Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ১৭

মহামায়া পর্ব ১৭

মহামায়া পর্ব ১৭
তুশকন্যা

“মিস্টার রেড! প্লিজ,সাহায্য করুন।”
কেনীথ তৎক্ষনাৎ বিস্ময়ে ভ্রু-জোড়া কুঁচকে,সামনে থেকে গাড়ির দরজাটা সরিয়ে, পাশে ফিরে তাকাল। মুহূর্তে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় স্পষ্ট হওয়া রমণীর মুখশ্রীখানি স্পষ্ট হলো।
আনায়ার ধারণা ভুল ছিল না। প্রচন্ড বিস্মিত হলেও সে কন্ঠস্বরেই চিনে নিয়েছে যে,এটাই সেই বজ্জাত গম্ভীরমুখো লাল পাখিটা। অবশ্য কখনো কল্পনাও করেনি, সে তাকে এই মূহুর্তে এতগুলো মাস পর আবারও নিজ চোখের সামনে দেখতে পাবে। নিজের কাছে বিষয়টা এখনও কাল্পনিক মনে হচ্ছে।

আনায়া কিংবা কেনীথ দুজনেরই নিস্পৃহে ভিজে চলেছে। কেনীথের চুল অনেকটা অংশ ভিজে গিয়ে,কপাল বেয়ে চোখে পানি পড়তেই তার ধ্যান ভাঙ্গল। একইসাথে ভাবমূর্তিও হঠাৎ দৃঢ়-গম্ভীর হলো। চোয়ালখানা শক্ত করে অকস্মাৎ সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে নিল। এবং গাড়িতে চড়ার জন্য পুনরায় পা বাড়াল।
তার এমন প্রতিক্রিয়ায় আনায়া তৎক্ষনাৎ থতমত খেয়ে যায়। সে দ্রুত কেনীথের কাছে আরো কয়েক-পা এগিয়ে গিয়ে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“প্লিজ এভাবে ফেলে রেখে চলে যাবেন না। আমার বাস আমায় রেখে চলে গিয়েছে। আর আমি এখানকার কিচ্ছু চিনি না।”
কেনীথ থামল। তবে মুখ না ফিরিয়েই, অকস্মাৎ শীতল-গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“আ’ইম নট সেফ ফর ইউ।”
তার এহেন কথায় আনায়া স্তম্ভিত হলো। কয়েকবার চোখের পাপড়ি ঝাপটে তৎক্ষনাৎ নিজেকে তটস্থ করে বলল,
“পাগল নাকি? আমি জানি, সবকিছুর পর… আ…মানে…তবুও প্লিজ সাহায্য করুন না! আমরা তো পরিচিত তাই না? ধরে নিন এটা আমার জীবনের শেষ ইচ্ছে। এমনিতেও আপনি আমায় ফেলে রেখে গেলে, এখানেই আমার জীবনের শেষ হয়ে যাবে। ঐদিকে একটা দোকান আছে,কিন্তু ওখানে কয়েকটা ছেলেপেলেও আছে। কাউকেই তো চিনি না। ওদের হাবভাবও সুবিধার নয়। প্লিজ শেষবারের মতো সাহায্য করে দিন।”
কেনীথ তাচ্ছিল্যের সহিত ক্ষীণ তির্যক হাসে। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে, পাশে মুখ ফিরিয়ে বলল,

“প্লিজ!”
তার ভাবগম্ভীর্যে আনায়া শুরুতে বুঝতে পারল না, সে কি বলছে। পরক্ষণেই যখন বুঝল,কেনীথ তাকে গাড়িতে ওঠার অনুমতি দিয়েছে—ওমনি সে প্রফুল্ল চিত্তে বলতে শুরু করল,
“থ্যাংক ইউ,থ্যাংক ইউ।”
এই বলতে না বলতেই,আনায়া গাড়ির অন্যপাশটায় ছুটে গেল। দ্রুত দরজাটা খুলতে গিয়ে পড়ল আরেক বিপত্তি। একহাতে ডায়েরি-ফোন, আর অন্যহাতে সে গাড়ির দরজাটা খোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতোই শক্ত যে, তার শক্তির সাথে কুলাতে পারল না।
এরিমধ্যে পেছন হতে হঠাৎ একটা হাত এসে তাকে ঘিরে ধরল। আনায়া তৎক্ষনাৎ চমকে ওঠে, পাশে ফিরতেই দেখে কেনীথ নিজ থেকে দরজাটা খুলে দিল। আনায়াও আর ভণিতা না করে, গাড়িতে চড়ে বসল। কেনীথ নির্বিকারে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে,ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে।
গায়ের জ্যাকেটের অনেকাংশ ভিজে গিয়েছে বিধায়,সে বেশ বিরক্ত হয়েই তা খুলে ব্যাকসিটে ছুঁড়ে মারল। পাশ থেকে আনায়া আঁড়চোখে সবটাই পরখ করছে। লোকটা কি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না নাকি? ভাবগম্ভীর্য এমন নিষ্প্রাণ কেনো কে জানে। হাবভাবে তেজ থাকলে কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছে।
আনায়া ভারী শ্বাস ফেলে, অন্যদিকে কেনীথ ততক্ষণে একটা ব্ল্যাক-গোল্ডেন সিগারেট বক্স বের করে, তা হতে একটা সিগারেট নিয়ে ঠোঁটে ধরল। লাইটার দিয়ে দু’হাতের আড়ালে আগুন ধরিয়ে, নির্বিকারে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। স্টিয়ারিং এ ডান হাত শক্ত করে রেখে, নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“কোথায় যাবেন?”
আনায়া উত্তর দিতে গিয়েও কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। কেনীথ তার দিকে ফিরেও তাকায়নি। দৃঢ় দৃষ্টিখানি সম্মূখের রাস্তার দিকে নিক্ষিপ্ত।তার এহেন অভিব্যক্তিতে কেনো যেন আনায়ার মনটা খানি বিষিয়ে উঠল। তবুও সে নিজেকে তটস্থ করে, ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“রাঙ্গামাটির একটা রিসোর্টে আমার বন্ধুরা গেটটুগেদারের অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছে। ওখানেই যাব।”
—“জায়গাটা কোথায়?”
—“আ…ঠিক বলতে পারছি না তো।”
কেনীথ যেন কিছুটা বিরক্ত হলো। তার সুক্ষ্ম ভাবগম্ভীর্যে এমন কিছুই প্রকাশ পেলো। অথচ আনায়া তখন বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তার দিকেই চেয়ে। কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে, এবার আনায়ার দিকে ফিরে তাকায়। বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। একদমই স্বাভাবিক তার চাহুনি। যেন আনায়ার সাথে তার দূরদূরান্তের কোনো সম্পর্ক নেই।
অন্যদিকে আনায়া তার চাহনিতে কেন যেন বেশ ইতস্তত হলো। শান্ত-গম্ভীর লালচে মণির চোখজোড়ায় বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে না পেরে, আচমকাই শুষ্ক ঢোক গিলে নজর সরিয়ে মাথা নুইয়ে নিল। আমতাআমতা স্বরে বলতে লাগল,

“মনে হয় সামনের বাস স্টেশন। ওখানেই নামিয়ে দিন। আমার বন্ধু এসে নিয়ে যাবে। এখানে নেটওয়ার্ক নেই নয়তো সায়েমকে ফোন দিতে পারতাম।”
কেনীথ আর কথা বাড়ায় না। সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ফুল স্পিডে ড্রাইভ করতে থাকে। একইসাথে কখনো বা সিগারেটে টান দিয়ে নির্বিকারে ধোঁয়া ছাড়ে।
গাড়ির জানালাদুটো খোলা থাকায়, বাতাসের সাথে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা ভেতরে প্রবেশ করে গায়ে লাগলেও,কেনীথ সম্পূর্ণ নির্বিকার। তবে আনায়ার এতে কিছুটা সমস্যা হয়। হাতে থাকা ডায়েরি আর ফোন ব্যালেন্স করতে গিয়ে, মাথা থেকে ওড়নাটা সরে গিয়ে বাতাসের তোপে খোপাটা আলগা হয়ে, চুলগুলো খানিক এলোমেলো হয়ে যায়।
ফ্রন্ট মিররে বিষয়টা কেনীথের নজরে, না চেয়েও ধরা পড়ে। সে তৎক্ষনাৎ পাশে মুখ ফিরিয়ে, আনায়ার পাশের জানালাটা বন্ধ করে দেয়। আনায়া তা টের পেতেই, আঁড়চোখে কেনীথকে দেখে। কেনীথ তখনও একহাতে স্টিয়ারিংএ রেখে,অন্যহাতে সিগারেট টানছে তবুও অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে।

আনায়া পুনরায় কিছুটা হতাশ হয়ে ভারী শ্বাস ফেলল। বেহায়ার মতো দুটো কথা তো বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু আদৌও উত্তর পাবে কিনা সন্দেহ। এদিকে সিগারেটের ধোঁয়ায় আচমকা তার শ্বাসকষ্ট হতে লাগল। নিজেকে সামলাতে না পেরে, সে কিছুটা ঘাবড়ে গেল এই ভাবনায় যে—তার কাছে ইনহেলার নেই৷ ওটা সে সিটের পাশে রেখে আসা ছোট ব্যাগটাতেই ফেলে এসেছে। যথারীতি সে চাপা শব্দে কাশতে শুরু করল৷
হুট করে পাশ থেকে খুকখুক কাশির শব্দে কেনীথের ধ্যান ভাঙ্গল। সে মৃদু ভ্রু কুঁচকে নিলেও,মোটেও পাশে ফিরে দেখতে গেল না কি হচ্ছে। বরং হুট করেই হাত থেকে সিগারেটটা বাহিরে ফেলে দিল। যা দেখে আনায়া রীতিমতো বেশ অবাক হলো। তার জন্য সিগারেট ফেলে দিল? এতো ভালোমানুষ? অবশ্য খারাপও তো ছিল না।
কিন্তু কিছুক্ষণ বাদেই আচমকা তার ভাবনায় জল ঢেলে দিয়ে,হুট করে সে গাড়ির গ্লোভবক্স থেকে হিপ ফ্লাস্ক বের করল। এবং বলা নেই কওয়া নেই,আচমকা সে মুখে পুড়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে খেতে লাগল। ভাবগম্ভীর্য শুরু হতেই এমন যে,পুরো গাড়িতে সে ব্যতীত আশেপাশে আর কেউ নেই।
অথচ এদিকে আনায়ার চোখ ছানাবড়া। সে বিস্ময়ের সাথে স্তম্ভিত দৃষ্টিতে, আঁড়চোখে কেনীথকে দেখতে দেখতেই মনে মনে আওড়ায়,

“আস্তাগফিরুল্লাহ! মদ খায়? এ তো পুরো নেশাখোর।”
প্রায় বেশ খানিকটা রাস্তা এভাবেই দুজনের পেরিয়ে গেল। আনায়া নানান কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েও বলতে পারল না। অদ্ভুত সংকোচ তাকে ঘিরে ধরছে৷ সে এতে কিছুটা বিরক্ত ও হতাশও হলো। এতোমাস, পুরো একটা বছর পর দেখা, তবুও সামান্য ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করার উপায় নেই৷ করলে বোধহয় বেহায়ামি হয়ে যাবে। কতবড় নির্বোধ হয়ে বাবার কথায় ভুলটা করে বসেছিল। সে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত কোন জনমে করতে পারবে,তা হয়তো নিজেও জানে না। আচ্ছা একবার কি সরি বলা যায় না? অন্তত সরি তো বলা যায়।
আনায়া এই ভাবনায় আচমকাই পাশে ফিরে বলতে নেয়,

“বলছিলাম যে…আ..মানে সরি…।”
আনায়ার কথা সম্পূর্ণ হলো না। বরং আচমকা গাড়িটা থেমে গেল। আনায়া এতে বেশ ভড়কেও যায়। গাড়ি কেন থামাল। এদিকে কেনীথের কপাল বেশ খানিকটা কুঁচকে গিয়েছে। সে খেয়াল করে গাড়ির কিছু একটা দেখতে। অন্যদিকে আনায়া চুপচাপ থাকতে না পেরে বলে উঠল,
“কি হয়েছে? গাড়ি কেনো থামালেন?”
কেনীথ কোনো উত্তর দেয় না। বরং সে হঠাৎ গাড়ি হতে নেমে পড়ে। আনায়া শুরুতে বুঝতে পারল না, সে করছেটা কি। কিন্তু যখন দেখল, কমে আসা বৃষ্টির মাঝে ভিজতে ভিজতেই সে গাড়ির ইঞ্চিন পার্টটা চেক করতে গিয়েছে—ওমনি বুঝে নেয়, আজ কপালে শনি,মঙ্গল, বৃহস্পতি একত্রে জুটেছে।
এবং শেষমেশ তার ভাবনাই সত্য প্রমাণিত করে, কেনীথ আরো বেশ খানিকটা ভিজে অবস্থায় গাড়ির কাছে এলো।মাথা নুইয়ে ব্যাকসাইট থেকে কিছু একটা বের করতে করতে, আনায়া উদ্দেশ্যে স্পষ্টভাবে তীক্ষ্ণ-গম্ভীর্যের সহিত বলল,

“ইঞ্চিনে সমস্যা হয়েছে। আপাতত এটা আর সামনে এগোবে। এখানে নেটওয়ার্ক পেলে আপনার লোকজনের সাথে যোগাযোগ করুন। আমায় যেতে হবে।”
তার এহেন নির্লিপ্ত সোজাসাপ্টা কথায় আনায়া তৎক্ষনাৎ ভড়কে যায়। দ্রুত অন্যপাশ দিয়ে গাড়ি খুলে নামতে চেয়েও দরজা খুলতে না পেরে,আচমকা আরেকপাশ থেকে চড়ে গাড়ি হতে বেরিয়ে আসতে আসতে বলল,
“কি বলছেন এসব? আপনি এভাবে আমাকে ফেলে রেখে যেতে পারেন না। তাকিয়ে দেখুন,চারপাশে জঙ্গল আর ঝোপঝাড়। অন্ধকারও নেমে এসেছে। এই মূহুর্তে আমি যাবো কোথায়?”
কেনীথ সম্পূর্ণ নির্বিকার। সে নিজের মতো ব্যকসাইট থেকে গিটারটা বের করে কাঁধে ঝুলিয়ে,বাহিরের বৃষ্টির মধ্যেই ভিজতে ভিজতে স্পষ্টস্বরে বলল,
“আই নো। সো প্লিজ কনট্যাক্ট ইয়োর ফ্রেন্ড অর সামওয়ান এলস।”

—“আপনি পাগল হয়েছেন? নেটওয়ার্ক নেই এখানে। বিপদে না পরলে আমি কখনোই আপনার সাহায্য নিতাম না।”
আনায়া এই বলেই থামল। অতঃপর ফোনটা নিয়ে সে নিজেও বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়ল।
—“আপনি যেখানে যাবেন, ওখানেই নিয়ে যান না প্লিজ। আই প্রমিজ,কাল সকালেই নিজের রাস্তা আমি নিজেই খুঁজে নেবো। আর আপনাকেও বিরক্ত করব না।”
আনায়ার অসহায়ত্বের কন্ঠস্বরে, কেনীথ কিছু বলল না। ভারী শ্বাস ফেলে গাড়ির দরজটা বন্ধ করে,চাবিটা নিয়েই হাঁটতে শুরু করল। সামনে পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে এলে,ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করতে হবে।
এদিকে তাকে আর গাড়িটাকে ফেলে রেখেই,এই বান্দা কোথায় যাচ্ছে আনায়ার বুঝে এলো না।তাকে যেভাবে অগ্রাহ্য করছে,যেন সে কোনো মানুষই না। আনায়া উপায়ন্তর না পেয়ে শেষমেষ কেনীথের পেছন পেছনই যেতে লাগল। চারপাশে যা ঝোপঝাড়, তাতে যে কোনো সময় সাপ-জন্তু এসে হামলে পড়বে।

আনায়া দ্রুত কেনীথের পায়ের সাথে পা মেলানোর চেষ্টা করল। ভিজে ভিজে সারা গা কেমন চিপচিপে হয়ে যাচ্ছে। কেনীথের অবস্থা তো আরো বেহাল। কালো টিশার্ট গায়ে পুরোপুরি লেপ্টে গিয়েছে। গিটারের নানান অংশবিশেষে পানি ঢুকছে অনবরত। ঝাঁকড়া চুলগুলো মিইয়ে চুপসে যাচ্ছে।
আনায়া তার পথ ধরে এগোতে এগোতেই দেখল, সে যেটাকে ঝোপঝাড় ভেবেছিল তার পাশ থেকে রাস্তা খুঁজে এই বান্দা নির্বিকারে হেঁটে যাচ্ছে। আনায়া তার সাথে পা মেলাতে না পেরে বলল,
“এভাবে আর কতক্ষণ হাঁটতে হবে? না মানে…আপনি যাচ্ছেনটা কোথায়?”
কেনীথ এবারও নিশ্চুপ। বেশি অন্ধকার নেমে আসায়, সে ফোনটা বের করে লাইন অন করল। এরপর হঠাৎ একটা বাঁশের সাঁকো বেয়ে হাঁটতে লাগল। আনায়া বুঝতে পারছে না, এ সে কার পাল্লায় পড়েছে। না জানে আজ কপালে কি আছে। বারবার উত্তর না পেয়ে কিছুটা অপমানিত বোধ হলো বিধায়,সে এবার একদমই চুপচাপ রয়ে কেনীথের পেছন পেছন হাঁটতে থাকে।

এরিমধ্যে সে খেয়াল করে দেখে দূরে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে আলো জ্বলছে। বিদ্যুৎ নয় বরং আগুন-মশাল জাতীয় আলো। সে ধরে নেয় তারা কোনো এক আদিবাসীর গ্রামে যাচ্ছে। সাথে কিছুটা অবাক হলো এই ভেবে যে, লোকটা কেমন ঝোপঝাড় দিয়েও জায়গাটার পথ বের করে নিয়েছে। ফলে এই থেকে তার মনে একটা প্রশ্নও এলো।
—“আপনি এই জায়গাটা আগে থেকেই চিনতেন?”
বরাবরের মতোই কেনীথ কোনো উত্তর দেয়না। আনায়া হতাশ হয়ে আবারও বলল,
“অন্তত এটা বলুন,গ্রামটা কি আপনার পরিচিত? এখানে আপনার পরিচিত কেউ আছে?”
—“না।”
অবশেষে গম্ভীরস্বরে একটামাত্র শব্দ শুনতে পেয়েও যেন আনায়া বেশ স্বস্তি পেল। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে গ্রামটার ভেতরে এগিয়ে গেলো।

বাঁশের সাঁকোটি পার হতেই তারা প্রবেশ করল মশাল ও লণ্ঠনের উষ্ণ আভায় আবৃত এক ভিন্ন জগতে। চারপাশ এখনও বৃষ্টিতে ছেয়ে আছে। মশাল-লন্ঠন সবই ঘর-বাড়ির নানান অংশে ঝুলন্ত। গ্রামে প্রবেশ করতেই কয়েকটি কুকুরের মৃদু ডাকে জীর্ণ পোশাকের কয়েকজন মানুষ বেরিয়ে এলেন। তাদের উৎসুক দৃষ্টিতে কেবল সরল কৌতূহল।
​কেনীথ শান্তভাবে, বাহুল্যবর্জিত কণ্ঠে তার উদ্দেশ্য জানাল—ঝড়ের তাণ্ডবে পথভ্রষ্ট এইসাথে গাড়ি নষ্ট হয়েছে। তাই আজকের রাতটুকুর জন্য অন্তত আশ্রয় প্রয়োজন।গ্রামপ্রধানের মতো দেখতে এক প্রবীণ ব্যক্তি তাদের দিকে নিবিড়ভাবে তাকালেন। সম্ভবত কেনীথের সুঠাম, ক্লান্তিমাখা অবয়ব আর আনায়ার স্নিগ্ধ তবে বিপর্যস্ত মুখচ্ছবি দেখে তাদের মনে সহানুভূতি জন্মাল। দুজনের বেশভূষাতেও সাধারণ ব্যক্তি ব্যতীত বিশেষ সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ল না। কেবল কেনীথের কাছে একটা গিটার দৃশ্যমান।
কোনো প্রশ্ন না করেই দ্রুত সিদ্ধান্ত হলো: এই ঝঞ্ঝার রাতে বাইরের অতিথিদের ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। তবুও আশ্বস্ত হতে কৌতুহল বশত পরিচিয় জিজ্ঞেস করতে গিয়ে বলল,

“আপনারা সম্পর্কে একে অপরের কি হোন?”
কেনীথের উত্তরটা যেন তৈরিই ছিল। কিন্তু সে সহসাই কিছু বলবে,তৎক্ষনাৎ পাশ থেকে আনায়া অকপটে বলে ফেলল,
“উনি আমার স্বামী আর আমি তার বউ। ইয়ে মানে,আমরা স্বামী-স্ত্রী।”
আনায়া সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। কি বলল তা নিয়ে বিশেষ কোনো ভাবান্তর নেই। অন্যদিকে কেনীথ তার কথা শুনে,ভ্রুকুটি করে পাশে ফিরে তাকায়। তার গম্ভীর মুখ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর পরতেই,আনায়া বেশ খানিকটা ঘাবড়ে যায়। এতোক্ষণ ভাবছিল,এমন একটা উত্তর দিয়ে কতবড় না মহৎকর্ম করে ফেলেছে। অথচ বিষয়টা পরক্ষণেই বোধগম্য হতেই সে বেশ ইতস্তত হলো। অন্যদিকে কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে আর কিছুই বলল না।
এদিকে গ্রামবাসীও যেন স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিল, এরা ক্লান্ত স্বামী-স্ত্রীই। যারা প্রকৃতির রোষানলে পড়ে এই বিপদসংকুল পথে এসেছে।

মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হলো আদিবাসী আতিথেয়তা। প্রথমে ভিজে জবুথবু পোশাক বদলের পালা। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো স্থানীয় তাঁতে বোনা মোটা সুতির পোশাক। বাধ্য হয়েই তারা সেই অনভ্যস্ত বস্ত্র পরিধান করল। কেনীথ যখন ঢোলা, সাদা কাপড়ের একটি বস্ত্রখণ্ড পরল, তখন ভিজে থাকা টি-শার্টের চেয়েও তার প্রশস্ত কাঁধ ও পেশিবহুল ত্বক যেন আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে চোখে ধরা পড়ল। আনায়াও স্থানীয়দের মতো একটি লম্বা স্কার্ট ও টপসের মতো পোশাক পরে নিল।

এরপর শুরু হলো তাদের আপ্যায়ন। মাটির পাত্রে গরম গরম ভেষজ পানীয় এবং স্থানীয় ফলমূল ও শস্যদানা দিয়ে তৈরি সাধারণ কিন্তু সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হলো। আনায়া দেখল, গ্রামবাসী কতটা সরল ও অতিথিপরায়ণ হতে পারে। অবশ্য আগেরবার এসেও বুঝে নিয়েছিল,পাহাড়ী মানুষজন অতিথিপরায়ণে সর্বসেরা।
​কিন্তু এই আপ্যায়নের মাঝেই আনায়ার দৃষ্টি গেল গ্রামের অল্পবয়সী মেয়েদের দিকে। তারা দল বেঁধে আবার কিছুজন একা একা, বারবার তাদের বসার জায়গার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে। আর তাদের লোভাতুর ও মোহময়ী দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কেবলমাত্র ফর্সা, বলিষ্ঠ দেহের কেনীথ।
তারা আড়চোখে তাকাচ্ছে, হাসছে, নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে, যেন পারলে চোখ দিয়েই কেনীথকে গিলে খাবে। তাদের উৎসুক দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট আকর্ষণ।
​কেনীথ আশেপাশে সরাসরি না তাকিয়েও, বিষয়টা বুঝতে পারল ঠিকই,কিন্তু সে নির্বিকার রইল। তার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, সে শান্তভাবে খাবার খাচ্ছে। তবে এই দৃশ্য আনায়ার মনে এক অদ্ভূত বিরক্তি ও চাপা ক্রোধ সৃষ্টি করল।

​”এই লোকটাকে এভাবে দেখার কি আছে? বেটা কি চিরিয়াখানার ভিনগ্রহের প্রাণী নাকি মিউজিয়ামের আইটেম। এরা কি জীবনে পুরুষ মানুষ দেখেনি কখনো? তবুও কেন বেহায়ার মতো দেখছে? পাহাড়ী হয়েছ তো কি হয়েছে,লজ্জা-শরম বলে কিচ্ছু নেই নাকি?”
আনায়ার ভেতরে স্পষ্টতই অজানা অধিকারবোধের তীব্রতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। কেনীথের এই নীরবতা তার বিরক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সে আড়চোখে একবার কেনীথকে দেখল। তার চোখে সেই মেয়েদের প্রতি সামান্যতম মনোযোগও নেই। এই নির্বিকারত্বই আনায়ার রাগ কিছুটা প্রশমিত করল, তবে মনে সন্দেহ ও অস্বস্তি থেকেই গেল।

খাওয়াদাওয়া শেষে, রাতের আশ্রয় হিসেবে তাদের জন্য গ্রামের এক প্রান্তে একটি ছোট কুটিরের ব্যবস্থা করা হলো। কুটিরটি পরিষ্কার, মাটির মেঝে আর খড়ের ছাউনিতে সজ্জিত। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি জানালেন, ঝড় কিছুটা কমে গেলে তারা যেন শান্তিতে বিশ্রাম নেয়।

​তবে খাবার শেষ করে,কেনীথের আগে আগেই আনায়া কুটিরের ভেতরে প্রবেশ করে। চারপাশে ঘুরেফিরে দেখতে থাকে। একটা ঘর সুন্দরমতো সাজিয়েগুছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাজিয়ে-গুছিয়ে বলতে একটি কাঠের বিছানায় চাদর-বালিশ বিছানো। একইসাথে ঘরটা যতদ্রুত সম্ভব হয়েছে, পরিষ্কার করে দেওয়া যায়—ঠিক তেমন। সে যাক গে, আশ্রয় হিসেবে এইটুকু জায়গাই তাদের জন্য আজ অনেক কিছু। নয়তো বাহিরে এখনোও অনবরত বৃষ্টি পড়ছে।
আনায়া ভারী শ্বাস ফেলল। সমস্ত দিনের ঘটনা, পথচলা, অপরিচিত স্পর্শ, আর এখন এই স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে এক অপরিচিত কুটিরে রাত যাপন—সব যেন এক নিমিষে তার জীবনে ঘটে গেল।
​অপেক্ষায় ছিল কেবল নিস্তব্ধ রাত্রি আর এই পরিচিত-অপরিচিত নামক দ্বিধার খেয়াল, অপ্রত্যাশিত পুরুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া একটি ছোট্ট কুটিরের পরবর্তী অভিজ্ঞতা। তাদের মধ্যে কি কোনো কথা হবে?নাকি আবার নেমে আসবে সেই অস্বস্তিকর নীরবতা?

আনায়া পড়েছে ভিন্ন বিপত্তিতে। সে জামাটা পড়ে মোটেও স্বস্তি পাচ্ছে না। গায়ের সাথে জামাটা পুরোপুরি এডজাস্ট না হওয়ায় বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। অনেক বেশ টাইট হওয়ায় গলা হতে নিচের অংশটাও কেমন বিশ্রি লাগছে। যদিও গায়ে ওড়না প্যাচানো। তবুও সাধারণ একটা আদিবাসী জামা ওয়েস্টার্ন বডিকন ড্রেস হয়ে গিয়েছে। সাথে আবার হাতাটাও একদম ছোট,গলাটাও বেশ বড়। সবমিলিয়ে আনায়া কেমন যেন অস্বস্তিতেই কান্না পেয়ে গেল।
এতোক্ষণ সহ্য করে চুপচাপ রইলেও,এখন যে এটা পড়তেই ঘুমাতে হবে—এটা ভেবেই তার কাঁদতে ইচ্ছে হলো। মনে মনে ভাবতে লাগল, বাড়িতে গিয়ে কঠিন ডায়েট করতে হবে। নয়তো এখানকার সব মেয়েই কেমন চিকন-চিকন। অথচ সে দিন দিন খেয়ে খেয়ে হয়েছে মোটাসোটা।
যদিও এসব নিছকই আনায়ার মনগড়া ভাবনাচিন্তা। কেননা তার মাথায় তো ঘুরছে অন্যকিছু। গ্রামে আসা হতে শুরু করে, রাতের খাবার অব্দি সবগুলো কচিকাঁচা মেয়ে কেমন অদ্ভুত অদ্ভুত নজরে লোকটাকে দেখছিল। আনায়া কেন যেন বিষয়টা নিতে পারল না। আর না এসব মাথা থেকে সরছে। তার মতে তারা কেবল কেনীথকে দেখছিল না বরং পারলে চোখ দিয়েই গিলে খাচ্ছিল।

আপাতত এই চিন্তা আবারও মাথায় আসতেই আনায়া প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে বিছানায় চাদর টেনে শুনে পড়ল। ওড়নার মতো ছোট এই স্কার্ফটা বিরক্ত লাগছিল বিধায়,একপ্রকার টেনে ছুঁড়ে ফেলে চাদর টেনে আবার হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসল। ফোনটা অন করে দেখল এখনো অর্ধেক চার্জ বাকি। অথচ নূন্যতম নেটওয়ার্ক নেই।
আগে এমনসব গ্রাম সে সিনেমায় দেখতো।আজ যে বাস্তবে নিজে থেকে এসে ভুক্তভোগী হতে হবে তা কল্পনাও করেনি। আনায়া ভারী শ্বাস ফেলে ভাবল, নেটওয়ার্ক যেহেতু নেই তবে ফোনে চার্জও রেখে লাভ নেই। তার চেয়ে একটু কার্টুন দেখে ঘুমিয়ে পড়া যাক। এই ভাবনায় সে ফোনের ডাউনলোডকৃত ও একই এপিসোড শতবারের চেয়েও বেশি দেখা কার্টুনটাই শেষমেশ ঘুরেফিরে দেখতে লাগল।

আশেপাশে কেউ নেই বিধায়,অল্প সময়ের মাঝেই সে ফোনের স্ক্রিণে মত্ত হলো। চারপাশের আর কোনোকিছুতেই তার ধ্যান নেই। এরিমধ্যে আনায়া যখন কার্টুন দেখতে দেখতে একপ্রকার বিছানায় গড়াগড়ি করে হাসছে,ঠিক সেই মূহুর্তেই হঠাৎ কেনীথের আগমন ঘটল।
হুট করে আনায়ার এমন বিতিকিচ্ছিরি পরিস্থিতিতে এসে,কেনীথ নিজেও কিছুটা স্তম্ভিত হলো। চোখের সামনে যে এমন দৃশ্য পড়বে তা হয়তো আশা করেনি। কেনীথ তৎক্ষনাৎ নিজের নজর সরিয়ে, খানিকটা গলা খাকিয়ে আশপাশ ঘুরে কিছু একটা খুঁজতে লাগল।

এদিকে রুমে যে কারো আগমন ঘটেছে,তা বোঝামাত্রই আনায়া একপ্রকার চমকে উঠল। নিজের দিকে চেয়ে আরো বেশি হতভম্ব হলো। আহাম্মকের মতো জামাকাপড়ের যে দশা বানিয়েছে,তা দেখে নিজেই তীব্র বিব্রতবোধ করল। দ্রুত নিজেকে সামলে গুছিয়ে নিয়ে,গায়ে চাদর ঢাকা দিয়ে,কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“আ…আপনি… আ’ইম সরি। আমি শুনেছি, এসব জায়গায় ছেলে-মেয়ে যদি স্বামী-স্ত্রী পরিচয় না দেয়,তাহলে আদিবাসীরা তাদের পুড়িয়ে খেয়ে ফেলে। এইজন্য আমি তখন ওটা বলে ফেলেছি।”
কেনীথ তার কথা শুনে ভারী শ্বাস ফেলল। ভ্রু – উঁচিয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে ভাবল,‘এটা বোধহয় বাংলাদেশ। আফ্রিকার জঙ্গল নয়।’

সে আশেপাশে একবারও তাকানোর প্রয়োজন মনে না করে,নিজের ফোনটা একবার চেক করল। নাহ,কোনো নেটওয়ার্ক নেই। হতাশ হয়ে ফোনটা রেখে দিল। অতঃপর গিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে, এককোণে নিচে পড়ে থাকা খড়গুলো নির্বিকারে টেনে কিছুটা সাজিয়ে-বিছিয়ে নিল। অন্যদিকে আনায়া শুধু চোখ পিটপিট করে, বেটার কাজকর্মগুলো দেখছে। নিচেই বোধহয় শুবে। আচ্ছা একবার কি বলা উচিত,বিছানায়…না,না,ওমন হলে তাকে অন্যকোথায় যেতে হবে।আর রুম থেকে বাহিরে গেলে,লোকজন সন্দেহ করবে। তারচেয়ে চুপচাপ এখানেই বসে থাকা ভালো।
এরিমধ্যে কেনীথ ঘরের ভেতর জ্বলতে থাকা, হারিকেনটা বন্ধ করতে নিলে আনায়া বলে উঠল,

“প্লিজ,ওটা বন্ধ করবেন না। আমি অন্ধকারে ঘুমাতে পারি না।”
কেনীথ আর কিছু বলল না। কিংবা আনায়ার দিকে ফিরেও দেখল না। সরাসরি নির্লিপ্তে শুতে চলে গেল।
আনায়াও আর কথা না বাড়িয়ে ভারী শ্বাস ফেলে,আলগোছে কাঁথা টেনে গুটিয়ে একপাশ হয়ে শুয়ে পড়ল। তবে মাঝে একবার মাথা উঁচিয়ে কেনীথের দিকে ফিরতেই কিঞ্চিৎ বেশম খেলো।

ঘরের ভেতরে থাকা কোথায় থেকে যেন, চাদর টাইপের কাপড় খড়ের উপর বিছিয়ে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। কিন্তু গায়ের পরনের সাদা সেন্ডোগেঞ্জিটা প্রচন্ড টাইট হচ্ছিল বিধায়,সে একপ্রকার তীব্র বিরক্তিতে তা গা হতে খুলে ছুঁড়ে ফেলল। এদিকে তার এমন অর্ধনগ্ন মোহনীয় পেশীবহুল বলিষ্ঠ দেহে নজর পড়তেই,আনায়া বেশম খেয়ে উঠল।
তৎক্ষনাৎ আবার কেনীথের তীক্ষ্ণ নজর ঘুরে তার দিকে পড়তেই,আনায়া লজ্জায় বিব্রত হয়ে চাদর টেনে মাথা অব্দি ঢেকে নিল। অন্যদিকে কেনীথ কি যেন ভেবে নিয়ে, হঠাৎ পাশ থেকে গামছাটা নিয়ে,গায়ে জড়িয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়ে শুয়ে চোখদুটো বুঁজে নেয়।
আনায়া কিছু সময় পর, আবারও আলতোভাবে মাথাটা উঁচিয়ে দেখে কেনীথ উল্টোপাশে ঘুরে শুয়ে পড়েছে। গায়ে আবার গামছাও জড়ানো। যা দেখে আনায়া কিছুটা তাচ্ছিল্যের সহিত মনে মনে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“বাপরে! ভাবটা এমন দেখাচ্ছে যেন,ঐ বেহায়া মেয়েগুলোর মতো আমিও তাকে চোখ দিয়েই খেয়ে ফেলতাম।”
এই বলেই সে দাঁত কিড়মিড়িয়ে, নিজের প্রতিই বিরক্ত হয়ে চোখদুটো বুঁজে নিল।

রাত কতটা গভীর তা বলা মুূশকিল। চারপাশে ভীষণ ঝড়ো হাওয়া বইয়ে। এরিমধ্যে বিদুৎ চমকানো শব্দে আনায়ার ঘুমটা অকস্মাৎ ভেঙে গেল। সে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই,কিছুটা অবাক হলো। হারিকেনের আলো মিটমিট করছে। কখন নিভে যায় কে জানে।
অন্যদিকে কেনীথ ঘুমের মাঝেও মৃদু নড়চড় করছে। হয়তো বা ঠান্ডায়। কেননা একটা চাদর তো সে নিজেই নিয়ে বসে আছে।বিষয়টায় আনায়ার কাছে একটু খারাপ লাগায়, সে নিজের চাদরটা নিয়ে খাট থেকে নেমে পড়ল। ভাবনা এমন যে, আলতোভাবে কেনীথের গায়ের উপর বিছিয়ে দিয়েই চলে আসবে।
আনায়া অতি সন্তপর্ণে কেনীথের কাছে আলতোপায়ে এগিয়ে,তার পাশেই চুপটি করে বসল। গায়ের উপর চাদরটা বিছিয়ে দিলেও,কেনীথের চোখে-মুখের ভাবভঙ্গিতে তার ভ্রু-জোড়া কুঁচকে গেল। লোকটার চোখ-মুখ এভাবে কুঁচকে আছে কেনো? আগ্রহবশত সে কি যেন ভেবে,কেনীথের কপালে হাত ছোঁয়াতেই চমকে উঠল। এনার তো জ্বর এসেছে? বৃষ্টিতে ভিজেই কি তবে দশা?

সহসাই আনায়ার মনে কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্নতা সৃষ্টি হলো। সে দ্রুত কেনীথের গায়ে চাদরটা ভালোমতো টেনে দিতে গিয়ে আরেকটা বিষয় নজরে পড়ে।কেনীথের পিঠ থেকে চাদর ও গামছার কিছুটা অংশ সরে যাওয়ায় শরীরের অনেকটা অংশ দৃশ্যমান হয়েছে।
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, ফর্সা পিঠের বিভিন্ন অংশে গভীর কালশিটে দাগ। এগুলো কিসের চিহ্ন বা ক্ষত, আনায়া ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।
​কৌতূহলের বশে, কিছুটা গুটিয়ে বসে সে কেনীথের মাথার কাছে এলো। সামান্য ভীতি সত্ত্বেও আলতো হাতে কেনীথের পিঠের উপর থেকে চাদর সরিয়ে, আরও ভালো করে বোঝার চেষ্টা করল। তীব্র আশঙ্কা ছিল, কখন না জানি কেনীথ জেগে ওঠে!

​আর তার ভয়কে সত্যি করে,তাকে একপ্রকার ভড়কে দিয়ে, মুহূর্তেই কেনীথ ঘুমের ঘোরে নড়ে উঠল। কী থেকে কী হলো, আনায়া বুঝে ওঠার আগেই, কেনীথ অকস্মাৎ আনায়ার পেটে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এলো। সে শুষ্ক ঢোক গিলে কেনীথের মাথাটা নিজের উরু থেকে সরানোর জন্য দু’হাত বাড়াল। ঠিক তখনই তার নজর পড়ল কেনীথের মাথার পেছনে ঝাঁকড়া চুলের আড়ালে। আনায়া ভ্রুকুটি করে আলতোভাবে পেছনের চুলগুলো সরাতেই বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলো।
​সেখানে স্পষ্ট সেলাইয়ের দাগ! এ তো বহুদিনের পুরনো এবং অত্যন্ত গভীর কোনো ক্ষতের চিহ্ন। পরক্ষণেই মনে হলো, পুরনো ক্ষতে নতুন করে আঘাত লেগে যেন তা আবার তাজা হয়েছে।

​আনায়া মনে মনে হিসেব মেলাতে শুরু করল—এটা কি সেই ঘটনার ফল, যা তার বাবার লোকজনের জন্য ঘটেছিল?তবে গভীর ক্ষতটা তো অনেক বেশিই পুরোনো মনে হচ্ছে। এই সমস্ত চিন্তার আবর্তে আনায়া ক্ষতের স্থানটিতে সামান্য হাত ছোঁয়াতেই হঠাৎ কেনীথ পুনরায় ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে দূরে সরে গেল।
আনায়া যেন বদ্ধ খাঁচা থেকে মুক্তি পেল, আর ভাবল দ্রুত এখান থেকে পালিয়ে যাবে।
​অথচ এইবারও সে তেমন কিছুই করল না। সে কেবল পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কেনীথের ঘুমন্ত মুখের দিকে। কেমন যেন এক গভীর বিষণ্ণতা ছেয়ে আছে মুখখানায়। আগেরবার যখন তাকে দেখেছিল, তখন সে গম্ভীর ছিল ঠিকই, কিন্তু এমন বিষন্নতা সে তার মাঝে দেখেনি।
লোকটারএত কিসের চিন্তা? দেখে তো মনে হয় সে ঠিকমতো ঘুমায়ও না! আচ্ছা, ওনার পরিবারের সবাই ভালো আছে তো?

​কে জানে, কখনো তো কোনো খোঁজই নেওয়া হয়নি। শেষবার কেবল শুনেছিল, এনার বাবা পদত্যাগ করেছেন—স্রেফ এইটুকুই ছিল তার জানা।
আচ্ছা, এই একটি বছর কি ইনি দেশেই ছিলেন? কিন্তু কোথায়? ঢাকায় কি একবারও যাননি? গেলে তো এই দীর্ঘ সময়ে একবার না একবার তার দেখা পেয়ে যেত। জেনেই হোক বা না জেনে, মনে মনে সে তো তাকে অনেক খুঁজেছে। কই, কোথাও তো একটিবারের জন্যও দেখা পায়নি!
তবে লোকটার কথা অনুযায়ী কেঁদেছো তো ঠিকই। শুরুর কয়েকমাস কতবার কল্পনা-জল্পনায় এসে তাকে বিরক্ত করতো। যখন সে তার সেসব বিরক্তিতে সয়ে উঠল,তখনই আবার দেখা দেওয়া বন্ধ করে দিল। কতটা বেদ্দপ এই লোক,ভাবতেই তার মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়।

আনায়ার এমন ভাবনাচিন্তার মাঝেই সে এক অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসল। হয়তো মনের অজান্তেই, তার আঙুল আলতোভাবে ঘুমন্ত কেনীথের গাল স্পর্শ করল। খোঁচা খোঁচা চাপ দাঁড়ির রুক্ষ সংস্পর্শে তার সর্বাঙ্গ যেন বিদ্যুৎ শিহরণে কেঁপে উঠল।ঘোর কাটতেই সে নিজের এই কাজে স্তম্ভিত হলো। এটা কেমন বেহায়াপনা!
​কিন্তু মস্তিষ্ক এক কথা বললেও, হৃদয়ের গোপন প্রকোষ্ঠ থেকে তো অন্য এক আহ্বান ভেসে আসছে। আরেকটু বেহায়াপনা কি করা যায় না?বেশি না, আর এক্টু?
আনায়া পড়ল চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে। এক মুহূর্তে নিজের ওপর বিরক্তি ও লজ্জিত ক্রোধে তার মুখ কুঁচকে যাচ্ছে; পরক্ষণেই বেপরোয়া মনের দুর্নিবার ইচ্ছায় সে চাইছে এই ঘনিষ্ঠতা আরও কিছুক্ষণ স্থায়ী হোক।
​এই দোলাচলের মাঝেই, গাল থেকে হাত সরিয়ে সে অকস্মাৎ কেনীথের শুষ্ক, উত্তপ্ত ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াল। স্পর্শটি ছিল ক্ষীণতম, প্রায় অলীক। অদ্ভুত এক ভয়ে তার সর্বস্ব কাঁপছে, আবার একইসাথে এক দুর্বোধ্য ভালোলাগাও কাজ করছে।

আনায়া নিজের আঙুলের ডগা দিয়ে বারংবার কেনীথের ঠোঁট স্পর্শ করার পর, নিজ ঠোঁট কামড়ে ধরে, মিটমিট করে হেসে চাপা স্বরে বিড়বিড় করে বলল, ‘সুন্দর।’
এই বলে সে নিঃশব্দে হেসে উঠল। অথচ তারই অন্তরাত্মার এক অংশ হতে, কেউ যেন বারবার তাকে ধিক্কার জানিয়ে বলছে,”ছিঃ আনায়া ছিঃ! তুই কবে থেকে এমন বেহায়া হলি?”
​অথচ আনায়ার যেন এতে আরো বেশি হাসি পেল। সে আনমনে বিড়বিড়িয়ে করে আওড়াল,
‘Jaane kab meri neend udi
Soyi soyi raaton mein
Jaane kab mera haath gaya
Sonya tere hotho pai____’
আনায়া নিঃশব্দে এইটুকু গেয়ে,আবারও ঠোঁট কামড়ে মিটমিট করে হাসতে লাগল।

‘Chal padte teri oar
Main jab bhi kadam uthaati hoon
Jaaoon tujhse door door to
Paas tere aa jaati hoon
Maine dekha tujhe bhula ke
Har ek tarkeeb laga ke
Har nuskhe ko aazma ke
Par dil se kabhi na utre.. utre.. utre..’

প্রয়োজন ভেদে গানের লিরিক্স উল্টেপাল্টে দিয়ে,বেশ ভালোমতোই নিজের অকাজের সময়টুকু পার করছিল। তবে এরই মধ্যে তার চোখ পড়ল ভিন্ন এক দিকে। কী যেন ভেবে কেনীথের ঠোঁটের একটা কোণ সামান্য উঁচু করে দেখতেই, বিস্ময়ে তার ভ্রু ঊর্ধ্বে উঠল। কেনীথের সামনের দাঁতের দু’পাশে থাকা দাঁত দুটি খানিকটা সরু। ঐ যাকে সহজভাবে ভ্যাম্পায়ার টিথ বলা হয়। যা দেখে আনায়া ভ্রুকুটি করে বিস্ময়ের ঘোরে বলে উঠল,
​”এ্যাহ্, বেটাকে পেঁচা ভেবেছিলাম, কিন্তু এ তো দেখি আস্ত বাদুড়।”
​এদিকে, জ্বরের ঘোরে এবং সুপ্তির গভীরতম স্তরে থাকা কেনীথ, অকস্মাৎ নিজের ঠোঁটে বারংবার শিরশিরে সংবেদন অনুভব করতেই, মৃদু বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে নিল। ঠোঁটের উপর কারো হাতের স্পর্শ অনুভূত হতেই, সে এক বিচক্ষণ শিকারীর ন্যায় আনায়ার হাতটি খপ করে ধরে ফেলল।স্পষ্টতই বোঝা গেল, কাজটি সে ঘুমের ঘোরেই করেছে।

​অথচ আনায়া তখন সম্পূর্ণ হতভম্ব। তার মনে হতে লাগল, কেনীথ বুঝি এতক্ষণ জেগেই ছিল। এই বুঝি তার চোখ খুলবে এবং তাকে ‘বেহায়া’ বলে ভর্ৎসনা করবে।
কিন্তু তার সমস্ত আশঙ্কাকে এক লহমায় চূর্ণ করে দিয়ে, কেনীথ অকস্মাৎ তার হাত ধরে এক হেঁচকা টানে নিজের দিকে টেনে নিল। আর আনায়া মুহূর্তেই ছিটকে গিয়ে পড়ল তার বিশালাকৃতির শরীরটার নিচে। সম্পূর্ণরূপে চাপা পড়ে গেল কেনীথের উষ্ণ অস্তিত্বের ভারে।
​বিষয়টি যদি কেবল শারীরিক চাপেই শেষ হতো, তবে আনায়া হয়তো কোনোমতে নিজেকে সামলে নিত। কিন্তু তার সমস্ত প্রতিরোধ ও চেতনাকে যেন শেষ করে দিতে, কেনীথ তখন আনায়ার নরম গলায় মুখ ডুবিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।

গভীর ঘুমে স্বস্তি খুঁজে পেয়ে কেনীথ আচমকা আনায়ার গলায় কয়েকবার নিজের মুখ-গাল ঘষে দিল। তারপর আনায়াকে আষ্টেপৃষ্টে জাপটে জড়িয়ে ধরে, তার উন্মুক্ত গলা থেকে খানিকটা নিচে মুখ ডুবিয়ে, সম্পূর্ণ স্থির হয়ে পুনরায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো।
এই আকস্মিক, নাটকীয় পতনের পর, আনায়ার অনুভূতি এখন জটিল সংমিশ্রণে জর্জরিত। ভয়, লজ্জা, দমবন্ধ করা উষ্ণতা এবং এক প্রবল আকর্ষণ—সব যেন তাকে গ্রাস করেছিল। প্রথমত সে অনুভব করল তীব্র উদ্বেগ। কেনীথের এই বিপুল ভারের নিচে চাপা পড়ার অসহায়তা। সে পুরোপুরি কেনীথের অধীনস্থ। পরক্ষণেই তার তীব্র কান্না পেয়ে গেল। ইচ্ছে করছে গলা ছেড়ে কেঁদে ফেলতে।

মহামায়া পর্ব ১৬

আনায়া অস্বস্তিতে চোখ-মুখ সহসাই খিঁচে নিয়ে, অন্তরাত্মা হতে একপ্রকার চিৎকার করে মনে মনে বলতে লাগল,
“ইয়া খোদা, এবার মতো মাফ করে দাও। আর জীবনে এমন অকাজ করব না। তওবা, তওবা,আমি একদম ভালো হয়ে যাবো।তবুও আমার উপর একটু হলেও দয়া করো। আমায় এই মুসিবত থেকে উদ্ধার করো। প্লিজ,প্লিজ,প্লিজ।”

মহামায়া পর্ব ১৮