Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ১৮

মহামায়া পর্ব ১৮

মহামায়া পর্ব ১৮
তুশকন্যা

বেশ ভোর বেলাতেই কেনীথের ঘুম ভাঙ্গল। তবে চোখদুটো খুলতেই,সে বেশ চমকে উঠল। ভ্রুকুটি করে নিজের অবস্থান বুঝতেই,আরো বেশি স্তম্ভিত হলো। আনায়া দু’হাতে তার ঘাড়-মাথা ও পিঠ জড়িয়ে,নিজের অর্ধ অনাচ্ছাদিত বুকে আগলে রেখেছে। দুজনের গায়ের উপর কেবল চাদরটা আলগাভাবে পড়ে আছে। কেনীথ মাথাটা কিঞ্চিৎ তুলতেই,আনায়ার ঘুমন্ত মুখখানা স্পষ্ট হয়।
সহসাই কেনীথের কপাল-ভ্রু কুঁচকে যায়। দ্রুত আনায়া হতে সরতে গিয়ে দেখে, সে নিজেও আনায়াকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। সবমিলিয়ে বিষয়টা বাস্তব না কাল্পনিক তা বুঝতে তার কিছুটা বেগ পেতে হলো। এমনিতেই মাথাটা ঝিমঝিম করছে।

কিন্তু যখনই বুঝল এটা বাস্তব, তখনই ভাবমূর্তি বিস্ময়ে পরিবর্তন হলো। না,সে এমন কিছু মোটেও প্রত্যাশা করেনি। আরেকটু খেয়াল করতেই আশ্বস্ত হলো, আনায়ার কাছে সে নয় বরং আনায়া নিজেই তার কাছে এসেছে।
আর বাস্তবত এটাই সত্যি। শুরুতে রেড নামক মুসিবত থেকে ছাড়া পেতে,আনায়া বেশ কয়েকটা প্রার্থনা করে। কিন্তু হুট করেই ঝড়ের মাঝে তীব্র শব্দে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে,আর কেনীথ তাকে আরো নিজের মাঝে আগলে নেয়—ঠিক তৎক্ষনাৎ ঘুমে আচ্ছন্ন আনায়া নিজেও কিভাবে যেন, সম্পূর্ণরূপে নিজেকে বিসর্জন দেয় কেনীথের মাঝে। সে নিজেও তাকে আগলে জড়িয়ে ধরে,ঘুমিয়ে পড়ে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে তৎক্ষনাৎ আনায়াকে ছেড়ে দেয়। আলগোছে তার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এই মূহুর্তে আনায়া জেগে উঠলে তা মোটেও ভালোকিছু হবে না। আনায়ার উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেনো, সে আর নতুন করে কোনো সম্পর্কে জড়াতে চায় না। জীবনের যা চূর্ণবিচূর্ণ হবার ছিল, তা বোধহয় সবটুকু এক জীবনের অতীতেই ঘটে গিয়েছে।
আনায়ার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়াতে কিছুটা বেগ পেতে হলেও, সে তার ঘুমের কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়েই উঠে সরে দাঁড়ায়। তবে হুট করে আনায়ার হাট-পা উল্টেপাল্টে ছড়িয়ে কিছুটা নড়েচড়, আবার ঘুমিয়ে পড়তে দেখে, কেনীথের ভ্রু-জোড়া বেশ খানিকটা কুঁচকে যায়। এটা আবার কেমন ঘুমানো স্টাইল! সে যাই হোক,তার কাছে এসব নতুন কিছুও না।
যথারীতি আনায়ার গায়ে চাদরটা মেলে দিয়ে, কেনীথ গায়ে গামছা জড়িয়েই বাহিরে চলে যায়। যাক, বৃষ্টিটা তবুও থেমেছে। নিজের টিশার্টটা অন্তত এতক্ষণে শুকিয়ে গেলেও,বড়জোড় বেঁচে যাবে৷

সকালের খাওয়া-দাওয়ার পর্বও চুকে গিয়েছে। এখন শুধু গাড়িটা ঠিক করার ব্যবস্তা করতে পারলেই হলো। গ্রামের লোকজনের সাহায্যে কয়েকজন গিয়েছে মেকানিকালকে ডাকতে। গাড়িতে সব টুলস নেই বিধায়,কেনীথ চেয়েও আর সমস্যাটা সাড়াতে পারল না।
আপাতত কখন লোক আসবে,তারই অপেক্ষা। তবে বেশ খানিকটা সময় যে ব্যায় করতে হবে,এটা নিশ্চিত। কেনীথের চোখে-মুখে বাড়ি ফেরার তাড়া রইলেও,আনায়া দিব্যি খুশি মনে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে,নিজেকে নিচে পেয়ে বেচারী এটাও মনে করতে পারেনি—গতরাতে ঠিক হয়েছিল। আর যা ভাবতে গিয়ে বেগ পেতে হয়,সেসব বিষয় নিয়ে পড়ে থাকার মতো বান্দা আনায়া নয়।

আপাতত যাদের বাড়িতে থেকেছিল,সে বাড়ির দুটো পিচ্চি পিচ্চি আণ্ডাবাচ্চা সাইজের মেয়ের সাথে তার বেশ ভাব হয়েছে। কারণ বড় কিংবা তার সমবয়সী মেয়েদের নিজ ভাবনায় বেহেয়া ভেবে কেন যেন সহ্য করতে পারছে না।
এদিকে পিচ্চি মেয়েদুটো কোথায় থেকে যেন,তাকে কাঁচা তেঁতুল এনে দিল। অতঃপর তিনজন মিলে অনায়সে প্রফুল্ল চিত্তে, তেঁতুল খেতে খেতে আশেপাশে ঘুরে বেরিয়ে দেখতে লাগল।
এরিমধ্যে তার নজর পড়ল কেনীথের উপর। পরনে লুঙ্গির মতো পেঁচানো সুতি কাপড় আর উপরে কেবল গামছা জড়ানো। সে এবং গ্রামের আরেকটি ব্যক্তি একত্রে বাঁশের সাঁকোর কাছে বশে রয়েছে। হয়তো বাড়ি ফেরার বিষয়েই আলাপন চলছে। তবে আনায়ার নজর তখন কেনীথ হতে সরে গিয়ে পড়ল,সাঁকোর ওপাড়ে থাকা একঝাঁক অল্পবয়সী মেয়েদের দিকে। ঝোপঝাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে, নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে আর কেনীথকে দেখে হাসাহাসি করছে। তাদের ভাবভঙ্গিতে আনায়ার আর বুঝতে বাকি নেই,ঘটনা ঠিক কি ঘটছে।

নিমিষেই তার চোখমুখ শক্ত হয়। চোয়াল দৃঢ় করে দাঁত কিড়মিড়িয়ে একবার নির্লিপ্তে বসে থাকা কেনীথকে দেখে তো একবার দূরের সেসব মেয়েদের। কেনীথের উদ্দেশ্যে বিড়বিড়িয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বলে,
“পিঠ না হয় ঢেকে রেখেছে,সামনের পার্ট এভাবে দেখিয়ে দেখিয়ে হাওয়া খাওয়ানো মানে কি? অসহ্যকর!”
এরিমধ্যে পাশ থেকে মেয়েদুটো তার হাত টেনে ভিন্ন জায়গায় নিতে চাইলে,সে মানা করে দেয়। এবং তাদের অন্য কোথাও গিয়ে খেলতে বলে।
আনায়ার মেজাজ নিমিষেই খারাপ হতে লাগল। কেনীথ এখনো একই জায়গায় চুপচাপ বসে আছে দেখে,হাত-পা যেন জ্বলতে লাগল।

—“কি আশ্চর্য! এই লোক কি চোখে দেখে না? এভাবে কচি কচি বেহায়া মেয়েদের, উদাম গায়ে বসে বসে নিজের জাওয়ানি দেখাবে। কতবড় বজ্জাত! সরছে না কেনো এখনো।আআআআহ্!”
আনায়া আর সহ্য করতে পারল না। অজানা ক্রোধে একপ্রকার ক্ষেপে গিয়ে, সবকিছু ভুলে কেনীথের কাছে গেল। কি করবে জানে না। তবে চোখের সামনে এমন দৃশ্য সহ্য করাও তার পক্ষে সম্ভব না।
ক্রোধে ফুটতে থাকা আনায়া দ্রুত পায়ে বাঁশের সাঁকোর দিকে এগিয়ে যায়। কাছে গিয়ে কেনীথকে কয়েকবার ইতস্ততস্বরে ডাকে,

“এই যে শুনছেন? শুনছেন?”
​কেনীথ একবার মুখ তুলে তাকাল বটে, কিন্তু শুনেও না শোনার ভান করে নির্লিপ্তে বসে রইল। আনায়া তখন খেয়াল করল, কেনীথের পাশে মদের ফ্লাস্ক রাখা। নিশ্চিত গাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে তার আরও বেশি মেজাজ খারাপ হলো—কেনীথ কোনো সাড়া দিচ্ছে না দেখে।
​আনায়া দাঁত কিড়মিড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। পাশে বসে থাকা গ্রামের লোকটি অবশেষে বিষয়টা পরখ করে কেনীথকে বলল,
“আপনার স্ত্রী বোধহয় ডাকছেন।”
​কেনীথ এবার বেশ বিরক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আনায়ার কাছে এগিয়ে এলেও তার চোখে চোখ রাখল না।বরং নিচের দিকে তাকিয়ে বেশ কাঠখোট্টা স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“জ্বী, বলুন।”
​আনায়ার গা কিড়মিড় করে উঠল। কেন, তা সে নিজেও জানে না। হয়তো ওই ‘আপনি’ সম্বোধনে, কিংবা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার ভঙ্গিতে।
​পাশের লোকটি কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করে উঠল,
“আপনি আপনার বউকে ‘আপনি’ বলে ডাকেন?”
​কেনীথ পেছনে ফিরে কিছু বলতে উদ্যত হওয়ার আগেই, আনায়া চটজলদি জবাব দিল,
“না, না, বিষয়টা তেমন না। উনার মাথা গরম থাকলে এসব উল্টোপাল্টা ভাবেই ডাকেন।”
—“আচ্ছা আপনারা কথা বলুন। তবে আমি এখন আসছি।”
​লোকটি দু’জনের ব্যক্তিগত সময়ের প্রয়োজন ভেবে এবার উঠে দূরে চলে যায়।
এদিকে কেনীথ নির্লিপ্ত চোখে আনায়ার দিকে চেয়ে আছে দেখে সে অকস্মাৎ ভড়কে গেল। ক্রোধে ছটফট করতে থাকা আনায়া সহসাই আমতাআমতা করতে লাগল। তার ভাবভঙ্গি দেখে কেনীথ বলল,

“কিছু বলবেন?”
​আনায়া কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আ… মানে বলছিলাম, আপনি দূরে কোথাও গিয়ে বসুন। আ… আপনি বরং ঘরে চলে যান। জায়গাটা আপনার জন্য মোটেও সেফ না।”
​কেনীথ এই পর্যায়ে কপাল কুঁচকে একপলক আনায়াকে দেখল। পরক্ষণেই তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে, পুনরায় ঘুরে একই জায়গাতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসল।
​আনায়া তা দেখে আবার ক্ষেপে গেল। চাপা স্বরে প্রায় ফোঁস করে উঠল,
“কী হলো? বললাম না, দূরে কোথাও যান। দেখছেন না ওখানে মেয়েগুলো…”
​আনায়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই কেনীথ দাঁতে দাঁত পিষে, পাশে মুখ ফিরিয়ে আনায়ার উদ্দেশ্যে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
​”হোয়াই ডু ইউ রিয়েক্ট লাইক দ্যাট? ইউ নো না, আ’ম নান অফ ইউস্।”
কেনীথের কথায় আনায়া থমকে গেল। হুট করেই তার মন এক অজানা বিষাদে ভরে উঠল। কিছু বলতে চাওয়ার আগেই কেনীথ গম্ভীর্যের সাথে, বেশ বিরক্তি প্রকাশ করে, জায়গা ছেড়ে নিজেই চলে গেল। আনায়া কেবল পেছন হতে, ঠোঁট চেপে তাকে দেখতে দেখতে, মলিনভাবে ক্ষীণ হাসল।

​বিকেল হয়ে এসেছে, তবুও গাড়ি সারানোর জন্য কাজের মতো লোক, কাউকেই পাওয়া যায়নি। কেনীথ বেশ হতাশ হলো। এবার তাকেই কিছু একটা করতে হবে, নয়তো এখানেই আটকে থাকতে হবে। যা তার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়।
​তবুও গ্রামের লোকের কথায় সে সন্ধ্যা অবধি অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। এতক্ষণে কপালগুণে কালো টি-শার্টটা শুকিয়ে যাওয়ায় সে অনেকক্ষণ আগেই তা পরে নিয়েছে। আর কিছু না হোক, এই একটা দিক দিয়ে কিছুটা স্বস্তি মিলল।
​তবে সে চিন্তিত ভঙ্গিতে বিকেল বেলায় বাইরে আসতেই, মেজাজ কিছুটা বিগড়ে গেল। সকালের পর আনায়াকে আর সে নিজের আশেপাশেও দেখেনি। দুপুরের খাবারের সময়ও, সে আলাদাভাবে মেয়েদের সাথে খেয়েছে। কেনীথের অবশ্য স্বস্তিই মিলেছে, আনায়ার এমন দূরত্ব তৈরিতে।

​তবে বিকেল বেলায় চোখের সম্মুখে যা দেখল, তা মোটেও পছন্দ হলো না তার। সহসাই তার কপাল কুঁচকে গিয়ে, তীক্ষ্ণ নজর পড়ল আনায়ার দিকে। তার থেকে বেশ খানিকটা দূরে, কিছু যুবকের সাথে সে কথা বলছে। শুধু কথা নয়, বরং খিলখিল করে হাসতে হাসতে পারলে ছেলেগুলোর সামনেই গড়াগড়ি খাবে।
যদিও চার-পাঁচটা ছেলের মাঝে সে কেবল একা মেয়ে নয়, তার সাথে আরও একটি ছোট মেয়েও আছে।কিন্তু বিষয়টি তো তার মোটেও পছন্দ হলো না। বরং সহসাই চোখে-মুখে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্যের ছায়া নামল।
বিশেষ করে রাগ হলো আনায়ার বেখেয়ালিপনায়। দুপুরে গোসল সেরে সে আদিবাসীদের ভিন্ন রকমের এক শাড়ি পরেছে। পুরোপুরি শাড়ির মতো নয়; নিচের অংশটুকু টাইট স্কার্টের ন্যায়, আর উপরের একটি অংশ শাড়ির আঁচলের মতো করে পেঁচানো।

এতেও সমস্যা ছিল না, যদি এই পোশাকের জন্য আলাদা কোনো ব্লাউজ কিংবা স্কার্ফ থাকত।
আনায়ার একপাশের কাঁধ হতে হাত পুরোটাই উন্মুক্ত। চুলগুলো খোঁপা করে উঁচুতে বেঁধেছে। ফর্সা হাতের বাহু ও কাঁধের মাঝবরাবর নরম মাংসপিণ্ডে একটা কালো তিলও আছে, যেটা বেশ কড়াভাবেই চোখে পড়ার মতো।
​যদিও দূর হতে কেনীথের নজরে সেই তিল দৃশ্যমান নয়, তবে কেনীথ খুব ভালো করেই জানে, ছেলেগুলো কথার ফাঁকে ছড়িয়ে থাকা দৃষ্টিগুলো সেখানেই নিবদ্ধ হয়েছে। অথচ গাধাটা কিচ্ছু টের পাচ্ছে না। আবার গলার ভাঁজে দৃশ্যমান তিলটাও তো বাদ যাচ্ছে না। ওটা বোধহয় তার ব্যক্তিগত নিজস্ব জিনিস।
​কেনীথের ভাবনা অনুযায়ী এমনই ক্রোধ প্রকাশ পেল। সে চোয়াল শক্ত করে কিছু একটা করতে গিয়েও থেমে গেল। ইচ্ছে তো করছে আনায়াকে ধরে-টেনে এনে, গাল বরাবর কষিয়ে দুটো চ’ড় মেরে দিতে।
​তবে সে নিজেকে থামিয়ে নিল। সে আবারও পাগলামি করছে। না, না, এসবে তার কিচ্ছু আসে যায় না। আনায়া তার কেউ নয়, আর হওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই। সে এবার মুক্ত হতে চায়। আনায়া যা ইচ্ছে তাই করুক, তাকে বাধা দেওয়ার নূন্যতম ইচ্ছেও তার নেই।

​এমনই সব মনগড়া ভাবনাচিন্তায় নিজেকে সংযত করে কেনীথ নজর ফিরিয়ে নিল। তবে এখানে থাকার ইচ্ছেটাও কেন যেন মরে গেল। সে খানিকটা জোরপূর্বকই গ্রামের অন্যদিকটায় চলে যেতে উদ্যত। যতই বলুক, আনায়ার বিষয়ে তার কিচ্ছু যায় আসে না, কিন্তু সত্যিটা হলো, হাত তার এখনো নিসপিস করছে আনায়াকে দশ-বারোটা চড়-থাপ্পড় মারার জন্য।
পাঁচ-দশ মিনিট অতিবাহিত না হতেই, আকাশ ভেঙে নেমে এলো এক প্রবল বর্ষণ। চতুর্দিক থেকে ধূসর ঘন মেঘের দল উড়ুউড়ু হয়ে এসে, প্রকৃতিকে নিমেষে সিক্ত করে দিল। কেনীথ বেশিদূর অবধিও এগোতে পারেনি। তবে সদ্য পরা শুকনো টি-শার্টটি এবার ভিজে যাক, তা সে চায়নি; তাই ঘরে ফেরার চিন্তা করেও শেষমেশ আর এগোল না।বরং পেছন ফিরতেই তার দৃষ্টি সহসা এক দৃশ্যে স্তম্ভিত হলো।
​বৃষ্টির প্রথম স্পর্শে আনায়ার সেই বাঁধনহারা চঞ্চলতা, ছোট মেয়ে দুটিকে নিয়ে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে যাওয়া—এসব দেখে সে স্তব্ধ। সে যেন ভুলে গেছে তার বয়স; বাচ্চাদের মতো প্রফুল্লচিত্তে খিলখিল হাসিতে মেতে উঠেছে এই বর্ষণের মধ্যে। ভেজা শাড়িটি তার শরীরে লেপ্টে আছে। উন্মুক্ত কাঁধ আর বাহুর সেই কালো তিল যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বৃষ্টির জলে তার উচ্ছলতা কেবল তীব্র নয়, এক অলৌকিক দীপ্তিতে উদ্ভাসিত। কেনীথ এক অজানা নিবেশিত মুগ্ধতায় তাকে দেখতে লাগল। নিজের পরনের টি-শার্ট যে ভিজে শীতল হয়ে শরীরে এঁটে বসেছে, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। যেন তার সমস্ত চেতনা ও দৃষ্টি কেবল ওই দৃশ্যপটেই নিথর হয়ে আছে।
​কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্ত দীর্ঘস্থায়ী হলো না। কাদামাটির পথে দৌড়াতে গিয়ে আনায়া হঠাৎই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সশব্দে ধপাস করে পড়ে গেল। যেন কোমরটাই বুঝি ভেঙে গেল!
​কেনীথ তৎক্ষণাৎ তটস্থ হয়ে, এক পা এগিয়ে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু পরক্ষণেই থমকে গেল। কারণ, ততক্ষণে ছোট মেয়ে দুটো হতবিহ্বল হয়ে দেখছে বটে, কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকদের মাঝে একজন মুহূর্তের মধ্যে ছুটে এলো আনায়ার দিকে। আনায়া সামান্য ইতস্তত করলেও, ছেলেটি দ্রুত হাতে তাকে আগলে ধরে সাবধানে তুলে দাঁড় করালো।
​এই দৃশ্য দেখামাত্র কেনীথের ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা মুগ্ধতার রেশটুকু কর্পূরের মতো উবে গেল। তৎক্ষণাৎ তার দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠল। কাঁধ কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে, ঘাড়ে হাত ঘষে পাশে নজর ফিরিয়ে নিজেকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা করল সে। সেই মুগ্ধতার স্থানে যেন মুহূর্তেই তিক্ততা ও ক্রোধের কালশিটে পড়ল।

কিছু বাড়ির পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে ছিল কেনীথ। তখনো বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম। সে ভিজে চুপসে এক প্রকার স্থির। আর দূর হতে আনায়াকে সাহায্য করা সেই ছেলেটি তারই দিকে এগিয়ে আসছে। তার ভাবভঙ্গি এমন যে, এই পথ ধরেই অন্য কোথাও যাবে। অথচ ছেলেটি কেনীথের কাছে আসা মাত্রই, সে আচমকা শিস বাজিয়ে ওঠে। ছেলেটির ধ্যান তার দিকে ফিরতেই, সে যেন বেশ কিছুটা ভীত হলো।
​কেনীথের ইশারা মতো সে তার কাছে ইতস্তত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“জ্বী, ডাকছিলেন? কোনো প্রয়োজন?”
​তীক্ষ্ণ চোয়াল শক্ত করে, কেনীথ ছেলেটির দিকে দু’পা এগিয়ে এলো।তার কাঁধে এক হাত চাপড়ে,শান্ত-গম্ভীর কন্ঠে চাপা স্বরে বলল,
“যতটা পারো, দূরত্ব বজায় রাখো!”
​তার কথা না বোঝার ভাণ করে ছেলেটি বলে,
“মানে?”
​কেনীথ ক্ষীণ তির্যক হাসল।

—“সৌন্দর্য দেখলেই কৌতূহল জাগবে, স্বাভাবিক। কিন্তু সে কৌতূহল যদি অন্যের সম্পত্তির ওপর জন্মায়—আর সেটা জানার পরও যদি কেউ এমন উৎফুল্ল হয়—তবে বুঝতে হবে সে লক্ষণ মোটেই ভালো নয়।”
​এই পর্যায়ে ছেলেটি খানিক তেজ দেখিয়ে বলল,
“কী বলার স্পষ্ট করে বলুন।”
​কেনীথ তার সেই তেজে বিচলিত না হয়ে, বরং চোয়াল আরও শক্ত করল। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘাড় চেপে ধরে, তীব্র চাপা স্বরে সে আওড়াল,
“আমার জিনিসকে ছুঁয়ে দেখার সাহস হয় কী করে?”
ছেলেটি বিষয়টা খানিক আন্দাজ করে নিয়ে বলল,
“কী আশ্চর্য, উনি পড়ে গিয়েছিলেন।আর আমি শুধু…”
​”আমি ছিলাম ওখানে। তোর না গেলেও চলত।”
​”দেখুন, ওখানে আরও ছেলেরা ছিল। আপনার স্ত্রী নিজেই আমাদের সাথে কথা বলেছে। তাহলে শুধু আমাকেই…”
​”হ্যাঁ, আমি শুধু তোকেই ধরে নিয়ে এসেছি। মানুষ চেনাতে আসবি না আমায়। তোর চোখের প্রতিটি দৃষ্টি কোথায়, কীভাবে যাচ্ছিল, তার সবটাই আমার নজরে এসেছে।”

​—“আপনি কিন্তু এবার বেশি বেশি করছেন। আমাদের গ্রামে এসে আবার আমাকেই…”
​”সো হোয়াট? আমার চোখের সামনেই আমার জিনিসের দিকে তুই কুদৃষ্টিতে তাকালি, তাকে ছুঁয়ে অবধি দেখলি! এরপরও বলবি আমি এসব চুপচাপ সহ্য করব?”
​কেনীথ ছেলেটার ঘাড় আরও শক্ত করে চেপে ধরতেই, সে যন্ত্রণায় এক প্রকার কুঁকড়ে যায়। অথচ কেনীথ তখনও নির্লিপ্ত স্বরে বলে যায়,
“এবারের মতো ছেড়ে দিচ্ছি। আমরা চলে যাওয়া অবধি ওর আশেপাশেও যেন না দেখি। তোর দলের বাদবাকি ছেলেদেরও বলে দিবি।”
​এই বলেই কেনীথ হঠাৎ তাকে ছেড়ে দেয়। ছেলেটি ছাড়া পেতেই, ভয় আর যন্ত্রণায় দৌড়ে ছুটে চলে যায়। সে যেতেই ভারী ভারী শ্বাস ফেলতে থাকে কেনীথ। অকস্মাৎ মাথা ধরে আসতেই, মাথা ঝুকিয়ে চোখমুখ খিঁচে নেয় সে। ততক্ষণে নাকে হাত ছুঁইয়ে দেখে, আঙুলের ডগায় সামান্য র’ক্তের দাগ। যা বৃষ্টির পানির সাথে নিমিষেই মিশে যায়। এসব দেখে কেনীথ তীব্র বিরক্তির স্বরে আওড়ায়, “ড্যাম…!”

কাদামাটি মেখেও, আনায়া তখনো নিজের মতো করে বৃষ্টিতে ভিজছিল। এরিমধ্যে কোথা থেকে একটি ছোট মেয়ে এসে জানাল, তার স্বামী নাকি তাকে ডাকছেন; এই মুহূর্তে তাকে ঘরে যেতে বলা হয়েছে। ‘স্বামী’ বলতে কেনীথের কথাই বলছে ভেবে আনায়া তৎক্ষণাৎ স্থির হলো। কিন্তু তাকে কেন ডাকছে? তবে কি চলে যাওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পেয়েছে? গাড়ি ঠিক হয়ে গিয়েছে? কিন্তু কখন?
​আনায়া দ্বিধা ও কৌতুহল নিয়ে সম্পূর্ণ ভেজা, সিক্ত গায়ে ঘরে প্রবেশ করল। গায়ের সঙ্গে হালকা গোলাপি-সাদা শাড়িটি সম্পূর্ণ রূপে লেপ্টে আছে, যা তার শরীরের প্রতিটি রেখা স্পষ্ট করেছে। আলগা খোঁপার এলোমেলো চুলগুলোও ভিজে জুবুথুবু হয়ে কপাল জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
​তবে সে ঘরে প্রবেশ করেই ভড়কে গেল। কেনীথ কেবলই নিজের ভেজা টি-শার্টটি খুলেছে, আর ওমনি সে এসে ঘরে ঢুকেছে। ফলস্বরূপ, কেনীথের ভেজা-সিক্ত উদাম দেহ দেখে আনায়া যেন স্তম্ভিত। দ্রুত ইতস্তত হয়ে আমতাআমতা স্বরে বলে উঠল,

“আ…সরি, আমি একটু পর আসছি…”
​এই বলেই সে চলে যেতে উদ্যত, আর ঠিক তৎক্ষণাৎ তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে কেনীথ পাশ ফিরে তাকাল। শীতল কণ্ঠে বলল, “স্টপ!”
​আনায়া তার কথায় থেমে গেল। তবে কেনীথের দিকে আর মুখ তুলে তাকাল না। বরং দৃষ্টি নত করে দাঁড়িয়ে রইল। এদিকে কেনীথ নিজের ভেজা-সিক্ত উদাম শরীরেই তার দিকে এগিয়ে এলো। আনায়া তাতে চকিতে কম্পিত হলো। অথচ কেনীথ সম্পূর্ণ নিরুদ্বেগ। তার ভেজা ঘন চুল হতে অনায়াসে জল ঝরছে; কপাল বেয়ে ভেজা চুলগুলো এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে আছে।
​সে আনায়ার থেকে কিঞ্চিৎ দূরত্ব বজায় রেখে বলল,
“আর বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
​তার কথায় আনায়া তৎক্ষণাৎ ভ্রুকুটি করে মুখ তুলে তাকাল। ক্ষণিক সময় নিয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বলল,

“আমি কেন আপনার কথা শুনব? আমি যা ইচ্ছে তাই করব, আপনি বলার কে?”
​এই বলেই সে কেনীথকে অগ্রাহ্য করে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে, কেনীথ মুহূর্তেই তার বাহু চেপে ধরে এক হেঁচকা টানে নিজের দিকে কাছে নিয়ে এলো। আনায়া ভড়কে গিয়ে তার উন্মুক্ত, উষ্ণ গায়ে একপ্রকার আছড়ে পড়ল।
সে ভীতু, ছলছল চোখে কেনীথের তীক্ষ্ণ-গম্ভীর দৃষ্টির দিকে তাকাল। কেনীথ কিছু বলল না, তার চোয়াল শক্ত, চোখে-মুখে স্পষ্ট কাঠিন্যের ছাপ।
​তবে কিছুক্ষণের মাঝেই আনায়ার অনুভূতির মিশ্র প্রতিক্রিয়া ঘটল। ব্যাথায় সে অস্ফুটস্বরে বলল,
“ছাড়ুন, ব্যথা পাচ্ছি।”

​কেনীথ তা শোনামাত্রই আরও সজোরে তার হাত চেপে ধরে,নিজের কাছে খিঁচে নিয়ে এলো। আনায়ার সেই ব্যাথাতুর, ছলছল নজরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। পরক্ষণেই তার হাতের দৃঢ়তা খানিকটা স্থির হলো। একইসাথে এক অবাক কাণ্ড করে বসল।
​ডান হাতটা অনায়াসে আনায়ার গাল অবধি চলে যায়। ফোলা ফোলা ভেজা গালের ওপর আচমকা হাতের উল্টো পিঠের পরশ পড়তেই, আনায়া অজান্তেই মৃদু শিউরে উঠল। চোখ-মুখ সামান্য খিঁচে নিতেই, তার ঠোঁটজোড়া কেঁপে ওঠে। কেনীথের নজর সরে গেল তার কম্পিত ঠোঁটের দিকে।
​একইসাথে গাল হতে হাতটা ঠোঁট অবধি সরে এলো।
আনায়ার মস্তিষ্ক যেন শূন্য হতে লাগল। সে ক্ষীণ, ক্ষীণ শ্বাস ফেলে তাকে দেখতে লাগল। অন্যদিকে কেনীথ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তার ভেজা কম্পিত ঠোঁটের কোণে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি ছোঁয়ায়। আলতোভাবে ঠোঁটে আঙুল ঘষে দিতেই, আনায়া বেশ খানিকটা কেঁপে চমকে উঠল।

সে কেনীথের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিতে নিতেই, তার নজর গিয়ে ঠেকল বাহু ও কাঁধের মাঝবরাবর জ্বলজ্বলে বড়সড় কালো তিলটার দিকে। একইসাথে গলার তিলটাও দৃষ্টির অগোচর হলো না। যেন আজ বহু কাল পর সে পুনরায় আনায়াকে পরীক্ষণ করছে; যার মহামায়া হতে সে চেয়েও পুরোপুরি মুক্তি পায়নি।
​কেনীথের এলোমেলো দৃষ্টিসকল তিলগুলোতে নিবদ্ধ হতেই, সে শুষ্ক ঢোক গিলল। এরিমধ্যে আনায়া এক অভাবনীয় কাণ্ড করে বসে। কেনীথ যে কেবল আনায়াকে দেখছিল, বিষয়টা তা নয়। বরং কেনীথের ফর্সা বুক হতে অ্যাবস অবধি ভেজা গায়ে লেপ্টে থাকা ক্ষীণ ক্ষীণ সকল বিন্দুতে আনায়ারও দৃষ্টির বিচরণ ঘটছিল। মাথা নুইয়ে নিজেকে তটস্থ রাখার শেষ চেষ্টা ছিল বটে, কিন্তু সে-ও হয়েছে ব্যর্থ।
কেনীথের ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে, সে কোন জগতে হারাল কে জানে। কেনীথের দৃঢ়তায় হাতে থাকা ব্যাথাটাও যেন গায়েব হয়ে গেল। মাঝ থেকে অকস্মাৎ হাত বাড়িয়ে, কেনীথের কপালে ছড়িয়ে থাকা ভেজা চুলগুলো কাঁপাকাঁপা হাতে ছুঁয়ে দিয়ে অস্ফুটস্বরে আওড়াল,

“আ…আপনার চুলগুলো সুন্দর।”
​অমনি কেনীথ তটস্থ হলো। আনায়াকে একপলক ভ্রুকুটি করে দেখে নিয়ে, অকস্মাৎ তাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গেল। এমনকি সোজা ঘর হতে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়ে বলল,
“দ্রুত ড্রেস চেঞ্জ করে, ঘরেই বসে থাকুন। বাইরে যেন যেতে না দেখি।”
​এদিকে আনায়াও তটস্থ হয়ে,গলায় জোর দিয়ে বলে ফেলল,
“ইহ্, বললেই হলো! আমি কেন আপনার কথা শুনব? আপনি তো ঠিকই…”
​আনায়ার কথা সমাপ্ত হবার আগেই, কেনীথ আনায়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

মহামায়া পর্ব ১৭

“আমি যা বলব, তাই করবি!”
​এমনই এক স্পষ্ট অধিকারবোধ দেখিয়ে সে ঘর ছেড়ে চলে গেল। এদিকে আনায়া বিস্ময়ের সহিত তার যাবার পানে চেয়ে রইল। ‘আপনি’ থেকে সোজা ‘তুই’? আনায়া নিজের হাতের দিকে ফিরে তাকাতেই আঁতকে উঠল। বজ্জাত পাখিটা হাতের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে গেল। ফর্সা হাতে দৃঢ় আঙুলের ছাপগুলো, সম্পূর্ণ স্পষ্ট আকারে লালচে হয়ে জ্বলজ্বল করছে।

মহামায়া পর্ব ১৯