Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫০

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫০

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫০
সাঞ্জেনা শাজ

ক্ষতবিক্ষত হাতের চিকিৎসা মেহরাদ করায়নি। উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক সেদিক ছুটেছে কেবল। শুধু একটা মাত্র ক্লু, একটা মাত্র হিন্ট! একটু কোন শুত্র পেতো শুভ্রতাকে খুঁজে পাওয়ার!
কিন্তু ব্যার্থ হয়েছে সে। কিচ্ছু পায়নি। আদনান সারাটা সময় ওর সাথে ছিলো। বন্ধুর পাগলামি দেখেছে৷ রাত গভীর হতেই আনেক আকুতি মিনতি করে বাসায় এনেছে। পুরো তালুকদার বাড়ি আমানিষার ঘোর বিষাদে ঢাকা তখন। জাহানারা বেগম, আলতাফ তালুকদার ছেলের পথ চেয়ে তখনও জেগে ছিলো । বসে বসে গুনগুনিয়ে কাদছে মেহরাদের মা।

মেহরাদকে ক্লান্ত ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে দেখে সেই গুনগুন আহাজারিতে রূপ নিয়েছে। মেহরাদ যেনো কোন ঘোরে আটকে। তার এখনো মনে হচ্ছে না সে আজ ব্যার্থ হয়েছে শুভ্রতাকে খুঁজে বের করতে। আজকের দিনটা নিয়ে তার অনেক এক্সপেকটেশন ছিলো। আজ সে সব রকম ভাবে নিজেকে শূন্য অনুভব করছে। নিজেকে ইউজলেস লাগছে। মা’য়ের আহাজাড়ি কিছুই তাকে সেই বিভ্রম থেকে বের করতে পারলো না। নিটোল পা’য়ে উপরে উঠে গেলো নিজের রূমে।
রুমে যেতেই শান্ত শিষ্ট স্তব্ধ রুমটায় তান্ডব চালালো তৎক্ষনাৎ। ভেতরের সকল রাগ জেদ ক্ষোভ উগরে দিলে বিলাসবহুল রুমটায়। ধ্বংসজজ্ঞ চললো কিছুক্ষণ। নিচ থেকে মেহরাদের বাবা-মা দু’জন দৌড়ে উপরে উঠে এসেছেন। ছেলের এ উন্মাদ বুনো রুপ দেখে জাহানারা বেগম মুখে আচল চেপে বললেন,
“যে নেই তার জন্য নিজেকে কেন এভাবে তিলেতিলে শেষ করে দিচ্ছিস? আমাদের কথা একবারও ভাববি না?”
মেহরাদ ফ্লোরে বসে ভারী শ্বাস ফেলছে, একেকটা প্রশ্বাস যেন সাক্ষী ভেতরের কি তোলপাড় চলছে ছেলেটার। মাথা নুয়িয়ে রেখেছে নিচের দিকে। পুরো রুম লণ্ডভণ্ড। হাত গুলোর দিকে তাকানো দায়। এতো বাজে অবস্থা! মা’য়ের দিকে চাইলো নিস্প্রভ দুটি চোখ নিয়ে। অনুভূতিহীন নির্জিভ কন্ঠে বলল,

“তোমাদের জন্যই সহ্যশক্তি বাড়িয়েছি, মা ৷ নয়তো এ যন্ত্রণা মৃত্যু থেকেও অধিক পীড়াদায়ক, মা।”
জাহানারা বেগম ছেলের দিকে এগিয়ে গেলেন। ছেলের কাছে গিয়ে বসলেন কান্না গিলে। কিছুটা আশ্বাস নিয়ে বুঝিয়ে বলতে চাইলেন,
“ও তো চলেই গিয়েছে, নতুন করে জীবন শুরু করে দেখ! দেখবি সব দুঃখ কষ্ট কমে আসছে। আমরা আছি তো?”
নতুন জীবন শুরু করবে মানে কি! ওঁরা কি কেউ জানে না মেহরাদ কেমন? ঠিক কতটা ভালোবাসে সে তার শুভ্রাকে?
“নতুন পুরনো কিছু নয়, মা। ওঁকেই চাই আমার, মা। এ দুনিয়া, পর দুনিয়া, কেয়ামত, হাশর যেখানেই হোক, সব জায়গায় ওঁকেই চাই আমার। এন্ড অফ দ্যা ডেসটেনি, এন্ড অফ দ্যা ব্রেথ, ইট উইল বি জাস্ট শী। জাস্ট শী!!”

শুভ্রতা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে। অশ্রুসিক্ত দু’চোখ রক্তলাল হয়ে আছে। গমরঙা ত্বক লালিমায় ছেয়ে আছে কান্নার তোপে। জীর্ন শির্ন কায়াখানা কান্নার তোপে ক্ষনে ক্ষনে কেঁপে উঠছে। অন্ধকার রাতের ব্যালকনিতে চুপটি করে বসে ভেতরের বিদ্ধস্ত অনুভূতি গুলোকে অশ্রু হিসেবে উগরে দিচ্ছে মেয়েটা। হাতের তালুতে মুখ চেপে রাখা সত্তেও চাপা কান্না ভেসে বেড়াচ্ছে আধারে ঢাকা ধরনীর বুকে। প্রকৃতিও যেন খুব রুষ্ট শুভ্রতার উপর। উত্তাল বৈরি হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড কিরে দিচ্ছে ধরনী।
শীতল বারিকনায় ক্ষনে ক্ষনে ভিজিয়ে দিচ্ছে বিদ্ধস্ত মেয়েটাকে।
একে একে দুইবার মেহরাদকে দেখেছে শুভ্রতা। একটা বারও লোকটার কাছে ধরা দেয়নি নিজেকে। আজ পরিক্ষার কেন্দ্রে দেখেছে। কেমন অগ্নিমূর্তি ছিলো মানব।
নিজেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে বার কয়েক দেখেছে সে লোকটাকে। তারপর বিধ্বংস মানুষটাকে পিছু ফেলে চলে এসেছে। চেয়েও ছুটে যেতে পারেনি মানুষটার কাছে। সে এতটা পাষান! নিজের উপরেই নিজে ভর্ৎসনা করছে মেয়েটা।

“আল্লাহ তুমি তো বৃষ্টির সময় দোয়া কবুল করো বলো! আমারটাও করো না! এতো কেন কষ্ট দিচ্ছো আমাদের? ভালোবাসি তো ওই মানুষটাকে! কিভাবে ভুলে যাই? আমার স্মৃতি গুলো মুছে দাও, নয়তো আমায় তোমার কাছে নিয়ে যাও! ও উন্মাদ চোখ দুটো আমায় মৃত্যু যন্ত্রণা দিচ্ছে তো খোদা! রুহ এসে ঠেকছে কণ্ঠনালীতে। ওই মানুষটার দু’চোখের ক্লেশ আমি কিভাবে সহ্য করবো বলো? বলো না? আল্লাহ শুনো না, আমার পা টা ভালো করে দাও? উনার কাছে ছুটে চলে যাই! তুমি চাইলে তো সব সম্ভব। এটা ঠিক করে দাও? আগের মতো করে দাও একদম হু? যেন কেউ বলতে না পারে মেহরাদ ভাই দয়া করে এখনো ভালোবেসে যাচ্ছে আমায়। অনুগ্রহ দেখাচ্ছে। আমাদের যায় না একসাথে। ঠিক করে দাও না,আল্লাহ? তুমি ছাড়া কার কাছে চাইবো বলো? তুমিই তো সব কিছুর মালিক। ” মেয়েটা অঝোরে কাদছে। কান্নায় গলা ভেঙে এসেছে। আরজি করছে তার রবের কাছে। আহাজারি করছে গড়াগড়ি করে। তার কেন এতো দুঃখ কষ্ট? সে কেন অভাগী? পরক্ষণেই কি যেন মনে করে আবার আহাজারি করে বলে,
“সব কূল ভেঙে আমায় কেন পাঠিয়েছো এ দুনিয়ায় খোদা? এতিম করে পাঠিয়েছো। কার রক্ত তা-ও জানি না। এই জাত কূলহীন আমায় এতো কেন ভালোনাসাইলা ওই মানুষটাকে? এই নিষ্ঠুর বাস্তবতায় রেখে এতো স্বপ্ন কেন দেখতে দিলা? আমি ওগুলো কিভাবে ভুলে যাবো বলো? কিভাবে….. ”

বাইরের ঝড়ের তীব্রতার সাথে সাথে শুভ্রতার ব্যাকুল কন্ঠের আর্তনাদ বেড়েছে। কক্ষ পেরিয়ে পাশের কক্ষে পৌচেছে তা ঝড় হাওয়ার তান্ডব ছাপিয়ে। শায়ান তালুকদার মেয়ের আর্তনাদ শুনে ত্রস পায়ে মেয়ের রুমে এসেছেন। পুরো রুম অন্ধকার। ব্যালকনির দরজা খোলা থাকায় তা দিয়ে ঝড়ো হাওয়া ধেয়ে আসছে রুমের ভিতরে। কান্নার শব্দও সেখান থেকেই আসছে। মেয়ে কোথায় অনুমান করে তিনি ব্যাস্ত পায়ে সেখানে গেলেন।
আকাশের বিদুৎ ঝলকানিতে মেয়েকে দেখলেন ব্যালকনিতর দেয়ালে পৃষ্ঠ ঠেকিয়ে হাটুতে মুখ গুজে কাদছে।
ফ্লোর ভিজে আছে হিচকে বৃষ্টিতে। তার মানে মেয়েটাও ভিজে। পরশু আবার পরিক্ষা। এ অবস্থায় জ্বর বাদালে কিভাবে হবে! তিনি তড়িৎ বেগে মেয়ের কাছে পৌছে উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিলেন। শুভ্র‍তা বাবার অবয়ব অনুমান করে নতুন উদ্যমে ফুপিয়ে উঠলো। শায়ান তালুকদার মেয়েকে বুঝিয়ে সুজিয়ে রুমে এনে বসালেন বিছানায়। শুভ্রতা কিছুতেই শান্ত হতে পারলো না। বাবার বুজ সে শ্রবণেন্দ্রিয়ে ঘেষতেও দিলো না। ঠোঁট উলটে টলটলে জলজ চোখে জানালো,

“আমার কষ্ট হচ্ছে বাবা। ভেতরটা দ্বীখন্ডিত হয়ে যাচ্ছে। আমায় মেহরাদ ভাইয়ের কাছে দিয়ে আসো। আমি আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারছি না। কারো কথা শুনতে হবে না, বাবা। যে যা খুশি বলুক। আমি কি কিছু ইচ্ছে করে করেছি বলো? আমার হাত আছে এতে? আমি কেন এর দায়ভার নিবো? ওই মানুষটা কেন এসবের দায়ভার নিবে? তুমি দেখেছো না আজকে মেহরাদ ভাইকে? কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো দেখা গিয়েছে? উনি নিশ্চয়ই আমায় খুজেছিল বাবা। আমার উপর নির্ঘাত রেগে আছে। কষ্ট পাচ্ছে। আমায় দিয়ে আসো ওনার কাছে। আমায়…আমায়…. ”
“হুশ, হুশ” আর বলতে পারলো না শুভ্রতা। মেয়েকে বুকে আগলে নিয়েছেন শায়ান তালুকদার। তার চোখ দুটোও অসম্ভব লাল হয়ে উঠেছে মেয়ের ব্যাকুল আহাজারিতে। সময়ে অসময়ে নিজেকে যখন আর আটকে রাখতে পারে না তখন এমন পাগলামো করে মেয়েটা। খুব কষ্টে সামাল দিতে হয়। আবার সময় নিয়ে নিজেই সব বুজে উঠে আগের মতো হয়ে যায়। তার এখানে স্বান্তনা দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। তাই প্রতিবারের মতো আজও জিজ্ঞেস করলো,

“সত্যি নিয়ে যাবো তালুকদার বাড়িতে? থাকতে পারবি তো সকলের সাথে?”
“শুধু মেহরাদ ভাইয়ের কাছে দিয়ে আসো। আর কারো কাছে না।”
“উঁহু, সবাই থাকবে। তালুকদার বাড়ির সকলে। তাদের মানিয়ে থাকতে পারবি তো?”
“তারা? তারা তো মানবে না বাবা। আমার তো জাত কূলের ঠিক নেই বাবা। অচল আমি। তারা তো মানবে না বাবা।”
“মেহরাদ মানবে…?”
“মানবে। একশো বার মানবে। ভালোবাসে তো…..”
“এ ভালোবাসা দয়া হয়ে যাবে তখন মা….” তিনি মাথায় হাত ভুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।
ব্যাস, শুভ্রতা থেমে গেলো পুরোপুরি। মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রগুলো নতুন প্রশ্ন ছুড়লো নিজেদের দিকে। আবার নিজেরাই প্রতিউত্তর করলো। তর্ক বিতর্ক চালালো নিজেদের মধ্যে। ততক্ষণে শুভ্রতা ক্লান্ত, নিস্তেজ বমে গেলো। বাস্তবতার হুশ জ্ঞান ফিরতেই ভেতরের যন্ত্রণাটুকু গিলে ফেলে আনায়াসে। একদম নিশ্চুপ বনে পরে রয়।

আজ দ্বিতীয় পরিক্ষা। সোহানার পা মুটামুটি অনেকটা ভালো এখন। আজও এসেছে শান্তা ওর সাথে। মেহরাদ আদনান অনেক আগেই এখানে উপস্থিত। মেহরাদকে গত দু’দিন তেমন একটা একা ছাড়েনি আদনান। সেদিন যে বিধ্বংসী রূপ দেখেছে! আর সাহস হয় না ছেলেটাকে একা ছাড়ার। অন্তত যতদিন শুভ্রতাকে খুঁজবে ততদিন সাথে সাথেই থাকবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।
সোহানা শান্তা ওদের কাছে যেতে যেতে নতুন এক মুখশ্রী দেখা পেলো ওরা। মুখশ্রী নতুন নয়,কিন্তু এখানে নতুন দেখা। দ্বীপ ও আছে ওদের সাথে। কি বিষয় নিয়ে যেন আলাপ আলোচনা করছে ওরা মিলে। শান্তা হটাৎই অস্থির হয়ে পরলো। আদনান, যে তার উডবি। আদনানের সাথে বিয়ের ব্যাপারে অনেকটাই কথা এগিয়ে ফেলছে বাড়ির মানুষ। সেই হিসেবে অনেকটা উডবিইই। আরেকজন! আরেকজন কি হয় তার? কি সম্পর্ক তাদের? মস্তিষ্ক হাতরে কোন জবাব পেলো না মেয়েটা। কোন সম্পর্ক নেই। তবুও এ ছেলেটার জন্য নিশাচর সে গত কয়েকদিন। বুক ঢিপঢিপ করছে। ঝর বস্তুর ন্যায় কদম আগাচ্ছে শুধু। দু হাতের তালু ঘেমে নেয়ে একাকার। দু’চোখ স্থীর ওই গম্ভীর মুখখানায়। কয়েকদিনের অদেখায় যেন ছেলেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে আবর্তিত হয়েছে।

“কি ব্যাপার স্টুডেন্ট? পা’য়ের কি অবস্থা এখন? এক্সাম দিতে কষ্ট হচ্ছে?” সোহানাকে দেখে দ্বীপ জিজ্ঞেস করলো। শান্তার দিকে তাকিয়েছে এক পলক। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললেই তার বুকে ঝর উঠে। ও চোখ দুটোয় সে বিতৃষ্ণা দেখে। অনাদার দেখে। ধনুকের মতো দৃষ্টিতে তার বুক এফোর অফোর হয়। রক্তক্ষরণ হয়। তাই সে এড়িয়ে গেলো সম্পূর্ণ মেয়েটাকে।
“এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ভাইয়া। দোয়া করবেন।” হালকা ঠোঁট এলিয়ে জবাব দিলো সোহানা। আদনানের দিকে ভুলেও তাকালো না। তাকালেই কষ্ট। হারানোর কষ্ট। বিরহ, বেদনা। নিজের এক পাক্ষিক ভালোবাসার সমাধি দেখে সে। তোলপাড় হয় ছোট্ট মন কুঠুরিতে। হৃদযন্ত্র খামচে উঠে। রক্তের সঞ্চালন স্তব্দ হয়ে নিশ্বাস আটকে আসে।

আদনান একাগ্র নেত্রে দেখলো সোহানার ছোট্ট হাসিটা। তার বেলায় মেয়েটা কতো পাষান! হাসবে দূর, চোখ তুলেও তাকায়না। তার সাথে এতো বৈষম্য কেন? আগে যা-ই দুটো কথা কাটাকাটি হতো। তবুও কথা তো হতো! এখন তা-ও হয়না। মেয়েটা ফিরেও তাকায় না তার দিকে। ওই চোখের মনি দুটোকে দেখতেও দেয় না। ভেতরে দাউ দাউ করে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠে। অজান্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। হৃদয়ে অজানা অনূভুতিতে তোলপাড়। কদম বাড়িয়ে ওদের দিকে এগুতেই যাবে, সোহানা পাশ কাটিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। আদনানের মিনে হলো তার জন্যই চলে যাচ্ছে মেয়েটা। সমগ্র পুরুষালী অস্তিত্বে তীব্র জ্বলুন অনুভব করলো সে। খরসান চোয়ালে শক্ত চোখে দেখলো সে মেয়েটাকে। তার সাথে এরকম করার মানে কি? দুটো কথাও বলারও রুচি হয় না তার সাথে?;এতো বিতৃষ্ণা কেন?
“সোহানা টা চলে গেলো, ওর এটা তো আমার কাছেই রয়ে গেলো!” উৎকন্ঠা নিয়ে বলেই হাতে থাকা ফাইলটা নিয়ে এগুতে যাবে, সুযোগ বুঝে আদনান বাধা দিলো। শান্তাকে রুখে নিজেই গেলো ফাইলটা নিয়ে। শান্তা ভাবলো ওর প্রতি কনসার্নেই বুঝি আদনান একাজ করছে। অস্থিরতা আরও বেশি করে ঝেকে ধরলো তাকে। ভিতরের হৃদযন্ত্রটা অনবরত প্রকম্পিত হচ্ছে । মুখশ্রীতে রক্তিম আভা ফুটে উঠেছে।
দ্বীপ চোখে চোখে ওর অস্থিরতাটা মেপে নিয়েছে। এতটা নার্ভাস সে আর কখনো দেখেনি। হাসলো মনে মনে নিজের উপর। তার জন্যই বুঝি এরকমটা দিনদিন বাড়ছে! আবার মেহরাদ ভাই পাশে আছে সেটা নিয়েও হতে পারে। তাই সে মেহরাদের উদ্দেশ্যে বলল,

“ভাইয়া আপনি নয়তো থাকুন এদিকে? আমি আরেকটু চেক দিয়ে আসি ক্যাম্পাসটা!”
“নাহ, দ্বিপ। তুমি থাকো আদনান আসা পর্যন্ত। আমিই যাচ্ছি। আজকের প্ল্যান যেন ফ্লপ না যায়, প্রে ফর দ্যাট। ”
মেহরাদ বিদায় নিতেই শান্তা চঞ্চল পা’য়ে সরে যেতে চাইলো এখান থেকে। কিন্তু দ্বীপ আটকালো তার বাক্যে,
“আমিই কি একটু বেশিইই বিরক্ত করছি, সিনিয়র? আমিতো ছিলামই না…. ”
“কোথায় ছিলে এতদিন?” শান্তার হটাৎই অস্থির কিন্তু পূর্নাঙ্গ অধিকারবোধ নিয়ে এক প্রশ্ন৷ দ্বীপ আবাক হলো। বিস্মিতকরণ তার চেহারায় প্রস্ফুটিত। সে ভেবেছিলো তাজে বিরক্ত স্বরে কিছু বলে থামিয়ে দিবে। চলে যেতে বলবে। সময় নিলো না ছেলেটা। উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলল,
“বাবার বিজনেস এর কাজে ঢাকার বাইরে ছিলাম। আমায় মিস করেছেন? আসলে আমিও একটু আকটু অফিসে….”
“মিস? ফালতু কথাবার্তা। এই যে এতদিন ছিলে না? শান্তিতে ছিলাম। এরকম দূরেই থাকবে, বুঝলে? ”
দ্বীপের উচ্ছ্বাসটা মূহুর্তেই আমানিষার অন্ধকারে ঢেকে গেলো। ভেতরে যেন রক্তক্ষরণ হলো প্রেয়সীর এ ভর্ৎসনায়। কণ্ঠনালীকে ঠেলে ঠুলে আওড়ালো,

“আমার দূরত্ব স্বস্থি দেয় আপনায়? এতটা মূল্যহীন কেন করছেন? পরিবার ছাড়া এক আপনাকেই শুধু হৃদয়ে আসন দিয়েছি। এতটা গুরত্ব আমি নিজেকেও দেই না। যতটা আপনার জন্য পাগলপারা। কেন বুঝছেন না, বলুন? আমায় ভালোবাসা টা কি এতটায় মূল্যহীন? ”
” শুধু মূল্যহীন না অবাঞ্চিতও।এ সমাজ তিরষ্কার করবে এ সম্পর্কে। আমাকে, আমার পরিবারকে। আমাদের সম্মান আছে একটা। আশা করি আমি না হোক ভাইয়ার কথা চিন্তা করে নিজেকে সংযত করবে। ” কথা বলতে বলতে শান্তা আজ একবারও তাকালো না দ্বীপের দিকে। অতীতের কর্কশ কন্ঠের পরিবর্তে আজ খুবই নমনীয় কন্ঠস্বর। যেন বিষাদ ভারে নুয়ানো। কন্ঠ রোদ হয়ে আসছে বারংবার। নিজেকে চড়াতে ইচ্ছে করছে তার। প্রাপ্তবয়স্ক তার বুঝতে একটু অসুবিধে হচ্ছে না ঠিক কোন প্রলয়ঙ্কারী অনুভূতির জোয়ারে ভাসছে তার অবাধ্য মন। এতো বিধিনিষেধ এর পরও এটা উড়ন্ত ডানায় শিকল ভেঙেছে। শান্তা আবার একে আটকাবো, তা না হলে নিষিদ্ধ এক প্রেম শিকারের থাবায় মৃত্যু অনিবার্য।

“সমাজকে কে পরোয়া করে?”
“আমি করি। আমরা করি।”
“আমি করি না। আপনার জন্য আমার ভালোবাসা কখনো সমাজ, এসব লেইম বিধিনিষেধ দেখে থেমে থাকবে না। আপনি কেন মানছেন এ উদ্ভট সমানের রীতিনীতি? একটু জায়গা দিন না ওই পাষাণ মনটায়!”
“আমি তোমার আথে কোন কথাই বলতে চাচ্ছি না। যাও সামনে থেকে। ওয়েট আমিই চলে যাচ্ছি।” বলেই শান্তা চলে যেতে হাটা ধরলো। দ্বীপ নিস্প্রান চোখে তা দেখে গেলো। সে তো এতটা কষ্টেরও যোগ্য না তাই না? মাতৃস্নেহ ছাড়া এতদিন তো কষ্ট করেই গেলো!এখনও কেন? কেন?????

সোহানাকে হলের বারান্দার এক পাশে টেনে এনে দাড় করিয়েছে আদনান। কোন বল প্রয়োগ করে নি। ফাইলের বাহানাতেই একটু ছাত্রছাত্রীদের ভীর কম সে জায়গায় এনে দাড় করিয়েছে।
সাহানা মাথা তুলে তাকায়নি। যখন তখন তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে যেতে পারে সেটা সে চায় না। তাই আদনানের হাত থেকে ফাইল টেনে নিতে গেলে। আদনান তা শক্ত করে ধরে রাখে। বল প্রয়োগ করে সোহানা। তবুও কাজ হয় না। শেষ মেষ না পেরে রক্তিম চোখ জোড়া নিয়ে তাকায় আদনানের চোখ জোড়ায়। দৃষ্টিতে দৃষ্টি বিনিময় ঘটে। একজোড়া তপ্ত দৃষ্টির সাথে একজোড়া স্বচ্ছ টলটলে চোখের মেলবন্ধনে কতো কথার আনাগোনা হলো! আদনান ওই মায়াবী চোখ জোড়ায় নিজেকে হারিয়ে বসলো যেন। এ চোখের ভাষা সে বুঝিতে পারছে না। কতো চাপা অনুরুক্তি যেন! কতো অব্যাক্ত যন্ত্রনা!

“কথা বলছো না কেন? এড়িয়ে যাচ্ছো আমায় তুমি।”
“কখন? ” কান্না গিলে শুধালো মেয়েটা। আবারও দৃষ্টি নমিত।
“সব সময়।আমি দেখছি। উপলব্ধি করছি তোমার এ দুরত্ব। এড়িয়ে যাওয়া। সকলের সাথে ঠিক আছে আমার সামিনে আসলেই চেহারায় এক আকাশ সম তেজ আর অহংকার নিয়ে আসো। কেন? আমার সাথে এ বৈষম্য কেন? বলো???”
সোহানা নিজেকে সংযত করতে চায়। কণ্ঠনালীতে শক্ত কি যেন চেপে ধরেছে! কোন শব্দ উচ্চারিত হয় না।
মানুষটা একটা সময় তার বড়ো বোনের হাসবেন্ড হবে। আজকের বাক্য বিনিময়ের রেশ শেষ অব্দি থেকে যাবে। তাই সে চায় না লজ্জাজনক কোন পরিস্থিতি তৈরি হোক তাদের মধ্যে। একপাক্ষিক ভালোবাসা টা নিতান্তই তার থেকে। এটার প্রভাব কারো উপরেই পরা উচিত না৷
“হয়তো খেয়াল করি নি। কিছু মনে করবেন না ভাইয়া। সামনে খেয়াল রাখবো যেন কোন বেয়াদবি না হয়।”
আদনান মুখ দিয়ে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ বের করলো। তপ্ত শ্বাস নির্গমন করলো বড়ো করে। অসহ্য গলায় বলল,
“এগেইন! ফরমালিটিস কেন দেখাচ্ছো? হুয়াইইই? আগে তো এরকম ছিলো না? এখন কেন? আমি এরকম তোমাকে চাই না তো!” অনেকটা কথার পৃষ্ঠেই ভেতরের সুপ্ত অনুভূতি টুকু বেরিয়ে আসলো তার।
সোহানা তড়িৎ করে চাইলো আদনানের দিকে। মেয়েটার রক্তিম চোখ জোড়া কেন যেন হটাৎই টলটলে স্বচ্ছ দীঘিতে পরিনত হয়েছে। মন বাগানে ঝংকার তুলছে শেষাক্ত বাক্যটি। মুখ ফুটে একবার জিজ্ঞেস করতে মন চাইলো, আপনি আমায় চান?
কিন্তু মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো না। কিছুক্ষণের স্থীর দৃষ্টি নামিয়ে চলে গেলো হলের ভেতরে। আদনান থমকে রইলো কিয়ৎক্ষন । মেয়েটার দৃষ্টির প্রগাঢ়তায় কেমন ব্যাকুল হলো অন্তঃপুট।এই চোখজোড়া তাকে ভিন্ন সংকেত দিচ্ছে৷ ভালোবাসার মানুষের চোখের ভাষা বুঝার মতো আশ্চর্য সুন্দর এই ধরনীতে দুটো নেই। যেটা এখন সে অনুভব করছে।

আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কেন্দ্রে এসেছে মেহরাদ। দ্বীপ আদনান সহ ওদের কিছু ফ্রেন্ডস মিলে স্টুডেন্টদের সিগনেচার শীট চেক করার উদ্বেগ নিয়েছে। প্রথম পরিক্ষার দিন এক্সামিনার রা এলাউ না করলেও আজ মেহরাদ সোর্স খাটিয়ে অনুমতি আদায় করে নিয়েছে। পুরো কেন্দ্রে লোক রেখেছে। নিজে বসেছে কন্ট্রোল রুমে। শুভ্রতা তালুকদার নামখানা সকলের জিহ্বার ডগায় ডগায় ।
খুব সুক্ষ তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তায় পরিক্ষার শেষ সময়ের দিকে কন্ট্রোল রুমে বসে, মেহরাদ প্রত্যেকটা হলের সিসিটিভি তে নজর রেখে স্পিকারে এনাউন্সমেন্ট এর জন্য মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে নিলো। ভেতরে বাহিরে উপস্থিত সকলে শুধু এক প্রেমিক পুরুষের পাগলামি দেখছে। উৎকন্ঠা নিয়ে চেয়ে আছে সকলে। সকলের ভেতরে টান উচাটন, তীব্র উত্তেজনা। কি হতে চলেছে তা নিয়ে।

বোর্ড পরিক্ষার একটা কেন্দ্র! কয়েকটি কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী আজ এই মূহুর্তে সকলে স্বাক্ষী হবে এক উন্মাদ পুরুষের ব্যাকুলতায়। সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেহরাদ বলতে আরাম্ভ করল,
“মিসেস শুভ্রতা শায়ান তালুকদার ওয়াইফ অফ তাশদীদ মেহরাদ তালুকদার। আর ইয়্যু হিয়ারিং মি? আই নো ইয়্যু আর হিয়ারিং। টেক দিজ এজ আ ওয়ার্নিং ইয়া এডভাইজ, আমি তোকে যেকোনো মূল্যে খুঁজে বের করবো। আমার থেকে কোনদিন কোন ভাবেই পালিয়ে বচতে পারবি না তুই। পাতাল থেকে হলেও খুঁজে বের করবো এই ক্যম্পাস তো মামুলি কিছুই! নো ম্যাটার হাও, নো ম্যাটার হোয়াট ইট টেকস, নো ম্যাটার হোয়েন! এট দ্যা এন্ড অফ দ্যা ডেসটিনি ইয়্যু উইল বি বায় মাই সাইড। নোট মাই ওয়ার্ড, ইয়্যু বিলংস টু মি। জাস্ট টু মি! ” হিমালয়ের ন্যায় শীতল হুশিয়ারি কন্ঠঃস্বরটা হটাৎই বিধ্বস্ত হয়ে আসলো। হাড়ানো অনুভূতির ঝরে কেমন নুয়িয়ে এসে আবারও আওড়ালো,
“একটু ভাব আমার কথা? আমাদের কথা? তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো শুধুমাত্র তোর একটুখানি দর্শনের জন্য পুরো দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছি আমি। তোর বিরহ দাহে তৃষ্ণার্ত কাকের ন্যায় তড়পাচ্ছি । একটু তো রহম কর? একটা বার ফিরে আয়? আর কতটা কষ্ট পেতে দেখতে চাস তুই আমায়! কি করলে বুঝবি তোকে ছাড়া আমি মেহরাদের বাচা অসম্ভব? ”
প্রত্যেকটা হল রুমে যেন বিস্ফোরণ ঘটেছে। সকল পরিক্ষার্থীরা অতিশয় আশ্চর্যে কানাঘুষা শুরু করেছে। সোহানা, সামান্তা, আশিক আশ্চর্য ব্যাকুল দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে চাওয়া চায়ি করলো। হাহাকার বাড়লো মনে মেহরাদের জন্য। আবার,কেউ কেউ এদিক সেদিক তাকাচ্ছে কে এই শুভ্রতা ভেবে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো মূহুর্তেই। শিক্ষরা হুশিয়ারী দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিক্ষায় মননিবেশ করতে বললেন। স্টুডেন্টরা তবুও মনযোগ ধরে রাখতো পারলো না। উৎকন্ঠায় অস্থির। ইচরেপাকা কিছু মেয়ে তো ফিসফিসিয়ে বলেই বসলো, কোন মুরখ্য মেয়ে এরকম প্রেমিক পুরুষ ফেলে দূরে চলে গিয়েছে! ইশ, আমাদেরও যদি এরকম কেউ থাকতো! আমরাও তো এমন দিওয়ানা ডিজার্ভ করি। হায়য়য়য়!

কত কতো মেয়ের দীর্ঘশ্বাস পড়লো। শুধু একজন ব্যাতিত। যার চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু গড়াচ্ছে। কলম চাপা হাতটা থরথরিয়ে কাপছে অনবরত। মাস্কের আড়ালে ঠোঁট দুটো দাতে দংশন করে রেখেছে। কেটে রক্তপাত হওয়ার উপদ্রব।
এতো এতো ভালোবাসা একমাত্র শুভ্রতা নামক পাষাণীই দূরে ঠেলে দিতে পারে। দিলোও তাই। পরিক্ষার হল থেকে কয়েকবার আগেই বেরিয়ে যেতে চেয়েছে। শিক্ষক দেয় নি। একসাথে বের হতে বলেছে। তাই শেষ হওয়ার অপেক্ষায় চাতকের মতো বসে রইলো। কখন এখান থেকে ছুটে পালিয়ে যাবে তা ভেবে। ভেতরের হৃৎপিণ্ড ফেটে বেরিয়ে আসার যোগার ভয়, উৎকন্ঠা আর আক্ষেপের মিশলে। অশ্রুসিক্ত নয়নে কলম চালাচ্ছে খাতায়। কি লিখছে নিজেও জানে না। তবুও ভালো শেষ সময় চলে এসেছে! অন্তত পাশ তো করতে পারবে!

পরিক্ষা শেষ হওয়ার ঠিক পাচ মিনিট পর। যখন কিছু কিছু শিক্ষার্থী বেরিয়ে গিয়েছে অলরেডি খাতা জমা দিয়ে। শুভ্রতাও বেরিয়ে যাবে যাবে ভাব। তার ধারণা আজও মেহরাদে নাগালের বাইরে ধুলো দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে। সে সত্যিই কারো জীবনে বোঝা হতে চায় না। কারো দয়া দাক্ষিণ্য পেতে চায় না। তাই সকল অনূভুতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেই আগেকার মতোই চলে যেতে উদ্বদ্ধ হলো। কিন্তু তাকে পুরো পুরি ভুল প্রমানিত করে মেহরাদ সহ দ্বীপ আদনান ক্লাস রুমের সামনে এসে দাড়ালো। মেহরাদ ব্যাতিত তারা বাইরেই দাঁড়িয়ে রইলো।
আদনান, দ্বীপ দুশ্চিন্তায় অস্থির। সিগন্যাচার শীটে শুভ্রতার সাইন খুঁজে পেয়েছে তারা। আর সেটা এই এত নং রুমেরই। খুজে পেতে পেতেই এতটা লেট হয়েছে। যখন পেয়েছে দৌড়ে এসেছে। এটা ভিন্ন ভবন। এতো এতো পরিক্ষার্থীর সিগন্যাচার চেক করা চাট্টেখানি কথা না। তাই তো এনাউন্সমেন্ট সহ করলো। তবুও যদি কাজ হতো!
দৌড়ানোর তাড়নায় হাপাচ্ছে তারা। ইতিমধ্যে কয়েকজন বেরিয়ে যাওয়ায় বাহিরেও নজর রাখছে। কিন্তু মেহরাদ অবিচল, স্থীর। সিগনেচার খুঁজে পাওয়ার পর থেকে কেমন জড় বস্তুর ন্যায় স্থীর হয়ে আছে।! এ যেন ঝড় আসার পূর্ববর্তী কোন সংকেত। সকলের ভেতরে এক আতংক বিরাজমান।

শুভ্রতা সবে ফাইল হাতে বেঞ্চ থেকে উঠে ক্রাচ নিয়ে দাড়িয়েছিলো, মাথা তুলে শিক্ষকের পাশে শান্ত, স্থীর ভঙ্গিতে মেহরাদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ধপ করে বেঞ্চে বসে পরলো। ক্রাচ টা শব্দ করে ফ্লোরে পড়ে গিয়েছে। দু-চোখ আতংক, ভয়, বিস্ময়ের মিশলে বিস্ফোরিত। হৃদযন্ত্র খামচে উঠেছে অনাগত প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের আভাসে। প্রস্থর খন্ডের ন্যায় জমে গেছে সম্পূর্ণ অস্তিত্ব। মেহরাদের রক্তলাল চোখ দুটো যেন মেয়েটার শীর্নকায় তনুকে গ্রাস করে নিচ্ছে। কুকড়ে যাচ্ছে মেয়েটার সমগ্র সত্তা।
শুভ্রতা উঠতে পারলো না বেঞ্চ ছেড়ে। থরথর করে কাপছে মেয়েটার অস্তিত্ব। কি করবে বুঝতে পারছে না। ওর কল্পনা ঝল্পনার মধ্যেই ক্লাসরুম ফাঁকা হলো একে একে। শুভ্রতা অকূল দরিয়ায় ভাসতে থাকলো। সে কিছুতেই ধরা পরতে চায় না। এতদিনের দুঃখ কষ্ট সব কিছু বিফলে যাবে তাহলে। সেই অতীত আবারও ফিরে আসবে। অনাগ্রহ, লাঞ্চনা বঞ্চনা সব,সব, সব।
শুভ্রতা পরে যাওয়া ক্রাচটা নিয়ে আবারও দাড়ালো মাথা নত করে। তার ধারণা মেহরাদ এখানো চিনে নি। যদি কোন রকমে বেরিয়ে যেতে পারে! ভয়ে মেয়েটার মস্তিষ্ক কার্যক্রম হারিয়েছে। তা না হলে ওর এখনো কিভাবে মনে হয় মেহরাদ ওকে চিনতে পাড়েনি?
ভাগ্য আজ মেহরাদের সহায়। ওর স্থীর চোখ দুটো বাজপাখির মতোই শুভ্রতার ইতি উতি মাপছে। ডেস্কের সামনে দিয়ে কদম বাড়াতেই শুভ্রতার মনে হলো ও কোন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় হাটছে। পা দুটো থরথর করে কাপছে। যেন এই পড়ে যাবে।

নিজেকে সামলে শুভ্রতা দরজার কাছে যাওয়ার আগেই মেহরাদের শক্ত চোখের ইশারায় দ্বীপ দরজাটা সজোরে আটকে দিলো। শুভ্রতা ভয়ে চেচিয়ে উঠলো। আর কোন উপয়ান্তর নেই। ধরা পরে গিয়েছে সে। মস্তিষ্ক এ বার্তা গ্রহণ করতেই একযোগে আন্দোলন শুরু করলো হৃদযন্ত্র। কি করবে না করবে জপতে জপতে দিশেহারা হয়ে গেলো মেয়েটা। পরিক্ষার ফাইল পরে গেলো হাত থেকে। ভয়ে উৎকন্ঠায় মেয়েটা একনাগাড়ে দরজা ধাক্কানো শুরু করেছে। অস্থির চিত্তে দরজা খুলে দিতে বলছে।
কিন্তু আফসোস কিছুই হলো না। ওপাশ থেকে কোন টু শব্দও হলো না। মেয়েটা অস্থিরতা নিয়ে কেদে ফেললো শব্দ করে। টিপছাপ গড়নের শীর্নকায় তনু থরথরিয়ে কাপছে। পিছু ঘোরার সাহস অব্দি পাচ্ছে না। এতদিনের দুঃখ কষ্ট সংযম সব জলাঞ্জলি গেলো। যার থেকে পালিয়ে বেড়াতে চেয়েছে তার ঢেরাই আটকে পরেছে৷ এখন কি করবে সে? কে বাচাবে তাকে?

কাদতে কাদতে পরাশ্রিত সৈনিকের ন্যায় পিছু ঘুরলো শুভ্রতা। কান্নার তোপে নাজেহাল অবস্থা মেয়েটার। যা বুঝার বুঝে গিয়েছে মেয়েটা।বেঞ্চিতে পিঠ ঠেকিয়ে রোনাজারি করতে করতে মাস্ক সড়েছে মুখশ্রী থেকে। তবুও দু হাতে মুখ ঢাকায় সম্পূর্ণ চেহারা দেখলো না মেহরাদ। শান্ত, স্থীর, অবিচল ভঙ্গিতে শুধু কাঙ্খিত রমনীকেই দেখে যাচ্ছে। যেন কত যুগের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে! ক্রন্দনরত রমনীর উপস্থিতিও যেন হৃদয়ে হিমবাহের শীতল প্রবাহ বহিত হচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই মেয়েটার কর্মকান্ড মনে পরে ক্রোধান্বিত হলো মস্তিষ্ক। টগবগ করে উঠলো শিরা উপশীরা৷
মেহরাদের কোন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া না দেখে শুভ্রতার ভয়ের মাত্রা আরও বাড়লো। অপরাধী সিক্ত দৃষ্টি জোড়া তুলে সামনের লৌহ মানবের দিকে দাবিত করতেই মেয়েটার নিচের ঠোঁট আপনা-আপনিই ভেঙে আসলো।
ছোট্ট ফ্যাকাসে মুখাবয়বে এক ঢালা মায়া ঢেলে মেহরাদের নামটা মুখ ফুটে উচ্চারিত হওয়ার আগেই মেহরাদের ব্যাগ্র থাবার সাথে শক্তপোক্ত এক চপেটাঘাত আছরে পড়েছে হাড্ডিসার কপোলে। ব্যাথায় টনটন করে উঠলো মেয়েটার সমগ্র মুখশ্রী। ঝাঝিয়ে উঠেছে শ্রবণেন্দ্রিয়। ক্রাচ ব্যাতিত স্ব’স্থান হতে দেয়ালে আছরে পরার আগেই শক্ত পোক্ত এক থাবায় বন্দী হয়েছে নারীকায়া। অঝোরে কাদছে মেয়েটা। যেন এটাই প্রাপ্য ছিলো তার। মেনে নিয়েছে সে আঘাত। অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতেই কর্নপাত হলো মেহরাদের হিসহিসানি,

“এই থাপ্পড় টা কেন দিয়েছি জানিস? আমার থেকে লুকিয়ে বেড়ানোর জন্য। আমায় মৃত্যু শয্যায় রেখে চলে যাওয়ার জন্য। আমার সাথে ছলনা করার জন্য। তুই আমার থেকে গুনে গুনে ১১০ টা চড় ডিজার্ভ করিস। বিশ্বাস কর? ইচ্ছে করছে তোকে মেরে এখানেই কবর দিয়ে দেই। কিন্তু, আমি পাগল তোর মতো বেঈমান ব্যাতিত তো বাচবো না! আমার নিজের বাচার জন্য হলেও তোকে চাই। এই যে কাদছিস? রক্তক্ষরণ হচ্ছে ভেতরে। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। কি করে বুঝাই বল ঠিক কতটা তোকে আমি চাই? আর কি করার বাকি আছে আমার? এই এই এদিকে তাকা? তাকা এদিকে? ” শুভ্রতার চোয়াল চেপে নিজের দিকে ঘোরালো মেহরাদ ওঁকে। শুভ্রতার কান্না যেন ভেতরের দাউ দাউ আগুনের লেলিহানে কেরোসিন ডালছে। শক্ত হাতে চোয়াল চেপে হিসহিসিয়ে বললো,
“চুপ! চুপ! চুপ! একদম চুপ! নাটক করছিস? এই ক্রাচ, মাস্ক এ সকল বেশভূষা আমার চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য তাই না? পরিক্ষার হলে স্পিকারে শুনিসনি আমায়? তা-ও পালিয়ে যেতে চেয়েছিলি? এতটা অপছন্দ করিস আমায়? এতটা স্বার্থপর?”

শুভ্রতা স’জোড়ে এদিক সেদিক মাথা নাড়ালো। কাদা থামিয়ে কান্না গিলে বলল,
“আ…আমায় ক্ষমা করে দিন মেহরাদ ভাই। আ’ম সরিহ। খুব সরিহ হ্যাঁ? মাফ করে দিন প্লিজ?আমি চাইনি আপনার থেকে দূরে যেতে। বিশ্বাস….. ” বলতে বলতেই মেয়েটা হাত বাড়ালো মেহরাদকে ছোঁয়ার জন্য, কিন্তু এর আগেই মেহরাদ দূরে ছুড়ে ফেললো মেয়েটাকে৷
শুভ্রতাকে তার কাছে এখন মিথ্যেবাদী ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না। দপদপ করছে মস্তিষ্ক। চওড়া হাতে সাদা কাপড়ে মুড়ানো ব্যান্ডেজ লাল রূপ ধারণ করেছে। সেদিকে কোন খেয়াল নেই মানবের। নিজেকে কিছুতেই শান্ত রাখতে পারছে না। সবকিছু ভেঙে গুড়িয়ে দিতে মন চাচ্ছে। টগবগিয়ে উঠছে শিরা-উপশিরা। শ্রেনী কক্ষে একে একে সামনের সকল বেঞ্চ গুলোয় পদাঘাত করা শুরু করলো। ঝনঝন শব্দে মেতে উঠলো ক্লাসরুম। দেয়ালের হোয়াইট বোর্ডে ফাটল ধরিয়েছে তীব্র এক মুষ্ট্যাঘাতে৷ বাহিরে উপস্থিত সকলে আতংকিত।
শুভ্রতা পা টেনে উন্মাদ লোকটার কাছে পৌছালো। আকুতি মিনতি করে বলল,
“এমন করবেন না দয়া করে। থামুন এবার দয়া করে। আঘাত পাচ্ছেন তো? রক্ত ঝড়ছে। ”
মেহরাদ হিংস্রতার সাথে প্রতিউত্তর করলো তৎক্ষনাৎ,

“ওহ্ রেয়ালি? আমার আঘাত নিয়েও কেউ ভাবে? এইসব বা’ল কি আঘাত দিবে আমায়? হ্যাঁ, কি আঘাত দিবে? তুই তো ফাসির দড়িতে ঝুলিয়ে গিয়েছিলি? সেগুলো কিচ্ছু না?”
শুভ্রতা দেখল্ক হাত গলিয়ে তাজা রক্ত ঝড়ছে। মেয়েটা কান্নার বেগ বাড়িয়ে বলল,
“যা শাস্তি দেন মাথা পেতে নিবো। এবার থামুন দয়া করে? রক্ত ঝড়ছে তো? আর কষ্ট দিবেন না দয়া করে নিজেকে? এই যে আমি? আমায় মারুন? আমার উপরে রাগ ঝাড়ুন।”
মেহরাদ ইচ্ছে করে আরও ক্ষতবিক্ষত হাতে আঘাত করলো। বন্য সিংহের ন্যায় গর্জন করছে সে। গর্জন করে আওড়াচ্ছে, ‘দেশে আসার পর থেকে পুরো ৩৪ দিন বেচে থেকেও মরে ছিলাম আমি। ধারণা আছে এই ৩৪ দিনে ঠিক কত মিনিট কত সেকেন্ড হয়? কিভাবে শ্বাস নিয়েছি আমি? পুরো ৪৮,৯৬০ মিনিট ২,৯৩৭,৬০০ সেকেন্ড। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি। পাগলের মতো এদিক সেদিক খুজেছে। একেকটা দিন পার করা যেন জীবন মৃত্যুর লড়াই ছিলো। কত রাত কাটিয়েছি নিস্তব্ধ শহর চষে বেড়িয়ে। আমি কিভাবে বেচে ছিলাম?… ‘

একের পর এক তীব্র আঘাতে শক্ত দেয়ালে চিড় ধরার মতো অবস্থা। সম্পূর্ণ জায়গাটুকু রক্তে রঞ্জিত হয়ে গিয়েছে। চুয়িয়ে চুয়িয়ে পরছে রক্ত। শুভ্রতার কোন আহাজারি কর্নপাত করছে না লৌহ মানব। এযাত্রায় শুভ্রতা সকল ভয়, আতংক, আক্ষেপ, অপরাধবোধকে পায়ে ঠেলে ইস্পাত কঠিন অবয়বকে পিছন দিক থেকে আকরে ধরলো। জড়িয়ে ধরেই থরথর করে কেপে উঠলো মেয়েটা মানবের দেহের উষ্ণতায়। ঠিক কতো দিন পর এ নৈকট্য!
নিজের শক্তপোক্ত দেহের সাথে হালকা পলকা এক দেহের সংঘর্ষণে হুংকারের গতি কমে এসেছিলো উন্মাদ মানবের। তবুও এতো সহজে রাগ মিটার নয়। নিজের উপর অত্যাচার করা জাড়ি রেখেছে মানব। কিন্তু শুভ্রতাকে দূরে ঠেলে দেওয়ার কোন প্রয়াস দেখা গেলো না।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৯

শুভ্রতা সাহস জুগিয়ে পা টেনে সামনে পৌছালো। মেহরাদ আর দেয়ালের মধ্যবর্তী বাধা হয়ে দাড়ালো সে। ঝড়েরবেগে দেয়ালের উদ্দেশ্যে ছুটে আসা মুষ্ঠ্যাঘাতে ব্রেক কষেছে মানব। শংকায় চোখমুখ খিচে নিয়ে ছিলো মেয়েটা। এই বুঝি তীব্র এক আঘাতের সম্মুখীন হবে সে। কিন্তু সেরকম কিছুই না হওয়ায় অশ্রুসিক্ত নয়ন জোড়া খুলেই সামনের ইস্পাত কঠিন মানবের রক্তাক্ত হাতের অস্তিত্বর দেখা মিললো। হিসহিসানি ধ্বনির সাথে গরম ভারী নিশ্বাসের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বাঘের ন্যায় ফুসছে মানব। ক্ষতবিক্ষত হাত থেকে চুয়িয়ে চুয়িয়ে পড়া রক্ত তার সাদা স্কার্ফের রঙ পরিবর্তন করে দিয়েছে। মুষ্ঠি টা ঠিক মেয়েটার মুখশ্রী বরাবর থামা। কাঁপছে অনবরত তা, নিজের শক্তি প্রয়োগের ব্যার্থতায়।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫১