Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ১৯

মহামায়া পর্ব ১৯

মহামায়া পর্ব ১৯
তুশকন্যা

রাতেবেলায় গ্রামে আদিবাসীদের আসর জমেছে। আকাশে তারার মেলা। বিকেলের প্রবল বর্ষণের পর রাতে এমন তারার সমাহার যেন সত্যিই এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। আনায়া এতে বেশ বিস্মিত হলো। কেনীথের কথামতো সে চেয়েও আর এক পা ঘরের বাইরে রাখেনি।
কিন্তু মধ্যরাতের অনেক আগেই রাতের খাবার শেষ হওয়ার পর, এমন আয়োজনে সে আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি। কেনীথের কাছ থেকে আলাদা করে কোনো অনুমতি তো নেয়নি, তবে তার সিদ্ধান্ত এমন ছিল—যদি কেনীথের হাবভাব বেগতিক মনে হয়, তবে আবারও ঘরে চলে আসবে।

​চারপাশের ছেলে-মেয়ে সকলে গোল হয়ে বসেছে, মাঝে আগুন জ্বালিয়ে এক মনোজ্ঞ আয়োজন চলছে। অনেকে নানান রকমের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে অদ্ভুত নতুনত্বে বিভিন্ন সুর তুলছে। গায়ে স্কার্ফ জড়িয়ে, মেয়েদের সাথে এমনই এক কোণে বসে বসে সবটা উপভোগ করছে আনায়া।
এদিকে তাদের থেকে খানিকটা দূরে,এক কোণে বাঁশের খাম্বার সঙ্গে ঠেস দিয়ে, নির্বিকারে দাঁড়িয়ে মদ্যপানে মগ্ন কেনীথ। তার নির্লিপ্ত, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দূর হতে সকলের মাঝেই নিবদ্ধ; যেন কিছু একটার সামান্য হেরফের হলেই সে বড় কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

​সময় ক্রমশই দীর্ঘ হচ্ছে। আজ সারাটাদিন এসব করেই কেটে গেল। কাজের মতো কাউকেই এখানে নিয়ে আসতে পারেনি। সামান্য প্রয়োজনীয় ম্যাকানিক্যাল টুলস যে নিয়ে আসবে, সেই উপায়ও হয়নি। এদের ভরসায় পুরো একটা দিন নষ্ট করল ভেবে, কেনীথ বড়ই হতাশ। আর দেরি না করে, আগামীকাল নিজেকেই এবার বের হতে হবে।
তবে তার শরীরটাও ভালো নেই। রাঙামাটি এসেছিল এক বিশেষ কাজে, কাজ শেষে সেদিনই বাড়ি ফিরত। তাই সাথে করে নিজের ঔষধগুলো নিয়ে আসা হয়নি। সারাদিন পেরিয়ে গেল, অথচ নির্দিষ্ট ঔষধ না নিয়ে সে এইসব ছাইপাঁশ খাচ্ছে। মাথা-শরীর কোনোটাই যে আর ঠিক থাকবে না, এটাই তো স্বাভাবিক।

​এরিমধ্যে দূর হতে একটি ছেলে তার কাছে এগিয়ে এলো। আনায়াও নজর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তাকে খেয়াল করছিল। ছেলেটি কেনীথের দিকে এগিয়ে যেতেই, আনায়া দ্রুত আসর হতে নজর সরিয়ে, তাদের দিকে মনোযোগী হলো।
​এদিকে ছেলেটি কেনীথের কাছে এসে বলল, তার গিটারটি আনা যাবে কিনা। যদি কোনো সমস্যা না থাকে, তবে তাদের যেন একটি গান শোনায়। কেনীথ শুরুতে মানা করতে চেয়েও আর করল না। বরং সে ছেলেটির হাতে মদের ফ্লাস্কটি দিয়ে, ঘর থেকে গিটারটি আনতে গেল।
​কেনীথ ফিরে আসতেই দেখল ছেলেটি কেমন যেন ইতস্তত করছে। বিষয়টা ঠিক বুঝল না সে। আবার পরক্ষণেই চোখ পড়ল তার থেকে কিছুটা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আনায়ার দিকে। হঠাৎ সে এখানে কখন এলো, তাও জানা নেই। কেনীথ কিঞ্চিৎ ভ্রুকুটি করে ছেলেটির হাত থেকে মদের ফ্লাস্ক নিয়ে, আনায়াকে না দেখার ভাণ করে, সবার মাঝে এগিয়ে যেতে উদ্যত হলো।

এরিমধ্যে হঠাৎ একবার মদের ফ্লাস্কে মুখ লাগাতেই তার ভ্রু-জোড়া কুঁচকে গেল। পানীয়ের স্বাদ তার পরিচিত নয়। পেছন ফিরে ছেলেটির উদ্দেশ্যে ভারিক্কি স্বরে কিছু বলবে তার আগেই সে আমতাআমতা করে বলল,
“আমার কোনো দোষ নেই, আমি কিছু করিনি।”
​তার কথা শেষ হতে না হতেই, পাশ থেকে আনায়া সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“হ্যাঁ, ওনার কোনো দোষ নেই। আর ওসব ছাইপাঁশ খাওয়াও ঠিক না। তাই ফেলে দিয়ে ওতে খাঁটি বিশুদ্ধ পানি ঢেলে দিয়েছি। আশা করি আপনি খুশি না হলেও, আপনার স্বাস্থ্য খুশি হবে।”
​তার এহেন অতিরঞ্জিত নাটকীয় ভাবভঙ্গিতে কেনীথের চোয়াল সহসাই শক্ত হলো। দাঁতে দাঁত পিষে চেয়ে রইল আনায়ার দিকে। অন্যদিকে আনায়া কোনোকিছুই না বোঝার ভাণ করে নির্বিকারে আবারও সবার মাঝে এগিয়ে গেল। ছেলেটিও আর ভয়ে বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না।

​ছেলেরা একপাশে এবং মেয়েরা অন্যপাশে, গোল হয়ে বসেছে। তবে আনায়ার ঠিক মুখোমুখি হয়ে বসেছে কেনীথ। যদিও বসেছে বললে ভুল হয়, তাকে যেন এক প্রকার জোর করেই ওইখানে বসানো হয়েছে। এতে কেনীথের বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া না রইলেও, আনায়ার অনেক মজা লাগছে কেনীথের গম্ভীর মুখটা সরাসরি দেখতে পেয়ে।
সে ঠোঁট চেপে মিটমিট করে হাসছে।
​এরিমধ্যে কেনীথ শান্তভাবে গিটারটা ঠিকমতো ধরল। আশেপাশে না তাকিয়ে, ভাবতে লাগল কোন গানটা গাওয়া যায়। জলে ভিজে গিটারটির সামান্য বেহাল দশা হয়েছিল, তবে এখন তা ঠিক আছে।
​তবুও সে পরীক্ষা করে নিয়ে, হালকা শব্দে গিটার বাজাতে শুরু করল। এরপর সে আকাশের দিকে তাকিয়ে, গাইতে লাগল—

‘ভেবে দেখেছো কি
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে
naa jane koi____
kaisi hai ye zindagani zindgani,
hamari adhuri kahani____
naa jane koi,
kaisi hai ye zindagani zindgani
hamari adhuri kahani____’

​এই গানটি তার সাথে গলা মিলিয়ে, সকলেই গাইল। অনেকে তার কণ্ঠস্বরের প্রশংসা করল। সে পেশাদার গায়ক কিনা, অনেকে জিজ্ঞেস করলেও, কেনীথ চুপ রইল। বাকি সকলের মতো আনায়া নিজেও মুগ্ধ হলো।
​এদিকে কেনীথ ভেবেছিল হয়তো তার গান গাওয়া শেষ। কিন্তু সকলের অনুরোধে তাকে আরেকটি গান ধরতে হলো। কেনীথ এবার নিজের গম্ভীর ভাবমূর্তি আরও কঠোর করে গাইতে শুরু করল,

​”আমাকে কে নে তোর গানে,আর মনের দুনিয়ায়নে আমাকে অকারণে,তোর শব্দ শুনি আয়।
এঁকেছি এক সূর্য দেখ,যার উষ্ণতা দারুন
আমাকে নে সে বারণে,আর তোর আবছায়ায়।
বরবাদ হয়েছি আমি তোর অপেক্ষায়,
চুরমার করে দে আরোও কিছু ইশারায়!”
​কেনীথের এই গানে সকলে আগ্রহী হলেও, আনায়া কিছুক্ষণের জন্য যেন থমকে গেল। কেনীথ তার দিকে একবারও ফিরে না তাকালেও,আনায়ার বিষন্ন চোখজোড়া কেবল তার দিকেই।
এদিকে সবাই আনায়াকে কিছু গাইতে বললে, সেও সকলকে একপ্রকার অবাক করে দিয়ে গেয়ে উঠল,

​”ওওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে,
আমি হয়ে গেছি তারা!
এই জীবন ছিল____
নদীর মতো গতিহারা,
এই জীবন ছিল____
নদীর মতো গতিহারা, দিশাহারা!
ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে
আমি হয়ে গেছি তারা___!”
​আনায়া সম্পূর্ণ গানটুকু মৃদু মৃদু হেসে, দু’হাত পায়ের উপর রেখে, কেনীথের নিগূর চোখজোড়ার দিকে তাকিয়েই গেয়ে ফেলল। অথচ কেনীথ তখন স্তম্ভিত ও গম্ভীর চোখে তার দিকে চেয়ে। এরিমধ্যে সবাইকে চমকে দিয়ে, সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তাকে চলে যেতে দেখে আনায়াও ভড়কে গেল। কিন্তু কিছু করার আগেই, কেনীথ পা বাড়িয়ে বলল,

​”আমার ঘুম পেয়েছে। ভোর বেলায় যেতে হবে।”
​তার এমন আচরণে না চাইতেও আনায়ার মন খারাপ হয়ে গেল। সেখানে আর থাকার ইচ্ছে না হওয়ায়, ঘুমের বাহানা দিয়ে সে-ও আসর ছেড়ে চলে গেল।

​ভোর হয়ে এসেছে। কেনীথ তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গাড়িতে গুছিয়ে নিয়েছে। সে নিজেও প্রস্থানের জন্য প্রস্তুত। না, গাড়ি সারানোর কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বরং একটি বাইক জোগাড় হয়েছে। আপাতত এটি দিয়ে আনায়াকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে, শহর থেকে মেকানিকের কাউকে নিয়ে আবারও এখানে ফিরে আসতে হবে। পরবর্তীতে তবেই গাড়ি সারিয়ে তুলে সে ফিরতে পারবে।
​এমনই পরিকল্পনায়, আনায়া কিছুটা হতাশ মনেই ভোর সকালে তৈরি হয়ে নিল। যে জামাকাপড় পড়ে এখানে এসেছিল,সেটাই গ্রামের লোকজন অনেক যত্নে তা ধুয়ে শুকিয়ে রেখেছিল। আনায়া সেগুলোই পরিধান করল। কোমর অবধি ছোঁয়া সিল্কি চুলগুলো আলগাভাবে খোঁপা বেঁধে নিল।

গ্রামের সকলে এগিয়ে এলো তাদের বিদায় জানাতে।কেনীথের মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর না থাকলেও, আনায়ার মন খারাপ হলো। ছোট ছোট দু-চারটি বাচ্চা মেয়ে এসে, তাকে বাঁশের ছোট্ট একটি ঝুড়ি উপহার দিল। যাতে কিছু কাঁচা তেঁতুল, বড়ই সহ পাহাড়ি টক ফল আছে।
আনায়া সেগুলো দেখে অত্যন্ত খুশি হয়। সবমিলিয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তরিকতা বোধহয় এই শিশুদের সাথেই তার গড়ে উঠেছিল।যাবার আগে মন খারাপ হলেও, শেষমেষ তাকে মোটরবাইক অবধি চলেই আসতে হলো।
তাকে দেখামাত্রই, কালো টি-শার্ট,জ্যাকেট, প্যান্ট পরিহিত কেনীথ, নির্লিপ্তভাবে হেলমেটটা এগিয়ে দেয়। আনায়া সেটি পরতে চেয়েই বিপত্তিতে পড়ল। ঠিকমতো পরতে না পেরে, উল্টো তার আলগা খোঁপা বাঁধা চুলগুলো খুলে গেল।

​পাশে ফিরে এসব দেখতে পেয়ে, কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলল। ভ্রুকুটি করে বাইক থেকে নেমে আনায়ার হাত থেকে হেলমেটটা নিয়ে নেয়। আনায়া তার পদক্ষেপে চমকে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয়। ভীতু ভীতু আঁড়চোখে চেয়ে থাকে গম্ভীরমুখো কেনীথের দিকে। অথচ কেনীথ সম্পূর্ণ নির্বিকার।
​এরিমধ্যে কেনীথের আলতো হাতের স্পর্শ গিয়ে ঠেকে আনায়ার চুলে। কপালের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো অদ্ভুত এক আবেশে ঠিক করে দিতে থাকে সে। তার দৃষ্টি আনায়ার ডাগরডোগর, ভীতু চোখজোড়ায়।যা ক্রমান্বয়ে তার পরশে ভেজা সিক্ত হয়ে উঠেছে।
অথচ কেনীথ সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে হেলমেটটা তাকে পরিয়ে দিয়ে, তৎক্ষণাৎ আনায়ার জলেভেজা চোখদুটো হতে নজর সরিয়ে নিল। হেলমেটের ফ্রন্ট গ্লাস অবাধে বন্ধ করে দিয়ে, সে পুনরায় বাইকে চড়ে বসল।
​আনায়াও আর দেরি না করে, শুষ্ক ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে, কেনীথের পেছনে বসল। প্রথমে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখলেও, বাইক স্টার্ট দিতেই দু’জনের দূরত্ব ঘুচে গেল। আনায়া কেনীথের পিঠের সঙ্গে লেপ্টে বসল। কেনীথ কিছু না বললেও, গাড়ি চলার সাথে সাথে আনায়ার ডান হাতটা গিয়ে কেনীথের কোমর জড়িয়ে ধরে। যা কেনীথ দেখেও না দেখার ভাণ করল।

​বিস্তৃত সবুজে ঘেরা আবহে, পাকা রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে একটি মোটরবাইক। তাতে আরোহণ করা ব্যক্তি দু’জনের মাঝে চলছে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেনীথের ভাবগম্ভীর্য দৃঢ় রইলেও, পথ যতই অতিক্রম হচ্ছে আনায়ার মন ততই বিষিয়ে যাচ্ছে। তার মন চায়ছে, এই পথ যেন আর কখনো শেষ না হয়। কেননা পথ ফুরিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো মাত্রই দুজনের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটবে। আবার কি কখনো দেখা হবে? হলেও তা কোন কিভাবে?
​আনায়ার এমন চিন্তাভাবনার মাঝেই, একবার ভাবল শেষবারের জন্য কেনীথের সাথে কিছু কথা বলা যায় কিনা। তবে অধিক সংকোচ ও দ্বিধার চাপে সে আর কিছুই বলতে পারল না। এভাবেই দুজনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, নির্দিষ্ট শহরের বাস স্টেশনে চলে এলো। নেটওয়ার্ক মিলতেই, আনায়া সবার আগে সায়েমকে তার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে। তাকে নিতে এই পাহাড়ি বাস স্টেশনেই তার বন্ধুরা আসবে।

​বাইক থামতেই, আনায়া চারপাশে নজর ফিরিয়ে দেখল, দূরে দূরে বাসের পাশাপাশি মানুষজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তার বন্ধুদের খোঁজ করতেই, দূরের এক কোণে দুজন সুঠাম দেহের যুবককে দেখা গেল। সাথে জিন্স ও কামিজ পরা একটি মেয়েও আছে। আনায়ার বুঝতে বাকি রইল না এরা কারা। তিনজনের উৎসুক দৃষ্টি আনায়ার মতোই কারো খোঁজ চালাচ্ছে।
​আনায়া আর দেরি না করে, সব ভুলে বাইক থেকে নেমে পড়ল। তার পাশাপাশি কেনীথ নিজেও নামল।আনায়া কেনীথের উদ্দেশ্যে অমনোযোগী স্বরে বলল,

“আমার বন্ধুরা…”
​আনায়া নিজের কথা সম্পূর্ণ না করেই দ্রুত তাদের দিকে ছুটে চলল। কেনীথ একটি ভারী শ্বাস ফেলে তার কার্যক্রম দেখল। তবে আনায়ার সাথে আর খুব বেশি একটা এগিয়ে গেল না। নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে হেলমেটটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
​এদিকে আনায়া হাতের ঝুড়িটা কোনোমতে আগলে রেখেই, রনক, সায়েম আর আলোর কাছে যেতেই, তারাও তাকে দেখে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এলো। আলো এসে তাকে জাপটে জড়িয়ে ধরল। রনক স্থির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলেও, সায়েম তখন তার মাথায় জোরেশোরে বারি মে’রে বলল,
“হতচ্ছাড়ী, জীবনটা ত্যানা ত্যানা বানিয়ে দিয়েছিস। কোথায় ছিলি এই দুইদিন? খুঁজতে খুঁজতে জান বেরিয়ে গেছে আমাদের।”

​তার কথা শুনে আনায়া চোখ পিটপিট করে রাগান্বিত চেহারার সায়েমকে দেখল। তার কথার জবাবে কী বলবে বুঝতে পেল না। উল্টো ভিন্ন একটি বিষয় মনে পড়তেই, ভীত স্বরে বলল,
“আমি যে নিখোঁজ হয়েছিলাম, এসব ঘটনা আমার বাড়ির কেউ জানে? তোরা আবার কাউকে কিছু বলিসনি তো?”
​তার কথায় সায়েম নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“জানবে না মানে, গত রাতে উপায় না পেয়ে তোর মাকে জানানো হয়েছে। আবার আজ সকালে তোর খোঁজ পেয়েছি, সেটাও জানিয়েছি। সো, চিন্তা করিস না। সময় করে ধীরেসুস্থে ফোন দিয়ে তার সাথে কথা বল।”
​তার এহেন নির্লিপ্ত অভিব্যক্তিতে, আনায়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে বিস্ময়ের স্বরে বলল,
“মানে? এটা কী করেছিস তোরা?”
​পাশ থেকে রনক ভ্রুকুটি করে বলল, “কেনো, কী হয়েছে?”

​—“বাবা এসব জানলে আমায় সোজা মে’রে ফেলবে। তোদের জানা আছে তো বাবা আমার সাথে কী করবে? সারাজীবনে মতো বাড়ির বাহিরে বেরোনো ঘুচিয়ে দেবে।”
​—“আনায়া এসব কথা আপাতত থাক। তোকে খুঁজে পাওয়াটা জরুরি ছিল। নয়তো আজ আমরা পুলিশের কাছে ডায়েরি করতে যেতে চেয়েছিলাম। যাক, তুই ঠিক আছিস এটাই শুকরিয়া। বাই দ্য ওয়ে, তুই ছিলিটা কোথায়? সকালে খালি ফোন দিয়ে বললি, তোকে যেন নিতে আসি। আর তো কিছুই জানা হয়নি।”
​আলোর কথায় আনায়া ইতস্তত হয়ে বলল,
“আ… ওসব না হয় পরে বলি?”
​—“আচ্ছা ঠিক আছে, এখানে একাই এসেছিস নাকি…”
​আলোর কথা শেষ হতে না হতেই, পাশ থেকে রনক বলল,
“আহ আলো, এসব পরে জানা যাবে। চল এবার গাড়িতে। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
​এই বলেই তিনজনের ধ্যান, চলে যেতে উদ্যত হলো। অথচ আনায়ার মনে পড়ল কেনীথের কথা। সে ত্বরিত পেছনে ফিরে আওড়াল,

“মিস্টার ভিভিয়ান… থ্যাং…”
​আনায়ার কথা সম্পূর্ণ হয় না। বরং সে এক ভারী শ্বাস ফেলে, চকিতে হতাশ দৃষ্টিতে সম্মুখপানে চেয়ে থাকে। কেনীথ আর তার মাঝের দূরত্বটা বেশ। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে অকপটে বাইকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আনায়ার ডাক হয়তো তার কানে যায়নি।
এভাবেই চোখের সামনে বলিষ্ঠ আকারের ব্যক্তিটি বাইকে চড়ে, পুনরায় সেই গন্তব্যে চলে গেল যেখান থেকে তারা এইমাত্র এলো। এরপর হয়তো গাড়ি ঠিক করে আবারও তার নির্দিষ্ট অজানা গন্তব্যে হারিয়ে যাবে। হয়তো আর কখনোই তাদের দেখা হবে না। কিংবা হতেও পারে। যেটাই হোক না কেন, সবটাই তো অনিশ্চিত!
​এরিমধ্যে পেছন থেকে রনকের ডাক ভেসে এলে, আনায়ার ধ্যান ভাঙে। তাকেও এবার যেতে হবে। আবারও দুজনের বিচ্ছেদ ঘটেছে। কিন্তু আনায়া এই স্বাভাবিক বিচ্ছেদটাকে মানতে পারছে না। অজান্তেই তার এক অদ্ভুত কষ্ট হচ্ছে। আনায়ার চোখজোড়া ভিজে ওঠে। সে ঠোঁট চেপে চেয়ে থাকে, সকালের আবহে অজানায় মিশে যাওয়া কেনীথের পানে।

​রাত নেমেছে। নিজের ঘরে ব্যাগ গোছাচ্ছে কেনীথ। আগামীকাল তার ফ্লাইট; জার্মানিতে ফিরতে হবে। ভেবেছিল এবার ছুটিতে এসে পরিবারকে কিছুটা সময় দিতে পারবে, কিন্তু অযথা দুটো দিন এমনিতেই নষ্ট হলো
​সে রাঙামাটি গিয়েছিল বিশেষ এক কাজে। সেখানে তার নূরজান তথা নূরজাহানের নামে একটি আশ্রম আছে। দায়িত্ব অনুযায়ী আশ্রমের বর্ষপূর্তি উদযাপনে ভোজ ও নানান আয়োজনের তদারকি করতে হলো তাকে। এর আগেও দুবার সে ভিন্ন কাজে সেখানে গিয়েছিল।

​সে যাই হোক, দুটো দিন নষ্ট হওয়ার আফসোস তার মিটছে না। মা আর নূরজান দুজনেই অসুস্থ। তাদের দেখভাল করার মাঝে আছে রোজ আর পাপড়ি। এতদূর থেকে বারবার দেশে ফিরে আসা সম্ভব নয়।
আবার জার্মানিতেও তাদের অবস্থা ভালো না। নায়রা কোম্পানি সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। রাতদিন পুরোটা কোম্পানির পেছনে সময় দিচ্ছে, অথচ সময় যতই গড়াচ্ছে কোম্পানির অবনতি হচ্ছে। মাঝে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু আবারও সেই একই দশা। এমন ডাউনফল এতো বছরে আগে কখনো হয়েছে কিনা তা কেনীথের জানা নেই।
‘ব্লাডেন’-এর কনসার্ট হয় না প্রায় ছয়-সাত মাস পেরিয়েছে। ফ্যানবেজ পাগল হয়ে তাদের অপেক্ষায় বসে আছে। অথচ তারা নিরুদ্বেগ। রেসিং ইভেন্টে যেখানে ব্লাডেনের ভিআইপি কিংবা ভিপিএন নামক ট্রিয়ো ব্যতীত সম্পূর্ণ হতো না, তারা আজ প্রায় এক বছর হতে এসবের নামনিশানা থেকেও দূরে।
যখন তখন এজেন্সির অফার লেটার আসছে, অথচ এখানেও তারা নির্বিকার।
​মাঝখান থেকে পাভেল কেবল নিজের মতো টুকটাক এগিয়ে যাচ্ছে। তবুও বাইক রেসারদের মাঝে রেষারেষির কারণে প্রায়শই মা’রামা’রি করে, চেহারার বারোটা বাজিয়ে বাড়িতে ফেরে।
আর সবটাই চোখের সামনে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দেখে যাচ্ছে কেনীথ। কোনো কিছুতেই তার বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

কেনীথের ভাবনাচিন্তার মাঝেই, ঘরে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করল রোজ। কেনীথ চলে যাবে এই ভাবনায় তার চোখে-মুখে বেশ হতাশার ছাপ। তবুও তা সর্বোচ্চ চেষ্টায় লুকিয়ে সে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“তবে তুমি সত্যিই কাল চলে যাচ্ছো?”
​কেনীথ ব্যস্ত ভঙ্গিতে গম্ভীর স্বরে আওড়াল, “হুম।”

​রোজ কিছু বলল না। এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কেনীথ কাজের ফাঁকে থেমে, তার উদ্দেশ্যে বলল,
“মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করিস। বাড়ির সবার খেয়াল রাখিস। চিন্তা নেই, কিছুদিন পর আবারও ফিরে আসব।”
​রোজ কোনো উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ চেয়ে চুপটি করে পেছন হতে কেনীথকে দেখতে দেখতেই, তার চোখজোড়া জলে ভিজে উঠল। একটা বছরে কতকিছু যেন পাল্টে গিয়েছে। বোধ হওয়ার পর থেকে এই এহসান মঞ্জিলকে সে সর্বদা বিষণ্ণ রূপেই দেখেছে। আর এখন যেন ক্রমাগতই তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
কবে হবে সবকিছু ঠিক? কবে আবার সবাইকে প্রাণখুলে হাসতে দেখবে? কবে আবার সবাইকে প্রফুল্ল মুখে আনন্দে মেতে উঠতে দেখবে? নেই,কোনোকিছুরই উত্তর নেই।
​রোজের চোখের কোণে মৃদু জল চলে এলো। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে, নাক টেনে বলল,
“রাত হয়েছে, আমি যাই তবে।”

​—“হু।”
​কেনীথের নিস্পৃহতায় রোজের চোখ অজান্তেই জলে টইটুম্বুর হলো। জল ঝরে পড়ার আগেই সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে চলে যেতেই, লাগেজে কাপড় সাজাতে থাকা কেনীথ ক্ষীণ শুষ্ক হেসে বলল,
“সকলেই কেবল মরীচিকার পেছনেই ছুটছে। যে মরীচিকার সময়সীমাও কিনা খুব শীঘ্রই ফুরিয়ে আসতে চলেছে।”
কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে, সাইড-টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল। রাত হয়েছে, মেডিসিনটাও নিতে হবে। ফেলে রাখা কিছু ঔষধের পাতা ও কৌটো হতে,সবমিলিয়ে একমুঠো ক্যাপসুল তুলে মুখে পুরে দিল। গ্লাসে পানি ঢেলে অকপটে তা খেয়ে নিল। তবে গ্লাসটা রাখতে গিয়েই,হঠাৎ টেবিলের কোণায় নজর পড়ল।

একটি চামড়ায় মোড়ানো ডায়েরি নিস্পৃহে পড়ে আছে। কেনীথ কিছুক্ষণ সেটির দিকে একমনে চেয়ে থাকার পর তুলে নিল। ভারী শ্বাস ফেলে,ডায়েরির উপরে থাকা নামটা একবার পড়ল। ‘আনায়া এহসান—নক্ষত্রমন্ডলের সম্রাজ্ঞী।’
জিনিসটা দেখে কেনীথের বিশেষ কোনো ভাবান্তর হলো না। ডায়েরিটা গাড়িতে পেয়েছিল। হয়তো আনায়া ভুলে ফেলে গিয়েছিল। আর সে পরবর্তীতে গাড়িতে পেয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু আপাতত ভাবতে লাগল এটার কি করা যেতে পারে। সিন্ধান্ত গ্রহণে খুব একটা সময় নিল না সে। লাগেজে তুলবে ভেবে নিয়েও, সে সরাসরি স্টাডি টেবিলের পাশে থাকা ডাস্টবিন অব্দি এগিয়ে গেল। এবং সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ডায়েরিটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে,খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে ভারী শ্বাস ফেলল। আবর্জনা সরূপ জিনিসটাকে চেয়ে চেয়ে আরো কিছুক্ষণ দেখতে লাগল।

​রাতের বেলায় বিষণ্ণ মনে নিজের ঘরের বারান্দায় বসে আছে আনায়া। পরনে সুতির নরম সালোয়ার-কামিজ। তার দৃষ্টি নিবন্ধ আকাশের বিস্তৃত চাঁদের দিকে। আনায়ার মন মেজাজ খুব একটা ভালো নেই। রাঙামাটি থেকে আজ বিকালেই বাড়ি ফিরেছে সে।
​পরিকল্পনা অনুযায়ী বেশি একটা সময় তার রাঙামাটিতে কাটানো হয়নি। তার বন্ধুরা এখনো সেখানে থাকলেও, সে একাকী বাড়ি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বাড়ি ফেরা নিয়ে কিছুটা ভীতু ছিল, না জানি বাবা তার কী অবস্থা করবে। কিন্তু বাড়িতে এসে বুঝল, তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টা কেবল মা জানে। তারেক রাগারাগি করবে ভেবে, অনিমার আর সাহস হয়নি এই বিষয়টা কাউকে জানানোর।
​এদিক থেকে বেঁচে গেলেও, এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা হতে বাঁচতে পারছে না সে। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। মনমরা হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছে। মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খেলেও, কোনো কিছুরই সুনির্দিষ্ট কারণ বা ব্যাখ্যা সে খুঁজে পাচ্ছে না।

​তার বাবার ফিরতে আজ মধ্যরাত হবে, এমনকি ভোরও হতে পারে। অন্যদিকে সামনেই ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা, তাই ইনায়া সবসময়ের মতো পড়ালেখাতেই ব্যস্ত। আনায়া উঠে দাঁড়াল। মা ছাড়া আর কাউকে এইসময় পাশে সে পাবে না। একমাত্র মা-ই হয়তো তাকে এই সমস্যায় সাহায্য করতে পারবে।
​এই ভাবনায় সে বারান্দা থেকে ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই তার নজরে পড়ল বিশালাকৃতির অ্যাংরি বার্ডস খ্যাত রেডের ক্যানভাসটার দিকে। পাখিটার গম্ভীর মুখ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন সরাসরি আনায়ার দিকেই নিবদ্ধ। আনায়া ছবিটি বেশ বিরক্তির সাথে দেখে নিয়ে, মুখ ভেঙচিয়ে বলল,

“বজ্জাত একটা!”
​এই বলেই সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
​অনিমা বিছানায় বসে বসে কাঁথা সেলাই করছেন। দিন বা রাত নেই, মাঝেমধ্যেই সময় সুযোগ পেলেই তিনি এসব করে সময় কাটায়।
​তার এমন ব্যস্ত সময়ের মাঝেই আনায়ার আগমন হলো। সে কোনো প্রকার দ্বিধা না করে, মায়ের কাছে এসে বিছানায় বসল।
​—“মা, আমার তোমার সাথে একটা প্রয়োজনীয় বিষয়ে কিছু কথা বলার ছিল।”
​হঠাৎ মেয়ের এহেন গম্ভীর অভিব্যক্তিতে, অনিমা নড়েচড়ে বসল। আনায়ার ভাবগাম্ভীর্যে তার মনে হলো বিষয়টা হয়তো সত্যিই জরুরি। যথারীতি তিনি কাঁথাটা পাশে রেখে, তটস্থ হয়ে বলল,
“হ্যাঁ, বল। কী বলবি?”
​আনায়া কিছুটা দ্বিধা করলেও, মায়ের কাছে আরেকটু ঘেঁষে এসে বলল,

“মা, তোমায় একটা সত্যি বলার আছে। প্লিজ কাউকে বলবে না, ঠিক আছে?”
​অনিমা আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলে,
“আরে পাগলী মেয়ে, এটা কেমন কথা। মেয়ে হয়ে মায়ের কাছে কিছু বলতে এসেছিস, আবার বলছিস তোর মা কাউকে সে কথা বলে দেবে?…চিন্তা নেই, বল কী বলবি।”
​অনিমার কথায় আনায়া আশ্বস্ত হলো। কিছুটা ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“মা,আমার না ওনার সাথে দেখা হয়েছিল!”
​আনায়ার অভিব্যক্তিতে অনিমার কপাল কুঁচকে গেল।
—“কার কথা বলছিস?”
​—“…ঐ যে, ঐ পাগলা লোকটা… আ মানে ভিভিয়ান এহসান।”
​অনিমা এই একটিমাত্র নামেই যেন বিস্মিত হলো। তড়িঘড়ি করে বলল,
“মানে? কখন, কীভাবে? ও তোর সাথে কথা বলেছে?”
​—“আ… শুধু কথা না, মাঝে যে একদিন নিখোঁজ ছিলাম… মানে পথ হারিয়েছিলাম। আমি উনার সাথেই ছিলাম।”
​—“কিহ্? এসব এতক্ষণে বলছিস?”
​অনিমাকে আর বিভ্রান্তিতে না রেখে আনায়া তাকে ধীরে ধীরে সবটা বলল। যদিও স্বামী-স্ত্রী হয়ে, একত্রে এক ঘরে থাকার বিষয়টা কাটিয়ে গেল। কিন্তু সবকিছু শুনে অনিমার বিস্ময় যেন কাটছিলই না।

সে বেশ কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ও তোর সাথে কোনো বাজে বিহেভ করেছে? পুরো একটা দিন-রাত অচেনা গ্রামে ছিলি,কোনো সমস্যা… ”
—“আ…তেমন কোনো সমস্যা তো হয়নি। কিন্তু বললাম না, বেটার রাগ অনেক। ঠিকমতো কোনো কথাও বলেনি।”, আনায়া ঠোঁট উল্টিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে বলে। অন্যদিকে অনিমা পুনরায় উৎসুক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ঐ বাড়ির সবাই ভালো আছে? কারো সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করেছিলি কি?”
—“না,সেসবও জানা হয়নি। কেবল মাত্র দুই-একবার কথা বলেছিল। আগের চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর হয়ে গিয়েছে,একটুও দাম দেয়নি।”
আবারও হতাশ আর বিরক্তি নিয়েই কথা বলল আনায়া। যদিও অনিমা ভাবছে ভিন্ন কিছু। সে যেন আনায়াকে অন্যকিছু জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছে,কিন্তু বলতে পারছে না। এরিমধ্যে আনায়া বলল,
“মা,আমার আরো একটা বিষয়ে জানার আছে। এতোদিন মাঝেমধ্যে জানতে ইচ্ছে হলেও কখনো বলিনি। কিন্তু…”

—“হুম বল,কি বলবি?”
—“বলছিলাম যে, আমরাও এহসান আবার ওনারাও এহসান। মানে আমাদের কি কোনো কানেকশন আছে? বা এমন কিছু,যা তুমি-বাবা দুজনেই সবসময় আমাদের কাছ থেকে লুকিয়েছো।”
অনিমা থমকায়। আনায়ার উৎসুক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর,কিছুটা রুক্ষ গলায় বলল,
“আগে এটা বল,গতবার যে ও তোকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল আর এবার যে ওর সাথে তোর দেখা হলো…কম করে হলেও,অনেকটা সময় তুই ওর সাথে কাটিয়েছিস। ওকে তোর ঠিক কেমন মনে হয়েছে? তোর বাবা ফিরে এসে আমায় খুব একটা কিছু বলেনি। শুধু রেগেমেগে বলল, ভিভান পাগল হয়ে গিয়েছে,তাই পাগলামি করছে। ও নাকি এখনও তোর ক্ষতি চায়ছে। তোকে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছে। কিন্তু আমার কেন জানি বিষয়টি পুরোপুরি বিশ্বাস হয়নি। তোর সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তোর বাবার কড়া নিষেধে সবসময়ের মতোই চুপ করে আছি।

সত্যি করে বলতো,সবমিলিয়ে ওকে তোর কি মনে হয়েছে? ও কি সত্যিই তোর ক্ষতি করতে চায়? এমন কিছুই কি মনে হয়েছে?”
আনায়ার তার মায়ের ভাবগাম্ভীর্যে কপাল কুঁচকে বলল,
“কিসব বলছো এসব? বাবা তোমায় এমন কিছু বলেছে?… কই উনি কেন আমার ক্ষতি করবে? শুরুতে আমিও ভেবেছিলাম,হয়তো আমায় কিডনাপ করে বাবার কাছ থেকে টাকাপয়সা চাইবে কিংবা কোনো বিশেষ স্বার্থহাসিল করবে। কিন্তু…”
—“কিন্তু?”
অনিমার এমন উৎসুক ভাবগাম্ভীর্যে,আনায়া কিছুটা ভড়কে নিজেকে তটস্থ করল।

—“পাগলামি করেছে, আমার জন্য! কেমন কেমন সব কথা বলতো! মনে হতো আমাকে চায় তাই ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে। আমি বোধহয় তারই ব্যক্তিগত কিছু। কিন্তু এবার কোনো ভাবান্তর নেই। কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়াও নেই। ভাবগম্ভীর্য এমন ছিল যেন সে আমাকে চেনেও না। আমি তার সম্পূর্ণ অপরিচিত। এছাড়া কখনো আমাকে কষ্ট দেওয়া বা খারাপ কিছু…না! কখনোই তেমন কিছু মনে হয়নি।”
আনায়া মাথা নুইয়েই ইতস্তত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে শেষ করল। অন্যদিকে অনিমা কিছু একটা চিন্তা করতে করতে তার কথাগুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনল। অনিমা কিছু বলছে না দেখে,আনায়া মাথা তুলে তাকায়। চোখ পিটপিট করে কিছুক্ষণ তাকে দেখার পর, একটা প্রশ্ন মাথা আসতেই বলে ওঠে,
“মা, আরো একটা প্রশ্ন। আমার কেন জানি মনে হয়,তোমরা তাকে আর তার পরিবারকে ভালোমতোই চেনো। নয়তো একটু আগেও তুমি তাকে ভিভান বলে ডাকলে। এমনটা এরআগেও ডেকেছো। আমি গুরুত্ব দেইনি,তাই কিছু জিজ্ঞেসও করেনি। বাট,আ’ম সিওর, তোমারা সবটাই জানো অথচ আমাদের কিছুই বলোনি। সবটা লুকিয়েছো! প্লিজ সত্যি করে বলো,আমি ঠিক বলছি তাই না?”
অনিমা কিছু বলল না। তার ভাবগম্ভীর্য বোঝা মুশকিল। আচমকা সে উঠে দাড়াতেই আনায়া বলল,
“কোথায় যাচ্ছো?”

—“দাঁড়া আসছি।”
এই বলেই সে দরজাটা ভালোমতো লাগিয়ে দিল। অতঃপর ঘরের আলমারি খুঁজে কিছু একটা বের করতে লাগল। আনায়া কপাল কুঁচকে মায়ের কাজকর্ম দেখে।
অনিমা কাজের ফাঁকে একবার আনায়াকে জিজ্ঞেস করল,
“আনায়া! তোর বাবা আসতে দেরি আছে, তাই না?”
—“আ…হুম, কিন্তু কেনো বলতো?”
আনায়ার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অনিমা ততক্ষণে কিছু একটা বের করে আনল। শাড়ির কাপড়ে মোড়ানো বই আকৃতির জিনিসটাকে দেখে,আনায়া ভ্রুকুটি করে বলে,
“এটা আবার কি?”
অনিমা আনায়ার সামনে বসল। শাড়ির ভাজ খুলে, মোটা কাগজে মোড়ানো বেশ পুরোনো এ্যালবামটা আনায়ার দিকে এগিয়ে দেয়।আনায়া জিনিসটার দিকে চেয়ে, কপাল কুঁচকে বলল,
“ছবির এ্যালবাম? এটা আবার কোথায় ছিল? আগে তো কখনো দেখাওনি।”
অনিমা সোজাসাপটা ভাষায় জবাব দেয়,
“আগে খুলে দেখতে থাক।”

এই বলেই সে ভারী শ্বাস ফেলল। অন্যদিকে আনায়া বেশ উৎসুক ভঙ্গিতেই এ্যালবামটা খুলতে লাগল। সব পুরোনো পুরোনো ছবি। শুরুতেই দেখা মিলল, অনিমা আর তারেকের বিয়ে সহ একত্রীত কিছু ছবি। আনায়া ছবিগুলো দেখে বেশ মজা পেল। পরক্ষণেই বের হলো কিছু অচেনা মানুষজনের ছবি। অনিমা তারেক সহ সবাই পরিবারের মতো কোনো বাড়ির বাগানে ছবি তুলেছে। পেছনে বিশাল এক ফোয়ারা। চারপাশে সজীব গাছগাছালির অপার সৌন্দর্য।
তবে অবাক করার বিষয়,বাবা-মা ব্যতীত বাকি অচেনা লোকগুলোকে তার চেনা চেনা মনে হচ্ছে। একইসাথে ছবিগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা বাগান কিংবা বাড়ির বিভিন্ন অংশ। আনায়া ভ্রুকুটি করে,মায়ের নির্লিপ্ত মুখের দিকে চেয়ে বলল,
“মা? এনারা কারা আর এই বাড়ি তো…”

—“এহসান মঞ্জিল। এই বাড়ির নাম এহসান মঞ্জিল। তোর বাবার পৈতৃক ভিটা।”
আনায়ার চোখজোড়া বিস্ময়ে ছেয়ে গেল। সে অস্ফুটস্বরে বলল,
“মানে? কিন্তু এটা তো উনাদের বাড়ি।…হ্যাঁ,মনে পড়েছে, এহসান মঞ্জিল ভাহিদ এহসানের বাড়ি। আমি বাড়ির নেইম-প্লেটে এইনাম দেখেছি। এইজন্য বাড়িটাও চেনা চেনা লাগছে। আর এই দুজন…”
—“তোর বড়আব্বু আর বড় আম্মু।… আমার ভাসুর ভাহিদ এহসান ও বড়-ভাবি কাশফিয়া এহসান।”
আনায়ার আবারও বিস্মিত। অথচ অনিমার চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই।
—“চুপচাপ পরের ছবিগুলোও দেখতে থাক।”

মায়ের কথামতো আনায়া, ধীরে এ্যালবামের মাঝ অব্দি এগিয়ে যেতে লাগল। ক্রমশই দেখা মিলল ফ্যামিলি ফটো সহ আনায়ার একদম ছোটবেলার সব ছবি। নিজের চেহেরাটা চিনতে তার বেশি একটা সময় লাগল না। তবে আরো কিছু পেইজ পেরোতেই আনায়া সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে গেল।
এ্যামবারের ঠিক এই মধ্যস্থান হতে দৃশ্যমান হয়েছে,এক সুদর্শন যুবকের নানান ভাবগাম্ভীর্যের সহিত তোলা নানান ছবি সমূহ। ফর্সা ত্বক, তীক্ষ্ণ চোয়াল,মাথায় একঝাঁক কাঁধ অব্দি ছুঁয়ে থাকা ঝাঁকড়া চুলযুক্ত এক তাগড়া যুবক। কখনো হাসিখুশি তো কখনো তার গম্ভীর ভাবভঙ্গি। সব ছবির পাশাপাশি গাঢ় লাল-কালো রঙের বাইকের অস্তিত্বও মিলছে প্রখরভাবে।

আনায়ার বিস্ময়ে ঘেরা চোখজোড়া আঁটকে গেল নতুন কিছু ছবিতে। এবার সেই সুদর্শন একা নেই। কাঁধ অব্দি ঝাঁকড়া চুলের, ফর্সা গড়নের অল্পবয়সেই বলিষ্ঠ পেশীবহুল দেহ গড়া সুদর্শনের কোলে রয়েছে একটি ছোট বাচ্চা মেয়ে। কখনো বা আদরে মাখা ভাবগাম্ভীর্যের সাথে বাচ্চাটিকে কোলের মাঝে রেখে দেখছে,আবার কখনো বা দুষ্টুমির ভঙ্গিতে।
অনিমার নিস্ফল চাহুনি। সে আনায়ার বিস্ময়কর ভাবগতিক পর্যবেক্ষণ করছে। যেন সে থামলেই,বিশেষ কিছু একটা বলবে। এদিকে আনায়া ক্রমাগত সামনের ছবিগুলোর দিকে এগিয়ে চলল। ধীরে ধীরে বাচ্চা মেয়েটির সাথে সাথে সুদর্শন ছেলেটিরও প্রাপ্তবয়স্ক নানান ছবি দৃশ্যমান হতে লাগল।

এরিমধ্যে আবারও নজরে এলো আরো দুটো ছবি। প্রথম ছবিতে ছেলেটির গায়ে কালো সেন্ডো গেঞ্জি-প্যান্ট। চুলগুলো এলোমেলো, বাইকের সাথে হেলান দেওয়া। রৌদ্রময় দুপুরে সদ্য গোসল সাড়া যুবকের পেশীবহুল উঁচিয়ে রাখা হাতটায় বসে আছে—খিলখিল করে হাসতে থাকা একটি বাচ্চা মেয়ে। বয়স দুই-আড়াই হবে হয়তো। পরের ছবিটিতে কোনো অনুষ্ঠানের মাঝে,ছেলেটির কাঁধে চড়ে বসে আছে সেই বাচ্চাটি।

পরের পৃষ্টা পাল্টাতে, আবারও দুটো ছবি নজরে এলো। একটাতে সেই বাচ্চা মেয়েটিকে ছেলেটা স্বযত্নে বুকে আগলে ধরে, ঘুম পারাচ্ছে। অন্যটিতে মেয়েটি আবার চিল্লিয়ে কাঁদছে, হয়তো ব্যাথা পেয়েছে। হাঁটুতে সামান্য চোট সদৃশ্য কিছু দেখা যাচ্ছে। আর ছেলেটি সহ কাশফিয়া বাচ্চাটির কান্না থামানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
আনায়া ভেবে পায় না, এমন সিচুয়েশনে এসব ছবি কে তুলেছে? সে যাই হোক। সে সম্পূর্ণ রূপে স্তব্ধ হয় পরের পৃষ্ঠা পাল্টাতেই। ঘরোয়া বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। চারপাশে নানান সাজসজ্জা। মাঝখানে বর আর বউ রূপে দুজন বসে রয়েছে। তাদের দেখেই আনায়া স্তব্ধ। বাচ্চাটির তুলনায় বিশালাকৃতির ছেলেটির পাশে লাল শাড়ি-গয়না পরিহিত বাচ্চা মেয়েটি তথা ছোট্ট আনায়া খিলখিল করে হাসছে। যেন তার আনন্দের আজ শেষ নেই। অথচ ছেলেটির ভাবগম্ভীর্য সম্পূর্ণ অদ্ভুত। কেমন এলোমেলো চুল,পোশাক আর সাজসজ্জা। চোখে-মুখে অদ্ভুত এক চাপা ক্ষি’প্ততা। তবুও চুপটি করে বসে আছে সে। আচ্ছা এটা কি সত্যিই বিয়ের আয়োজন? আর এরাই কি বর-বউ? এটা কি করে সম্ভব?

অসম দুই বর-বউ ব্যতীত আশেপাশে তার বাবা-মা সহ সকলেই আছে। সাথে ঝাঁকড়া চুলওয়ালা আরেকটা ছেলের দেখা মিলেছে। আনায়া বোধহয় এই ব্যক্তিকেও খুব মতো চিনে ফেলেছে।
আনায়ার বিস্ময় ফুরাবার নয়। সে সবমিলিয়ে স্তম্ভিত চোখে মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকায়। চোখজোড়া অজান্তেই কিছুটা ভিজে গিয়েছে। কেন সে তা জানে না। তবে ছবিতে থাকা সবগুলো মানুষকে যে সে ভালোমতোই চিনেছে,তা একদম স্পষ্ট।
আনায়া ঠোঁট চেপে, কিছুটা ভিজিয়ে নিয়ে ভারী ভারী শ্বাস ফেলে ভগ্নস্বরে বলল,

“মা! এসবের মানে কি? উনি আসলে কে?”
অনিমা মেয়ের কথায় ক্ষীণ হাসল। পরক্ষণেই নিরেট স্বরে বলে উঠল,
“ভাহিদ এহসান ও কাশফিয়া এহসানের একমাত্র ছেলে,ভিভিয়ান এহসান; এহসান বংশের একমাত্র বংশধর। তাই আদরের একমাত্র নাতীকে তোর দাদু শখ করে ভিভান নামেই ডাকত। তার সাথে সাথে পরিবারের বাদবাকি আমরাও ভিভান বলেই ডাকতাম। আজও এইনামেই চিনি ওকে।”

মহামায়া পর্ব ১৮

আনায়া স্তম্ভিত দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে। অনিমা থেমে আবারও বলল,
“সম্পর্কে ও তোর কাজিন হয়। কম করে হলেও তোর চেয়ে সতেরো বছরের বড়। আর…ভুলবশত এই ভিভিয়ান এহসানই হয়তো বা তোর স্বামী।”

মহামায়া পর্ব ২০