Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ১৬

মহামায়া পর্ব ১৬

মহামায়া পর্ব ১৬
তুশকন্যা

‘সে এসেছিল আমার জীবনে এক অবিনাশী ঝড় হয়ে। প্রলয়-ঘূর্ণির মতো নির্মম অথচ মোহনীয় ছিল তার আগমন। যেমন হঠাৎ করে নেমে আসে শ্রাবণের ঘন কালো মেঘ…আর এক মুহূর্তেই নিমজ্জিত করে সমগ্র পৃথিবীকে এক অনির্বচনীয় আলো-অন্ধকারে—ঠিক তেমন!

তার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আমার নির্জন জীবনের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় জেগে উঠেছিল অজানা এক উৎকন্ঠা। যার উৎস খুঁজে পাইনি আমি কখনো। মনে হয়েছিল যেন কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি, অবচেতনে আমায় গ্রাস করছে। মায়ার মেঘে, আকাঙ্ক্ষার জ্বরে কিংবা অদৃশ্য প্রেমের কোনো নিঃশব্দ শপথে—সে আমায় দুর্বার স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে চলছে। অথচ আশ্চর্য হলেও এটাই সত্য যে—আমি একবারও এই মহাপ্রলয় হতে বাঁচার চেষ্টা করছি না।
সে যে কেবল এক মানুষ ছিল, তা নয়! সে ছিল এক মহামায়া। যার মায়ার বলে আমি হারিয়েছি অতল গহীনে। যে আমার প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি নিদ্রাতেও অধিকার বিস্তার করেছে নিঃশব্দে, অনিবার্যভাবে!
তারপর একদিন—যেভাবে হঠাৎ তার আবির্ভাব হয়েছিল, সেভাবেই এক অদৃশ্য স্রোতে সে বিলীন হয়ে গেল। তার সেই শূন্যতা আজও অনুরণিত হয়ে ফিরে আসে আমার প্রতিটি রাতের নিস্তব্ধতায়।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সে চলে গেল, অথচ চলে গিয়ে যেন আরও বেশি রয়ে গেল। তার অনুপস্থিতি হয়ে উঠল আমার জীবনের স্থায়ী উপস্থিতি। তার স্মৃতি এক অনিবার্য যন্ত্রণার মতো আমাকে দগ্ধ করে। যার দংশনে আমি প্রতিদিন নতুন করে জন্মাই, আবার প্রতিদিন একটু করে মরে যাই। আমার অন্তরের গহীনে সে রেখে গেছে এক অমোচনীয় চিহ্ন। এক অগ্নিলিপি, যার কোনো ভাষা নেই,আছে কেবল অনন্ত দহন।যা আমায় ছারখার করছে প্রতিনিয়ত।
আজও হঠাৎ কোনো গন্ধে, কোনো বাসাতে কিংবা কোনো অজানা সুরে আমি টের পাই—সে যেন আমার খুব কাছেই আছে। সময়ের পর্দার আড়াল হতে কেউ যেন আমার কানে ফিসফিসিয়ে বলছে,‘মুক্তি মিলবে না তোর। তুই কাঁদবি, তারা! তুই এই আমিটার জন্যই কাঁদবি!’

তখনই আমার সমগ্র সত্তা কেঁপে ওঠে এক অদ্ভুত সঞ্জীবন-বিদ্যুতে। আমি কেঁদে ফেলি—অকারণে,অসহায়ভাবে।আমার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি জানি না, আবার কখনো তার দেখা পাবো কিনা! আজ হতে ঠিক একবছর আগে এই অগাস্টের অসময়ের হঠাৎ বৃষ্টিতে যেভাবে তার সান্নিধ্যে হারিয়েছিলাম—আবারও সেভাবে হারাবো কিনা,আমি তা জানি না। অথচ অজান্তেই আমি প্রতিক্ষণ তার প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় জেগে থাকি।
আমার প্রার্থনা, আমার নিঃশ্বাস, এমনকি আমার একাকিত্ব—সবই এখন তার নামে উৎসর্গীকৃত। যেন সে চলে গিয়ে আমার ভেতরেই আশ্রয় নিয়েছে—আমার হৃদয়ের গহিনতম কুঠুরিতে।

সে যা লণ্ডভণ্ড করে গিয়েছে, তা আমি আর কোনোদিন গুছিয়ে নিতে পারিনি। বরং সে ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই আমি নিজের এক নতুন অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি। ধ্বংসাত্মক কিন্তু আশ্চর্যভাবে জীবন্ত আমি। তার অনুপস্থিতির অন্ধকারেই আমি আবিষ্কার করেছি আলো কাকে বলে। তার নীরবতার মাঝেই শুনেছি চিরন্তন ভালোবাসার আত্নচিৎকার।
সে হারিয়ে গিয়েছে…হ্যাঁ! কিন্তু আমার ধ্যান, আমার জ্ঞান, আমার প্রতিটি অস্তিত্বের পরমাণু আজও তার রাজত্বের অধীন। আমি কেবল তারই বন্দি, তারই সৃষ্টি, তারই ধ্বংস। আর এই দাসত্বেই যেন আমি চূড়ান্ত মুক্তি খুঁজে পাই।এক মায়াবী, অনন্ত, অবিনাশী মুক্তি!’
09/08/2025
—আনায়া এহসান

আনায়ার লেখা সম্পন্ন হলো। এক-একটি শব্দ সাজিয়ে সে আজ নিজ ডায়েরির শেষ পাতার কাছে পৌঁছে গিয়েছে। অথচ তার মন-মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাওয়া সেই ঝঞ্ঝার ন্যায় মানবকে নিয়ে ভাবা—নানান জল্পনা-কল্পনার ইতি ঘটেনি। আর আদৌও তা কখনো ঘটবে কিনা,সেটাও যে অজানা।
আনায়া ডায়েরিটা বন্ধ করে,বুকে আঁকড়ে ধরে। বাস চলছে তার নিজস্ব গতিতে। একইসাথে শুরু হয়েছে এই আগষ্টের অসময়ের হঠাৎ বৃষ্টি। হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সাথে খানিক দমকা হাওয়া। আনায়া জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে,বিষয়টা বেশ উপভোগ করতে লাগল। বৃষ্টি তার বরাবরই প্রিয়।কিন্তু প্রিয় বৃষ্টি যখন বিধ্বংসী ঝড়ে রূপ নিয়ে, জীবনকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়, তখনই তো তার মনটা বিষিয়ে যায়।
এই যেমন নানান সব ভাবনাচিন্তা করতে করতেই আনায়ার মনটাও বিষিয়ে উঠল। আনায়া ভারী শ্বাস ফেলল। যথেষ্ট হয়েছে। ঐ বেদ্দপ রেডকে নিয়ে আর কিচ্ছু ভাবতে চায়না। বদমাশ লোকটার জন্য, এখন সে আর শান্তিতে প্রিয় কার্টুনটাও দেখতে পারেনা। সবজায়গায় এসে তার মাথাটাকে গুলিয়ে দেয়। সবসময় তাকে কাঁদাতে চায়। আগে তাও মাঝেমধ্যে নিজে এসে দেখা দিতো। অথচ সময়ের সাথে সাথে সে-ও আজ প্রায় বেশ কয়েকমাস হলো তার কল্পনাতেও আসে না। অথচ আনায়া এই নিয়েও যেন তার উপরই বিরক্ত।

বাস ভর্তি মানুষজন। আনায়ার পরনে সাদা-নীল রঙের লন শার্ট-প্লাজো। মাথায় ওড়না পেঁচানো,চুলগুলো আলগা খোঁপা করে বাঁধা। চোখে সাদা ফ্রেমের চশমা। তার পাশে একজন বৃদ্ধা মহিলা বসে আছে। সাদা-শাড়ি, চোখে চিকন ফ্রেমের সোনালী চমশা। ভাবগম্ভীর্যও বেশ দৃঢ়। চোখদুটো বুঁজে চুপচাপ নিজের স্থানে বসে রয়েছে। আগ বাড়িয়ে কথাবার্তা বলা যায়—এমন ব্যক্তি যে ইনি নয়,তা আনায়া বুঝে গিয়েছে। তাই সে-ও বাধ্য হয়েই চুপচাপ আছে। এমনিতে বেশি কথাবার্তা বলতেও তার তেমন ভালো লাগে না। দিনের বেশিরভাগ সময় তার একাকী বিষন্নরূপেই কেটে যায়।

তবে আজ বেশ কয়েকমাস পর আবারও বাড়ি ছেড়ে দূর গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। আজ থেকে ঠিক একটা বছর আগে এই চট্টগ্রামে আসা হয়েছিল তার। অতঃপর সেই অপ্রত্যাশিত ঝড়! সবকিছু লণ্ডভণ্ড করলেও,আনায়াকেও যেন বেশ পরিবর্তন করে দিয়েছে। আনায়া এখন প্রতিমাসেই সময়-সুযোগ পেয়ে বাড়ি হতে বেরিয়ে পড়ে।
বুয়েটে পড়ার ইচ্ছে ছিল,কিন্তু তা আর সেই ঘটনার সূত্রে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বাবাও আর শুরুতে তাকে পড়ানোর জন্য রাজি হয়নি। অবশ্য মা তার বাবাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মানিয়ে নিয়েছে। অবশেষে গিয়ে বাবার ইচ্ছে অনুযায়ীই একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এটা সম্ভব হওয়ার পেছনে অবশ্য সাবারও অনেক অবদান রয়েছে। তারেক সাবার বাবা সামিউল খানের সাথে নানান পরামর্শ করেই দুজনকে ঐ একই ভার্সিটিতে ভর্তি করায়। যদিও দুজনের ডিপার্টমেন্ট সম্পূর্ণই আলাদা।

এবার তার জীবনে একটা নতুন মোড় আসতে চলেছে। সাবার শুরু থেকেই ইচ্ছে ছিল বাহিরে দেশে যাওয়ার। আনায়ার অবশ্য এসব নিয়ে তেমন কোনো ইচ্ছে ছিলো না। কিন্তু বাড়িতে সবার তিক্ত-গম্ভীর মুখখানা দেখতে দেখতে সে-ও এখন ভীষণ ক্লান্ত। যেন তখন বিয়েটা না করে সে কতোবড় অন্যায়টা করে ফেলেছে।
সে যাই হোক,সাবার ইচ্ছে অনুযায়ী তার বাবা সামিউর খান তাকে ইউরোপ পাঠানোর ভাবনাচিন্তা করছিল।এদিকে তারেকের সাথে সামিউয়ের সখ্যতা বেশ পুরোনো। কিভাবে যেন সামিউর এই বিষয়টা তারেকের মাথাতেও ঢুকিয়ে দেয়। অতঃপর আকস্মিকভাবে তারেক এতে রাজিও হয়ে যায়।

কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়াই সে হঠাৎ আনায়াকে এই প্রস্তাব দেয়। আনায়া শুরুতে ভাবছিল কি করবে না করবে,কিন্তু পরবর্তীতে নানান ভাবনাচিন্তার পর সেও ঠিক করে এবার পড়াশোনার জন্য হলেও দেশ ছাড়বে। আর যেহেতু ইউরোপের দেশগুলোতে ব্যাচেলর ডিগ্রির জন্য পড়তে গেলে,অবশ্যই আগে এইচএসসির পর আরো একটা বছর দেশেই কোনো একটা ভার্সিটিতে পড়া আবশ্যক—তাই তারা দুজন সেই অনুযায়ী ভাষা হতে নানান কোর্স,স্কোর সবটাই আয়ত্ত করেছে। আপাতত আর কিছুদিন পরই, দু’জনে এই দেশ ছেড়ে বহু দূরে চলে যাবে।
এইসব নিয়ে সাবা অনেক বেশি আগ্রহী রইলেও,আনায়ার তেমন বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আপাতত দেশ ছাড়ার আগে শিখা ও সায়েমের সাথে একবার দেখা করতে হবে। আর এবার সে বাড়ি হতে বেরিয়েছে মূলত এই উদ্দেশ্যেই।

শিখা আর সায়েমের বিয়েটা হয়েছে কিছুমাস হলো। পারিবারিক ভাবে নয়। বরং দুজন বিয়েটা করেছিল পরিবারের দ্বিমতে। দুজনের পরিবারের কেউই রাজি ছিল না বিয়েতে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে, একবছর আগে আনায়ার জীবনের ঝড় তোলা সেই ঘটনার পরপরই। সায়েম যে শিখাকে পছন্দ করতো,এটা তখন কেউই জানতো না। তবে শিখার বাড়িতে তার বিয়ে নিয়ে চলা গুঞ্জনে, প্রায়শই সায়েমের মাঝে অদ্ভুত এক অস্থিরতা সৃষ্টি হতো। বলা নেই কওয়া নেই, এমনই একদিন সে এক অদ্ভুত সিন্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
দুদিন আগে এক চল্লিশ উর্ধ্ব লোকের সাথে শিখার বিয়ে ঠিক হয়। আর সে দুদিন পরই এই খবর পেয়ে, তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। কোনো রকম ভণিতা না করে, সোজাসাপ্টা কথায় প্রস্তাব দেয়—সে শিখাকে বিয়ে করবে। তবে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, শিখা প্রথমে বিষয়টিতে বিস্মিত হবার পাশাপাশি বেশ রাগও করে। তার কাছে সায়েমের সাথে সম্পর্কটা ছিল সম্পূর্ণ বন্ধুত্বের। অথচ সায়েম সেই সম্পর্কে মর্যাদা রাখেনি।
কিন্তু তাতে কি! সায়েমের উদ্ভট সব পাগলামিতে তার রাগ আর স্থায়ী হয়নি। সে কল্পনাও করেনি,সায়েম তার জন্য এতোটা পাগল ছিল। সে কখনো কিছু বুঝতেও পারেনি। সবশেষে শিখাকে মানিয়ে নেবার পর, শিখার বাড়িতেই ছোট্ট আয়োজনে দুজনের বিয়েটা সম্পন্ন হয়। তাদের গ্রুপের সবাই বিয়েতে আসে।

তবে সেই বিয়েতে সায়েমের বোন ব্যতীত তার পরিবারের তেমন কেউই আসেনি। তখনই শিখা বুঝে নিয়েছিল, ঘটনা ঠিক কি ঘটছে। আর ফলাফলস্বরূপ, বিয়ের পর তাদের দুজনের জায়গা আর সায়েমের নিজ বাড়িতে হয়নি।
যথারীতি দুজনে এডমিশনে চট্রগ্রাম ভার্সিটিতে কোনোমতে চান্স পেতেই, সেখানেই দুজন ভর্তি হয়ে যায়। এবং তখন হতে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামেই স্থায়ী হয়ে বসবাস করছে। সায়েম আর শিখা দুজনে টুকটাক টিউশনি করায়,সাথে ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নিয়ে দু’জনে একসাথেই থাকে। এভাবেই চলছে এই দুই টোনাটুনির জীবন-সংসারের গল্প।
তাদের বিয়েতে নাক ছিটকানো জন্য অবশ্য বন্ধু হিসেবে একজন ব্যক্তি বরাবরের মতোই উপস্থিত ছিল। সে হলো সাবা। বিয়েটা কেনো যেন সে মানতেই পারেনি। হতে পারে, এই বিয়েটা তার কাছে ছিল একদমই ছোটলোকি ব্যাপার-স্যাপার। সে যাক গে, আপাতত সায়েম আর শিখার আবদারে আনায়াকে কিছুদিনের জন্য রাঙ্গামাটির এক রিসোর্টে আসতে হচ্ছে।

শুধু সে নয়, একদিন আগে অবশ্য আলো আর রনকও নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গিয়েছে। সাবা তাল-বাহানা করছিল। তার আর আনায়ার একত্রে আসার কথা ছিল। অথচ শেষমুহুর্তে এসে বলল,সে আসবে না। ফলে আনায়াকে একদিন দেরি করে হলেও, সবার শেষে একাই আসতে হলো।
আনায়া এখানকার রাস্তাঘাট তেমন চেনে না। সায়েমের কথামতো ঢাকা হতে রাঙ্গামাটির বাসে উঠে পড়েছে। বিকেল বা সন্ধ্যা নাগাদ এই বাস শহরের যে স্টেশনে থামবে, যেখান থেকেই সায়েম তাকে নিতে আসবে। আপাতত আনায়ার জানার মধ্যে এইটুকুই জানে।
বিকেলের ঠিক শেষ প্রহরে হুট করে বাস থেমে গেল। মাঝপথে এমন অপ্রত্যাশিত বিরতিতে যাত্রীরা খানিক বিরক্ত হলেও, চালকের সহকারীর উচ্চস্বরের ঘোষণায় সবাই নড়েচড়ে বসল,

“পাঁচ মিনিটের ব্রেক, চা-সিগারেট যা লাগবে নিয়ে নিন!”
​আনায়া জানালা দিয়ে মাথা বের করে দেখল। বাসটি কোনো টার্মিনাল বা পরিচিত শহরের মাঝে থামেনি। রাস্তার দুপাশে ঘন জঙ্গল, সামনে পাহাড়ের শেষ ঢাল, আর নিচে গভীর খাদ। বাম দিকে একটি টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট চায়ের দোকান। আর তার পাশেই একটা নড়বড়ে সাইনবোর্ড।যা পড়ারও উপায় নেই। সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও হচ্ছে তবে তা খুবই সামান্য।
​আনায়ার মনে পড়ল সায়েমের কথা।—’বাস যেখানে থামবে,সেখানে এসে আমায় একটা ফোন দিবি’।
জায়গাটা অদ্ভুত নির্জন লাগলেও, সে কেন যেন ধরেই নিল এটাই সেই স্পট, যা শহরের ঠিক আগের কোনো মোড় হবে। কেননা রাঙ্গামাটির কোনো গ্রামীণ রিসোর্টেই যেতে হবে তাকে। তবুও আনায়া নিশ্চিত নয়। যার ফলে সে সায়েমকে একবার ফোন করার সিন্ধান্ত নিল।

কিন্তু ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল,তেমন নেটওয়ার্ক মিলছে না। বাসের ভেতরে আছে বিধায় সে ভাবল,একবার নিচে নেমে চেষ্টা করা যাক। দুই-একজন সহ অনেকেই তো সামছে। যথারীতি সে নিচে নামার জন্য প্রস্তুতি নিল। কি যেন ভেবে শুরুতে ডায়েরিটা সিটে রেখে যেতে চেয়েও, পাশে বসে থাকা নারীর কথা ভেবেই হয়তো সে ডায়েরিটা নিজের বুকে আগলে নিল। অতঃপর কেবল ফোন আর ডায়েরিটা নিয়েই নিচে নেমে পড়ে।
​তবে মাঝে একবার কন্ডাকটরকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল—”ভাইয়া, এটাই কি তবলছড়ি?”। অথচ সে জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করল না। যদি সায়েম নিতেই আসে, তবে এখানে নামতে কোনো সমস্যা তো নেই—এই ভেবে সে আর সময় নষ্ট না করে তাড়াহুড়ো করে বাস থেকে নেমে গেল।

বাস থেকে নামতেই পাহাড়ি এলাকার সেই শীতল বাতাস আর মৃদু বৃষ্টির পরশে, তার সমস্ত ক্লান্তি যেন দূর করে দিল। বাসের বদ্ধ পরিবেশে থাকা সবটা অস্বস্তি মুহূর্তেই দূর হলো। সে চায়ের ছোট্ট দোকানটা হতে কিছুটা সরে গিয়ে রাস্তার পাশে ঘন জঙ্গলের দিকে মুখ করে দাঁড়াল।
এই নতুন পরিবেশের স্নিগ্ধতা যেন তাকে মুহূর্তের জন্য সম্মোহিত করে ফেলল।
​আনায়া সহসাই দু’চোখ বুজে নেয়। উঁচু নিচু পাহাড়ের কোল থেকে নেমে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া তার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।সে গভীর করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যেন তার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত উদ্বেগ সেই বাতাসের সাথে মিশে গেল।

​ঠিক একই সময়েই, বাসের ইঞ্জিনটা গর্জে উঠল। আনায়া প্রথমে বিষয়টা খেয়াল করল না। সে এক মুহূর্ত চোখ বুজেই রইল।পাহাড়ি নীরবতা আর শীতলতাকে উপভোগ করতে গিয়ে যেন বাইরের সবকিছু ভুলে গিয়েছে।
​মুহূর্তের নীরবতা ভেঙে আবারও জোরালো হর্ন বাজল। আনায়া চমকে চোখ খুলে তাকায়। ততক্ষণে ড্রাইভার হেলপারের দিকে মাথা নেড়ে দরজা বন্ধ করার ইশারা করেছে। গেট বন্ধ হওয়ার শেষ শব্দটা তার কানে স্পষ্টভাবেই এলো। সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল, বিশাল আকারের বাসটি দ্রুতগতিতে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করেছে।
​আনায়া আতঙ্কিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, “আরে দাঁড়ান! এই, এই যে!”
কিন্তু সহসাই তার চিৎকার গতির সাথে বাড়তে থাকা বাসের গর্জনে চাপা পড়ে গেল। হেলপার সম্ভবত তাকে দেখলেও তাড়াহুড়োয় গুরুত্ব দিল না।এক সেকেন্ডের মধ্যে বাসটি বাঁক নিয়ে পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
​আনায়ার বুক ধক করে উঠল। এটাই কি সেই স্টেশন ছিল? তবে সে কি ভুল করল? তার ব্যাগটাও তো বাসের ভেতরেই। ওহ খোদা! এবার কি করবে সে?

​বিকেল গড়িয়ে চারিদিকে দ্রুত অন্ধকার নেমে আসছে। বাতাসের সোঁদা গন্ধ, আর ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সে দ্রুত ফোনটা অন করে।এবং এবার যেন আরেক দফায় হতভম্ব হলো।
ফোনের স্ক্রিনে স্পষ্ট করে লেখা “No Service.” সে দ্রুত কয়েক কদম এগিয়ে দোকানের দিকে যায়। টিনের দোকানে জীর্ণ চেহারার একজন বৃদ্ধ আলো-আঁধারিতে বসে আছেন।
​”চাচা, এটা কোন জায়গা? তবলছড়ি যেতে কত দূর?”
​আনায়া ভীত কন্ঠস্বর মৃদু কাঁপছে। অন্যদিকে বৃদ্ধ নির্লিপ্তভাবে বলল,
“এটা তবলছড়ি নয় মা। সে তো অনেক দূর যেতে হবে। আর শেষ বাস তো চলে গেল…”

​আনায়ার শরীর হিম হয়ে গেল। তার হাতে সময় নেই। আশেপাশে কোনো মানুষজন নেই। তার সায়েমের সাথে যোগাযোগ করারও কোনো উপায় নেই। সে সম্পূর্ণ একা, ভুল জায়গায়, দ্রুত নেমে আসা অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। তার বুক কাঁপতে শুরু করল সহসাই।
কী করবে ভেবে না পেয়ে সে অস্থিরভাবে চায়ের দোকানের আশপাশেই পায়চারি করতে লাগল। পাহাড়ি পরিবেশের নির্জনতা তার ভয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
​একটু পরে, চায়ের দোকানে কয়েকজন স্থানীয় ছেলেপেলের দেখা মিলল। তারা আনায়ার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে, তাদের চাহনিতে কৌতূহল মেশানো সন্দেহ। দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসা এই অচেনা জায়গায় সে কাকে বিশ্বাস করবে? এই ছেলেগুলোর চাহুনিও তো ভালো ঠেকছে না।

​আনায়া কোনোমতে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করল। ফোনটা আবারও অন করে নেটওয়ার্ক খোঁজার ভান ধরল। যেন সে ব্যস্ত আছে এবং আশেপাশের দিকে তার কোনো নজর নেই। এরপর দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সে ধীরে ধীরে চায়ের দোকান ছেড়ে রাস্তার অন্যদিকে, ঢাল বেয়ে নিচের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
একটানা হাঁটতে হাঁটতে সে রাস্তার দুপাশ, জঙ্গল এবং পাহাড়ের বাঁকগুলোর দিকে সতর্ক চোখে দেখতে লাগল—কোথাও একফোঁটা নেটওয়ার্কের দেখা মেলে কি না!
​অথচ কোথাও নেটওয়ার্কের দেখা নেই। বাসে বসে কার্টুন দেখতে দেখতে ফোনের চার্জও অর্ধেক ফুরিয়ে ফেলেছে।
সেও চায়ের দোকান হতে আনমনে মেইন রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় কুড়ি মিনিটের মতো পেরিয়ে অনেকটা দূরে সরে এসেছে। পেছনে ফিরে চায়ের দোকানের টিমটিমে আলোটুকুও এখন আর দেখা যায় না। এদিকে বৃষ্টির ছিটেফোঁটার তোপ যেন ক্রমশই বাড়তে শুরু করেছে।

​আনায়া সহসাই হতাশ ও ভীত হতে লাগল। আশেপাশে কোনো মানুষের চিহ্ন নেই, কোনো যানবাহনের শব্দও নেই। এখন সে করবেটা কি? নিরুপায় হয়ে তার কেন যেন কান্না করতে ইচ্ছে হলো।
​ঠিক সেই মুহূর্তে, দ্রুতগতিতে একটা গাড়ি আসার শব্দ হলো। আনায়া তখনো আনমনে ঠিক মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে। পাহাড়ি নীরবতা এবং নিজের চিন্তায় এতটাই মগ্ন ছিল যে, সে কিছু খেয়ালই করেনি। হুট করে পেছন থেকে গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো এবং ইঞ্জিনের প্রচণ্ড শব্দে তার ধ্যান ভাঙ্গল।
আনায়া তৎক্ষণাৎ পেছনে ফিরে তাকাতে না তাকাতেই দেখল, কালো রঙের একটা বিশাল মার্সিডিজের লোগো চকচককৃত জি-ওয়াগন তীব্র গতিতে তার দিকে ছুটে আসছে।

যেন সম্পূর্ণ তার উপরই চড়ে বসবে।
​মৃ’ত্যুভয়ে আনায়া চোখমুখ খিঁচে কুঁকড়ে গিয়ে, দু’হাত দিয়ে গাড়ির তীব্র আলো হতে বাঁচতে নিজের মুখ আড়াল করল। তার মনে হলো, আজই হয়তো সে চিরতরে শেষ।
​অথচ ঠিক তৎক্ষণাৎ, ঘষটানোর এক তীক্ষ্ণ শব্দ তুলে, তার থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে গাড়িটা থেমে গেল। ভয়ে জমে যাওয়া আনায়া চোখ খোলার আগেই, গাড়ির দরজা খুলে এক মানব বেরিয়ে এলো। পরনে কালো টিশার্ট আর প্যান্ট। গায়ে জড়ানো ম্যাট ব্লাক-ডার্ক রেড কম্বিনেশনের লেদার জ্যাকেট। হাতে সিগারেট ধরা। সিল্কি চুলগুলো কাঁধ অবধি নেমে এলোমেলো পাখির ঝাঁক হয়ে আছে।

হেডলাইটের তীব্র আলোর বিপরীতে তার অবয়ব স্পষ্ট না হলেও, বোঝা যায় সে এক অত্যন্ত সুপুরুষ।তবে আনায়া শুরুতে লাইটের আলোয় ঝাপসা চোখে ব্যক্তিটিকে চিনতে পারল না। কিন্তু ততক্ষণে লোকটি প্রচণ্ড রাগ ও ক্ষিপ্ততা নিয়ে, বিরক্তি ও রাগ সংমিশ্রিত গা’লি ছুড়ে বসল,
“হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ফাকিং গ্রোস!”
ব্যক্তির কন্ঠস্বরে আনায়া অজানা এক কারণে,সহসাই শিউরে উঠল। সে বিস্ময়ের তোপে হতভম্ব। এদিকে বৃষ্টির বেগও বেড়ে চলল তীব্র ভাবে। চারপাশে আলো-আঁধারিতে ছেয়ে যাচ্ছে ক্রমশই। আনায়াও বেশ খানিকটা ভিজে গেল এরিমধ্যে।
এদিকে ব্যক্তিটি কয়েক’পা এগিয়ে,পুনরায় হিং”স্রস্বরে উন্মাদের ন্যায় ভারিক্কি গলায় বলে উঠল,
“হেই, আর ইউ ম্যাড? এখনো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? এতোই যখন মরার শখ…সো প্লিজ,গো ডাই সাম-হোয়ার রাইট নাউ।”

আনায়া একটুও নড়ল না। বরং সেখানে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে, আলো-আঁধারির মাঝে ভিজতে থাকা ব্যক্তির অবয়বের দিকে স্তম্ভিত চোখে চেয়ে রইল। অন্যদিকে ব্যক্তিটি বোধহয় এতে বেশ বিরক্ত হলো। বৃষ্টিতে গা ভিজছিল বিধায়,সে ক্ষুব্ধ হয়ে পেছনে ফিরে গাড়িতে ওঠার জন্য অগ্রসর হয়।হাতের সিগারেটটা পানির ছিটেয় খানিক ভিজে যাওয়ায়, সে আরো বেশি বিরক্ত হয়ে তা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে,বিড়বিড়িয়ে দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ায়, ‘আঃ ফা*কিং গ্রো’স!”

মহামায়া পর্ব ১৫

এদিকে ব্যক্তিটি চলে যাচ্ছে দেখে, আনায়ার যেন হুঁশ ফিরল। নিজের দিকে চেয়ে দেখল, হঠাৎ এই বৃষ্টির তোপে গায়ের জামা-চুলের অনেক অংশই ভিজে গিয়েছে।হাতের ডায়েরি আর ফোনটাও ভিজছে । সে আর এক মূহুর্তও দেরি না করে, দ্রুত হুড়মুড়িয়ে ছুটে গেল। ব্যক্তিটি যেই না গাড়ির দরজাটা খুলে গাড়িতে চড়তে নিয়েছে,ওমনি সে গাড়ি হতে খানিকটা কাছ অব্দি পৌঁছেই, ভারী ভারী শ্বাস ফেলে,হাঁপানো স্বরে অস্ফুটে আওড়াল,
“মিস্টার রেড! প্লিজ,সাহায্য করুন।”

মহামায়া পর্ব ১৭