মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৭+১৮
শ্যামলী রহমান
সবুজ ধানক্ষেতের আইল মাড়িয়ে চলছে কিছুজন। পায়ের তলায় পিষে যাচ্ছে সবুজ ঘাস।প্রকৃতি আজকাল রঙীন রুপে থাকে।চারদিক কেমন চিকচিক করে নতুনের মতো লাগে।মাঠে কিছু ছেলে মাছ ধরছে।জমিতে ছোট মাছ হয়েছে।পানি সেঁচে সেই মাছ ধরছে তারা।একজন পিয়াস কে দেখেই হাক ছেড়ে বলল,
“পিয়াস ভাই তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো।ওই পাড়ার মেম্বারের বেটা খুব জ্বালায় মিলি রে।ওরে কিছু কইয়ো তো। বাপে মেম্বার এক নাম্বার খারাপ লোক।নিজে খারাপ সাথে ছোট ছেলে গুলোকেও নেশায় ডুবিয়ে জীবন ধ্বংস করছে। যার বাড়িতে নেশার রমরমা ব্যবসা সে আবার কেমন জনগণের করবে সেবা?তা অজানা নয়। কিন্তু দোষ তো আমাগোর। টাকার লোভে ভোট দিই আবার পরে নিজেরাই পস্তাই।
ততক্ষণে ওরা ছেলেগুলোর কাছাকাছি গিয়েছে।
ছেলেটা বেশ বড় প্রহরের বয়সী হবে। সে চিনে তাদের গ্রামেরই।প্রহর তার কথার উত্তর দিলো,
“বাঙালি লোভ ও করে,আফসোস ও করে।
যোগ্য মানুষ রেখে একজন ইসমাগলার কে নির্বাচনে জয়ী করে।এখন বোঝো কেমন মজা।
সময় থাকলে মূল্য দিতে হয়,নয়তো পস্তাতে হয়।
ছেলেটা নিশ্চুপ রইলো।প্রহরের কথা ভুল নয়।
আমরা বাঙালি টাকা দিলেই গলে যাই,বাঁশ দিলেও ভুলে যাই পরে কি হবে তার পরিনতি।পিয়াস যেতে যেতে বলল,
“ঠিক আছে আমি ওকে সাবধান করে দিবো। তার পর ও মিলি কে বিরক্ত করলে সোঁজা এসে বিচার দিবি দাদুর কাছে বাকিটা দেখা যাবে।
ছেলেটা মাথা বাড়ালো। মেম্বার হলেও দেওয়ান বাড়ির মানুষদের থেকে উচ্চবিত্ত নয় বিধায় তাদের ভয় পায় অনেকটা।তাছাড়া ধনসম্পদ,টাকা-পয়সা যাদের থাকে,তাদেরই মানুষ মানে এবং ভয় পায়।
আইল পথে হাঁটতে গিয়ে হুট করে শার্লিন পড়ে গেলো।এক পা কাঁদায় পড়ে কি এক অবস্থা হলো।রিদিতা আর মিথি ওকে টেনে তুললো। আসিফ তার পড়ে যাওয়া দেখে তখন থেকে হেঁসে চলেছে।
মুখ চেপে হাসলেও শার্লিনের দৃষ্টি এড়ালো না। ও ওঠে দাঁড়ালো রাগে ফুসলো তবে প্রহর আর পিয়াস থাকতে কিছু বলতে পারলো না। জমির পানিতে পা ধুয়ে পুকুরের দিকে গেলো।
পুকুরের ঘাটে নৌকা বাঁধা।আশে পাশে মাঝি নেই। পিয়াস খুঁজলো কিন্তু পেলো না।
“হারুন চাচা মনে হয় বাড়ি গেছে। কিছু বলবে না তোরা সব চড় আগে।
পিয়াস বৈঠা নিয়ে আগে উঠলো। পাভেল আসিফ ও উঠলো।পর পর শার্লিন রিতি,রিদিতা উঠলো। রয়ে গেলো মিথি।প্রহর সবে পা দিয়েছে তখনই হুট করে নৌকা কিছু নড়ে উঠলো। সরে গেলো খানিকটা।টলে পড়ে যেতে মিথি ভয়ে হাত খানা চেপে ধরে। প্রহর পড়লো না। হাতের শক্ত বাঁধনে আঁটকা পড়লো হাত,দমে গেলো পড়া থেকে।
“দাঁড়া নৌকা কাছে ভিড়ায় নয়তো পড়ে যাবি।
পিয়াস আরেকটু কাছে আনলো।মিথির হাত এখনো প্রহরের হাতে। সকলের খেয়াল সেদিকে না থাকলেও কেউ খেয়াল করে হেঁসে ফেললো।
মিথির হাত ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে। নৌকায় উঠার জন্য মিথি পা বাড়ালো। নৌকা কাছে ভিড়লেও পিয়াস এগিয়ে এসে মিথিকে হাতে ধরে উঠিয়ে নিলো।প্রহর সেই হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো।
চোখ সরলো না যতক্ষণ পর্যন্ত না পিয়াস মিথির হাত ছাড়লো।
পিয়াস বৈঠা হাতে নৌকা চালাচ্ছে। বাকিরা সারি হয়ে বসে পড়েছে। মিথির পুকুরের পানিতে হাত বুলাচ্ছে।পুকুরটা বেশ বড় এবং অনেক মাছ ও আছে। ওইপাশে শাপলা ফুল ফুটে আছে সেগুলো তোলার জন্য মিথি আর শার্লিন ওতপেতে আছে। কে বেশি তুলতে পারে এই প্রতিযোগিতাও চলবে।
“প্রহর একটা গান ধরতো। কতদিন তোর গান শুনিনা,কবিতাও পড়িনা বহুদিন। আগের মতোই লিখিস?নাকি শুধু পড়তে ব্যস্ত।
পিয়াসের প্রশ্নের প্রতিত্তোরে বলল,
“গান তুমি গাও। তোমার মনে এখন বসন্ত বইছে।
প্রেমের গান শোনাও।আমরা বৈরাগী মানুষ, শুধু বিরহের গান আসে।এমন প্রেমময় বসন্তে বিরহের গান শুনতে কি ভালো লাগে?
পিয়াস বৈঠা বাইতে বাইতে হেঁসে উঠলো কি ভেবে।
“বসন্ত কি শুধু প্রেম নিয়ে আসে?
প্রেম বিরহ সবই চলে এই রঙিন বসন্তে।
“প্রহর শুরু কর নে।আমি ফোনে গানের টিউন চালাচ্ছি। কোন গান গাইবি?
প্রহর আর না করলো না। আসিফ কে ধীর কন্ঠে গানের নাম বললো। নিস্তব্ধ পুকুরের জলের শব্দের সঙ্গে মিলিত হলো গানের সুর। এক ঝলক সামনের মানুষটার দিকে তাকিয়ে চোখ রাখলো দূর পাড়ে। তার পরই প্রহর গাইতে শুরু করলো,
–দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা,
দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা।
পথিক কয়, ভেবো না রে ডুবে যাও রূপসাগরে
পথিক কয়, ভেবো না রে ডুবে যাও রূপসাগরে
বিরহে বসে করো যোগ-সাধনা”
একবার ধরতে পেলে মনের মানুষ ছেড়ে যেতে আর দিও না….ধরতে পেলে মনের মানুষ ছেড়ে যেতে আর দিও না।
দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা
দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা…..
পুরো গান শেষ হতেই সকলে হাত তালি দিলো। সকলের প্রশংসায় প্রহর তীর্যক হাঁসলো। এ গানের মর্ম কি আর সবাই বুঝলো?সবার কাছে শুধু এটা গান।আমার কাছে মনের ভেতরে থাকা তীব্র অনুভূতির টান।
মনে মনে ভেবেই নিলো রূপসাগরে ডুব দিয়ে যোগ-সাধনা করেও তাকে আর হবে না পাওয়া।
নৌকা শেষ প্রান্তে আসতেই মিথি, রিতি,শার্লিন শাপলা তুলতে লাগলো।রিদিতা একটু ভয় পায়। শুনেছে পুকুরে সাপ থাকে, অনেক সময় শাপলা পাতার আড়ালেও বসে থাকে।যেহেতু শহরে বড় হয়েছে তাই ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।
চারদিকে সাদা শাপলার মধ্যে একটা লাল শাপলা ফুটে আছে। মিথি হাত বাড়াচ্ছে কিন্তু নাগালে পাচ্ছে না।
“মিথি পড়ে যাবি।
মিথি হাত সরালো।পেল না বলে মন খারাপ করলো। নৌকাও ভিড়বে না কারণ সেখানে কিছু বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঝোপের মতো তৈরি করা।
বিষন্ন মুখভার কারো সহ্য হলো না।
“পিয়াস ভাই নৌকাটা একটু বামে নিয়ে যাও।
নৌকা বামে যেতেই প্রহর হাত বাড়ালো।সেও শাপলার নাগাল পাচ্ছে না। আর অল্প হলেই পাবে কিন্তু অল্পটুক এগোলেই পড়ে যাবে এমন অবস্থা।
মিথি দেখেই বলল,
“থাক প্রহর ভাই লাগবে না। আপনি পড়ে যাবেন আবার।
প্রহর শুনলো না। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি আসলো। পা বাড়িয়ে শাপলার গাছটাকে টেনে আনলো। হাত দিয়ে ফুলটা ছিঁড়ে মিথির সামনে ধরলো।
তার ঠোঁটের কোনো হাঁসি লেপ্টে ধরলো।
ফুলটা নিয়েই প্রহর কে বলল,
“ধন্যবাদ প্রহর ভাই।
সেদিকে তার খেয়াল নেই সে তো দেখতে ব্যস্ত তার শুকতারার ঠোঁটের কোটি টাকার হাঁসি।এই সামান্যতে যে মেয়ে এতো খুশি হতে পারে,তাকে পেলে যেকোনো পুরুষ নিজেকে ভাগ্যবান বলে উপলব্ধি করবে।
“চলো নেমে পড়লো।
সকলে নামতে লাগলো।শার্লিন নামার সময় ইচ্ছে করে আসিফ কে ধাক্কা দিলো। আসিফ পানিতে না পড়লেও নৌকার মধ্যে হুড়মুড়িয়ে পড়লো।
“আওওও।
চোখ খিঁচে ব্যথা পেয়েছে তা প্রকাশ না করার চেষ্টা করলো।
পাভেল ওকে ধরে তুললো।
“পড়লি কি করে?
“ বদমাইস মেয়ের ধাক্কায়। কথাটা ধীরে বলল শুধু পাভেল শুনতে পেলো।শার্লিন মুখ চেপে হাঁসছে।
আসিফ রাগান্বিত চোখ তাকিয়ে আছে।
“এই আপা হাঁসছো কেন?
মিথির কথায় শার্লিন হাঁসি বন্ধ করলো।বলল,
“ভূতে ধরেছে। বলেই আবার দাঁত বাহির করে হাঁসছে। পিয়াস ওদিকে ডাকছে। মিথি সহ সকলে বাড়ির পথে গেলো।রিদিতা জোঁকে ভয় পায়।মাঠে ঘাসের মধ্য জোঁক থাকে সেজন্য নিচে দেখে দেখে হাঁটছে। মিথি পিয়াসের সামনে।সবার শেষে প্রহর।
কি দারুন না?আইলের প্রথম প্রান্তে আমার শুকতারা,
শেষ প্রান্তে আমি একমাত্র অভাগা।
মানিক সাহেব আজ কাজ থেকে তাড়াতাড়ি ফিরলো।এখনো সন্ধ্যা হয়নি।গুমোট ভাব আজ, অথচ কাল চৈত্রের কড়া রোদে পুড়িয়ে দিচ্ছিলো মাঠঘাট।রোদের তাপে মাঠে থাকাও মুসকিল হয়ে পড়ছিলো।তবুও জীবনের তাগিদে কৃষকদের কষ্ট করে মাঠে কাজ করতে হয়। কষ্টের মূল্য হিসাবে কি পায়? এবার আলু চাষে ব্যাপক ফলন হলো কিন্তু দাম পেলো মাত্র পাঁচ ছয় টাকা কেজি।অথচ সেই আলুই ব্যবসায়ীরা শহরে নিয়ে বিক্রি করে পঞ্চাশ,ষাট টাকা কেজি।কষ্টের মূল্য যদি হয় এই সামান্য তবে চাষ করে লাভ কি? সবকিছুর মূল্য আছে কেবল কৃষকের ফসলের মূল্য নেই।চাষ করে তারা লাভবান হয় পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকা ব্যবসায়ীরা।
মিথি ঘরে বসে নকশীকাঁথা সেলাই করছিলো। মোহনিয়া বেগম সেলাই করেন মাঝে মাঝে মিথিও সেলাই করে।সুতোর কাজ মিথি বেশ সুন্দর পারে।
আনমনে গুনগুন করে গান গাইছে আর সেলাই করছে।
“কে?কে?
মিথি প্রথমে চমকে উঠলো।হঠাৎ কে চোখ ধরলো?
ঠান্ডা হাতখানা তার চোখ ধরে আছে।কেবল স্বল্প হাঁসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। মোহনিয়া বেগম ও পাশ থেকে হাঁসছে তা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কিন্তু চোখ ধরেছে কে?হাতে সুঁই থাকাতে হাত দিয়ে দেখতেও পারছে না।
“কে চোখ ধরেছে আম্মা?
“তুই বল কে হতে পারে?
হাঁসির শব্দ এবার বেশি হলো। গিটগিট কটে হাঁসছে। চেনা হাঁসির শব্দে কানে আসতেই সুঁই রেখে হাত টেনে সরালো।
“তুই?
“হ্যাঁ আমি।আংকেল নিয়ে আসলো তুই নাকি আমার জন্য মন খারাপ করে ছিলি।
মিথি অনিমা কে জড়িয়ে ধরলো। ওকে বসিয়ে বলল,
“তোর মনে পড়েনি?
“হ্যাঁ পড়েছে বলেই তো আসলাম।স্কুল শেষ হয়ে কিছু ভালো লাগে না। আগে ভাবতাম কখন স্কুল শেষ করে বেরিয়ে যাবো।এখন ভাবি কেন স্কুল জীবন শেষ হলো। অনিমা মিথির হাত টেনে নিলো আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো মোহনিয়া বেগম নেই।
মিথি তার লুকোচুরি দৃষ্টি দেখে শুধালো,
“কি হয়েছে?কি দেখছিস?
“তোর নাকি পিয়াস ভাইয়ের সাথে বিয়ে?
মিথি চমকে উঠলো।বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইলো,
“কে বলেছে?
“আংকেল আসার সময় বললো। পিয়াস ভাই কে মিথির সাথে কেমন মানাবে?যখন জিজ্ঞেস করলাম কেন আংকেল মানালে কি হবে?
উত্তরে বলল তোর সাথে পিয়াস ভাইয়ের বিয়ের আলাপ করবে আজ।তুই কি জানিস না?তুই কি রাজি?
মিথি এ বিষয়ে কিছু জানেনা। কেউ তো তাকে কিছু বলেনি।
“না আমাকে আম্মা আব্বা কেউ কিছু বলেনি।
“ওহ। তাহলে মনে হয় সন্ধ্যায় বলবে। তুই কি বলবি?দেখ প্রহর ভাই। মিথি জানালা দিয়ে তাকালো।পাভেল আর প্রহর যাচ্ছে কোথাও। অনিমা বলছে,
“আমার কেন জানি প্রহর ভাই কে বেশি ভালো লাগে।পিয়াস ভাই ভালো মনের মানুষ কিন্তু প্রহর কে কেন জানি ভালো লাগে তা জানিনা।তোর সাথে প্রহর ভাই কে বেশ মানাতো।
মিথি অনিমার পানে চাইলো।কি বলছে এসব?কার সাথে মিলাচ্ছে?
“উনি অন্য কাউকে পছন্দ করেন।
“কি বলিস কাকে?
মিথি সবকিছু খুলে বলল যতটা জানে।
অনিমা সব শুনে ভাবছে।আসলে ব্যপারটা কেমন ঘাপলা লাগছে।মিথির ধারণা সঠিক নয় মনে হচ্ছে।
“মিথি.. মিথি?
রাবেয়ার ডাকে মিথি অনিমা দুজনে দরজার দিকে তাকালো।
“কি চাচি?
“রিতিকে দেখেছিস?
“না। আসেনি তো।দেখো হয়তো খেলছে কোথাও।
রাবেয়া চলে যেতে নিলো।
“চাচি রুহেল ভাই কোথাই?
“সে কোথাই ঘুরে বেড়ায় সেই জানে।
একটা কাজ বললে আরেকটা করে।
ওরে নিয়ে আর পারিনা।হেই আবার কয় বিয়ে করবে।ওরে কোন মাইয়া বিয়া করবে বলতো?
অনিমা হেঁসে ফেললো। মিথিও হেঁসে উত্তর দিলো,
“চাচি আম্মা রুহেল ভাই কে বলো যাকে পছন্দ তাকে নিয়ে আসবে।
“হ।ওরে কে পছন্দ করবে?যে পছন্দ করবে নিশ্চিত তার চোখে সমস্যা। ভালো মাইয়া ওরে পছন্দ করবো না।
রাবেয়া চলে গেলো। অনিমা আর মিথি জোরে জোরে হাঁসতে লাগলো।
“এমন মা থাকলে মান সম্মান শেষ করতে আর কাউকে লাগে না।
গরম পড়েছে।কারেন্ট যাচ্ছে মিনিটে মিনিটে। বিরক্তিতে নাচ কুঁচকালো মানুষ।গ্রামীণ পরিবেশ শীতল হলেও চৈত্র মাসে গরম বেশি পড়ে।দিনে শীতল বাতাস থাকলেও রাতে প্রকৃতি গুমোট ভাব নিলো।গাছের পাতা নড়ছে না পর্যন্ত।মিথি আর অনিমা রিতিদের বাড়ি গেছে।রুহেল তখন থেকে রিতির ঘরের সামনে ঘোরাঘুরি করছে মাঝে মধ্যে উঁকি মারছে ঘরে। অনিমা আর মিথি তার কান্ডে হাঁসছে আর মজা নিচ্ছে।রাবেয়া বারান্দা থেকে বলে উঠলো,
“গায়ে কি বিচুটি পাতা ধরেছে?ওমন এদিক ওদিক ছুটছিস কেন?
“না আম্মা বিচুটি পাতা ধরেনি কিন্তু মনের মাঝে ঝড় হওয়া বইছে।
রাবেয়া দূর থেকে কেমন করে দেখলো কিন্তু কিছু বললো না।
“মিথি?এই মিথি?ডাকতে ডাকতে মোহনিয়া বেগম এ বাড়ি আসলো। অনিমা রিতি আর মিথি ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো।
“কি হয়েছে আম্মা?পাশ থেকে শার্লিন এদিকে আয়। মিথি সুরসুর করে গেলো।মোহনিয়া বেগম কে অনুসরণ করে গেলো ওই বাড়িতে।পথে শার্লিন মুখভার রাশভারি কন্ঠে বলল,
“মিথি তুই কি পিয়াস ভাই কে পছন্দ করিস?
প্রথমে অনিমা এখন শার্লিন আপা পিয়াস ভাই কে নিয়ে জানতে চাচ্ছে। তবে কি সত্যি আব্বা এমন কিছু ভেবেছে?
“কেন আপা?এমন প্রশ্ন কেন?
“আহা আগে উত্তর দে।
শার্লিন বাড়তি কথা শুনতে চাইলো না। তার আকাঙ্ক্ষা তো মিথির উত্তরের উপর।
“পছন্দ বললে তো করি। তিনি সম্পর্কে ভাই হন পছন্দ থাকবে না?
“আমি সেই পছন্দের কথা বলিনি।
“তবে?ক….
“মিথি তাড়াতাড়ি আয়।
মোহনিয়া বেগমের ডাকে তাড়াতাড়ি করে গেইট পেরিয়ে গেলো। শার্লিনের প্রশ্নের উত্তর সে পেলো না।অনিমা হয়তো শার্লিনের কথার কিছুটা বুঝতে পেয়েছে। মিথি ওর মায়ের পিছুপিছু গেলো।খাবার টেবিলের ওখানে বৈঠক বসেছে যেন। বাড়ির সকলে সেখানে উপস্থিত। বাদ যায়নি মানিক সাহেব ও। মিথি বুঝতে না পারলেও অনিমার কথা মনে পড়তেই বুঝতে পারলো কারণটা।প্রহর দৃষ্টি মিথির চোখে মুখে।চোখ কিছু বলছে কিন্তু চোখের ভাষা সে বুঝতে পারছে না। পাভেল আসিফ কে বলছে,“কি হবে এবার?ওদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই নিশ্চিত মিথি রাজি হবে। হুট করে আজই বিয়ের বিষয়ে কথা হবে জানলে কালই বলে দিতাম।সুযোগের অপেক্ষা করতে গিয়ে সময় ফুরিয়ে ফেললাম। প্রহর বরাবরের মতোই নিশ্চুপ। মুখের ভঙ্গি দেখে বুঝার উপায় নেই মনে কি চলছে।
শমসের দেওয়ান মিথিকে তার পাশে বসতে বললো। মিথি ধীর পায়ে এসে বসলো। তার সোজাসুজি পিয়াস বসে তার পাশে প্রহর। সামনে তাকালে প্রহরের মাথা নিচু করে রাখা মানুষটার দেখা মিলছে।শার্লিন ও প্রহরের দিকে তাকিয়ে অস্থির হয়ে আছে।শমসের দেওয়ান মিথির দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে জানতে চাইলো,
“আমরা চাচ্ছি তোর আর পিয়াসের বিয়ে দিতে।সবাই রাজি। পিয়াসের সাথে বিয়ে নিয়ে বেশি মত মূলত সুচরিতার ছিলো অনেক আগেই এই নিয়ে কথা হয়ে আছে। সোলাইমান মানিক ওরাও দ্বিমত করেনি।ম্যাটিক পরীক্ষা শেষ হয়ে বিয়ে হবে এমন বলা রাখাছিলো।তোকে জানানো হয়নি এ বাড়ি আসতে যেন দ্বিধাবোধ না হয় তাই। এখন তোর মতামত শুনতে চাই।সবাই তোর মতের অপেক্ষায় আছে।হ্যাঁ বললে তবেই এগুবো আর না বললে থেমে যাবে। এখন সিদ্ধান্ত তোর।
মিথি বিস্ময় নিয়ে বসে আছে। আশে পাশে সব পরিচিত মুখ চাতক পাখির ন্যায় তার উত্তরের আশায় আছে। কারো মুখ ভার আবার কারো উচ্ছাস।প্রহরের দৃষ্টি মেঝেতে। সামনে তাকানোর সাহস হচ্ছে না। পিয়াস মিথির মুখপানে তাকিয়ে আছে। মানিক সাহেব মেয়ের উত্তরের আশায় চেয়ে আছে। মোহনিয়া বেগম পাশ থেকে ভরসা দিয়ে বলতে বলছে।মিথি তার বাবার আকুলতা বুঝতে পারলো।এ্যাঁ বুঝলো তারা খুশি এই সম্পর্কে। সবার দৃষ্টি আর জানার আগ্রহ শেষ হলো। মিথির উত্তর এলো।
“সবাই যখন রাজি আমার কোনো সমস্যা নেই।
মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৬
এই এক কথায় প্রায় সকলে খুশি হলো। আনন্দে হেঁসে উঠলো অনেকে।মুখভার কিছুজনের। মিথির উত্তর শুনার সঙ্গে সঙ্গে প্রহর চোখ তুলে তাকিয়েছিলো।তার চোখে উচ্ছাস না থাকলেও বিষাদ ও ছিলো না। আশে পাশের মানুষগুলো এই আনন্দ দেখে প্রহরের আর সহ্য হলো। সে উঠে পড়লো। কাজের বাহানা দিয়ে ঘরে চলে গেলো। পিছু পিছু গেলো পাভেল আর আসিফ।শার্লিন ওদের যাওয়ার দিকে একবার তাকালো আরেকবার মিথির দিকে।কি হবে শেষে?কেউ আনন্দে মেতে উঠবে,কারো হৃদয় ভাঙবে,কেউ অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও হাঁসবে।
