Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৩১

মহামায়া পর্ব ৩১

মহামায়া পর্ব ৩১
তুশকন্যা

গালের মধ্যে সপাটে দুটো চড় পড়তেই মাওরার মাথা যেন ঘুরে গেল। ভিভিয়ান হতে আকস্মিক এই চড় সে কুক্ষণেও আশা করেনি। তার চোখ বেয়ে অচিরেই পানি ঝড়ল,অথচ ভিভিয়ান থামলো না। তার চুলের মুঠিখানা শক্তকরে পেছন হতে চেপে ধরল সে। অতঃপর হিসহিসিয়ে নিজের সবকিছু হিং’স্রতা নিং’ড়ে দিয়ে বলতে লাগল,
“কেনো করলি এটা? জানোয়ার! বল কেনো করলি এটা? বারবার বলেছি তোকে,তোর সমস্যা কি বল আমায়। তবুও আমাকে দূরে সরিয়ে দিস না, আমি আমার জান শেষ করে দিতাম তোর জন্য, তোর সব সমস্যা দূর করে দিতাম তো আমি। তবুও কেন এমন ছলনা করলি! কেন ধোঁকা দিলি? বল আমায় কেন করলি এমনটা, বল কেন তুই বিশ্বাসঘাতকতা করলি!

এটা তো হওয়ার কথা ছিল না মাওরা, তবে কেন? তোর জন্য আমি কি না করিনি! আমি যতবার নিজের সত্তা ভুলে বিকৃতজীবনে হারিয়েছি, ততবারই শুধু তোর জন্য ফিরে এসেছি। তুই দূরে সরে যাবি, তোকে হারিয়ে ফেলবো, শুধু এই সংশয়েই আমি আমার পরিবার, প্রিয়জন কারো পরোয়া করিনি।কেবল তোকেই ভালোবেসেছি,কেবল তোকেই চেয়েছি। তারপরও কেন এমন করলি মাওরা! বল কেন?”
মাওরা যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তার চোখজোড়া দিয়ে অনবরত পানি ঝড়ছে। কন্ঠস্বর কাঁপছে। হুট করে ভিভিয়ান ঢাকায় কি করে এলো তা সে জানে না।ব্যাথার চোটে, বহু কষ্টে সে ঠোঁট চেপে আওড়াল,
“ভিভিয়ান, ছাড়ো আমায়। ব্যাথা পাচ্ছি আমি।”
ভিভিয়ান ছাড়ল না। তার মুখাবয়বে স্পষ্টত ব্যাথার ছাপ দেখেও সে একটুও দমে গেল না। অথচ অন্যান্য সময়ে এই মাওরার একটু কষ্টতেই সে পাগলপ্রায় হয়ে উঠল।
ভিভিয়ান তার ব্যাথাকে একপ্রকার তাচ্ছিল্য করে বলল,

“বিশ্বাস কর, এরচেয়েও অনেক বেশি ব্যাথা আমি পেয়েছি রে। ঐ কুত্তার বাচ্চার সাথে তুই…এটা আমি সহ্য করতে পারিনি,পারছি না আমি সহ্য করতে। আমার কষ্ট হচ্ছে! অনেক বেশি কষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছে করছে তোকে মেরে তারপর নিজেই মরে যেতে।”
ভিভিয়ান থামে। আক্রোশের তোপে তার কন্ঠস্বর-শরীর রীতিমতো কাঁপছে। অন্যদিকে মাওরা যেন ব্যাথা পেতেও ভুলে গেল। ভিভিয়ান ততক্ষণে আবারও হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
“মাওরা, তুই এটা ঠিক করিসনি। ভালোবাসতাম না তোকে! বল ভালোবাসতাম তো তোকে! সবকিছুর উর্ধ্বে কেবল তোকেই ভালোবেসেছি। তাহলে এমন কি হলো যে, তুই ঐ কুত্তার বাচ্চাটার সাথে… কেন মাওরা? কেন তুই ঐ তন্ময়ের সাথেই… কেন, বল আমায়!”
মাওরা এই পর্যায়ে সম্পূর্ণ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ল। সংশয়ে তার গলা শুকিয়ে এলো। ভিভিয়ানের হঠাৎ এখানে উপস্থিত হওয়া কিংবা এরূপ আচরণ সবটাই এখন তার কাছে স্পষ্ট। কিন্তু সে এখন করবেই বা কি? এ-তো কোনো সামান্য ভুল নয় যে,সে তার জন্য ভিভিয়ানের কাছে মাফ চেয়ে নিবে। আর সে-ও তাকে মাফ করে দিবে।

ঘটনাপ্রবাহ খানিকক্ষণ পূর্বের। বিয়ের সেই ঘটনার মাস খানেক অতিক্রম না হতেই ভিভিয়ান প্রয়োজনের জন্য ঢাকায় এসেছিল। কিন্তু ঢাকায় এসেই যেন তার মাথাটা আর বাদবাকি ঘুরে যায়।মাওয়ার খোঁজখবর রাখার জন্য,নিয়জিত তার লোকজন তাকে কিছু তথ্য ও ছবি দেয়। আর সেই তথ্য অনুযায়ী সে সরাসরি আজ বিকেলে একটা পরিচিত পার্কে যায়।
সেখানে গিয়ে দেখে নির্জন পার্কের এককোণে মাওরা আর একটি ছেলের তীব্র ঘনিষ্ঠতা। দুজনে এক বেঞ্চে বসে গাছগাছালির আলাড়ে গল্পগুজব করছে—অথচ ঘনিষ্ঠতার মাত্রা যেন অত্যধিক!
শুরুতে ভিভিয়ান নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে অস্বীকার করে। তার কাছে এই দৃশ্য সম্পূর্ণ ভ্রম মনে হতে লাগে। কিন্তু পরক্ষণেই খেয়াল করে দেখে সে ঐ ছেলেটাকে চেনে। এবং খুব ভালোকরেই চেনে। এছাড়া তার লোকজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এটাই সেই ছেলে,যার সাথে মাওয়ার বিশেষ এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তারই অনুপস্থিতি কিংবা আড়ালে-আবছায়ায়। আর এই ছেলে কেউ নয় বরং সেই তন্ময় যাকে সে নিজের হাতে আধমরা বানিয়ে, পরদিন মাওরার কাছে চড় অব্দি খেয়েছিল;নিজের শখের বাইক অব্দি চুরমার করেছিল। যার জন্যই নানান ইস্যু তৈরি হওয়ায় তাকে সনামধন্য কলেজ হতেও বহিষ্কৃত করা হয়;এমনকি তার বাদবাকি বন্ধুদের সুদ্ধ।

ভিভিয়ান অন্যান্য দিনের মতো তার তীব্র আক্রোশে তৎক্ষনাৎ গিয়ে তন্ময়কে মারধর করার চিন্তাভাবনা করল না। বরং সে খানিকক্ষণ আগে পাওয়া তথ্য ও ছবিগুলো অনুযায়ী হিসেব কষতে থাকল—একে একে দুই মেলাতে লাগল।
সন্ধ্যা নামতেই তন্ময়ের চলে যাবার উপক্রম হয়। মাওরাও তখন মেসে ফেরার জন্য পার্ক থেকে বেরিয়ে পড়ে। তবে ভিভিয়ান দূর হতে ঠিকই তার পিছু নেয়।এবং নির্জন গলির কাছে আসতেই সে তার সম্মূখে এসে দাঁড়ায়। হঠাৎ ভিভিয়ানকে এখানে দেখে মাওয়া প্রচন্ড অবাক হয়। তবুও সে সাহস করে জানতে চায়,
‘ভিভিয়ান,তুমি? এখানে…কবে… ঢাকায় কবে এসেছো?’
ভিভিয়ান খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর তাচ্ছিল্যের সহিত গুরুগম্ভীর স্বরে জবাব দিল,
“খুশি হওনি সুইটহার্ট?”
ভিভিয়ানের ভাবগম্ভীর্য সুবিধাজনক ঠেকল না। মাওরা চাপা এক আশংকায় শুকনো মুখে পুনরায় শুধালো,
“সব ঠিক আছে? তুমি এখানে হঠাৎ… ”

—“কেনো, আমার হঠাৎ আগমন কি তোমায় অস্বস্তিতে ফেলে দিল? তোমার তো খুশি হওয়া উচিত, আমাদের এতোদিন পর সামনাসামনি দেখা। তুমি কি সত্যিই খুশি হওনি,মাওরা?”
—“না,বিষয়টা তা নয়…শুধু তোমায় হঠাৎ এখানে…একবার জানালে…”
মাওরার কথা শেষ হয়না বরং, ক্রমশই ভিভিয়ানের চোখ-মুখে কাঠিন্যের তীব্রতা গ্রাস করে। এবং অকস্মাৎ প্রথম চড়টা সরাসরি মাওরার গাল বরাবর বসিয়ে দেয়। মাওরা হতভম্ব হয়ে কিছু বলবে, তার আগেই ভিভিয়ানের পরবর্তী আক্রমনা”ত্মক আচরণে সে সম্পূর্ণ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে।
আর এখন ভিভিয়ানের রাগের কারণ স্পষ্টত বুঝতে পেরে, সে আরো বেশি হতবিহ্বল হলো৷
—“কি হলো? কিছু বলছিস না কেনো?”, তার হুংকারে মাওরা হকচকিয়ে যায়। চুলে তীব্র টান পড়লেও,সে ব্যাথায় কাতরাতে ভুলে যায়। চাপা স্বরে ফুঁপিয়ে আওড়ায়,

“ভিভিয়ান! এমন কোরো না,তুমি ভুল বুঝছো…আমি সত্যিই…”
মাওরার কথা সম্পূর্ণ হয়না। ভিভিয়ান তাকে গলির মোড়ের জীর্ণ দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। সন্ধ্যা নামায় দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রমণীর ক্রন্দনরত মুখখানা স্পষ্ট। কিন্তু ভিভিয়ান থমকে গিয়েছে তার ভেজা-সিক্ত ডাগরডোগর সুদীর্ঘ পল্লব বিশিষ্ঠ চোখজোড়ার অতলে। তার এযাবৎ সমগ্র জীবনের খাতায়, সর্বাধিক উর্ধ্বে মূখ্য দূর্বলতা বলতে বোধহয় কেবল এই সুদীর্ঘ পল্লব বিশিষ্ট একজোড়া চোখই ছিল—যাতে সে আজ ছলনার প্রলেপ ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
ভিভিয়ান মাওরার সাথে নিজের দুরত্ব কমিয়ে কাছ ঘেঁসে দাঁড়ায়। চুলের মুঠি হতে হাতের দৃঢ়তা কমে যায়। ধীরে ধীরে সে তার গাল হতে গ্রীবা সুদক্ষ ভঙ্গিতে বলিষ্ঠ হাতের আদলে আগলে ধরে। মাথাটা খানিক উঁচিয়ে, রমণীর সিক্ত চোখে চোখ রেখে,কন্ঠস্বর একখাদ নিচে নামিয়ে ভগ্নস্বরে আওড়ায়,
‘কিছু মৃত্যু হয় তলোয়ারের ধারালো ফলায়, আর কিছু ধ্বংসলীলা রচিত হয় নিভৃতে— এক জোড়া চোখের মৌন ইশারায়।’

ভিভিয়ান থামে। পরক্ষণেই কন্ঠস্বরে দৃঢ়তা ও অসহায়ত্ব চেপে বলে,
“ধ্বংস করেছিস তুই আমায়। বরবাদ করে দিয়েছিস। এই ছলনা আমার প্রাপ্য ছিল না রে। ভালোবাসতাম না আমি তোকে? তবে কেন করলি এই ছলনা?”
মাওরা স্তম্ভিত। সে কান্না থামাতে পারে না। ঠোঁট উল্টে কেঁদে ওঠে,
“ভিভিয়ান একবার আমার কথাটা শোনো…”
ভিভিয়ান তাকে সুযোগ দিল না। পুনরায় হিং”স্র সত্তায় ফিরে এসে, মাওরাকে ছেড়ে দিল। দ্রুততম নিজের ফোনটা বের করে, মাওরার দিকে এগিয়ে দিল। আক্রোশের তোপে শরীর কাঁপলেও, সে যথাসাধ্য নিজেকে সংবরণ করে বলল,

“এগুলো দেখ! আর দেখে বল,এসব মিথ্যে।”
মাওরা কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা নিয়ে,তাতে দৃশ্যমান ছবিগুলো দেখতে থাকে। আর ততই যেন পুরোদমে ভেঙে যায়। ভিভিয়ান তার ভাবভঙ্গি দেখে, বিদ্রূপের সহিত বলতে থাকে,
“জানিস! আমিও বিশ্বাস করিনি, স্তব্ধ হয়েছি এসব দেখে। ভেবেই নিয়েছিলাম সব বানোয়াট, কিন্তু পার্কে গিয়ে সচক্ষে তোর আর ঐ জানোয়ারটা ঘনিষ্ঠতা দেখার পরও…সম্ভব হয়নি আর নিজেকে মিথ্যে বুঝ দেওয়ার।”
মাওরা ঠোঁট উল্টে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ছবিগুলো কোনোমতে দেখতে থাকে। কোন মুখে বলবে সে,এগুলো মিথ্যে! দেখেই বোঝা যাচ্ছে সবগুলো ছবি কেউ দূর হতে অগোচরে তুলেছে। কোনোটাতে মাওরা-তন্ময় কাছাকাছি গা ঘেঁসে বসে, আবার কোনোটাতে একে-অপরকে হাতে কিংবা কপালে চুম্বনের দৃশ্য। কোনোটাতে ঘনিষ্ঠায় একে-অপরকে আইসক্রিম-ফুচকা খাইয়ে দিচ্ছে, আবার কোনোটাতে পায়ে-পা মিলিয়ে হেঁটে চলেছে।
এরিমধ্যে সামনে এলো সেই ছবি—সেখানে মাওরা খোদ তন্ময়ের ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে দিচ্ছে। যা দেখে মাওরার কাঁপা কাঁপা হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাবার আগেই, ভিভিয়ান তা কেড়ে দিল। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাচ্ছিল্যের সাথে ছবিটা দেখতে দেখতে, বিদ্রুপের সহিত ক্ষীণ হেসে ভাবল—এমন একটা মূহুর্তও প্রচন্ড দক্ষতার সাথে দূর হতে কত চমৎকার ভাবে ক্যাপচার হয়েছে!

অথচ সে মুখে তাচ্ছিল্যের সহিত বলতে লাগল,
“কি আশ্চর্য, তাই না? এমন একটা মূহুর্তে তোর সাথে আমার থাকার কথা ছিল। কতবার চাইতাম তোকে, অথচ তুই নানান বাহানায় দূরে সরিয়ে দিতি। অথচ দেখ, এখানে কি সুন্দর… সত্যি বলছি মাইরি, তোর কিন্তু চয়েস আছে। খুঁজে খুঁজে কেমন একটা হাঁদারামকে পছন্দ করেছিস। ভাবতেই আমি অবাক হচ্ছি।”
ভিভিয়ানের কথায় মাওরা নিজেকে কোনোমতে সামলে নিল। ঠোঁট চেপে ফুঁপিয়ে আওড়াল,
“ভি…ভিভিয়ান,মাফ করে দাও প্লিজ। আমি এটা… ”
মাওরার কথা শুনে ভিভিয়ান ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা দুজনের ঘনিষ্ঠ দৃশ্য হতে নজর সরিয়ে, তার দিকে মুখ তুলে চায়। ভ্রু উঁচিয়ে বিদ্রূপাত্মক স্বরে বলে,
“হুহ্? মাফ করে দেবো? কিন্তু কেনো? তুই আমার হোসনি, এটা তো আমার কপালের দোষ। তোর তো কোনো দোষ নেই। আর আমি তো আরো তোর চয়েসের প্রসংশা করছি রে। দেখ কত সুন্দর একটা রামছাগল, তোদের ভালো মানিয়েছে বটে।”
ভিভিয়ানের ভাবমূর্তি ক্রমশই উম্মাদের মতো হয়ে উঠল। মাওরা অজানা সংশয়ে আরো ভীত হয়ে, কাঁপা কাঁপা স্বরে শুধালো,

“ভিভিয়ান প্লিজজজ,তুমি প্লিজ কোনো…”
এবারও মাওরার কথা শেষ হয়না। ভিভিয়ান ফোনটা পকেটে তুলে রেখে, ঘাড়টা কিঞ্চিৎ কাত করে তাতে বা-ম হাতটা ঘসতে থাকে এবং ক্রন্দনরত মাওরাকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে। ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলোয় একটি অপ্রতিরোধ্য মৃগনয়নী লাবণ্যময়ী রমণী কি করে এক মূহুর্তের ব্যবধানে চোখের দৃষ্টিতে ছলনাময়ী বিষধর সাপ রূপক হয়ে ওঠে—তা ভিভিয়ানের জানা নেই।
মাওরা’কে একনজরে সম্পূর্ণরূপে পরখ করার পর, ভিভিয়ান এক চিলতে বিদ্রুপাত্মক তির্যক হাসি ফুটিয়ে বলল,
“চিন্তা করিস না, তোর ঐ রামছাগলটাকে আমি বেশিদিন বাঁচতে দেবো না। তুই কি ভেবেছিস, তুই আমার হোসনি তো অন্যকারো হয়ে যাবি? কক্ষনো না। তুই আমার হোসনি মানে,তুই আর কারো হবি না।”
ভিভিয়ান থামতেই মাওরার চোখে-মুখে অজানা ভয়-সংশয় পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলে। সে শূন্য দৃষ্টিতে ভিভিয়ানের দিকে চেয়ে থাকে। ভিভিয়ান পুনরায় তাচ্ছিল্যের সাথে বলে,

“যাস্ট দুটো দিন অপেক্ষা কর, আমি নিজে ওর লাশ তোর পায়ের কাছে এনে ফেলবো। তারপর যত পারিস ধোঁকা দে,যত পারিস ছলনা কর। তুই আমার হতে না পারলে, তুই আর কারোর হবি না।”
রাতের হিমশীতল বাতাস মাওরার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত হয়। ভিভিয়ান নিজের কথা সম্পূর্ণ করে, পা বাড়ায় চলে যেতে। ঠিক তখনই মাওরা পাশ থেকে নিরেট গলায় বলে ওঠে,
“ভিভিয়ান! ভুলেও তুমি এই কাজ করবে না।”
ভিভিয়ান তার কথা শুনে,পাশে ঘাড় ফেরায়।ভ্রু উঁচিয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে বলে,
“হুহ্? করবো না? কেন করবো না? আমি ওকে মেরে নিজে ফাঁসিতে ঝুলবো, তবুও আমি ওকেই মারবো।”
মাওরা ভিভিয়ানের উম্মাদের মতো কথায় পুনরায় চাপা স্বরে শাসিয়ে বলল,
“আমি বললাম তো তুমি এটা করবে না। নয়তো আমার চেয়ে খারাপ আর তখন কেউ হবে না।”
মাওরার এহেন প্রতিক্রিয়ায় ভিভিয়ানের কুঁচকে থাকা ভ্রু-জোড়া শিথিল হলো। চাপা আক্রোশেও নিজেকে সংবরণ করে, তার দিকে দু’পা এগিয়ে যায়।এবার আর মাওরা ভীত হয়না। বরং ভিভিয়ানের চোখে চোখ রেখে আওড়ায়,
“আমি দোষ করেছি, আমাকে তুমি যতটুকু শাস্তি দিতে পারো দাও… কিন্তু তন্ময়কে তুমি কিছু করতে পারবে না। ওর তো কোনো দোষ নেই!”
মাওরার কথায় ভিভিয়ান ক্রোধে হাসফাস করে বলে উঠল,

“ওহ রিয়েলি? ওর কোনো দোষ নেই? ও তোকে ডিস্টার্ব করতে এলো, আমি ওকে ট্রিটমেন্ট দিয়ে হাত-পা ভেঙে হসপিটালে পাঠালাম। ওদিকে তুই কিনা ওর টানে নিয়ম করে সেবাযত্ন করতে গেলি…যে তুই আমাকে ছাড়া এই শহরে এক’পা একা চলতে পারতি না, সেই তুই এতোকিছু করে ফেললি? তা-ও কিনা আমাকে ধোঁকা দিয়ে, আমার নজরই ফাঁকি দিয়ে। ধোঁকাই যখন দিবি তা আগে বলিসনি কেন? আমার জীবনটা শুধু শুধু কেন বরবাদ করলি? এরপরও আশা করছিস,আমি তোদের শান্তিতে বাঁচতে দেবো? মেরে ফেলব রে, সবগুলোকে জানে সুদ্ধ মেরে ফেলব। আর সবার আগে তোর ঐ রামছাগলটাকেই মারবো।”
ভিভিয়ানের কথা শেষ হতে না হতেই, অকস্মাৎ এক চড় এসে তার গালে পড়ল। ভিভিয়ান বিস্ময়ের সাথে মাওরার দিকে চেয়ে রইল। সে আক্রোশে কিছু একটা করে বসবে, তা আগেই মাওরা তাকে ধাক্কা দিয়ে দুপা পিছিয়ে গেল। চাপা স্বরে চেঁচিয়ে বলতে লাগল,
“তাহলে সবার আগে তুমি নিজে মরে যাও। তুমিও তো আমায় ধোঁকা দিয়েছো ভিভিয়ান!”
ভিভিয়ানের ভ্রু-জোড়া কুঁচকে গেল। গলার স্বর একখাদ বাড়িয়ে বলল,

“ঐ তোর সাহস কি করে হয়, নিজে দোষ করে আমাকেই এখন দোষারপ…”
—“মিথ্যে কি বলছি আমি? তুমি কি ভেবেছো আমি জানি না কিছু? একটা উম্মাদ,পাগল তুমি। যার ভবিষ্যৎ বলতে কিচ্ছু নেই,যার জন্য পরিবার বলতে কোনো পরোয়া নেই,যে কিনা শুধু একটা জিনিসই পারে তা হলো নিজের মনমর্জি পাগলামি!”
মাওরা দমে না। বরং চাপা স্বরে আরো বলতে লাগল,
“সবচেয়ে বড় ধোঁকা তুমি নিজে আমায় দিয়েছো। হ্যাঁ,মানছি আমি অন্যায় করেছি,তোমার সাথে ছলনা করেছি, কিন্তু তুমি কি করেছো? তুমি এতো ভালো মানুষ তবে তোমার ঐ কাজিনকে বিয়ে করেছো কেনো? ভাবতে পারছো তুমি কত ভালো মানুষ? ইতিমধ্যে একজায়গায় বিয়ে করে আশা রাখছো, তোমাকে আমি এখনোও ভালোবেসে যাবো?”
ভিভিয়ানের ক্রোধ তিরতির করে বাড়ছিল। কিন্তু হুট করে মাওরার প্রসঙ্গ তার এই অযাচিত বিয়েতে জড়িয়ে যাওয়া সে প্রচন্ড অবাক হলো। ভ্রু-জোড়া কুঁচকে বিস্ময়ের সাথে রুক্ষ স্বরে বলল,

“তোমায় এসব কে বলেছে?”
ভিভিয়ানের প্রশ্নে মাওরা তাচ্ছিল্যের সহিত হেসে বলে,
“কি ভেবেছিলে,আমি কিছু জানতে পারবো না? আর তুমি ইচ্ছে মতো নিজের খেলাটা খেলে যাবে? আমার প্রতিনিয়ত বোকা বানাবে?”
ভিভিয়ানের মাথা ধরে এলো। সে ঠোঁট ভিজিয়ে, মাওরাকে বোঝানোর উদ্দেশ্যে বলল,
“মাওরা আমার কথা শোনো,তুমি যেমনটা ভাবছো বিষয়টা তা নয়। এসব বিয়ের কোনো অর্থ নেই, আর আনায়াকে তো তুমি দেখেছো, ও তো কেবল একটা বাচ্চা, ওর সাথে আমার কিভাবে যায় বলো?”
—“ভিভিয়ান! তোমার কাছে সবকিছু হেলাফেলা বলেই, আজ এতোকিছু। তুমি বিয়ে করেছো অথচ সেই বিয়ে মানছো না। আমাকে পেয়ে গেলে তুমি যে দুদিন বাদে আমাকেও মানবে না, এর কি নিশ্চিয়তা আছে?”
মাওরার কথা শুনে এবার ভিভিয়ান নিজেই হুঁশ হারিয়ে ফেলল।

“হোয়াট ননসেন্স! মাথা নষ্ট কোরো না আমার। কার সাথে কি বোঝানোর চেষ্টা করছো আমায়?”
মাওরা তার ধমকে কিছুটা ভড়কে গেলেও, নিজেকে তটস্থ রাখল। ঠোঁট ভিজিয়ে আওড়াল,
“ভিভিয়ান! বিয়েটা কোনো ছেলেখেলা নয়। তুমি যেই উদ্দেশ্যেই বিয়েটা করো না কেনো, তোমাদের বিয়েটা হয়ে গিয়েছে। এই জেনারেশনে এসব হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু আগেকার যুগে অনেক বিয়ে এভাবেই হয়েছে।আর সেই বিয়ে গুলো কিন্তু সত্যিকারের বিয়ে হিসেবেই গন্য হয়েছে। তাই তুমি বিয়ে না মানলেও,এটা অস্বীকার করতে পারবে না যে আনায়া তোমার বউ নয়। তাকে যখন তুমি বিয়ে করেছো তখন সে-ই তোমার বউ।তুমি মানো বা না মানো,এটা মিথ্যে হয়ে যাবে না।
আর ঘরে বিয়ে করা বউ রেখে তুমি কিভাবে চাইছো, তুমি আমাকে পাবে? এটাও কি সম্ভব? নিজের জেদ নিজের কাছে রাখো ভিভিয়ান। যা হওয়ার হয়েছে, আমরা চাইলেও আর এখন আগের পর্যায়ে ফিরতে পারবো না। তুমি প্লিজ….”

মাওরার অভিব্যক্তিতে ভয়-সংশয় একইসাথে ভিভিয়ানকে কৌশলে বোঝানোর তীব্র প্রয়াশ—সবই চলছিল এক নাগাড়ে। কিন্তু ভিভিয়ান তার কথা শেষ করতে দিল না। বরং তার আগেই সে পুনরায় উম্মাদের স্বরে বলে উঠল,
“আবারও ছলনা করতে চাইছিস? এখন সব দোষ আমার হয়ে গেলো? কি বোঝাতে চাইছিস আমায়? তুই নোংরামি করেছিস দেখে আমিও করেছি? তোর আর আমার তুলনা এক করে সব মিটমাট করতে চাইছিস? এতোই সহজ? এতোই সহজে তোদের ছেড়ে দেবো?”
মাওরা এবার অস্থির হয়ে উঠল। ভিভিয়ানের ভাবগতিক ভালো নয়। দুদিন বাদে ঠিকই উল্টোপাল্টা কিছু করে ফেলবে। এদিকে সে তন্ময়কে ছাড়তে পারবে না। ছেলেটাকে সে ভালোবেসে ফেলেছে।আর এই ভালোবাসার পরিমাণটা বোধহয় ভিভিয়ানের চেয়ে বহুগুণে বেশি।

ভিভিয়ান তার জীবনে এসেছিল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড়ের বেশে।যে তাকে মনপ্রাণ উজার করে ভালোবাসলেও, সে নিজে তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনি। যেখানে ভিভিয়ানের ভালোবাসাটা বোধহয় একতরফাই রয়ে গিয়েছে।
অন্যদিকে তন্ময়ের জীবনে সে প্রবেশ করেছে স্বইচ্ছায়, ধীরস্থিরে। সেবার মারপিট কান্ডের পর তন্ময় যখন হসপিটালে ভর্তি; মৃত্যুর সাথে লড়ছে তখন সে নিজেই গিয়েছিল তাকে মানবতার খাতিরে একবার দেখে আসার জন্য। এরপর থেকেই ভিভিয়ানের অনুপস্থিতি কিংবা আড়ালে দুজনের সখ্যতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে; কিভাবে তা মাওরা জানে না। সবটাই যেন ঘটে চলছিল আকস্মিকতায়।
আর আজকের দিনে এসে সে তন্ময়ের প্রতি যে পরিমাণ দূর্বল হয়ে পড়েছে,তাতে করে তার জন্য তন্ময়ের কোনো ক্ষতি হোক সে তা চায়না। এবং সে এটাও মেনে নিয়েছে, এই পরিস্থিতির জন্য সে নিজেই দায়ী। ভিভিয়ানের ভয় না করে, শুরুতেই যদি সে তাকে এইসব বলে দিতো তাহলে আজকের পরিস্থিতি হয়তো এই পর্যায়ে আসতো না। কিন্তু এখন মাওরার হাতে করার মতোও কিছু নেই। কেবল ভিভিয়ানের কাছে ক্ষমা ও মুক্তি চাওয়া ব্যতীত।
কিন্তু ভিভিয়ানের যা ভাবমূর্তি সে কি আদৌও তার হাত থেকে নিস্তার পাবে?
“ভিভিয়ান! অনেক হয়েছে, আর সিনক্রিয়েট কোরো না। আমাদের আর এই সম্পর্ক এগোনো সম্ভব না। এবার তুমি আমায় মুক্তি দাও। হাতজোড় করে বলছি, এবার শান্তিতে বাঁচতে দাও আমায়।”
মাওরার অভিব্যক্তিতে অসহায়ত্বের চেয়ে বেশি তিক্ততা ফুটে উঠল। ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“মুক্তি?”

—“হ্যাঁ,মুক্তি! তুমি মানো কিংবা না মানো, আমাদের রিলেশনশিপ কখনোই সুস্থ ছিল না।ইট ওয়াজ জাস্ট আ টক্সিক রিলেশনশিপ! যেখানে কেবল তোমার মনমর্জি পাগলামি, উগ্রতা, উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হয়তো তুমি আমায় ভালোবেসে গিয়েছো, কিন্তু আমি কখনোই তোমার সেই ভালোবাসাটাকে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। সবটাই আমার কাছে কেবল পাগলপন ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি।”
—“মাওরা! দিস ইজ ঠু-মাচ ইয়ার! নিজে ভালোবাসতে ব্যর্থ হয়েছো আর সেই দোষের আরোপ এখন আমাকেই দিচ্ছো? ভেবেছো টা কি? এসব করে ওকে তুমি আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে?” ,ভিভিয়ানের কন্ঠে তাচ্ছিল্য ও ক্রোধ একত্রে প্রকাশ পাচ্ছে। আর মাওরা কেবল তন্ময়ের প্রসঙ্গে এলেই থমকে যাচ্ছে। সে আর পূর্ববর্তী ধৈর্য বজায় রাখতে না পেরে চেঁচেছি বলে উঠল,
“বলছি তো আমি, না তুমি কোনো সুস্থ মানুষ আর না তোমার ভালোবাসা সুস্থ। সবটাই অসুস্থ। আর এখনো তুমি কিসের আশা করছো ভিভিয়ান? আগে জানতাম তুমি পাগলামি করো, তোমার মাঝে উন্মাদনা-বেপোরয়া ভাবমূর্তি প্রকাশ পায়;কারণ তুমি এমন। কিন্তু পরে বুঝলাম না, তুমি আমার চেয়েও অনেকবেশি ভালোবাসো তোমার নেশার দুনিয়াকে।

আমায় একটা কথা বলোতো ভিভিয়ান। আমি তোমার জীবনে আছি;কয়েকটা বছর পেরিয়ে গিয়েছে। তুমি তো আমায় অনেক ভালোবাসো তাই-না? তবুও কিভাবে আমি থাকার পরও তোমাকে নেশায় মত্ত হতে হলো? কেনো তোমাকে পুরোদমে একটা নেশাখোরে পরিণত হতে হলো? বলো আমায়, এটা তোমার কেমন ভালোবাসা? আজ বাদে কাল তুমি পুরোপুরি আমায় ভুলে নেশার জগতে হারিয়ে যাবে না, এটার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? খবর কিন্তু আমিও পেয়েছি ভিভিয়ান।তাহলে তুমিই বলো, আর যাই হোক একটা নেশাখোর, ড্রাগস্ এডিকটেড্ মানুষের সাথে আমি জেনে-বুঝে কেনো নিজের জীবন নষ্ট করবো?”

ভিভিয়ান স্তম্ভিত দৃষ্টিতে মাওরার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাওরার চোঝে জল,তবে কন্ঠস্বর দৃৃঢ়। ভিভিয়ান ভারী শ্বাস ফেলে, অস্বস্তিতে কপালের একাংশে বৃদ্ধাঙ্গুলি স্লাইড করে,ভারী কন্ঠস্বরে আওড়াল,
“মাওরা!…হ্যাঁ,হয়তো আমি জেনে কিংবা অজান্তে একটা ভুল পথে চলে গিয়েছিলাম, কিন্তু ফিরেছি তো। শুধু তোমার জন্য, নয়তো আমার প্রয়োজন ছিল না ফেরার…তবুও কেনো তোমার এমন অভিযোগ… ”
ভিভিয়ানের অভিব্যক্তি দ্বিধান্বিত, খানিক কাঁপছেও বটে; অসহায়ত্বে নাকি ক্রোধে,তা বলা মুশকিল। মাওরা এই পর্যায়ে অজান্তেই কেঁদে ফেলে। তবুও নিজেকে সংবরণ করে বলে,
“সরি ভিভিয়ান, আর সম্ভব না। হয়তো তোমার শুনতে খারাপ লাগবে, কিন্তু তোমার প্রতি আমার তীব্র ঘৃণাবোধ চলে এসেছে। জানি না কিভাবে, কিন্তু আমি আমার নিজের জীবন নষ্ট করতে চাইনা।এককথায় তোমায় আমি এখন ঘৃণা করি। অ…অনেক বেশি!

একে তো ঐটুকুন একটা মেয়েকে বিয়ে করেছো;বুঝতেও পারছি না তোমার বিবেকবুদ্ধি কতটা লোপ পেয়েছে। আর বিয়ে যেহেতু করেছো,সেক্ষেত্রে তোমার ওদিকেই ফোকাস করা উচিত। মেয়েটাকেও তো দেখলাম, ন্যাউটার মতো সারাক্ষণ তোমার জন্য ঘুরঘুর করে। ও পাগল তোমার জন্য, হয়তো এখন সবকিছু গোলমেলে, কিন্তু ও বড় হয়ে গেলে… খারাপ কি বলো? তোমার জীবন আর আমার জীবন দুটোই এখন আলাদা হয়ে গিয়েছে, ঝামেলা করে আর লাভ কি, ভিভিয়ান?”
পুনরায় মাওরার সেই একই প্রচেষ্টা। লাবণ্যময়ী মৃগনয়না রমণী হতে ছলনাময়ী হওয়ার যে প্রচেষ্টা—ভিভিয়ানের কাছে বিষয়টা খানিক এমনই ঠেকল। সে যেন মাওরার এতোসব কথা কানে তুলেও তুলল না। খানিকটা বিদ্রূপাত্মক তির্যক হেসে, পেছনে না ফিরেই উল্টোপায়ে পা বাড়াল। কিছু না বলেই, তাকে চলে যেতে দেখে মাওরা সংশয়ের সহিত ডাকল,

“ভিভিয়ান!”
ভিভিয়ান পুনরায় বিস্তৃত তির্যক হেসে বলল,
“ভালো থাকো সুইটহার্ট! কতদিনের জন্য তা না হয় আমার হাতেই ছেড়ে দাও।”, এই বলেই সে মাওরা’কে নিশানা করে, ঠোঁটে দু’আঙ্গুল ছুঁইয়ে, এক বিদ্রুপাত্মক চুমু ছুঁড়ে দিল।
অন্যদিকে তার এই কথার উদ্দেশ্যে বুঝতে মাওরার একমুহূর্তও সময় লাগল না। এতো প্রচেষ্টার ফল তবে এই? সে শুষ্ক ঢোক গিলে ছন্নছাড়া অবিন্যস্ত রূপের ভিভিয়ানের পানে চেয়ে থাকে। ততক্ষণে ভিভিয়ান উল্টোঘুরে গলির মোড় ছাড়িয়ে গিয়েছে। মাওরা নিজেকে সামলাতে না পেরে, যথাস্থানেই মুখ চেপে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। শেষবারের মতো মুখ থেকে অস্ফুটে উচ্চারিত হয়,
“ভিভিয়ান,মাফ করে দাও আমায়।”
অথচ সে তার কর্ণধারে যেন স্পষ্টত শুনতে পায়; ভিভিয়ানের তাচ্ছিল্যের প্রতিধ্বনি,
“ছলনাকারীর মাফ হয়না, মাওরা ওয়াসিম!”
(নায়িকা যদি আনায়া না হতো, তবে এদের আমি ফোর্স ম্যারেজ করিয়ে উত্তম-মধ্যম দিয়ে ছাড়তাম)

…….অতঃপর ওদের বিচ্ছেদ হয়ে গেল।”
—“তারপর? তারপর কি হয়েছিল মা?”
আনায়ার উৎসুক ভাবমূর্তিতে অনিমা ভারী শ্বাস ফেলল। অতীতের স্মৃতিচারণ করতে করতে, রাত এখন দেড়টা ছাড়িয়েছে। তারেক এখনো ফেরেনি, হয়তো আর কিছুক্ষণের মাঝেই ফিরবে। যদিও ইতিমধ্যে অনিমার সেসব হতে খেয়াল হারিয়েছে।
এদিকে আনায়ার ছটফটানি কমছে না। তাকে আরো কিছু জানতে হবে। ভিভিয়ানের প্রেমিকা থাকার কথা শুনে সে যতটা না হতাশ হয়েছিল, তার চেয়ে অধিকতর খুশি হলো শেষ মূহুর্তে দুজনের বিচ্ছেদের গল্প শুনে। অনিমার সংক্ষিপ্ত আকারে শোনানো ঘটনায়, কোথাও কারো নাম-পরিচয়ের বিশেষ কিছু উল্লেখিত হয়নি। তাই আনায়ার এটাও জানা হলো না, ভিভিয়ানের সেই প্রেমিকার নাম বা আসল পরিচয় আদতে কি ছিল।
(টুইস্ট~ বর্তমানে মাওরাকে আনায়া খুব ভালো করেই চেনে; দুজনের অনেক ভালো সম্পর্ক। অথচ দুজনের কেউই কারো অতীতের সম্পর্কের বিষয়ে অবগত নয়)

কিন্তু এখন সেসব নিয়ে আনায়া একদমই ভাবছে না। তার খুব করে জানতে ইচ্ছে করছে, সবকিছু এই অব্দি ঠিক থাকার পরও কিভাবে দুটো পরিবার এভাবে আলাদা হয়ে গেল।আর আজকের দিনে এসে কিভাবে এক পরিবার আরেক পরিবারের শত্রু হয়ে দাঁড়াল?
আর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার, ঐ লোকটা কিনা তার চেয়ে বয়সে গুনে গুনে সতেরো বছরের বড়। এটাও কি বিশ্বাসযোগ্য? সে তো এমনটা কল্পনাতেও ভাবেনি। সেক্ষেত্রে অবুঝ বয়সে বিয়ে; এ যেন বিস্ময়ের উপর বিস্ময়।
তবে আনায়ার সব ভাবনায় হুট করেই জল ঢেলে পড়ল। অনিমা অন্ধকার অতীতের শেষাংশও বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে,তবে মেয়েটার এমন প্রফুল্লতা দেখে সে যেন নিজের মাঝেই তীব্র সংকোচ বোধ করছে। এরিমধ্যে তার ইতস্ততের মাত্রা বেড়ে গেল,হুট করে পরিচিত পায়ের শব্দে।
অনিমার বুক ধরফরিয়ে উঠল। মুখ তুলে ঘড়ির দিকে তাকাতেই তার হুঁশ ফিরল। আগেপাছে কিছু না ভেবে সে দ্রুত বিছানায় মেলে রাখা এ্যালবামটা কোনোমতে কাপড়টা দিয়ে পেঁচিয়ে নিল। অতঃপর সোজা সেটিকে ছিটকে ফেলে দিল,বিছানার পেছনে।
হঠাৎ মায়ের এহেন কান্ডে আনায়া নিজেও হতভম্ব। সে অবাক স্বরে শুধালো,

“মা কি হয়েছে…’
আনায়ার কথা শেষ হলো না। বরং তার পূর্বেই ঘরের দরজায় ঠকঠক শব্দ হলো। আনায়া হকচকিয়ে দরজার দিকে ফিরে তাকাল। বোঝা হয়ে গিয়েছে তার মা হুট করে এমন আচরণ কেনো করল।
আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে ভারী শ্বাস ফেলে। মায়ের শোনানো অতীত অনুযায়ী তার বাবা তো ঠিকই তখন তাকে খুব ভালোবাসতো। অথচ এমন কি হলো যে, তার সেইসব ভালোবাসার কোনোকিছুই আজ আর প্রকাশিত হয়না। বাবা কেনো তার প্রতি এতো কঠোর, সেই রহস্যও তার আর জানা হলো না।
দরজায় আরো দুবার শব্দ হতেই, অনিমা তড়িঘড়ি করে দরজাটা খুলে দেয়। দরজা খোলামাত্রই উচ্চারিত হয় ভারিক্কি কন্ঠস্বর,
“দরজা খুলতে এতক্ষণ লাগে? এতো রাতে দরজা বন্ধ করে কি করছো?”
অনিমা ইতস্তত হয়। বারংবার শুষ্ক ঢোক গেলে। তার ভাবমূর্তিতে খানিক পরিবর্তন দেখে তারেকের কপাল কুঁচকে যায়। সে কিছু বলার আগেই, ভেতর থেকে আনায়া এগিয়ে আসে।
আনায়া কিছু বলার আগেই, তারেক ভ্রুকুটি করে বলে,
“আনায়া,তুমি এতো রাতে… এখানে?”
তারেক সন্দিহান দৃষ্টিতে অনিমা ও আনায়াকে একত্রে পরখ করে। সে কিছু বোঝার আগেই, আনায়া নিজের সহজাত নমনীয়তা বজায় রেখে বলে,

“আ…বাবা,আমরা গল্প করছিলাম।আমার ঘুম আসছিল না, তাই। আর মা তো তোমার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে, অনেক রাত অব্দি একা একা জেগে থাকে…তাই এসেছিলাম এখানে।”
আনায়ার কথা শুনে, তারেক স্বাভাবিক হলো।
—“ওহ, এই কথা, বেশ ভালো তবে। আচ্ছা তাহলে তোমরা আর খানিকক্ষণ গল্পআলাপ করো আমি না হয় আর কিছুক্ষণ পর…”
—“না,না,তার আর প্রয়োজন নেই। আমার ঘুম পেয়ে গিয়েছে। তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম; তুমি এলে ঘুমাতে যাবো।”
তারেক ক্ষীণ হাসল। ঘরের ভেতর নির্বিকার ভঙ্গিতে প্রবেশ করে, সে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“তা তোমার প্রিপারেশন কেমন? নতুন দেশ, নতুন জায়গা… আমার ব্যস্ততার জন্য তো সেভাবে খোঁজখবরই নেওয়া হলো না, তবে চিন্তা করো না,যেহেতু সাবার বাবাই সবটা এ্যারেঞ্জ করছে—আশা করি, তোমাদের দুজনের জন্য ভালোকিছু হতে চলেছে।”
আনায়া বেশি কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়াল। বাবা তার কাজে ব্যস্ত হলো। সে-ও আর বেশিক্ষণ স্থির হতে চাইল না। মাথার ঘোমটাটা বারবার ইতস্তত ভঙ্গিতে টেনে, মায়ের দিকে আঁড়চোখে তাকাল। মা তার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, তারেকের জন্য ক্লোজেট হতে জামাকাপড় বের করছে। অন্যদিকে তারেক সোফায় বসে, এতো রাতেও কিসব পেপার্স নিয়ে বসেছে।
এটাই সুযোগ! এবার এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। নয়তো কখন বাবা তার কি প্রশ্ন করে বসে, কে জানে! এমনিতেও ট্যুরের কেলেঙ্কারির ঘটনা কোনোভাবে তার বাবার কানে গেলে, তার জীবন চিরতরে খাঁচায় বন্দী হয়ে যাবে।

—“তাহলে বাবা…আমি বরং এখন আসছি।”
—“হ্যাঁ,যাও।”
বাবার অনুমতিটা নিয়েই ভদ্র মেয়ের মতো আনায়া ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো। এবং একমুহূর্তও কালবিলম্ব না করে সোজা নিজের ঘরের দিকে ছুটল। ঘরে প্রবেশ মাত্রই সে দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে দিল। মাথা হতে ঘোমটাটা ফেলে দিয়ে,সোজা গা হতে ওড়নাটাই ছুঁড়ে ফেলল। অতিমাত্রায় উত্তেজনা কাজ করছে তার মাঝে।
সে কোমড়ে হাত দিয়ে দুবার হাঁপিয়ে উঠল। এরিমধ্যে তার নজর পড়ল পাশেই দেয়ালে দৃশ্যমান রেডের প্রোট্টেটে। আনায়া ভ্রু উঁচিয়ে সেদিকে ঘুরল। কোমড় হতে হাত সরিয়ে,দুহাত বুকে গুঁজল। নির্বিকার ভঙ্গিতে ছবিটার দিকে এগিয়ে গিয়ে, তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল। বাম-ভ্রু খানা অতিমাত্রায় উঁচিয়ে অকপটে বলতে লাগল,
“তো মিস্টার গোলামের ফুত! ওহ সরি, প্রিয় বড় আব্বুর ফুত; এই ছিল আপনার কাহিনি? বিয়ে করেছিলেন আমায়! বউ আমি আপনার!”
আনায়া থামে। পরক্ষণেই বাচ্চাদের মতো, মিছে রাগ দেখিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“তা এটা একবার আমায় বললে কি হতো শুনি? কি হতো? এতো ঝামেলা হতো? যখন তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখনই তো সংসার পেতে সুখে-শান্তিতে দিন কাটিয়ে দিতাম। এই এক বছরে একটা-দুইটা বাচ্চাকাচ্চাও চলে আসতো। অথচ সবকিছু বিগড়ে দিয়ে, এখন আমাকেই চেনেন না। ইশ! কি ভাবটাই না দেখালেন। দাঁড়ান, আর একবার পাই আপনাকে। ইচ্ছে তো করছে,দুহাতে আপনার গাল দুটো ধরে, ঠাস করে…ঠোঁটে চারটে চুমু খাই।”
অভিব্যক্তির শেষাংশে আনায়ার কন্ঠস্বর অতি ক্ষীণ ও নমনীয় হয়ে উঠল তীব্র হতাশায়। চোখদুটো আলতোকরে বুজতেই,চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বলিষ্ঠ মানবের পুরু ঠোঁটজোড়া। এক নিমিষেই আনায়া অদ্ভুত এক মোহে আচ্ছন্ন হলো। বারান্দা হতে ভেসে আসা রাতের শীতল হাওয়া গায়ে স্পর্শ করতেই,সে অচিরেই শিউরে উঠল। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আগে তো এমনিতেই ঘুম হারাম করতে চলে আসতেন, আর এখন তো জানটাই নিয়ে নেওয়ার পায়তারা করেছেন। আমাকে কি আপনার মানুষ মনে হয় না?”

—“উঁহু, বউ মনে হয়।”
সেই একই পরিচিত গুরুগম্ভীর হাস্কিস্বর। আনায়া অচিরেই চমকে উঠল। চকিতে রেড হতে নজর সরিয়ে, পাশে চেয়ে দেখল সেই বলিষ্ঠ পুরুষের অবয়ব। ক্লোজেটের সাথে গা ঠেকিয়ে, বুকে দুহাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে কালো টিশার্ট, প্যান্ট। কাঁধ অব্দি ছুঁয়ে যাওয়া, ঝাঁকড়া চুলগুলো প্রচন্ড রকমের এলোমেলো। চোখে-মুখে সেই একই গম্ভীর ভাবগাম্ভীর্য বিরাজ করছে। শান্ত-তীক্ষ্ণ দৃষ্টিখানা কেবল আনায়াতেই নিবদ্ধ।
আনায়া অদৃশ্য সেই মোহে, ভিভিয়ানের দিকে এগিয়ে যায়। ভিভিয়ানের বিশেষ কোনো নড়চড় হলো না। সে স্থির,জ্যান্ত এক মূর্তির ন্যায় দৃঢ়। আনায়া নিষ্ফল দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে থাকে। উচ্চতায় লোকটা তার চেয়ে বেশ খানিকটা বড়। আনায়া একমনে ভিভিয়ানের দিকে চেয়ে চেয়ে কিছু একটা পরখ করে। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে বলে,

“এতোমাস পর আমার মনে পড়ল? আগে তো ঠিকই জ্বালাতন করতে চলে আসতেন। মাঝে এমন কি হলো যে,আপনার দেখাসাক্ষাৎ সবটাই বন্ধ হলো।”
ভিভিয়ান নিরুত্তর দাঁড়িয়ে থাকে। আনায়ার মেজাজ হুট করেই বিগড়ে যায়। ক্ষিপ্ততায় সাথে চাপা স্বরে আওড়ায়,
“আপনাকে আমার কি করতে ইচ্ছে করছে জানেন? মেরে হাতমুখ ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।”
আনায়ার কথা শুনে ভিভিয়ান ক্ষীণ হাসল।
—“হঠাৎ আমার প্রতি এতো রাগের কারণ?”
ভিভিয়ানে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখে,আনায়ার ভ্রু-জোড়া কুঁচকে যায়। মুখটা খানিক বাঁকাতেই দু’গালে দুটো ছোট-বড় টোলের দেখা মেলে। সে ত্যাছড়া গলায় নিরেট স্বরে বলে,
“এভাবে হাসবেন না, প্রবলেম হয়।”
ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে কিছু বলবে,তা আগেই আনায়া তার কথা টেনে নিয়ে বলে ওঠে,
“শুনলাম আপনার নাকি গার্লফ্রেন্ড ছিল।”

—“হু,ছিল”
—“বাহ, কি চমৎকার। লজ্জা করছে না,মুখের উপর এ কথা স্বীকার করতে?”
—“আমার প্রতি এতো রাগ কি তবে, এই কারণেই?”
—“তা নয়তো কি। আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে,এটা শোনার পর একটু বেশিই রাগ হয়েছিল। পরে বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছি। কারণ,যেহেতু আপনি আমার চেয়ে বয়সে এতো বড়, সেক্ষেত্রে যুগ হিসেবে বিয়ের আগে আপনার দু-চারটে গার্লফ্রেন্ড থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমি যে আপনার মতো উম্মাদ প্রেমিকের ফাস্ট লাভ নই, এতা হতাশাজনক!…যাই হোক, আপনাদের ব্রেক-আপ হয়েছে শুনে খুব খুশি হয়েছি। আপাতত এই নিয়ে আপনার প্রতি আমার আর কোনো অভিযোগ নেই। আপনার এক্স-টেক্স নিয়েও আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।”
আনায়া থামে, ভিভিয়ানের চোখে চোখ মিলিয়ে আবারও বলে,
“আপনি জানেন, আপনি একটা পাগল? আর আমি আপনার চেয়েও মস্তবড় এক পাগল।”
—“হঠাৎ এমন ভাবনার কারণ?”
—“আমার মাথা আর কাজ করেনা। আমার ধ্যান-জ্ঞান সবকিছুতে আপনার রাজত্ব; সবটাই দখল করে বসে আছেন।”
—“…..”
—“একটা অনুরোধ, আপনি আমার জীবনে আর একটিবারের জন্য ফিরে আসুন না,প্লিজ। ওয়াদা করছি, আর কখনো আপনার পিছু ছাড়ব না। সবমসময় আপনার পাশে পাশে থাকব।”
—“এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তুই তো তা হতে দিলি না।”
—“তো এটাও কি আমার দোষ নাকি? আচ্ছা আপনিই বলুন, একটা অপরিচিত, উম্মাদ, পাগলাটে পুরুষ; বলা নেই-কওয়া নেই, হুট করে আমারই বিয়ে থেকে আমাকেই তুলে নিয়ে গেল। না আমি তাকে আগে কখনো দেখেছি, না ঠিকমতো চিনি,সেও আমাকে বলল না, তার সাথে আমার কি সম্পর্ক। অথচ ওমন একটা মানুষের সাথে আমি ধ্যানজ্ঞান সব হারিয়ে সংসার পাতবো! এটাও কি সম্ভব?
সেক্ষেত্রে সব দোষ তো আপনার। একবার যদি বলতেন, আপনি আমার স্বামী, আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে, তাও কিনা আমার অবুঝ শৈশবে, আর এতোবছর পর যখন আপনার হুঁশ ফিরেছে, তখন নিজের বউকে অধিকারের দাবিতে তুলে নিয়ে গিয়েছেন—এটা তখনই বললে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেতো?”

—“…..”
—“কি হলো, কথা বলছেন না কেনো? উত্তর দিন, বলুন সব দোষ আপনার! হ্যা মানছি, শেষমুহুর্তে বাবার কথায় বাধ্য হয়ে যা করেছি তা একদমই ঠিক হয়নি, কিন্তু আপনিও তো ঠিক করেননি। বিয়ে করে গায়েব হয়ে গেলেন, আমায় একা ফেলে কোথায় হারালেন, তা আপনিই জানেন। আর যখন দেখলেন, বউটা বড় হয়ে গিয়েছে, তার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তখন ভাবলেন যাই গিয়ে একটু বউটাকে তুলে নিয়ে আসি। তখন গিয়ে আপনার বউয়ের কথা মনে পড়ল; কই আগে বউয়ের কথা মাথায় ছিল না? হু! কথা বলুন!”
—“….”
—“…আপনাকে বোঝাতে পারব না, আপনার প্রতি আমার ঠিক কি রাগটাই না হচ্ছে। ইচ্ছে তো করছে…!”
আনায়ার পাগলামির সবটাই, ভিভিয়ান নিস্ফল দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখে। আনায়া নিজেকে শান্ত করে, চাপা স্বরে বলে,
“আপনার ঐ প্রেমিকাকে খুব ভালোবাসতেন তাই না?”
আনায়া দু’হাত বাড়িয়ে ভিভিয়ানের বুকে ও কাঁধে আলতোভাবে হাত রাখে। ইতস্তত ভঙ্গিতে দুপা বাড়িয়ে, ভিভিয়ানের মুখোমুখি হয়৷ দুজনের দুরত্ব ক্ষীণ হয়। আনায়া ফিসফিস করে আওড়ায়,
“আমায় কতটুকু ভালোবাসেন?”
ভিভিয়ান তার চোখে চোখ রেখে আওড়ায়,
“কি মনে হয়?”
—“জানি না তো, আপনাকে ঠিকমতো জানা-বোঝার সুযোগই তো হলো না।”
—“….”
আনায়া আবেশে নিজেদের দুরত্ব আরো কিছুটা কমিয়ে নেয়। অজান্তেই তার তর্জনী ছুঁয়ে দেয় ভিভিয়ানের ঠোঁটজোড়া। অশালীন দৃষ্টিদ্বয় বিচরিত হয় কাল্পনিক পুরুষের মুখাবয়বে। আনায়া সঙ্কুচিত হয়ে,পা’দুটো উঁচিয়ে আঙুলের উপর ভর করে দাড়ায়; ভিভিয়ানের ঠোঁটের কাছে ঠোঁট এনে ফিসফিস করে আওড়ায়,
“আপনাকে একটা চুমু খেতে চাই।”
আনায়া ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তার চোখে-ঠোঁটে চেয়ে থাকে। ভিভিয়ান স্বাভাবিক স্বরে বলে,
“তুই কিন্তু এমনটা নোস!”

—“হু, জানি তো। আর আমার চেয়ে বেশি তো আপনি আমাকে জানেন। সবাই যে আনায়াকে দেখতে পায়,সে আমি নই৷ আমি হলাম তারা, এক পাগলাটে পুরুষের ছোট্ট তারা।”
—“উঁহু, ছোট্ট নয়, তারা এখন বড় হয়েছে।”
—“কিন্তু বজ্জাত তো সর্বদাই রয়ে গিয়েছে।”,এহেন কথা বলেই আনায়া সশব্দে হেসে উঠল। পরক্ষণেই তটস্থ হয়ে, ভিভিয়ানের ওষ্ঠদ্বয় চুম্বনের জন্য চোখ বুজল। ক্রমশই নিজের ওষ্ঠদ্বয় সম্মূখের প্রান্তে এগিয়ে যায়। আর ঠিক তৎক্ষনাৎ শক্তপোক্ত কিছুর সাথে আমায়ার কপাল ঠুকে যায়। যেই না চোখ খুলে বাস্তবতায় ফিরেছে, ওমনি সে হতভম্ব হয়ে ভড়কে যায়।
তার সম্মূখ হতে আশেপাশে কারো কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ এতোক্ষণ ধরে সে কিসব করে যাচ্ছিল? আনায়া হতবিহ্বল হয়ে, কয়েক পা পিছিয়ে আসে। দু’হাতে মাথা চেপে ধরে, চোখ-মুখ খিঁচে আওড়ায়,
‘খোদা,এটা কি ছিল? কি ছিল এসব? শেষ, আমি শেষ, এই লোক আমায় পাগল বানিয়েই ছাড়বে।”
আনায়া আর এক মূহুর্তও দেরি না করে নিজেকে সংবরণ করে ; বেখেয়ালিতে ছুঁড়ে ফেলা ওড়নাটা তুলে নিয়ে গায়ে চড়িয়ে দেয়। পরক্ষণেই আরো বেশ কিছুটা শান্ত হয়ে,বিস্তৃত মুকচি হাসে। বারান্দার দিকে এগিয়ে গিয়ে, মস্তবড় ঐ চাঁদ ও তার পাশে দৃশ্যমান এক ঝকমকে ছোট্ট তারা’র দিকে চেয়ে বলে,

‘অপার্থিব চাঁদ তুমি, ক্ষুদ্র এক নক্ষত্র আমি।তবু তোমার অতল প্রভায় দ্যুতিত হব; নীরব হলেও অমোঘ আলোকে অঙ্গীকার করিব।”
আনায়া ভারী শ্বাস ফেলে ক্ষীণ হাসে। পরক্ষণেই আবার আনমনা হয়ে আওড়াল,
“একবার নয় দুবার নয়, সহস্রবার নয়, লক্ষ-কোটিবারও নয়, আপনাকে আমি অনন্ত-অনাদিকাল পর্যন্ত নিজের করে পেতে চাই—প্রিয় চানপাখি!”
অচিরেই ঠোঁট কামড়ে হেঁসে ওঠে আনায়া। অদ্ভুত-অজানা এক আনন্দ-উল্লাস তার ভেতরের সমগ্র সত্তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। হাসি-কান্না,হতাশ-ক্ষোভ সবকিছুতেই সে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে। আনায়া অজানা স্বস্তিতে ভারী শ্বাস ফেলে দুবার গোল-গোল চক্কর কেটে,বাচ্চাদের মতো দু-হাত উচিয়ে-দুলিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। গুনগুন করে গাইতে থাকে,

‘যখনই পড়েছে নজর
আমি তো হয়ে গেছি তোর,
জেগে রয়েছি রাত ভোর
আমি তো হয়ে গেছি তোর!
খোদা জানেএএ,খোদা জানে…..’
তড়িঘড়ি করে বিছানা চড়ে বসে, কম্বল দিয়ে গা মুড়িয়ে নেয় আনায়া। অতঃপর এক সুবিস্তীর্ণ ভাবনায় নিমগ্ন হয়। ভাবনাচিন্তার একপর্যায়ে আনায়া নানান হিসেব কষতে কষতেই হকচকিয়ে আওড়াল,
“নয় আগস্ট! তার জন্মদিন, আমাদের বিয়ে, আবার…এক সেকেন্ড, গতবছর যখন ঘটনাটা ঘটল,সেদিনও তো…আগস্ট মাস, বৃষ্টি…তারপর, তারপর…হ্যাঁ,ওদিনও নয় আগস্ট ছিল!”
আনায়া থামতেই আক্রোশে ঠোঁট চেপে ধরল। বালিশের উপর ধুমধাম দুহাতে দুটো কিল বসিয়ে আওড়াল,
“ধুর,ধুর,ধুর, কি একটা কপাল আমার! অ্যানিভার্সারির দিনেই বিচ্ছেদ?”

পুনরায় সে অস্থির হয়ে ছটফট করতে লাগল। চোখদুটো বুঁজে নিয়ে, উম্মাদ পুরুষের মুখাবয়ব মানসপটে ভাসিয়ে তুলল। একইসাথে কল্পনা করতে লাগল এ্যালবামের ছবিগুলোর সাথে মায়ের বলা গল্পকাহিনী।
অচিরেই চোখবুঁজে বেখেয়ালিতে হারিয়ে যাওয়া আনায়ার ঠোঁটের কোণে মিটমিটে হাসির দেখা মিলল। আকষ্মিক লজ্জায় হুট করেই দুগালে দুটো টোল ভেসে উঠল। আদতে তার ছটফটে মস্তিষ্কে কি চলছে তা বোঝা মুশকিল।
খানিকক্ষণ বাদেই সে চোখজোড়া খুলল। ভারী শ্বাস ফেলে মিনমিন করে ত্যাছড়া স্বরে বলল,
“ভাবা যায়? আমার চেয়ে উনি কিনা সতেরো বছরের বড়। এক না, দুই না,পুরো সতেরো বছর? বেটা বুড়ো একটা!”
অথচ এমন অভিব্যক্তির খানিকক্ষণ বাদেই, কিঞ্চিৎ ঠোঁট কামড়ে আনায়া চাপা স্বরে আওড়াল,
“উমমম,বয়সে একটু বেশি হলেও খারাপ না! সুন্দর আছে।”
এই বলতে না বলতেই সে আবারও আকস্মিক লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল। রমণীর চঞ্চল মন ছটফট করে উঠল অচিরেই। সে পুনরায় বালিয়ে মুখ গুঁজে দু-তিনবার হাত-নেড়ে চাদরে কিল-ঘুষি দিয়ে, শুষ্ক ঢোক গিলে আওড়াতে লাগল,

“আয়াআআআআ,এতোকিছু জানিনা, আমার ওনাকেই লাগবে,ওনাকেই লাগবে।…হায়য়য়য়য়,কি সুন্দর, কি সুন্দর। যেভাবেই হোক, আমার বড় আব্বুর ফুতরেই লাগবে।”
আনায়া নিজেকে কোনোমতে সামলে নিল। হুট করে কি যেন মনে পড়তেই, দ্রুততর বালিশের নিচ থেকে ফোনটা হাতড়ে বের করল। কিছু সোশ্যাল প্লার্টফর্মে একটা নামই খুঁজতে লাগল। ‘ভিভিয়ান এহসান’— নেই! ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার এক্স, কোথাও তার দেখা নেই। এই নামে বেশ কিছু আইডি পাওয়া গেলেও, প্রোফাইল চেক করতেই আনায়া পুরোপুরি নিশ্চিত হয়—এদের মাঝে কেউই সে নয়, যাকে সে খুঁজছে।
আনায়া শুধু ‘ভিভিয়ান এহসান’ নয় বরং ‘ভিভান’ সহ নাম-ধাম সবকিছু উল্টেপাল্টে যেভাবে সার্চ করা যায়,সবটাই করেও ক্ষ্যান্ত হলো না। বরং বিস্ময়, রাগ ও হতাশায় তার সারা শরীর অস্থির হয়ে উঠল। শেষমেশ ফোনটা বিছানার একপাশে ছুঁড়ে দিয়ে, ক্ষিপ্ত স্বরে আওড়াল,

“ধুর! এই বান্দা কি এই দুনিয়ায় থাকে নাকি আরেক দুনিয়ায় থেকে টকপেছে? আশ্চর্য! কোথাও তার নামনিশানা নেই? এখন আমি এই খোদার বান্দাকে কোথায় খুঁজব?”
আনায়ার মস্তিষ্ক এক মূহুর্তের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিল। ভাবতে লাগল,এবার কি করা যায়।লোকটাকে খুঁজতে কি তবে চট্টগ্রামে যাবে? বাড়িটা তো চেনেই, খোঁজ-খবর নিয়ে পৌঁছাতেই পারবে। কিন্তু সমস্যা তো ভিন্ন কিছু। সে নিজেই তো দেশে থাকছে না। সে জার্মানিতে চলে গেলে, ভিভিয়ানকে খুঁজে পাবে কি করে?
আনায়া দু’হাতে মাথাটা চেপে ধরে। উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দিয়ে, চাপা স্বরে বাচ্চাদের মতো চেঁচিয়ে আওড়ায়,
“খোদা, রাস্তা দেখাও আমায়। এখন কি করব আমি? তোমার এই উদ্ভট বান্দাটাকে কোথায় পাবো আমি? তার চেয়েও বড় কথা, এই মূহুর্তে বাবাকে গিয়ে কিভাবে বলব যে, আমি দেশেই থাকতে চাই। দেশে না থাকলে তো আর আমি তাকে খুঁজে পাবো না। আমার সাথেই কেনো এসব হতে হলো, কেনো?কেনো?কেনো?”
—“এতো চিন্তার তো কিছু নেই; মন থেকে খুঁজে দেখ,ঠিকই খুঁজে পাবি আমায়।”
আনায়া ঝটপট বালিশ হতে মুখ তোলে। পাশে ফিরতেই দেখে,অতি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ভিভিয়ান তার পাশে শুয়ে আছে। আনায়া দাঁতে দাঁত পিষে, ভ্রুকুটি করে বলে,
“সমস্যা কি আপনার? আবার এসেছেন?”

—“তো আমাকেই না খুঁজছিলি?”
আনায়া চোখমুখ খিঁচে দমে যায়। ঠোঁট খানা ভিজিয়ে,নিজেকে শান্ত করে হুড়মুড়িয়ে ভিভিয়ানের দিকে এগিয়ে যায়। টিশার্টের বুকের অংশ একহাতে খিঁচে ধরে, ভ্রু উঁচিয়ে আওড়ায়,
“তাহলে চুমু খেতে দিলেন না কেন?”
আনায়ার কথা শুনে ভিভিয়ান এক চিলতে তির্যক হাসে।
—“তারা! তুইও খুব ভালো করেই জানিস—আমি শুধুই তোর কল্পনা।”
—“তো বাস্তবতায় আপনি কেনো আমার হচ্ছেন না?”
আনায়া ভারী শ্বাস ফেলে, হতাশায় নিমজ্জিত হয়। ভিভিয়ান নিজের বক্ষপটে অবস্থানরত আনায়ার ললাটে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো আলতোভাবে ছুঁয়ে ঠিক করে দেয়। আনায়া একমনে তার দিকে চেয়ে থাকে। খানিকটা সময় স্থির থাকার পর, আনমনা হয়ে বলতে থাকে,

“জানি না, আপনার সাথে আমার আবার কবে দেখা হবে। জানিনা, কিভাবে কোন উপায়ে আপনাকে আমি নিজের করে পাবো। কিন্তু বিশ্বাস করুন, গত একটা বছর ধরে যেভাবে আপনি আমার মন-মস্তিষ্কে নিজের রাজত্ব কায়েম করেছেন, এরপরও আপনাকে ছেড়ে অন্যকারো সাথে নিজের জীবনকে জড়ানোর দুঃসাধ্য আমার নেই।
হয়তো এখন আপনি আমায় ঘৃণা করছেন,কিন্তু খুব করে চাইবো আপনি আমায় ভালোবাসুন।আমার প্রতি আপনার ভালোবাসার উম্মাদনা আমি দেখতে চাই; অনুভব করতে চাই সেইসব পাগলামি। আমি চাই, আপনি কেবল আমার থাকুন,আমাকেই ভালোবাসুন।”
ভিভিয়ান হতে কোনো প্রত্যুত্তর মেলে না। আনায়া ক্ষীণ মলিন হেসে আবারও বলে,

মহামায়া পর্ব ৩০

“জানিনা আমাদের নিয়তিতে কি লেখা আছে, কিন্তু আমি শুধু এইটুকুই জানি, আমার কেবল আপনাকেই চাই। আর বিশেষ একটা অনুরোধও করতে চাই; আবার যখন আমাদের দেখা হবে,তখন ভুলেও ওভাবে আমায় অবজ্ঞা করবেন না,ঠিক আছে? নয়তো আমার কষ্ট হবে। আমি মাফ চেয়ে নেবো আপনার কাছে, তবুও আমায় অবহেলা করবেন না।”
আনায়া জানে তার সংস্পর্শে মিশে থাকা এই মানুষটা কেবলই তার কল্পনা, তবুও সে যেন কাল্পনিক পুরুষহীন বাস্তবতায় ফিরতে চায়না। আনায়া আবেশে চোখদুটো বুঁজে নিয়ে,ভিভিয়ানকে আষ্টেপৃষ্টে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে। বক্ষদেশে মাথা ঠেকিয়ে, ঘুম জড়ানো কন্ঠে আওড়ায়,
“আমাদের আবারও দেখা হোক,এবার না-হয় আমি আপনার ন্যাওটা হয়ে ছায়ার মতো পাশে থাকব; আপনাকে খুব খুব ভালোবাসব। আপনি আমায় ভালো বাসবেন তো?”
বি.দ্র. ওটা কোলবালিশ ছিল…..

মহামায়া পর্ব ৩২

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সমাপ্ত