Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৩০

মহামায়া পর্ব ৩০

মহামায়া পর্ব ৩০
তুশকন্যা

বছর খানেক সময় পেরিয়ে গিয়েছে। একইসাথে সবার জীবনযাত্রার গল্পতেও যেন বেশ খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। অনেককিছুই আর আগের মতো নেই। কিছু সম্পর্কে মরিচা ধরেছে; কিছু সম্পর্ক তার নিজস্বতা হারিয়েছে। কিন্তু জীবন থেমে থাকেনি,সে চলছে তার নিজস্ব গতিতে,নিজস্ব ছন্দে।
এই তো সপ্তাহ খানেক আগের কথা। এহসান মঞ্জিলে ঘটে গিয়েছে, এক মহাপ্রলয় সরূপ দুর্বার ঝড়। বংশের একমাত্র উত্তরসূরী ভিভিয়ান এহসান—ছোট বেলাতেই বাবা-কাকা’য় শখ করে রাজধানীতে পাঠিয়েছিল, জীবনযাত্রা ও পড়াশোনার মান উন্নত বিবেচনায়। অথচ তার ফলাফল কি এলো? ছেলে তাদের বিগড়ে গিয়েছে।

যে ছেলের এতোদিনে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্দাপনের কথা ছিল—সে নাকি বছর দেড়েক হতে কলেজ থেকেই বহিষ্কৃত। আশ্চর্য! এ-ও কি বিশ্বাসযোগ্য? শুধু যে তার অবস্থা এমন, বিষয়টা তা নয়। ভিভিয়ানের বন্ধুবান্ধব দিয়ে তৈরি গ্যাংটারও ঠিক একই দশা। মাথা নষ্ট করে আরো কিছু খোঁজখবর নিতেই জানা গেল—ছেলে তাদের মারপিট, দাঙ্গা, নানান নেশাদ্রব হতে শুরু করে মেয়ে সঙ্গ—কোনোকিছুতেই পিছিয়ে নেই।
আর এইসব শুনেই যেন ভাহিদ এহসানের মাথা বিগড়ে গিয়েছে। ছোট ভাই তারেক তাকে শান্ত করে বোঝানোর চেষ্টা করেও কোনো কাজ হয়নি, ছেলে’কে বাড়ি এনে শাস্তিস্বরূপ তাকে ঘরবন্দী করে রাখা হয়েছে। ওদিকে ভিভিয়ানও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। গত একটা বছর ধরে নানান পরিস্থিতিতে সে বন্ধুদের সাথে মিলে, যে পরিমাণে মারাত্মক সব ড্রা’গসের সাথে নিজের অস্তিত্বকে মিশিয়ে ফেলেছে—তাতে সে এখন আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই বললেই চলে।
ধ্বং’সা’ত্মক-বি’ধ্ব’স্ত এক অবিন্যস্ত রূপে নিজেকে উ’ম্মাদ করে তুলেছে। বাড়ির কারো কথাকেই গ্রাহ্য করার নূন্যতম সক্ষমতা তার নেই। যখন যেটা মাথায় আসছে, সেটাই করছে। আর যখন তা সম্ভব হচ্ছে না, তখন উম্মাদ-বেপরোয়া হয়ে ঘরের জিনিসপত্র ভেঙে চুরমার করছে। যা তার গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বের কাছে খানিকটা নতুন এক রূপের বহিঃপ্রকাশ।

এদিকে ছোট্ট আনায়াও এখন বেশ খানিকটা বড় হয়েছে। আধোআধো কথাগুলো কিছুটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সন্ধ্যা হলেই বড় আম্মু-আব্বু নয়তো বাবা-মা’য়ের কাছে সে পড়তে বসে যায়। মাথায় ঢুকিয়ে ফেলেছে, বড় হয়ে সে তার ভিভান ভাইয়ের মতোই হবে। আর সেজন্য এখন থেকেই তার প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে।
অন্যদিকে এতোসব ঝঞ্জাটের মাঝে, একপশলা খুশির সংবাদ হলো—আনায়া এখন আর একা নেই, পূর্ববর্তী কালে তাকে দীর্ঘ সময় ধরে দুই-ভাইয়ের ফেরার অপেক্ষা করতে হলেও এখন তার একজন ছোট্ট সঙ্গীও আছে। তার একটা ছোট বোন এসেছে। নাম তার ‘ইনায়া এহসান ইরা’। আনায়া মজার ছলে তাকে ইলু-ইলু বলে ডাকে। তবে তার ছোট্ট বোনটা বোধহয় পুরোপুরি তার মতো নয়। সে একটু অদ্ভুত। এইটুকু আকারের একটা বাচ্চা অথচ সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকে। এই বয়সে কোনো বাচ্চাই কথা বলতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইনায়া তো কাঁদেও না, হাসেও না। কেমন যেন একটু—এমনই এক ধারণা তৈরি হয়েছে আনায়ার মাঝে। তবুও সে তার ছোট্ট বোনকে পেয়ে বেশ খুশি।

এই যেমন, ইনায়াকে কাঁথায় মুড়িয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখা হয়েছে। অনিমা একগাদা কাপড়চোপড় ভাজ করে আলমারিতে রাখছে। তার অধিকাংশ ধ্যান কাজের মাঝে নিবদ্ধ রইলেও, মাঝেমধ্যে নজর ফিরিয়ে দুইবোনের দিকে ঠিকই খেয়াল রাখছে।
এদিকে আনায়া তার ভিভান ভাইয়ের দেওয়া সেই প্রিয় খরগোশটা সহ আরো কিছু তুলতুলে খেলনা একত্রিত করে, বোনের চারপাশে সাজিয়ে রেখেছে। খরগোশটাকে বুকে জড়িয়ে,সে বারংবার নাড়াচাড়া করে ইনায়াকে দেখিয়ে বলছে,
“ইলু পাকি,ইলু পাকি,এই দেকো আমার খগ্গোশ কতা বলতে পারে…তুমি কতাহ্ বলবে?”
আনায়া থামতে না থামতেই, আবারও বলে ওঠে,
“জানো,আমার ভিভান বাইয়া বাড়ি এসেচে। কিনতু সে আমার সাথে কতা বলচে না। আমি কি একন কি কববো বলো তো?”

আনায়া হতাশার স্বরে আওড়াল। ছোট্ট ইরার তীক্ষ্ণ দুটি চোখ আনায়াকে অপলক দৃষ্টিতে পরখ করছে। বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই তার। এরিমধ্যে আনায়া তাকে হাসাতে,আলগোছে তার পা’দুটো হতে কাঁথাটা কিঞ্চিৎ সরিয়ে দেয়। অতঃপর আলতোভাবে তর্জনী দিয়ে সুরসুরি দিতে লাগে পিচ্চি ইরার তুলতুলে পায়ে।
এতে করে মেয়েটি মোটেও হাসে না, বরং কপালে এক সুক্ষ্ম বিরক্তির ভাজ দেখা মেলে। অথচ ইনায়াকে সুরসুরি দিতে গিয়ে, আনায়া নিজেই হেসে তাল সামলাতে পারছে না। সে একহাত দিয়ে মুখ চেপে হাসতে হাসতেই বিছানায় ঢলে পড়ছে।
তার চাপা হাসির শব্দে,অনিমা পেছনে না ফিরেই বলে উঠল,
“আনায়া! বোনের সাথে দুষ্টামি করে না মা।”
মায়ের কথায় আনায়া থামলো। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে গিয়ে মায়ের কাছে এগিয়ে গেল। এখন আর কষ্ট করে অন্যের সাহায্য নিয়ে উঁচু বিছানা কিংবা জায়গাগুলোতে তার ওঠানামা করতে হয়না। বরং সে নিজেই সেসব নিজ দক্ষতায় করে ফেলে।

আনায়ার কোলে তখনও সেই তুলোর খরগোশটা। যত যাই হোক,এটা সে কোনোমতেই হাতছাড়া করেনা। আনায়া তার মায়ের আঁচল ধরে, দুষ্টুমির ছলে অবিন্যস্ত পায়ে ঘুরতে ঘুরতে বলল,
“মা,মা, ভিভান বাইয়া আমার সাথে কতা বলে না কেনো? আমি কার সাথে খেলবো? কেউ তো খেলচে না।”
অনিমা কাজের ব্যস্ততায় উত্তর দিল,
“মা আমার, কাজ করতে দাও। বিরক্ত করো না প্লিজ। তুমি একা একাই খেলো না, তোমার বাবা, বড় আব্বু তোমাকে কতগুলো খেলনা এনে দিয়েছে, সেগুলো দিয়ে খেলো।”
মায়ের কথা শুনে আনায়ার মনটা ভার হলো।

—“আমি বাইয়ার কাসে যাই? বাইয়াকে বলোনো না খেলা কততে।”
সে গাল ফুলিয়ে বলল। অনিমা রুক্ষ স্বরে উত্তর দেয়,
“না, মা। ভাইয়ার কাছে এখন যেও না, সে রাগ করবে। তুমি বাগানে গিয়ে খেলো।”
আনায়া খানিকটা রাগ হয়েই, গাল ফুলিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। মনে মনে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ধুর, একা একা কি খেলা যায়? কেউ খেলতে চায় না।”
আনায়া ধীরস্থিরে সোজা বাগানে চলে গেল। আশেপাশে না ফিরে ছুটে চলল সোজা বাগানের উত্তরকোণে। তার বেলিফুলের গাছটায় কয়েকটা সাদা সাদা ফুল ফুটেছে। গাছটাও বেশ খানিক বড় হয়েছে। একইসাথে বেড়ে উঠেছে চেরি ফলের গাছটা। প্রায় একহাত সমান লম্বা হয়েছে চারাটা।
আনায়া গাছদুটো দেখে খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল। ইচ্ছে করছে ভিভিয়ানকে ডেকে, গাছদুটো দেখাতে। কিন্তু ভিভিয়ান এতোদিন পর বাড়ি ফিরেও, তার সাথে একটুও কথা বলছে না দেখে,সে বেশ হতাশ।
আনায়া নিজের খরগোশটা বুকে আরেকটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ট্যাবের কাছে গিয়ে, একমগ পানি এনে সুন্দর মতো গাছের গোড়ায় দিতে লাগল।

এরিমধ্যে বাড়িতে আগমন হলো তারেক এহসানের। সে বাড়িতে প্রবেশ করতে উদ্যত ঠিক সেই মূহুর্তে তার নজর পড়ে,বাগানে উপস্থিত নিজের মেয়ের দিকে। কাজের ব্যস্ততার কারণে সংসার-মেয়ে কোনোদিকেই তার নজর দেওয়ার মতো সুযোগ হয়ে ওঠে না।
শুভ্র সাদা পাঞ্জাবিতে মোড়া, তারেক মেয়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে, হাঁটু নামিয়ে বসে বলল,
“আমার আম্মাজান! কি করছো তুমি?”
দিনের এই মূহুর্তে নিজের পাশে বাবাকে দেখে, আনায়া খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল। সে বিস্মৃত হাসি মুখে বলল,
“বাবা তুমি এসেচো? এই দেকো আমাদের গাস কতো বড় হয়ে গিয়েসে।”
তারেক ছোট্ট মেয়েটাকে নিজের বাহুবন্ধনে আগলে নিয়ে বলল,
“এটা তোমাদের গাছ মানে?”

—“মানে আমার আর বাইয়ার৷ উইযে আগেরবার বাইয়া যখন আসছিলো তখন আমরা লাগিয়েসিলাম। দেকো কত সুনদররর দেকা যায়। আমি পতিদিন পানি দেই তো, এইজন্য তাতাড়ি বড় হচ্ছে।”
তারেক মেয়ের কথায় ক্ষীণ হাসল। মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“তা আমার আম্মাজান, তোমার এই গাছে ফল কবে ধরবে শুনি?”
—“অনেক দেরি আছে বাবা। বড় আব্বু বলেসিল এই গাস যখন ইয়া ইত্তো বড় হবে তখন গাসে চেরি ধববে। চেরি হলে আমি তোমাকে খেতে দেবো,থিক আছে?’
তারেক হেসে ফেলে মাথা নাড়ে। মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে,বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। আনায়ার হাতে লেগে থাকা হালকা কাঁদা-পানি তারেকের স্বচ্ছ পাঞ্জাবির গায়ে লাগলেও তাতে সে ভ্রুক্ষেপহীন। যেন এই মূহুর্তে দাম্ভিক তারেক এহসানের কাছে তার মেয়েই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

আরো কয়েকটা দিন এভাবেই পেরিয়ে গেল। ঘর হতে ভিভিয়ানের কোনো দেখাসাক্ষাৎ নেই। বাড়ির দুই প্রান্তে দুইরকম চিত্রে সকলেই ভেতরে ভেতরে তীব্র দুশ্চিন্তায় ভুগছে। এর প্রতিকার কি? ভিভিয়ান নিজের ঘরের এমন কিছু নেই যা আস্ত রেখেছে। এতো বড় ছেলে, মারধর করে শাসন করাও তো সম্ভব নয়। সে কি চাচ্ছে তা-ও বলা মুশকিল,ফোনটা ভেঙে ফেলায় তার কাছে আপাতত কোনো ফোন নেই,বাহিরের কারো সাথে যোগাযোগও নেই। সবসময় অস্থির ভঙ্গিতে ছটফট করে, আর বিশেষ কিছু একটার প্রয়োজন পড়লেই উম্মাদ হয়ে ওঠে।
এলাকায় এহসানদের একটা ভালো নামডাক রয়েছে। দুইভাই চেয়েছিল ঘরের বিষয়গুলো ঘরেই চাপা থাকুক। ভিভিয়ানকে এভাবে বাড়িতে এনে আঁটকে রাখলে হয়তো সে থেমে যাবে, কিন্তু এর তো কোনো উন্নতিই হচ্ছে না।
যথারীতি সবাই মিলে একটা নতুন সিন্ধান্ত নেওয়া হলো।অভিজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে কিছু কাউন্সেলিং এর পর তাকে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারসরূপ এক বিশেষ জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো। তবে বিষয়টা খানিক গোপনে।
ছেলের নেশাগ্রস্ত হওয়ার তথ্য শুনে ততটাও আশংকিত হয়নি, যতটা স্বচক্ষে তার করূন অবস্থা দেখে হচ্ছে। একনিমিষেই একটা সুস্থ মস্তিষ্কের ছেলে, নেশার তোপে কিভাবে এরূপ হয়ে যেতে পারে তা তাদের জানা নেই।
এছাড়া মেয়ে সঙ্গ থাকার কথাটাও তাদের বেশ অবাক করেছে। যদিও মেয়ে সঙ্গ বলতে কে কিংবা তার পরিচয়—এসব বিষয়ে তেমন কিছুই জানতে পারেনি। কিন্তু এইটুকু খবর কানে এসেছে, ভিভিয়ানের বাইকের পেছনে প্রায়ই এক স্কুল পড়ুয়া মেয়ের দেখা মিলতো। একইসাথে বেশ অনেকদিন আগে, সে এক কলেজ পড়ুয়া ছেলে’কে সেই মেয়ের কারণে মারধর করে প্রায় মৃত্যুশয্যায় পাঠিয়েছিল।

এতোসব কিছু জানার পর, স্বাভাবিক ভাবেই কোনো পরিবার স্বস্তিতে থাকতে পারবে না৷ কিন্তু উপায়ন্তরও যে নেই। চট্টগ্রামে বাড়ি এরূপ যতগুলো বন্ধুবান্ধব তার গ্যাং-এ ছিল, তারা সকলেই এখন চট্টগ্রামেই নিজেদের বাড়িতে বেকার জীবন পাড় করছে৷ কেউ আবার সবকিছু ঠিকঠাক করিয়ে, পুনরায় পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে; কেউ না কেউ সবভুলে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে, কিন্তু তাদের ছেলের তো কোনো উন্নতিই নেই।
এভাবে আরো মাস তিনেক সময় কেটে গেলো। ভিভিয়ান এই পুরো সময়টাই রয়ে গেল রিহ্যাবের জটিল পরিচর্যার মাঝে;নেশা দ্রব যেন তার অস্থিমজ্জায় মিশে গিয়েছিল। অতঃপর সে বাড়ি ফিরলো, অনেকটা শান্ত-শীতল ভাবমূর্তি নিয়ে। যেন সবটাই ঠিক হয়ে গিয়েছে। অথচ এ যেন ছিল নিকষিত এক দুর্বার ঝড়ের আগমুহূর্ত। কেউই বুঝে উঠতে পারেনি, আগামীতে কি হতে চলেছে।
ভিভিয়ানের শান্তভাবপূর্ণ আবহে সকলেই ভেবে নিল,এবার বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে। যথারীতি নতুন করে তার পড়াশোনা সহ যাবতীয় কার্যক্রম পূর্ববর্তী নিয়ম-কানুন মাপেই চলতে লাগল। তবে তার আর আগের মতো ঢাকায় ফেরা হলো না৷ যা ঘটছিল, সবকিছুই চট্টগ্রামে। তাদের বন্ধুদের মাঝে ফারহান, আরাফ, ইলহাম সহ আরো স্থানীয় কয়েকজনের অবস্থানও চট্টগ্রামে রয়ে গেল।
কিন্তু এসবের মাঝে বিস্তত দূরত্ব তৈরি হলো ভিভিয়ান ও ছোট্ট আনায়ার মাঝে। ভিভিয়ানের প্রতি উৎসুক আনায়া সারাক্ষণ ছোঁকছোঁক অনুভূতি দেখালেও, ভিভিয়ান তখন সম্পূর্ণ নির্বিকার। শুধু আনায়া নয় বরং বাড়ির কারোর প্রতি তার বিশেষ কোনো ভাবান্তর নেই। ততদিনে মাওরার সাথেও তার এক বিস্তর দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছে। মাওয়ার জন্য সর্বদা পাগলপড়া ভিভিয়ান যেন বহু আগেই নেশার প্রভাবে দূরে সরে গিয়েছে;যেমনটা বাকিদের ক্ষেত্রেও হয়েছে।

সবমিলিয়ে এক অনিশ্চিত জীবনের পথে সে এগিয়ে চলছিল। বাহ্যিক আচরণে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো মোটেও স্বাভাবিক ছিল না;সেখানে ঘটে চলেছিল ভিন্নকিছু। যা পরবর্তীতে কারো জীবনের জন্যই সুখকর কিছু বয়ে আনতে পারেনি।
এভাবেই আরো বেশকিছুদিন কেটে গেল। ভিভিয়ানের বাহ্যিক আচরণগুলোও সবার স্বাভাবিক মনে হতে লাগল। ঘরবন্দী না থেকে তখন সে বন্ধুদের সাথে মাঝেমধ্যেই ঘুরতে বেরিয়ে যেতো। গানের প্রতি পুরোনো ঝোঁকটা যেন তখন নতুন নেশায় রুপান্তর হলো। বাইক রাইডিং সহ গিটার বাজিয়ে সময় কাটানো—সবটাই হতে লাগল নির্বিশেষে।
আরো কিছুটা স্বাভাবিক হতেই, সে পুনরায় মাওরার সাথে নিজেদের যোগাযোগটুকু বাড়িয়ে তুলল। মাওরা তখন ঢাকায়, ভিভিয়ান পরোক্ষভাবে তার খোঁজখবর নিতে না পারলেও, ঠিকই নিজের লোকজন মাওরার চারপাশে সুক্ষ্ম অনুসন্ধানী রূপে নজর রাখছিল।

এভাবেই দিন কাটছিল। আগস্ট মাসের শুরুর দিকে হঠাৎ একদিন ভিভিয়ান তার বাবার সামনে এসে দাঁড়াল। শান্ত গলায় সে আবদার করল,জন্মদিনের জন্য ১২ লাখ টাকা লাগবে।
​ভাহিদ এহসান যেন আকাশ থেকে পড়ল। যে ছেলে জীবনে কোনোদিন ঘটা করে জন্মদিন পালন করেনি, সে আজ হঠাৎ জন্মদিনের জন্য বারো লাখ টাকা চাইছে?সে কপালে ভাঁজ ফেলে জেরা শুরু করল, “এত টাকা দিয়ে কী করবে? বারো লাখ টাকা কি মুখের কথা? কাকে খাওয়াবে এত টাকা দিয়ে? কিসের জন্য লাগবে এসব?”
​তারেক এহসানও পাশে এসে দাঁড়াল। যদিও সে শুরুতে ভাইকে বোঝাল,
‘যুুগ হিসেবে এসব স্বাভাবিক, তাই এতো সিনক্রিয়েট করার কিছু নেই। বারো লাখ না হোক,অন্তত এক-দুই লাখ টাকা বরং দিয়ে দেই।’
কিন্তু তারেকের এসকল স্বাভাবিক কথায়, ভাহিদ স্বাভাবিক হতে পারল না। এই ছেলে দুদিন আগে রিহ্যাব থেকে ফিরেছে, প্রশ্নই ওঠে না এর হাতে এতো টাকা দেওয়ার। যতই ভালো সেজে থাকার ভাবমূর্তি নিয়ে চলুক, এর ভেতর থেকে যে নেশার উপদ্রব সত্যিকারে উঠে গিয়েছে—তাতে তো তিনি নিশ্চিত নন। তাহলে কিভাবে সবকিছু স্বাভাবিক ভাববে;বিশ্বাস করবে?”

তবুও তারেকও যখন তার বাবার মতো টাকা দেওয়ার ব্যাপারে নানা প্রশ্ন আর শর্ত জুড়ে দিতে লাগল, ঠিক তখনি ভিভিয়ানের ভেতরের সেই অবদমিত অন্ধকার সত্তাটা ফণা তুলে বেড়িয়ে এলো। এতদিনের সেই শান্ত রূপটা এক নিমিষেই কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ভিভিয়ানের চোখমুখ রক্তিম হয়ে উঠল, চোয়াল শক্ত হয়ে এল; সাথে চলল সেই আগের মতো উগ্র হয়ে জিনিসপত্র ভাঙচুর। সে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে হুংকার দিয়ে বলে উঠল,
“আমার টাকা লাগবে মানে লাগবেই! কোনো প্রশ্ন শুনতে চাই না!”
​ছেলের এই উগ্র রূপ দেখে পরিবারের সবাই স্তম্ভিত হলো। তাদের বোঝা হয়ে গেল, ছেলে তাদের পুরোপুরি কখনোই ঠিক হয়নি।এতোকিছুর পরও নেশার সেই বিষ এখনো ভিভিয়ানের রক্ত থেকে মুছে যায়নি। নেশা মানুষকে কতটা পৈশাচিক করে তুলতে পারে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভিভিয়ান খোদ নিজেই।
এই পরিস্থিতির সামাল দিতে ভাহিদ এহসান পরদিন এক অদ্ভুত প্রস্তাব রাখল।তিনি স্থির দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,

“টাকা তুমি পাবে, ভিভান। বারো লাখ কেন, আরও বেশি পাবে। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। তোমাকে বিয়ে করতে হবে। ভালোকিছুর আশায় তোমাদের পেছনে আমাদের বহু খরচা হয়ে গিয়েছে। আপাতত তোমাকে নিয়ে আর কোনো আশা রাখছি না আমি। যথেষ্ট বড় হয়েছো,এই বয়সে এই টাকাগুলো আমার কাছে না চেয়ে তোমার নিজে উপার্জনের ব্যবস্থা করার কথা ছিল। কিন্তু সেসব যখন তোমাকে দিয়ে হবে না, তাহলে বিয়ে করে বাড়িতে বসে থাকো। আর পারলে মাথায় সুবুদ্ধির উদয় করো;বয়স তো আর কম হয়নি!”
এমন প্রস্তাবে ভিভিয়ান শুরুতে বেশ অবাক হলেও, পরক্ষণেই নিজেকে সংবরণ করে জবাব দিল,
“বিয়ে? ঠিক আছে, বিয়েই সই। টাকা দিন,আমি মেয়ে নিয়ে আসছি। বিয়ে করলে, আমি নিজের পছন্দমতো বিয়ে করব, নয়তো এই নাটক বন্ধ করেন।”

​ভাহিদ এহসান এবার মাথা নাড়ল। মাওয়ার বিষয়ে এহসান মঞ্জিলের কেউই অবগত নয়।তবে ভিভিয়ানের মেয়ে সঙ্গ থাকার বিষয়টি তারা শুরুতেই জেনেছে;যা মোটেও কেউ ভালোকিছু হিসেবে গণ্য করেনি। আর ভাহিদ ভেবেছে, বিয়ের নাম করে ছেলেকে বাড়িতে পুরোপুরি আঁটকে রেখে শুদ্ধ করার মোক্ষম সুযোগ এটি। ছেলের যা হালচাল হয়েছে,দুদিন বাদে নির্বাচনে তার নাম সবার আগে ডুবিয়ে ছাড়বে। আর কাকা হিসেবে তারেকও বাদ পড়বে না।
ভিভিয়ানের অভিব্যক্তিতে, ভাহিদ সম্পূর্ণ দ্বিধাহীনতায় বলে ফেলল,
“না। বিয়ে যদি করতে হয়, তবে আমাদের পছন্দমতো করতে হবে। আমরা যাকে বলব, তাকেই তোমাকে গ্রহণ করতে হবে। তবেই তোমার টাকা পাবে।”
​ভিভিয়ান থমকে দাঁড়াল। মাওরা ছাড়া অন্যকাউকে বিয়ে? এটা কি করে সম্ভব? তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, নেশার তাড়নায় শরীর তখনো কিছুটা কাঁপছে। সে দাঁতে দাঁত পিষে জিজ্ঞেস করল,
“কাকে? কার সাথে বিয়ে ঠিক করেছেন আপনারা?”
ভাহিদ গম্ভীর গলায় বলল,

“আনায়া! তোমায় আনায়াকেই বিয়ে করতে হবে।”
​মুহূর্তের জন্য ঘরের আবহ স্তম্ভিত হলো। ভাহিদের পাশাপাশি ঘরে উপস্থিত তারেকও কিছুটা দ্বিধান্বিত। ভিভিয়ান তার বাবার কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ল। কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলতে পারল না। তারপর সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল—সেই হাসি মোটেও আনন্দের নয়, বরং এক পৈশাচিক আর্তনাদের মতো।
​”আনায়া? আপনারা কি সবাই মিলে পাগল হয়ে গেছেন?”,ভিভিয়ান গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠল। সে থেমে আবারও হিসহিসিয়ে বলল,
“আজ বাদে কাল আমার বয়স একুশ হতে চলল, আর আপনারা বলছেন একটা সাড়ে তিন কি চার বছরের বাচ্চার সাথে আমার বিয়ে দেবেন? ও তো নিজের নামটা পর্যন্ত ঠিকমতো বলতে পারে না! মাথা কি ঠিক আছে আপনাদের?”
​কিন্তু এহসান মঞ্জিলের কর্তাদের যুক্তি তখন ভিন্ন। তারা মনে করছে, আনায়াই একমাত্র ব্যক্তি যাকে ভিভিয়ান কিছুটা হলেও মায়া করে।আর সংসার জীবন নয় বরং এই অসম বিয়ের মাধ্যমে তারা হয়তো ভিভিয়ানকে একটা দীর্ঘমেয়াদী পারিবারিক শৃঙ্খলে আটকে রাখতে পারবে।
যদিও তারেকের মনে তীব্র দ্বিধা রয়েছে এই মতামতে। কিন্তু এই অযৌক্তিক প্রস্তাবকে জোরদার করেছে তারই স্ত্রী। বাড়ির অন্যকেউ এমন চিন্তাভাবনা না রাখলেও, অনিমার শুরু থেকেই ভীষণ ইচ্ছে ছিল কোনোমতে আনায়া আর ভিভিয়ানকে এক করা যায় কিনা।

নিজের সন্তানদের চেয়ে ভিভিয়ানের প্রতি তার টান বহু আগে থেকেই। আর বিয়ের ক্ষেত্রে যুক্তি তার—ভিভিয়ানের দাদার বাবারও বিয়ে হয়েছিল এমন অসমতায়। তাদের বেলায় এটা সম্ভব হলে, ভিভিয়ান আর আনায়ার ক্ষেত্রে কেনো নয়? কিন্তু তার এমন চিন্তাভাবনাকে শুরুতেই মজা ও অযৌক্তিক ভেবে নিয়েছিল কাশফিয়া কিংবা তারেক। তাদের কাছে এমন আশা রাখাটাও অত্যন্ত অসঙ্গত। যুগ বদলেছে, এমন কোনো নিরর্থক কাজ করলে তা এখন সরাসরি আইনের চোখেই দৃষ্টিবিদ্ধ। অথচ অনিমার সেই চেপে রাখা আশাই যেন এখন বাস্তব হতে চলেছে।
কিন্তু নেশার গ্রাসে থাকা ভিভিয়ানের কাছে এসব ছিল এক চরম অপমানসরূপ।শুরু হলো তার উগ্রতা-তাণ্ডব। সে পাগলের মতো ঘরের সবকিছু লণ্ডভণ্ড করতে লাগল। এতোকিছু সে বোঝো না, তার টাকা লাগবেই। তার মুখাবয়ব-ভাবমূর্তি হতে পুনরায় মানুষের অস্থির বিলীন হতে লাগল; কেবল এক অন্ধকার সত্তা সেখানে রাজত্ব করছে। সে কেন এতো টাকা চাইছে, তার উদ্দেশ্য কী—সেটা কাউকে পরিষ্কার করল না। কিন্তু টাকার জন্য তার এই উম্মাদনা দেখে বাড়ির সবার মনে স্পষ্টত সংশয়ের সৃষ্টি হলো।
​বাড়ির লোকজন আন্দাজ করে নিল, এই বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে ভিভিয়ান মোটেও ভালো কিছু করবে না। হয়তো বড় কোনো ড্রাগ ডিলের চক্কর চলছে, অথবা বড় কোনো অপরাধের পরিকল্পনা তার মাথায় ঘুরছে। কিন্তু তাকে থামানোর আর কোনো উপায় তাদের হাতে নেই। উল্টো এই ছেলে বংশের নামধাম সব ডুবিয়ে ছাড়বে।

ভিভিয়ান বিধস্ত রূপে দিশেহারা হয়ে নিজের আস্তানায় পড়ে আছে। শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে জঙ্গল সরূপ এলাকায় এক পরিত্যক্ত ইট-সিমেন্টের অন্ধকার বাড়িতে তাদের এই ডেরা। মাঝে সব ঠিক থাকলেও, এখন তাদের অবস্থা যেন আরো ভয়াবহ। তার বন্ধুরা মোটামুটি বেশ কয়েকজনই নিয়ম করে এখানে আসে। ঢাকা থেকে এবার ফেরার পর পাভেলও এখানে এসেছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু ভেতরে চলমান-চিত্র মোটেও ভালোকিছু নয়।
চারপাশের দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, নোংরা কাঠ কিংবা কাঁচের ভাঙাচোরা টুকরো মেঝেতে পড়ে আছে। একপাশে আবার কিছু শুকনো খড় বিছিয়ে রাখা, তার উপরই কয়েকজন মিলে তাস মেলে আড্ডা দিচ্ছে। আগের মতো নামীদামী ড্রাগস্ নেওয়া বন্ধ হলেও, প্যাকেটের পর প্যাকেট সিগারেট টানার অভ্যাস কারোরই বাদ পড়েনি। আর এসবে সবার চেয়ে ভিভিয়ানই যেন এগিয়ে।
ভিভিয়ান মাথা ঝুঁকিয়ে মেঝেতে বসে আছে; অনেকক্ষণ হতে তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে, আবরার নামক একজন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলে উঠল,

“এতো চিন্তা করতেছিস কেন? বিয়ে করতে বলছে যখন বিয়ে করে ফেল। এইসব বিয়েতে আর কি এসে যায়?”
আবরারের কথায় ভিভিয়ান নিরুদ্বেগ রইল। তবে পাশ থেকে ফারহান বলে উঠল,
“পাগল হয়েছিস? তুই জানিস না, ও মাওরার জন্য কি পরিমানে পাগল? তার চেয়েও বড় কথা, ঐটুকু এক বাচ্চার সাথে কারো কিভাবে বিয়ে হয়? এই জামানায় এসেও এমন চিন্তাভাবনা… ওর ফ্যামিলি পাগল হয়ে গিয়েছে কিনা বুঝতে পারছি না।”
আবরার মাছি তাড়ানো ভঙ্গিতে আবারও বলল,

“তোরা বেশি বুঝোস দেখেই সমস্যা। গত দেড় বছরে ড্রাগ ডিলারদের কাছে কতটাকা দেনা পড়ে আছে, খোঁজ নিয়েছিস? এখন এক ডিলার বারো লাখ চেয়ে বসেছে, দুদিন বাদে বাকিরাও চাইবে। আমরা ভালো হলেই কি ওরা ওদের দেনাপাওনা ভুলে যাবে? টাকা শোধ করা লাগবে না? এতো টাকা পাবি কই তুই? ফ্যামিলির হেল্প ছাড়া নিজেদের কিডনি বেচ্চাইও টাকা শোধ করতে পারবি না। আর ওরা কি বলছে শুনিস নাই? ওরা কেমন মানুষ, জানিস না? সময় মতো টাকা না দিতে পারলে গুষ্টির ফষ্টিনষ্টি করিয়ে ছাড়বে।”
—“তো এইজন্য ও ঐ বাচ্চারে বিয়ে করবে?”
—“ও করতে পারবে না, তা তুই কর না হাঁদারাম! তোর আমার বাপ-চাচায় ওতো টাকা দিবে? চাইতে পারবি বাড়িতে? একজনে ফাঁসলে তো সবগুলোই ফাঁসবো। ভিভিয়ানের বাপ-চাচায় তাও শর্ত দিয়ে রাজি হয়েছে, আমাদেরগুলো টাকার কথা শুনলেই কোপাইয়ে ছাড়বে।”

—“আবরার মেজাজ খারাপ করিস না। তুই কি বলতে চাচ্ছিা ভালোমতো বল।”,ফারহানের রুক্ষ অভিব্যক্তি।
—“ভালো মতো বলার কিছুই নাই। ভিভিয়ান মাওরাকে ভালোবাসে এটা যেমন সত্য, তেমনি আগামী পনেরো দিনের মধ্যে ড্রিলারের টাকা শোধ না করতে পারলে আমার ভবিষ্যৎ আন্ধার হয়ে যাবে—এটাও তেমন সত্য। আর এতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি ভিভিয়ানেরই হবে,ওর বাপ-চাচা সব মন্ত্রী-মিনিস্টার হয়ে যাচ্ছে… এলাকায় সবচেয়ে বেশি নাম-ডাক তো ওদেরই, আমাদের তো না। অতীতের চেয়ে ভবিষ্যতে আরো খারাপ কিছু হলে নাম কিন্তু বেশি খারাপ…”
আবরার ছেলেটার কথায় স্পষ্টত প্রলুব্ধতার ছাপ। সে কথার জালেই যেন ভিভিয়ানের মাথায় বিশেষ কিছু ঢোকানোর চেষ্টা করছে। যদিও ভিভিয়ান চুপচাপ মাথা ঝুঁকিয়ে সবার আলোচনাগুলোই কানে তুলছে।
এরিমধ্যে আবরার আবারও ভিভিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“এতো চিন্তা না করে,বিয়েটা করে ফেল বস। এমন তো নয় যে বিয়ে করেই ঐ বাচ্চার সাথে তোর সংসার করতে হবে।আর তার চেয়ে বড় কথা, এইযুগে এসব বিয়ে কে মানে ভাই? ঐ মুখে কবুল-টবুল বলবি, কাহিনি শেষ! কাগজ-কলমে বিয়ে দেওয়ার সাহস তোর বাপ-চাচার আছে? এটা করতে গেলে তো তারা নিজেরাই জেলের ভাত খাবে। আর বিয়েটাও তো দিবে গোপনে, তাহলে এসব জানবেটা কে? আর বিয়ে নিয়ে যখন জানাজানি হবেই না, তখন সমস্যাটা কোথায়?
আমাদের প্রয়োজন টাকা। টাকা পেলেই কাজ শেষ। অতীতে কি করেছি তা বড় কথা না। আমরা এখন ভালো হয়ে যাচ্ছি,এটাই বড় কথা। ভালো হওয়ার রাস্তায় এখন যদি এসব ডিলার-টিলার এসে ঝামেলা বাঁধায়,তোদের কি মনে হয় আমরা ফিউচারে কিছু করতে পারবো?”
ভিভিয়ান মুখ তুলে পাশে ফিরল। আবরারের দিকে একনাগাড়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তার নিস্তব্ধ চাহুনিতে আবরার ক্ষীণ হাসল। হুড়মুড়িয়ে বন্ধুর কাছে এগিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলল,
“টেনশন নিস না বস, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ভিভিয়ান কিছুক্ষণ বেশ গভীর ভাবনায় মগ্ন রইল। পরক্ষণেই ভ্রুকুটি করে শুধালো,
“কিন্তু মাওরা?”

আবরার ফিঁচকে হাসিতে হেসে, তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“ওকে এসব না জানালেই তো হলো? প্রথমত এই বিয়ের কোনো দামই নেই। আর যেখানে দাম নেই সেখানে দায়বদ্ধতা কিসের?সবকিছু হচ্ছেই তো গোপনে।… বিয়ে করবি, তোর কাজিন ঐটা বড় হতে হতে আরো একযুগ পার হয়ে যাবে, ততদিনে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেলে,এসব ঝামেলা মিটমাট হতেই আইন-কানুন মেনে মাওরাকে বিয়ে করে ফেলবি। সাক্ষী-টাক্ষীর জন্য তো আমরা আছিই!… যাহ্! মাওরা আর তোর বিয়ের সব ব্যবস্থাও না হয় আমারই করে দেবো।
কোথায় মুখে মুখে কবুল বলে বিয়ে আর কোথায় কোর্টকাছারির বিয়ে—দুটো এক হলো নাকি! মাওরাকে বিয়ে করার পর তোর গুষ্টির সাধ্য নেই তোদের দুজনকে আলাদা করবে। তখন তোর ঐ কাজিনের সাথে বিয়ের কোনো মানেই থাকবে না।

আরে ভাই,এটা তো তোর কপাল যে তোর ফ্যামিলি বড় কোনো মেয়েকে তোর ঘাড়ে না চাপিয়ে, একটা বাচ্চার সাথে বিয়ে দিতে চাইছে।ধর প্রাপ্ত বয়স্ক একটা মেয়ের সাথে তারা তোর বিয়ে দিতে চাইল, তখন কি করবি তুই? তখন তো ঠিকই নিয়ম-কানুন মেনেই বিয়ে-শাদি করে নিজের অপছন্দের মানুষের সাথে সারাজীবন পার করে দিতে হবে। অথচ এখন তোর কাছে বড়সড় সুযোগ আছে। এই বিয়ে করলে তোর ফ্যামিলির নজরেও তুই ভালো থাকবি,আগামীতে যখন আরো টাকাপয়সার প্রয়োজন পড়বে তখন ওরা তোকে কোনো ঝামেলা ছাড়াই টাকা দিয়ে দিবে। কারণ তুই তাদের কথা শুনেছিস, তাদের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছিস!
এখন বল, এক-দুই বছরের মধ্যে মাওয়াকে বিয়ে করবি নাকি একযুগ ধরে বসে থেকে ঐ বাচ্চার বড় হওয়ার অপেক্ষায় থাকবি?…উটকো চিন্তা না এনে, এসব ভালোমতো ভেবে দেখ। তুই চাইলেই কিন্তু সব সম্ভব।”
(এমন বন্ধু থাকলে ইবলিশের দরকার নেই)

ভিভিয়ানের মস্তিষ্ক দুমিনিটে জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সে নিগূঢ় চিন্তায় মগ্ন হয়। আবরারের কথাগুলো ফেলে দেওয়ার মতো না। মাওরা তাদের এসব ডার্কসাইট সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি অবগত নয়;সে তার আসন্ন পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। সে এসব জানলে হয়তো সে-ও তার পরিবারের মতো রিয়েক্ট করবে।
আর এসবের মাঝে ড্রাগস্ ডিলারদের সময়মতো টাকা পরিশোধ করতে না পারলে,এসব খবরাখবর এমনিতেই চারপাশে ছড়িয়ে যাবে। তখন তো পরিস্থিতি আরো হাতছাড়া হয়ে যাবে। পরিবারের চিন্তা আপাতত সে করছে না, কিন্তু তার নেশাগ্রস্ত বিকৃত মস্তিষ্ক ঠিকই মাওরাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। মাওরা কখনো তাকে ভুল বুঝে দূরে সরে যাক,এটা সে কখনোই চায় না।

ভিভিয়ান নিজের ভাবনায় মগ্ন। আবরার বাদে তার সকল বন্ধুরা উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। পরিস্থিতির এমন রূপ দেখে,আবরার ভারী শ্বাস ফেলল। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে,সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পায়তারা করলো। ভিভিয়ানের গিটারটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে, অকপটে আওড়াল,
“বস! ওসব চিন্তা বাড়ি গিয়ে কোরো, এবার একটা সুন্দর করে গান গাও তো।”
ভিভিয়ান তার কথায় নিরুদ্বেগ রইলেও, বিরক্তির একটা ছাপ ঠিকই তার চোখেমুখে স্পষ্ট হলো। তবে আবরার থামল না। সে জোরাজুরি করে শেষমেশ তাকে গান গাইতে বাধ্য করল।

‘ও ভ্রমর রে…………………………
কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর
রাঁধারে বুঝাইয়া…….
কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর
রাঁধারে বুঝাইয়া…………..
নিভা ছিলো মনের আগুন,
কি দিলা জ্বালাইয়া রে
ভ্রমর কইয়ো গিয়া………………’
ভিভিয়ান গান ধরল, আনমনে গিটারে টুংটাং শব্দ তুলল। মন-মস্তিষ্কে চলমান ঝড়ে তার সবকিছু তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। তবুও সে গাইতে থাকল।
এতোসব গান রেখে, ভিভিয়ানের এই গান গাওয়ার উদ্দেশ্যে শুরুতে তার বন্ধুরা বুঝতে পারতো না। কিন্তু পরক্ষণেই টের পেলো, বেটা এই গানকে নিজের সিগনেচার গান বানিয়েই ছাড়বে। কিছু তো একটা স্পেশাল আছে এতে,যা কেবল ভিভিয়ানের কন্ঠস্বরেই মেলে।
ভিভিয়ান থামতেই সকলেই হাততালি দিয়ে ওঠে।পাশ থেকে আরাফ বলে,”সেরাহ্ বস, সেরাহ্!”
কিন্তু কোনোকিছুতেই ভিভিয়ানের মুখাবয়ব হতে গম্ভীর্য সরে না। আবরার ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“ভাই এবার একটু হাস না! এসব কাহিনি দেখতে দেখতে মুড আর ভালো হয়না। এইজন্য বলি মাইয়া মানুষের পেছনে কু’ত্তার মতো ঘুরতে নাই,পুরা জীবনটাই লস হয়ে যায়। অথচ তোরা শুনিস না। এখন সব চিন্তা ঝেড়ে একটু স্বাভাবিক হো। পড়াশোনাটা তো শেষ করে ফেলছিস,ওতে গা ভাসিয়ে আর লাভ নেই। তুই ভালো গান পারিস, ঠিকমতো এটাতে ফোকাস কর, দেখবি তুই উপরে উঠে গেছিস। তখন আর ফ্যামিলির কাছে এখনকার মতো হাত পাততে হবে না।”
আবরার থেমে,অচিরেই দুহাত তুলে উম্মাদের মতো চিৎকার করে আওড়াল,
“আমাদের ভিভিয়ান একদিন রকস্টার হবে রেএএএ!”

নয় আগস্ট—আজ এহসান মঞ্জিলের একমাত্র উত্তরসূরী ‘ভিভিয়ান এহসান’—এর জন্মদিন। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনের আগমন হয়েই গেল। কিন্তু এই দিনের সূর্যোদয় এহসান মঞ্জিলের আকাশে যে অদ্ভুত আর বৈপরীত্যে ভরা এক আলো ছড়িয়েছে, তা আগে কখনো কেউ দেখেনি। বাড়িতে আজ দুই রকম আমেজ বিরাজ করছে। একদিকে উৎসবের সাজ-সজ্জা আর কিছু মানুষের অবুঝ আনন্দ, অন্যদিকে গুটিকতক প্রাণের অস্তিত্ব যেন এক গভীর বিষণ্ণতায় মৃতপ্রায়।
​বাড়ির অন্দরমহলে আজ সাজ সাজ রব। বিশেষ করে তারেক এহসানের ঘর থেকে ভেসে আসছে চঞ্চল হাসির শব্দ। সেখানে খুশিতে আত্মহারা হয়ে আছে ছোট্ট আনায়া। তার মা তাকে আজ সাজিয়ে দিয়েছে এক লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়িতে। বড়দের আদলে পরা সেই শাড়িটির আঁচল বারবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, আর আনায়া অতি সাবধানে সেটা সামলে নিয়ে সারা ঘরময় নেচে বেড়াচ্ছে। গলায় সোনার হার, কপালে ছোট্ট একটা টিকলি আর হাতে ছোট ছোট সোনার বালা—মা যেন তার শখের বশে এসব আগেই বানিয়ে রেখে দিয়েছিল।

​সবমিলিয়ে আনায়াকে আজ জগতের সবচেয়ে চমৎকার পিচ্চি বউয়ের মতোই ঠেকছে।অথচ এখনো সে জানে না বিয়ে নামক এই জটিল সামাজিক বন্ধনের ভার কতখানি, কিংবা তার প্রিয় ভিভান বাইয়ার সাথে আজ তার কোন সূত্রে নাম জড়াতে চলেছে। তার কাছে আজকের দিনটি কেবল সাজগোজ আর চকোলেট,কেক,বিরিয়ানির সহ নানান মুখরোচক খাবার খাওয়ার এক আনন্দ উৎসব। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিফলন দেখে সে বারবার হেসে উঠছে; নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে নিয়ে, বিড়বিড় করে আওড়াচ্ছে,
“বাইয়ার বউ হবো আমি…বাইয়া বউ।”
পরক্ষনেই আবার ড্রেসিং টেবিলের সামনে সাজিয়ে রেখে দেওয়া খরগোশটার উদ্দেশ্যে বলছে,
“খগ্গোস তুমি জানো, আমার আজকে বিয়ে হবে,বাইয়ার সাতে…অনেক মজা মজা হবে।”
সে খরগোশটা কোলে তুলে নিয়ে, ছোট্ট বোনটার কাছে যায়।ইনায়া দোলনায় শুয়ে শুয়ে মাথার উপর ঝুলতে থাকা কিছু কৃত্রিম চাঁদ-তারা সরূপ খেলনার দিকে তাকিয়ে আছে। নতুন সাজগোছপূর্ণ রূপে আনায়া তার পাশে দাঁড়াতেই, ইনানা তার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। বোনকে টানা-টানা চোখদুটো দিয়ে একনাগাড়ে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। ততক্ষণে আনায়া তার গল্পের ঝুড়ি মেলে দিয়েছে,
“ইলু পাকি, ইলু পাকি, তুমি আমার বিয়েতে যাবে? গেলে তোমাকে অনেকগুলো চকলেত দেবো,বাইয়া কেক বানালে ওতাও খেতে দেবো। তুমি এসো কিনতু, হ্যা? নতুন জামা পড়ে। এই দেকো আমি জামা পরসি,শারি জামা। ছুনদর দেকা যায় না?…যায় তো, অনেক ছুনদর দেকা যায়, হুউউউ…হি হি হি।”
ছোট্ট আনায়ার এতো আনন্দের কারণ ছোট্ট ইরা বুঝল না। তার এসব বোঝার কথাও না। সে কেবল হাসিমাখা বিচিত্র সাজের বোনটাকে দেখে যাচ্ছে।

​বিপরীত চিত্রটি ঠিক তার উল্টো দিকে, ভিভিয়ানের ঘরে। সেখানে গুমোট অন্ধকার আর দমবন্ধ করা এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ভিভিয়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার চোখে নিজের জন্য বিন্দুমাত্র দয়ার ছিটেফোঁটা নেই। পরনে দামি পাঞ্জাবি, কিন্তু তার ভেতরের সত্তাটা আজ যেন এক ছিন্নমূল কঙ্কাল। নেশার প্রভাব আর ঠিকমতো না ঘুমানোর ফলে চোখের নিচে গভীর কালো দাগ, আঙুলগুলো মাঝেমধ্যেই কুঁকড়ে যাচ্ছে। কাঙ্খিত টাকার সেই বিশাল অংকটা আজ তার হাতে আসবে,কিছু ঝামেলা থেকে মুক্তিও মিলবে, কিন্তু তার বিনিময় মূল্য যে কতখানি চড়া—তা এখন সে হাড়হাড় করে টের পাচ্ছে।

​মাওরার প্রতি তার যে তীব্র ভালোবাসা-পাগলামি ছিল—সবই আজ এক ধুলোমাখা পাণ্ডুলিপির মতো এক কোণে পড়ে আছে। সে জানে, এই অসম চুক্তির মাধ্যমে সে কেবল নিজেকে নয়, ওই নিষ্পাপ বাচ্চাটিসহ গোটা পরিবারের ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু নেশার তাড়না আর জেদ তাকে এমন এক প্রান্তে দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ সে নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে। দুই রাত-দুইদিন নির্ঘুম কাটিয়ে এই সিন্ধান্তে স্থির হয়েছে সে। যদিও আগামীতে কি হতে চলেছে, তা নিয়ে সে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
ড্রয়িংরুমে ঘরের মধ্যমণি হয়ে,বর-বউ সাজে সোফায় বসে আছে অসম বয়সের দুজন—ভিভিয়ান এহসান আর আনায়া এহসান। দৃশ্যটি যে কারো চোখেই অসম্ভব রকমের বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
​ভিভিয়ান পরনে ঝকমকে শুভ্রসাদা পাঞ্জাবি;যার আভিজাত্য তার শীর্ণ হয়ে যাওয়া বলিষ্ঠ শরীর আর ফ্যাকাসে চেহারার সাথে একদমই মানাচ্ছে না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে আছে। তার দৃষ্টি মেঝের কোনো এক বিন্দুতে নিবদ্ধ, চোখের পাতায় কোনো স্পন্দন নেই। নেশায় অবশ করে দেওয়া মস্তিষ্ক তাকে এক অদ্ভুত নির্বিকারত্বের জগতে নিয়ে গেছে।

ঠিক তার পাশেই বসে থাকা আনায়া যেন এক বসন্তের রঙিন প্রজাপতি হয়ে উড়ছে। লাল শাড়িতে মোড়া ছোট্ট শরীরটি খুশিতে এক মুহূর্তের জন্য স্থির থাকতে পারছে না। সে বারবার সোফার হাতল ধরছে, পা দোলাচ্ছে আর ভিভিয়ানের পাঞ্জাবির হাতা ধরে টানছে। তার কাছে এই সবকিছুই একটা দীর্ঘস্থায়ী খেলা।
​পরিবারের স্থায়ী কয়েকজন সদস্য আর অতি ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষের উপস্থিতিতে এই গোপন বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। বিশেষ ব্যক্তির মাঝে উপস্থিত রয়েছেন নূরজাহান। এক বাড়িতে দুই নাতী-নাতীর বিয়ে—তার আর আনন্দের সীমা থাকে কই?
সবাইকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বাদবাকি লোকজন। কাশফিয়া বারংবার ছেলের দিকে তাকাচ্ছে। কেন যেন সে এসব স্বাভাবিক ভাবে মানতে পারছে না। গতরাতে সে ছেলের কাছে গিয়ে, আলাদাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছে—‘বাবার কথা শুনে হুট করেই এমন সিন্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখতে।ওতো টাকা’র কি প্রয়োজন একবার তাকে জানাতে। সে না হয় পরে ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবে। তার বাবা’কে বোঝাবে।’
কিন্তু ছেলে যেন তার জ্যান্তমূর্তি হয়ে বসে আছে। ওদিকে দ্বিধান্বিত তারেকও কয়েকবার ভাইয়ের সাথে আলাদাভাবে এই ব্যাপারে আলোচনা করেছে। কাজটা কি আদৌও ঠিক হচ্ছে? নাকি মস্তবড় বোকামি!
এসব ভাবনার প্রায় এখন অনেকটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ড্রইং রুমে সবার মাঝে আসন পেতে বসে আছে বয়স্ক কাজি সাহেব। তিনি চশমার ওপর দিয়ে একবার ভিভিয়ানের দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার লাল শাড়িতে মোড়া ওই বাচ্চাটার দিকে।

তার কলম ধরা হাতটি বারবার থমকে যাচ্ছিল। এই যুগে এসেও এমন অসম আর বিচিত্র বিয়ে তিনি তার দীর্ঘ কর্মজীবনে হয়তো আর দুটো দেখেনি। তিনি ভাহিদ এহসানের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কর্তা, এই মেয়ে কি বিয়ের মর্ম বোঝে? ওর তো এখনো খেলার বয়স।”
​ভাহিদ এহসান কোনো উত্তর দিল না, কেবল হাতের ইশারায় কাজ সম্পন্ন করতে বলল। কাজি সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাতা মেলল। প্রথমে আনায়ার পালা।কাজি সাহেব আনায়ার দিকে ফিরল। তিনি কিছুটা দ্বিধা নিয়ে নিচু হয়ে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল, ”

“দাদুমণি, আপনি কি ভাহিদ এহসানের একমাত্র পুত্র ভিভিয়ান এহসানকে আপনার স্বামী হিসেবে কবুল করছেন?”
​আনায়া তার লাল রাঙা আঁচল দিয়ে ঢাকা ছোট ছোট আঙুলগুলো নাড়ছিল। সে ‘কবুল’ শব্দের অর্থ জানে না, কিন্তু সে জানে এই শব্দটা বললেই খেলা শেষ হবে—এমনটাই তার মা বলেছিল। আর খেলা শেষ হতেই, সে তার ভিভান ভাইয়ার বউ হয়ে যাবে। এরপর তার ভিভান ভাইয়া সবসময় তার সাথেই থাকবে, সবসময় তার সাথে খেলা করবে, অনেক মজার মজার খাবার বানিয়ে দিবে। সে ভিভিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক গাল চওড়া হাসি দিল। নিমিষেই মেয়েটার দু-গালে ছোট-বড় দুইখান টোল ফুটে উঠল।
অতঃপর সে তার আধো-আধো আদুরে স্বরে বেশ শব্দ করেই বলে উঠল,
“কবু,কবু,কবুতর!”
এই বলেই হেসে খিলখিল করে হেসে উঠল। একইসাথে ভিভিয়ানের ঠোঁটের কোণেও, প্রথমবারের মতো এক চিলতে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে তাচ্ছিল্যের রেখা ফুটে উঠল। আনায়ার এহেন কথায় ততক্ষণে চারপাশের সকলেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। কাজি সাহেব নিজেও নজর ফিরিয়ে এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল।
ইনায়াকে কোলে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অনিমা দ্রুততরে, মেয়ের কাছে ঘেঁসে দাঁড়িয়ে কানের কাছে মুখ এনে আওড়াল,

“আনায়া মা আমার। দুষ্টুমি করতে নেই, তোমায় শিখিয়ে ছিলাম তো কিভাবে কবুল বলতে হয়। তুমি তো এটা বলতে পারো, তাহলে কেনো দুষ্টুমি করছো?”
আনায়া মায়ের কথা শুনে স্থির হয়ে বসল। তার পাশেই নিস্পৃহে পড়ে আছে তুলোর খরগোশটা। আনায়া খরগোশটা দুহাতের মুঠোয় নিয়ে,মাথা ঝুকিয়ে নম্র স্বরে বলল,
“কবুল!”
এবার আর উচ্চারণে কোনো ভুলত্রুটি হলো না। কাজি সাহেব ভারীশ্বাস ফেলে আবারও বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, সবাই সাক্ষী থাকুন!… আম্মাজান বিয়েতে রাজি থাকলে আরো দুইবার বলেন কবুল।”
আনায়া পুনরায় নম্র স্বরে ভদ্র মেয়ের মতো আওড়াল,
“ক…কবুল,কবুল!”
সবাই মিলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠের পর, কাজি সাহেব ভিভিয়ানের দিকে ফিরে বলল,
“ভিভিয়ান এহসান, আপনি কি তারেক এহসানের কন্যা আনায়া এহসানকে মহরানার বিনিময়ে স্ত্রী হিসেবে কবুল করে নিচ্ছেন?”
​ভিভিয়ানের ঠোঁট দুটো অস্ফুটে একবার কাঁপল। তার কানে বাজছে কেবল নেশার সেই বিচিত্র সুর আর লাখ লাখ টাকার দেনা। একইসাথে মাওরা’কে হারিয়ে ফেলার এক তীব্র সংশয়। তার কাছে এই আয়োজন নিত্যন্তই ফেলনা। সে কোনো ভাবাবেগ ছাড়াই যান্ত্রিক গলায় উচ্চারণ করল,

“কবুল, কবুল, কবুল।”
কাজির প্রয়োজন পড়ল না দ্বিতীয়বার তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার। বরং সকলেই বিয়ে সম্পন্ন হতেই মলিন হোক বা বিস্তৃত হাসি ফুটিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আওড়াল।রুমে এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এল। ভিভিয়ানের পাশেই ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল ঝাঁকড়া চুল বিশিষ্ট পাভেল। সে নিজেও জানেনা, এমন এক মূহুর্ত কিভাবে উপভোগ্য হতে পারে! তবুও দায়িত্ব অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হতেই সে বেশ কয়েকটি মূহুর্ত ফ্রেমবন্দী করে নিল।
বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়া মাত্রই ভিভিয়ান আড়ালে তার বাবার সাথে দেখা করতে গেল। ছেলের মুখাবয়বে কাঠিন্য ভাবগম্ভীর্য দেখেই ভাহিদ বুঝে নিল ঘটনা কি! সে প্রস্তুত করে রাখা একটি চেক্ ভিভিয়ানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,

“জানিনা, কত জায়গায় আমার নাম ডুবানোর ব্যবস্থা করে রেখেছো। তবে এখন শুধু এইটুকুই বলব, মানুষ হও।”
চেক্ টা স্পর্শ করতেই ভিভিয়ানের নির্লিপ্ত চোখে এক মুহূর্তের জন্য এক বিদ্রুপাত্মক উজ্জ্বলতা খেলে গেল। সে আর কারো’র পরোয়া না করে, নির্বিকারে স্থান ত্যাগ করতে লাগল।
​আনায়া তখনো তার শাড়ির কুঁচি সামলাতে ব্যস্ত। ভিভিয়ানকে এই মূহুর্তে চলে যেতে দেখে, জোর গলায় করুন স্বরে ডাকল,

মহামায়া পর্ব ২৯

“বাইয়া! তুমি কোথায় যাচ্ছো? আমরা খেলা করবো তো!”
​ভিভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে দ্রুতপায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। আনায়া করুন দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়ার পানে চেয়ে রইল।
এহসান মঞ্জিলের আকাশপ্রান্তে তখন, আগষ্টের মেঘলা আবহের অন্ধকার মেঘভেঙে বৃষ্টি নামার উপক্রম। অথচ এক অসম সম্পর্কের সূচনা হলো এমন এক দিনে হলো, যখন পবিত্র বন্ধন আর বিকৃত আকাঙ্ক্ষার মাঝে কোনো তফাত রইল না।

মহামায়া পর্ব ৩১