হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৯
সাঞ্জেনা শাজ
শুভ্রতাদের পরিক্ষার কেন্দ্র পরেছে কলেজ থেকে কিছুটা দূরে ভিন্ন কলেজে। দূরত্ব আনুমানিক আধা ঘণ্টা হবে হয়তো! তবুও অসংখ্য ছাত্র ছাত্রীদের ভীর হবে। কে আগে যাবে, কোথায় সিট পড়ছে সেই নিয়ে তুমুল দুশ্চিন্তা।
হসপিটাল থেকে ফিরে ঔষধ খাওয়ার পর পা’য়ের ব্যাথা টা কমেছে সোহানার। কিন্তু মেয়েটা সেই যে হাসপাতাল থেকে আসার পর ফুপিয়ে ফুপিয়ে থেমে থেমে কান্না শুরু করেছে! প্রেম বিরহে, বোন নামক বেস্ট ফ্রেন্ডের অনপুস্থিতে মেয়েটার বুক ফেটে চৌচির। ক্ষনে ক্ষনে হাসপাতালের সেই চোখ দুটোর কথা মনে করে কাদছে। চোখ দুটো ফোলে আছে। সকলে ভাবছে হয়তো ব্যাথায় কাদছে, কিন্তু কেউ তো আর মনের গোপন বিরহ জানে না। এই বিরহী মন নিয়েই মেয়েটা রাতে একটু আকটু পড়েছে। সকালে একটু পড়াগুলো রিভাইস দিয়ে রেডি হয়ে নিচে নেমেছে।
সে জানে আজকের দিনটা তার ভাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোন ভাবে মেয়েটার খোজ পায় পরিক্ষার উছিলায়! এ দিনটার জন্যই তো কতো জল্পনা কল্পনা করে রেখেছে ভাইয়া! সে তো দেখলো গতকালের উন্মাদনা তার ভাইয়ের। সারা রাতের অস্থির পাইচারি।
সোহানা যখন নিচে নামলো দেখলো শান্তা রেডি হয়ে বসে আছে তার জন্য। তার সাথে যাবে। তার বাবা, বড়ো বাবাও অপেক্ষাকৃত তার জন্য। তাদের দেখে সে ঠোঁটের কিনারে হাসি টানলো। তারা এগিয়ে এসে একে একে মাথায় হাত ভুলিয়ে দোয়া করলেন ওর জন্য। শুভ্রতার কথা একটি বারও কারো মুখে শুনা গেলো না। মানুষ বরাবরই স্বার্থপর, যখন সে নিজের দিকটা প্রাধান্য দেয়।
একটু পর গাড়ি করে বের হয়ে গেলো দু’বোন সহ ওদের বাবা। মেহরাদ আজ সকাল থেকেই বাসায় অনপুস্থিত। জানা কথা কোথায় আছে। ওদের সাবধানে আসতে বলে সে আগেই বিদায় নিয়েছে।
দশটায় পরিক্ষা শুরু। কলেজের ৪ তলা ভবনে সিট পড়েছে সোহানাদের। মেহরাদ এসেই ওদের সকল সিট টিট বের করেছে। শুভ্রতা সোহানার পাশাপাশি রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার ছিলো, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে সেই সিট টি খালি। কোথাও সেই নাম্বারের সিট পাওয়া যায় নি।
পুরো কলেজ লোক দিয়ে তন্নতন্ন করে ফেলেও কোথাও সে সিটের হদিশ পায়নি সে। এতো দিনের প্ল্যান পরিকল্পনা সব একে একে চোখের সামনে ইউজলেস হতে দেখে মেহরাদের পাগলপাড়ার মতো অবস্থা। ঘারের রগ কটমট করছে। ক্রোদান্বিত চোয়াল হয়ে আছে ইস্পাত কঠিন। চোখ দুটো হয়ে আছে অস্বাভাবিক লাল। একের পক এক লোকদের সাথে যোগাযোগ করছে। হুংকার ছাড়ছে। ওর বন্ধু কায়েসের সাথে কথা বলে কলেজের গেটে ডিউটিরত পুলিশদের নজরদারিতে রাখতে বলেছে। বলিষ্ঠ হাত দুটো থরথর করে কাপছে মাত্রাতিরিক্ত প্রেশারে।
সোহানারা কেন্দ্রে এসে নামতেই আলতাফ তালুকদার মেয়ের মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে, কিছু পরামর্শ দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। শান্তা আর সোহানা দাঁড়িয়ে সামনে এগুনোর আগে কোথা থেকে যেন আদনান এসেছে। ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে। শান্তা কিছুটা অস্বস্তিতে পরলো, আর সোহানা পুরোপুরি মূর্তি বনে গিয়েছে। আদনান এগিয়ে এসেই শান্তার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলো,
“হাত ভালো হয়েছে?”
শান্তা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। সোহানার এখান থেকে ছুটে কোথাও পালিয়ে যেতে মন চাইলো। বিষাদময় অনুভূতির প্রলয়োচ্ছ্বাসে সম্পূর্ণ মুখশ্রী রক্তবর্ন ধারণ করেছে। চোখের নোনাপানি এড়াতে হাতের ফাইলটায় অযথাই এটা সেটা চেক করা শুরু করলো।
আদনান সোহানার দিকে তাকালো। সব ফেলে মেয়েটার জন্যই এখানে এসেছে। কেন এসেছে তা অজানা। শুধু মনে হলো তার বিশাল কোন দায়িত্ব রয়েছে মেয়েটাকে পরিক্ষার আগে একটু চিয়ার আপ করার। দায়িত্বের ভারে মেহরাদের অনপুস্থিতে মেয়েটার সাথে আগের মতো ততো খুনসুটি হয় নি। কথা কাটাকাটি হয়নি। মনে হয় এতে যেন দূরত্ব বেড়েছে অনেকটা। মেয়েটার চোখে সে মূল্যহীন। তবুও হেসে জিজ্ঞেস করলো,
“কি ব্যাপার পড়া চোর ? পরিক্ষার প্রিপারেশন কেমন? পড়েছো নাকি এখনও পড়া চুরি করে এসেছ? দেখো, নকল টকল করো না কিন্তু? ধরতে পারলে আমাদের মান সম্মান ডুবাবে। ”
সোহানার টুপ করে এক চোখের জল গড়িয়ে পরলো। চারদিকে স্টুডেন্ট অবিভাবকদের ভীর। তৎক্ষনাৎ ঘুরে দাড়িয়ে চোখের জল আড়াল করলো মেয়েটা। মাথা নিচু করেই দৃষ্টি ফাইলের দিকে রেখে জানালো,
“ডুববে না। ”
ভীরের হট্টগোলে ওর কান্না মিশ্রিত কন্ঠ ওঁরা কেউ বুঝলো না। একটু পরেই সামান্তা আশিক এসে সোহানার সাথে দাড়ালো। ওদের অবিভাবকও এসেছে। সোহানার পা’য়ের অবস্থার কথা জানে তারা। চারদিকের শব্দে সামান্তা কিছুটা গলা উচিয়েই জিজ্ঞেস করলো,
“পা’য়ের কি অবস্থা এখন? দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধে হচ্ছে? উপরে যেতে পারবি তো?”
আদনানের টনক নড়লো। এতক্ষণ খেয়াল করে নি সে। এখন খেয়াল করে দেখলো মেয়েটা এক পা কিছুটা আলগা করে দাঁড়িয়ে। পা’য়ের জুতোটাও কেমন করে যেন পড়া। তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে ভালো করে দেখে হতবুদ্ধর ন্যায় হয়ে গেলো। পা’টার কি অবস্থা! অস্থিরচিত্তে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা কি হয়েছে? কবে হলো? কিভাবে হলো?”
সোহানার গলা ধরে আসছে যেন। ঢোক চাপলো বহু কষ্টে। অভিমানী চোখ দুটো আর উঠায় নি মেয়েটা। তার এ অভিমান নিছকই ছেলেমানুষী। বৃথা, মূল্যহীন। সামান্তার হাত ধরে বললো,
“কিছু হয় নি। এই তো অল্প…”
তারপর শান্তার উদ্দেশ্যে বলল, “আমি হলে চলে যাই আপু। দেখি যেতে যেতে ভাইয়াকে দেখি কি-না। আসছি।”
মেয়েটা আর এক দন্ডও দাড়ালো না। ছোট ছোট পা ফেলে স্থান ত্যাগ করলো ওঁদের সাথে। যেতে যেতে ওরাও পরিক্ষার জন্য দোয়া চেয়ে গেলো শান্তা আর আদনান থেকে। আদনান তখনো হতভম্ব। তার ভিতরটা শিউরে উঠছে। আহামরি ক্ষত যে তা না। কিন্তু মেয়েটার এতটুকু কষ্ট, এ বিষয়টাই তার ভিতরে তোলপাড় করছে।
শান্তাজে অস্থিরচিত্তে জিজ্ঞেস করলো,
“কখন হলো এটা? আমি একটু জানলাম না? এতটা ক্যায়ারলেস মেয়েটা….”
“আপনারা সেদিন আসলেন না? ওই যে হাত কেটে গেলো আমার? তখনিই ওর-ও পা পুড়ে গিয়েছিলো গরম চা’তে। আমরা কেউ জানতাম না জানেন? মেয়েটা কাউকে জানায়নি। গতকাল সকালে জেনেছি, ও তখন জ্বরে বেহুশ ছিলো। তারপর ভাইয়াই তো নিয়ে গিয়ে ডক্টর দেখিয়ে আনলো। ”
আদনান কপালে আঙুল ঘষলো। হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম বেগতিক। নিজেকে নিজে বলল,
“আমি থাকতে হয়েছে? আমি জানলাম না? একটু দেখলামও না? মেয়েটা এতো কষ্ট পেলো? কতটা গুরত্বহীন আমি হ্যাঁ? এখনও একটু প্রয়োজন মনে করলো না আমায় বলার! অথচ আমি মেয়েটাকে নিয়ে কত কিছু ভেবে বসেছি। কতটা মূল্যহীন আমি, হ্যাঁ? ”
কলেজের ভিতরে ঢুকে মেহরাদের দেখা পেলো সোহানা। মনটা আমাণীষায় ছেয়ে গেলো মেয়েটার। তার ভাইটাকে কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো দেখা যাচ্ছে! সেই সকাল থেকে এখানে। নিশ্চয়ই আবারও ব্যার্থ হয়েছে! যে নিজ থেকে হাড়িয়ে যায় তাকে কি অতি সহজে পাওয়া যায়! তার ভাইটার পাগলপাড়ার মতো অবস্থা দেখলে, পৃথিবীর সকল রাগ শুভ্রতা নামক মেয়েটার উপর জমে সোহানার। মেয়েটাকে মিরাক্কেলের মতো খুঁজে এনে তার ভাইয়ের কাছে এনে দিতে মন চায়।
সোহানাকে দেখে দৃষ্টি নরম হলো কিছুটা মেহরাদের। এগিয়ে গিয়ে ওর সামনে দাড়াতেই সামান্তা ওরা কুশলাদি করে পরিক্ষার জন্য দোয়া চাইলো। মেহরাদ ওঁদের সাথে একটু কথা বলে কত নং হল আর কোথায় সিট পরেছে তা জানিয়ে দিলো ওদের। ওঁরা সামনে এগলো সোহানাকে রেখে। সোহানার এক হাত ধরলো মেহরাদ। উদ্দেশ্য হলে নিয়ে যাবে। কিন্তু সোহানা দাঁড়িয়ে রইলো। ভাইয়ার রক্ত লাল চোখ দুটোর দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
“খোঁজে পাওনি না ভাইয়া? আর কতো খুজবে ভাইয়া? নিজেকে একটু রেহাই দাও না? তুমি..তুমি… ” কেদে ফেললো মেয়েটা।
মেহরাদ চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। অস্বাভাবিক রকম হ্যাং করছে মাথা। মনে হচ্ছে ব্ল্যাংক আউট হয়ে যাবে। তবুও সোহানাকে বলল,
“শেষ শক্তি অব্দি খুজে যাবো ওঁকে। শেষ নিঃশ্বাস অব্দি শুধুমাত্র ওকেই চেয়ে যাবো। সোনাতেও খাদ থাকে, কিন্তু আমার ভালোবাসায় কোন খাদ রাখিনি আমি। উপর ওয়ালা একদিন ঠিক এহসান করবেন। ‘ একটু থেমে সোহানার উদ্দেশ্য বলল,
“তুই এসব নিয়ে ভাবিস না। ভালো ভাবে পরিক্ষা দিস। ”
ওঁকে রেখে আসলো রুমে।
এদিকে শুভ্রতার বাবা কারসাজি করেছে। নিজের কিছুটা পুরনো ক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে। যে চাকরি তার জীবনের সব কেড়ে নিয়েছে। সন্তান কেড়ে নিয়েছে। তার দারস্থ জীবনে দ্বিতীয় বার না হওয়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েও তার দারস্থ হয়েছে মেয়ের জন্য। ক্ষমতা খাটিয়ে মেয়েকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গায় পরিক্ষার ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন। শুভ্রতার পা’য়ের সমস্যাটার কারণেই সব কিছু আরও ইজি হয়েছে। পরিচিত কেউ তাকে চিনতে না পারার জন্য ড্রেসের সাথে মাস্ক সহ ক্রাচ নিয়েছে পা’য়ের জন্য। চশমাও এটেছে ভাসা ভাসা চোখ দুটোও। এমনিতেও মাথা ব্যাথার জন্য ডক্টর চশমা সাজেস্ট করেছে সেই কবেই। সব সময় ক্রাচের প্রয়োজন না হলেও এখন ব্যাবহার করছে নিজেকে আড়াল করতে।
যাদের থেকে নিজেকে দূরেই সড়িয়ে নিয়েছে তাদের থেকে যেকোনো মূল্যেই সে আড়ালে থাকতে চায়। কি দরকার নতুন করে কষ্ট কুড়ানোর? পুরনো স্মৃতি নিয়েই সে না-হয় বেচে যাবে!
পরিক্ষা শেষ হয়ে সকল ছাত্র ছাত্রী বাড়িতে চলে গিয়েছে। কলেজ ফাঁকা। সকল হল ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। কিন্তু মেহরাদ আছে। রয়ে গিয়েছে সে। গাড়ির মধ্যে মাথা হেলিয়ে এখনও সেই কলেজের সামনে সে। ক্রমান্বয়ে মাথাটা ছুড়ে ফেলছে পিছনের সিটের গা’য়ে। চোখ দুটো নির্জিব দৃষ্টিতে তাকিতে উপরের দিকে। ভিতরের সমস্ত অনুভূতি যেন ভোতা হয়ে আছে। কারো বিরহে,দগদগে আগুন জ্বলিছে তৃষ্ণার্ত বুকটায়। ভিতরের সমস্ত কিছু ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
শূন্য অনূভুতিরও যে এতটা ওজন মেহরাদকে না দেখলে বোধহয় কখনোই বোঝা যেতো না। ভিতরের ভারী যন্ত্রনাকে সে প্রকাশে অপারগ বর্তমানে। কেমন পাথরের মূর্তির ন্যায় হয়ে আছে। কিন্তু ভিতরটা জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্বলে জ্বলে উঠছে। এই অনুভূতিগুলো কে মেহরাদ ধামাচাপা দিতে চায়। যেকোনো মূল্যে উগরে দিতে চায় ভেতর থেকে। এগুলো তাকে পুড়িয়ে রাখ করে দিচ্ছে।
গাড়ি স্টার্ট দিলো মেহরাদ। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় গাড়ি চালিয়ে নিভির এক জায়গায় এসে থামালো গাড়ি। শুভ্রতাকে নিয়ে এসেছিলো একবার গাড়ি করে এ জায়গায়। তা-ও মেয়েটার উপর রেগেই। মেয়েটা এতো পোড়ায়, এতো রাগায় তাকে!
আহহহহ্! আবার সেই স্মৃতি! সেই অনুভূতি! মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রগুলো একযোগে আন্দোলন করছে যেন তাকে উচ্ছন্নে যেতে। টগবগ করছে রক্ত কনিকারা। মাথা চেপে ধরলো মেহরাদ। কোন উচ্চশব্দ করলো না। সন্তপর্ণে গাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়ির লুকিং গ্লাসটা এক মুষ্ট্যাঘাতে ভেঙে গুড়িয়ে গিলো। সাথে সাথেই ভিপ ভিপ করে উঠলো গাড়িটি। গলগলিয়ে রক্ত ঝড়ছে হাত থেকে।
অনুভূতিরা তখন পাথর হয়ে বুকে চেপে আছে। হাতের ব্যাথা কোন প্রভাবই ফেললো বেহায়া হৃদযন্ত্রটার উপর। সে এখনো সেই বেঈমান নারীর নামই জপে যাচ্ছে।
ক্ষতবিক্ষত হাত দ্বারা আরেক মুষ্ট্যাঘাত ছুড়লো গাড়ির জানালায় এবারও ঝড়ো অনুভূতির কোন পালাবদল হলো না। শুভ্রতা নামক রমনীর বিরহ শোকে তারা এখনো কাতর। ক্ষত বিক্ষত হাতের যন্ত্রণা সেখানে এখনও কড়া নাড়াতে পারেনি।
দু-হাতে চুল গুলো অতি স্বাভাবিক ভাবে পিছনের দিকে ঠেলে দিলো মেহরাদ। এ স্বাভাবিকতায় ভয়, উন্মাদ বনে যাওয়ার ভয়। নির্লিপ্ত অভিব্যাক্তিতে আবারও গাড়ির দরজা খুলে সিগারেটের বক্সটা নিলো লাইটার সহ।
সিগার নাকি সকল বিষাক্ত অনুভূতি শুষে নেয়? মেহরাদ ভাইও বুঝি এখন এ পন্থাই অবলম্বন করবে? উঁহু, তা হলো না।
মেহরাদ ভাই তো যে সে প্রেমিক নয়! সকল গতি ধারার বাইরে তার ভালোবাসা,তাই তার কষ্টের মাত্রাও আমাদের কল্পনার বাইরে।
এই যে মেহরাদ একে একে সকল সিগার গুলো বক্স থেকে বের এক সাথে লাইটার দ্বারা জ্বালিয়ে দিলো, জ্বলন্ত সিগারেট গুলো ক্ষতবিক্ষত হাতের মুঠোয় চেপে ধরলো,, এটা কি কখনো কল্পনীয়! উঁহু, কখনোই না।
হাত থেকে টপটপিয়ে রক্ত ঝড়ছে আবার সে হাতই পুড়ে মংশপেশি উন্মুক্ত হচ্ছে। অথচ, মানব কতো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে আছে। চেহারার অভিব্যক্তি তখনো শূন্যের কোঠায়।
কোথা থেকে যেন মেহরাদের এসিস্ট্যান্ট রাসেল সাহেব ছুটে আসলেন। চিৎকার করে হাত ঝাকালেন। কুন্ডলী পাকিয়ে মুষ্টি থেকে বের হওয়া ধোয়া গুলো থেকে উটকো গন্ধ্যে চারিপাশ ভারী হয়ে আসছে। নাক মুখ উগরে বমি বের হওয়ার কথা মানবের তাজা মাংশপেশি পুড়ে ছাই হওয়ার গন্ধ্যে ।
এসিস্ট্যান্ট সাহেব আহাজারি করেও টলাতে পারেনি ওকে। মেহরাদের অনুভূতিহীন শীতল চাহনির শিকার হয়েছে উল্টো। রাসেল সাহেব হায় হায় করে কেঁদে উঠলেন। বড়ো স্যার হন্যে হয়ে পাঠিয়েছে তাকে ছেলের খুঁজে। আর তার ছেলে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে এভাবে, এ-ও তার সামনে! তাকে ফাসির দড়িতে ঝুলিয়ে দিবে নির্ঘাত এই মূহুর্তে আটকাতে না পারলে।
সে অপারগ হয়ে আদনানকে কল করলো। ঝড়ের বেগে আদনাব হাজির হয়েছে সেখানে মিনিট দশের মধ্যে, বাইক নিয়ে। ততক্ষণে সিগারেট পুড়ে ছাই। সেই সাথে মানবের হাত ও।
আদনান হাতের করুন এ দুর্দশা দেখে চিৎকার করে ক্ষোভে ফেটে পরলো,
“পাগল হয়ে গিয়েছেস? কি করেছিস এটা? এভাবে তিলে তিলে নিজেকে শেষ না করে একবারে ম/রে যা? এটাকে কেউ বাচা বলে? ফিরে এসেছিলি কেন? কেন এসেছিলে? একবার মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে আবার সেই যন্ত্রণা ফিরছিস কেনো? একেবারেই গ্রহন করে নিতি?”
মেহরাদ তাকালো বড্ড নির্লিপ্ত চোখে। পুড়ে যাওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন। তারপর আদনানের দিকে তাকিয়ে অনুভূতিহীন কন্ঠে শুধালো,
“এটা কি বেশি পুড়েছে? তেমন কিছুই তো মনে হচ্ছে না?”
আদনান চেচিয়ে উঠলো,
“বেশি পুড়ে নি? ঝলসে গিয়েছে পুরো হাত। তাকানো যাচ্ছে না। কি করেছিস এটা?”
“কি জানি! এর থেকেও বেশি পুড়া এই যে এ খানটা।” হাত দ্বারা বুকের বা পাশটা দেখালো ও। আবারও বলল, “কি বিশ্রি যন্ত্রণা এখানটায় জানিস? এর কাছে এ হাত নিতান্তই তুচ্ছ আদনান। ইমেজিন, আমি ঠিক কি ভাবে বেচে আছি! এক্সিডেন্ট এর যন্ত্রনা আমার মনে নেই আদনান। কতসব মেডিসিন ছিলো তা কমানোর! জ্ঞানহীন ছিলাম তো! কিন্তু এ যন্ত্রণা কমানোর কোন মেডিসিন নেই রে। হুশ আছে, জ্ঞান আছে, যন্ত্রনা আছে কিন্তু কোন পথ্য নেই। এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার মানুষটা নেই। আমি বোধহয় ওর জন্য মরতে মরতে বেচে এসেছিলাম, আদনান। তা না হলে, ও ব্যাতিত মৃত্যু এখন আমার কাছে খুব কাছের কিছুই মনে হয়। আপন আপন মনে হয়। ”
আদনান সহ্য করতে পারলো না আর। নিজেই কেদে ফেললো বন্ধুর এ ভঙ্গুর কন্ঠ শুনে। কোন সান্তনা বানী আওড়াতে পারলো না। এর আগেই ফের ধ্বনিত হলো অভিমানী কন্ঠঃ,
“আমার এখনো মনে পরে, এক্সিডেন্ট এর সময়কার কথা। ও আমায় ছেড়ে যেতে চায়নি। জোড় করে থেকে গিয়েছিলো আমার বাহু আঁকড়ে। কতো ঠেলে সড়াতে চেয়েছি গাড়ি থেকে নামিয়ে দিতে চেয়েছি! তবুও যায় নি। সেই মেয়েটা কিভাবে আমার দুর্দিনে ফেলে চলে গিয়েছে! আমার বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হয় রে। এখানটা দ্বীখন্ডিত হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য ঠেকে সব। আমি এখনও স্বপ্ন বুনি, এসব মিথ্যে। ওঁকে পেলে ও ক্ষমা চেয়ে নিবে আমার কাছে। আমি সেই আগেকার মতো ওঁকে রাগ টাগ দেখিয়ে বুকে আগলে নিবো আবার। কিন্তু ও? ও বার বার আমায় ভেঙে দিচ্ছে। পুড়িয়ে মা’রছে। ও কিভাবে পারলো নিজেকে এতটা আড়াল করে নিতে আমার থেকে? আমি বেচে আছি না-কি ম/রে গিয়েছি ও বোধহয় সেটাও জানতে কারো সাথে যোগাযোগ করে নি। মানুষ কতটা বেঈমান হয়!”
দুপাশে অনবরত মাথা নাড়ালো মেহরাদ। যেন কোন ভ্রম থেকে মুক্তি পেতে চাইছে। আচমকাই এক হাতে ভ্রু চুলকে আরেকটা সিগারের প্যাকেট থেকে সিগার নিলো। লাইটার টা একটু দূরে। রাসেল সাহেবের দিকে তাকাতেই তিনি অশ্রুসিক্ত চোখেই দ্রুত কর্মঠ পায়ে এগিয়ে এসে লাইটার টা এগিয়ে দিলো। মেহরাদ সুস্থ হাতটা দিয়েই ঠোঁটের ভাজে সিগারেট গুজে লাইটার জ্বালিয়ে নিলো। সিগারেট ধরিয়ে নাকে মুখে ধোঁয়া ছাড়লো। এতক্ষনের নরম সত্তা যেনো কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়ার সাথেই ভিতর থেকে টেনে হিচরে বের করে দিয়েছে৷ অতি শান্ত শীতল গলায় ধ্বনিত হলো তার একেকটা ভয়ংকর হুশিয়ার বানী,
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৮ (২)
“ও যদি বেচে থাকে,আমি মেহরাদ ওঁকে পাতাল থেকেও খুজে বের করবো, সেটা আজ না-হোক কাল করবোই! এন্ড দ্যান? গ্যাস হোয়াট? আমি যতটা রাস্তার কুকুরের মতো ঘুরছি ওঁকেও এর চাইতে বেশি ঘুরাবো। একবার না হাজার বার ভাঙ্গবো হাজার বার গড়বো। এই আমি যতটা পুড়িয়েছে এর চাইতে বেশি পুড়াবো। এতো সাধু পুরুষ আমি নই যে প্রতিবার গলে গলে পড়বো। আর ভালোবাসা? ওটা চৌ ডাবল আদায় করে নিবো। ভালো হলে, মাথায় করে রাখবো না-হয় বন্দী করে রাখবো। যেই দু’হাতে পেলে পুষে বড় করেছি, ওই দু’হাতে কবরও খুড়তে পারবো। ওঁকে আমার চাই-ই৷ বায় হুক ওর বায় ক্রুক!”
