মহামায়া পর্ব ২১
তুশকন্যা
বিছানায় দেহটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজেছে ভিভিয়ান। কিন্তু বাইরের নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করতে পারল না, বরং স্মৃতির এক অদ্ভুত ঘূর্ণাবর্তে সে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্কের পর্দায় ভেসে উঠছে ঠিক কয়েক দিন আগের এক গোধূলি বেলার প্রতিচ্ছবি।
বিকেলের শেষ রক্তিম আভা তখন ম্লান হয়ে আসছে। কোচিং সেন্টারের সামনে রাখা বাইকের ওপর হেলান দিয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে ভিভিয়ান এহসান। পরনে নিকষ কালো টিশার্ট আর প্যান্ট, যা তার গম্ভীর অবয়বে এক প্রকার রুক্ষ আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছে। কাঁধ অবধি নেমে আসা চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় খানিকটা এলোমেলো। বাম হাতে কালো রঙের একটি ঘড়ি,একইসাথে একটি কালো রঙের ব্রেইডেড ব্রেসলেট।
তার পাশেই আবার নিজস্ব বাইক নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান, আরাফ আর ইলহাম সহ তাদের গ্যাং এর বাকি সদস্যগণ। যারা এলাকায় ‘হেলিশ বিস্টস্’ নামেও পরিচিত, আর এই ত্রাস ও দাপটের নেপথ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক নাম—ভিভিয়ান এহসান।
তাদের অপেক্ষার কিছুক্ষণ বাদেই কোচিংয়ের গেট খুলে গেল। একদল কিশোর-কিশোরী কলকাকলি করতে করতে বেরিয়ে আসছে ঠিকই, কিন্তু ভিভিয়ানের তীক্ষ্ণ আর স্থির দৃষ্টি কেবল একজনের প্রতীক্ষায় নিবদ্ধ। ভিভিয়ানের ব্যক্তিত্বের গভীরতা এতটাই যে, তার সেই চাউনি ভেদ করে অন্য কিছু দেখার জো নেই।
অবশেষে তার সেই কাঙ্খিত মানুষটিও দেখা মিলল। ধূসর-সাদা স্কুল ইউনিফর্মে সাধারণ এক কিশোরী—মাথায় লম্বা দুটো বিনুনি। বয়সের বিচারে ভিভিয়ানের চেয়ে কয়েক বছরের ছোট এই মেয়েটি। এখনো স্কুলের গণ্ডিও পেরোয়নি। দশম শ্রেণির ছাত্রী মাওরার সৌন্দর্য দেখতে ভারী চমৎকার হলেও, তার সেই মায়াবী হরিণী চোখ দুটো যেন একটু বেশিই আকর্ষণীয়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে সে ভিভিয়ানের দিকে এগিয়ে এল।মাওরা কাছে আসতেও, ভিভিয়ানের ভাবলেশহীন মুখে কোনো পরিবর্তন ঘটল না। তবে তার বন্ধুরা তটস্থ হয়ে পড়ল। একযোগে সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বেশ বিনয়ের সাথে বলে উঠল,
“আসসালামু আলাইকুম ভাবী, ভালো আছেন?”
পরিণত বয়সের ছেলেগুলোর এমন মাত্রাতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন মাওরাকে প্রতিবারই অপ্রস্তুত করে তোলে। সে কিছুটা সংকুচিত হয়ে আড়চোখে ভিভিয়ানের দিকে তাকাল, কিন্তু তার মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই। ভিভিয়ান আগের মতোই নিস্পৃহ। মাওরা ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাইয়ারা। আপনারা ভালো আছেন?”
—“হ্যাঁ, আমরা সবাই ভালো…”
বন্ধুদের কথা শেষ করার অবসর দিল না ভিভিয়ান। বাইকের ইঞ্জিনে একটা গম্ভীর গর্জন তুলে মাওরার দিকে তাকিয়ে কর্তৃকসরূপ সংক্ষিপ্ত আদেশ করল,
“মাওরা, বাইকে ওঠো।”
মাওরা খানিকটা দোটানায় পড়ে মিনমিন করে বলল,
“বলছিলাম, রিকশায় যাই?”
ভিভিয়ান কথা বাড়াল না, কেবল তার সেই শীতল আর কর্তৃত্বব্যঞ্জক দৃষ্টিটা মাওরার চোখের ওপর স্থির করল। সেই এক পলকের চাহনিতেই মাওরা বুঝে নিল তার পরবর্তী পদক্ষেপ। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে ভিভিয়ানের পেছনে চেপে বসল। মুহূর্তেই ভিভিয়ানের বাইকের সাথে সাথে বাকি ছয়-সাতটা বাইকও গতি নিল।
ফাঁকা রাস্তায় পড়তেই ভিভিয়ান এক্সিলারেটর ঘুরিয়ে দিল। বাইকের গতিবেগ বাড়ার সাথে সাথে মাওরা ভয়ে কিছুটা কুঁকড়ে গেল। বাতাসের ঝাপটা আর তীব্র গতি থেকে বাঁচতে সে অচিরেই ভিভিয়ানের পিঠের ওপর ঝুঁকে পড়ল, কাঁধের ওপর রাখা হাতের মুঠোটা শক্ত হয়ে এল।
মাওরার পূর্ণাঙ্গ নাম, ‘মাওরা ওয়াসিম’। সে সিলেটের মেয়ে। পড়াশোনার জন্য পরিবারের মায়া কাটিয়ে ঢাকা এসেছিল অনেক আগেই। কয়েকটা বছর আত্মীয়ের বাসায় কাটানোর পর নবম শ্রেণিতে উঠতেই সে স্কুলের হোস্টেলে চলে যায়।কিন্তু ভিভিয়ানের সাথে তার সম্পর্কের সূত্রপাত সেই অষ্টম শ্রেণি থেকে।
সময়ের সাথে সাথে ভিভিয়ান তাকে নিয়ে এতটাই সংবেদনশীল আর জেদি হয়ে ওঠে যে, তার নির্দেশে শেষ পর্যন্ত হোস্টেল ছাড়তে বাধ্য হয় মাওরা। হোস্টেলের কঠোর নিয়মকানুন ভিভিয়ানের উপস্থিতিকে সহজভাবে গ্রহণ করত না, তাই মেসের স্বাধীন জীবনই ছিল ভিভিয়ানের পছন্দ।
নটরডেম আর হলিক্রস—দুজনের দুই মেরুর জীবনযাত্রা হলেও ভিভিয়ানের গম্ভীর ছায়ার নিচেই যেন মাওরার পুরো পৃথিবী আবর্তিত হয়।কোচিং সেন্টার থেকে মাওরার মেস বেশ খানিকটা দূরত্বে। প্রতিদিন ক্লাস শেষে ভিভিয়ান নিজেই তাকে পৌঁছে দেয়। তবে আজ রাস্তার মোড়গুলোতে ভিভিয়ানের বাইকের অভিমুখ দেখে মাওরা আঁচ করতে পারল, গন্তব্য মেস নয়। সে অত্যন্ত নরম গলায় ডাকল,
“ভিভিয়ান!”
—“হু, বলো।”
—“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
—“কাছেই একটা রেস্টুরেন্ট আছে। ওখানেই যাচ্ছি।”
মাওরা আর কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না। সে জানে, ভিভিয়ানের মেজাজ আর তার গাম্ভীর্য ইদানীং এক অদ্ভুত পাগলামির দিকে মোড় নিচ্ছে। সন্ধ্যার ধূসর আলোয় মাওরার মনে হালকা উদ্বেগের ছাপ পড়লেও সে চুপ করে রইল।
রেস্টুরেন্টের কাছাকাছি আসতেই সে লক্ষ্য করল, পেছনে থাকা ভিভিয়ানের বন্ধুরা হুট করেই পথ বদলে ভিন্ন দিকে চলে গেল। মাওরা ভ্রুকুটি করে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়ারা কোথায় গেল? তারা আসবে না?”
ভিভিয়ান সংক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিল, “ওরা কাজে গিয়েছে।”
বিশাল এক রেস্টুরেন্টের সামনে এসে বাইক থামাল সে। মাওরা নামার পর ভিভিয়ানও নেমে পড়ল। ভেতরে পা রাখতেই দুজন যুবক এগিয়ে এসে, ভিভিয়ানকে দেখে বেশ বিস্তৃত হেসে, নিচু স্বরে বলল,
“বড় ভাই, আসসালামু আলাইকুম। সব রেডি আছে।”
ভিভিয়ান কোনো কথা বলল না। সে কোনো দিনই কোলাহল পছন্দ করে না। রেস্টুরেন্টের এক নির্জন প্রান্তের পরিচ্ছন্ন টেবিলটি তার জন্যই নির্দিষ্ট করা ছিল। মাওরাকে নিয়ে সে সেখানে গিয়ে বসল।
রেস্টুরেন্টের সেই নিভৃত কোণায় এক ধরনের শান্ত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। বাইরের ব্যস্ত শহরের হট্টগোল এখানে এসে ক্লান্ত হয়ে থমকে যায়। টেবিলে রাখা হালকা হলদেটে আলোটা মাওরার ওপর পড়তেই তার চেহারার দ্বিধাটুকু আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
ভিভিয়ান কোনো তাড়াহুড়ো করল না। সে খুব স্থিরভাবে বসলো, তার দীর্ঘ আঙুলগুলো টেবিলের ওপর এক তাল মেলাচ্ছে।
মাওরা কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকার পর সাহস সঞ্চয় করে মুখ তুলল। ভিভিয়ানের চোখে চোখ রাখাটা তার জন্য সব সময়ই কঠিন, তবুও সে মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল,
”হুট করে আবার এখানে কেন নিয়ে এলে? তার চেয়ে মেসেই রেখে আসতে।”
ভিভিয়ান শান্ত অথচ ভারিক্কি গলায় জবাব দিল,হ
”চিন্তা করার কিছু নেই। এখন মাথা ঠান্ডা রেখে খেয়ে নাও। সময় হলে বিনাবাক্যে আমি তোমায় রেখে আসব।”
মাওরা একটু চুপ থেকে বলল,
“একটা কথা বলি? তুমি একটু বেশিই গম্ভীর হয়ে যাচ্ছো না ইদানীং? কেমন যেন অদ্ভুত লাগে তোমায়। ওসব ছাইপাঁশ সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিও তো। যে নেশায় কোনো ভালো নেই, ওসবে মত্ত হয়ে কি লাভ?”
ভিভিয়ানের ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল, যা অনেকটা বিদ্রুপাত্মক দেখাল। সে সামনে ঝুঁকে এলে, মাওরা অজান্তেই একটু পেছনে সরে গেল। ভিভিয়ান অনুচ্চ স্বরে বলল,
“আসক্তি মাত্রই ধ্বংসাত্মক, মাওরা—তা সে তামাকের ধোঁয়া হোক কিংবা তোমার ঐ দু’চোখের মায়া। তুমি আমায় এক আসক্তি ছাড়তে বলছো, অথচ তুমি নিজেই যে এক দুর্নিবার নেশা, তা কি জানো?”
মাওরা উত্তর দেয় না। ভিভিয়ান ক্ষীণ হেসে গম্ভীর স্বরে আবারও বলল,
“তবে শোনো, এক তুচ্ছ বিষ ত্যাগের বিনিময়ে যদি ‘তুমি’ নামক এই মহাজাগতিক নেশাকে আজীবনের তরে ললাটলিখন করে পাওয়া যায়, তবে আমি এই মুহূর্তেই সহস্র নেশা বিসর্জন দিতে রাজি।
তুমি কি চাও, আমি এই নিয়েও বাজি ধরব?… ইদানীং আমি কেমন হয়ে যাচ্ছি জানি না,তবে তুমি কিন্তু আমায় বেশ পোড়াচ্ছো।”
মাওরা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।ভিভিয়ান তখনও সরেনি। তার চোখের সেই স্থির, অন্ধকার চাউনি মাওরার সমস্ত সত্তাকে এক অদ্ভুত সম্মোহনে বন্দি করে ফেলেছে। মাওরা কথা বলতে চাইল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
ভিভিয়ান সামান্য বাঁকা হাসল—সেই একই বিদ্রূপাত্মক কিন্তু নেশাতুর হাসি। সে আলতো করে মাওরার এক গুচ্ছ চুল কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“চুপ করে থেকো না, মাওরা। মৌনতা মানেই কিন্তু আমি সম্মতি ধরে নেব। আর আমি যদি একবার বাজি ধরি, তবে তাতে হারার অভ্যাস আমার নেই।”
মাওরা এবার চোখ নামিয়ে নিল। ভিভিয়ানের এই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস আর গাম্ভীর্যের সামনে সে বড্ড অসহায়। সে বুঝতে পারল, সে ভিভিয়ানকে নেশামুক্ত করতে নয়, বরং সে নিজেই এক অতলান্ত মোহের জালে জড়িয়ে পড়েছে। মাওরা অস্ফুট স্বরে শুধু বলল,
“তোমার কি হয়েছে কে জানে। তবুও বলবো ওসব ছেড়ে দাও।”
—“আচ্ছা ঠিক আছে,এসব নিয়ে পরে কথা হবে। আগে এটা বলো, তোমার বিয়ের হয়েছে?”
হঠাৎ এমন এক নির্লিপ্ত প্রশ্নে মাওয়া থতমত খেয়ে যায়।
—“হঠাৎ এই কথা?”
ভিভিয়ান আবারও নিরুদ্বেগ ভাবগম্ভীর্যের সাথে বলল,
“আর কিছুদিন পর সতেরো হবে…তাই তো? উমমম…ব্যাপার না, আগেই বিয়েটা সেড়ে ফেলবো। এভাবে আর দেরি করে লাভ নেই।”
—“মাথা খারাপ হয়েছে তোমার? এখনই কিসের বিয়ে…আর তোমার এসব পাগলামি আমি মেনে নিলেও পরিবার মানবে?”
—“মানলে মানবে না মানলে নেই, ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই৷ বিয়ে করবো, তাদের কাছ থেকে দোয়া নেবো, বাড়িতে থাকতে দিলে থাকবো, নয়তো অন্য কোনো ব্যবস্তা করে নেবো।
ডোন্ট ওয়ারি, ওতোটাও অকর্মা হইনি যে বিয়ের পর তোমার খরচাটাও যোগার করতে পারব না।”
—“ভিভিয়ান তুমি আদৌও জানো,তুমি কিসব বলো আর কিসব করো? আমরা আমরা না হয় তোমার বিষয়টা বুঝে নিলাম, বাদবাকি সবাইও কি তাই বুঝবে নাকি?”
—“আমার পায়ের নিচের মাটি যেমন শক্ত, তেমনি আমার চারপাশের মানুষের আনুগত্যও প্রশ্নাতীত। আমি যা করি, তা তো সবার বোঝার দরকার নেই।”
ভিভিয়ানের নির্লিপ্ত সব কথাবার্তায় মাওরার যেন মাথায় হাত। এমন পাগলাটে মানুষ তার কপালেই জুটেছিল? হুট করে এই বিয়ের ভুত মাথায় কে ঢুকালো? না জানি সামনে কোন পাগলামি করে বসে।
মাওরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, এই গম্ভীর মানুষের সাথে এসব তর্কে জেতা অসম্ভব। তাই চুপ থাকাই ভালো।দিনশেষে ভিভিয়ান এহসানের ভালোবাসা যতটা গভীর, তার চেয়েও বেশি প্রখর তার আধিপত্য।
কিছুক্ষণ পর খাবার চলে এলে ভিভিয়ান নিজেই প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল,
”খেয়ে নাও। এরপর তোমাকে পৌঁছে দেব। কাল থেকে কোচিংয়ের পর ঠিক সময়ে বাইরে থাকবে, আমি লোক পাঠাব অথবা নিজেই আসব।”
মাওরা নিঃশব্দে খেতে শুরু করল। ভিভিয়ান তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই নিজের মনের গভীরে কোথাও যেন এক অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব করল, যা সে কখনো প্রকাশ করে না। মাওরার এই শান্ত ভীরুতা তাকে যেমন টানে, তেমনি তাকে আরও বেশি রক্ষনশীল করে তোলে।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে ওরা যখন রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এল, বাইরের বাতাসে তখন রাতের হিমেল আমেজ। নিয়ন আলোর প্রতিফলনে ভিভিয়ানের অবয়বটা আগের চেয়েও বেশি রহস্যময় আর গম্ভীর দেখাচ্ছে। ভিভিয়ান বাইক স্টার্ট দিতেই মাওরা তার পেছনে গুছিয়ে বসল।
ব্যস্ত শহরের বুক চিরে বাইক ছুটতে শুরু করেছে গন্তব্যের দিকে।রাস্তার ট্রাফিক আর যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝেও মাওরার নজর হঠাৎ আটকে গেল রাস্তার অন্য প্রান্তের এক কোণে। সেখানে একটি ফুটপাতের ফুলের দোকান; বাহারি সব ফুলে সাজানো। বিশেষ করে ঝুড়িতে রাখা তাজা গোলাপগুলো রাতের আলোয় অদ্ভুত মায়াবী দেখাচ্ছে।
মাওরা অজান্তেই আনমনা হয়ে গেল।
বাইক যখন সিগন্যালে এসে থামল, মাওরা অত্যন্ত সন্তর্পণে ভিভিয়ানের পেশীবহুল বাহুর কালো টি-শার্টের হাতাটা কিঞ্চিৎ টেনে ধরল। অতি ক্ষীণ আর সংকুচিত স্বরে সে ডাকল,
“ভিভিয়ান!”
ভিভিয়ান সামান্য কপাল কুঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। মাওরার সেই হরিণী চোখদুটোর দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টিতে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় খেলে গেল। পরক্ষণেই সে অনুসরণ করল মাওরার দৃষ্টিপথ। রাস্তার ওপাশের সেই ফুলের দোকানটা দেখতে পেয়ে ভিভিয়ান কোনো পাল্টা প্রশ্ন করল না। বাইকটা একপাশে স্ট্যান্ড করিয়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“বাইকে বসে থাকো, এনে দিচ্ছি।”
মাওরার ঠোঁটের কোণে নিমিষেই এক টুকরো বিস্তৃত হাসি ফুটে উঠল। ভিভিয়ান দৃঢ় পায়ে লম্বা কদমে রাস্তা পেরিয়ে দোকানের ভিড়ে মিশে গেল।
মিনিট পাঁচেক পর ভিভিয়ান যখন ফিরে এল, মাওরা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে সম্পূর্ণ স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। ভেবেছিল সাধারণ একটা তোড়া হবে, অথচ ভিভিয়ানের হাতে একশ এক রক্তলাল গোলাপ দিয়ে তৈরি এক বিশাল আয়তনের বুকেট। এতগুলো গোলাপের তীব্র সুবাস আর লালের সমারোহে ভিভিয়ানের সেই রুক্ষ অবয়বটাও যেন মাওরার কাছে,এক মুহূর্তের জন্য নমনীয় হয়ে পড়েছে।
মাওরা বিস্ময় সামলাতে না পেরে বলে উঠল,
“এটা কী করলে? তুমি কি দিন দিন পাগল হয়ে যাচ্ছ?”
ভিভিয়ান যথারীতি নির্বিকার। সেই বিশাল ফুলের তোড়াটা মাওরার কোলে তুলে দিয়ে সে সরাসরি মাওরার চোখের গভীরে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তার কণ্ঠে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, গম্ভীর আর নেশাতুর স্বর,
“হচ্ছি বোধহয় পাগল। আর কারণটাও হয়তো তুমি।”
মাওরা আর বলার মতো কিছু খুজে পেল না। ভিভিয়ানের এমন সরাসরি আর নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তি তাকে বাকরুদ্ধ করে দিল। তার চারিত্রিক কাঠিন্যের আড়ালে যে কতটা নিয়ন্ত্রণহীন পাগলামি লুকানো থাকতে পারে, তা মাওরার কল্পনারও অতীত।
এদিকে ভিভিয়ান নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়েছে। আবারও সেই চেনা নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বাইক স্টার্ট দিয়ে বলল,
“চলো এবার, যাওয়া যাক।”
রাত গভীর হচ্ছে। বিশাল সেই গোলাপের তোড়া বুকে চেপে ধরে মাওরা আবারও ভিভিয়ানের পেছনে বসল। বাইক ছুটছে মেসের দিকে, আর মাওরার মনের কোণে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ভিভিয়ানের সেই সংক্ষিপ্ত অথচ ভারী অভিব্যক্তিখানি।
মেসের গলির মুখে এসে ভিভিয়ান বাইক থামাল। চারপাশ নিঝুম হয়ে এসেছে। ল্যাম্পপোস্টের ম্লান হলদেটে আলোয় ভিভিয়ানের কঠিন মুখাবয়বটা আরও স্পষ্ট। কিছুক্ষণ আগেই কেনা সেই বিশাল লাল গোলাপের স্তবকটি হাতে নিয়ে মাওরা যখন বাইক থেকে নামল, ভিভিয়ান কেবল একবার তার চোখের দিকে তাকাল। খুব সংক্ষিপ্ত বিদায় জানিয়ে সে বাইক ঘুরিয়ে অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেল।
মাওরা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মেসের গেটের দিকে পা বাড়াতেই হুট করে ছায়াঘেরা দেয়ালের আড়াল থেকে এক যুবক বেরিয়ে এল। ছেলেটার নাম তন্ময়।মাওরার স্কুলের কাছেরই এক নামকরা কলেজের ফাস্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট।
এলাকায় নতুন আসা এই ছেলেটি গত কয়েক দিন ধরেই মাওরাকে নিয়ে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আছে। যা মাওরা বারবার বুঝেও না বোঝার ভাণ করেছে। অসময়ে তাকে মেসের সামনে দেখে মাওরা শিউরে উঠল। তার দুশ্চিন্তার একমাত্র কারণ ভিভিয়ান; যদি সে কোনোভাবে এইসব জেনে ফেলে, তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা কল্পনা করেই মাওরার বুক কেঁপে উঠল।
তন্ময় কোনো ভূমিকা ছাড়াই মাওরার পথ আগলে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এক ধরনের বেপরোয়া আবেগ। সে অনর্গল বলতে শুরু করল তার ভালো লাগার কথা, তার অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা। মাওরা প্রবল অস্বস্তি নিয়ে তাকে থামানোর চেষ্টা করল। সে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করল যে এটা সম্ভব নয়, কিন্তু আবেগের আতিশয্যে তন্ময় তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য।
আলোচনার এক পর্যায়ে তন্ময় মাওরার অনেকটা কাছাকাছি এসে তার হাতটা আঁকড়ে ধরল। কথা বলতে বলতে মাওরা নিজেও তখন খেয়াল করেনি যে তন্ময় তার হাত ধরে আছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই পরিবেশটা কেমন যেন ভারি হয়ে উঠল।ভিভিয়ান বাইক নিয়ে সামনের মোড়টা পেরিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ কী মনে করে সে আবার ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। মাওরার জন্য কয়েকটা পছন্দের চকলেট কিনে সে বাইকটা মোড়েই রেখে পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসছিল।
ভেবেছিল গেট দিয়ে ঢোকার আগে শেষবার মাওরাকে দেখে নেবে। কিন্তু ল্যাম্পপোস্টের সেই ম্লান আলোয় যা দেখল, তাতে ভিভিয়ান এহসানের শান্ত অবয়ব নিমিষেই এক রুদ্র মূর্তিতে পরিণত হলো।
এদিকে কথার মাঝেই মাওরা অনুভব করল এক জোড়া প্রখর, শীতল দৃষ্টি তাদের ওপর নিবদ্ধ। মাথা তুলতেই দেখল, কয়েক গজ দূরে অন্ধকারের মাঝে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভিভিয়ান। তার তীক্ষ্ণ নজরটি তীরের মতো বিঁধে আছে তাদের হাতের ওপর—যেখানে তন্ময় শক্ত করে তার হাতটা ধরে রেখেছে।
মাওরা আতঙ্কিত হয়ে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল। তার গা-টা অচিরেই কেঁপে উঠল। মুখ দিয়ে কোনো শব্দও বেরোচ্ছে না।
ভিভিয়ান ধীর কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক আসন্ন ঝড়ের সঙ্কেত। তন্ময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠে, খাদে নামা তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করল,
“এখানে কী হচ্ছে?”
তন্ময় এবার ভিভিয়ানের দিকে তাকাল। ভিভিয়ানের ব্যক্তিত্ব আর তার চোখের সেই শীতল আগ্নেয়গিরির মতো তেজ দেখে তন্ময় কিছুটা থতমত খেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে পালটা প্রশ্ন করল,
“আপনি কে?”
ভিভিয়ান সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। তার নজর তন্ময়ের ওপর স্থির রেখেই মাওরাকে জিজ্ঞেস করল,
“মাওরা, ওকে তুমি চেনো?”
মাওরা তখন ভীতু হয়ে নুইয়ে আছে।ভিভিয়ানের মেজাজ সম্পর্কে সে অবগত। তন্ময়কে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকে বাঁচাতে সে এক মুহূর্তের জন্য সত্য গোপন করে কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠল,
“আ… হ্যাঁ, পরিচিত আত্মীয় আরকি।”
ভিভিয়ানের ভ্রু কিঞ্চিৎ কুঁচকে ক্ষীণ হাসল। সে আবারও শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কাজিন?”
মাওরা নিরুপায় হয়ে যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়াল। তন্ময় তখন প্রচণ্ড অবাক। সে ভাবল, মাওরা কেন মিথ্যে বলছে? তবে কি এটাই সেই মানুষটি যার কথা মাওরা আগে ইঙ্গিত দিয়েছিল? এলাকার ‘হেলিশ বিস্টস্’ গ্যাং এর লিডার হিসেবে,চারপাশে ভিভিয়ানের দাপট থাকলেও তন্ময় নতুন হওয়ায় তাকে ঠিক চিনতে পারল না।
মাওরা পরিস্থিতি সামাল দিতে তন্ময়কে উদ্দেশ্য করে দ্রুত বলল,
“তোমার সাথে এই ব্যাপারে পরে কখনো কথা হবে, তুমি এখন যাও।”
তন্ময় কিছুটা ইতস্তত করে চলে যেতে উদ্যত হতেই ভিভিয়ান তার পথ আগলে দাঁড়াল। অত্যন্ত ধীরভঙ্গিতে তন্ময়ের এক কাঁধে হাত রাখল ভিভিয়ান। তার আঙুলের চাপ আর কণ্ঠস্বরের সেই অদ্ভুত গাম্ভীর্য তন্ময়কে ভেতর থেকে খানিক ভড়কে দিল। ভিভিয়ান ধীর স্বরে গম্ভীর্যের সাথে ক্ষীণ হেসে আওড়াল,
“শালা বাবু, আশা করছি শীঘ্রই আমাদের আবারও দেখা হচ্ছে।”
কথার অন্তর্নিহিত অর্থ মাওরা কিংবা তন্ময় ঠিক বুঝতে না পারলেও এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি স্পষ্টত ছিল। তন্ময় আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করল। তন্ময় আড়াল হতেই মাওরা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ভিভিয়ান তাকে সেই সুযোগটুকুও দিল না। পকেট থেকে কিছু চকলেট বের করে মাওরার হাতে গুঁজে দিয়ে সে অত্যন্ত শীতল স্বরে নির্দেশসরূপ বলল,
”চুপচাপ ভেতরে যাও। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। আমি আর পড়াশোনা ছাড়া, বাদবাকি কোনো কিছুতেই যেন তোমার ধ্যান দিতে না দেখি।”
মাওরা আর কথা বলার সাহস পেল না। সে দ্রুত মেসের ভেতরে ঢুকে পড়ল। গেটের ওপাশ থেকে সে একবার উঁকি দিয়ে দেখল—ভিভিয়ান একবিন্দু নড়েনি। মাওরা পুরোপুরি ভেতরে না যাওয়া পর্যন্ত সে স্থির হয়ে গম্ভীর্যের সহিত দাঁড়িয়ে রইল।
পরদিন বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে সন্ধ্যার ধূসরতায় মিশে যাচ্ছে, ঠিক তখন শহরের এক নিভৃত গলির মোড় থেকে তন্ময়কে একপ্রকার টেনে-হিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো ব্রিজের নিচের নির্জন সেই ফাঁকা চত্বরে। জায়গাটা শহরের মূল কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন, চারদিকে শুধু জমাটবদ্ধ অন্ধকার আর গুমোট নিস্তব্ধতা। তন্ময় শুরুতে পরিস্থিতির আকস্মিকতা বুঝতে না পারলেও, ব্রিজের নিচে পৌঁছাতেই তার শিরদাঁড়ায় এক শীতল স্রোত বয়ে গেল।
সে দেখল, অদূরেই সারি সারি বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একদল যুবক। তাদের হাতে হকিস্টিক আর শক্ত কাঠের লাঠি। আর সবার মাঝখানে নিজের বাইকের ওপর হেলান দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছে ভিভিয়ান এহসান। তার আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট, যেখান থেকে বের হওয়া ধোঁয়াগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে তার গম্ভীর চেহারার ওপর এক রহস্যময় প্রচ্ছন্নের আড়ালে মিশে যাচ্ছে।
তন্ময়কে যখন তার সামনে এনে ছেড়ে দেওয়া হলো, তখন সে প্রায় ভয়ে নীল হয়ে গেছে। চারপাশ থেকে ভিভিয়ানের দলবল তাকে ঘিরে ধরলে, সে পালানোর পথ খুঁজে না পেয়ে সর্বশক্তি সঞ্চয় করে ক্ষিপ্ত স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
“এসবের মানে কী?”
ভিভিয়ান ধীরস্থিরভাবে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। আঙুলের ডগায় অর্ধেকটা শেষ হওয়া সিগারেটটি,অবজ্ঞার সাথে মাটিতে ফেলে জুতোর তলায় পিষে ফেলল। এরপর ধীর পায়ে তন্ময়ের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাক্ত আর তির্যক হাসি ফুটিয়ে সে শান্ত গলায় বলল,
“এত তাড়া কিসের, শালাবাবু!”
ভিভিয়ানের এমন বিদ্রূপাত্মক সম্বোধনে তন্ময় আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল। সে রুখে দাঁড়িয়ে বলল,
“মশকরা করছেন? কে আপনার শালাবাবু?”
ভিভিয়ান আবারও শব্দহীন হাসল।খুব স্বাভাবিক গলায় আওড়াল,
“কেন, তুমি!”
তন্ময় এবার কিছুটা হকচকিয়ে গেল। ভিভিয়ানের এই অস্বাভাবিক শান্ত ভাব তাকে কুঁকড়ে দিচ্ছে। ভিভিয়ান কিছুক্ষণ তার মুখাবয়ব পরখ করে দেখল, যেন কোনো এক তুচ্ছ পতঙ্গকে পর্যবেক্ষণ করছে। তারপর অত্যন্ত ক্ষীণ-গম্ভীর স্বরে আল্টিমেটাম সরূপ বলে উঠল,
“এটাই প্রথম এবং এটাই শেষ… কেবল একটা সুযোগ দিচ্ছি। বেঁচে থাকতে, মাওরার আশেপাশে ত্রিসীমানা কাছেও যেন তোকে কখনো না দেখি।”
—“আর যদি এমনটা না হয়?”—তন্ময়ের এই পালটা প্রত্যুত্তরে ভিভিয়ান পুনরায় হাসল। সে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নিজের কপালের একপাশ স্লাইড করে, ঘাড়টা খানিক কাত করল। গুরুগম্ভীর স্বরে চূড়ান্ত নিস্পৃহতায় বলল,
“মরতে চাস? সুযোগ দিচ্ছি রে বাবা।… দাফা হো যা (এখান থেকে বিদায় হ)।”
এই বলেই সে যখনই পেছন ফিরতে যাবে, ঠিক তখনই তন্ময় তার অপরিণামদর্শী তারুণ্যের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে চিৎকার করে উঠল,
“আমি মাওরাকে ভালোবাসি। আমারও দেখার ইচ্ছে আছে, কোন শালায় কত বড় মাপের… আর আমার ঠিক কী কী করতে পারে!”
কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই ফারহান আর আরাফ হিং**স্র হায়নার মতো তেড়ে আসতে চাইল, কিন্তু ভিভিয়ান স্রেফ একটা হাতের ইশারায় তাদের থামিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে পুনরায় তন্ময়ের দিকে ফিরল। কিছুক্ষণ তাকে নিজের রহস্যময় চোখজোড়া দিয়ে পরখ করল।
পরক্ষণেই কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই ভিভিয়ানের মুষ্টিবদ্ধ হাতটা ঝড়ের গতিতে আছড়ে পড়ল তন্ময়ের মুখ বরাবর।
দৃঢ় সেই এক ঘুষিতেই তন্ময় ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। নাক আর মুখ ফেটে অচিরেই রক্তে ভিজে উঠল তার গায়ের টিশার্ট। ভিভিয়ান কোনো ভাবান্তর হলো না। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় তার দলের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দেয়,
“সবার আগে ওর হাত ভেঙে দে। যেন আর কোনোদিন চাইলেও আমার মাওরার হাত ছুঁতে না পারে।”
আদেশ দিয়েই ভিভিয়ান আবারও নির্বিকারে তার বাইকের দিকে এগিয়ে গেল। পকেট থেকে নতুন একটি সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে লাইটার জ্বালায় সে। আগুনের শিখায় তার চোখের সেই নিষ্ঠুর শীতলতা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এরপর কোনো অ্যাকশন ফিল্মের জীবন্ত দৃশ্য দেখার মতো করেই সে বাইকের ওপর গা এলিয়ে বসল।
শুরু হলো নৃ*শংস প্র*লয়।
মহামায়া পর্ব ২০
তন্ময় নামের ছেলেটা নির্জন এই ব্রিজের নিচে ক্রমশই আধমরা হয়ে উঠল। ফারহান আর আরাফ সহ বাকিদের জুতোপেটা আর হকিস্টিকের প্রতিটি আঘাত যেন তার হাড়গোড় চুরমার করে দিচ্ছে। আর্তনাদ করার সুযোগটুকুও তাকে দেওয়া হলো না; সেই তথাকথিত ভদ্রবেশধারী বিকৃত জেদি মানুষগুলোর দম্ভের নিচে পিষ্ট হতে থাকল তন্ময়ের শরীর।
অথচ ভিভিয়ান তখন এক দৃষ্টিতে ধোঁয়ার আড়ালে সেই বীভ*ৎসতা দেখছে। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা নেই,নেই কোনো করুনা। আছে কেবল একচ্ছত্র অধিকার রক্ষার চরম পরিতৃপ্তি।
