মহামায়া পর্ব ৩৯
তুশকন্যা
‘প্রেম কি বুঝিনি আগে তো খুঁজিনি
আজ কি হলো রে আমার!
তুই তো ছিলি বেশ, লুকিয়ে ভিনদেশ,
ইচ্ছে নিয়ে পালাবার____!
তুই ছাড়া না এই মন বাঁচে,
তুই ছাড়া বল কে আর আছে
আয় চলে আয় আমার কাছে আয়___”
তীব্র উচ্ছ্বাসে গলা ছেড়ে গান গাইছে অস্থিরখেয়ালী রমণী। আনায়ার হৃদস্পন্দন কোনো এক অবাধ্য অশ্বারোহীর মতো দ্রুতগতিতে ছুটছে। একহাতে শাড়ির আচল পেঁচিয়ে অন্যহাতে শাড়ির কুঁচি উঁচিয়ে ধরেছে। ড্রয়িংরুমের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সে যেন আর মাটির পৃথিবীতে নেই; তার পায়ের তলায় এখন মেঘের গালিচা। কোনো প্রকার শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করেই সে নাচতে নাচতে দোতলার করিডোর পেরিয়ে নিজের শয়নকক্ষে প্রবেশ করল।
ঝটপট দরজাটা বন্ধ করে দিয়েই সে এক লহমায় যেন এক বিমূর্ত উল্লাসে ফেটে পড়ল। দীর্ঘদিনের জমানো একরাশ উত্তেজনা আর কেনীথের সেই বলিষ্ঠ সান্নিধ্যের আবেশ তাকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিমজ্জিত করেছে।
সে সারা ঘরে পাগলের মতো দৌড়াতে লাগল। কখনো বিছানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তো কখনো জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই খিলখিল করে হেসে উঠছে। তার কণ্ঠ দিয়ে তখন সুর নয়, যেন এক অদম্য আনন্দধারা নির্গত হচ্ছে। অবচেতন মনেই সে গাইতে শুরু করল তার প্রিয় সেই কিছু পঙক্তি,
’প্রেমেরী নিল ইশারাতে এলো মেলো হাওয়া
মনেরী মাঝে জাগালো আরো আরো চাওয়া
আগুন, আগুন, ভালোবাসাআআআ!
নেবালে যে নেবে না ও..ও..ও..
মন মানে না. মানে না
মন মানে না. মানে না____’
আনায়া দুহাত প্রসারিত করে ঘরের মাঝখানে লাটিমের মতো ঘুরতে লাগল। তার বারংবার এটাই মনে হতে লাগল, এই মুহূর্তটি যদি এখানেই থমকে যেত! আরাধ্য পুরুষের সেই প্রশস্ত বুক, তাঁর ঘ্রাণ, সেই শীতল ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অগ্নি-উত্তাপ ছোঁয়া—সবকিছুই তাকে এক অলৌকিক আনন্দের জগতে এক লহমায় ভাসিয়েছে। সামনের সাত দিন আর তার দুচোখের পাতা এক হওয়া সম্ভব নয়। সে নিজের দুহাতে মুখ ঢেকে তীব্র উচ্ছ্বাসে বিড়বিড় করল,
“সাব্বাস আনায়া! তুই পেরেছিস! তুই সত্যিই পেরেছিস।”
কিন্তু এই আত্মতুষ্টির আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হাসতে হাসতে যখন সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, ঠিক তখনই তার পায়ের গতি যেন কোনো এক অদৃশ্য আঘাতে থমকে গেল। আয়নার প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে তার চক্ষু চড়কগাছ! মুহূর্তের মধ্যে তার আনন্দের জোয়ার এক অতলান্ত বিষাদে আর লজ্জায় রূপান্তরিত হলো। তার চোয়াল ঝুলে পড়ল, মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোলো না।
ভিজে সিক্ত অবস্থায় তার যা দশা হয়েছে, তা দেখে আনায়ার ইচ্ছে হলো এখনই মাটির নিচে সেঁধিয়ে যেতে। ঝমঝমে বৃষ্টিতে ভিজে তার ফিনফিনে জামদানী শাড়ি আর পাতলা ব্লাউজ শরীরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে যে, তার সুকুমার দেহের প্রতিটি ভাঁজ আর বঙ্কিম রেখা যেন এক নির্লজ্জ শিল্পকর্মের মতো ফুটে উঠেছে। বৃষ্টির স্বচ্ছ জলধারা তাকে এক প্রকার বিবস্ত্র আবেশে জড়িয়ে রেখেছে। সিক্ত কাপড়গুলো তার লতানো শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি যেন প্রখরভাবে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
আনায়া ছটফটে ভঙ্গিতে ঘুরে ফিরে আয়নায় নিজেকে দেখতে লাগল। এক সুতীব্র আতঙ্কে আর লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠল—
”আস্তাগফিরুল্লাহ্! ছিঃ ছিঃ! আমি কি এই… এই অবস্থায় ওনার সামনে ছিলাম? উনি কি সব দেখেছেন? ওহ খোদা! আমায় তুলে নাও!”
তার মস্তিষ্কের ভাবনায় তখন কেবল কেনীথের নিস্পৃহ গভীর দৃষ্টির কথা ভেসে উঠল। কেনীথ যখন তাকে তার ওভারকোট দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল, তখন কি সে তার সবকিছু অনুভব করেছিল? ব্লাউজের উন্মুক্ত গ্রীবা, সেই ভিজে সিক্ত শাড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা লাবণ্য—সবই কি তবে তাঁর চোখের সামনে উন্মুক্ত ছিল? ভাবতেই আনায়ার সারা শরীরে লজ্জার এক তীব্র লহর খেলে গেল। সে নিজের ওপর প্রচণ্ড বিরক্তিতে ফেটে পড়ল। মনে মনে নিজেকে সহস্রবার ধিক্কার দিল—
“গাধা তুই, মস্তবড় একটা গাধা। পুরোপুরি নির্লজ্জ-বেহায়া হয়ে গেছিস।”
মস্তিষ্ক তখন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এই তীব্র গ্লানি আর লজ্জা থেকে বাঁচতে সে দ্রুত বাথরুমের দিকে দৌড়াতে গেল। কিন্তু তাড়াহুড়ো আর মেঝের পিচ্ছিলতায় তার ভারসাম্য বজায় থাকল না। হঠাৎ সজোরে পা পিছলে সে সশব্দে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। ভাগ্যিস! কপালটা অল্পের জন্য খাটের কোণ থেকে বেঁচে গেল, নয়তো আজ র ক্তার ক্তি কাণ্ড হতো। তবে কোমরে যে চোট পেল, তাতে মনে হলো মেরুদণ্ডটা বুঝি ইতিমধ্যে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছে।
—’উইম্মাআআআআআ!’
যন্ত্রণায় আনায়া মুখ দিয়ে এক বিকট শব্দ নির্গত হলো। পরক্ষণেই ধপ করে ফ্লোরে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে রইল। কোমরের অসহ্য ব্যথার চেয়েও তখন তার কাছে বড় হয়ে দেখা দিল সেই নিদারুণ লজ্জা। মেঝের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে সে অবুঝ শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। একদিকে ভিভিয়ান নামক আরাধ্য পুরুষের তপ্ত ছোঁয়ার মূহুর্ত, আর অন্যদিকে এই নগ্নপ্রায় অবস্থার চরম অপদস্থতা—সব মিলিয়ে আনায়ার দিনটি শেষমেশ সমাপ্ত হলো হযবরল রূপে।
সকাল বেলায় বিধ্বস্ত ঝড়ের মতো এলোমেলো করে রেখে যাওয়া ঘরটায়, ফ্লোরে শুয়ে গড়াগড়ি করতে করতে আনায়া বিড়বিড় করে দাঁতে দাঁত চিপে বলতে লাগল,
“বড় আম্মুর বাচ্চা! শুধু একবার, শুধু একবার আপনাকে পুরোপুরি হাতের নাগালে পাই। এই সব ভোগান্তির ফল আমি সুদে-আসলে গুণে নেবো।”
বিকেলের ম্লান আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ড্রয়িংরুমে এক বিষণ্ণ ছায়া হয়ে প্রবেশ করছে। বৃষ্টির তেজ কিছুটা কমলেও আকাশের মুখ এখনো ভার। আনায়া সোফায় কুঁকড়ে বসে একদৃষ্টিতে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে আছে—আইজেল আর সাবার এখনো ফেরার নাম নেই।
আনায়া বাড়ি ফিরেই দুজনকে এসএমএস পাঠিয়ে নিশ্চিত করেছিল যে আগেই বাড়ি চলে এসেছে; যাতে তারা অহেতুক তাকে খুঁজতে গিয়ে দুশ্চিন্তা না করে। কিন্তু এখনো দুজনের ফেরার কোন নাম-গন্ধ নেই দেখে, আনায়া কিছুটা চিন্তিত। ফোনও তুলছে না,মেসেও সিন করছে না।
অপেক্ষার প্রহর যখন ক্রমশই দীর্ঘতর হচ্ছিল, ঠিক তখনই কলিংবেলের তীক্ষ্ণ শব্দে আনায়ার ভাবনায় ছেদ পড়ল। দরজা খুলতেই দেখা মিলল আইজেল আর সাবার। বাইরে থেকে আসা বৃষ্টির ছাঁটে তারা ভিজে একাকার, কিন্তু তাদের চোখেমুখে যে দীপ্তি আর উল্লাস, তাতে ক্লান্তি বা বিরক্তির লেশমাত্র নেই। ঘরে ঢুকেই দুজনে একসাথে আনন্দের চিৎকার করে উঠল। আইজেল দুহাত ছড়িয়ে রীতিমতো নেচে নেচে আনায়ার দিকে এগিয়ে এল,
”আনায়াআআআআআ! ইউ ওন্ট বিলিভ হোয়াট হ্যাপেন্ড!”
তাদের এই আকস্মিক উন্মাদনা দেখে আনায়া কিঞ্চিৎ থতমত খেয়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
“কী হয়েছে তোমাদের? এত খুশি কেন?”
আইজেল আর সাবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় হাসল। তারপর সোফায় আয়েশ করে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমরা পারমিশন পেয়ে গিয়েছি আনায়া! সব ক্লিয়ার!”
আনায়া বিস্মিত হয়ে পালটা প্রশ্ন করল,
“পারমিশন? কিসের পারমিশন?”
সাবা তার ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“ব্লাডেন হেলে যাওয়ার পারমিশন! ওটা ব্লাডেন মেম্বারদের নিজস্ব ট্রিপলেক্স ম্যানশন। ওখানে ইমানি ম্যাম, ভিকে আর মিস্টার হান্স থাকে, যাস্ট ইমাজিন… আমরা ব্লাডেন হেলে যাবোওওও!”
আনায়ার কানে ভিকে নামটা প্রতিধ্বনিত হতেই, সে অবাক হয়ে বলল,
“ব্লাডেন হেল? এটা আবার কোন জায়গা? আর ওখানে তোমাদের কেন যেতে দিবে?”
আইজেল এবার ধীরেসুস্থে ব্যাখ্যা করল,
“লিসেন বেবস্, ভার্সিটির প্রিন্সিপালের কাছ থেকে বিশেষ এক পারমিশন নেওয়া হয়েছে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের ১২-১৫ জন ফ্রেশার আর অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট থেকে হাতে গোনা দুই-একজন ওখানে যাওয়ার সুযোগ পাবে। মূলত এসাইনমেন্টের খাতিরে আমাদের প্রফেসর ভিকে-র কাছ থেকে কিছু হেল্প আর গাইডেন্স নিতে হবে।”
সাবা কিছুটা দমে গিয়ে যোগ করল,
“কিন্তু একটা সমস্যা আছে। প্রিন্সিপাল পারমিশন দিলেও মূল অনুমতি নিতে হবে ব্লাডেনের একজন মেম্বারের কাছ থেকে। আর আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা হচ্ছেন ইমানি ম্যাম। তাকে যদি একবার রাজি করানো যায়, তবে কাল সকালেই আমরা সেখানে পা রাখতে পারব।”
আনায়া সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বলল,
“এসাইনমেন্টের জন্য কোনো প্রফেসরের ব্যক্তিগত বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি দিবে? ব্যাপারটা কি একটু অদ্ভুত লাগছে না?”
আইজেল হেসে উত্তর দিল,
“আরে পাগলী, এসাইনমেন্ট তো একটা উছিলা মাত্র! আসল উদ্দেশ্য হলো ব্লাডেন হেল স্বচক্ষে দেখা। ব্লাডেন হেল শুধু একটা বাড়ি না, ওটা কোনো মিউজিয়ামের চেয়ে কম কিছু না! ওখানে ঢুকতে পারা মানেই ভাগ্যের ব্যাপার। অডিটোরিয়ামে এতক্ষণ ধরে এই নিয়ে তুলকালাম আলোচনা চলছিল। সাবা তো অন্য ডিপার্টমেন্টের, তবুও একটা অপশন আছে, দেখা যাক কি হয়। যদি ও তো আমাদের ওপরও চটে আছে—ভিকে যে আমাদের ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর, সেটা ওকে আগে জানাইনি কেন!”
সাবা মুখ ফুলিয়ে বলল,
“অবশ্যই রাগ করব! এতো বড় একটা বিষয় একবার জানালে কি এমন ক্ষতি হতো?
আইজেল আনায়ার হাত ধরে টান দিয়ে বলল,
“এখন ওসব ভাবার সময় নেই। আমাদের দ্রুত তৈরি হতে হবে। আজ বিকেলের মধ্যেই ব্লাডেন গ্যালারিতে যেতে হবে। সেখানে ইমানি ম্যামের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি যদি একবার গ্রিন-সিগন্যাল দেন, তবে কাল থেকে আমাদের আর পায় কে! আমাদের ডিপার্টমেন্টের আরও কয়েকজন সেখানে পৌঁছাবে ইমানি ম্যামকে কনভেন্স করার জন্য। জলদি কর আনায়া, দিস ইজ আ গোল্ডেন অপর্চুনিটি আয়াআআআ!”
আনায়া স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার অন্তরালের আয়নায় ভেসে উঠল খানিক আগের সিক্ত বিকেলে কেনীথের সুগম্ভীর মুখখানা। অতঃপর আবারও তাদের দেখা হবে? একদম সামনা-সামনি, মুখোমুখি, তারই বাড়িতে? অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাসে তার হৃৎপিণ্ড আবার দুলতে শুরু করল।
গোধূলির শেষ আভাটুকু দিগন্তের ওপারে মিলিয়ে যাচ্ছে। একরাশ অনিশ্চয়তা আর অদম্য কৌতূহল সঙ্গী করে যে যার বাড়ি হতে যাত্রা শুরু করেছে ব্লাডেন গ্যালারি’র অভিমুখে। শীতের হিমেল পরশ থেকে বাঁচতে প্রত্যেকেই ভারী আর পরিপাটি পোশাকে সজ্জিত।
তবে গ্যালারির সামনে পৌঁছাতেই আইজেল আর আনায়ার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক চরম হতাশার দৃশ্য। তাদের ডিপার্টমেন্টের আরও কয়েকজন স্টুডেন্ট সেখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে, যাদের চোখেমুখে ব্যর্থতার স্পষ্ট ছাপ। নিয়োজিত গার্ডরা কাউকেই ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না; কারণ তাদের কাছে কোনো লিগ্যাল ভিজিটিং পারমিট নেই।
স্টুডেন্টরা মিনতি করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। পরিস্থিতি দেখে সবাই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে যে, ইমানি ম্যামের দেখা পাওয়া তো দূরের কথা, তাঁর সাথে কথা বলে কনভেন্স করার দুঃস্বপ্ন দেখাও এখন বিলাসিতা।
আইজেল যখন সবার সাথে পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই আনায়ার অস্থির নজর চলে গেল দূরপ্রান্তের এক মনোমুগ্ধকর কর্নারে। সেখানে সারি সারি করে সাজানো রাখা হয়েছে অ্যাংরি বার্ডস্ সিরিজের বেশ কিছু সফট টয়। প্রিয় কার্টুন চরিত্রগুলোকে চোখের সামনে দেখে আনায়া যেন মুহূর্তেই সবকিছু ভুলে গেল। আইজেল বা বাকিদের কথোপকথনের আর কোনো গুরুত্ব রইল না তার কাছে। সে একপ্রকার মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধীর পায়ে সেদিকে এগোতে লাগল। আইজেলও তার এই আকস্মিক প্রস্থানের দিকে খেয়াল রাখার সুযোগ পেল না; সে তখন বাকিদের সাথে প্রত্যাবর্তনের বিকল্প পথ খুঁজতে ব্যস্ত।
একসাথে এতগুলো বিশালাকার ও জীবন্ত সফট টয় দেখে আনায়া যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। তার চোখজোড়া উচ্ছ্বাসে চকচক করে উঠল। সেখানে তিনটি বিশাল আকৃতির গাঢ় লাল রঙের ‘রেড’, একটি চঞ্চল হলুদ রঙের ‘চাক’ আর একটি মায়াবী গোলাপি রঙের ‘স্টেলা’ সুন্দরভাবে গুছিয়ে সাজিয়ে রাখা।
বিশেষ করে দানবীয় সাইজের বড় রেডটার দিকে তাকিয়ে আনায়া খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল। সে অবচেতন মনেই হাত বাড়িয়ে সেগুলোকে ছুঁতে যাচ্ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই এক সুপ্ত আশঙ্কা তাকে থামিয়ে দিল। সে ভাবল, আগে প্রাইজ ট্যাগটা দেখে নেওয়া জরুরি; নয়তো দেখা যাবে আগেরবারের মতো এই পুতুলের মূল্যের কাছে তার পৈতৃক বিষয়সম্পত্তিও তুচ্ছ হয়ে পড়েছে।
কিন্তু প্রাইজ ট্যাগের ওপর নজর পড়তেই আনায়ার বিস্ময়ের সীমা রইল না। মূল্য তালিকার অংকগুলো তার কল্পনার চেয়েও কয়েক গুণ কম! এমনকি স্বাভাবিক বাজারের চেয়েও যেন এগুলো অবিশ্বাস্য সস্তায় বিক্রি হচ্ছে। সে ভ্রু কুঁচকে চারপাশটা একবার পরখ করে নিল—আদৌ কি এগুলো বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে নাকি কোনো বিশেষ প্রদর্শনীর অংশ?
তবে অভাবনীয় সস্তা দামের সুযোগ হাতছাড়া করার পাত্রী আনায়া নয়। সাথে যে ক’টা টাকা আছে, তা দিয়ে অনায়াসেই এই সবকটি সফট কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে। সে আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে সবগুলো পুতুল কিনে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
এদিকে প্রবেশপথের সামনে সবাই যখন এক নিদারুণ ব্যর্থতার গহ্বরে নিমজ্জিত হয়ে বাড়ি ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই আইজেল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল।
হেডকোয়ার্টারের বিশাল ফটক পেরিয়ে বাইরে আসার জন্য বেরিয়ে আসছিল সকলের ইমানি ম্যাম। যাকে নিয়ে নতুন করে আর কিছুই বলার থাকে না। তাঁর সেই চিরচেনা রাজকীয় আভিজাত্য আর তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্বের ছটায় যেন চারপাশ মুহূর্তেই প্রকম্পিত হয়ে উঠল। পরনে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের আউটফিট, চোখেমুখে সেই দর্পিত চাহুনি আর ঠোঁটে কড়া লাল লিপস্টিকের প্রলেপ—সব মিলিয়ে সে যেন কোনো পৌরাণিক সম্রাজ্ঞী।
তাঁর হাই-হিলের খটখট শব্দে উপস্থিত সকলের নজর সেদিকে নিবদ্ধ হলো। একঝাঁক বলিষ্ঠ বডিগার্ড তাঁকে ঘিরে রেখেছে প্রহরীর মতো।
ইমানিকে সশরীরে এত কাছে দেখে বাকি সবাই যখন বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখনই সেই সুযোগটি লুফে নিল আইজেল। গার্ডদের সামান্য অসতর্কতার সুযোগে সে হুড়মুড়িয়ে সিকিউরিটির বেষ্টনী পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। ক্ষিপ্ত প্রহরীরা তাকে পাকড়াও করার জন্য পিছু নিতেই, আইজেল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে বলল,
“প্লিজ! মাত্র কয়েকটা মিনিট সময় দিন! আমি ম্যামের সাথে কথা বলেই চলে যাবো!”
বলতে বলতেই সে প্রায় ইমানির পায়ের কাছে গিয়ে আছড়ে পড়ার উপক্রম হলো, যদিও সে দ্রুততর কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। তবে বাঁধা তখনও অতিক্রান্ত হয়নি। ইমানির চারপাশের ক্রুদ্ধ গার্ডরা তাকে একযোগে ধরতে এলে, ইমানি তাঁর ভ্রু ঈষৎ কুঁচকে শীতল দৃষ্টিতে মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করল। আইজেল তড়িঘড়ি করে বারংবার মাথা ঝুকিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে একপ্রকার হাঁপিয়ে উঠেছে,
“ম্যাম, দয়া করে মাত্র দু’মিনিট সময় দিন। আমি বেশি সময় নেবো না।”
আইজেলের এই দুঃসাহসী প্রচেষ্টা আর তার সপ্রতিভ আচরণ সম্ভবত ইমানির মনস্তত্ত্বের কোনো এক সুপ্ত কৌতূহলকে স্পর্শ করল। সে একটু অবাকই হলো বটে। ইমানি তাঁর বা-হাত উঁচিয়ে পেছন হতে আগত গার্ডদের থামিয়ে দিল তৎক্ষনাৎ। ইমানির একটি ইশারাতেই সব স্থির হয়ে গেল। আইজেলকে আপাদমস্তক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে নিল সে। অতঃপর দুই হাত বুকের কাছে গুঁজে নিয়ে, তির্যক গম্ভীর কণ্ঠে কথা বলার অনুমতি প্রদান করল,
“স্পিক আউট। হোয়াটস ইওর ইমার্জেন্সি?”
আইজেল হাপাচ্ছিল, তবে তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। সে নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত মার্জিত ও গোছালোভাবে বলতে লাগল,
“আই অ্যাম সরি ম্যাম, এভাবে ইন্টারাপ্ট করার জন্য। বাট দিস ইজ ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট। আমরা টাম-এর ম্যাকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট। প্রফেসর ভিকের আন্ডারে আমাদের একটা এসাইনমেন্ট আছে, যেটার জন্য ব্লাডেন হেলে আমাদের যাওয়ার পারমিশন দরকার ছিল। প্রিন্সিপাল অলরেডি গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছেন, বাট আপনার ভ্যালিডেশন ছাড়া ইটস ইমপসিবল ফর আস।”
এভাবেই আইজেল বুক ভরে শ্বাস নিয়ে অত্যন্ত পরিপাটি এবং গোছানো ভাষায় তাদের আগমনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করল। সে কোনো রকম ভূমিকা না করে সরাসরি ব্লাডেন হেলে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা, তাদের অ্যাসাইনমেন্টের গুরুত্ব এবং প্রফেসর ভিকে-র নির্দেশনার আবশ্যকতা তুলে ধরল।
ইমানি স্থির দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। আইজেলের প্রতিটি শব্দ ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এবং যুক্তিনির্ভর, যা ইমানির মতো কঠোর ব্যক্তিত্বের মানুষকেও কিছুটা প্রভাবিত করল। সাধারণত এই বয়সের শিক্ষার্থীরা তাঁর সামনে এসে থতমত খেয়ে যায়, কিন্তু আইজেলের এই পরিপক্কতা তাঁর বেশ পছন্দ হলো।
ইমানি নিঃশব্দে তাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। তার মতোই বেশ লম্বা-চওড়া, চুলগুলোও তার মতোই কিছুটা গাঢ় বাদামী, চোখদুটো অদ্ভুতসুন্দর বাদামী রঙের। যদিও ইমানির চোখদুটো অবশ্য হ্যাজেল রঙের। সবশেষে আইজেলের প্রেজেন্টেশন স্কিল আর সাহসিকতা সত্যিই তাঁর বেশ মনে ধরেছে। কিছু তো একটা আকর্ষণীয় বিষয় রয়েছে মেয়েটার মাঝে।
আইজেলের কথা শেষ হলে ইমানি কিঞ্চিৎ গম্ভীর-মার্জিত স্বরে প্রশ্ন করল,
“হোয়াটস ইওর নেম?”
—”আ…আইজেল, ম্যাম।”
ইমানি মাথাটা সামান্য হেলিয়ে তার নামটা মনে মনে দুবার আওড়িয়ে,মুখে বলল,
“আইজেল… আ প্রিটি নেম ফর আ স্মার্ট গার্ল। ইউ হ্যাভ গড আ স্ট্রং পারসোনালিটি; আই লাইক ইট।”
ইমানির মতো একজনের মুখ থেকে এমন প্রশংসা শুনে আইজেল রীতিমতো বিমোহিত হয়ে গেল। সে-ও খুশি মনে প্রত্যুত্তর দিল,
“থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ ম্যাম। তবে আপনার আভিজাত্য আর ব্যক্তিত্বের প্রশংসা না করলেই নয়, আপনি সত্যিই অনন্য।”
দুজনের কথোপকথনের সবটাই চলল জার্মান ও ইংরেজির মিশ্রনে। ইমানি আর কথা বাড়াল না, কেবল সম্মতির একটা সূক্ষ্ম ইশারা দিয়ে তাঁর গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গেল। তাঁর সম্মতির এই নীরব সংকেত পেয়ে আইজেল বুঝে নিল কাজ হয়ে গিয়েছে। গ্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাকিরা তখন বিস্ময়ে হতবাক। যে ইমানি ম্যামের কাছে পৌঁছানোই অসম্ভব ছিল, আইজেল শুধু তাঁর কাছে পৌঁছালোই না, বরং একপ্রস্থ হৃদ্যতাপূর্ণ আলাপ সেরে ফিরে এল।
আইজেল বিজয়ী বেশে গ্যালারি থেকে বেরিয়ে এল এবং সবাই একরাশ স্বস্তি আর সাফল্যের আনন্দ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিল।
এদিকে ঝামেলা কেটে যাবার পর ইমানি নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাথার মধ্যে কেনীথকে নিয়ে নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। আগামীতে কি হতে চলেছে,সবটাই অনিশ্চিত। সবমিলিয়ে মেজাজটা খানিক চড়া। এরিমধ্যে হঠাৎ তাঁর তীক্ষ্ণ নজর পড়ল গ্যালারির দূরবর্তী কর্নারে। সেখানে কিছু স্টাফ তড়িঘড়ি করে সেই অ্যাংরি বার্ডস সিরিজের বিশাল সফট টয়গুলো নামিয়ে প্যাকিং করছে। ইমানি ভ্রু উঁচিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করল; মনের ভেতর স্বস্তি অনুভূত হচ্ছে তার।
ইমানি মনে মনে স্বস্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আওড়াল,
“গড! ফাইনালি এই উইয়ার্ড মেসগুলো ক্লিয়ার হচ্ছে।”
মূলত এই বিশাল পুতুলগুলো ছিল ইমানির সেই তথাকথিত সাইকো দিওয়ানার পাঠানো সারপ্রাইজ গিফট। গতকালই এসব তার কাছে এসেছে। দীর্ঘদিনের পাগলামি আর অনাকাঙ্ক্ষিত উপঢৌকনের ভিড়ে এবারই প্রথম সেই লোক কোনো স্বাভাবিক কিছু পাঠিয়েছিল।
ইমানি অবশ্য অবাক হয়েছিল তার রুচির এমন পরিবর্তন দেখে।আরেকটু অবাক হয়েছিল এবার কোনো চিরকুট বা চিঠি না পেয়ে। কিন্তু এই সফট-টয়ের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। নিজের রুচির সাথে এগুলো একেবারেই বেমানান ছিল বলে সে স্টাফদের গতকালই অর্ডার দিয়েছিল, এগুলো নামমাত্র মূল্যে ডিসপোজ করে দিতে।এখন সবকটি পুতুল একযোগে বিক্রি হতে দেখে সে বেশ সন্তুষ্ট।
অন্যদিকে, বাড়ি ফেরার পথে আনায়া আর আইজেল পড়ল এক মহাবিপাকে। আইজেল এতক্ষণ ইমানিকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় খেয়ালই করেনি যে আনায়া পুরো একটা অ্যাংরি বার্ডস্ বাহিনী কিনে বসে আছে! এতগুলো বিশালাকার সফট টয় নিয়ে জনবহুল রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরা যে কতটা দুঃসাধ্য, তা তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল। একেকটি পুতুল যেন একেকজন মানুষের সমান জায়গা দখল করে আছে।
অবশেষে বহু কসরত, হাসাহাসি আর পথচারীদের কৌতূহলী দৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা সেই বিশাল লাল-হলুদ-গোলাপি পুতুলের পাহাড় নিয়ে বাড়ির ফটকে পৌঁছালো। আনায়া ক্লান্ত হলেও ফুরফুরে মনের কোণে এক অদ্ভুত তৃপ্তি বিরাজিত।
তবে এসব দেখে সাবার অভিব্যক্তি ছিল দেখার মতো। সে কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল; যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার অতি সিরিয়াস দুই বান্ধবী কাজের কথা বলে বাইরে গিয়ে আস্ত এক অ্যাংরি বার্ডস্ স্কোয়াড নিয়ে ফিরবে।
সাবা বিস্ময়ের সাথে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল,
“সিরিয়াসলি গাইস? তোমরা কি রিগ্রেশনের স্পেশাল থেরাপি নিচ্ছো? কাজের কথা বলে এই বাচ্চাদের পুতুল কিনে বাড়ি এসেছো! রাস্তার লোকজন তোমাদের দেখে হাসেনি?”
আইজেল ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত হয়ে জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে উত্তর দিল,
“হাসাহাসি বাদ দেও সাবা। এগুলো আনতে গিয়ে আমার যা কসরত হয়েছে, সেটা আমিই জানি।”
—“তো এসব কিনতে কে বলেছে? তোমায় আমি যথেষ্ট ম্যাচিউর ভেবেছিলাম আইজেল।”
আনায়া পুতুলগুলো নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। সে ওগুলোর নিচে প্রায় চাপা পড়েছে। আইজেল দ্রুততর সেগুলো রাখতে রাখতে বলল,
“এগুলো আমার না আনায়ার। আর এসবের জন্য ম্যাচিউরিটি কোনো ফ্যাক্ট না। মানুষের জীবন তো একটাই। যার যেটা ভালো লাগে, জীবনে সেটাই করা উচিত। পাছে লোকে তো কত হাসবে, কত কি বলবে।”
সাবার ইচ্ছে ছিল আনায়াকে দুটো ত্যাছড়া কথা শোনানোর। তবে শুরুতেই আইজেলের এমন পজেটিভ কথাবার্তা সে আর কথা বাড়াল না। বরং কাজের প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করতে লাগল,
“তো কাজ হয়েছে তো তোমাদের?”
—“হ্যা,হ্যা, হবে না কেনো। ইউ নো হোয়াট, আমি লাইফের ফাস্ট টাইম স্বচক্ষে ইমানি ম্যামকে এতো কাছ থেকে দেখেছি, আর তার সাথে কথাও বলেছি।”
আইজেল তীব্র উচ্ছ্বাসের সাথে সেসব ঘটনা বলতে থাকে। সাবাও বেশ আগ্রহ নিয়ে সেসব শুনতে লাগল। তবে আনায়া ব্যস্ত নিজের কাজে।
সে দ্রুততর সবগুলো সফট-টয় একত্রে জাপটে ধরে, টানতে টানতে নিজের শোবার ঘরের দিকে ছুটল। ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজাটা হালকা করে ভিড়িয়ে দিয়ে সে নিজের কল্পনার জগত সাজাতে শুরু করল। নিজের বিছানায় তিনটি ভিন্ন সাইজের গাঢ় লাল রঙের রেড’কে এমনভাবে বসিয়ে দিল, যেন তারা একেকজন তার অতন্দ্র প্রহরী; সব’কটাই কেনীথের সেই গম্ভীর আর রাগী মুখাবয়বের প্রতিচ্ছবি। আনায়া মৃদু হেসে দু-চারটে চুমু ছুঁড়ে দিয়ে বিড়বিড় করল,
“তোমরা ঠিক ওনার মতোই রাগী, অথচ কত্ত কিউট! উম্মাহ,উম্মাহ।”
এবার বাকি রইল হলুদ রঙের ‘চাক’ আর গোলাপি রঙের স্টেলা। আনায়া বিছানার মাঝখানে বসে চাক-এর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। তীক্ষ্ণ নাক আর চঞ্চল সেই চাহনি দেখে তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে আনমনে বলে উঠল,
“তা আপনার নাম কি দেবো? উমমম, পাভেল! এটা ঠিক আছে।”
চাককে পাভেল নাম দিয়ে সে পাশে থাকা স্টেলার দিকে নজর দিল। স্টেলার বড় বড় চোখ আর আভিজাত্যপূর্ণ অবয়ব দেখে তার হঠাৎ ইমানির কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই সে মাথা নাড়ল। না, ইমানি ম্যামের সেই কুল অ্যান্ড ক্যালকুলেটেড ব্যক্তিত্বের সাথে এই তুলতুলে গোলাপি স্টেলার ঠিক মেলবন্ধন হচ্ছে না। ইমানি মানেই তো নিকষ কালো র’ক্তাক্ত আভিজাত্য; আর স্টেলা বড্ড বেশি কোমল।
আনায়া কিছুক্ষণ ভাবল, স্টেলা ক্যারেক্টারটা আসলে কাকে দেওয়া যায়? কোনো জুতসই নাম খুঁজে না পেয়ে সে আপাতত হাল ছেড়ে দিল। বিছানার পাশের টি-টেবিলটা পরিষ্কার করে সে পাভেল ওরফে চাক-এর ঠিক পাশেই স্টেলাকে বসিয়ে দিল। জোড়ায় জোড়ায় তাদের এই সাজানো রূপ দেখে আনায়ার ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
বলা বাহুল্য,সেই রাতে সাবার হাসাহাসি থামলেও আনায়ার ঘরের দরজার আড়াল থেকে এক চিলতে সুখের আভা সারা বাড়িতেই ছড়িয়ে পড়েছিল। আগামীকালের সকালটা যে এক নতুন রোমাঞ্চের হাতছানি নিয়ে আসবে, তা যেন এই অবোধ খেলনাগুলোও জানত।
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই ভার্সিটির নির্দিষ্ট ভ্যানটি গিয়ে থামল ব্লাডেন হেল-এর সদর তোরণে। গাড়ি থেকে নেমেই একদল তরুণ-তরুণী বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে এক বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে বিস্তৃত সেই রহস্যময় ট্রিপলেক্স ম্যানশন। পুরো বাড়িটি ব্ল্যাক অ্যান্ড ডার্ক রেড থিমের এক রহস্যময় ভুতুড়ে সংমিশ্রণে সজ্জিত।
আধুনিক স্থাপত্যের প্রতিটি ভাঁজে স্পষ্টত গাম্ভীর্যপূর্ণ আভিজাত্য চুইঁয়ে পড়ছে।
বাড়ির চারপাশে অসংখ্য চেরি ফলের গাছ; গাঢ় লাল টকটকে চেরি ফলের থোকাগুলোর ভারে ডালগুলো নুয়ে আছে। ম্যানশনের পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায় তুষারে ঢাকা পাহাড়ের সেই সুউচ্চ চূড়া। প্রকৃতি আর স্থাপত্যের এমন দৃশ্য যেন এক লহমায় সবাইকে বাকরুদ্ধ করে দিল।
—”আরেব্বাস! এটা বাড়ি না আর কিছু,এতো জোস কেন?”
আইজেল সহ আরো বেশ কয়েকজনের মুখ হতে এমনই সব কথাবার্তা অচিরেই নির্গত হলো। আনায়া চুপচাপ দেখতে লাগল চারপাশটা। সত্যিই অবাক করার মতো। সবকিছু কত শান্ত, ছমছমে; দূর হতে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে শীতল হাওয়া তাদের গা স্পর্শ করছে; অচিরেই শিউরে উঠছে সর্বাঙ্গ।
আনায়ার পরনে আজ বাকিদের মতোই সাদা জ্যাকেট আর কালো জিন্স। দেশে থাকতে বেশ রঙেঢঙে আনারকলি সহ গাউন পড়ে ঘুরে বেড়াতো। কালে কালে সে তার ঐ গোছালো রূপ থেকে অনায়াসেই বেরিয়ে এসেছে।অবাধ্য চুলগুলোকে নিজের মতোই ছেড়ে রেখেছে। সেগুলো দমকা হাওয়ায় ক্রমশই এলোমেলো হচ্ছে।
বাকিরা চারপাশের সৌন্দর্য নিয়ে মেতে থাকলেও, আনায়া আর আইজেলের বিস্ময় কাটার নাম নেই। তবে আফসোসের ব্যাপার,আজ তাদের সাথে সাবা আসতে পারেনি। ভার্সিটি হতে কেবল তাদের ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্টদেরই এলাউ করা হয়েছে। এই নিয়ে গতরাত হতেই বেচারী মন খারাপ করে বাড়িতে বসে আছে।
সবাই ধীর পায়ে এবার সেই সুউচ্চ বিশাল কালচে কাঠের দরজাটির সামনে এসে দাঁড়াল। বারোজন মেয়ের সাথে কেবল তিনজন ছেলে এসেছে। কিন্তু কেউই বুঝতে পারছে না, এবার তারা কি করবে। গাইড দেবার জন্য সেভাবে তো কেউই আসেনি।
দরজার দুপাশে স্বচ্ছ গ্লাসের দেয়াল দিয়ে ড্রয়িংরুমের ভেতরের অংশ কিছুটা দেখা যাচ্ছে। কলিংবেল চাপবে কি না—এই নিয়ে সবাই যখন দ্বিধায়, তখনই আবার সবার নজর চলে গেল গ্লাসের ওপারে। ড্রয়িংরুমের আভিজাত্যপূর্ণ প্রকোষ্ঠে এক দীর্ঘকায় পুরুষ অবয়বকে অত্যন্ত অবিন্যস্ত রূপে দেখা মিলেছে।
গতকাল বৃষ্টিতে সামান্য ভেজার মাসুল হিসেবে, কেনীথকে দিতে হয়েছে চড়া মূল্য। মধ্যরাত থেকেই তার শরীরে তীব্র জ্বর। এছাড়া মাথায় একের পর এক ভাবনাচিন্তা তো ঘুরপাক খাচ্ছিলই। ফলে সারারাত নির্ঘুম কাটানোর পর, অবশেষে ভোররাতে দু-চোখের পাতা এক করতে পেরেছিল। আর একারণেই ঘুম থেকে উঠতে উঠতে তার এতো বেলা হয়ে গেল। যদিও আগে সে এসব বিষয়ে আরো বেশি খামখেয়ালী ছিল, কিন্তু গত একবছর হতে সে নিজের প্রতি না হোক, নিজের দায়িত্বের প্রতি বেশ সিরিয়াস হয়েছে। যদিও তার ছন্নছাড়া বেপরোয়া হাবভাব সব এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে।
কেনীথের পরনে কেবল একটি ঢিলেঢালা, পাতলা কালো টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। ট্রাউজারের বা-পায়ের একদিকের অংশ হাঁটুর ওপর পর্যন্ত অগোছালোভাবে উঠে আছে। কাঁধ অব্দি ছুঁয়ে থাকা মাথার চুলগুলো প্রচণ্ডরকমের এলোমেলো। এক হাতে কফির মগ আর অন্য হাতে ফোন—পুরুষ যেন তার নিজের এক বন্য সত্তায় বিচরণ করছে।
এদিকে দরজার বাহিরে উপস্থিত কারো চিনতে বাকি রইল না যে, এটাই তাদের তথাকথিত প্রফেসর ভিকে। কিন্তু ভার্সিটির সেই ডিসেন্ট প্রফেসরের এমন রূপটি কারো কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না।
আইজেল আনায়ার পাশেই দাঁড়ানো। সবাই ঘাড় উঁচিয়ে ভাগাভাগি করে দরজার দুপাশে হেলে পড়ে, একজন আরেকজনের উপর দিয়ে এই দৃশ্য দেখছে। ছেলেগুলো অবশ্য বেআক্কেলের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
এরিমধ্যে সবার ফিসফিসানো শুরু হলো। আইজেল আনায়ার কানে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“ড্যাম! ওনাকে এই ক্যাজুয়াল লুকে দেখলে কে বলবে ইনি আমার ক্লাসের সেই কড়া প্রফেসর?”
আইজেলের কথা শেষ হতে না হতেই,আর দু-তিনজনের আলাপ-আলোচনা শোনা গেল,
—”এটা কি আমাদের প্রফেসর ভিকে?”
—”সিরিয়াসলি? এটাই আমাদের প্রফেসর?”
—”ইয়াহ্! হি লুকস সো ফা কিং হট অ্যান্ড রিল্যাক্সড!”
—”হেই শাটআপ, উনি আমাদের প্রফেসর। এসব বলা ঠিক হবে না।”
—”না বলে উপায় আছে, দেখার মতো একটা মাস্টারপিস!”
—”শুধু দেখার মতো না, গিলে খাবার মতো।”
অতঃপর একযোগে সকলের ফিসফিসানো হাসির ছড়াছড়ি। সবক’টা মেয়ের চোয়াল যেন ঝুলে পড়েছে। চোখগুলো বিস্ময় ও তীব্র আকর্ষণে চকচক করছে। কিসের প্রফেসর আর কিসের বয়সে দ্বিগুণ বড় গুরুজন—ঘুরেফিরে ভিকে তাদের দৃষ্টিতে ধরা দিয়েছে কেবল হার্টথ্রব আইকন হিসেবে।
এদিকে আনায়ার অবস্থাও নাজেহাল। তারও ওই বাকিদের মতোই দশা; তবে একটু বেশিই বৈকি। চপল রমণীর হৃদস্পন্দন তখন লয় ছাড়িয়ে গিয়েছে। কেনীথ তার কফির মগটা ঠোঁটের কাছে নিতেই, তার তীক্ষ্ণ চোয়াল আর গ্রীবায় সকালের রোদের ঝিলিক পড়ল। আনায়া অবচেতন মনে নিজের ওষ্ঠাধর দংশন করল। কেনীথের কপালে পড়া সুক্ষ্ম কিছু ভাজের রেখা কিংবা বিরক্তির ছাপ, সবটাই সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
ক্রমশই তার অবাধ্য মন অন্তরালেই আওড়াতে লাগল,
“ভিভিয়ান! আপনি কি জানেন? আপনার এই অগোছালো রূপটুকুই আমায় ধ্বং-স করবার জন্য যথেষ্ট!”
এই পরিবেশে, এরূপ বেশভূষায় মানুষটা যেন আরও বেশি দুর্বোধ্য আর ভয়ানক সুন্দর হয়ে ধরা দিয়েছে। তাঁর অসুস্থ চোখে যে মাদকতা ছিল, তা আনায়ার জন্য সামলানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।
কিন্তু রমণীর এই বেঘোরে ডুবে থাকা ভাবনা কাটল তার আশেপাশে থাকা বাদবাকি মেয়েদের কথাবার্তায়। একেকজন উদ্ভট সব মন্তব্য করছে আর ফিসফিস করে হাসছে। এতক্ষণ নিজের আরাধ্য পুরুষকে দেখার ঘোরে সেসব কানে না তুললেও, এবার তার মেজাজটা হুট করেই চটে গেল। দাঁতে দাঁত পিষে দেখতে শুরু করল কেনীথের আপাদমস্তক। কপালে বেশ কয়েকটা ভাজ ফেলে, মনে মনে সে বিড়বিড় করল,
মহামায়া পর্ব ৩৮
“কি নির্লজ্জ লোক রে বাবা। এতো বড় হয়েছে ঠিকমতো জামাকাপড়ও পড়তে পারেনা। ঠ্যাংটাও বের করে রেখেছে; ঢেকে রাখতে সমস্যা কি? ওসবও কি আমিই শিখিয়ে দেবো?”
আনায়া থেমে গিয়ে নিজের আশপাশটা আঁড়চোখে দেখল। বাকি-মেয়েদের মতো সে নিজেও এতক্ষণ এই দৃশ্য উপভোগ করছিল। অথচ অন্যদের এই উপভোগ্য দৃশ্য তার একটুও সহ্য হলো না। গা-পিত্তি যেন সব জ্বলে উঠল। চাপা স্বরে আবারও বিড়বিড় করল,
“সবগুলো বেহেয়া মেয়ে গিলে গিলে খাচ্ছে, একটারও লজ্জা-শরম নেই, অসভ্যের দল।”
