Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫১

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫১

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫১
সাঞ্জেনা শাজ

মেয়েকে আড়াল করে মেহরাদের মুখোমুখি চওড়া দেহ টানটান করে দাঁড়িয়েছে শায়ান তালুকদার। চোখে মুখে ক্ষুব্দতা। মেয়েকে অনেক্ক্ষণ হবে কেন্দ্র থেকে বের হতে না দেখে বাধ্য হয়ে ভেতেরে এসেছেন তিনি। এসেই দেখে ক্লাসরুমের বাহিরে আদনান আর দ্বীপ দাঁড়িয়ে। যা বুঝার বুঝে ফেলেছিলো উনি। এতো এতো ট্রিকস ও ছেলেটার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার কাছে হাড় মেনেছে ভেবে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেছে। বন্ধ দরজা খুলে ভেতরে এসে দেখে মেয়ে তার মেহরাদের সামনে আতংকিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে। নিজের কাছে এনে মেয়ের ঢাল হয়ে ভাতিজার সামিনে দাঁড়িয়েছে শায়ান তালুকদার। রুক্ষ, রগরগে কন্ঠে জবাব চেয়েছে,

“হ্যাভ ইয়্যু লস্ট ইয়্যুর মাইন্ড? কি করতে যাচ্ছিলে তুমি? ওর গায়ে হাত তুলতে?”
মেহরাদ ভস্ম করে দেওয়া দৃষ্টিতে দেখছে চাচ্চুকে। ফুঁসছে গুখোরা সাপের মতো। চাচ্চুর কাছ থেকে সে এই লুকোচুরি কিছুতেই আশা করে নি। তাই চওড়া গলায় তেজ ঢেলে বলল,
“তুলবো। একশো বার তুলবো। ও এটাই ডিজার্ভ করে। পালিয়ে বাচতে চেয়েছিলে আমার কাছ থেকে? কি ভেবেছিলে আমি কখনো সুস্থ হয়ে ফিরবো না? বিছানায় পরে থাকবো? মেয়েকে এই অধমের সাথে রাখবে না? ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিবে? তোমরা এতো নিচ ম্যান্টালিটির! শেম অন ইয়্যু!” বলেই একদলা থুতু ফ্লোরে ফেললো মেহরাদ। ভেতরে টগবগ করছে লাভা। কিছুতেই নিজেকে স্থীর রাখতে পারছে না।
এদিকে মেহরাদের মুখে এসব কথাবার্তা শুনে কপাল গোটালো শায়ান তালুকদার। ছেলের কথা শুনে বুঝতে বাকি নেই, ছেলেকে যে কেউ-ই এসব শুনিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। আরও একবার মনে মনে দীর্ঘনিশ্বাস ফেললো মানুষ্য প্রজাতির উপর। এই জগতের উপর। মানুষ নিজের সার্থের জন্য কতো কিছু করতে পারে তা নিজের আপন মানুষদের না দেখলে কখনো বুঝতো না সে।

বাবার পিছু দাঁড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে শুভ্রতা। আগে কি হবে তার কিচ্ছু জানা নেই। কিন্তু এই মূহুর্তে মেহরাদের মুখ থেকে নিঃসৃত হওয়া প্রতিটি শব্দ যেন ধারালো ছুরির ফলার মতো তার হৃদপিণ্ড ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে।কথাগুলো যেন একেকটি তপ্ত কাঁচের কণা, বুকের গভীরে বিঁধে যাচ্ছে। সে এতদিন কষ্টে কষ্ট পেলো, আবার একজনের কাছে অপরাধীই হয়ে রইলো। তার জীবনটাই বৃথা। যে যার যার মতো করে তাকে তাদের জন্য ব্যবহার করে। এতো মূল্যহীন করে দুনিয়ায় পাঠানোর জন্য রবের প্রতি তার খুব অভিমান জমলো।
এতো এতো অভিমান, অনুরাগ, অনুযোগ সব মিলিয়ে ভেতরের জমাটবদ্ধ অনুভূতি গুলো মেয়েটার দুচোখে যেন কালবৈশাখীর তাণ্ডব নামিয়ে এনেছে। দুচোখ ছাপিয়ে কূলঘেঁষা কোনো জলোচ্ছ্বাসের মতো আছড়ে পড়েছে। অঝোর ধারায় ঝরতে থাকা চোখের জল যেন এক অনিয়ন্ত্রিত স্রোতে পরিণত হয়েছে।
শুভ্রতার কান্নার শব্দে মেহরাদের কান সহ মস্তিষ্ক পর্যন্তে দিকদিক আগুন জ্বলছে যেন। শুভ্রতার দিকে ব্যাগ্র হাতের থাবা বাড়িয়ে চাপা কন্ঠে হিসহিসিয়ে উঠলো সে,

“ম’রা কান্না জুড়েছে কেন এখন? বেঁচে গিয়েছি বলে কাঁদছে নাকি আবার আমার সাথে থাকতে হবে বলে কাঁদছে? এই স্বার্থপর মেয়ে এই? জবাব দে। আমাকে বল, এতটা স্বার্থপর কবে থেকে হলি? এক্সিডেন্ট এর আগেও তো আমায় ছেড়ে যেতে চাসনি। এরপর কিভাবে পারলি? চোখের আড়াল তো মায়ার আড়াল? যেই সামনে থেকে গিয়েছি ওমনি ভুলে গিয়েছিলি আমায়? এতো ঠুনকো তোর ভালোবাসা ছিলো?”
কান্নারত শুভ্রতার বাহু চেপে শায়ান তালুকদারের পিছু থেকে নিজের সামনে আনতে আনতে জিজ্ঞেস করছিলো মেহরাদ। শায়ান তালুকদার গর্জে উঠলেন,
“পাগল হয়েছো? কীসব বলছো? যা খুশি তা-ই মনে করতে লারো তুমি। কিন্তু আমার মেয়ের গা’য়ে একদম হাত দেবে না মেহরাদ। আমি ওর বাবা এখনো জীবিত দাঁড়িয়ে আছি ওর সামনে। ওর কষ্ট হচ্ছে। ছাড়ো তুমি ওঁকে? ছাড়ো বলছি…..”

শুভ্রতা পা’য়ের ব্যথায়, বাহু চেপে ধরা হাতের ব্যাথায় চোখমুখ খিচে রয়েছে। কি অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে! অসহায়ের মতো সহ্য করছে সব।
আদনান আর দ্বীপ রয়েছে ক্লাসরুমে বর্তমানে। আদনান মেহরাদকে ছাড়াতে চেয়ে বলল,
“কি করছিস? এতদিন পাগলের মতো খুঁজে বেরিয়ে এখন পেয়ে এমন করছিস কেন? মেয়েটার কষ্ট হচ্ছে তো? ছাড় ওকে তুই?”
“পাগল আমি, যে দ্বিতীয় বার হাত ছাড়া করবো? আমার কাছেই রাখবো। বেচে থেকেও প্রাণহীন এক দেহ বয়ে বেড়াচ্ছিলাম। প্রান হীন বেঁচে থাকার স্বাদটুকু তিলেতিলে বুঝাবো ওঁকে আমি। ঠিক কতটা সুখে ছিলাম এতদিন।” দাতে দাত চেপে বললো মেহরাদ।
“ছাড়ো ওঁকে মেহরাদ। মেয়েটার কষ্ট হচ্ছে। ওর এমনিতেই সমস্যা। অসুস্থ হয়ে পরবে। ” শুভ্রতাকে নিজের কাছে নিতে চেয়ে বলে উঠলো শায়ান তালুকদার।
মেহরাদ দিলো না। জোর খাটিয়ে নিজের কাছেই রাখলো। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“খুব ভালো অভিনয় শিখেছো বাবা মেয়ে। নোবেল ডিজার্ভ করো তোমরা। এখনো কি সুন্দর অভিনয় করে যাচ্ছো? কি ভেবেছো এসব বলে আবার আমার কাছে থেকে পালিয়ে যেতে পারবে? অবশ্য এখন তো পালানোর কোন কারণ দেখছি না! এই যে দেখো আমায়? সম্পূর্ণ সুস্থ! তোমার মেয়েকে একদম ভালো রাখতে পারবো। কোন অচল অক্ষমের সাথে সংসার করতে হবে না। আর কি চাই তোমাদের?”
“কিছু বলছি না মানে এই না যে যা নয় তাই বলে যাবে। তোমার জানায়ও ভুল থাকতে পারে। আমাদের, আমাদের মতোই থাকতে দাও। শুভ্রতাকে এখানে আসতে দাও।”
“উঁহু, তা কি করে হয় বলো? আকাশ পাতাল এক করে খুঁজে বের করেছি কি আবার চলে যেতে দিতে? আমার কাছেই থাকতে হবে। থাকতে না চাইলে বন্ধি হয়ে থাকতে হবে। তবুও শেষ নিঃশ্বাস অব্দি আমার কাছেই থাকতে হবে। ”
“তুমি সীমা অতিক্রম করছো মেহরাদ! এতটা ডমিনেট তো আগে ছিলে না! তোমার কাছে আমি আমার মেয়েকে কিছুতেই দিবো না।”
মেহরাদ ভ্রু উচিয়ে তাচ্ছিল্য করে বলল,

“ওহ্ রিয়েলী? ডমিনেটিং মাই ফুট! যে যেমন আমি তার সাথে তেমনই। ফর ইয়্যুর কাইন্ড ইনফরমেশন মি. তালুকদার। শী বিলংস টু মি। মাই লিগ্যাল ম্যারিড ওয়াইফ। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
দমে গেলো শায়ান তালুকদার। ছেলেটা কোন স্কোপই রাখছে না দ্বিতীয় প্রতিউত্তর করার। এরকম হলে তো সমস্যা। এতো কষ্ট করে এতদিনের লুকিয়ে থাকা তো তো জলাঞ্জলি যাবে তাহলে। তিনি কিছুটা নমনীয় হয়ে বললেন,
“দেখো, আমরা চলে গিয়েছি তোমার ভালোর জন্যই। এ দূরত্ব সকলের জন্যই কল্যাণের। আশা করি তুমি একটা সময় বুঝবে। আমাদের যেতে দাও। শুভ্রতার কষ্ট হচ্ছে, দেখো?”
আসলেই শুভ্রতার বেশ কষ্ট হচ্ছে পা নিয়ে। দৌড় ঝাপ টানা হেচড়ায় পা’য়ের অবস্থা বেগতিক। ঠোঁট কামড়ে ব্যাথা গিলার চেষ্টা করছে মেয়েটা। সেই সাথে অঝোরে ঝড়ছে দুচোখের অশ্রু।
মেহরাদ সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করলো সে কথা। তার ধারণা এ সবাই মিথ্যেবাদী। সামনে পরে থাকা ক্রাচটাই জোড়ে লাথি মে’রে দূরে সড়িয়ে দিলো। রাগান্বিত স্বরে চেচালো,

“এই নাটক দেখলাম তো। আর কতো? ”
শায়ান তালুকদার ক্লান্ত হলেন ছেলের নির্বুদ্ধিতায়। ছেলেটাকে কিছুতেই কিছু বুঝানো যাচ্ছে না। মেহরাদের এতো রাগ আজ প্রথমেই দেখা তার। অবশ্য দেখবেই বা কি করে! সারাজীবন ছিলো চাকরির সুত্রে দূরে দূরে। যা শুনার শুনেছিলো শুধু। আজ স্ব চোক্ষে দেখছেও।
শুভ্রতা ফুপিয়ে উঠলো করুন সুরে। মেহরাদের একেকটা বাক্য ধনুকের তীরের মতো ক্ষতবিক্ষত করছে অন্তস্থল। পিছনে থাকা বেঞ্চের উপর এক হাতে ঠেস দিয়ে দাড়ালো মেয়েটা। শায়ান তালুকদার ব্যস্ত ভঙ্গিতে মেয়ের দিকে এগিয়ে গিয়েই জিজ্ঞেস করলো,
“ব্যাথা টা কি বেড়েছে? ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো?”
শুভ্রতা সিক্ত চোখ জোড়া বন্ধ অবস্থাতেই মৃদু মাথা নাড়ালো। বুঝালো তার খুব কষ্ট হচ্ছে। আদনান মেহরাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,
“ওর বোধহয় সত্যিই কোন সমস্যা হচ্ছে রে! এখানে আর সিনক্রিয়েট করিস না। বায়ায় চল। ওখানেই বাকি কথা হবে।”

মেহরাদও মনে মনে তাই-ই ভাবছিলো। কিন্তু শুভ্রতা সঙ্গে সঙ্গে অবাধ্য কিশোরীর ন্যায় বিরোধিতা করলো। কণ্ঠনালীতে দলা পাকানো কান্না গুলো উপচে পড়ছে, তা সমেতই অশ্রু বিজোরীত কন্ঠে বলল,
“নাহ, নাহ, আমি কোথাও যাবো না। কারো সামনে যাবো না। আমি একাই ভালো আছি।” বলেই মেয়েটা ছুটে বেরিয়ে যেতে চায়। অতিমাত্রায় উত্তেজিত হওয়ার ফলস্বরূপ পা’য়ের তীক্ষ্ণ ব্যাথা মস্তিষ্ক হতে ছুটে গিয়েছিলো সেকেন্ডের জন্য। কদম ফেলতেই তা আবার নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে ফিরে এসেছে। ফলস্বরূপ হুমড়ি খেয়ে পড়তে নিয়েছিলো সামনে। ঝটকায় এক বাহুতে আগলে নিলো মেহরাদ। তরতর করে রাগ বাড়ছে মেয়েটার ছটফটানিতে। এখনো তার কাছ থেকে পালাতে চায়!
“দেখলে? বললাম তো ওর সমস্যা আছে! বার-বার কথা অগ্রাহ্য করছো কেন, মেহরাদ? ওঁকে ডাক্তার দেখাতে হবে। দাও আমার কাছে।”
মেহরাদ তপ্ত স্বরে শুধালো,
“কি সমস্যা ওর? বুঝতেই তো পারছি নাটক করছো।”

“মেয়েটার পরশু আবার পরিক্ষা আছে, মেহরাদ। ওঁকে ডাক্তার দেখাতে হবে। না-হয় পরিক্ষাই এটেন্ড করতে পারবে না। কেন নাটক করতে যাবো?” অপারগ হয়ে বললো শায়ান তালুকদার। মেয়ের কষ্টটা তিনি উপলব্ধি করতে পারছেন।তাই কথা বাড়াতে চাচ্ছেন না।
“কি সমস্যা বলো আমায়? আমিও শুনি আর কতো অভিনয় করতে পারো তোমরা?”
“তোমার সাথে আর একটাও বাড়তি কথা বলার প্রয়োজন মনে করছি না আমি। ছাড়ো ওঁকে। এত তেড়ামো, এক সময় ঠিকি ফেলে রেখে চলে যাবে…” বলেই তিনিই মেয়েকে নিয়ে নিলেন নিজের কাছে। মেহরাদ এ দুনিয়ায় মোহের সবটুকু অবিশ্বাস কন্ঠে ঢেলে জিজ্ঞেস করলো,
“আমি ফেলে রেখে চলে যাবো? আমিইইই?” মোহের সমস্ত মায়া মেহরাদের কণ্ঠে যেন অবিশ্বাসের তলোয়ার হয়ে ঝিলিক দিয়ে উঠল।

“কোন পঙ্গু বিকলাঙ্গ মেয়েকে নিশ্চয়ই সারাজীবন নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে মেনে নিবে না!” আর কোন বাক্য বিনিময় করলো না তিনি। মেয়েকে এক পাশে আগলে রেখে নিচ হতে ক্রাচটা উঠিয়ে দিলো। শুভ্রতা ওটাতে ভর দিয়েই বানার সাথে এগোচ্ছে। আর কোন বাঁধা এগিয়ে আসছে না তাদের দিকে। ক্লাসরুমে দরজার সামনে পৌঁছে মেয়েটা একবার পিছু ঘুরে তাকালো স্তব্ধ মানবটার দিকে। আবারও ঠোঁট ভেঙে আসছে। উনি কি সত্যিই ওকে চাইবে না? মস্তিষ্কে দাপিয়ে বেড়ানো এই বাক্যটা যেন দাবানলের আগুনের মতো মেয়েটার অস্তিত্বের সবটুকু রসদ পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।
মেহরাদ স্তব্দ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সামনের পরিস্থিতি বুঝে উঠতে তার বেগ পোহাতে হচ্ছে বেশ। বিদ্যুৎ আলোড়নে ছুটছে স্নায়ুতন্ত্র। আদনান দ্বীপেরও একই অবস্থা। চোখের সামনে এতদিনের সুস্থ একটা মেয়েকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রুপে দেখছে।মেয়েটা এক পা’য়ে ভর দিচ্ছে না। ক্রাচের সাহায্যে সামনে আগাচ্ছে। এর চেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনা বোধহয় দুটো নেই!

স্তব্ধ মেহরাদের দৃষ্টি থমকানো। চোখ দুটো অবিশ্বাস্য ঠেকছে। শায়ান তালুকদারের শেষের বাক্যাটা এখনো শ্রবণেন্দ্রিয় ঝনঝন শব্দ তুলে ঘুরপাক খাচ্ছে। সে যা দেখছে তা কি সত্যি? কেন এটা সত্যি? কখন? কিভাবে হলো এটা? তার চঞ্চল পাখিটা হাটতে কেন পাড়ছে না ভালো করে? এই অশ্রুপাত কি সব তাহলে সত্যি?
নিজের সবটুকু কষ্ট লাঘব করতে শুভ্রতার এতটুকু ক্লেশানুভূতিই যথেষ্ট ছিলো মেহরাদের জন্য। এতদিনের রাগ জেদে গড়ে উঠা তপ্ত পর্বত ধ্বসে পড়ছে। হিমালয় টলেছে। নিজের বিরোহ কষ্ট ছাপিয়ে শুভ্রতার পঙ্গুত্ব যেন পুরো অন্তস্তল ছেয়ে গিয়েছে। দমকা বৈরি হাওয়ার ন্যায় এলোমেলো করে তুললো কঠোর মানবকে। চোয়াল শক্ত করে বড়ো বড়ো কদম ফেলে এগিয়ে গেলো ক্লাসরুমের বাহিরের দিকে। আদনান দ্বীপ বলাবলি শুরু করলো, এটা কি সত্যিই নাকি! কখন কি হলো? তারা কেউ কিছু জানে না কেন?

পুরো বারান্দায় এখনো ছাত্রছাত্রীদের ঢল। কেউ বেরিয়েছে কেউ এখনো প্রশ্ন নিয়ে আলাপ আলোচনা করছে। তার উপর মাঝ পরিক্ষার সেই এনাউন্সমেন্ট এর ব্যপারটি নিয়েও অনেকে আলোচনা করছে। দূরে দূরান্ত থেকে আসা কত শিক্ষার্থী হায় হায় করছে এমন প্রেমিক পুরুষের জন্য! মেহরাদকে চিনার জন্য কতো কিশোরী, রমনী মুখিয়ে আছে!
এতসব ভীর ভাট্টা পায়ে ঠেলে শুভ্রতাদের দিকে কয়েক কদমেই পৌছে গেলো মেহরাদ। ওর ভারী আভিজাত্য কদমে সকলে না চাইতেও ওর দিকে তাকাতে বাধ্য। আপনা আপনিই সরে যাচ্ছে তারা। শুভ্রতাদের পিছু পৌছাতেই কারো তোয়াক্কা না করে ঝটিকা প্রবাহের সাথে শুভ্রতাকে কোলে তুলে নিলো মেহরাদ। সকলের বিস্মিত, বিস্ফোরিত চাহনি তাদের দিকে দাবিত হয়েছে। কেউ কেউ মুখে হাত ঢেকে চোখ বড়ো করে তাকিয়ে। আশ্চর্য তারা, কি হচ্ছে বুঝতে অক্ষম।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫০

এদিকে শুভ্রতা কাপছে থরথরিয়ে ভীত হরিন শাবকের ন্যায়। শিহরণি শীতল স্রোতটা সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জমিয়ে দিয়েছে।কান্না ভুলে জলজ চোখের মনি জোড়া মেহরাদের দিকে নিবদ্ধ করে রেখেছে। বুকের ভেতরটা নিস্তরঙ্গ শীতল এক দিঘির মতো শান্ত হয়ে এসেছে। সে তার মেহরাদ ভাইয়কে কখনো ভুল চিনতেই পারে না! সে তো জানতো, লোকটা এভাবেই তাকে আগলে নিবে।
হাটার তালে তালে মেহরাদের হৃদযন্ত্রের অসহ্য ধুকপুকানি শুভ্রতাকে ব্যাকুল করে তুলছে।মেয়েটা অবিলম্বে আস্তে আস্তে মাথা এলিয়ো দিলো, কাঙ্খিতো অথচ অনিবার্য নির্ভরযোগ্য বক্ষে। কেন্দ্র জুড়ে সকলের অবাক – বিস্মিত চাহনি তখনও ওঁদেরই গিলে খাচ্ছিলো।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫২