Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৪২

মহামায়া পর্ব ৪২

মহামায়া পর্ব ৪২
তুশকন্যা

রাতের খাবার শেষে কেনীথ নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি দূরপ্রান্তের ঐ বরফে ঢাকা পাহাড়ের উপর। তবে মস্তিষ্কে চলছে ভিন্ন ভাবনা। অদ্ভুত মেসেজটা পাবার পরপরই সে আন্দাজ করে ফেলেছিল,এটা আদতে কে হতে পারে।
যথারীতি বিষয়টা নিয়ে খুব একটা বিচলিত হয়নি সে। বরং ধীরেসুস্থে ফোনের নাম্বার লিস্ট খুঁজে সে এক বিশেষ মানুষকে মেসেজ করার কথা ভাবল।
মাইকেল জ্যাক! রেসিং জগতে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা মার্সিডিজের হয়ে ইভেন্টে জয়েন করলেও, জ্যাকের টিম আসে বি.এম.ডাব্লিউ’র হয়ে। এভাবেই বছরের পর বছর হতে দুই দলের মাঝে রেষারেষি চলে আসছে। কিন্তু সমস্যাটা বাঁধিয়েছে জ্যাকের ছোট বোন স্টেলা। মেয়েটা শেষমেশ কেনো যে তার জন্যই এতো পাগলামি শুরু করেছে, এটা সে আজও বুঝতে পারেনি।

জ্যাকের সাথে শেষবার তার কবে কথা হয়েছিল,কেনীথের তা জানা নেই। তবে জ্যাকেট ইনবক্সে যেতেই তার ভ্রু-জোড়া কুঁচকে গেল। বেশ কয়েকমাস আগে জ্যাক তাকে দুটো মেসেজ দিয়েছিল, একটা হলো,
“কি ড্রাকুলা মাস্টার! সব উড়াউড়ি শেষ? বাদুড় থেকে বিড়াল হয়ে বসে আছিস? সাহস থাকলে নেক্সট ইভেন্টে এসে আমাদের হারিয়ে দেখা।”
মেসেজটা প্রায় বেশ কয়েকমাস আগের। কেনীথ এটা আগে খেয়ালও করেনি। যে যাকগে, এসব দেখে তার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের এক সুক্ষ্ম হাসি ব্যতীত আর কোনো প্রতিক্রিয়াই ঘটল না। বরং সে দুমাস আগে আরেকটা মেসেজের দিকে নজর দিল

“তুই জার্মানি ছাড়বি কিনা বল, আমার বোনের যদি কিছু হয় তবে তোকে মাটিতে গেঁড়ে রাখব। *** **** ****!”
মেসেজের সাথে একগাদা গালি-গালাজ। কেনীথ দুটো মেসেজই ইগনোর করে, নতুন করে একখান মেসেজ লিখল,
“স্টেলা কোথায় আছে, খোঁজ নে। ওর কিছু হলে, পরবর্তীতে আমায় দোষারপ করতে পারবি না।”
কাজ শেষ। এরচেয়ে বেশি কিছু করার প্রয়োজন মনে করল না কেনীথ। ফোনটা বন্ধ করে দিয়ে ভারী শ্বাস ফেলল। রাতের শীতল দমকা হাওয়ার মাঝে,চোখদুটো বুঝতেই নাসারন্ধ্রে এক অদ্ভুত সুগন্ধি অনুভব করল। চকিতেই চোখদুটো মেলে সে পাশে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। দেখল আজ বারান্দার ঐ ছোট্ট বেলীফুলের গাছটায় সবগুলো বেলীফুলই ফুটে গিয়েছে।একই সাথে ছড়িয়ে যাচ্ছে স্নিগ্ধ এক সুগন্ধী। মূহুর্তের মাঝেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। যার স্মরণে এই গাছ লাগানো, সেই রমণীর হাসোজ্জল লাবণ্যময় মুখচ্ছবিটি এক নিপুণ প্রতিচ্ছবির ন্যায় তার মানসপটে মূর্ত হলো।

পরদিন সকালবেলা। কোনো কিছু বাছবিচার না করেই আনায়া সোজা ব্লাডেন গ্যালারির সামনে এসে হাজির হলো। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ হয়ে ওঠেনি। ভার্সিটিতে আজ কেনীথের কোনো ক্লাস নেই, তাই সেও আর ক্যাম্পাসের দিকে পা বাড়ায়নি।
​গ্যালারির ভেতরে পা রাখতেই আনায়ার মনে জমে থাকা সব রাগ আর জেদ মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। মনের ঝোঁকে কাউকে কিছু না বলে এখানে তো চলে এসেছে, কিন্তু যার খোঁজে তার এই অতর্কিত আগমন, সে তো থাকে পাশের হেডকোয়ার্টারে। আর সেখানে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া তো আকাশকুসুম কল্পনা। আনায়া কপালে হাত দিয়ে অস্ফুটে বলল,

“সেরেছে! এখন এখানে বসে আমি কী করব?”
​বুদ্ধি যখন প্রায় লোপ পাওয়ার দশা, ঠিক তখনই তার নজর পড়ল গ্যালারির একদিকের লম্বা এক লাইনের ওপর। ওখানে ঠিক কী হচ্ছে তা বোঝার জন্য আনায়া উৎসুক হয়ে উঠল। এমন সময় গাঢ় লাল আর কালো রঙের ইউনিফর্ম পরা একজন স্টাফকে সামনে দিয়ে যেতে দেখে সে তাকে ডেকে থামাল। লোকটির কাছ থেকে জানতে পারল, ওখানে গ্যালারির নতুন স্টাফ নিয়োগের জন্য ইন্টারভিউ চলছে।
​স্টাফটি চলে যাওয়ার পর আনায়া একা দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। তার মগজ যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ভাবতে ভাবতেই অবচেতন মনে সে নিজেও গিয়ে ওই লাইনের পেছনে দাঁড়াল। মনের এক কোণে প্রশ্ন জাগল—কাজটা করা কি তার জন্য ঠিক হবে? আর্থিক কোনো অভাব তার নেই; প্রতি মাসেই বাবা তার একাউন্টে মোটা অংকের টাকা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু এখানে স্টাফ হিসেবে কাজ করাটা তো আসলে একটা বাহানা মাত্র। গ্যালারিতে কাজ করলে যখন-তখন কেনীথের দেখা পাওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হবে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটাও সে ভাবল। যদি কোনোভাবে তার বাবা জানতে পারেন যে দেশের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর মেয়ে গ্যালারিতে সাধারণ স্টাফের কাজ করছে, তবে নির্ঘাত তিনি হার্ট অ্যাটাক করবেন।

​আবার পরক্ষণেই সে নিজেকে সান্ত্বনা দিল—বাবা তো নিজের কাজ আর রাজনীতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে মেয়ের এত খবর নেওয়ার সময় তাঁর কোথায়? আর সে তো এখানে চিরকাল পড়ে থাকবে না; উদ্দেশ্য সফল হলেই ইতি টানবে।
​আনায়া আর দ্বিতীয়বার না ভেবে ওই লাইনের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। আগে জানলে অন্তত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো সাথে নিয়ে আসত। আজ একদম খালি হাতে এসে সে আবারও হতাশায় ডুবল। কোমরে এক হাত দিয়ে মাথা নিচু করে, পাইচারি করতে করতে আঙুল দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে, নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করতে লাগল।
​এদিকে সকাল সকাল মুখ ভার করে পাভেল আর ইমানি হেডকোয়ার্টারে প্রবেশ করেছে। রাতের সেই ছোটখাটো ঝামেলা ডিনার টেবিলেই মিটে গেছে। বর্তমানে টুকটাক কাজের কথা বলতে বলতে তারা লিফটের দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই পাভেলের নজর গ্লাস-ওয়াল ভেদ করে বাইরে একজনের ওপর আটকে গেল। সে চরম বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল। কাঁচের ওপারে ওই লাইনের আশেপাশে সাদা গাউন পরা একটা মেয়ে অস্থির হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে; যাকে হয়তো পাভেল খুব ভালো করেই চেনে।
​পাভেল গ্লাস-ওয়ালে দুহাত ঠেকিয়ে অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠল,

“হোয়াট দ্য হেল! আনায়া এখানে?”
​ইমানির পা থমকে গেল। সে ভ্রু উঁচিয়ে, বুকে হাত গুজে পাভেলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পাভেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কে আনায়া?”
​পাভেল তার দিকে ফিরে ঘোরের মধ্যে বলল,
“আরে আনায়া! ভাইয়ের ওই যে… ও!”
​ইমানি নিজেও কিছুটা অবাক হলো। পরিস্থিতি আঁচ করার চেষ্টা করে সে চাপা স্বরে বলল,
“তুই নিশ্চিত তো?”
​”আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ! এটা তো ওকেই মনে হচ্ছে। কিন্তু ও এখানে কী করছে?”
​ইমানি দূর থেকে আনায়াকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে পরখ করল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক হাসি ফুটিয়ে বলল,

“দেখে তো মনে হচ্ছে স্টাফ নিয়োগের ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। নয়তো ওভাবে লাইনের কাছে ঘুরঘুর করবে কেন?”
​পাশ থেকে পাভেল প্রায় আকাশ থেকে পড়ল,
“কী বলছিস! ও এখানে ইন্টারভিউ দিতে এসেছে? আরে ওর বাবা দেশের মন্ত্রী! মন্ত্রীর মেয়ে হয়ে ওর এই কাজ করার কী প্রয়োজন?”
​”সেটা তো আমিও বুঝতে পারছি না। কিন্তু…পাভেল! একটা কাজ কর—ওকে ডেকে এখানে নিয়ে আয়।”
​পাভেল যেন ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠল,
“পাগল হয়েছিস তুই? তোর মাথায় যা চলছে তা এখনই বন্ধ কর। ভাই জানতে পারলে দুজনকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবে!”
​ইমানি চোখ দুটো সরু করে বলল,

“পারবি না তো? ঠিক আছে, থাক!”
​এই বলেই সে পেছন দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন স্টাফকে থামাল। দূর থেকে আনায়াকে ইশারা করে দেখিয়ে ইমানি হুকুমের সুরে বলল,
“ওই মেয়েটাকে গিয়ে বলো, আমি তাকে ডেকেছি।”
​স্টাফটি কথা অনুযায়ী হেডকোয়ার্টার থেকে গ্যালারির দিকে এগিয়ে গেল। ওদিকে পাভেল ভয়ে আর সংশয়ে কাঁপছে। তার ভাবনায় কেবল একটাই চিন্তা—কেনীথ বোধহয় জানেই না যে আনায়া এখন এ দেশে। জানলে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে? আর ইমানি যে আসলে কী চাল চালছে, তাও পাভেলের বুদ্ধির বাইরে। সব মিলিয়ে এক দমচাপা উত্তেজনায় পাভেল কেবল বিড়বিড় করতে লাগল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন স্টাফ আনায়ার কাছে এগিয়ে এল। বিনীত ভঙ্গিতে সে বলল,
“এক্সকিউজ মি ম্যাডা, আপনাকে ইমানি ম্যাম ডেকেছেন। দয়া করে আমার সাথে আসুন।”
​আনায়া বেশ অবাক হলো। এই অচেনা জায়গায় তো তাকে চেনার মতো কেউ থাকার কথা নয়। মনে মনে কিছুটা খটকা জাগলেও কৌতূহল সামলাতে পারল না সে। কিছুটা ইতস্তত করে মাথা নেড়ে স্টাফটির সাথে যেতে রাজি হলো। স্টাফটি তাকে গ্যালারি পার করে হেডকোয়ার্টারের দিকে নিয়ে গেল।
বিশাল এক গ্লাস ডোর পেরিয়ে সে যখন একটি সুপরিসর কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করল, তখন তার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
​বিশাল এক আধুনিক কক্ষ। চারদিকের কাঁচের দেয়াল দিয়ে বাইরের সকল দৃশ্য দেখা যাচ্ছে; কে কোথায় যাচ্ছে, গ্যালারিতে কখন কি হচ্ছে, কে কি করছে,সবকিছু! কক্ষের ঠিক মাঝখানে রাখা প্রকাণ্ড এক গ্লাস টেবিলে পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে বেশ গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছে ইমানি। চোখেমুখে তীব্র গম্ভীর্যের ছাপ।
তবে আনায়ার নজর ইমানির ওপর বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারল না। টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে দেখেই সে থমকে গেল। অস্ফুটে বলে উঠল— “পাভেল ভাই?”

​আনায়া চরম বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। পাভেল নিজে যেন তীব্র এক সংকোচে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, সে কোনোমতে আনায়ার দৃষ্টি এড়িয়ে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। এদিকে স্টাফটি ইমানির সামনে সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে নিঃশব্দে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। আনায়া এখনো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না তাকে এখানে কেন ডেকে আনা হয়েছে। সে অস্ফুটস্বরে জার্মান ভাষায় আওড়াল,
“আমায় ডেকেছেন আপনি?
​ইমানি হাতের ফাইলটি বন্ধ করে দৃষ্টি সরাল। ধীরস্থিরে আনায়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে কাঠখোট্টা ইংরেজিতে বলল,
​”ইয়েস,ইউ ক্যান কাম ক্লোজার। প্লিজ, হ্যাভ আ সিট।”
​আনায়া আর কথা বাড়াল না। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ইমানির ঠিক মুখোমুখি চেয়ারটাতে বসল। ইমানি নিজের তর্জনীটা ঠোঁটের কাছে ঠেকিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। তার ওই উজ্জ্বল হেজেল চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আনায়াকে আপাদমস্তক একবার পরখ করে নিল। মনে মনে শুধু একটি শব্দই আওড়াল— “ট্রুলি বিউটিফুল!”
​কিন্তু মুখের কাঠিন্য আর ভাবগাম্ভীর্য বিন্দুমাত্র কমতে দিল না সে। সরাসরি কাজের প্রসঙ্গে এসে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি এখানে জবের জন্য এসেছ? আই মিন, স্টাফ পজিশনে ইন্টারভিউ দিতে ইন্টারেস্টেড?”

​আনায়া কয়েক মুহূর্ত ভাবল। তার আসার উদ্দেশ্য চাকরি নয়, কিন্তু এখন এটাই একমাত্র পথ। সে মাথা নেড়ে ধীর স্বরে বলল,
“ইয়েস, আই অ্যাম।”
​ইমানির পরবর্তী চাল কী হতে পারে ভেবে পাশ থেকে পাভেল ক্রমেই ঘাবড়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ইমানি গম্ভীর স্বরে প্রপোজাল দিল,
“আমার কাছে তোমার জন্য আরও বেটার একটা অফার আছে। তোমাকে একজনের পিএ হতে হবে, পারবে?”

​আনায়া কিছুটা সময় নিল। মনে মনে অঙ্ক কষল সে। কোনো বড় মাপের মানুষের পিএ হতে পারলে গ্যালারিতে তার অবস্থান আরও শক্ত হবে। সে রাজি হয়ে জিজ্ঞেস করল—
​”ঠিক আছে, পারব। কিন্তু কার পিএ হতে হবে?”
​ইমানি খুব ছোট করে উত্তর দিল, “ভি।”
​আনায়া থমকে গেল। এই ‘ভি’ টা আবার কে? সে কোনো কূলকিনারা না পেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাভেলের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। পাভেল এবার নিজের জড়তা কাটিয়ে চাপা স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
​”ভাইয়ের কথা বলছে। ভিভিয়ান ভাই…”
​কথাটা শোনামাত্রই আনায়ার বিস্ময়ের সীমা রইল না। চোখের মণি জোড়া যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে! সে তড়িৎবেগে ইমানির দিকে তাকাল। তার দু চোখে এখন হাজার ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে। ইমানি আনায়ার চেহারার এই আকস্মিক পরিবর্তন দেখে মনে মনে হাসলেও মুখে সামান্য প্রশান্তি বজায় রাখল।
​আনায়া নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে অত্যন্ত নিচু গলায়, চাপা উত্তে-জিত স্বরে ইমানির কাছে নিশ্চিত হতে চাইল,

“সত্যি বলছেন?”
​ইমানি এবার একটা মনকাড়া হাসি দিয়ে বলল,
“ইয়াহ, হোয়াই নট?”
​পাভেল দূরে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল আর নানান সব ভাবনা ভাবছিল। আনায়ার চেহারায় খুশির ঝিলিক দেখে সে মোটেও বুঝতে পারল না, যার নামের আতঙ্ক এই তল্লাটে সবার হৃদয়ে কাঁপুনি ধরায়,যার পাগলামিতে আগেরবার এই মেয়েই কান্নাকাটি করে বিতিকিচ্ছিরি ঘটনা বাঁধালো, আজ তারই পারসোনাল এসিস্ট্যান্ট হতে পেরে এই মেয়ে এত খুশি হচ্ছে কেন! অথচ আনায়ার মনে তখন একটাই চিন্তা—এ যেন মেঘ না চাইতেই জল! কেনীথের এত কাছে থাকার এমন সুযোগ সে কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি।

বেলা প্রায় সাড়ে নয়টা নাগাদ কেনীথ হেডকোয়ার্টারে পা রাখল। গতরাতে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা সামলাতে গিয়ে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত প্রেশার নিতে হয়েছে, যার ফলে আজ অফিসে আসতে কিছুটা দেরি হয়ে গেল। কেনীথ আশেপাশে কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। পরনে তার চিরচেনা সেই হাই-নেক কালো সোয়েটার, তার ওপর চমৎকার ফিটিংয়ের একটা কালো ট্রেঞ্চ কোট।
গতরাতে নিজের চুলের ওপর যে ধ্বংসযজ্ঞ সে চালিয়েছে, তার ফলে আজ তার লুকটা একদম ডিফারেন্ট। আগের সেই অগোছালো বন্য ভাবটা এখন আর নেই, বরং তাকে এখন বেশ সফিস্টিকেটেড আর মার্জিত দেখাচ্ছে।
​কেবিনে ঢোকার সময় কেনীথের মাথায় তখন একরাশ কাজের চিন্তা। আগামী মাসে তার সার্জারির ডেট ফিক্সড করা হয়েছে। সবকিছু প্ল্যান মাফিক চললে আগামী মাসেই অপারেশন সম্ভব। তবে তার আগে বেশ কিছু দায়িত্ব আর কাজ তাকে গুছিয়ে নিতে হবে। এমনকি সার্জারির ঠিক আগে একবার দেশেও যেতে হবে, সেখানেও কিছু পার্সোনাল ডিল বাকি রয়ে গেছে।

​অফিসের বেশ কিছু কাজ এখনো পেন্ডিং। কেনীথ কেবিনে ঢুকেই অন্য কোনো দিকে খেয়াল না করে সরাসরি নিজের চেয়ারে বসল এবং ল্যাপটপ ওপেন করে কাজে ডুবে গেল। তবে তার শার্প সেন্স দ্রুতই সিগন্যাল দিল যে, এই রুমে সে একা নয়—আগে থেকেই একটি নারী অস্তিত্বের উপস্থিতি রয়েছে। কেনীথ অবচেতন মনে সেটাকে ইমানি ভেবে খুব একটা বিশেষ গুরুত্ব দিল না। ল্যাপটপের স্ক্রিনে দৃষ্টি স্থির রেখেই সে নিরেট স্বরে বলল—
​”সুইঠি, জেড সিক্সটি ফোর ফাইলটা দে তো।”
​অনাহুত রমণী মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এটা আবার কেমন কোড নেইম? কেনীথ ঠিক কোন ফাইলের কথা বলছে তা বুঝতে না পেরে রমণী দ্রুত ফাইল শেলফের কাছে গিয়ে খুঁজতে শুরু করল। খানিকক্ষণ পর একই ধাঁচের দুটো কালো ফাইল নিয়ে সে নিঃশব্দে কেনীথের টেবিলের ওপর পাশ থেকে এগিয়ে দিল। তার মুখ থেকে একটা শব্দও বের হলো না।
​কেনীথ ফাইলটা খুলতে গিয়েই ভ্রু কুঁচকে ফেলল। এটা তো সে ফাইল নয় যা সে চেয়েছিল! সে বিরক্ত স্বরে আওড়াল—
​”এসব কিসের ফাইল দিলি? তোর কাছে তো…”

​বলতে বলতেই কেনীথের কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ জমে গেল। পাশে মুখ ফেরাতেই সে পুরোপুরি স্তব্ধ। কপালের ভাঁজ আরও প্রখর হলো, বিস্ময় মেশানো দৃষ্টিতে সে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তার সামনে এই মুহূর্তে কি সত্যি আনায়া দাঁড়িয়ে, নাকি এটা তার হ্যালুসিনেশন?
​এদিকে আনায়া ভেতরে ভেতরে ভীষণ নার্ভাস। কেনীথের এই পেনিট্রেটিং লুকের সাথে বেশিক্ষণ চোখ মিলিয়ে রাখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে বারবার চোখের পাপড়ি ঝাপটাতে লাগল; ইতস্তত করল প্রতি মূহুর্তে। পরনের সাদা গাউনটাকে দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরেছে সে। অস্বস্তিতে মাথার আলগা খোপাটাও যেন এখন খুলে পড়ার অপেক্ষায়।
তবে সব ছাপিয়ে তার ঠোঁটের কোণে একটা মেকি ইতস্তত হাসি ঝুলে আছে। কেনীথের এই নতুন বর্ণন দেখে সে নিজেও বেশ অবাক! চুলগুলো কেটে ফেলেছে? এতো সুন্দর চুলগুলো সব কেটে ফেলেছে? চুল কেটেছে কেনীথ,অথচ সেই নিয়ে আফসোসে কান্না পাচ্ছে আনায়ার।
গতকালও তো সব ঠিকঠাক ছিল। তবে কি সে চুলগুলো সুন্দর বলেছিল বলেই কেনীথ এমনটা করল? তিক্ততায় মনে মনে সে ভাবল,

“দুদিন পর যখন আমি বলব আপনার চোখগুলোও সুন্দর, তখন কি সে নিজের চোখগুলোও তুলে ফেলবে? ডেফিনেটলি স্ট্রেঞ্জ ম্যান!”
​কেনীথ তখন আর কোনো কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। আনায়াকে তার পার্সোনাল কেবিনে এভাবে দেখাটা তার কাছে সত্যিই খানিকটা বিস্ময়কর ব্যাপার। অন্তত তাকে সে এখানে আশা করেনি। সে খুব ভালো করেই জানে, আনায়া এখানে এমনি এমনি আসেনি; ডেফিনেটলি ইমানি নয়তো পাভেল এই কাজটা করেছে। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে বসে থাকল না। আনায়াকে কিছু জিজ্ঞেস করা মানে স্রেফ টাইম ওয়েস্ট। যা ডিল করার, ওই দুটোর সাথেই করতে হবে।
​কেনীথ তৎক্ষণাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রাগে তার মাথা ফেটে যাওয়ার দশা। তাকে হনহন করে বেরিয়ে যেতে দেখে আনায়া থতমত খেয়ে গেল। সে জানত এমনটাই হবে—এই ঘাড়ত্যাড়া লোক এত সহজে হার মানবে না। এখন আবার কোন ঝামেলা পাকায় কে জানে! কিন্তু সাহস করে কেনীথকে থামানোর ক্ষমতা তার এই মুহূর্তে নেই।
এরিমধ্যে কেবিনের বাইরে থেকে কেনীথের বজ্রকণ্ঠ শোনা গেল—
​”ইমানিইইই! পাভেলললল!”
​আনায়ার মাথাটা ভনভন করছে। এই অবাধ্য মানুষকে সে কন্ট্রোল করবে কীভাবে? কেনীথের রিঅ্যাকশন দেখে মনে হচ্ছে আজ সে পুরো মিউনিখ শহর মাথায় তুলে ছাড়বে। তবুও নিজেকে কিছুটা শান্ত করল সে। মনে মনে জেদ নিয়ে আওড়াল,

​”হাহ! এসেছিল আনায়ার সাথে পাঙ্গা নিতে, মুখের ওপর রিজেক্ট মেরেছিল। এবার দেখাব মজা। লাইফ একদম হেল বানিয়ে দেব, তবুও পিছু ছাড়ব না।”
​বলেই সে টেবিলের ওপর রাখা বোল থেকে দুটো চেরি মুখে পুরে দিল। ওদিকে হয়তো বড় কোনো হাঙ্গামা চলছে, কিন্তু তাতে তার বয়েই গেল! সে শান্তিতে ফোনের মিউজিক প্লেলিস্টে ঢুকল। টপলিস্টে একটা অদ্ভুত গান দেখে সে ভ্রু কুঁচকে প্লে করল। বেজে উঠল—
​”কী নেশা ঢাইলা দিলি গেলাসে… মাইনাসে না পেলাসে…”
​গানটা শুনে শুরুতে আনায়ার চোখমুখ কুঁচকে গেলেও পরক্ষণেই সে গানের তালে শরীর দুলাতে লাগল। চেরি খেতে খেতে বেশ খুশি খুশি মনে সে নাচ শুরু করে দিল। খুশির তোপে পৈশাচিক হাসিতে খিলখিল করতে করতে, আনমনা হয়ে নিজেকেই বলতে লাগল,

মহামায়া পর্ব ৪১

​”গান জঙ্গল হোক,তাতে আমার কি? আপনা টাইম আ গেয়া হে বেহেনজি! একবার এই বেটাকে সোজা করতে পারি, তারপর বাবাকেও ম্যানেজ করে ফেলব। তখন দুই পরিবার এক হয়ে যাবে, আর আমাদের বংশের বাত্তি আবারও জ্বলজ্বল করে উঠবে। হায়য়য়, কত বুদ্ধি আমার। সাব্বাশ বেটা!”

মহামায়া পর্ব ৪৩

6 COMMENTS

  1. এই জে আপু প্লিজ পর্ব গুলো একটু তাড়াতাড়ি দেন প্লিজ আপু🙂

  2. Hlw apu…if I’m not wrong then Tushkonnoa may be tumr choddonam…..& sotti bolte jodio amr mne hoi ami namta ageo kothao shunechi but thik mne porse na
    Jai hok tumi ki regular goplo likho???…..but ami may be etai first tumr kono golpo porsi….& kokhon porschi jano amr xm er time e 😅….kichu din age hothath ei ( romantic golpo page e dukhsilam but ei golpo tai bhule touch lege gesilo and amio koutohol dhore rakhte na pere pora start kori…. Honestly bolbo????…..first e sob amr mathar upor diye jacchilo 🥲…mane kahinir drisshopot kon jaiga theke kon jaigai jacchilo ami kisui bujhte parsilam na 🤭…kintu kisuta pore besh moja pelam….. Tumi asholei onnnnk bhalo likho❤️🤍❤️
    Jai hok amr kukirtir kotha ekhono bola ses hoi ni😅….agei bollam amr xm cholche but eta pore ses na kora porjonto shanti pacchilam na…. Kintu kopal🤦‍♀️…ses r holo koi tumi nijei ekhono likhe ses koro ni 😫….tw oirat e r amr academic boi pora holo na…… & interesting part wta j ami matro dui din e tumr ei golper 42 ta part pore ses korsi 😁….bhabte parso ki poriman bhalo lagse amr?….but ami ending na peye hotash😐…opekkha amr kono kalei shojjo hoi na 😕….tao tumr ei golpo tar jonno amr opekkha kortei hobe….kintu kintu kintu🙃….ei golpo porar chokkore ami dui din kisu na porei amr physics & higher math xm dilam…..emn xm ami jiboneo dei ni🥲….xm er jonno ber hoar ag porjonto golpota porsi abr xm theke fire golpo pora continue korsi…mane mut kotha tin ghonta r xm r asha jaoa dui ghonta kore bad diye baki ta time ami shudhu ei golpotai porsi😘….infact ami last dui rat ekfutao ghumai ni🙃….amr ashoktir level bujhte parso? Jai hok obak kora bishoi holo amr xm niye ektu o pera lagse na 🤣🤣🤣…ok onk tw ok bok korlam
    Ebr kajer kotha boli…..👉next part gulu taratari dye dio ok?….ami asholei beshi opekkha korte pari na 😭😭😭😭plz plz plz taratari dio🥺…..r ami ghumai jehetu next part nei r jege theke ki korbo?…..abro bolte icche kortese……..golpo ta ami montro mughder moto porsi🥹…etotai bhalo chilo….🥰

Comments are closed.