Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৪১

মহামায়া পর্ব ৪১

মহামায়া পর্ব ৪১
তুশকন্যা

চোখ-মুখ চুপসে একরাশ বিষণ্ণতা নিয়ে বাড়ি ফিরল আনায়া। সদর দরজা দিয়ে ঢোকার পর থেকেই তার ঠোঁটে কোনো কথা নেই, যেন মৌনতার এক শক্ত দেয়াল তুলে দিয়েছে নিজের চারপাশে। আইজেল আর সাবা আড়চোখে তাকে কয়েকবার দেখল, কিন্তু আদতে ওর মনে কী চলছে বা বাইরে ঠিক কী ঘটেছে, তা তারা কিছুতেই আন্দাজ করতে পারল না।

​রাতের খাবারের ঠিক আগের মূহুর্তে ড্রয়িং রুমের পরিবেশটা বেশ থমথমে। সবাই চুপচাপ বসে আছে যার যার মতো। সাবার পুরো মনোযোগ তার ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনে; আঙুলগুলো দ্রুতগতিতে কি-বোর্ডে চলছে। আইজেল নিবিষ্ট মনে কিছু জরুরি কাগজপত্র গুছিয়ে ফাইলবন্দি করছে।
অন্যদিকে আনায়া সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে একের পর এক খাবারের রিলস স্ক্রল করে যাচ্ছে। যদিও রিলসের সেই চটকদার দৃশ্য বা শব্দের সাথে তার মনের কোনো সংযোগ নেই; সে কেবল যান্ত্রিকভাবে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছে, তার শূন্য দৃষ্টি পড়ে আছে ফোনের ওপারে অন্য কোনো অজানায়।
​নীরবতা ভাঙতে আইজেল আর সাবা কাজের ফাঁকে ফাঁকে ব্ল্যাডেন হেলের কিছু গল্প শুরু করল। হেলের জীবনের অদ্ভুত সব রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে কথা বলতে বলতে তারা দুজনেই বেশ হাসাহাসি করছিল। পরিবেশটা যখন কিছুটা হালকা হয়ে এসেছে, ঠিক তখনই মিউজিকের প্রসঙ্গ উঠল। আইজেল হুট করেই আনায়ার দিকে তাকিয়ে বেশ উৎসাহের সাথে বলে উঠল—

​”হেই আনায়া, আমাদের মিউজিক আইকন তো ভিকে, তোমার পছন্দেরটা কে?”
​হুট করে ধেঁয়ে আসা এমন প্রশ্নে আনায়া ভ্রু কুঁচকে ফেলল। সারাক্ষণ ঐ লোকটাকে নিয়ে তাদের এতো মাতামাতি কেনো যেন সহ্য হলো না। অন্তত এই মূহুর্তের জন্য না। সে ফোন থেকে নজর সরিয়ে, নির্বিকার ভঙ্গিতে খানিকটা তিক্ততা নিয়ে বলে উঠল,
​”কিসের রকস্টার ভিকে! আমি তো দেব-দার পাগলু ফ্যান, ঝিংকু তারা।”
​আনায়ার মুখে এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ উত্তর শুনে আইজেল আর সাবা দুজনেই থমকে গেল। আইজেল পাকিস্তানি হওয়ায় সে কিছুটা বিভ্রান্ত; ‘দেব’ বা ‘পাগলু’ শব্দগুলো তার কাছে ঠিক পরিষ্কার নয়। ওদিকে সাবা কিছুটা অবাক এবং বিরক্ত হয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
​”এই দেব-দা টা আবার কে? ওই যে ছোটবেলায় বিয়ে-শাদিতে যার গান বাজিয়ে সবাই নাচানাচি করত… ইয়্যুউউ! তুই কি এখনো ওইসব বাংলা গানের কথা বলছিস?”
​আনায়ার বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছাল। সাবার এই উন্নাসিকতা তার একদমই সহ্য হলো না। সে দাঁতে দাঁত চিবিয়ে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,

​”তা তোমার ওই রকস্টার ভিকে কি উগান্ডার ভাষায় গান গায় শুনি?…আর তুই নিজেও তো বাংলাতেই কথা বলিস, সবসময় এতো ঢং করিস কেন তবে?”
​আনায়ার মেজাজ এখন রীতিমতো অগ্নিশর্মা। সাবা পাল্টা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই পাশ থেকে আইজেল পরিস্থিতি সামাল দিতে হাত উঁচিয়ে বাঁধা দিল। সে শান্ত স্বরে বলল—
​”আরে আরে সবাই চুপ করো তো! আর আনায়া, তোমার কী হয়েছে বলো তো? তুমি বাড়ি ফেরার পর থেকেই দেখছি তোমার মেজাজটা খিটখিটে হয়ে আছে। সকালেও তো সব ঠিকঠাক ছিল।”
​আনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। তার ভেতরে বয়ে যাওয়া ঝড়টা বাইরের কাউকে সে দেখাতে চায় না। সে সংক্ষেপে উত্তর দিল,
​”কিছু না। আমি ঘুমাতে চললাম।”
​কথাটা বলেই সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আইজেল কিছুটা বিচলিত হয়ে ডাকল,
​”এখনই ঘুমাবে? রাতে ডিনার করবে না?”
​”না, আজ আর মুড নেই।”
​পেছন ফিরে আর তাকাল না সে। গজগজ করতে করতে দোতলায় নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আইজেল আর সাবার এই ভিকে নিয়ে আদিখ্যেতা তার সহ্যশক্তির বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে এই মুহূর্তে, যখন সে নিজের ভেতরেই অস্থির, তখন এই নামটা তার কানে বিষাক্ত কাঁটার মতো বিঁধছে।

নিজের ঘরে প্রবেশ করেই আনায়া সজোরে দরজাটা আটকে দিল। বাইরের সেই মেকি চঞ্চলতা কিংবা অস্থিরতা মুহূর্তেই উবে গিয়ে তার চোখেমুখে এখন এক পাথুরে গাম্ভীর্য নেমে এলো। ফোনটা বিছানায় একপাশে ছুঁড়ে ফেলে সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বিছানার ওপর রাখা বিশাল আকারের তিনটি পুতুলের(রেড) দিকে।
ওই নিষ্প্রাণ বস্তুগুলোর দিকে তাকিয়ে তার ভেতরের সুপ্ত রোষ যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। পরক্ষণেই সে ক্ষিপ্ত পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল এবং সজোরে পুতুলগুলোকে এদিক-ওদিক ছিটিয়ে ফেলে দিল। ঘরজুড়ে এখন এক বিশৃঙ্খল নিস্তব্ধতা।
​আনায়া বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দিল। বুকের ভেতরটা তীব্র এক হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। কখনো ইচ্ছে করছে গলার সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করতে, আবার কখনো মনে হচ্ছে ফুঁপিয়ে কেঁদে বুকটা হালকা করতে। কিন্তু কোনোটা করার শক্তিও যেন তার নেই।

​—“কী হয়েছে, মন খারাপ?”
​পরিচিত কণ্ঠস্বরটা কানে আসতেই আনায়া চমকে উঠল। ভেজা বালিশ থেকে মুখ তুলে পাশে তাকাতেই দেখল, তার কাল্পনিক পুরুষ ভিভিয়ান ঠিক তার পাশেই আধশোয়া হয়ে বসে আছে। আনায়া তীব্র বিতৃষ্ণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,
​”চলে যান এখান থেকে, অসহ্য লাগছে আপনাকে। নিষ্ঠুর, পাষাণ লোক কোথাকার!”
​ভিভিয়ান নড়ল না। বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,
​”এত দ্রুত হাল ছেড়ে দিলে চলবে? আমাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য একসময় কতই না পাগলামি করেছিস; আর এখন যখন আমি তোর হাতের নাগালে, তখন সব ছেড়েছুঁড়ে দিচ্ছিস?”
​আনায়ার এবার সত্যিই কান্না পেয়ে গেল। অভিমানে তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। সে মুখ না ফিরিয়েই ধরা গলায় বলল,
​”তো আর কী করব আমি, শুনি? আপনার সাথে যুদ্ধ করব? চেহারা যা বানিয়েছেন, বেশি কিছু করতে গেলে তো আপনার এক থাপ্পড় খেয়েই আমি উল্টে পড়ব!”
​ভিভিয়ান হালকা হাসল। বলল,
“তাতে দোষটা আমার নাকি তোর? খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করলেই তো পারিস।”

​—“বাজে বকা বন্ধ করুন। আপনাকে একদম সহ্য হচ্ছে না, ইচ্ছে করছে আপনার মা-থাটা ফা-টিয়ে দিই।”
​ভিভিয়ান আবারও সেই ক্ষীণ হাসল। আনায়ার রাগ যেন সেই হাসিতে দ্বিগুণ হলো। সে ঝট করে শোয়া থেকে উঠে বসল এবং নিচু গলায় দৃঢ় স্বরে বলল,
​”আপনি তো আমার মগজের একটা রোগ, তাই না? চব্বিশ ঘণ্টা আমার মাথাতেই তো আপনার বসবাস। তাহলে বুদ্ধি দিয়ে কোনো ভালো উপায় বলতে পারছেন না কেন? কোনো উপায়েই কি কাজের কাজ কিছু হতে পারে না?”
​ভিভিয়ান কোনো উত্তর না দিয়ে আবারও হাসল। আনায়া দাঁতে দাঁত চিবিয়ে ধমকে উঠল,
​”চুপচাপ উঠে বসুন বলছি, একদম হাসবেন না। আমার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে।”
​বাস্তবে ভিভিয়ানের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও, এই কল্পনার জগতে ভিভিয়ান যেন আনায়ার আজ্ঞাবহ দাস। ভিভিয়ান বাধ্য ছেলের মতো উঠে বসল। গম্ভীর মুখে বলল,

​”দেখ তারা, লাইফে আপ-ডাউন তো থাকবেই। কিন্তু থেমে গেলেই মানুষ হেরে যায়…”
​—“বড় বড় কথা বাদ দিয়ে কাজের কথা বলুন। ভার্সিটির প্রফেসর হয়ে লেকচার দিতে বলিনি আপনাকে।”
​—“বিরক্ত করিস না, ইডিয়ট! বলতে দে আগে। সব ফটরফটর তো আমার কাছেই করিস, বাস্তবে তো কাজের বেলায় ঠনঠন।”
​—“ওসবও কি আমার দোষ? দোষ তো সব বড়-আব্বু আর বড়-আম্মুর, দুনিয়ার সবচেয়ে অদ্ভুত পিসটাই তারা ডাউনলোড দিয়েছে।”
​—“সারাদিন উল্টোপাল্টা বকিস বলেই মাথায় ভালো কিছু কাজ করে না। একবারও ভেবে দেখেছিস এখন তোর করণীয় কী?”
​আনায়ার চোখে এবার এক জেদি আভা ফুটে উঠল। সে জেদ মেশানো গলায় বলল,

​”কী আর করব? আমাকে পাত্তা না দিয়ে যাবেন কোথায়? এবারও পাত্তা না দিলে মাথা ফাটিয়ে দেব, তবুও পিছু ছাড়ব না। আমাকে এতই সস্তা পেয়েছেন উনি? যখন ইচ্ছে হবে তুলে নিয়ে যাবে, যখন ইচ্ছে হবে পাগলামি করবে, কথা বলবে না, ভাব ধরে নায়ক সেজে বসে থাকবে—আর আমি চুপচাপ সব সহ্য করব? কালকেই আবারও যাব আমি। দেখি কতদিন ওভাবে ভাব নিয়ে বসে থাকতে পারে।”
​কাল্পনিক ভিভিয়ান চোখ ছোট করে আনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। আনায়া নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলতে লাগল,
​”এভাবে তাকিয়ে কী দেখছেন? আমি আর কত সহ্য করব? অতীতে আপনার আর বাবার সাথে কী হয়েছিল কে জানে, কিন্তু তার মাশুল আজও আমাকে দিতে হচ্ছে। বাবা কোনোদিন আমাকে আর পাঁচটা সাধারণ বাবা-মায়ের সন্তানের মতো বাঁচতে দেয়নি। সবসময় নিয়মনীতির বেড়াজালে আমাকে আটকে রেখেছে। পড়াশোনায় বাধা, নাচ করতাম, সেটাও পছন্দ করত না; এমনকি কারো সাথে কথা বলা বা বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়ার ওপরও ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা। সারাক্ষণ এক অজানা আতঙ্কে কাটিয়েছি আমি; না জানি কখন বা কি বলে ফেলে, আবার না জানি কোন নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেয় আমার উপর। যখন আমায় কিছু বলতে পারতো না তখন অকারণেই সব রাগ গিয়ে ঝাড়তো আমার মায়ের উপর।

অথচ মায়ের মুখে শুনলাম, আগে নাকি সবকিছু ঠিকই ছিল। তাহলে মাঝে এমন কী ঘটনা ঘটল যার জন্য আমার পুরো জীবনটাই অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়ে গেল?”
​একটু থেমে বুক ভরে দম নিয়ে আনায়া আবার বলতে থাকল,
​”আর এখন জুটেছেন আপনি! ওই সময় বাবার অবাধ্য হওয়ার সাহস আমার ছিল না। বুঝ হওয়ার পর থেকে আমি কখনো বাবার কথার অবাধ্য হতে পারিনি। সেদিন বাবা যদি আমায় বলত, আপনি কিংবা আপনার পরিবারের ওপর খুনের দায় চাপিয়ে দিতে হবে; তবে নিজের বিবেক-বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে আমি বোধহয় তাই-ই করতাম। কিন্তু গত এক বছরে তো আমি নিজেকে চিনতে শিখেছি, নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে শিখেছি। নিজের মতো বাঁচতে শিখেছি, অন্যদের মতামতের উর্ধ্বে গিয়ে নিজের মতামত, নিজের ভাবনা নিয়ে চলতে শিখেছি; কই এখন তো শত যুক্তি দিলেও আমি ওমন ভুল করব না। নিজের সেই গর্দভের মতো কাজের জন্য আমি আজও অনুতপ্ত, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সব দোষ কেবল আমারই!”
​ভিভিয়ান অবাক হওয়ার ভান ধরে বলল,

“কী আশ্চর্য, এসব আমাকে কেন বলছিস? আমি কি তোকে কিছু বলেছি?”
​—“না বলেননি, কিন্তু সবাই তো এমনটাই ভাবে। আর আপনাকে অবশ্যই দোষ দেব আমি। আমাকে দেখে কি আপনার স্বাভাবিক মনে হয়? স্বাভাবিক আছি আমি? পুরো পাগল হয়ে গেছি!
কোনো সুস্থ মানুষ কি দিনরাত এভাবে এক কাল্পনিক অস্তিত্বের সাথে কথা বলতে পারে? পারে না। কিন্তু আমি পারছি! কারণ আমার মস্তিস্কের এই অসহ্য যন্ত্রণাগুলো কমানোর জন্য আমি এটা করতে বাধ্য হচ্ছি। আর এই সবকিছুর জন্য কেবল আপনি দায়ী! তারপরও কত অবলীলায় আমাকে রিজেক্ট করে দিলেন; একবারও কি আপনার কলিজা কাঁপল না?”
​ভিভিয়ান এবার নিশ্চুপ। তার মুখে কোনো কথা নেই, দৃষ্টি নিবদ্ধ মেঝের দিকে,
​—“কী হলো, কথা বলছেন না কেন?”
​ভিভিয়ান তবুও নিরুত্তর।

​—“হয়েছে, আর কিছু বলতে হবে না। বোঝা হয়ে গেছে, আপনাকে দিয়ে কি হবে আর না হবে।”
আনায়া বিছানা থেকে নেমে পায়চারি করতে শুরু করল। তার মাথায় তখন হাজারটা চিন্তার আনাগোনা। কোমরে এক হাত রেখে অন্য হাতের আঙুল কামড়াতে কামড়াতে সে সমাধানের পথ খুঁজতে থাকল। খানিকক্ষণ পর পাশে তাকাতেই দেখল, বিছানার সেই জায়গাটা শূন্য। ভিভিয়ান উধাও হয়ে গেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়াল,
​”অকর্মা একটা! কোনো কাজেই লাগে না। সবই আমার এই নড়বড়ে মাথার তাজুর্বা!”
​নিজের ওপর চরম বিরক্তিতে, একরাশ তিক্ততা নিয়ে এবার রমণীর ঠোঁটে ফুটে উঠল,একখান বিদ্রূপাত্মক হাসি। সে আবারও গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে কিছু একটা ভাবতে শুরু করল। ততক্ষণে তার মাথায় বিশেষ কিছু না এলেও, একটা বিষয় তো স্থির হলো যে—এতো সহজে হার মানা যাবে না।
আনায়ার তিক্ততায় এবার খানিক অদ্ভুত পূর্বক রহস্যময় হাসির দেখা মিলল। সে সুন্দর মতো বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে, বিড়বিড় করতে লাগল,

“একদিন,দুইদিন,তিনদিন? কয়দিন আর আমায় রিজেক্ট করবেন আপনি? একটা সময় তো আমার কাছেই ধরা দিতে হবে। আই নো,আই নো, এসবই আপনার হিপোক্রেসি! ভালো যদি না-ই বাসতেন, তবে এতোদিনে বিয়ে-শাদি তো ঠিকই করে নিতেন। ওসবও করেননি। কিন্তু…. ”
আনায়ার ভাবনা থেমে গেল। হুট করে মাথায় একটি নতুন নাম ঘুরপাক খেতে লাগল। ‘ইমানি’—এটা তো সে ভেবেই দেখেনি!
বিস্ময়ে ঘেরা রমণীর ছটফটে মন ভাবতে লাগল,
‘এই ইমানিটা কে? উনার আসল পরিচয় কি? শুনেছি তিনজনে ঐ বাড়িতে একসাথে থাকে। পাভেল ভাই তো ওনার কাজিন কিন্তু… ওনার তো কোনো নিজের বোন নেই। মায়ের কাছে বা এলবামেও তো তেমন কিছু পেলাম না৷ তাহলে? এই ইমানির সাথে ওনার কি সম্পর্ক? শুধু মাত্র কাজের জন্য ওনাদের মাঝে এতো ঘনিষ্ঠতা?’
না! এবার ভাবনাচিন্তা অভারডোজ হয়ে যাচ্ছে। এক চিন্তা থেকে বের হতে না হতেই, আরেক চিন্তা মাথায় ভর করেছে। আনায়া চোখ-মুখ খিঁচে, হাত-পা ছাড়িয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করতে করতে আওড়াল,
“নাআআআ, আর কত,আর কত, আমার স্বামীকে নিয়েই কেনো সবার এতো টানাটানি। খোদা আমায় তুলে নাও, এই জীবন আমার চাই না!”

রাত এখন প্রায় নয়টা। কেনীথ নিজের ঘরের এক কোণে সোফায় হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে আছে। তার সমস্ত মনোযোগ কোলের ওপর রাখা একটা বইয়ের পাতায়। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, অবিন্যস্ত চুলগুলোর কিছু অংশ কপালে এসে পড়েছে, আর বাকিটা মাথার পেছনে একটা কালো রাবার ব্যান্ড দিয়ে মেসি বান করা। তার ঠিক পাশেই কেনেল আর ক্লারা পরম নিশ্চিন্তে বসে আছে।ক্লারা স্বভাবজাত আদুরে ভঙ্গিতে কেনীথের উরুতে মাথা রেখে শুয়ে আছে, আর কেনীথ আনমনেই তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
​বইয়ের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকলেও কেনীথের মস্তিষ্ক আজ অবাধ্য। বারবার সেখানে একজনেরই প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে—আনায়া। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই ভাবনাগুলো ঝেড়ে ফেলতে, কিন্তু মনের গহীনে আনায়ার অস্তিত্ব যেন আরও জেঁকি বসছে।

​সে জানত, এমনটাই হবে। চট্টগ্রামে আদিবাসীদের গ্রামে কাটানো সেই দিনগুলোতেই সে টের পেয়েছিল মেয়েটার মনের অব্যক্ত চঞ্চলতা। সেই আশঙ্কার কারণেই সে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল, গড়ে তুলেছিল এক অদৃশ্য দেয়াল। কিন্তু নিয়তি হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছে। আনায়া তাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে এবং সেটা সে সরাসরি স্বীকারও করেছে।
গত এক বছরে কেনীথের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। একসময়ের বেপরোয়া, উগ্র আর ছন্নছাড়া ভিভিয়ান আজ দায়িত্বশীল কেনীথ হয়ে উঠেছে। সে এখন বোঝে পরিবার কী, সম্পর্ক কী। একসময় কেবল নিজের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেওয়া সেই উদ্ধত মানুষটা আজ অন্যের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। বিশেষ করে আনায়াকে নিয়ে।
কেনীথ জানে, কোনো না কোনোভাবে আনায়ার সাজানো জীবনটা ওলটপালট হওয়ার পেছনে কেবল সে নিজেই দায়ী। আর তাই, জীবনের এই শেষভাগে এসে সে আবারও কোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না। সে চায় না তার জন্য ওই নিষ্পাপ মেয়েটার বাকি জীবনটাও ধ্বংস হোক। সময় যে তার হাতে খুব কম, বড্ড বেশি কম।
​চিন্তার জাল ছিঁড়ে কেনীথের মস্তিষ্কে হঠাৎ এক তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ খেলে গেল। অসহ্য সেই ব্যথায় সে চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে নিল। হাতের বইটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে দুহাতে নিজের চুল শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। মূলত এই কারণে কেনীথ আজ সবার চেয়ে ব্যতিক্রম। এই যান্ত্রিক জীবন থেকে বেরিয়ে যখনই সে আবেগের আশ্রয় নিতে যায়, তখনই এই মরণব্যাধি যন্ত্রণার উদয় হয়।

​তার এই আকস্মিক অবস্থা দেখে পাশে থাকা কেনেল আর ক্লারাও যেন ঘাবড়ে গেল। তারা অস্থির হয়ে নিজেদের হিং-স্র ভাষায় ডাকতে শুরু করল। কেনীথ কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে তাদের শান্ত হতে ইশারা করল। তারা শান্ত হলো ঠিকই, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই কেনীথের নাসারন্ধ্র দিয়ে উষ্ণ লাল তরল গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখে তার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এল। যন্ত্রণায় চুলগুলো আরও জোরে মুঠো করে ধরতেই সে এক অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করল—তার হাতের মুঠোয় উঠে আসছে একগুচ্ছ চুল।
​কেনীথ স্তম্ভিত হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের স্থবিরতা কাটিয়ে সে নিজের হাতের তালুর দিকে তাকাল। বেশ কয়েকটা চুল গোড়া থেকে অনায়াসেই উঠে এসেছে। কেনীথ একনাগাড়ে চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকার পর, অদ্ভুতপূর্বক এক হাসিতে ক্ষীণ হাসল। এ হাসি নিজের প্রতি করুনা নাকি বিদ্রুপের তার বলা মুশকিল। তবে এইসব তাকে নতুন করে বুঝিছে দিল—তার হাতে সত্যিই সময় অনেক কম।
​কিছুক্ষণ স্থির থাকার পর কেনীথ টলমলে পায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় প্রতিফলিত নিজের এলোমেলো চুল আর ফ্যাকাসে মুখশ্রীর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হুট করে আনায়ার সেই মুগ্ধ কণ্ঠস্বর কর্ণধারে প্রতিধ্বনিত হলো,
“আপনার চুলগুলো অনেক সুন্দর!”

​কেনীথ ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শৌখিন চুলের প্রতি সে বারবারই কিছুটা দূর্বল ছিল।চিরকালই নিজের স্টাইল, নিজের অভিজাত্য সবসময় সে শুরু হতেই বাকিদের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম রেখেছে। আর এখন সেটাই আনায়া পছন্দ করতে শুরু করেছে। কেনো যেন এই ভাবনায় তার খানিক হাসি পেলো। মূহুর্তের মাঝেই সে এক সিন্ধান্ত নিয়ে ফেলল। কাল হোক বা পরশু, সার্জারির প্রয়োজনে এই চুলগুলো তাকে হারাতেই হবে। তবে কেন এই অনিশ্চয়তা বয়ে বেড়ানো? ঝামেলা রেখে তো লাভ নেই। মায়া যত কমবে, বিচ্ছেদের দহনও ততটা সহনীয় হবে।
​সে আর কালক্ষেপণ করল না। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে ট্রিমার আর ছোট কাঁচি বের করে আনল। দীর্ঘদিনের যত্নে লালন করা কাঁধ অবধি অবাধ্য চুলগুলোর ওপর সে আজ নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে মেতে উঠল। একেকটি চুলের গোছা মেঝেতে খসে পড়ার সাথে সাথে কেনীথ যেন নিজের অতীতের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলতে চাইছে।

​কেনীথ সদ্য গোসল শেষ করে নিচে নেমে এল। অবিন্যস্ত চুলগুলো কেটে ফেলার পর হতেই এক ধরণের অস্বস্তি কাজ করছিল বলেই সে দ্রুত গোসলটাও সেরে নিয়েছে। পরনে কালো টাউজার ও ধবধবে সাদা রঙের লং-স্লিভ এর টি-শার্ট; হাতা দুটোও কবজি অব্দি গুটানো। মাথার দুপাশের চুলগুলো বেশ ছোট করে ছাঁটা; আর ওপরের দিকের চুলগুলো মাঝারি ধাঁচের। দীর্ঘদিনের সেই বন্য রূপটা আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, অথচ মুখাবয়বের সেই চিরাচরিত গাম্ভীর্য এখনো অমলিন। এই নতুন লুকে কেনীথকে যেন আরও বেশি রহস্যময় আর গম্ভীর দেখাচ্ছে।
​এদিকে ড্রয়িং রুমে পাভেল তখন পুরোপুরি অন্য জগতে ডুবে আছে। সোফায় আয়েশ করে বসে সে বিশাল স্ক্রিনে ভিডিও গেম খেলতে মগ্ন। টি-টেবিলের ওপর পপকর্ন আর সফট ড্রিংকসের খালি ক্যানগুলো অগোছালোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পাভেলের সম্পূর্ণ ধ্যান স্ক্রিনের দিকে; আশেপাশে কী ঘটছে বা কার আগমন হলো, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।

​ওদিকে ইমানি এখন রাতের রান্নায় ব্যস্ত। সারাদিন নিজেকে রাফ অ্যান্ড টাফ লুকে আভিজাত্যের মোড়কে গুটিয়ে রাখলেও, অন্দরে সে বেশ ঘরোয়া। কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে আজ তার খানিকটা দেরি হয়ে গেছে, তাই রান্নার কাজ এখনো শেষ হয়নি।
তাদের জীবনে আর্থিক সচ্ছলতার কোনো কমতি নেই, তবুও এই বাড়িতে একাধিক কর্মচারীর ভিড় দেখা যায় না। কেবল যখন বাড়িতে কেউ থাকে না, তখন মাঝেমধ্যে ন্যান্সি আসে। সে মূলত ইমানির বিড়ালছানা নুযা এবং কেনেল ও ক্লারার দেখাশোনা করতে আসে; এছাড়া বিশেষ কোনো কাজ তার নেই।
মূলত রান্নাবান্নার যাবতীয় কাজ ইমানি নিজেই করতে পছন্দ করে। এটি কেবল তার শখ নয়, বরং এক ধরণের দায়িত্ব। বহু বছর আগে এই রান্নার সূত্র ধরেই কেনীথ আর পাভেলের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল।
সেই স্মৃতিগুলো এখন বেশ পুরনো। আপাতত ইমানি কুচকুচে কালো রঙের এক সাদামাটা গাউন পরে চুলার ধারে ব্যস্ত। আর চুলার ঠিক পাশেই কাউন্টার-টপের এককোণে চুপটি করে বসে আছে জিঞ্জার কালারের হেজেল চোখের বিড়াল নুযা।

​এমন সময় কেনীথ কিচেনে প্রবেশ করল। সে সরাসরি ড্রয়িং রুম পেরিয়ে এখানেই এসেছে। ইমানির ব্যস্ততা দেখে সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
​”কোনো হেল্প লাগবে?”
​ইমানি আনমনা হয়ে কাজের তাড়ায় জবাব দিল,
“না, রান্না প্রায় শেষ।”
​ইমানি তখন সালাদ কাটতে ব্যস্ত। কেনীথ নিজে থেকেই গরম প্যানে থাকা স্টেকটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। এর মধ্যেই হঠাৎ ইমানির কিছু একটা মনে পড়ায় সে কেনীথের দিকে মুখ ফেরাল,
​”বলছিলাম ভি, সেদিন কিছু ক্লায়েন্ট…”

​কথাটা শেষ করতে পারল না ইমানি। সে থমকে গেল। কেনীথকে এই অবস্থায় দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল, ললাটে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ল। হাত থেকে ছুরিটা প্রায় খসে পড়ার দশা। সে তীব্র বিস্ময় নিয়ে বলে উঠল—
​”হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস! চুলের এ কী অবস্থা করেছিস তুই? কখন করলি এসব?”
​কেনীথ নিজের মতোই প্যানে স্টেকের ওপর মেল্টেড বাটার ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ইমানির এমন আকাশ থেকে পড়া ভাবমূর্তিতে সে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। নির্বিকার স্বরে বলল—
​”বিরক্ত লাগছিল, তাই কেটে ফেলেছি।”
​ইমানি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কেনীথকে আপাদমস্তক পরখ করে নিয়ে চাপা উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,

​”তোর দিনদিন কী হচ্ছে আমায় বল তো? এভাবে আর কতদিন চলবে? মরে গেছিস তুই? তোকে তো আর জীবন্ত কিছু মনে হয় না আমার।”
​কেনীথ নিরুত্তর। তার এই নীরবতা দেখে ইমানি আবারও ঝাঁঝালো কণ্ঠে আওড়াল,
​”কথা বলছিস না কেন? আমার মেজাজ খারাপ না করলে তোদের হয় না? ইচ্ছে তো করছে তোর মাথাটা ফাটিয়ে দিতে!”
​কেনীথ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল,
​”সুইঠি, জাস্ট কাম ডাউন! এত সিরিয়াস কিছুই হয়নি যে চিৎকার করতে হবে। চুল ছিল মাত্র, ভালো লাগছিল না, তাই ঝামেলা মিটিয়ে দিয়েছি।”

​—“বাহ, কত চমৎকার! তোর চুল ভালো লাগছিল না? বেশ তো, আমি তো এটাই জানতে চাচ্ছি—এতকাল পর তোর হুটহাট এসব কেমন ইচ্ছা জাগছে, যা গত কয়েক বছরে কখনো জাগেনি?”
​—“এতকাল হয়তো সময়ের গুরুত্ব দেওয়াটাকে প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু এখন করছি। বড্ড অল্প সময় আমার হাতে; এখন আর নষ্ট করতে চাই না।”
​ইমানি যেন কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল। কেনীথ একবারের জন্যও দৃষ্টি আশেপাশে ফেরাল না।কাজ শেষ করেই সে ইমানির উদ্দেশ্যে খানিকটা জোর গলায় বলল,
​”এটা হয়ে গেলে বল, নিয়ে যাচ্ছি। খিদে পেয়েছে আমার, দ্রুত সালাদ নিয়ে আয়।”
​বলেই সে গরম স্টেকপ্যানটা নিয়ে অন্য কাউন্টার-টপের দিকে এগিয়ে গেল। পেছন হতে ইমানি ত্যাছড়া সুরে বলল,
​”বাহ, বাহ! কত সুন্দর হুকুমের গোলাম আমি এদের! যখন যা ইচ্ছে বলছে আর ওটাই আমায় করে দিতে হচ্ছে!”
​কেনীথ ঘাড় বাকিয়ে পাশে মুখ ফেরালো; বা-ভ্রু উঁচিয়ে নিরেট গলায় কিঞ্চিৎ বিদ্রূপাত্মক স্বরে বলল,
​”হু,হু, ঠিকমতো কাজ কর। নয়তো তুই যে আমাদের হুকুমের গোলাম, তা সবাইকে জানিয়ে দেব।”
​হুট করে কেনীথের মুখে এমন রসিকতা শুনে ইমানি তাজ্জব বনে গেল। সে দাঁতে দাঁত চিপে বলল,
​”সিরিয়াসলি? তুইও এখন পাভেলের মতো… ভি-এর বাচ্চা!”

​—“আমি আমার আম্মাজানের বাচ্চা।”
​—“তোকে তো আমি…!”
​সারাদিন বাইরে খাটাখাটনির পর ইমানির মাথা সত্যিই গরম ছিল। কিন্তু কেনীথের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে সে বেশ মজা করার মেজাজেই আছে। ইমানি সালাদ কাটা ফেলে তেড়ে আসতে যাচ্ছিল, কিন্তু তখনই ড্রয়িং রুম থেকে পাভেলের চিলচিৎকার ভেসে এল,
​”ঐ ইমুর বাচ্চা! রাত এগারোটা বাজতে চলল, খাবার কখন দিবি?”
​ইমানি এবার রাগ-ক্ষোভে ফেটে পড়ার দশা,
“আমাকে কি তোদের কাজের মাসি মনে হয়? বছরের পর বছর ধরে তোদের জন্য ফ্রিতে খেটে যাচ্ছি, তার ওপর এমন ব্যবহার! ইচ্ছে করছে সবগুলোকে ঠাস করে মে-রে ফেলে এখান থেকে চলে যেতে।”
​দূর থেকে পাভেলের জবাব এল,
“চলে যা না, মানা করেছে কে? আমরা কি রান্না করতে পারি না? ভাই পানি গরম করবে, আর আমি তাতে ডিম ছেড়ে দেব। ডিমের খোসা ছাড়ানোর জন্য না হয় তোকে ফোন করে ডেকে আনব। এছাড়া তোর রান্না না খেলে কি আমরা মরে যাব?”

​—“পাভেল, আমার মাথা গরম করিস না, নয়তো আমি সত্যিই বাড়ি ছাড়ব!”
​পাভেল তার কথা শুনল কি শুনল না, তার আগেই আবারও চেঁচিয়ে উঠল,
“ঐ ইন্দু মাসি, তাড়াতাড়ি আয়! খিদে পেয়েছে তো!”
​পাভেলের কথা আর শেষ হলো না। গেম খেলার তালেই হুট করে একখান লেডিস স্লিপার উড়ে এসে তার মাথায় লাগল। পাভেল চোখমুখ খিঁচিয়ে তাকাতেই দেখল ইমানি দ্বিতীয় জুতোটা খুলে তার দিকে তেড়ে আসছে। পাভেল তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠল। বেখেয়ালে বোধ হয় একটু বেশিই বলে ফেলেছে! এই নারীর মেজাজ তো সবসময়ই তুঙ্গে থাকে।

​—“সেরেছে রে! পালা রে হতচ্ছাড়া!” অস্ফুটে এটুকু বলেই সে সোফা ডিঙিয়ে পালাতে লাগল। ওদিকে ইমানিও আজ ছাড়ার পাত্রী নয়; ধরতে পারলে যেন জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে।
​—“সাহস থাকলে আবার বল ওসব উল্টাপাল্টা নাম! তারপর দেখাচ্ছি মজা…”
​—“এই না, না! ছুড়িস না ওটা! মরে-টরে যেতে পারি। এখনো বিয়ে করিনি আমি, প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর বোন আমার। এভাবে এই সাদাসিধা ভাইটাকে হারালে তোর কি একটুও কষ্ট লাগবে না?”
​—“না, একদম লাগবে না। ম-র তুই!”
​বলতে বলতেই ইমানি দ্বিতীয় জুতোটা নিখুঁত নিশানায় তার পিঠে ছুড়ে মারল। পাভেল এবার রেগে গিয়ে সোফার ওপর থাকা কুশন আর খালি ক্যানগুলো ইমানির দিকে ছুড়তে লাগল।

মহামায়া পর্ব ৪০

​রাত বিরেতে খাবারের টেবিলে বসার আগে এই দুই রণমূর্তির যুদ্ধ চলছে; আর কেনীথ যেন ফ্রিতে কোনো মজাদার লাইভ টেলিকাস্ট দেখছে—এমন ভঙ্গিতে দৃশ্যটা উপভোগ করতে লাগল। সে কাউন্টার-টপের ওপর বসে আয়েশ করে তপ্তপ্যান থেকেই স্টেক খেতে ব্যস্ত। ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল। আননোন নাম্বার থেকে আসা সেই মেসেজটা দেখতেই কেনীথের ভ্রু কুঁচকে গেল। জার্মান ভাষায় সেখানে স্পষ্ট লেখা—
​”তুমি যদি আমার না হও, তবে আজ রাতে আমি সুই-সা-ইড করব। এবার তোমার ইচ্ছে তুমি কী করবে।”

মহামায়া পর্ব ৪২

1 COMMENT

Comments are closed.