তে তার যে আহিরের সাহায্য চাই। চিত্রা মিনমিন স্বরে বলে উঠে
— আমি বিয়ে করতে চাইনা।
— করিস না তোকে বিয়ে করতে কে বলেছে? আর তোকে নিবেই বা কে? কার মরণের ভূতের ধরেছে?
তখন নিচ থেকে ভেসে এলো ফিরোজা বেগমের গলা তিনি চিত্রাকে ডাকছেন ।নিজের রাগ সংবরন করতে খানিকটা শুষ্ক ঢোক গিলে চিত্রা, এখন কিছু বলা যাবেনা কারণ সে এখন অসহায়। চিত্রা ঠোঁট উল্টে ইনোসেন্ট মুখ বানিয়ে বলে
— প্লিজ মাকে গিয়ে বলো আমি বিয়ে করতে চাইনা।
আহিরের এবার একটু মায়া হয় আর তাছাড়া একটু আগে বিছুটি পাতার কারণে কি রকম বেঙ্গের মত লাফাচ্ছিল । গাল গলা এখনো লাল হয়ে আছে। আহির বেশ চিন্তিত হয়ে কিছু একটা ভাবে তারপর হাতের চুটকি বাজিয়ে উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে
— একটা দারুণ বুদ্ধি পেয়েছি তবে আপাতত এদের এখান থেকে বিদেয় করতে হবে ।
আহির নিজের রুমে গিয়ে কিছু একটা হাতে নিয়ে তরিগরি করে কিচেনে দিকে অগ্রসর হয়। গরম গরম পায়েস আলাদা একটা বাটিতে নিয়ে সেখানে হাতে থাকা কাগজটা বের করে তার ভিতর থাকা গুরু পায়েস ভালো ভাবে মিশিয়ে দিয়ে দাঁত কেলিয়ে বলে
— বিয়ের আগে মিষ্টি তো খেতে হবে তাইনা?
আহির কিচেন থেকে বেরিয়ে দেখে চিত্রা ইতোমধ্যে নিচে চলে এসেছে। আহির সকলের সম্মুখে গিয়ে বলে
—আরে গিয়ে দেখলাম পায়েশ রান্না হয়েছে। চিত্রা যা তো গিয়ে মেহমানদের জন্য নিয়ে আয়।
আহির চোখ দিয়ে ইশারা করে চিত্রাকে । চিত্রা জুহুরি দৃষ্টিতে পরখ করে বুজতে পারে কিছু একটা করেছে এই ছেলে। তাই কথা না বাড়িয়ে আহিরের কথা মত চলে যায় পায়েশ আনতে।
চিত্রা পায়েশ এনে সামনে রাখে, একটা মহিলা তার হাত ধরে পাশে বসিয়ে হাসি মুখে বলে
— বাহ আপনাদের মেয়েতো মাশাআল্লাহ খুব মিষ্টি দেখতে। আমাদের মেয়ে অনেক পছন্দ হয়েছে।
ফিরোজা বেগম সৌজন্য হেসে বললেন
— আসলে ওর বাবা চাচার বাসায় নেই আর তাদের অনুমতি ব্যতিত আমারা কিছু মানে আসলে।
মহিলাটি মুচকি হেসে বলে
— আরে আপনি ইতস্তত করবেন না আমাদের কোনো সমস্যা নেই আমরা না হয় পরে আবার আসলাম।
বেশ কিছুক্ষন কথা বলার পর মহিলা বলে উঠে
— আজ তাহলে আসি ।
এরপর তারা চলে যায় আহির সেদিকে তাকিয়ে ভাবুক হয় কোনো রিয়েক্শন নেই কেনো?
চিত্রার রুমে গুল হয়ে বসে আছে মাহির মাইরা চিত্রা। চিত্রা বসে বসে ফুঁসছে কোন আক্কেলে ওই বেক্কলকে ভরসা করেছিলো সে? হওয়ার তো কিছুই হলো না উল্টো বিয়ে পাকা করে গেলো মাঝখান থেকে। ঠিক সেই মুহূর্তে মেহু হাসি মুখে পায়েশ নিয়ে হাজির হয়
— আপু শুনলাম তোমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে। নেউ একটু মিষ্টি মুখ করো।
— ওই কোনো বিয়ে টিয়ে ঠিক হয় নি আমার। আর তুই আমাকে আপু ডাকছিস এ ও সম্ভব??
বড্ড আর্শয দেখায় চিত্রাকে । মাহির এতো কিছুর ধার না ধরে পায়েশের বাটিটা মেহুর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে খাওয়া শুরু করে। খেতে খেতে বলে উঠে
— আরে এতো প্যারা না নিয়ে আগে খা আর মাথা ঠান্ডা কর। নে নে ধর ।
সবাই এক এক করে পায়েশ খেয়ে নেয়। কথা বলতে বলতে মাহিরের পেট কেমন গুড়গুড় শব্দ শুরু করে । মাহিরকে এমন হাসফাস করতে দেখে মাইরা জিজ্ঞেসা করে
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৮
— কি হয়েছে তোমার? এভাবে বাইম মাছের মতো নাড়াচাড়া কেনো করছো?
— পেটটা কেমন যেনো গুড়গুড় করছে ।
— আরো খাও বেশি করে খানা দেখলে আর হুশ থাকেনা ।
মাহির আর অপেক্ষা করতে পারলোনা তার পেটে প্রচন্ড চাপ দিয়েছে । মাহির যাওয়ার পর মাইরার পেট গুড়গুড় শুরু হয় মাইরা আর থাকতে না পেরে দৌড়ে গিয়ে ওয়ারুমের দরজা এলোপাথাড়ি বাড়ি দিতে থাকে। মাহির বের হতেই মাইরা ঢুকে পরে এভাবে পালাক্রমে চিত্রা, মেহু, মাহির, মাইরা, ঢুকতে থাকে আর বের হতে থাকে। একজন ঢুকতেই বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন ক্রমাগত দরজার খটখট করতেই থাকে ।
