মহামায়া পর্ব ৪০
তুশকন্যা
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেই সারারাত কেটেছে কেনীথের। মাথার ভেতর এক অবাধ্য যন্ত্রণার ঘূর্ণাবর্ত, আর তার চেয়েও বড় যন্ত্রণা—অনিশ্চয়তা। গতকাল আনায়াকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার পর, ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠেছিল একটি জরুরি মেইলের আগমনে। কেনীথ এক মুহূর্ত দেরি করেনি; সেই বিকেলেই তার গাড়ি ছুটে গিয়েছিল মিউনিখের সবচাইতে বড় হসপিটাল,LMU Klinikum বা লুডউইগ ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটি হসপিটার মিউনিখ।
জায়গটা কেনীথের কাছে নতুন নয়।বিগত একবছর হতে এখানে নিয়ম করে তার প্রায়ই আসা হয়। নিজ ইচ্ছেতে না হলেও, তাকে একপ্রকার জোরপূর্বক এখানে আসতে হয়।
কেনীথ দেরি না করে হসপিটালের ভেতরে প্রবেশ করল। যথাযথ স্থানে পৌঁছাতেই দেখল, সিনিয়র নিউরোসার্জন ডক্টর অ্যাম্বারের কেবিনে আগে থেকেই উপস্থিত নিউরোলজিস্ট রেইনহার্ড রিচার্ড। কেনীথের দীর্ঘদিনের স্নায়বিক সংকটের ইতিহাস তাঁদের নখদর্পণে। এর আগে তার ট্রিটমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন নিউরোলজিস্ট রেইনহার্ড রিচার্ড।
কেবিনের ভেতরে এক থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ডক্টর রিচার্ড চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে কেনীথের দিকে এক স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। তার চোখে পেশাদারিত্বের আড়ালে এক চিলতে দ্বিধা। ডক্টর অ্যাম্বার সরাসরি কেনীথের মস্তিষ্কের লেটেস্ট স্ক্যান রিপোর্টগুলো আলোর বিপরীতে ধরে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।
”বসুন মিস্টার ভিকে,” অ্যাম্বারের কণ্ঠস্বর গম্ভীর,
“আমরা সরাসরি মূল আলোচনায় আসছি।”
কেনীথ বসল। তার মেরুদণ্ড টানটান। সে জানে, এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তার মাথার পেছনের সেই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাটা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যা অত্যন্ত জটিল।
নিউরোলজি হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের সেই অতি-সংবেদনশীল শাখা, যা মানুষের মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড এবং সমগ্র স্নায়ুতন্ত্রের জটিল বিন্যাস নিয়ে কাজ করে। কেনীথের বর্তমান নরকযন্ত্রণা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দেড় যুগেরও আগের অতীতের সেই ভয়াবহ ঘটনারই অবশিষ্টাংশ।
তখন কেনীথ নিতান্তই তরুন; পরিচয় তার ভিভিয়ান এহসান। ফিরে দেখা সে গল্পে, ভিভিয়ানের উগ্র-বেপোরোয়া কিংবা বিকৃত সত্তা নিয়ে ইতিমধ্যে অনেকেই অবগত। আবার হয়তো কেউ কেউ সম্পূর্ণ নিকষিত গল্পটার একাংশও নিয়েও অজ্ঞাত নয়।
তেমনই অন্তিমক্ষণের এক অশুভ মুহূর্তে, ভিভিয়ান নামক সেই বি কৃত সত্তার মাথার ঠিক পেছন দিকে একটি ভারী রড সরূপ বস্তু দিয়ে সজোরে আঘাত করা হয়েছিল। সেই প্রবল আঘাতেই তার মস্তিষ্কের টিস্যু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনও অবস্থা হয়েছিল যে, সেই উগ্র সত্তার বেঁচে থাকা নিয়েই তীব্র সংশয়ের জন্ম হয়।
চিকিৎসকরা তখনও প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাদের ভাষায় তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ৷ আবার বেঁচে ফিরলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারবে কিনা তাও অনিশ্চিত। অতঃপর দীর্ঘ দিনের যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা আর লড়াইয়ের পর সে যমের দুয়ার থেকে ফিরে এলেও, সেই আঘাত তার মস্তিষ্কের ভেতর আজও এক স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন হয়ে অবস্থান করছে।
দীর্ঘ চৌদ্দ-পরেনো বছর ধরে তাকে একটানা কড়া ডোজের ঔষধ খেয়ে নিজের স্নায়ুকে শান্ত রাখতে হয়েছে। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস হলো গত বছরের সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা। ঠিক যে স্থানে পনেরো বছর আগে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, দুর্ভাগ্যবশত সেখানেই পুনরায় আঘাত লাগে। এই দ্বিতীয় দফার আঘাতটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মুখে অগ্নিসংযোগের মতো কাজ করেছে। মেডিক্যাল সায়েন্সের ভাষায়, তার মস্তিষ্কের সেই সংবেদনশীল অংশে এক জটিল সেরিব্রাল এভিএম পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে ধমনী ও শিরার সংযোগস্থলে রক্তের স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হয়ে এক বিষাক্ত জট তৈরি হয়।
দ্বিতীয় আঘাতের ফলে সেই রক্তনালীগুলো এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। যৎসামান্য রক্তচাপ বাড়লেই যেকোনো মুহূর্তে মস্তিষ্কে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা হেমোরেজ হতে পারে। আর এই কারণেই কেনীথের সেই অসহ্য তীব্র মাথাব্যথা, চোখের দৃষ্টিতে অন্ধকার নেমে আসা এবং হঠাৎ করে শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার মতো সংকটগুলো এখন চরমে পৌঁছেছে।
ডক্টর রিচার্ড কেনীথের দিকে একটা ফাইল এগিয়ে দিলেন,
“মিস্টার ভিকে,আপনার কেস-টা নিয়ে আমরা আমাদের পুরো টিম সহ দীর্ঘদিন হতে কাজ করে আসছি। ইউরোপ এবং আমেরিকার সেরা নিউরোলজি ডিপার্টমেন্টগুলোর সাথে আমরা কনসাল্ট করেছি। সবাই কেবল একটাই চূড়ান্ত সমাধানেই পৌঁছেছেন। আপনার এই কন্ডিশন থেকে মুক্তি পেতে হলে সার্জিক্যাল রিসেকশন বা সরাসরি সার্জারি ছাড়া আর কোনো পথ নেই।”
কেনীথ শান্তভাবে বলল,
“প্রসিডিউর নিয়ে কথা বলুন।”
তার এমন নির্লিপ্ত ভাব দেখে ডক্টর রিচার্ড ভারী শ্বাস ফেললেন। বললেন,
”সমস্যা হলো ঝুঁকি। এই সার্জারিতে পেশেন্টর টিকে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ৩০%। বাকি ৭০% ক্ষেত্রে রোগী সার্জারি টেবিলেই মারা যেতে পারেন অথবা চিরস্থায়ী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারেন।”
কেনীথ নিশ্চুপ বসে রয়েছে। তার মস্তিষ্কে এই মূহুর্তে ঠিক কি ভাবনা চলছে তা বলা মুশকিল। মধ্যবয়স্ক ডক্টর রিচার্ড এবার প্রফেসনাল মোড়ক হতে বেরিয়ে কিছুটা ব্যথিত স্বরে বললেন,
”ভিকে, উই আর রানিং আউট অফ টাইম। তোমার কন্ডিশন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখানে মেডিসিন কেবল যন্ত্রণাকে সাময়িকভাবে কমিয়ে রাখতে পারবে, মূল সমস্যা নয়। এবার আমাদের একটা ফাইনাল ডিসিশন নিতেই হবে।”
কেনীথ স্থির দৃষ্টিতে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বরে নূন্যতম আবেগের রেশ মিলল না। কেবল এক প্রখর স্বরে জিজ্ঞাসা করল,
“সো, হোয়াটস দ্য আল্টিমেট ডিল?”
নিউরোসার্জন ডক্টর অ্যাম্বার পাশ থেকে প্রত্যুত্তর করলেন,
“একমাত্র সমাধান হচ্ছে সার্জারি। কিন্তু একমাত্র সমস্যাটাই হলো এর সাকসেস রেট। মিস্টার ভিকে, প্রবলেমটা আসলে আপনার এই নিউরোলজিক্যাল লিশন-এর লোকেশন নিয়ে। আপনার ব্রেইনের এমন এক ক্রিটিক্যাল আর হাইলি সেনসিটিভ জোন-এ এটি পজিশন নিয়েছে, যেখানে সার্জিক্যাল ইন্টারভেনশন করাটা এক্সট্রিমলি রিস্কি।
আমাদের ক্লিনিক্যাল স্ট্যাটিস্টিকস যা বলছে, তা মোটেও আপনার ফেভারে নেই। এই সার্জারিতে সারভাইভাল প্রোবাবিলিটি বা বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা মাত্র থার্টি পার্সেন্ট।”
তিনি সামান্য থামলেন, কেনীথের পাথরের মতো স্থির চেহারায় কোনো পরিবর্তন দেখার চেষ্টা করলেন; তবে ব্যর্থ হলেন। আশ্চর্য হলেন পেশেন্টের এমন নির্লিপ্ত ভাবমূর্তিতে। আদৌও কি তার সামনে বসে থাকা মানুষটা নিজের জীবনের পরোয়া করে? নাকি না! তা তিনি জানেন না। ডক্টর অ্যাম্বার আবারও বলতে লাগলেন,
“বাকি সেভেন্টি পার্সেন্ট ক্ষেত্রে ইন্ট্রা-অপারেটিভ অথবা পোস্ট-অপারেটিভ কমপ্লিকেশনস-এর কারণে পেশেন্টের ডেথ হওয়ার প্রবল রিস্ক থাকে। মেডিকেল সায়েন্সের ভাষায় এটিকে স্রেফ ট্রিটমেন্ট বলা চলে না, এটি অনেকটা ওয়ান সাইডেড গ্যাম্বলিং বা একপাক্ষিক বাজি ধরার মতো। এই লাইফ-অ্যান্ড-ডেথ ক্যালকুলেশনটা মাথায় রেখে আপনাকে ফাইনাল ডিসিশন নিতে হবে মিস্টার ভিকে!”
পুরো ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। ডক্টররা কেনীথের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করছিলেন। অ্যাম্বার আরো একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“এটি কনসেন্ট পেপার। সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে, এই সার্জারির ফলাফল যাই হোক না কেন—এমনকি মৃ’ত্যু হলেও—হাসপাতাল বা ডাক্তার কোনোভাবেই দায়ী থাকবে না। আপনি সময় নিন। এটি আপনার লাইফের ওয়ান অফ দ্য মোস্ট ক্রিটিক্যাল ডিসিশন। দু-একদিন ভেবে তারপর না হয় আমাদের জানাবেন।”
কেনীথ ফাইলটা হাতে নিল। পাতাগুলো উল্টে দেখে নিল একবার। তার শীতল লালচে চোখের মনিতে নেই কোনো অস্থিরতা, নেই জীবনের প্রতি নূন্যতম আকুল আসক্তি। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের স্তব্ধতা! কেনীথ তার ওভারকোট হতে একটি পেন বের করল। কোনোরূপ অত্যাধিক ভাবনাচিন্তা না করেই, সে সিনিয়র দুজন ডক্টরকে একপ্রকার বিমূঢ় করে দিয়ে, কোনো ধরনের হেজিটেশন ছাড়াই খসখস শব্দে পেপার্সে সাইন করে দিল।
ডক্টর রিচার্ড কিছুটা হকচকিয়ে গেলেন।
“ভিকে! তুমি কি বুঝতে পারছো, তুমি কী করলে?”
কেনীথ কলমটা টেবিলে রেখে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“এতো ভাবার কিছু নেই ডক্টর। ঝুলে থাকা অনিশ্চয়তার চেয়ে চূড়ান্ত পরিণতি অনেক ভালো। আমাকে একটা পার্মানেন্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেই হতো; আজ হোক বা কাল।”
ডক্টররা একে অপরের দিকে চাইলেন। এই ব্যক্তির এরূপ স্থিতধী আচরণ তাদের অভিজ্ঞতায় বিরল। কেনীথ উঠে দাঁড়াল, কিন্তু যাওয়ার আগে স্থির দৃষ্টিতে ডক্টর রিচার্ডের দিকে তাকাল।
”আমি জানি, ইমানি এখানে এসেছিল।”
কেনীথের গলায় বরফশীতল গাম্ভীর্য। সে আবারও বলল,
“আপনাদের কাছে রিকোয়েস্ট, এই সার্জারির কোনো ডেটা বা ইনফরমেশন যেন ওর কানে না পৌঁছায়। খবরটা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
রিচার্ড দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা আশ্চর্যের ভঙ্গিতে বললেন,
“বাট শি ইজ ইয়োর ওয়েল-উইশার,ভিকে!”
কেনীথ এবার কঠোর হলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“ইটস মাই লাইফ, ডক্টর। আমার শরীরের সাথে কী ঘটবে আর কী ঘটবে না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার কেবল আমারই আছে। এখানে অন্য কারো অযাচিত হস্তক্ষেপ বা করুণা—কোনোটাই আমি পছন্দ করব না।”
আর কথা বাড়াল না কেনীথ। দীর্ঘ পা ফেলে হসপিটালের করিডোর পেরিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে।
আর বাসায় ফেরার পর থেকেই শুরু হয়েছে সেই দহন। রাতের অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে সে ভেবেছে—জীবন নিয়ে কি আসলেই তার কোনো পরোয়া আছে? অতীতেও তো সে বহুবার মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে। তখনো তো বাঁচার জন্য কোনো বিশেষ আকুতি তার ভেতর জন্মায়নি। তবে আজ কেন এই অস্থিরতা? কিসের এই সূক্ষ্ম টান?
ভাবনারা যখন জট পাকিয়ে যাচ্ছিল, তখনই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল তার। শরীরের তাপমাত্রা যেন শত ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জ্বরের ঘোরে কেনীথ অনুভব করল, সে এক অগ্নিকুণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে। তবুও তার ঠোঁটের কোণে লেগে রইল এক বিদ্রূপাত্মক হাসি। মৃত্যুকে সে সই দিয়ে নিমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছে, এখন আর ভয় কাকে?
গতরাতের ভাবনা ভাবতে ভাবতেই, সকালে কেনীথের তন্দ্রা ভাঙল। জ্বরের দাপট কিছুটা কমলেও শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে এক ধরণের অবসাদ জেঁকে বসে আছে। অগোছালো চুল আর বেশভূষায় সে বিধ্বস্ত অবস্থাতেই নিচে নেমে এল। ড্রয়িং রুমে পা রাখার আগে, কিচেন থেকে এক মগ কড়া ব্ল্যাক কফি বানিয়ে নিল সে। গরম কফির ধোঁয়া নাকে লাগতেই মস্তিস্কের স্নায়ুগুলো একটু সজাগ হলো।
এক হাতে কফির মগ আর অন্য হাতে ফোন স্ক্রল করতে করতে সে সোফার দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই সুইঠি তথা ইমানির একটা টেক্সট ভেসে উঠল স্ক্রিনে। ভ্রু দুটো কুঁচকে একাকার হয়ে গেল তার। মেসেজে লেখা,
”আজ ব্লাডেন হেলে টাম এর মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের কিছু স্টুডেন্ট যাবে। একটু হ্যান্ডেল করে নিস।…আর সরি,আগে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।”
বিরক্তির একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল তার শিরদাঁড়া দিয়ে। মনে মনে আওড়াল,
“হোয়াট দ্য হেল! সুইঠি কবে থেকে এতো কেয়ারলেস হলো!”
কেনীথের মাথায় সত্যিই বিষয়টা বোধগম্য হলো না। কিসের স্টুডেন্ট আসবে আর এসবের মানে কী? তৎক্ষনাৎ সে বিরক্তি নিয়ে ইমানিকে কল করার জন্য আঙুল বাড়াল সে। কিন্তু ঠিক তখনই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল, এখানে সে ব্যতীত আরো বেশ কিছু অস্তিত্ব অবস্থান করছে। হঠাৎ এমনটা মনে হবার কারণ সে নিজেও জানে না। তবে অবচেতন মনেই পাশের কাঁচের স্লাইডিং ডোরের দিকে নজর যেতেই সে স্তম্ভিত হলো।
পার্শ্ববর্তী গ্লাসের ওপারে একঝাঁক অস্পষ্ট অবয়ব উঁকি দিচ্ছে। এক জোড়া নয়,দুই জোড়া নয় বরং কয়েক জোড়া কৌতূহলী এবং উৎসুক চোখ অন্দরের দৃশ্য দেখার জন্য কাঁচের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। কেনীথের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ হতেই বাইরের জটলাটার মধ্যে যেন এক ছোটখাটো ভূমিকম্প হয়ে গেল।
বাইরের দৃশ্যটা ছিল রীতিমতো লঙ্কাকান্ড বাঁধার মতোই। প্রফেসর তাদের দেখে ফেলেছেন—এই আতঙ্ক বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ল সবার মাঝে। কেনীথ মুখ ফেরানোর সাথে সাথেই বাইরের রমণীকুল একযোগে পেছনের দিকে সরতে গেল। হুড়োহুড়ি করে সরতে গিয়ে ভারসাম্য হারালো সব; একজন অন্যজনকে টেনে ধরেই একে অপরের উপর উল্টে হুমড়ি খেয়ে আছড়ে পড়ল। আনায়া কিংবা আইজেল—কেউই এই চরম হট্টগোল থেকে রেহাই পেল না। মুহূর্তেই সবাই মিলে বারান্দার মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম হলো।
ভেতর থেকে কেনীথের সুঠাম পদক্ষেপের শব্দ এগিয়ে আসছে। দরজার দিকে জুতো ঠোকার সেই গম্ভীর শব্দ শুনেই মেয়েগুলো ছটফট করতে করতে একে অপরের হাত ধরে টেনেটুনে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। যে যার মতো জামাকাপড় আর চুল ঠিকঠাক করে কোনোমতে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়ানোর সেকেন্ড কয়েকের মাথায় হুট করে দরজাটা খুলে গেল।
কেনীথ কপালে ভাঁজ ফেলে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে কিছু একটা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু তার শব্দগুলো কন্ঠনালীতেই আটকে গেল ভিড়ের মাঝে আনায়াকে দেখামাত্রই। এই মূহুর্তে তাকে অন্তত সে আশা করেনি। অন্য মেয়েদের মতো সেও মাথা নিচু করে কোনো এক অপরাধীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। বাকি মেয়েগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়; কয়েকজন তো কেনীথের এরূপ রাফ এন্ড রাফ বুনো রূপের সম্মূখে রীতিমতো থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু এই ভয়ের মাঝেই সব’কটার চোরকাটা অবাধ্য দৃষ্টি কেনীথের সেই এলোমেলো, পুরুষালি রূপখানা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে ভুলছে না।
মেয়েদের এই বেখাপ্পা পরিস্থিতিতে পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল ছিমছাম পোশাকের তিনজন ছেলেও হতভম্ব। তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে একটু ইতস্তত করে মাথা নুইয়ে কেনীথকে কুর্নিশ জানাল। নিস্তব্ধতা ভেঙে স্মিথ গলায় তারা জার্মান ভাষায় অভিবাদন জানাল,
”গুটেন মর্গেন, প্রোফেসর!” (শুভ সকাল, প্রফেসর!)
ছেলেদের কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই মেয়েগুলোর হুঁশ ফিরল। সংবিৎ ফিরে পেয়ে তারা যেন তড়িৎস্পৃষ্ট হলো। মুহূর্তের মধ্যে সবাই একসাথে মাথা ঝুঁকাতে শুরু করল।
“গুড মর্নিং, গুড মর্নিং প্রফ… ”
তাদের ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছিল, একটু সুযোগ পেলে সবক’ট নুইয়ে নুইয়ে কেনীথের পায়ে লুটিয়ে পড়বে।
কেনীথ সবার এরূপ ভাবমূর্তি দেখে চোখজোড়া কিঞ্চিৎ সরু করল। অতঃপর ভারী শ্বাস ফেলে গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,
“এটা পাবলিক পার্ক নয়, গেট ইনসাইড,কুইক!”
বিশাল ড্রয়িং রুমটা এখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের একঝাঁক শিক্ষার্থী সোফায় সারিবদ্ধভাবে বসে আছে। যে প্রজেক্টের কাজে তাদের আসা, তা নিয়েই ব্যস্ত সবাই। কেউ ল্যাপটপে ডেটা এন্ট্রি করছে, কেউবা ড্রয়িং শিটে নিবিষ্ট। কেনীথ মাঝেমধ্যে নিচু কিন্তু গম্ভীর স্বরে তাদের গাইড দিচ্ছে, আর প্রতিটি নির্দেশের সাথে সাথে স্টুডেন্টরা যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে কাজ করে যাচ্ছে।
তবে কাজের ফাঁকে ফাঁকে সবারই চোখ অবাধ্য হয়ে উঠছে। তারা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখছে বাড়ির ইন্টেরিয়র। পুরো বাড়ির থিমটাই যেন এক রহস্যময় আভিজাত্যে মোড়া। দেয়ালের রঙ থেকে শুরু করে আসবাব—সবই গাঢ় লাল আর কালোর এক মায়াবী সংমিশ্রণ। দেয়ালে ঝোলানো বিশাল বিশাল সব অদ্ভুতুড়ে পেইন্টিং, যা দেখলে মনে হয় কোনো দক্ষ শিল্পী নিজের রক্ত আর আবেগ মিশিয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই বিমূর্ত শিল্পকর্মগুলো তাদের মনে এক ধরণের অজানা শিহরণ জাগিয়ে তুলছে।
কিন্তু আনায়ার পৃথিবীটা যেন অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তার দৃষ্টি চারপাশের দামি শৌখিনতায় নয়, বরং স্থির হয়ে আছে কেবল একজনের ওপর। কেনীথ এখন অনেকখানি পরিপাটি রূপে ধরা দিয়েছে। গায়ে কালো রঙের হুডি; ট্রাউজারটাও সঠিক ঢঙে পরিধান করা। ঝাঁকড়া চুলগুলো হাতের ছোঁয়ায় কিছুটা বশ করার চেষ্টা করলেও সেগুলো এখনো অবিন্যাস্তভাবে কপালে এসে লুটিয়ে পড়ছে।
তবে আনায়ার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে কেনীথের কালো রঙের চিকন ফ্রেমের চশমাখানা। জ্বরাক্রান্ত লালচে চোখ দুটো সেই কাঁচের আড়ালে ঢাকা পড়লেও তাদের তীব্রতা কমেনি। চশমার আড়ালে কেনীথের এই নতুন রূপটা আনায়াকে এক অজানা ঘোরে ফেলে দিচ্ছে। হাতে কলম নিয়ে সে মাথা নুইয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু খাতার পাতায় এক ফোঁটা কালির দাগও পড়েনি। তার সমস্ত মনোযোগ কেবল কেনীথের প্রতিটি সূক্ষ্ম নড়াচড়ার ওপর।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে এক আগন্তুকের আগমন ঘটল। শ্বেতশুভ্র গাউনে সোনালী চুলের এক বিদেশি রমণী সাবলীল ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করল। ড্রয়িং রুমে এত মানুষের জটলা দেখে মেয়েটি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার চেহারায় খানিকটা বিভ্রান্তি আর বিস্ময়। কেনীথের দৃষ্টি তখন একটি রেফারেন্স বুকের পাতায় নিবিষ্ট; কিন্তু বাকি সবার নজর মুহূর্তেই সেই নতুন রমণীর ওপর গিয়ে স্থির হলো।
আনায়ার মনের অন্তরালে অকারণেই এক অস্বস্তির মেঘ জমতে শুরু করেছে। এই জনমানবহীন নির্জন বাড়িতে এই মেয়েটি এত সহজে কীভাবে প্রবেশ করল? তার চলাফেরা দেখে তো মনে হচ্ছে সে এ বাড়ির প্রতিটি কোণ চেনে; এমনকি বাড়ির ডিজিটাল লকের কোডটাও সম্ভবত তার নখদর্পণে। আনায়া মনে মনে এক জটিল হিসেব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে উঠল, ঠিক তখনই সেই মিষ্টি চেহারার মেয়েটি ধীর পায়ে কেনীথের দিকে এগিয়ে এল। আনায়া মাথা নিচু করে থাকলেও তার কান দুটো সজাগ—একটা শব্দও যেন মিস না হয়।
মেয়েটি কাছে এসে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে কেনীথ বই থেকে নজর না তুলেই অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে ডাকল,
”ন্যান্সি!”
জার্মান ভাষায় মেয়েটি বিনয়ের সাথে উত্তর দিল,
“জ্বী মাস্টার।”
রমণীটি উৎসুক চোখে কেনীথের দিকে তাকিয়ে রইল পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায়। কেনীথ এবার বই থেকে চোখ সরিয়ে একবার তার দিকে তাকাল এবং খুব সংক্ষিপ্তে কিছু একটা ইশারা করল। কোনো দ্বিতীয় বাক্য ব্যয় না করে ন্যান্সি ক্ষিপ্র গতিতে কিচেনের দিকে চলে গেল। কেনীথের সাথে তার এই মৌন বোঝাপড়া দেখে আনায়ার বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই মোচড় দিয়ে উঠল।কোথাও জ্বলছে কিনা বুঝতে পারছে না। আশ্চর্য! কি এক রোগ ধরেছে, লোকটার আশেপাশে অন্যকোনো মেয়ে মানুষ দেখলেই অযাচিত চিন্তা এসে মাথায় ভর করে; বুকভরে জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে যায়।
আনায়া মনে মনে নামটা আবারও দু’বার আওড়াল—”ন্যান্সি।” পড়াশোনা তো বহুদূরের কথা! এই ‘মাস্টার’ সম্বোধন আর ন্যান্সির অবাধ যাতায়াত—সব মিলিয়ে আনায়ার মাথায় তখন ঝড়ের বেগে হাজারটা চিন্তা খেলছে। কে এই ন্যান্সি? আর কেনীথের সাথে তার সম্পর্কের গভীরতাটাই বা ঠিক কতখানি? এতো বড় বাড়ি,অথচ তেমন কেউই নেই। ন্যান্সি কি তবে এই বাড়িতেই থাকে?…সকল ভাবনা শেষে অস্থিরতা চেপে রাখা দায় হয়ে পড়ছে তার জন্য।
কিছুক্ষণ বাদেই ড্রয়িংরুমে ন্যান্সির পুনঃপ্রবেশ ঘটল। তার হাতে থাকা বড় কালো ট্রে-তে সাজানো ধোঁয়া ওঠা হট চকলেটের মগ, রং-বেরঙের ম্যাকারন কুকিজ আর মাখনের ঘ্রাণে ম ম করা বেশ কয়েকটা ক্রোসেন্ট। ন্যান্সি অত্যন্ত দক্ষ হাতে নিঃশব্দে সবার সামনে খাবারগুলো পরিবেশন করতে লাগল। কিন্তু ট্রে-টি টি-টেবিলে ছোঁয়ানো মাত্রই আনায়া হুট করে একটি হট চকলেটের মগ তুলে নিল। এবং তাতে লম্বা এক চুমুক দিয়েই সে বিরস মুখে বলে উঠল,
”এসবের কী দরকার ছিল? এসব তো না আনলেও চলত!”
বাকি সবাই কেবল হাত বাড়িয়ে নিজেদের খাবারগুলো টেনে নিচ্ছিল। নিস্তব্ধ ঘরে আনায়ার এই অকস্মাৎ মন্তব্য যেন কামানের গোলার মতো ফাটল। মুহূর্তেই সবার হাত থেমে গেল এবং একযোগে সবার উৎসুক দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো আনায়ার ওপর। এমনকি ন্যান্সি নিজেও অবাক হয়ে চোখ পিটপিট করে আনায়াকে দুবার দেখল। আনায়া শুরুতে বুঝতে পারছিল না হঠাৎ সবার হলোটা কী! সে কি খুব অদ্ভুত কিছু বলে ফেলেছে?
ঠিক তখনই সম্মূখের দেয়ালের এক বিশাল আয়নায় নিজের প্রতিফলনের দিকে নজর পড়ল তার। আয়নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, আনায়া ইতিমধ্যে মগের অর্ধেকটা শেষ করে ফেলেছে এবং তার ঠোঁটের ওপরে হট চকলেটের একটি গাঢ় বাদামী প্রলেপ লেগে আছে। এক হাতে খাবার খাওয়া আর অন্য মুখে তা না খাওয়ার পরামর্শ—নিজের এমন বেয়াক্কেলে কাণ্ড দেখে আনায়া লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইল।
আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখল কেনীথ তার দিকে একজোড়া তীক্ষ্ণ-বরফশীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বসে আছে। সে দৃষ্টির তীব্রতায় আনায়া রীতিমতো বিষম খেল। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ন্যান্সির উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে একটা ধন্যবাদ ছুড়ে দিল সে। ন্যান্সি কোনো কথা বলল না, শুধু ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে আনায়ার দিকে একটি টিস্যু এগিয়ে দিল এবং বাকিদের খাবার পরিবেশন করতে লাগল। আনায়াও দ্রুত মগটা টেবিলে রেখে বাচ্চাদের মতো ছটফটে ভঙ্গিতে মুখটা মুছে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করল।
পুরো ঘরজুড়ে এখন এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। সবাই প্রচণ্ড ধীরস্থিরভাবে খাওয়াদাওয়ার আড়ালে কাজ করে যাচ্ছে। আনায়া আবার হট চকলেটের মগে ঠোঁট ডুবিয়ে আড়চোখে সবাইকে দেখছে। তার মনে হচ্ছে, সে কোনো ড্রয়িংরুমে নয়, বরং মরা মানুষের জানাজায় এসে বসেছে। কারো মুখে কোনো সাড়াশব্দ নেই, সবাই যেন এক একটি জীবন্ত মূর্তি।
ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে একপাশে এক পুরুষালি কণ্ঠের ফিসফিসানি শোনা গেল। আনায়ার একপাশে আইজেল, আর অন্যপাশে সোনালী চুল আর গোল চশমা পরা জেইন এবং তার বাকি দুই বন্ধু বসেছে। বলতে গেলে আনায়া এখন ছেলে আর মেয়েদের সংযোগস্থলে বসে আছে। জেইন পড়া নিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতেই আনায়া মগের শেষ চুমুকটা দিয়ে ফিসফিস করে উত্তর দিল
“বিশ্বাস কর জেইন, আমি তো এসবের কিছুই বুঝছি না। মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না আমার!”
জেইন অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল এবং নিচু স্বরে তাকে সাহায্য করতে শুরু করল। আনায়া তখন নিজের সব বিভ্রান্তি আর অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে জেইনের কথায় মন দিল। জেইন তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল কীভাবে ড্রয়িংয়ের জটিল অংশগুলো মেলাতে হয়, আর আনায়াও বাধ্য মেয়ের মতো তার কথা শুনছিল। এর মাঝেই অবচেতন মনে আনায়ার ঠোঁটের কোণে আবারও সামান্য হট চকলেট ছড়িয়ে পড়ল। জেইন বিষয়টি খেয়াল করে নিচু স্বরে বলল,
“আনায়া, তোমার ঠোঁটের কোণে ওটা লেগে আছে, মুছে নাও।”
আনায়া হাত দিয়ে কয়েকবার চেষ্টা করেও ঠিক জায়গাটা ধরতে পারল না।
“হয়েছে কি?” সে বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল। জেইন দেখল কাজ হচ্ছে না, তাই সে নিজেই একটা টিস্যু নিয়ে খুব স্বাভাবিক আর বন্ধুসুলভ ভঙ্গিতে আনায়ার ঠোঁটের ঐ কোণটা মুছে দিল। আনায়ার কাছে বিষয়টি খুব সাধারণ মনে হলো, তাই সে আবারও জেইনের সাথে আলোচনায় মত্ত হয়ে পড়ল।
অথচ ঘরের অন্যপ্রান্তে পরিস্থিতি তখন অগ্নগর্ভ। কেনীথের হাতের কলম আর দৃষ্টি—দুটোই স্থির হয়ে গিয়েছে। সে তাদের মুখোমুখি সোফায় বসে; আনায়া আর জেইনের এই ঘনিষ্ঠ দৃশ্যটুকু সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছিল। কেনীথের সুঠাম তীক্ষ্ণ চোয়াল অচিরেই শক্ত হয়ে উঠল। চশমার আড়ালে তার চোখের দৃষ্টি হয়ে উঠল প্রলয়ংকরী। সে নিজেকে পুরোপুরি সংযত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও শেষমেশ ব্যর্থ হলো। এক অদ্ভুত ঈর্ষা আর আক্রোশে তার ভেতরটা জ্বলে উঠল। অবশেষে সে নিজেকে পুরোপুরি সংবরন করতে না পেরে, হাতের ভারি রেফারেন্স বুকটা সশব্দে বন্ধ করে টি-টেবিলের ওপর সজোরে রাখল।
হঠাৎ সেই আওয়াজে সবার ধ্যান ভেঙে গেল। সবাই কিছুটা বিস্ময়ে কেনীথের দিকে তাকাল, কিন্তু আনায়া আর জেইন তখনও নিজেদের তর্কে মত্ত। কেনীথ দাঁতে দাঁত পিষে নিজেকে শান্ত করার শেষ চেষ্টাটুকু করে নিয়ে,হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
”আজকের মতো যথেষ্ট। আমায় একটা আরজেন্ট কাজে বাইরে যেতে হবে।”
এই সংক্ষিপ্ত এবং চূড়ান্ত কথাটি বলেই সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার এই আকস্মিক প্রস্থানে ঘরের সবাই কিছুটা হতবাক। হুট করে কি হয়ে গেল? সবটাই স্বাভাবিক নাকি ভিন্নকোনো কারণ আছে?
এই পর্যায়ে এসে আনায়ার নজরও কেনীথের দিকে পড়ল।অথচ ততক্ষণে কেনীথ দৃঢ় বেগে সিড়ি বেয়ে ভেতরের দিকে চলে যাচ্ছে। সে নিজেও বুঝতে পারল না, কি থেকে কি হয়ে গেল। অল্প সময়ের মাঝেই কেনীথের এই হঠাৎ চলে যাওয়া কারো জন্য হতাশার হলেও, আনায়ার মাথায় তখন নতুন এক চিন্তার পোকা নড়চড় করে উঠল। বসে বসে কোন গোলমাল পাকাতে লাগল,তা তো কেবল সেই জানে।
ব্লাডেন হেলের ফাঁকা রাস্তার কাছে সকলে দাঁড়িয়ে আছে। যে যার মতো বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে পা বাড়াচ্ছে। তবে আনায়া, আইজেল আর জেইন এখনো রয়ে গেছে। কারণ সবাই যেতে না যেতেই আনায়া একটা অদ্ভুত কাজ করে বসেছে। জেইন আর আইজেল কথা বলছিল। এরিমধ্যে গেইটের পাশে লাগানো চেরি গাছগুলোতে ঝুলতে থাকা বেশ কয়েকটা চেরি ছিঁড়তে শুরু করে আনায়া। কয়েকটা চেরি জেইন আর আইজেলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, ওখানেই নির্বিকারে বাদবাকিগুলো খেতে শুরু করেছে।
তার কাজকর্ম দেখে আইজেল আর জেইন দুজনেই বেশ অবাক। আইজেল তার উদ্দেশ্যে বলল,
“আনায়া পাগল হয়ে গেছো? এসব কি করছো? এখনই কেউ দেখে ফেললে কি ভাববে?”
আনায়া তার কথায় বেশি একটা পাত্তা না দিয়ে বলল,
“গাছের নিচের দিকটায় চেয়ে দেখো। সব পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। ওনারা নিজেরাও খায় না যখন, আমরা খাচ্ছি তো সমস্যা কোথায়?”
আইজেল ভারী শ্বাস ফেলল তার কথায়৷ তবে আনায়ার এমন উদাসীন ভাবভঙ্গি দেখে সে কিছুটা অবাক হলো। কোনো ভয়-ডর,সংকোচ কিছুই নেই যেন তার৷ এটা আইজেলকে সত্যিই বেশ অবাক করল। আনায়া তো এমনটা নয়। ইদানীং তার আচরনের এরূপ পরিবর্তনের কারণ কি?
এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে, ওদিকে আনায়া নিজের মতো একটার পর একটা চেরি ছিঁড়ছে, নিজেও খাচ্ছে বাকিদেরও সেধে সেধে দিচ্ছে। ফলে আইজেল কপালে কিছুটা ভাজ ফেলে বলল,
“আনায়া, অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে৷ আমরা এখানো এখানে দাড়িয়ে কি করছি? চলো বাড়ি ফেরা যাক।”
এই পর্যায়ে আনায়া থমকে গেল। কি যেন ভেবে আইজেল আর জেইনকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিল সে।ইতস্তত করে বলল,
“তোমরা দুজন চলে যাও৷ আমার একটু কাজ আছে।”
আইজেল সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাল,
“তোমার আবার এখানে কি কাজ?”
এতোক্ষণ সম্পূর্ণ নির্বিকার রইলেও, এবার আনায়া ভেবেচিন্তে বেশ খানিকটা ইতস্তত করে বলতে লাগল,
“আ…আছে একটা কাজ আরকি৷ তোমরা যেতে পারো সমস্যা নেই৷ আমি একাই ফিরতে পারব। কোনো সমস্যা হলে তুমি তো আছোই।”
আকস্মিকতায় আনায়া যথাযথ কোনো কারণ খুঁজে দিতে পারল না। যথারীতি আইজেলেরও সন্দেহ মিটলো না৷ তবুও জেইন ফিরে যাচ্ছিল বিধায়,সেও তার সাথে চলে যাবার সিন্ধান্ত নিল। এবং আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“তবে তুমি কাজ শেষ করে এসো। কোনো সমস্যা হলে,আমায় কল কোরো।”
আনায়াও তার কথায় মাথা নেড়ে সাই দিল। এদিকে সবাই চলে যেতেই ছটফটে রমণী উসখুস করতে করতে চারপাশে পায়চারি করতে লাগল। আশেপাশে কারো কোনো অস্তিত্ব মিলছে না৷ জায়গাটা মিউনিখের মূল শহর হতে বেশ খানিকটা দূরের একটি ভিআইপি জোনে অবস্থিত৷ ফলে দূরদূরান্তরে পাহাড় ঘেসে কিছু বিস্ময়কর দালান ও মাঝেমধ্যে ফাকা রাস্তায় দু-চারটে নামী-দামী গাড়ি ব্যতীত আর কোনো মানব অস্তিত্বের চিহ্ন মিলছে না।
এদিকে একের পর এক চেরি মুখে পুরে দিতে দিতে,আনায়ার পেটটাও বেশ ভরে গিয়েছে। সকাল থেকে খাওয়া দাওয়া তো আর কম হয়নি। খেতে খেতে কতগুলো চেরি খেয়ে ফেলেছে নিজেও হয়তো জানেনা। অত্যধিক রসালো ও টকটকে থাকায় তার ঠোঁটের চারপাশেও খানিকটা করে লাল রঙের রসালো আস্তরণ মেখে গিয়েছে। কিন্তু সে যার জন্য এতক্ষণ হতে অপেক্ষা করছে উনি কোথায়? কেনীথ তো বলল সে নাকি বের হবে। তাহলে এই রাস্তা দিয়েই তো বাড়ি থেকে বের হবে। তবে এখনো আসছে না কেনো?
আনায়ার এই দীর্ঘতর অপেক্ষার মাঝেই সে নিজেকে কিছু বিষয়ে তটস্থ করতে লাগল। বিড়বিড় করে একের পর এক ভাবনা আওড়াল,
“শোন আনায়া, ঘাবড়ালে চলবে না৷ নয়তো সব ভেস্তে যাবে। কোনো প্রফেসর, রকস্টার কিংবা সেলিব্রেটি আইকন নয়, উনি কে? তোর স্বামী! আবারও মাথায় ঢুকিয়ে নে, উনি কে? তোর স্বামী। তোর বিয়ে করা স্বামী। ছোট বেলায় বিয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে, বিয়ে তো হয়েছে৷ ওতেই হবে৷ সব সমস্যা কেটে গেলে, প্রয়োজনে আবারও বিয়ে করে নিবি। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না, উনি এখনো তোর স্বামী। ঠিক আছে? আর স্বামী ছাড়াও উনি তোর ভাই হয়, না মানে ওমন ভাই না, কাজিন আরকি। মানে পরিচিতই। ধরে নে একদম ঘরের মানুষ,মানে নিজের মানুষ। তাই একটুও ঘাবড়ে গেলে চলবে না। যা ভেবে রেখেছিস ওটাই টুপ করে বলে ফেলবি। আজকে বলতে না পারলে, আর কোনোদিনও পারবি না৷ মাথায় থাকে যেন, নয়তো তোর মাথা ফা টিয়ে দেবো আমি।”
নিজেই নিজেকে একের পর এক এসব কথা আওড়াতে আড়াতেই, আনায়া আবার হাতে থাকা শেষ চেরিটাও মুখে পুরে দিয়ে চিবোতেও লাগল। এরিমধ্যে হঠাৎ গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে আনায়ার ধ্যান ভাঙ্গল। বাড়ির ভেতর হতে চকচকে কালো রঙের একখান মার্সিডিজ বেরিয়ে যাচ্ছে। আনায়া বিস্ময়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলল। যার জন্য এতক্ষণ হতে অপেক্ষা করছে, সে চলে যাচ্ছে?
আনায়া কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। কোনোমতে দুহাত খানা ঝেড়ে তড়িঘড়ি করে দ্রুততর ছুটে গিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। দুহাত ছড়িয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“আরে, আরে, আগেই কোথায় যাচ্ছে, থামুন! থামুন!”
গাড়ির স্পিড বেশি না থাকায় কেনীথ শুরুতেই জোরে ব্রেক কষল। আনায়াকে সম্মূখে দেখে তার কপাল খানিকটা কুঁচকে গেল। আনায়া এখনো যায়নি? আশেপাশে তাকিয়ে বুঝল, বাকি সবাই হয়তো এতক্ষণে চলে গিয়েছে। তবে এই মেয়ে এখনো এখানে কি করছে?
কেনীথ নিজের সহজাত গম্ভীর্যের সাথে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। পরনে হাইনিক কালো সোয়েটার তার সাথে কালো ওভারকোট। দেখেই মনে হচ্ছে সত্যিই কোনো কাজের জন্যই বেরিয়েছে। তবে আনায়া তার এরূপ গম্ভীর্যে ঘেরা অবয়ব দেখে আবারও সব তালগোল পাকিয়ে ফেলল। কেনীথের উৎসুক চাহুনিতে মনে হচ্ছে সে হয়তো জানতে চাইছে, আনায়া কি বলতে চায়। অথচ আনায়ার মুখ থেকে এখন আর কোনো কথাই বের হচ্ছে না।
এদিকে কেনীথ একমনে শীতল দৃষ্টিতে চেয়ে রমণীর আপাদমস্তক পরখ করছে।কোমড় ছোঁয়া সিল্কি চুলগুলো কিছুটা এলেমেলো হয়ে আছে। চোখে-মুখে তীব্র অস্থিরতা ও অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। যার দরূন ফর্সা দুগালে ফুটে উঠেছে ছোট-বড় সামান্য দু’খান টোলের রেখা। গোলাপের পাপড়ির ন্যায় নমনীয় ঠোঁটের আশেপাশে লেগে আছে রসালো চেরির আস্তরণ। কেনীথের দৃষ্টি ঠিক সেখানেই স্থির হলো। থমকে গেল কেনীথ। অবচেতন মনে অযাচিত ভাবনা আসার পূর্বেই নিজেকে সংবরণ করল সে। কিঞ্চিৎ শুষ্ক ঢোক গিলে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
ওদিকে আনায়া এতো প্রস্তুতির পরও তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। এখন সে ভাবছে, কেনীথকে কি বলে ডাকবে। যথারীতি মন আর বাস্তবিক দিক গুলিয়ে সে বিড়বিড় করতে থাকে,
“আ…বলছিলাম যে ভাই…না,ভিভিয়ান নাকি ভিভান…না, না…নাম ধরে ডাকা যাবে না, তবে কি? কোনটা বলব?”
আনায়ার মুখ হতে কোনো শব্দ নির্গত হচ্ছে না, কেবল সে বিড়বিড় করে চলেছে। যার ফলে কেনীথের ভ্রুজোড়া আরো খানিকটা কুঁচকে গেল। আনায়া তার গম্ভীর্যে মোড়া মুখখানা দেখে এবার আরো বেশি হকচকিয়ে গেল। উপায়ান্তর না শেষমেশ মুখ ফস্কে বলেই ফেলল,
—”আপনার চুলগুলো অনেক সুন্দর।”
মুখ ফস্কে কি বলে ফেলল কে জানে। নিজেকে শুধরে নেওয়ার আগেই, কেনীথ ভ্রু কুঁচকে আওড়াল,
—”হাহ?”
—”আই লাইক ইউ।”
আনায়া স্তব্ধ, স্তম্ভিত, বিমূঢ়। তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে; মাথার উপর যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। এরূপ কথা বলা মাত্রই তার মনে হচ্ছে, তার পুরো মাথাটা রীতিমতো চক্কর দিচ্ছে। চোখের সামনে হতে আশেপাশের সবকিছু ক্রমশই ঝাপসা অন্ধকার হয়ে আসছে।
আনায়া আবারও নিজেকে দ্রুততর সামলে নিল। নিজেকে স্বাভাবিক করতেই দেখল কেনীথ সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আনায়া বুঝতে পারল না, আদৌও সে তার কথাটা বাস্তবে বলেছে নাকি কল্পনায়? কেনীথ কি তার কথা আদৌও শুনতে পেয়েছে?
আনায়া এবার শেষ সাহসটুকু সঞ্চয় করে আরও দু-পা এগিয়ে গেল। শরীরের কাঁপন উপেক্ষা করে সে আবারও বেশ কষ্ট করে বলল,
“আই থিংক, আই লাইক ইউ। ডু ইউ লাইক মি?”
ভয়ে ভয়ে বলেই ফেলল আনায়া। ছটফটে রমণীর মনপ্রাণে কেবল একটিই চাওয়া; কেনীথ যেন এই মুহূর্তে কোনোভাবেই তাকে প্রত্যাখ্যান না করে। নয়তো সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাবে; তার পুরো পৃথিবীটাই যেন তোলপাড় হয়ে যাবে।বর্তমানে তার একমাত্র ভয়ের কারণই হলো নিজের একমাত্র আরাধ্য পুরুষ হতে প্রত্যাখ্যান।
এইসকল ভাবনা ভাবতে ভাবতেই, আনায়ার অন্তরাল কাঁপতে শুরু করেছে। না জানি কেনীথ কী উত্তর দিয়ে দেয়।
অথচ তার সেই আশাকেই অপূর্ণ রেখে, কেনীথ অত্যন্ত নির্লিপ্ত স্বরে বলে উঠল,
“নো!”
শব্দটা ছোট, কিন্তু এর আঘাত যেন কোনো ধারালো অস্ত্রের চেয়েও তীব্র। উত্তরে ‘না’ শুনে আনায়ার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। অচিরেই বুকের ভেতরটা শূন্য হয়ে এল, গলার কাছে এক দলা তপ্ত নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে—যাকে চিৎকার করে বের করে দেওয়ার সাধ্য তার নেই।
গলায় বিঁধে থাকা অদৃশ্য এক কাঁটার যন্ত্রণায় সে কুঁকড়ে যেতে চাইল, তবুও নিজেকে শক্ত রাখার শেষ চেষ্টাটুকু করল সে।চোখের কোণে জমা হওয়া আর্দ্রতাটুকু আড়াল করার বৃথা চেষ্টায়, আনায়া পুনরায় আর্তির স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
”তবে আপনার করা সেই পাগলামিগুলোর সবই কি মিথ্যে ছিল?”
কেনীথ বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। লালচে চোখদুটো যেন আরও বেশি শীতল ও গভীর হয়ে উঠল। সে আবারও আগের মতোই নিস্পৃহ কণ্ঠে জবাব দিল,
“হয়তো।”
আনায়ার ইচ্ছে করল চিৎকার করে এখানেই কেঁদে ফেলতে; পুরো শহরের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খানখান করে দিতে। তার চোখজোড়া অভিমানে ভিজে উঠেছে, অথচ ঠোঁটের কোণে সে ঝুলিয়ে রাখল এক করুণ, বিস্তৃত হাসির রেখা। এই হাসিটা আনন্দের নয়, বরং নিজের পরাজয়ের। আনায়া কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে, ব্যথিত স্বরে শেষবারের মতো শুধাল,
”কেন করেছিলেন ওসব?”
”জানি না।”
কেনীথের অভিব্যক্তি এই একটি শব্দেই সমাপ্ত হলো। যেন সে দাঁড়িয়ে উত্তর দিচ্ছে না, বরং এক উটকো ঝামেলা থেকে মুক্তি চাইছে। আনায়ার আর কিচ্ছু বলার মতো অবশিষ্ট নেই। তার সাজানো পৃথিবীটা মুহূর্তেই কাঁচের টুকরোর মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। এটা হওয়ার কথা ছিল না। অন্তত কেনীথ তাকে এভাবে অবজ্ঞার সাথে প্রত্যাখান করবে, এমনটা সে কখনোই আশা করেনি। আচ্ছা, সে কি একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করে ফেলল?যার ফলাফল স্বরূপ তাকে এভাবে প্রত্যাখান হতে হলো?আনায়া জানে না, আর এই মুহূর্তে সেই উত্তর জানতেও চায় না।
ওদিকে কেনীথ আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। আনায়ার পাংশুটে মুখখানা থেকে অবলীলায় দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল। সময়ের খুব তাড়া আছে—এমন একটি ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তুলে সে অতিরিক্ত একটি কথা না বাড়িয়েই, ধীরস্থিরে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসল।
মুহূর্তেই ঝরে পড়া এক নক্ষত্রস্বরূপ সত্তার সামনে, প্রচণ্ড অবজ্ঞার সাথে কেনীথ তার গাড়ি নিয়ে প্রস্থান করল। ইঞ্জিনের মৃদু গর্জন আর ধুলোর আস্তরণ ফেলে রেখে মার্সিডিজটা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। আর সবটাই জ্যান্ত মূর্তির মতো চেয়ে চেয়ে দেখে গেল আনায়া। মাথার মধ্যে হাজারো ভাবনা বিষাক্ত সাপের ন্যায় ফণা তুললেও, এখন কেবল তার কান্নাই পাচ্ছে; চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে!
আনায়া জ্যান্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে, ওদিকে আকাশে মেঘের ঘনঘটা। বেশ খানিকটা সময় একই রূপে স্থির দাঁড়িয়ে রইল ব্যথিত রমণী। ঠিক পরক্ষণেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। সেই বৃষ্টি যা তার সুখ হতে দুঃখ সবসময়ের সঙ্গী হয়েছে। কিন্তু আজ এই হঠাৎ বৃষ্টিতে আনায়ার কেবল এটাই মনে হলো যে—এই বৃষ্টি তাকে আজ বিদ্রুপ করছে, তাচ্ছিল্য করছে; এই বৃষ্টি আজ তাকে উপহাস করতেই নেমেছে।
বৃষ্টির ছাঁটে আনায়া ক্রমশই ভিজে চলেছে। অথচ তার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।এই রুদ্ধশ্বাস মূহুর্তে মস্তিষ্কে কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে বছর খানেক পূর্বে ভিভিয়ান নামক পাগলাটে মানুষটার বলা সেই একটি কথাই—
“তুই কাঁদবি, তারা! তুই আমার জন্যই কাঁদবি; আমাকে নিজের করে পাবার জন্যই কাঁদবি।”
আনায়ার চোখ বেয়ে অচিরেই জল গড়িয়ে পড়ল। বৃষ্টির জল আর চোখের জল মিলে একাকার হলো। আর নিজেকে ধরে রাখা সম্ভব নয়। কষ্টের দানা বাঁধা দমবন্ধ করা মেঘেরা বৃষ্টি হয়ে ঝড়তে শুরু করেছে। আনায়া নিজের চোখ মুছতে মুছতেই ব্যথিত সুরে বিড়বিড় করে আওড়াল,
মহামায়া পর্ব ৩৯
“এতোটা পাষাণ না হলেও পারতেন।এসব ইচ্ছে করেই করছেন, তাই না? আমাকে আরো কষ্ট দিবেন। আমাকে কাঁদাতে কাঁদাতে একদিন জানেই মে রে ফেলবেন; এটাই তো আপনার পরিকল্পনা,তাই তো? ঠিক আছে, কাঁদব আমি। দেখি আপনি আপনার তারা’কে ঠিক কতটা কাঁদাতে পারেন। তবে এটাও মনে রাইখেন, এই তারা ম’রে না যাওয়া অব্দি আপনার পিছু ছাড়বে না। যেদিন আমি ম’রে যাবো,সেদিন আমার থেকে আপনি রেহাই পাবেন। ছাড়লাম না আপনার পিছু, দেখি আপনি কি কি করতে পারেন!”

আপু তাড়াতাড়ি পর্ব গুলো দেন প্লিজ