Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৩+১৪

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৩+১৪

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৩+১৪
শ্যামলী রহমান

শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পর মিলাদ হবে। তার পর সেই লোকগুলোকে খাওয়ানো হবে এমনই ভাবে আয়োজন চলছে।এখন সকাল দশটা।সকলে কিছুটা ব্যস্ত।একদিকে মাংস রান্না হচ্ছে আরেকদিকে আলুর ঝোল চড়িয়েছে। ভাত আরেকটু পর চড়াবে নয়তো এখন থেকে রান্না করলে ঠান্ডা হয়ে যাবে। মাংস,আলুর ঝোল তরকারি তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করে তার পর বাকি কাজ।প্রহর পিয়াস দুজনে কাজে সাহায্য করছে।শমসের দেওয়ান চেয়ারে বসে আছেন। কোথাই কি করতে হবে তা মাঝে মধ্যে বলে দিচ্ছেন। প্রহর কাজের ফাঁকে একবার এদিক সেদিক তাকালো। কিন্তু না কাঙ্ক্ষিত মানুষটির দেখা পেলো না।দূরে শুধু রিতিকে দেখা যাচ্ছে বাচ্চাদের সাথে খেলছে।পিয়াস রিতি কে ডাকলো।রিতি খেলা বাদ দিয়ে ছুটে আসলো। প্রহর সেখানে ছিলো একবার তার দিকে দেখেই পিয়াসের পাশে গেলো।

“কি হয়েছে ভাইয়া?ডাকছো কেন?
পিয়াস ব্যস্ত হয়ে বলল,
“বাড়ি থেকে এক বাটি মুড়ি নিয়ে আয় তো।তুই আর মিথি তো মাংসের ঝোল দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে খেতে পছন্দ করিস।মাংস রান্না শেষ ডিস থেকে নামিয়ে নিলে তলায় থাকা ঝোল দিয়ে মুড়ি মাখাবো অনেক মজা হয়।
রিতি তো খুশি হলো।বড় ডিসে রান্নার সাদ আলাদা। তলানির ঝোলা নিয়ে মুড়ি মাখানো আরো মজা। রিতি তখনই ছুটলো।প্রহর রিতির ছুটে চলা দেখে নিজেকে বলল,

“পছন্দ অপছন্দের যার এতো খেয়াল,
আমি পারতাম নাকি তার মতো রাখতে এতো খেয়াল?
ভালোবাসার থেকে ভালো রাখাটা জুরুরি তাই তো ছেড়ে আসছি।জানি সেখানে থাকবে সে সুখী।
“এক্সকিউজ মি?এখানে দেওয়ান বাড়িটা কোনদিকে?
মিথি,শার্লিন আর রিনিতা এসেছিলো গ্রামের শেষ প্রান্তের কাঁচা রাস্তায়। মূলত গ্রাম ঘুরতে এসেছিলো রিনিতাকে নিয়ে। সে তো গ্রামে মাঝে মাঝে আসে।
কাল এসেছে কয়দিন পর চলে যাবে। তাছাড়া মিথি আর রিতি তো প্রায় নিত্যদিনই গ্রাম চষে বেড়ায়।দুজনের বয়সের ফাঁরাক তিন বছরের ছোট বড় হলেও তাদের মিল ভীষণ।দুজনে প্রায় সব সময় একসাথে ঘুরে।বন্ধু বলতে তাকেই সে বুঝে। সময়ে এসময়ে তাকেই পাশে খুঁজে।কাঁচা রাস্তার দিকে গাড়ি চলাচল নেই বললেই চলে। কিছু মানুষ সাইকেল,মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়া আসা করে।

কেউ হেঁটে চলে পথে। ওরা তিনজনে বাড়ি ফিরছিলো হঠাৎ কোনো পুরুষের কন্ঠ শুনে তিনজনে পিছনে তাকালো।তাদের সামনে দু’জন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। একজনের চোখে সানগ্লাস সম্ভবত আরেকজনের খোলা চোখ। দুজনের ঘাড়ে ব্যাগ।দেখে মনে হচ্ছে বেড়াতে এসেছে নয়তো বাড়ি ফিরছে। শার্লিন তাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করলো,
“দেওয়ান বাড়ি আপনাদের কি কাজ?কে আছে সেখানে?
পাভেল উত্তর দিতে চাইলে আসিফ আঁটকায়। সেও বাঁকা উত্তর দেয়,
“কি কাজ সেটা আপনার শুনে কাজ কি?কোন দিকে শুধু এটা বলুন।
রিনিতা আর মিথি শুধু দেখছে।শার্লিনের বাঁকা উত্তর শুনে রাগ হলো,বলল,

“জানিনা।আপনারা নিজে খুঁজে নেন।
“কি বদমাইস মেয়ে রে বাবা।সোজা প্রশ্নের বাঁকা উত্তর দেয়। ঠিকানা বলবেন না সেটা বললেই হয়।
বদমাইস বলতেই শার্লিন ক্ষেপে গেলো। লেগে গেলো কথা কাটাকাটি।মিথি থামতে বলছে কিন্তু হচ্ছে কই?পাশের ছেলেটা এবার বিরক্ত হলো।
“তুই থামবি?চল এখান থেকে গ্রামে যখন এসেছি বাড়ি খুঁজে পাওয়া ব্যাপার নয়।বলেই হাঁটতে শুরু করলো। পিছন পিছন ছেলেটাও দৌঁড়ে গেলো। শার্লিন কিছুটা ফুঁসছে যেন। মিথি বলল,
“ওই বাড়ির খোঁজ করছে নিশ্চয়ই কোনো দরকারে এসেছে কিংবা হতেও পারে কোনো আত্নীয়।
“আমাদের আত্নীয় হলে চিনতাম না?

“আরেহ কে হয় হোক চলো তো। রিনিতা ওদের দুজনকে টেনি নিয়ে চললো।ছেলে দুটো ততক্ষণে গ্রামের ভেতরে চলে গেছে হয়তো।কারণ তাদের পথে আর দেখা যাচ্ছে না।খেঁজুর গাছগুলো সারি সারি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।খেঁজুর গাছের নিচে কাঁটা পড়ে ছিলো।ওখানে একটা মেয়ে বখুরি বাঁধতে গিয়ে পায়ে কাঁটা ফুটিয়েছে। কয়েকজন সেখানে ভিড় করেছে। তারাও সেখানে গেলো দেখলো বড় একটা কাঁটা পায়ের তলায় ঢুকে গেছে। টান দিতেই অর্ধেক বেরোলো বাকি অর্ধেক পায়ের ভেতরে রয়ে গেছে।সেখান থেকে র*ক্ত পড়ছে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে কাঁটা বাহির করে দিবে।কয়েকজন বলল,খেঁজুরের কাঁটা বড় বিষাক্ত। পায়ে বিধে থাকলে মরণ ও ঘটাতে পারে।
প্রহর সবে বালতি হাতে পানি নিয়ে আসছিলো। দূরে পরিচিত মুখ দেখে বালতি রেখে দাঁড়ালো।প্রথমে ভাবলো হয়তো ভুল দেখছে তাই আশে পাশে চোখ ঘুরিয়ে আবার তাকালো। না একই দেখছে কিন্তু তারা কি করে?তার ভাবনার মাঝেই দু’জন এসে প্রহর কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো।

“সারপ্রাইজ!
প্রহরের চোখ সত্যি দেখেছে। তাকে জড়িয়ে রয়েছে পাভেল আর আসিফ। দুজনের মুখে বিস্তার হাঁসি। আসিফ চটপটে স্বভাবের সেই বলল,
“কেমন লাগলো সারপ্রাইজ?অবাক হয়েছিস না?
“তোরা আসবি বললি না তো?আসলে একসাথে আসতাম।
“ভাই এই প্ল্যান আসিফের।আমি চেয়েছিলাম তোকে বলে তোর সাথে আসবো।তোর প্রেয়সীনি নাকি হৃদয়হরনী তাকে দেখবো।না হোক সন্ধি আক্ষেপ রইবে কেন মনের মধ্যে বন্ধি?
আবার ভাগ্য বদলাতেও পারে,হতেও পারে সন্ধি।
আল্লাহ তায়ালা চাইলে কোনো কিছুই নয় অসম্ভব।
পাভেলের অর্ধেক কথার মানে প্রহর বুঝতে পারলো না। আসিফ আশে পাশে তাকিয়ে দেখছে। তার গ্রাম সম্পর্কে ধারণা কম।গ্রামে আসা হয়নি খুব একটা। তবে ভালো লাগছে। শমসের দেওয়ান সেখানে উপস্থিত হলো। ছেলেগুলোকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

“কারা এরা?
“নানা এরা আমার বন্ধু।
বন্ধু বলতেই শমসের দেওয়ান বুঝতে পারলেন।হেঁসে উঠে বললেন,
“আগে বলবি না।তোদের না দেখলেও প্রহরের মুখে বহুবার শুনেছি।দূরে বলে তোরা আসিস না নাকি?
তুই বললাম বলে রাগ করিস না।প্রহর আর তোরা তো একই,আমার নাতী।
পাভেল আর আসিফ মুগ্ধ হলো।
“না,নানু ঠিক আছে। আমরাও তোমার নাতী সো তুই বলতেই পারো।আজ এসেছি প্রহর যতদিন থাকবে আমরাও থাকবো এবং নানা নাতীরা মিলে আড্ডা দিবো।
শমসের দেওয়ান সহ সকলে হেঁসে উঠলো।তিনিও বেশ সৌখিন মানুষ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
শার্লিন,রিদিতা আর মিথি বাড়ির দিকে আসছিলো।তিন জনে গল্পে মত্ত। হুট করে মিথির চোখ আঁটকে গেলো। সামনের মানুষগুলোর সাথে মানুষ কে দেখে।

“এই আপা সামনে দেখো।
মিথির হাত টানাতে শার্লিন সামনে তাকালো। তারা ততক্ষণে অনেকটা কাছে এলো।সেই ছেলেগুলো প্রহর ভাই আর নানা ভাইয়ের সাথে কি কথা বলছে?
“এরা আবার প্রহর ভাইয়ের কেউ নয়তো?
“কিজানি। হতে পারে।তাহলে আমাদের দেখলে যদি প্রহর ভাই কে বেয়াদবি করার কথা বলে দেয়?
রিদিতার কথায় শার্লিন ঠোঁট বাকিয়ে বলল,
“আমরা কখন বেয়াদবি করলাম?তুই চুপ থাক চল আমরা এপাশ দিয়ে তোদের বাড়ি যাই।শার্লিন মুখে এক কথা বললেও মনে মনে একটু ভয় পেলো।তার মা’কে বললেই বকা খাবে। তিনি তো কিছু হলেই বকা দেওয়ার জন্য তৈরি থাকেন সেখানে অতিথিদের ঠিকানা বলিনি এতে তো আরো বকা।ওরা তিনজনের এক প্রকার লুকিয়ে দূর থেকে ঘুরে যাচ্ছিলো।তবে শেষ রক্ষা হলো না।সামনে থেকে পিয়াস ডেকে উঠলো,

“মিথি এদিকে আয়।
ব্যস যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয়।
এই প্রবাদ টা সঠিক হলো।পিয়াসের ডাকে সামনের মানুষ গুলো পিছনে তাকালো। দুজনের ভ্রু কুঁচকে এলো।শমসের দেওয়ান ও তাদের ডাকলো ওদিকে যেতে। উপায় না পেয়ে তিনজনে ধীর পায়ে চললো।
বিড়বিড় করলো,কি হবে বললে?
ওরা তিনজনে যেতেই পাভেল আর আসিফ জিজ্ঞেস করলো,
“এরা কারা?
“কাজিন।
আসিফ ভ্রু কুঁচকে শার্লিনের দিকে চেয়ে আছে।
শার্লিন অন্য দিকে।সে মনে মনে বলছে,“ কি মিথ্যে বাদী মেয়ে রে।পিয়াস ওদের ডাকছে তাই সেই বাহানায় মিথি বলল,

“আমরা যাই দাদু?পিয়াস ভাই ডাকছে।
শমসের দেওয়ান যেতে বলতেই তিনজন যেন হাফ ছাড়লো।তড়িঘড়ি করে ছুটলো।
শমসের দেওয়ান ও গেলো ওপাশে।
সবাই চলে যেতেই প্রহর কে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“মিথি নাম ধরে ডাকলো কিন্তু ওখানের মধ্যে মিথি কোনটা?ছবি দেখেছিলাম ছোট বেলার কিন্তু সেই ছবির সাথে একজনের মিল পাচ্ছি না।
প্রহর ওদের কে নিয়ে বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে আঙ্গুল দিয়ে মিথিকে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“লাল সালোয়ার পরা যে মেয়ে সেই আমার শুকতারা।
দুজনে তাকালো। তংন রাস্তায় নিরবে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাই তবে সে?যাক ভালো ওই বদমাইস মেয়েটা নয় ভাগ্যিস।

“কি ভাবছিস আয়।
প্রহরের ডাকে দুজনের দৃষ্টি সরলো। তার পিছু নিয়ে বাড়ির ভেতরে গেলো। মিথির দৃষ্টি তাদের দিকেই ছিলো। বাড়ির ভেতরে যেতেই মুড়ি খেতে খেতে পিয়াস কে জিজ্ঞেস করলো,
“পিয়াস ভাই?প্রহর ভাইয়ের সাথে ওরা কারা?
পিয়াস বেখেয়ালে বলল,
“কে?
তার পর খেয়াল আসতেই বলল,
“ওহ ওরা?প্রহরের সাথে পড়ে।ওর ভার্সিটির বন্ধু। একটু আগে আসলো।
পাভেল আর আসিফ প্রহরের ঘরে আসতে গিয়ে সোনিয়া সাথে দেখা হলো।

“এরা কারা দেবরজি?
প্রহর মুখ গোমড়া করে উত্তর দিলো,
“আপনার না জানলেও চলবে।
বলেই পাশ কাঁটলো। ঘরে প্রবেশ করে আসিফ বলল,
“এটা সেই ভাবি নাকি?
প্রহর হুম বলল। পাভেল বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিলো।একটু পর বলল,
“তোর হৃদয় হরনী তো বেশ শান্ত এবং ভদ্র মনে হলো।
“চঞ্চলতা দেখলে বুঝছি সে কেমন শান্ত। পুরো গ্রাম চষে বেড়ায়। হ্যাঁ ভদ্র আছে।
“তুই শান্ত সে চঞ্চল পারফেক্ট ম্যাচ।
প্রহর ভ্রু কুঁচকে তাকালো।পাভেল ওর তাকানো দেখে বলল,
“আচ্ছা যা তোর সাথে মিলবে না।তোর বড় ভাই তার সাথে সুন্দর মানাবে একটু আগে দেখলাম।
কি কেয়ারিং এখন থেকে।
আসিফ হাঁসছে।প্রহরের ভেতর পুড়ছে।বাহির থেকে যত যাই বলুক মন তো জানে,সে ছাড়া তার পাশে অন্য কাউকে মেনে নেওয়া কতটা কষ্টের।

সায়েদা বানু নিজ ঘরে বসে আছেন।চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। ঘরের জানালা খোলা। দূরে দেখা যাচ্ছে কবরের এলিন। মায়ের আগে মেয়ে হারানো ব্যথা একজন মা’ই বুঝে। মা তো জীবন দিয়ে চেষ্টা করে সন্তান কে পৃথিবীতে সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে।সেখানে মেয়ে বুক খালি করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছিলো বিশ বছর আগে।ভালোবাসার প্রতিদান বুঝি এমনই হয়?যার কারণে এই পরিনতি?আজ আফসোস হয় কেন মেয়েকে না জেনেশুনে অন্যের কথায় বিয়ে দিয়েছিলো।কেন সেদিন চোখে চোখে রাখলো না।তাহলে তো মেয়েকে হারাতে হতো না।
“আম্মা আছো?
সায়েদা বানু জানালা থেকে চোখ ফেরালো। সুচরিতা বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে।শাশুড়ির চোখ জল দেখে কারণটা বুঝতে পারলো। তিনি ধীর পায়ে ঘরে আসলো। বলল,
“আম্মা আপনাকে আপনার ছেলে ডাকছে।
প্রহর ও তো খুঁজছে। ওর সাথে কিন্তু কাঁদবেন না।ছেলেটা এমনিতে মন খারাপ,ভেঙে পড়েছে তবুও নিজেকে শক্ত রেখেছে।
সায়েদা বানু বিছানা থেকে নামলো। চোখের জল মুছে নিলো। সন্তুষ্টিতে বড় বউয়ের দিয়ে তাকিয়ে বলল,

“তুমি আমার সংসারের আলো।সমস্ত আঁধার তোমার হাত ধরে চলে গেলো।এখন শুধু পিয়াসের জন্য একটা আনতে হবে। তার পর প্রহরের জীবনেও তোমার মতো আঁধার সরিয়ে ওর জীবনে আলো এনে দিবে এমন একটা মেয়ে খুঁজতে হবে।
সুচরিতা বেগম শাশুড়ীর কথায় হাঁসলো। সেও কৃতজ্ঞ নিম্ন ঘরের এক মেয়েকে এখানে এনেছিলেন। তাদের ভালোবাসা না দিয়ে কাকে দিবে?স্বামী,সংসার, সন্তান সবই তা নিজেরই তাকেই তো সামলাতে হবে।
অরুনা ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলো। শাশুড়ির সাথে সুচরিতা বেগম আসছে। তার চোখ মুখের আদল পরিবর্তন হলো। সে সুচরিতা বেগম কে একটু হিংসা করেন। মেরিনা সেদিকে পাত্তা দেয় না। সে শাশুড়ী কে দেখে বলল,
“আম্মা আপনার শাড়ির আঁচল ওঠিয়ে নেন।
সায়েদা বানু আচল ওঠালো। ছোট বউয়ের শুষ্ক মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“মন খারাপ করিও না।আল্লাহ পরীক্ষা নিচ্ছে হয়তো। মানুষের কথায় আমরা কান দেইনা,আমার ছেলেও দেয় না সেখানে তুমি কেন দেও?কেন কষ্ট পাও?
মেরিনার চোখ টলমল করছে। এখনি কেঁদে দিবে এমন ভাব। সে চোখের জল লুকিয়ে হেসে উঠলো।
“ঠিক আছে আম্মা।
তিনি চলে গেলেন। মেরিনা দাঁড়িয়ে রইলো। আসলেই কি আছে? মানুষের কথা কানে নিতে হয়না কানে এমনিতেই আসে। এই সমাজে সন্তান না হওয়া যেন অভিশাপ স্বরুপ।সন্তান কেন হয়না, কি জন্য হয়না এসব খবর তারা জানেনা।
ডাক্তার দেখিয়েও ফল হয়নি। কম চেষ্টা তো তারা করেনি।
“মানুষ শুধু কথার আঘাত দিতে জানে,
কেউ ব্যথা উপসম করার মলম দিতে পারে না।
আযান শেষে মিলাদ শুরু হয়েছে। মিথি গোসল সেরে নতুন কাপড় পরেছে। এখন ও বাড়িতে অনেক মানুষ বিধায় শার্লিন রিদিতা ও রিতি মিথির ঘরে বসে আছে।শার্লিন গল্পের মাঝে বলল,

“ওই ছেলেটার সামনে পড়েছিলাম। দেখেই বলে বদমাইস মেয়ে দাঁড়াও প্রহর কে বলে দিবো।কত বড় শয়তান দেখছো?যদিও প্রহর ভাই কে বললে সমস্যা নেই। আরেকটা ছেলে আছে না?ওটা কিন্তু ভদ্র দেখে মনে হয়।
বাহিরে শোরগোল বেশি হলো। মিথির চোখ পড়লো দূরে পুকুর পাড়ের পাশে।শুভ্র পাঞ্জাবি গায়ে প্রহর দাঁড়িয়ে। ওখানটায় উনার মায়ের কবর দেওয়া আছে।মিথির ঘরের জানালা দিয়ে পুকুর পাড়ের কিছুটা দেখা যায়।পুকুর পাড়ের পাশে অনেকটা জায়গা আছে যেখানে দেওয়ান বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান। মিথি দূর থেকে প্রহরের চেহারা দেখতে না পেলেও বুঝতে পারলো তার অবস্থা। মা হারানোর ব্যথা না বুঝলেও এক মূহুর্তের জন্য যখন ভাবে মা ছাড়া পৃথিবী তখনই বুক কেঁপে ওঠে।মনে হয় কাঁটাযুক্ত পথে দাঁড়িয়ে আছি। আর সে তো মা বাবা দুটোই হারা। ছোট থেকে মানুষ হয়েছে পায়নি কারো ভালোবাসা।পৃথিবীতে মা বাবা ছাড়া সবার ভালোবাসা তুচ্ছ মনে হবে। যার বাবা মা নেই তার পুরো পৃথিবীর পথ অস্ত্রের উপর দিয়ে হাঁটার ন্যায়।

তার বন্ধু দুটো প্রহর কে দুপাশ দিয়ে জড়িয়ে নিলো। কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিয়ে নিয়ে আসছে। প্রহর হাত দিয়ে চোখের জল মুছছে। এতটুকু এদিকে আসার কারণে দেখতে পাচ্ছে। মিথির মন খারাপ হলো।কেন প্রহর ভাইয়ের জীবন এমন হলো?জীবনে কেউ একজন থাকলেও পারতো। নাই বাবা-মা,আরেকদিকে প্রিয়জন হারানোর ব্যথা।মনে মনে সে এবার ভেবে নিলো।প্রহর ভাই না বলুক তার বন্ধুদের একবার জিজ্ঞেস করে দেখবো?যদি কিছু জানা যায়।
“মিথি আয় রে সবাই কে ডাকছে।
“উ হুমম।
মিথি ভাবনার ছেদ ঘটলো। জানলার দিকে কেউ নেই।শার্লিন তাকে ডাকছে দরজার কাছ থেকে।
ভাবনার কতটুকু সময় মসগুল ছিলো সে নিজেও জানেনা। কেন যেন আজকাল প্রহর ভাই কে নিয়ে বেশি ভাবি। হুটহাট মনে পড়ে।তার দুঃখের জন্য কেন আমিই উতলা হই?কই আগে হয়নি এমন।
“কি রে আসবি নাকি?
“হুম আসছি।

মোহনিয়া বেগম ঘরে আসলো। ওড়নায় কি যেন ভরেছে বিধায় মিথির নতুন একটা ওড়না নিলো।
মিথি বাড়ি থেকে বাহির হলো। মানিক সাহেব মিলাদ শেষ করে পাঞ্জাবি খুলে রাখতে ঘরে আসছিলো। মিথিকে দেখে পাঞ্জাবি টা তার হাতে দিলো। বলল,
“এটা নিয়ে যা তো মা।খেতে দিতে গেলে তরকারির ঝোল ভরলে সাদা পাঞ্জাবি শেষ।
মানিক সাহেব সেন্ডো গেঞ্জি গায়ে চলে গেলো। মিথি দৌঁড়ে ঘরে এসে পাঞ্জাবি রেখে আবার ছুৃঁটলো।তার দৌঁড় থামলো গিয়ে ওই বাড়ির সামনে। মিলাদের মানুষ গুলোকে খেতে দিচ্ছে বাহিরে সারি করে কার্পেট বিছিয়ে দিয়ে। সবাই ব্যস্ত খেতে দিতে। মিথি অলিন্দ নীড়ের গেইট পেরোতে গিয়ে কারো কাঁধের সঙ্গে ধাক্কা খেলো। পড়ে যেতে চাইলো পড়লো না। তবে সামনের মানুষটার দিকে তাকাতেই মুখ ছোট হয়ে এলো।জিভ কাঁটলো।
সামনে প্রহর দাঁড়িয়ে। তারই সাথে ধাক্কা লেগেছে এবং হাত হাতে থাকা জগের পানি গুলো তার পুরো শরীর ভিজিয়ে দিয়েছে। বুকের সামনে পাঞ্জাবির পুরো অংশ ভিজেছে।প্রহরের মন খারাপ বিধায় চোখ মুখ বিষন্ন ছিলো। মিথি জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলল,

“দুঃখিত প্রহর ভাই।আমি আপনাকে দেখিনি।
প্রহর কিছু বললো না। তার দেরি হচ্ছে পাশ থেকে আসিফ আসলো তার হাতে জগটা দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।মিথি দাঁড়ালো একপাশে।তারও মন খারাপ হলো।নিজেকে গাঁধি উপাধি দিলো। চোখে দেখতে পাসনা?
আসিফ মিথির দিকে নজর দিলো।সে আনমনে কিছু ভাবছে। আশে পাশে তাকালো তার পর মিথির উদ্দেশ্য বলল,
“তোমাকে একটা প্রশ্ন করবো?
মিথি চোখ তুলে তাকালো।তারই দিকে চেয়ে আমি ডার মানে তাকেই বলছে। সে মাথা নাড়ালো।অনুমতি পেয়ে আসিফ বলতে নিলো।

“মিথি এখানে কি করছিস?বাড়ির ভেতরে যা।
আসিফ পিছনে তাকালো পিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। সন্দেহ ভাজন দৃষ্টি তারই দিকে। মিথি মাথা নিচু করে দৌঁড় দিলো। পিয়াস আসিফের দিকে তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেলো নিজের কাজে।
সে চলে যাওয়া দেখে ধীর কন্ঠে বলল,

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১১+১২

“এই কি ভিলেন?নাকি নায়ক?কোনটা?নাকি ব্যর্থ প্রেমিক? আল্লাহ জানে কে কোনটা হবে।একজন তো ব্যর্থ প্রেমিকের স্বকৃীতি নিয়ে বসে আছে। তবে আমরা তো তা হতে দিতে আসিনি। যে প্ল্যান নিয়ে এসেছি তা সাকসেসফুল করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।হোক না কারো একটু মন্দ।
বিশাল ভালোর মধ্যে একটু দুঃখ থাকলে কিছু যায় আসবে না। কিন্তু যার দুঃখের সাগরে বাস,তার ও তো একটু সুখ সাগরের দেখা পাওয়ার হক আছে।
সে না হয় সেটুকু পাক।আল্লাহ তার দিকেও একটু চেয়ে দেখুক।দুঃখের সাথে কিঞ্চিৎ সুখ ও ঢেলে দিক।”

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৫