মহামায়া পর্ব ২০
তুশকন্যা
ফ্ল্যাশব্যাক
ঘটনার সূত্রপাত আজ থেকে ঠিক উনিশ বছর আগে। তৎকালীন সেই সময়টাতে পুরো ‘এহসান মঞ্জিল’ জুড়ে বিরাজ করছিল এক উৎসবমুখর রাজকীয় পরিবেশ। এহসান বংশের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ সেখানে এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের আগমন ঘটেছে।
প্রয়াত আহমেদ এহসানের কনিষ্ঠ পুত্র তারেক এহসানের ঘর আলো করে জন্ম নেওয়া এই শিশুটির নাম রাখা হলো— ‘আনায়া এহসান’। সে যেন ভোরের শিশিরভেজা কোনো সদ্য ফোটা ফুল, কিংবা বিশাল আকাশের বুকে আপন মহিমায় উজ্জ্বল কোনো ধ্রুবতারা সরূপ নক্ষত্র।
আহমেদ এহসান কিংবা তারেক এহসানের জননী আজ আর ইহজগতে নেই। কিন্তু নবজাতিকার আগমনে এই আনন্দের ভাগিদার হওয়ার মানুষেরও অভাব হলো না। আহমেদ এহসানের জ্যেষ্ঠ পুত্র ভাহিদ এহসান এবং তার সহধর্মিণী কাশফিয়া এহসানের হৃদয়ে আজ উপচে পড়া আনন্দ। অন্যদিকে, প্রথমবারের মতো বাবা হিসেবে কন্যাসন্তানের মুখ দেখে তারেক যেন খানিকটা দিশেহারা—চোখেমুখে এক অপার্থিব প্রাপ্তির ছাপ।
ভাহিদ ও তারেক সম্পর্কে সৎ ভাই হলেও, তাদের ভ্রাতৃত্বের মাঝে কোনোদিন তার তিলমাত্র রেশ পড়েনি। বরং সহোদরের চাইতেও গভীর এক অটুট বন্ধনে তারা একে অপরকে আগলে রাখেন। আজকের এই খুশির দিনে দুজনে উন্মত্তের মতো চারদিকে মিষ্টি বিতরণে ব্যস্ত।
পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে দাদি নূরজাহানও ছুটে এসেছেন। স্বামী আহমেদ এহসানের মৃত্যুর পর তিনি জীবনের বেশির ভাগ সময় স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত আশ্রমে অতিবাহিত করেন, আর বাকি সময়টুকু কাটে এই এহসান মঞ্জিলে। নাতনির আগমনে তাঁর মুখচ্ছবিতেও আজ বার্ধক্যের ছাপ ছাপিয়ে আনন্দের আভা ছড়িয়ে পড়েছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এই পারিবারিক উৎসবে সামিল হতে এসেছে এহসান বংশের বর্তমান প্রজন্মের একমাত্র উত্তরসূরী;ভাহিদ-কাশফিয়া দম্পতির একমাত্র ছেলে ভিভিয়ান এহসান। তার সঙ্গে এসেছে কাশফিয়ার ভ্রাতুষ্পুত্র পাভেল। দুজনেই পড়াশোনার সূত্রে ঢাকায় বোর্ডিংয়ে থাকে, কেবল ছুটির অবসরেই এই পৈতৃক ভিটায় তাদের পদধূলি পড়ে।
পাভেলের স্কুলের পাঠ চুকোতে এখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি থাকলেও, ভিভিয়ান সবেমাত্র এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে। এই দীর্ঘ অবসরে সে কিছুদিন আগেই চট্টগ্রাম ফিরেছে। ফর্সা গড়ন আর স্বভাবজাত গাম্ভীর্যের কারণে ভিভিয়ান ছোট থেকেই সবার চেয়ে আলাদা। বিশেষ করে তার ছোট মা অনিমার কাছে সে অত্যন্ত স্নেহভাজন। নিজের সদ্যজাত ছোট বোনটিকে দেখার জন্য ভিভিয়ানের মনেও জন্মেছে এক প্রচ্ছন্ন কৌতূহল। কিন্তু…
রাত্রির নিস্তব্ধতা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই এহসান মঞ্জিলের কোলাহলে হঠাৎ ছন্দপতন ঘটলো। সন্ধ্যাবেলা শিশুটির জন্ম হলেও রাত দশটা অতিক্রান্ত হওয়ার পর ভিভিয়ানের কোনো হদিস মিলছে না। পুরো বাড়ি ও আশপাশ তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেই গম্ভীর স্বভাবের কিশোরটির দেখা পাওয়া গেল না।কোঁকড়া চুলে ঢাকা বিদেশি বালকের মতো দেখতে চঞ্চল পাভেলও ভিভিয়ানের অবস্থানের ব্যাপারে কিছুই বলতে পারল না। শুধু জানে, ভিভিয়ান সেই বিকেল বেলায় বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিল কাজের কথা বলে। এরপর বাড়ির ব্যস্ততায় কারোরই আর তার বিষয়ে নজর দেওয়ার সময় হয়নি।
একদিকে নবজাতিকার আগমনে আনন্দের জোয়ার, অন্যদিকে বংশের বড় ছেলের হঠাৎ এই নিরুদ্দেশ হওয়া—সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজে ঘনিয়ে খানিক দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে, রাতের নিস্তব্ধতা উপেক্ষা করে তারেক আর ভাহিদ বেরিয়ে পড়ল ভিভিয়ানের খোঁজে। এ ছেলে অজান্তেই এতো খাপছাড়া আর বেপরোয়া কিভাবে হয়ে উঠল,তা তাদের বুঝে আসছে না।
ছেলে-ভাতিজাকে খুঁজতে গিয়ে রাত এগারোটার নিস্তব্ধতা চিরে যখন ভাহিদ আর তারেকের উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই পকেটে থাকা মুঠোফোনটি সশব্দে বেজে উঠল। ওপার থেকে ভেসে আসা সংবাদটি ছিল এক খানিকটা স্বস্তির—ভিভিয়ান বাড়ি ফিরেছে।মুহূর্তেই দুই ভাইয়ের হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক স্পন্দন থিতু হয়ে এল।
দু’ভাই পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতিতে জড়িয়েছে। সাথে সাথে বেড়েছে অজান্তেই সব পরিচিত-অপরিচিত শত্রুর আনাগোনা। এদিকে বংশের একমাত্র ছেলে,সেও দিন দিন অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। কখন কোন অঘটন ঘটে যায়, কে জানে!
রুদ্ধশ্বাসে কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল এবং কোনো বাক্যব্যয় না করেই দ্রুতপদে বাড়ির অভিমুখে রওনা দিল।
এহসান মঞ্জিলের উত্তরসূরী ভিভিয়ানের অবয়বে মিশে আছে দুই ভিন্ন গোলার্ধের রক্ত। মা কাশফিয়া সুদূর রাশিয়ার তুষারশুভ্র অঞ্চলের মানুষ, আর বাবা ভাহিদ খাঁটি বাঙালি। এই দ্বিজাতীয় সংমিশ্রণে ভিভিয়ান পেয়েছে এক গ্রিক দেবতাতুল্য এবং কিছুটা বন্য সৌন্দর্য। তার কাঁধ অবধি গাঢ় বাদামি চুলের ঘন অরণ্য সবসময়ই অবিন্যস্ত থাকে। চুলের এই অবাধ্যতাকে সে কোনোদিন আয়ত্তে আনার প্রয়োজন বোধ করেনি। আবার সযত্নে লালিত সেই ঝাঁকড়া চুলগুলো ছাঁটতেও তার ঘোর আপত্তি।
তবে ভিভিয়ানের অবয়বে সবচেয়ে রহস্যময় ও সম্মোহনী অংশ হলো তার চক্ষুদ্বয় এবং দন্তপাটি। তার চোখের মণি সাধারণের মতো কৃষ্ণবর্ণ বা পিঙ্গল নয়, বরং এক অদ্ভুত হালকা লালচে আভায় রঞ্জিত। আর ওপরের মাড়ির দুই প্রান্তের দাঁত দুটি রূপকথার ভ্যাম্পায়ারদের ন্যায় সামান্য দীর্ঘ ও তীক্ষ্ণ। বংশগতিবিদ্যায় এই বিরল লালচে চোখের বৈশিষ্ট্য কেবল ভিভিয়ান এবং তার মামাতো বোন রোজের মাঝেই পরিলক্ষিত হয়েছে।
কাশফিয়ার পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী, তাঁর প্রপিতামহ আলেকজ্রান্ডারের অবয়বে ঠিক এমন কিছু অদ্ভুত চিহ্ন ছিল। আলেকজান্ডার ছিলেন কোনো এক রহস্যাবৃত ধর্মের অনুসারী, যাঁর জীবন নিয়ে খুব বেশি তথ্য কালক্রমে টিকে থাকেনি। যদিও কাশফিয়ার পরিবার জন্মসূত্রে ক্যাথলিক ছিল, তবে বর্তমানের কাশফিয়া একনিষ্ঠ মুসলিম এবং আচার-আচরণে আদ্যোপান্ত এক বাঙালি নারী।
কারো সাথে কোনো বাক্যবিনিময় না করে ঝড়ের বেগে অন্দরমহলে প্রবেশ করল ভিভিয়ান। তার পরনে নিরেট কালো টি-শার্ট আর প্যান্ট। কাঁধ-কপাল অবধি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগোছালো চুল। তার বাম হাতের তালুতে প্যাঁচানো একটি সাদা ব্যান্ডেজ শুভ্রতার মাঝে এক অশুভ সঙ্কেত হয়ে ফুটে আছে।
ছেলের এই রণক্লান্ত দশা দেখে কাশফিয়ার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে দ্রুত এগিয়ে এসে ছেলের আপাদমস্তক পরখ করল। শ্রান্ত-বিধ্বস্ত ফর্সা মুখটা যেন রক্তিম আভায় ছেয়ে গেছে। কাশফিয়া আর্তস্বরে অথচ চাপা গলায় সুধালো—
“আব্বা! এসবের মানে কী? কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ? দেখে তো মনে হচ্ছে রেগে আছো। মারামারি করে এসেছো?”
ভিভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। কেবল মস্তক উত্তোলন করে তার সেই তীক্ষ্ণ লালচে মণির দৃষ্টি দিয়ে মাকে একবার দেখল। কাশফিয়া পুনরায় ছেলের ব্যান্ডেজ জড়ানো হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বিচলিত হয়ে উঠলেন,
“হাতে চোট পেলে কীভাবে? সত্যি করে বলো ভিভান! তোমার বাবা আর কাকা তোমায় খুঁজতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এখন যদি তারা বাড়ি ফিরে তোমাকে এই অবস্থায় দেখে, তবে আরেক তুলকালাম কাণ্ড বেঁধে যাবে।”
ভিভিয়ান এবারও নিশ্চুপ। নিজের ক্ষতবিক্ষত হাতের দিকে স্থবির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। কয়েক মুহূর্তের সেই ভারী নিস্তব্ধতা ভেঙে সে অত্যন্ত গম্ভীর ও স্বল্প শব্দে প্রশ্ন করল,
“ছোট মা ঠিক আছে?”
ছেলের এই অপ্রত্যাশিত মমত্ববোধ দেখে কাশফিয়ার উদ্বিগ্ন মনটা কিছুটা শিথিল হলো। তিনি ক্ষীণ হেসে উত্তর দিলেন,
“হ্যাঁ, সে ভালো আছে। তোমার ছোট্ট একটা বোন হয়েছে।”
ভিভিয়ান মায়ের দিকে পুনরায় দৃষ্টিপাত করল, কিন্তু তার চেহারায় বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাস কিংবা বিষণ্ণতার চিহ্ন ফুটে উঠল না। কাশফিয়া জানে, তাঁর এই ছেলে এমনই। যে কিনা নিজের অনুভূতি নিয়েই সর্বদা অজ্ঞাত, তাকে বাহ্যিক রূপ দেখে কি বা আর বোঝা যাবে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে তিনি তাগাদা দিলেন—
“যাও, আর দেরি না করে দ্রুত নিজের ঘরে যাও। তোমার বাবা-কাকা আসার আগেই ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর ছোট মায়ের ঘরে গিয়ে বোনকে একবার দেখে এসো। অসুস্থ শরীরেও অনিমা তোমার চিন্তায় বসে আছে।”
মায়ের নির্দেশ শিরোধার্য করে ভিভিয়ান আর দাঁড়িয়ে রইল না। নিশব্দ চরণে সে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নিজের কক্ষের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তবে আজ সে আদতে কোথায় গিয়েছিল—তা এক অমীমাংসিত রহস্য হিসেবেই রয়ে গেল।
নিজের কক্ষে ফিরে ভিভিয়ান দ্রুততার সাথে অবিন্যস্ত চুলগুলো হাত দিয়ে খানিকটা গুছিয়ে নিল। ক্ষতবিক্ষত বাম হাতটি পরিষ্কার করে সাদা ব্যান্ডেজ দিয়ে এমনভাবে কষে বাঁধল, যাতে কাপড়ের ওপর দিয়ে রক্তের ছাপ অন্তত চট করে কারও নজরে না পড়ে। এলোমেলো চুলগুলো কোনোমতে পেছনের দিকে দু’হাতে একবার ঠেলে দিয়ে, গায়ের কালো টি-শার্টটি টেনে সোজা করে সে মন্থর চরণে অনিমার কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো।
কক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতেই এক বৈপরীত্যের আভাস পেল ভিভিয়ান।এই কক্ষের পরিবেশটি বেশ গুমোট। ভেতরে পরিবারের প্রায় সকল সদস্যেরই উপস্থিতি। বিছানায় আধশোয়া অনিমার কোল ঘেঁষে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে এক সদ্যজাত প্রাণ— আনায়া এহসান। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ভাহিদ ও তারেক, যাদের চোখেমুখে উদ্বেগের রেশ এখনো কাটেনি। এছাড়া ঘরটাতে নূরজাহান কিংবা অবাল বাচ্চারমতো কাশফিয়ার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে পাভেল।
ভিভিয়ানকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখেই উপস্থিত সকলের দৃষ্টি তার ওপর নিবদ্ধ হলো। তারেক ও ভাহিদ—উভয়ই দীর্ঘক্ষণ উৎকণ্ঠায় ছিলেন, আর সেই উৎকণ্ঠা এখন কিছুটা মেজাজে রূপ নিয়েছে। ভাহিদ এহসান ছেলের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বেশ চাপা-কর্কশ স্বরে বলে উঠল,
“কোথায় ছিলে তুমি? সুযোগ পেয়েই বাড়ি ছেড়েছে। কতবার নিষেধ করা হয়েছে তোমায়, দেশের দিনকাল ভালো না৷ কখন কোন অঘটন ঘটে যায় তারও নিশ্চয়তা নেই। বাড়িতে যখন আসবে, চুপচাপ বাড়িতেই থাকবে। তোমায় এখান থেকে ঢাকায় সরিয়েছি কি মনের সাধে? রাত এগারোটা অবধি আমাদের রাস্তায় রাস্তায় হন্যে হয়ে ঘুরিয়ে এখন বীরদর্পে ফেরা হচ্ছে?”
ভিভিয়ান কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। তার এই নির্বিকার মুখচ্ছবি দেখে ভাহিদ এহসানের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তিনি এক পা এগিয়ে এসে কঠোর কণ্ঠে বললেন,
“গাম্ভীর্য আর অবাধ্যতা দিনদিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে তোমার। আর এই যে হাতে ব্যান্ডেজ, নিশ্চয়ই কোথাও কোনো অঘটন ঘটিয়ে এসেছ? বড় হচ্ছো, আর দিনে দিনে অবাধ্য হচ্ছো।এটা কেনো ভুলে যাও, বড় হয়েছো মানেই যা খুশি করার অধিকার পেয়ে যাওনি,তুমি!”
ঘরের আনন্দঘন পরিবেশ মুহূর্তেই বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। নূরজাহান আর কাশফিয়া নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলেন। ভিভিয়ান মাথা নিচু করে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। সে কোনো সাফাই গাইল না, কোনো তর্কেও জড়াল না।
কাশফিয়া ভাহিদের কাছে এসে চাপা স্বরে আওড়ায়,
“এতো রাগ করার কি আছে। শান্ত হও। যখনই দেখি তখনই ছেলেটার সাথে… ”
—“তুমি চুপ করো কাশফি, তোমার জন্যই ছেলেটা খারাপ হচ্ছে।”
—“ভাইজান, বাদ দাও না। ও ফিরে এসেছে, এটাই যথেষ্ট। শুধু শুধু আর…”,তারেক বলেও কথা শেষ করতে পারল না। অচিরেই অনিমা পরিস্থিতি শান্ত করতে, নিজেই অত্যন্ত ক্ষীণ ও দুর্বল কণ্ঠে বলে উঠল,
“থাক না বড় ভাই, ও তো ফিরে এসেছে। মিছে কেন এখন রাগারাগি করছেন? ভিভান, এদিকে আয় বাবা।”
ছোট মায়ের স্নেহমাখা ডাক উপেক্ষা করার ইচ্ছে ভিভিয়ানের হলো না। সে ধীর পায়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। ভাহিদ তখনো ক্ষোভ সামলাতে না পেরে বিড়বিড় করছে,
“অতিরিক্ত আদরে ছেলেটা একেবারেই দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পড়ছে।”
ভিভিয়ান সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আনায়ার দিকে তাকাল। দুগ্ধশুভ্র গায়ের রঙ আর বন্ধ চোখের পাতায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সে অত্যন্ত সন্তর্পণে তার অক্ষত ডান হাতটি বাড়িয়ে ছোট্ট আনায়ার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হাতটি স্পর্শ করল। মুহূর্তেই এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটল— স্পর্শ পাওয়া মাত্রই আনায়া তার ছোট্ট আঙুল দিয়ে ভিভিয়ানের তর্জনীটি শক্ত করে চেপে ধরল। ঘুমের ঘোরেই শিশু আনায়ার ওষ্ঠকোণে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল।
সেই দৃশ্য দেখে ঘরে উপস্থিত সকলের কঠোরতা মুহূর্তেই যেন জল হয়ে গেল। তারেক আর ভাহিদের মুখাবয়বে ক্রোধের স্থানে স্থিরতা ফিরল। কাশফিয়া মৃদু স্বরে বলল,
“তোমরা শুধু শুধুই আমার ছেলেটাকে বকাঝকা করো। দেখো, তোমরা না চিনলেও বোন তার ভাইকে ঠিকই চিনেছে।”
ভিভিয়ান আঙুল ছাড়িয়ে নিল না। বাম হাতের ক্ষতটি আড়ালে রেখে সে একদৃষ্টিতে তার আনায়ার দিকে চেয়ে রইল। কিছু একটা স্পেশাল তো রয়েছে এই বাচ্চাটির মাঝে।
ভিভিয়ান অত্যন্ত সন্তর্পণে, দুই হাতের আশ্রয়ে আলতোভাবে আনায়াকে কোলে তুলে নেয়। নবজাতিকার তপ্ত নিশ্বাস আর অতি কোমল দেহের স্পর্শে ভিভিয়ানের নিভৃত হৃদয়েও যেন এক অজ্ঞাত শিহরণের স্পন্দন অনুভূত হলো। সে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে চেয়ে আনায়ার আপাদমস্তক পরখ করে দেখছে।
বুকের কাছে আনায়াকে আগলে ধরে কিছুক্ষণ তার নির্মল মুখচ্ছবি পর্যবেক্ষণ করল ভিভিয়ান। শিশুটির পবিত্র অবয়বে এক অপার্থিব স্নিগ্ধতা, যেন এইমাত্র স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো জ্যোতিষ্ক। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে সে ছোট মা অনিমার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অতি সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করল,
“ওর নাম কি?”
অনিমা কিছু বলার উপক্রম করতেই পাশ থেকে ভাহিদ এহসান গাম্ভীর্যের সাথে উত্তর দেয়,
“আনায়া এহসান। আপাতত এটাই রাখা হয়েছে।”
ভিভিয়ান কোনো বিশেষ ভাবান্তর প্রকাশ করল না। সে পুনরায় নবাগত আনায়ার পানে অনিমেষ দৃষ্টি ফেরাল। তার সেই রহস্যময় লালচে মণি দুটো প্রদীপের ম্লান আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল; যেন শিশুটির শান্ত ললাটে কোনো এক অনাগত ভবিষ্যতের লিপি পাঠ করার চেষ্টা করছে। ভিভিয়ানের এই একাগ্রতা দেখে অনিমার মাতৃহৃদয়ে অজান্তেই এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল। তিনি স্নেহভরে ভিভিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভিভান, তুমি কি ওর অন্য কোনো নাম দিতে চাও?”
আকস্মিক এই প্রস্তাবে ভিভিয়ান চকিতে ছোট মায়ের দিকে ফিরে তাকায়। কিছুক্ষণ অনিমার চোখের দিকে চেয়ে থেকে, সে মন্থর মস্তকে মুখ ফেরাল খোলা জানালা হতে দৃশ্যমান বিস্তৃত আকাশপানে।
বাইরে তখন নিশীথ রাতের গহীন নিস্তব্ধতা। মেঘমুক্ত নীলিমায় আজ সহস্র প্রদীপের ন্যায় তারার মেলা বসেছে। প্রতিটি নক্ষত্র যেন আপন মহিমায় দ্যুতি ছড়াচ্ছে। তবে সেই অগণিত আলোকবিন্দুর মাঝে উত্তরমেরুর আকাশে স্থির ও দেদীপ্যমান সেই বিশেষ নক্ষত্রটি ভিভিয়ানের দৃষ্টি কেড়ে নিল—যাকে লোকে ‘ধ্রুবতারা’ বলে চেনে; যে মহাকাশের নিঃসঙ্গ নক্ষত্রমন্ডলের সম্রাজ্ঞীর ন্যায় একাই দিকনির্ণয়ের মহিমা বহন করে চলে।
দুদণ্ড কাল কী যেন ভাবল ভিভিয়ান। তার অবিন্যস্ত চুলগুলো রাতের হাওয়ায় ঈষৎ আন্দোলিত হলো। আকাশ থেকে নজর সরিয়ে সে পুনরায় আনায়ার কোমল মুখচ্ছবির দিকে তাকাল। অতঃপর এক গভীর ও প্রশান্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“তারা!”
অকস্মাৎ এই স্বল্পাক্ষর নামে কক্ষের নিস্তব্ধতা ভাঙল। পাশ থেকে কাশফিয়া কিছুটা অবাক স্বরে পুনরুক্তি করল,
“তারা?”
ভিভিয়ান ধীরস্থিরভাবে মাথা নুইয়ে সায় দেয়। তার লালচে মণি দুটোতে তখন এক দৃঢ় প্রত্যয়। সে অতি সংক্ষেপে নিজের দর্শনের ব্যাখ্যায় বলল,
“হুম। শি ইজ লুক লাইক এ স্টার।”
ভিভিয়ানের মুখে এমন কাব্যিক উপমা শুনে ঘরের গুমোট পরিবেশে এক পশলা আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। ভাহিদ আর তারেকের মুখ থেকেও কঠোরতার শেষ রেশটুকু মুছে গিয়ে সেখানে প্রসন্নতার রেখা ফুটে উঠল। ভাহিদ এহসান বেশ তৃপ্তির সাথে আওড়াল,
“আনায়া এহসান তারা! বেশ চমৎকার ও শ্রুতিমধুর। পুরো নামটা মন্দ নয়।”
এহসান মঞ্জিলের সেই উৎসবমুখর রাতে, যখন বাইরের আকাশে ধ্রুবতারা তার অটল অবস্থান জানান দিচ্ছে, ঠিক তখন অন্দরমহলে আর এক নক্ষত্রের নামকরণ সম্পন্ন হলো। ভিভিয়ানের কোলে থাকা ছোট্ট ‘তারা’ কেবল সেই মায়াবী মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল।
ভিভিয়ান এহসানের বয়স যখন সতেরো, তখন জন্ম নিয়েছিল তার ছোট্ট ‘তারা’। জন্মের পরবর্তী কয়েকটা দিন আনায়ার পাশে কাটাতে পারলেও, পড়াশোনার তাগিদে তাকে শীঘ্রই ঢাকায় ফিরে যেতে হয়। এরপর থেকে এহসান মঞ্জিলে ভিভিয়ানের যাতায়াত কেবল ছুটির দিনগুলোতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
তবে সময়ের সাথে সাথে ভিভিয়ানের চরিত্রে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সে দিন দিন আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে এবং পরিবারের সবার থেকে এক অদৃশ্য দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে।
মাঝেমধ্যে সে যখন বাড়ি ফিরত, মনে হতো যান্ত্রিক কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা কোনো এক নিগূঢ় টান তাকে টেনে আনছে; কিন্তু পরিবারের সাথে সেই আগের নিবিড়তা আর অবশিষ্ট ছিল না।
অন্যদিকে, ছোট্ট আনায়াও বড় হতে থাকে তার আপন গতিতে। দীর্ঘ সময় পর পর যখন ভিভিয়ান বাড়ি ফিরত, দেড় বছরের সেই অবুঝ শিশুটি তার অপরিণত মস্তিষ্কে এই মানুষটিকে চেনার তীব্র চেষ্টা চালাত। ভিভিয়ানের সাথে কাটানো সামান্য স্মৃতিগুলো তার শৈশবস্মৃতি থেকে বারবার মুছে যেত বলে প্রতিবারই সে ভিভিয়ানকে এক নতুন ও উদ্ভট মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করত।
দেখতে দেখতে এভাবেই আড়াইটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। সেই নবজাতিকা আনায়াও এখন আড়াই বছরের এক চঞ্চল শিশুতে পরিণত।সারা বাড়ি তার খিলখিল হাসি আর দুরন্তপনায় মুখরিত থাকে। মাথা ভর্তি একঝাঁক সিল্কি চুল; সবসময় এলেমেলো করে রাখে। যদিও সেসবের প্রতি খেয়াল রাখার বয়স তার এখনো হয়নি। তাই সারাদিন এলোমেলো চুলে এঘর-ওঘর ছুটে বেড়ানোর মতোই দুরন্ত বিচ্ছু হয়েছে সে।
এদিকে এহসান মঞ্জিলের অভ্যন্তরীণ ব্যস্ততাও বেড়েছে। অনিমা পুনরায় অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় আগের মতো চঞ্চল আনায়ার দেখাশোনা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
বাড়ির বড় বউ হিসেবে কাশফিয়া সংসারের বিপুল কাজের মাঝেও চেষ্টা করে নিজের মেয়ে সমতুল্য এই মেয়েটির দেখভাল করতে। ওদিকে তারেক এহসান বর্তমানে জন এমপি নির্বাচিত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যতিব্যস্ত; ঘরের দিকে নজর দেওয়ার অবকাশ তাঁর নেই বললেই চলে।
ভাহিদ এহসানও রাজনীতি ও ব্যবসা—এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট। দাদিমা নূরজাহানও আশ্রম আর বাড়ি মিলিয়ে নিজের সময়টুকু ভাগ করে নিয়েছেন। সবার জীবনই এখন এক যান্ত্রিক ছন্দে আবর্তিত।
দীর্ঘদিন পর গ্রীষ্মের ছুটিতে ভিভিয়ান বাড়ি ফিরছে, সাথে বরাবরের মতোই আছে পাভেল। সতেরো বছরের সেই কিশোর ভিভিয়ান এখন উনিশ বছরের এক বলিষ্ঠ যুবক। আর কিছুদিন পর বোধহয় কুড়িতে পর্দাপর্ণ করবে। কিন্তু এই বয়ঃপ্রাপ্তি তাকে শান্ত করার বদলে আরও বেশি বেপরোয়া ও উশৃঙ্খল করে তুলেছে। তার চলন-বলনে এখন এক ধরণের দম্ভ আর উদাসীনতা স্পষ্ট।
ঢাকা শহরে পড়াশোনার আড়ালে পাভেল আর ভিভিয়ান আসলে কী করছে, সেই খবর রাখার মতো সময় এহসান মঞ্জিলের কারোরই নেই।
যথারীতি এভাবে একটি বিষয় পরিবারের সকলের অলক্ষ্যেই রয়ে গেছে—সতেরো বছরের শেষভাগে মাধ্যমিক দিয়ে, আঠারোতে কলেজে ওঠা একসময়ের তুখোড় ছাত্র ভিভিয়ান কেন উনিশ-বিশ বছরে এসেও উচ্চমাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের গণ্ডি পার হতে পারল না। পাভেলও যেন ঘুরেফিরে তারই সঙ্গ ধরেছে। বড়দের অন্ধ বিশ্বাস আর অতিরিক্ত ব্যস্ততার সুযোগে ঢাকার বোর্ডিং লাইফে তারা আসলে নিজেদের জীবনকে কোন পথে পরিচালিত করছে, তা এক নিগূঢ় রহস্যে আবৃত রয়ে গেছে।
প্রচ্ছন্ন দিনের এক তপ্ত অপরাহ্ণে এহসান মঞ্জিলের সদর দরজায় এসে থামল ঢাকা হতে আগত বিশেষ ব্যক্তিদের গাড়িটি। দীর্ঘ অদর্শনের পর তাদের আগমনে বাড়ির নিস্তব্ধতা কিছুটা ভঙ্গ হলো। বাগানের সবুজ ঘাস আর বারান্দার করিডোর জুড়ে তখন ফ্রক-ডাইপার পরা ছোট্ট আনায়া আপন মনে খেলে বেড়াচ্ছে।
হঠাৎ অচেনা দুই যুবককে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। অপরিণত মস্তিষ্কে স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে সে চেনার চেষ্টা করছিল এই মানুষগুলোকে। চেনা কি অচেনা—এই দ্বন্দ্বে তার কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল।
কাশফিয়া আর অনিমা ততক্ষণে নিচে নেমে এসেছে। পাভেল হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল,
“বড় মা, ছোট মা! কেমন আছো তোমরা?”
কাশফিয়া পাভেলের মাথায় হাত রেখে কুশল বিনিময় করল। ভিভিয়ান বরাবরের মতোই নির্বিকার। অনিমা তাদের কাছে এগিয়ে অনুযোগের স্বরে বললেন,
“আব্বারা, শরীরের এই হাল কেন? খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করা না নাকি?”
পাভেল সামান্য মাথা নেড়ে জানাল সে ঠিক আছে। কথোপকথনের ফাঁকেই আনায়া চুপিচুপি এগিয়ে এসে,পেছন থেকে কাশফিয়ার শাড়ির আঁচলটা খপ করে চেপে ধরল।
বড়-মায়ের পেছন থেকে মাথা বের করে সে বড় বড় চোখে আগন্তুকদের পর্যবেক্ষণ করছে। পাভেল লক্ষ্য না করলেও, ভিভিয়ান তার গম্ভীর চাউনিতে ঠিকই আঁড়চোখে সেই লুকোচুরি দেখে নিল। তবে তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর মিলল না।
কাশফিয়া যখন হাসিমুখে আনায়াকে আড়াল থেকে সামনে আনতে চাইলেন, অমনি সে এক ঝটকায় আঁচল ছেড়ে দিয়ে বাড়ির ভেতর দৌড়ে পালাল। কাশফিয়া মেয়ের কাণ্ড দেখে হেসে ফেলে বিড়বিড় করে আওড়ায়, “পাগলি মেয়ে একটা!”
এরপর তিনি ভিভিয়ান আর পাভেলকে ফ্রেশ হওয়ার জন্য, যার ঘরে যেতে বলল। তারা দুজনও কোনো উচ্চবাচ্য না করে সোজা দোতলায় নিজ নিজ কক্ষে চলে গেল।
দীর্ঘ জার্নি করায় ভিভিয়ান সোজা গোসলটা সেরে নিল। ভেজা সিক্ত চুলে যখন ভিভিয়ান নিজের কক্ষে ফিরল, তখনই ঘরের নিস্তব্ধতায় সে এক অন্যরকম উপস্থিতি অনুভব করল। সে অচিরেই বুঝতে পারল—একটা ছোট্ট অস্তিত্ব তার ঘরেই কোথাও ওত পেতে আছে।
ধরা না দেওয়ার ভান করে সে ক্লোজেট থেকে একটি কালো টি-শার্ট বের করে পড়ে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে কাঁচের প্রতিফলনে ঘরের কোণগুলোর দিকে সতর্ক নজর রাখল।
হঠাৎ পেছনে চপল পায়ের ক্ষীপ্র শব্দ পাওয়া গেল। কেউ একজন ছায়ার মতো চোখের আড়ালে ছুটে পালালো। ভিভিয়ান ওষ্ঠকোণে সামান্য হাসি ফুটিয়েও নিজেকে স্বাভাবিক রাখল। পুনরায় চুল মোছার অভিনয় করতেই আবারও সেই একই রকমের ছোটাছুটি আর চাপা হাসির শব্দ কানে এল। ভিভিয়ান এবার আর সময় নিল না; বিদ্যুৎগতিতে পেছনে ফিরেই হাতের থাবায়, সেই ছোট্ট অস্তিত্বটাকে ছোঁ মেরে তুলে নিল।
আনায়ার ফ্রকের পেছনের অংশটি শক্ত করে চেপে ধরে, তাকে শূন্যে ঝুলিয়ে নিজের মুখোমুখি উঁচিয়ে ধরল। ঝুলতে থাকা আনায়া ভয় পাওয়ার বদলে খিলখিল করে হেসে উঠল। ভিভিয়ান তার চোখজোড়া ছোট ছোট করে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হাস্যমুখী আনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।আরেক হাতে মাথার পেছনের দিকটা খানিক আনমনে মুছে নিয়ে, তোয়ালেটা বিছানায় ছুড়ে ফেলল। গম্ভীর স্বরে আনায়াকে প্রশ্ন করল—
“মনে আছে, নাকি আবারও ভুলে গেছিস আমায়?”
আনায়া তার দিকে চেয়ে আচমকা খিলখিল করে হেসে ওঠে। আধো-আধো স্বরে জবাব দেয়,
“বিভাব বাইয়া!”
নিজের নামের এই অদ্ভুত সুন্দর উচ্চারণ শুনে ভিভিয়ানের রুক্ষ মুখে এক প্রশস্ত হাসি ফুটে ওঠে। সে তার ভেজা চুলগুলো প্রবলভাবে দুবার ঝাঁকিয়ে নিতেই পানির সূক্ষ্ম ছিটেফোঁটাগুলো সরাসরি আনায়ার মুখে গিয়ে লাগল। আনায়া সেই স্পর্শে আরও বেশি আহ্লাদিত হয়ে হাসতে লাগল।
ভিভিয়ান তাকে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা কোনো বস্তুর ন্যায়, আলতো করে নিজের বিছানায় বসিয়ে দেয়। অতঃপর নিজেও আধশোয়া হয়ে, এক হাতে মাথা ঠেকিয়ে আনায়ার দিকে মুখ করে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল।
অন্যদিকে আনায়া তখন জ্যান্ত পুতুলের মতো চুপটি করে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। অবিন্যস্ত চুলের কারণে আনায়াকে বেশ অগোছালো দেখাচ্ছিল। ভিভিয়ান হাত বাড়িয়ে সেই অবাধ্য চুলগুলো আরও খানিকটা এলোমেলো করে,অচিরেই ঠিক করে দিয়ে কিছুটা রুক্ষ স্বরে বলল,
“চুলগুলো সব শাঁকচুন্নির মতো বানিয়ে রেখেছিস। বাড়িতে কি তোর কেউ দেখাশোনা করে না?”
ভিভিয়ানের গলার স্বরে একধরণের ক্ষীণ অনুযোগ। যা শুনে আনায়া কিছুটা মিইয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে নিরীহ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে জানাল,
“নাহ্!”
তার এই সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে ভিভিয়ান মলিন হাসল। অজান্তেই কি যেন ভেবে একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস গোপন করে, সে বিছানায় থাকা ব্যাগপ্যাকটি কাছে টেনে নিল। ব্যাগ খুলে মুঠো ভর্তি রঙ-বেরঙের চকলেট বের করে সে আনায়ার সামনে রাখল। চকলেট দেখে আনায়া উচ্ছ্বসিত হলেও তার নজর আটকে গেল ব্যাগের আধখোলা চেইনের দিকে। সে উৎসুক হয়ে আঙুল উঁচিয়ে ইশারা করল,
“বাইয়া! ওতা কি?”
ভিভিয়ান লক্ষ্য করল ব্যাগের ভেতরে তুলোর তৈরি একটি সাদা-গোলাপী লম্বা কানের অংশ দেখা যাচ্ছে। সে তৎক্ষনাৎ কানটি ধরে টান দিতেই, বেরিয়ে এল এক শুভ্র নরম তুলোর খরগোশ। আনায়ার মুখের হাসি যেন আর ধরে না। ভিভিয়ান পুতুলটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত উদাসীন ভঙ্গিতে পরখ করছিল।
তৎক্ষনাৎ আনায়া তখন উচ্ছ্বসিত কন্ঠে, হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল,
“এতাও আমার?”
ভিভিয়ান ক্ষণকাল স্তব্ধ হয়ে তার ‘তারা’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ কি যেন একটা ভেবে নিয়ে শান্ত-গম্ভীর স্বরে শুধায়,
“পছন্দ হয়েছে তোর?”
আনায়া প্রবল বেগে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,
“হু, হু, অন্নেক ছুন্দর!”
ভিভিয়ান আর কথা বাড়াল না। খরগোশটি আনায়ার কোলে তুলে দিয়ে নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“তাহলে এটা তুই রাখ।”
আনায়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে সেই সাদা খরগোশটিকে দুই হাতে বুকের সাথে জাপটে জড়িয়ে ধরল।আনায়া পুতুলটা জড়িয়ে, কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তার পর ভিভিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“বাইয়া, ওর নাম কি?”
ভিভিয়ান তার ভাষা বুঝে নিয়ে, নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দেয়,
“জানি না। তুই রেখে দে কিছু একটা।”
আনায়া তার কথার সম্মতি জানাতে মাথাটা খানিক এপাশ-ওপাশ করল। কিছুক্ষণ আগে ভিভিয়ানের গুছিয়ে দেওয়া চুলগুলো আবারও এলোমেলো হলো। এদিকে আনায়া খানিক ভাবনাচিন্তার পর বলল,
“বানি?”
ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
“বানি? বানি অর্থ কি তুই জানিস?”
আনায়া মাথা ঝাঁকিয়ে আওড়ায়,
“হু,হু, খগ্গোস!”
এই বলে সে আবারও খিলখিল করে হেসে ওঠে। তার এহেন কান্ডে ভিভিয়ানও ক্ষীণ হাসে। যদি তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে কোথাও না কোথাও খানিক দুশ্চিন্তায় আছে। যদিও তা কোনোভাবে প্রকাশ করতে চাচ্ছে না।
এদিকে আনায়া খরগোশটা নিয়ে খেলার ছলেই, হুট করে ভিভিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“তাওলে ও আমার বানি আর তুমি হলে আমার হানি! আছ্ছা?”
সহসাই ক্ষণিকের জন্য চিন্তামগ্ন হয়ে যাওয়া ভিভিয়ান, ভ্রু কুটি করে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি তোর হানি? হানি অর্থ কি, বলতো?”
—“উমম…বাদুর।”
ভিভিয়ানের ভ্রু-জোড়া আরো বেশি কুঁচকে গেল।
—“হানি অর্থ বাদুর, এটা তোকে কে বলল?”
এবার আনায়া বেশ বিজ্ঞ ভঙ্গিতে আওড়ায়,
“উযে টিবিতে দেকিচি, বানি একতা খগ্গোস আর হানি একটা বাদুর। আকাশে উড়ে।তোমার মতো দাঁতও আছে। আর ঐ খোগ্গসের মতো আমারও দেখো দুতো দাঁত, হি হি…!”
ভিভিয়ান বুঝে যায় এ কি বলতে চাচ্ছে। নিশ্চিত কোনো কার্টুন চরিত্রকে এভাবে বর্ননা করছে। তবুও খানিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে, রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“তোর আমাকে বাদুর মনে হয় কোন দিক থেকে?”
আনায়া শুরুতেই কিছু বলল না। কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তা করে আবারও উচ্ছসিত স্বরে বলে উঠল,
“না না, তুমি বাদুর না। তুমি রেড।”
—“তা এটা আবার কোন আহাম্মক?”
—“উযে রেড, তুমি চিনো না? একটা লাল পাকি, লাল লাল কালার…কিন্তু উত্তে পারে না।একটুও কতাটতা বলে না। সবসসময় চুপতি করে থাকে। ওর অনেক রাগগগগ।তোমার মতো! খালি মুখ ফুলে থাকে। এক্টুও হাচে না।”
বহুকষ্টে একবারে এতোগুলা কথা শেষ করে,আনায়া প্রায় হাঁপিয়ে উঠল। ভিভিয়ান সবটা দেখে ভারী শ্বাস ফেলে, ক্ষীণ হেসে বলল,
“হয়েছে,আজ অনেক কথা বলে ফেলেছিস। আরেকটু কথা বললে হাঁপাতে হাঁপাতে পেট ফেটে যাবে। এখন গিয়ে তোর বড়-মা’কে বল, আমার খিদে পেয়েছে। কিছু খাবার এখানে পাঠিয়ে দিতে।”
—“আছ্ছা।”
আনায়া আর দেরি করল না। রুম থেকে ছুটে চলে যাবার প্রস্তুতিতে,আগে বুকের মধ্যে পুতুল আর চকলেটগুলো জড়িয়ে গুছিয়ে নিল।কিন্তু বিছানার কিনারায় দাঁড়াতেই বুঝল,এখান থেকে সে নামতে পারবে না। যথারীতি পেছন ফিরে মলিন মুখে ভিভিয়ানের দিকে তাকাতেই, সে তাকে তৎক্ষনাৎ দুহাতে কোলে তুলে নিচে নামিয়ে দিল। আনায়া পুনরায় আহ্লাদিত হয়ে, ছুটতে ছুটতেই বলল,
“বাইয়া হাংকউউ!”
আনায়া রুম ছেড়ে চলে গিয়েছে। কিন্তু ভিভিয়ান এই ‘হাংকউউ’ এর অর্থ খুজে পেল না। কিছুক্ষণ যেতেই বুঝল, সে থাংক ইউ’কে হাংকউউ বলে চলে গিয়েছে। ভিভিয়ান তাচ্ছিল্যের সাথে ক্ষীণ হেসে আওড়াল,
“বিচ্ছু একটা!”
এই বলেই সে বিছানায় হাতদুটো দুদিকে ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। চোখে-মুখে আবারও দুশ্চিন্তার ছাপ নেমে এলো। না, সে নিজের জন্য কিছু ভাবছে না। কিন্তু ভাবছে তার পরিবার ও আরো এক বিশেষ মানুষটার জন্য। নিজের হোক বা পরিবার—কখনো কারোর পরোয়া না করা মানুষটাকে,এখন এসব নিয়েই ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।
ভিভিয়ান চোখদুটো বুঁজে নিয়ে, ঘাড়ের নিচে একহাত রেখে, ক্ষীণ স্বরে গেয়ে ওঠে,
মহামায়া পর্ব ১৯
“Secrets I have held in my heart,
Are harder to hide than I thought
Maybe I just wanna be yours!
I wanna be yours, I wanna be yours
Wanna be yours,Wanna be yours___
