মহামায়া পর্ব ৪৩
তুশকন্যা
ইমানি নিজের সুসজ্জিত কেবিনে রাখা সিসিটিভি মনিটরের সামনে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার দুহাত বুকের ওপর শক্ত করে ভাঁজ করা; তীক্ষ্ণ আঁখিযুগলে এক চিলতে অবাধ্য হাসির ঝিলিক। তবে তার ঠিক বিপরীত দশা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাভেলের। চরম অস্বস্তিতে সে নিজের আঙুল কামড়াচ্ছে, যেন যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো বিপদের আশঙ্কায় তার হৃৎপিণ্ড থমকে যাবে।
মনিটরের পর্দায় তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি দৃশ্য সচল—যা সরাসরি কেনীথের কেবিন থেকে সম্প্রচারিত হচ্ছে। ইমানি আসলে দেখতে চেয়েছিল, আনায়ার আকস্মিক উপস্থিতিতে কেনীথের প্রতিক্রিয়ার পারদ ঠিক কতখানি ওপরে চড়ে। শুরুতে দৃশ্যপট স্বাভাবিক মনে হলেও, কেনীথ যখনই ক্ষিপ্ত হয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল, তখনই দুজনের ঘোর কাটল। পাভেল প্রায় থতমত খেয়ে ভড়কে উঠল,
”এই রে! আসতেছে, আসতেছে! ইমুর বাচ্চা, বন্ধ কর, বন্ধ কর, দেখে ফেললে সোজা জানে কোপাবে।”
হামলাটা যেন বজ্রপাতের মতো অতর্কিত ছিল। পাভেলের কথায় ইমানি দ্রুত সজাগ হলো ঠিকই, কিন্তু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। দুজনে মিলে হুড়োহুড়ি করে কিবোর্ড আর মনিটরের সুইচে আঙুল চালিয়ে ফুটেজটি সরিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। তবে শেষরক্ষা হলো না। তারা দৃশ্যপট পরিবর্তনের সুযোগ পাওয়ার আগেই কেবিনের গ্লাসডোর ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল সেই ক্রুদ্ধ পুরুষ।
—”ও এখানে কী করছে?”
সরাসরি নিক্ষিপ্ত প্রশ্নে পাভেল তোতলাতে শুরু করল। অথচ ইমানি অবিশ্বাস্য রকমের শান্ত। সে ধীরস্থিরে দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন কিছুই ঘটেনি। তবে দুজনের শরীর দিয়েই সিসিটিভির মনিটরটি আড়াল করার এক ব্যর্থ চেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছিল।
কেনীথের প্রশ্নের পিঠে ইমানি অত্যন্ত নির্লিপ্ত স্বরে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
”হোয়াট হ্যাপেন্ড, ভি? ভেতরে আসতে হলে একবার নক্ করে তো আসবি… সো ন্যাস্টি!”
ইমানির উন্নাসিকতায় কেনীথ দুই পা এগিয়ে এল। দাঁতে দাঁত চেপে সে হিসহিসিয়ে উঠল,
”আমি তোর বেডরুমে ঢুকিনি যে পারমিশন নিয়ে আসব, ইডিয়ট! এতগুলো বছর ধরে আমরা এখানে একসাথে কাজ করছি, আর তুই আজ আমাকে ম্যানার্স শেখাতে আসছিস?”
ইমানি মুহূর্তের জন্য থতমত খেয়ে গেল। যদিও বাইরের গাম্ভীর্যে সে এক ফোঁটা ফাটল ধরল না। সে জানত কেনীথ বিচলিত হবে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া যে এত দ্রুত এবং এতটা তীব্র হবে, তা তার ভাবনার অতীত ছিল। নিজেকে তটস্থ রেখে সে বলল,
”এনিওয়ে, কী হয়েছে তা স্পষ্ট করে বল। তোকে দেখে মনে হচ্ছে তুই একটু বেশিই হাইপার হয়ে আছিস।”
কেনীথ নিজের ঠোঁট কামড়ে ভেতরের রোষ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল। রণমূর্তি কিছুটা প্রশমিত করে চাপা স্বরে পুনরায় শুধাল,
”আনায়া এখানে কী করছে?”
”কোন আনায়া?” অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল ইমানি।
কেনীথ তার এই অতিরঞ্জিত ছলনায় কর্ণপাত না করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পাভেলের দিকে তাকাল। পাভেল আর সহ্য করতে না পেরে হাত তুলে আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠল,
”বিশ্বাস করো ভাই, আমার কোনো দোষ নেই।আমি কিচ্ছু জানিনা। সব ও করেছে, ও!”
পাভেল বারবার আঙুল উঁচিয়ে ইমানিকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করল। কেনীথ এবার পুনরায় ইমানির দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
”হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস! আমাকে কি ঠিক করে বলবি যে, তোদের মাথায় আসলে কী চলছে?”
ইমানি আবারও সেই মায়াবী ভাবলেশহীন মুখাবয়ব ধারণ করল,
“আশ্চর্য! আমাদের মাথায় আবার কী চলবে? আর আনায়া বলতে… ওহ হ্যাঁ, ওই আনায়ার কথা বলছিস? কেন, ও আবার কি করেছে?”
ইমানির এরূপ ভাবগাম্ভীর্য দেখে কেনীথ তপ্ত শ্বাস ফেলল। চাপা স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
”সুইঠি! আমি জানতে চেয়েছি, ও এই হেডকোয়ার্টারে—তাও আবার আমার পারসোনাল কেবিনের ভেতর কী করছে?”
ইমানি এবার কিছুটা স্বাভাবিক গাম্ভীর্যের ঢঙে বলল,
“আ… সরি! এটা হয়তো তোকে আগেই জানানোর প্রয়োজন ছিল। ও জবের জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসেছিল। মেয়েটা সত্যিই ব্রিলিয়ান্ট, আমারও পছন্দ হয়ে গিয়েছে। সেজন্য তোর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের স্লটটা ওকে দিয়ে দিয়েছি।”
কেনীথ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আওড়াল,
“আমার পিএ? আনায়া? আর ইউ কিডিং উইথ মি? আমরা এত বছর ধরে এখানে কাজ করছি, কোনোদিন তো কারও পারসোনাল এসিস্ট্যান্টের প্রয়োজন হয়নি। না আমার, না তোর, আর না পাভেলের! তাহলে হঠাৎ এমন কী হলো যে…!”
কেনীথ কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই ইমানি টেবিলের সাথে গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে, নির্লিপ্ত এক ভাবমূর্তি নিয়ে বলল,
”উঁহু, তুই অযথাই এতো রিয়েক্ট করছিস। আমি ভেবেচিন্তেই এই ডিসিশন নিয়েছি। আমাদের কারও অফিশিয়াল পিএ না থাকলেও লরেনসহ বেশ কয়েকজন স্টাফ আমাদের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো’র দেখাশোনা করে। তারা হয়তো কাগজ-কলমে পিএ নয়, কিন্তু কাজের ধরণ তো একই।
যেহেতু আমাদের ইন্ডাস্ট্রি এখন একটি বিগেস্ট ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই কাজের ক্ষেত্রে আমাদের আরও বেশি অর্গানাইজড হতে হবে। এই কারণেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে আমাদের প্রত্যেকেরই একজন করে পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকবে।”
ইমানির প্রফেশনাল যুক্তির সামনে কেনীথ ক্ষণকাল স্তব্ধ হয়ে রইল। পরক্ষণেই সে পুনরায় চাপা কণ্ঠে হুংকার দিল,
”ঠিক আছে, পিএ রাখার প্রয়োজন হলে রাখ। কিন্তু আমাকে একবারও কি জিজ্ঞেস করা যেত না? আর সবথেকে বড় কথা, আনায়া কীভাবে আমার পিএ হতে পারে? ও তো আমাদের কাজের কিছুই জানে না! একটা ফাইল চেয়েছি, ও দিয়েছে আরেকটা। এভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ নিয়ে কাজ করার মানে কী?”
ইমানি ভেতরে ভেতরে আরেকটু ভড়কে গেল। মেয়েটাকে আরেকটু শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠানো উচিত ছিল। তবুও সে দৃঢ় গলায়, কেনীথকে উল্টো বুঝ দিয়ে বলল,
“তো কি হয়েছে, ভি? আস্তে আস্তে শিখে যাবে তো।”
কেনীথ দু-পা এগিয়ে আবারও দাঁতে দাঁত পিষে হুংকার ছুঁড়ল,
“ইডিয়ট, এটা কোনো কিন্ডারগার্টেন স্কুল নয় যে বাচ্চাদের ধরে ধরে কাজ শেখাবো!”
কেনীথের ভাবমূর্তি অতিমাত্রায় চড়া দেখে ইমানি আর ভণিতা করার সাহস পেল না। দ্রুত নিজের দৃষ্টি পাভেলের দিকে ফিরিয়ে বলল,
“পাভেল! যা তো, গিয়ে ওকে ডেকে নিয়ে আয় তো। দেখি কি ঝামেলা হয়েছে।”
পাভেল আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে আনায়াকে নিয়ে আসার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওদিকে কেনীথ এখনো ইমানির দিকে রুষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে। রমণীর এই কৃত্রিম নিস্পৃহতা যে তাকে একদমই বোকা বানাতে পারেনি, তা তার চোখের চাহনিতেই স্পষ্ট। অথচ ইমানিকে দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত কিছুই আজ তার কাছে একদম স্বাভাবিক।
কিছুক্ষণ পর পাভেলের পেছনে পেছনে অত্যন্ত শান্ত ও সুবোধ বালিকার মতো মাথা নুইয়ে ধীরে ধীরে কেবিনে প্রবেশ করল আনায়া। ঘরের থমথমে পরিবেশ দেখে সে নিজের সমস্ত চঞ্চলতা আড়াল করে এক প্রকার জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শুরুতে সবকিছু বেশ স্বাভাবিক এবং অফিসিয়াল নিয়মের গণ্ডিতেই ছিল। কিন্তু আনায়ার কপাল আজ আর তার সহায় হলো না।
হুট করেই রমণীর হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটি উচ্চস্বরে বেজে উঠল, আর সেই আকস্মিক শব্দ তরঙ্গে পুরো ঘরের জমাটবদ্ধ গাম্ভীর্য মুহূর্তেই ওলটপালট হয়ে গেল।কেবিনের চারদিকের কাঁচের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে স্পিকারে সশব্দে বেজে উঠল এক চটুল গানের লিরিক্স,
”রাত এখনো বাকি, প্রেম রাতেই পাখি, তাই এতো নাচাকোঁদা রেএএএএএ!”
তার পরপরই বেজে উঠল এক অদ্ভুত ও বিদঘুটে সুর। আকস্মিক এই সুরের ধাক্কায় আনায়া নিজের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার উপক্রম হলো। এই অভিজাত করপোরেট অফিসে এমন একটি উদ্ভট গান বাজা তো দূরের কথা, কেউ কল্পনাও করতে পারে না।
ইমানি আর কেনীথ দুজনেই চরম বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে আনায়ার দিকে ফিরে তাকাল। ওদিকে আনায়া তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়; লজ্জায় ও অপমানে তার ফর্সা মুখশ্রী নিমেষেই লাল-নীল হয়ে উঠছে। গতরাতে নিজের ঘরে একা একা শয়তানি করে এই গান ছেড়ে নাচানাচির সময় কখন যে অবচেতন মনে গানটাকে ফোনের রিংটোন হিসেবে সেট করে দিয়েছিল, তা সে নিজেও প্রায় ভুলতে বসেছিল।
কিন্তু আপাতত যে বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ডটি ঘটে গিয়েছে, তা নতুন করে ব্যাখ্যা করার কোনো অবকাশ রাখে না। আনায়া তীব্র লজ্জায় তড়িঘড়ি করে ফোনটা কাটতে গেল, কিন্তু হাত কাঁপায় ফোনটি তার আঙুলের ডগা থেকে ছিটকে মেঝেতে আছড়ে পড়ে স্লাইড করে সোজা বিশাল গ্লাস টেবিলের একদম শেষ প্রান্তে চলে গেল।
পাভেল পরিস্থিতি দেখে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। আনায়া মরিয়া হয়ে ফোনটা ধরার জন্য টেবিলের নিচে অন্ধের মতো ছুটতে গিয়ে নিজের পায়ের সাথে পা জড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ার দশা হলো। তার এই টালমাটাল অবস্থা দেখে ইমানি আর পাভেল দুজনে একসাথে আঁতকে উঠে চেঁচিয়ে বলল,
”এই এই আস্তে…!”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! টেবিলে ধাক্কা লেগে ফোনটি তখনো অবিরামভাবে তার সেই উদ্ভট লিরিক্স গেয়েই চলেছে,
”কলি যুগের কেষ্ট রাঁধা,
কলি যুগের কেষ্ট রাঁধা,
ডিস্কো গিয়ে করে ডান্স!
ভজো গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ,
লহ গৌরাঙ্গের নাম রে…”
আনায়া বহু কসরত করে টেবিলের নিচে মাথা গলিয়ে কোনোমতে ফোনটা হাতের মুঠোয় পুরল। দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে দুহাতে স্ক্রিনে এলোপাতাড়ি টিপে-চেপে কলটা রিসিভ করার চেষ্টা করল। কিন্তু তাড়াহুড়োয় কলটি কাটার পরিবর্তে হুট করে লাউডস্পিকার মোডে চলে গেল। স্ক্রিনে আইজেলের নাম দেখে আনায়া শুরুতেই দাঁতে দাঁত চিপে হিসহিসিয়ে উঠল,
”আইজেলের বাচ্চা…”
কিন্তু তার বাক্য সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই, ওপাশ থেকে লাউডস্পিকারের উচ্চৈঃস্বরে আইজেলের কণ্ঠ গমগম করে উঠল,
”আনায়ার বাচ্চাআআআ! সকাল সকাল কাউকে কিছু না বলে কোথাও চলে গেছো তুমি?…”
আইজেলের কথাও শেষ হতে পারল না, তার আগেই ওপাশ থেকে ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ডে সাবার কান ফাটানো চিলচিৎকার ভেসে এল,
”ঐ শালী! কোথায় আছিস তুই? দ্রুত বাড়িতে আয়। সেদিন আমার ফেসওয়াশ নিয়েছিলি, তোর পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও ওটা পাচ্ছি না। জলদি বল আমার ফেসওয়াশ কোথায় রেখেছিস!”
লাউডস্পিকারে ভেসে আসা এই ঘরোয়া এবং চরম আপত্তিকর ঝগড়ার শব্দে বদ্ধ কেবিনের সম্পূর্ণ আবহ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। আনায়া কী বলবে, কী করবে—নিজেও জানে না। সে সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ফোন থেকে অপরাধীর মতো চোখ তুলে সে চারপাশের দিকে তাকাতেই, দেখল তিন জোড়া অদ্ভুত ও স্তম্ভিত চোখ তাকে একনাগাড়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। কেনীথের দৃষ্টিতে তীব্র বিরক্তি ও বিস্ময় সংমিশ্রণ; পাভেলের চোখ কপালে, আর ইমানি যেন নিজের গম্ভীর্যের আড়ালে হাসি চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
এদিকে আনায়ার কেবল ইচ্ছে করছে, লজ্জায় মেঝের টাইলস ফুঁড়ে পাতালপুরীতে প্রবেশ করতে কিংবা হাত-পা ছুঁড়ে ছোট বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করতে। এই একেকজন দাম্ভিক, গম্ভীর, গুমোট মানুষদের সামনে তার আত্মসম্মান আজ ধুলোয় মিশে ছারখার হয়ে গিয়েছে। অথচ ওদিকে সাবা এখনো ফোনের ওপার থেকে চিৎকার করেই যাচ্ছে। আনায়া কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপা আঙুলে ফোনটা কেটে দিল।
পরমুহূর্তেই সে ফোনটা সাইলেন্ট মোডে দিয়ে, লজ্জায় মাথা একদম নুইয়ে ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটা যে এই মুহূর্তে তীব্র বিব্রতবোধ করছে এবং নিজের ভেতরেই কুঁকড়ে যাচ্ছে, তা তার নুইয়ে পড়া অবয়বেই দেখেই স্পষ্টত। আনায়ার এই করুণ, অসহায় দশা দেখে ইমানি নিজের গম্ভীর ভাবমূর্তি কিছুটা শিথিল করল। সে ভারী শ্বাস ফেলে পরিবেশটা হালকা করার প্রয়াসে শান্ত স্বরে বলল,
”ইটস ওকে, রিল্যাক্স! কিচ্ছু হয়নি।”
ইমানির সান্ত্বনাদায়ক বাক্যটি শোনার পর আনায়া কিছুটা ধাতস্থ হলেও তার অবনত মস্তক আর তোলার সাহস হলো না। কক্ষের ভেতরের সেই গুমোট স্তব্ধতা যেন আরও কয়েক গুণ ঘনীভূত হয়েছে। কেনীথ এতক্ষণ ইমানির পাশে স্থির রইলেও, এবার সে ধীর পায়ে কক্ষের অনপ্রান্তে এগিয়ে গেল। তার দুই হাত ট্রেঞ্চকোটের পকেটে অবিন্যস্তভাবে গোঁজা; মুখাবয়বে এক কঠিন নিস্পৃহতা।
সে কোনো কথা না বলে জানালার কাঁচের ওপারে মিউনিখের ধূসর আকাশটার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার এই নীরবতা যেন পুরো পরিবেশের ওপর এক অদৃশ্য চড়চাপড়।
ইমানি টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্রের দিকে ক্ষণকাল দৃষ্টিপাত করে পুনরায় নিজের পেশাদার আভিজাত্য ফিরিয়ে আনল। সে চেয়ারে সোজা হয়ে বসে আনায়ার উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
”সো, আনায়া। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে আর সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। এবার একটু প্রফেশনাল আলোচনা করা যাক। আই হোপ, তোমার একটু হলেও আইডিয়া আছে যে ব্লাডেন গ্যালারি এবং হেডকোয়ার্টারের কাজের ধরণ কতটা জটিল?”
আনায়া আলতো করে মাথা নাড়ল। তার কণ্ঠস্বর এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, তবে সে নিজেকে শক্ত করে বলল,
“জ্বী, পাভেল ভাই আসার সময় বলেছে আমায় কিছু কিছু…। এখানে আর্ট কিউরেশন, ইন্টারন্যাশনাল ক্লায়েন্ট ডিলিং আর কি যেন….আ, হ্যাঁ বেশ কিছু সিক্রেট প্রজেক্টের কাজ হয়।”
আনায়া হাত কচলাতে কচলাতে কোনোমতে বলে ফেলল। ইমানি ফাইলের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল।
”এক্স্যাক্টলি, আর এই কারণেই ভি-এর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের দায়িত্বটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলা চলে। তার প্রতিদিনের শিডিউল মেইনটেইন করা, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ মেইলগুলোর ড্রাফট প্রস্তুত করা এবং কনফিডেন্সিয়াল ফাইলগুলো ক্যাটাগরি ওয়াইজ গুছিয়ে রাখা—এসবই হবে তোমার মূল কাজ। আশা করি, আজকের মতো ফাইলের হেরফের আর ভবিষ্যতে হবে না?”
ইমানির কণ্ঠের এই সূক্ষ্ম শ্লেষটুকু আনায়ার মস্তিষ্কে গিয়ে বিঁধল। সে আড়চোখে একবার বিশাল প্যানোরামিক জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কেনীথের দৃঢ় প্রশস্ত পিঠটার দিকে তাকাল। লোকটা এখনো বরফের মতো জমে আছে, যেন এই ঘরের কোনো কথার সাথেই তার কোনো সংযোগ নেই। আনায়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে কিছুটা ফিসফিস করে বলল,
“আজকের ভুলটা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। মানে…কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এরপর থেকে সব ঠিকঠাক করব, প্রমিজ। কাজের ক্ষেত্রে আমি আমার সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখব।”
এতক্ষণ চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাভেল এবার নিজের জড়তা ঝেড়ে কাশির একটি কৃত্রিম শব্দ করল। সে ইমানি আর আনায়ার দিকে চেয়ে কিছুটা গম্ভীর মুখে বলল,
”নায়রা! একটা বিষয় ক্লিয়ার করা দরকার। আমাদের ক্লায়েন্টদের একটা বড় অংশ কিন্তু ইউরোপের বাইরের। ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যারিয়ার একটা বড় ফ্যাক্ট। আনায়া কি জার্মান কিংবা অন্য কোনো ইন্টারন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজে ফ্লুয়েন্ট…?”
প্রশ্নটা শুনে আনায়ার ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটি আত্মবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠল, যা কেবল ইমানির চোখেই ধরা পড়ল। আনায়া পাভেলের দিকে তাকিয়ে মার্জিত স্বরে উত্তর দিল,
”আমি ইংরেজি এবং বাংলার পাশাপাশি উর্দু, হিন্দি, জাপানিজ, চাইনিজ, আরাবিয়ান সবগুলোই টুকটাক পারি। কিন্তু একসাথে বলতে গেলে খিচুড়ি হয়ে যায়। আর জার্মান ভাষাটা আমি A2 লেভেল পর্যন্ত পারি, যদি দরকার পড়ে তাহলে সি লেভেলটাও শিখে নেবো।”
আনায়ার কথাবার্তা শুনে পাশ থেকে পাভেল বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল,
“বাপরে, এতো ভাষা কিভাবে শিখেছো?”
আনায়া মাথা চুলকে ইতস্তত করে হেসে বলল,
“কার্টুন, এনিমি, ড্রামা,মুভি,সিরিয়াল এসব দেখে।”
তার কথা শুনে পাশে দাঁড়ান পাভেল যেন আরেকটু যুতসই আস্তানা খুঁজে পেল,
“তুমি এনিমি দেখো? জুজুৎসু কাইসেন দেখেছো?”
আনায়াও এবার বেশ গদগদ হয়ে বলল,
“হ্যা,হ্যা, গোজোকে তো আমার অনেক ভাল্লাগে।”
মূহুর্তেই প্রফেশনাল আলাপ-আলোচনা থেকে দুজন টপকে পড়ল কাল্পনিক বিনোদন চরিত্রদের আলোচনায়। পাভেল আর আনায়া কথা বলছে, অন্যদিকে ইমানি চোখ পিটপিট করে দুজনের কান্ডকারখানা দেখছে। কখনো বা, আড়চোখে তাকাচ্ছে কেনীথের দিকে। কিন্তু সে বান্দা নিজের মতোই আরেক জগতে যেন বিচরণ করছে।
পাভেল-আনায়ার অতিউৎসাহী অবস্থা দেখে, ইমানি তখন পেন দিয়ে টেবিলের ওপর মৃদু টোকা দিয়ে গলা খাকিয়ে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
”উহুম, এবার কাজের কথায় আশা যাক। আগামী মাসটা আমাদের এই অর্গানাইজেশনের জন্য অত্যন্ত ক্রুসিয়াল। বেশ কিছু বড় প্রজেক্টের ডেলিভারি আছে, একই সাথে কিছু ইন্টারনাল শিফটিংও চলবে। ভি হয়তো সবসময় তোমাকে গাইড করার সময় পাবে না, তাই তোমাকে সেলফ-ডিপেন্ডেন্ট হয়ে কাজ শিখতে হবে। লরেন তোমাকে আজ গ্যালারির বাকি ডিপার্টমেন্টগুলোর সাথে ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দেবে।”
আনায়া ভদ্র মেয়ের মতো কেবল মাথা নাড়ল। ইমানি তাকে আরো বেশ কিছু কাজ বুঝিয়ে দিল।
সবাই যখন কথা বলছিল, কেনীথ তখনো জানালার দিকে তাকিয়ে একমনে নিজের হাতের মুঠোটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে। তার মস্তিষ্কে তখন কাজের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে আনায়ার এই জেদ। মেয়েটা যে স্রেফ তার কাছাকাছি থাকার জন্য নিজের ‘মন্ত্রীর মেয়ের’ পরিচয় বিসর্জন দিয়ে এখানে স্টাফের কাজ করতে এসেছে, তা কেনীথের বুঝতে বাকি নেই। কিন্তু এই মরণব্যাধির দিনগুলোতে সে তো কোনো মায়ার বাঁধন জড়াতে চায় না। মেয়েটার এই পাগলামি কীভাবে থামানো যায়, সেই চিন্তাই তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।
ইমানি ফাইলটা সজোরে বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল। সেই শব্দে যেন আলোচনার সমাপ্তি ঘোষিত হলো। সে আনায়ার দিকে চেয়ে শেষবারের মতো বলল,
”তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আজ বিকালের মধ্যেই রেডি হয়ে যাবে। কাল সকাল আটটা থেকে তোমার ডিউটি শুরু। আশা করি, তুমি আমাদের নিরাশ করবে না।”
”ধন্যবাদ আপনাকে,” বলে আনায়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। কিন্তু বিদায় নেওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ইমানি মৃদু ইশারায় তাকে থামাল। টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে সে আনায়াকে বসার নির্দেশ দিল। আনায়া কিছুটা অবাক হলেও বাধ্য মেয়ের মতো আবার চেয়ার টেনে বসল। ইমানি তার দিকে সোজা হয়ে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবেচিন্তে বলল,
”যাওয়ার আগে তোমার শিফটটা একটু ক্লিয়ার করে নেওয়া দরকার। আমাদের এখানে দুটো শিফট চালু আছে। ফার্স্ট শিফট সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা, আর সেকেন্ড শিফট বিকেল চারটা থেকে রাত বারোটা। যেহেতু তুমি ভি-এর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, সো ওকে ফলো করাই তোমার জন্য বেটার হবে। ও নরলামি মর্নিং শিফটেই…”
বলতে বলতেই ইমানি হুট করে থেমে গেল। তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে নতুন এক ভাবনা হোঁচট খেলো। সে আনায়ার ফাইলের দিকে আর একবার চোখ বুলিয়ে, কিছুটা কিউরিওসিটি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
”ওয়েট,তুমি তো এদেশে স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছ। রাইট?”
আনায়া বিনীতভাবে মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
“জ্বী।”
”সেক্ষেত্রে তো তোমার ইউনিভার্সিটির ক্লাসের একটা ব্যাপার থাকে,” ইমানি হাতের পেনটা টেবিলে রেখে জানতে চাইল,
“মিউনিখের কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছ তুমি?”
আনায়া কোনো দ্বিধা ছাড়াই ছোট করে উত্তর দিল,
“টাম (TUM)-এ।”
ইমানি সামান্য ভ্রু কুঁচকে কিছুটা অবাক হলো। টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখ বা ‘টাম’ জার্মানির অন্যতম টপ লেভেলের একটা ইনস্টিটিউট। সে আগ্রহ নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করল,
“কোন ডিপার্টমেন্টে?”
এই প্রশ্নে আনায়ার এতক্ষণের চপলতা যেন নিমেষেই গায়েব হয়ে গেল। সে প্রচণ্ড ইতস্তত বোধ করতে লাগল। অবচেতনভাবেই তার আড়চোখ জোড়া একবার জানালার পাশে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা কেনীথের ব্যাক সাইডের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল। আনায়া নিজের শুকনো ঠোঁট দুটো সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে, অত্যন্ত নিচু স্বরে আওড়াল,
”মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং…
শব্দ ক’টি কেবিনের বাতাসে ভাসামাত্রই যেন এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাভেল আর চেয়ারে বসা ইমানি—দুজনেই যুগপৎভাবে বিস্মিত এক দৃষ্টি নিয়ে জানালার পাশে উল্টো মুখে দাঁড়িয়ে থাকা কেনীথের দিকে তাকাল। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে, কেনীথ নিজেও এই টাম-এর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টেরই একজন পার্ট-টাইম প্রফেসর এবং বর্তমান সেশনে সেখানে নিয়মিত ক্লাসও নেয়! অর্থাৎ আনায়া আর কেনীথের দেখা আগে থেকেই হয়ে আসছে।অথচ এই কথাটা একবারও কেনীথ তাদের বলেনি। পাভেল অবাক হলেও, ইমানি মনে মনে কেনীথকে উদ্দেশ্য করে গালি ছুড়ল,
“শালা, ভেতরে ভেতরে লাইন ঘাট আগেই বানানো শেষ। এখন এসে যত ড্রামা!”
ইমানি কেনীথের উদ্দেশ্যে জোর গলায় কিছু বলতে যাবে,তার আগেই কেনীথ হঠাৎ ঘুরে দাড়াল। সে ইমানি কিংবা আনায়ার দিকে একবারের জন্যও তাকাল না। কোনো অতিরঞ্জিত ভাবগতিক ব্যতীত সে দৃঢ় পায়ে কেবিন হতে বেরিয়ে যেতে পা বাড়াল।
কেবিনের গ্লাসডোর ঠেলে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে, পেছনের দিকে না ফিরেই সে পাভেলের উদ্দেশ্যে আদেশ ছুঁড়ল,
”পাভেল, সাথে আয়।”
পাভেল আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। সে অত্যন্ত নার্ভাস হয়ে একবার ইমানি এবং আরেকবার আনায়ার দিকে অসহায় ভঙ্গিতে একবার তাকাল। তারপর দ্রুত পায়ে কেনীথের দীর্ঘ ছায়াকে অনুসরণ করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
ইমানির কাছ থেকে কাজের ব্যাপারে আগাগোড়া সব বুঝে নিয়ে, আনায়া বেশ উৎফুল্ল মনে কেবিন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। হাতের হালকা গোলাপী রঙের আইফোনটাকে বারবার উলোটপালোট করতে দেখতেই তার মনটা বিষন্নতায় ভড়ে উঠছে। ছয়টা মাসও হয়নি ফোনটা কিনেছিল। অথচ হাত থেকে ফস্কে পড়ে গিয়ে ফোনটার দশা এখন চল্লিশা।
আনায়া হাসিখুশির মাঝেও, ছলছলে দৃষ্টিতে চেয়ে শুধু একটা কথাই আওড়াচ্ছে,
“আমার আইফোন, আআআআ, আমার আইফোন!”
এরিমধ্যেই করিডোরের এককোণে দেখা মিলল পাভেলের। সে কেনীথের সাথে আলোচনা শেষ করে আবার ইমানির কাছে ফিরছিল।এরিমধ্যে পাভেল আর আনায়া মুখোমুখি হতেই, পাভেল মুচকি হাসল।এছাড়া বেশি কিছু অবশ্য বলা বা করারও নেই। কিন্তু সেই মুচকি হাসিতেই আনায়া গললো না। বরং পাভেল মুচকি হাসি দিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে যাবার আগেই, আনায়া আবারও তার পথে বাঁধা হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। এবার পাভেলের ললাটে দুটো ভাঁজ পড়ল। সে ভ্রু উঁচিয়ে উৎসুক স্বরে জানতে চাইল,
“আনায়া, কিছু বলবে?”
আনায়া তার কথা শুনে এক চিলতে বিস্তৃত মুচকি হাসল। পাভেলের কাছে এই হাসি কেনো যেন স্বাভাবিক মনে হলো না। কিছু তো একটা ঘাবলা আছে। তবুও সে নিজেকে আশ্বস্ত করল এই ভেবে যে,সবটাই ঠিক আছে।
ততক্ষণে আনায়া তার দিকে আরো দুপা এগিয়ে গিয়ে, চাপা স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“একটা হেল্প লাগবে!”
তার এই কথা শুনে কেনো যেন পাভেলের কণ্ঠনালী শুকিয়ে গেল। সে ইতস্তত করে বলল,
“হ্যা বলো, কি হেল্প লাগবে, আমি চেষ্টা করব… ”
পাভেলের কথা শেষ হওয়ার আগেই, আনায়া আশেপাশে মুখ ফিরিয়ে চারপাশটা একবার দেখে নিল। পাভেল আকারে বেশ লম্বা হওয়ায়, আনায়া তাকে ইশারায় কিছুটা ঝুঁকতে বলল। পাভেল তার কথা মতো কিছুটা ঝুকে পড়তেই, আনায়া তার আধভাঙ্গা ফাটল ধরা ফোনটা পাভেলের দিকে এগিয়ে, ফিসফিস করে বলল,
“ওনার ফোন নাম্বারটা লাগবে।”
পাভেল বিস্ময়ের সাথে বলল,
“কার?”
আনায়া দ্বিধাহীনভাবে উত্তর দিল,
“আপনার ভাইয়ের!”
পাভেলের চোখমুখ নিমিষেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। দুবার বেশম খেয়ে কেশে উঠল সে। সোজা হয়ে পালানোর জন্য পেছনের দিকে ছুটতেই, আনায়া পেছন থেকে তার হুডিটা টেনে ধরল। আবারও তার মুখোমুখি হয়ে, অতিরঞ্জিত নাটকীয় অসহায়ত্বের ঢঙে বলল,
“পাভেল ভাই! আপনি না আমার ভাই হোন। ওনার ভাই মানে তো আমারও ভাই। তাহলে আমি না আপনার বোন হই? আপনি আপনার বোনের জন্য এইটুকু করতে পারবেন না? ছিহ্, পাভেল ভাই, ছিহ্, আপনি তো ভাই জাতির কলঙ্ক। একটা সাধাসাধি ছোট্ট বোনকে সাহায্য না করেই আপনি পালিয়ে যাচ্ছেন? জগৎ কি আপনার এই অন্যায় মানবে? খোদা কি আপনার উপর ঠাডা ফেলবে না?”
আনায়ার চোখ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম। কি পরিমাণ নাটকবাজ হলে এতো দ্রুত চোখের পানি ঝড়াতে পারে, এটা তাকে না দেখলে বোধহয় কেউ বুঝবে না।
অন্যদিকে রমণীর অসহায়ত্বকে সত্যি ভেবে, পাভেল বেচারা বেশম খেয়ে উঠল। আনায়ার সামনে দুহাত জোর করে বলল,
“বোন আমার, এভাবে ভাইটাকে ফাঁসিয়ে দিও না। তুমি ভাবতেও পারছো না তুমি আমার কাছে কি চাচ্ছো। ভাই কোনোমতে এসব জেনে গেলে, আমায় জানে কোপাবে!”
আনায়া তার রঙেঢঙে জল ছলছলে কান্নাটা থামিয়ে, তৎক্ষনাৎ তাকে আশ্বস্ত করে বলল,
“আরে কিসব বলছেন আপনি, কিচ্ছু হবে না। আমি আছি তো! কেউ আমার ভাইয়ের সাথে খারাপ কিছু করতে এলে, আমি নিজে গিয়ে ঐ বান্দার মাথার খুলি উড়িয়ে দেবো। এখন দেরি না করে, টুপ করে আপনার মহামান্য ত্যাড়া ভাইটার ফোন নাম্বারটা আমাকে দিয়ে দিন না, প্লিজজজজ!”
পাভেল আর কোনো উপায় খুঁজে পেলো না এখান থেকে কেটে পড়ার। শেষমেশ নিজের ফোন থেকে কেনীথের ফোন-নাম্বারটা বের করে, বলতে শুরু করল,
‘ +49 143 *** **** ‘
আনায়া অতিদ্রুত ফোন নাম্বারটা নিজের ফোনে তুলে নিল। পাভেলের দিকে বিশ্বজয়ের এক হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
“বিশ্বাস করুন, আপনাকে যে আমার কি করতে ইচ্ছে করছে।”
পাভেল তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,
“কিচ্ছু করতে হবে, খালি এমন কিছু করো না যে দিনশেষে বাঁশটা আমাকেই খেতে হয়।”
আনায়া মুচকি হেসে বলল,
“না, না, একদম চিন্তা করবেন না। আমি কি ওমন মেয়ে নাকি। একদই না, আমি অনেক ভালো। কিন্তু….”
আনায়ার ‘কিন্তু’ শুনে পাভেল চমকে উঠল। বলল,
“আবার কি হলো?”
আনায়া এবার চোখ-মুখে গাম্ভীর্য ঢেলে বলল,
“আমি আপনার কথা কাউকে কিচ্ছু বলব না৷ কিন্তু আপনাকেও একটা প্রমিজ করতে হবে—আপনি যে আমায় ওনার ফোন নাম্বার দিয়েছেন বা আমি যে ওনার ফোন নাম্বারটাও হাসিল করেছি, এটা যেন উনি কোনোভাবেই জানতে না পারে। যতদিন না আমি চাইছি, এটা ওনাকে আপনি বলবেন না।”
পাভেল ভারী শ্বাস ফেলল,
“তা আর বলতে! তুমি ফাঁসলে তো আমিও ফাঁসব। যে লাউ সেই কদুই হবে।”
আনায়া বিস্তৃত মুচকি হেসে চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। তবে যাবার আগে হুট করে পাভেলের উদ্দেশ্যে জোর গলায় বলল,
“ধন্যবাদ কদু ভাই!”
নিমিষেই পাভেলের চোখমুখ চুপসে গেল। হুড়মুড়িয়ে বলে উঠল,
“এ্যাই,এ্যাই এটা তুমি কি বললে …?”
আনায়া ততক্ষণে উড়ন্ত ফড়িং এর মতো করিডোরের সীমানা পেরিয়ে গেছে। পাভেল ততক্ষণে হাবলার মতো দাঁড়িয়ে থেকে, মাথা চুলকে মনে মনে আওড়ায়,
“কদু ভাই? মেয়েটাকে ভালো ভেবেছিলাম, এখন তো সুবিধার মনে হচ্ছে না।”
—“মিশন টু সাকসেস!”, আনায়া খুশিতে গদগদ হয়ে, গা দুলিয়ে একপ্রকার নাচতে নাচতে হেডকোয়ার্টারের নিচের ফ্লোর অব্দি নেমে এসেছে। কোথায় যাচ্ছে, কেনো যাচ্ছে, কোনো কিছুতেই তার হুঁশ নেই৷ মাথায় শুধু কিলবিল করছে, নিত্যনতুন উদ্ভট সব পরিকল্পনা।
কিন্তু এতো কিছুর মাঝে কোনো ভাবেই, আনায়ার খুশি থামছে না। অবশেষে তার আরাধ্যের পুরুষ ভিভিয়ানের ফোন নাম্বারটাও সে হাসিল করে ফেলেছে। এতো খুশি আজ সে কোথায় রাখবে? কোথায় রাখবে?
মনে মনে রমণীর অবাধ্য ছটফটে মন হুট করেই গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
“ও আমার বিলেত রাজা, প্রেমেরী ডালা সাজা… কি নেশা ঢাইলা দিলি গেলাসে…মাইনাসে না পেলাসে…
কোমড় ঘুরায় ঢুমকা দিলে…পুরায় দেশি ফিল আসে…
একদিকে গুনগুন করে গান গাইছে, অন্যদিকে অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে গা দুলিয়ে ছোট্ট ব্যাঙ্গাচীর মতো নেচে-কুঁদে যাচ্ছে। অথচ চপল রমণীর একবারও জন্য হুঁশ হচ্ছে না যে, তার এই উদ্ভট কার্যক্রম উপরের ফ্লোরের করিডোর হতে দাঁড়িয়ে, কালো সুটবুট পড়া এক সুপুরুষ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
কেনীথ সত্যিই বুঝে উঠতে পারছে না, আনায়া এসব কি করছে। নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে নিচের ফ্লোরে চোখ রাখতেই, এমন দৃশ্যর মুখোমুখি হয়েছে সে। তার ভ্রুজোড়া সহসাই কুঁচকে গিয়েছে, ললাটে পড়েছে গভীর ভাজ। মাথায় ঘুরছে রমণীকে ঘিরে একরাশ চিন্তা।
আনায়া আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে কেনীথের কেবিনের সম্মুখস্থ করিডোরে এসে পড়েছে, তা সে নিজেও টের পায়নি। এখানে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা তার ছিল না; কিন্তু অবচেতন মনের খেয়ালে এসে পড়ার পর সে বুঝতে পারল না এখন তার কী করা উচিত। আগ বাড়িয়ে ওই গম্ভীর, কাঠখোট্টা মানুষটার মুখোমুখি হতে তার মন সায় দেয় না। সত্যি বলতে, তার ছোট্ট হৃদয়ে সেই দুঃসাহসটুকুও কুলিয়ে ওঠে না।
ঠিক তখনই, যেন নিয়তির পরিহাসে, চোখের সামনে স্বয়ং কেনীথ এসে দাঁড়াল। একেই বোধহয় বলে—যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। কেনীথ সবেমাত্র নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছিল। মাঝপথে আকস্মিকভাবে আটকা পড়ে গেল আনায়া।
নিমিষেই এই চঞ্চল রমণীর হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ বেগে ধড়ফড় করতে লাগল। খানিক আগে যে মনটা প্রজাপতির মতো ডানা মেলে নাচছিল, তা হুট করেই যেন অমাবস্যার নিকষ কালো ঝড়ে ম্রিয়মাণ হয়ে গেল। তার সমস্ত সাহস মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। কেনীথকে ঘিরে একরাশ দ্বিধা আর আশঙ্কা তার মস্তিষ্কে জট পাকাতে শুরু করল। পরিস্থিতি সামাল দিতে আনায়া নিজের চলার গতি একদম কমিয়ে দিয়ে, মাথাটা সম্পূর্ণ নুইয়ে ফেলল।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, কেনীথ তাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে, সম্মুখপানে স্থির দৃষ্টি রেখে পাশ কাটিয়ে করিডোর পেরিয়ে চলে গেল। তার ভাবভঙ্গি এতো নির্লিপ্ত ও শান্ত, যেন আনায়া নামক কোনো রক্ত-মাংসের অস্তিত্বই সেখানে উপস্থিত ছিল না!
কেনীথ দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যেতেই আনায়া থমকে দাঁড়াল। শূন্য করিডোরের দিকে চেয়ে অবজ্ঞায় মুখভঙ্গি বিকৃত করে চাপা স্বরে বলল,
”ইশ! কী ভাবের স্বামী আমার! দেখো না জানেমান, তোমার এই সুন্দর জীবনটা আমি কীভাবে ঝালাপালা করি! আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে তুমি কতদিন সুখের ঘুম ঘুমাও, আমিও তা দেখে ছাড়ব।”
এসকল কথা বিড়বিড় করতে করতেই আনায়া দীর্ঘ করিডোরটা পেরিয়ে কেবিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কিন্তু গ্লাসডোরটা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই সে চরমভাবে হকচকিয়ে উঠল। নিজের চাক্ষুষ অনুভূতিকেও এক মুহূর্তের জন্য সে বিশ্বাস করতে পারল না। একটু আগেই না কেনীথ তার চোখের সামনে দিয়ে করিডোর পেরিয়ে চলে গেল! তাহলে কেবিনের ভেতরে বসে থাকা এটা আবার কে?
আনায়া অত্যন্ত ধীর পায়ে দু-পা এগিয়ে যেতেই তার ওষ্ঠকোণে একটি বিস্তৃত, স্বস্তির মুচকি হাসি ফুটে উঠল। অবশেষে তাহলে তার কাল্পনিক ভিভিয়ান এখানেও চলে এসেছে! কী অপরূপ দৃশ্য! পেছনের সিটে রাজকীয় ভঙ্গিতে গা এলিয়ে দিয়ে সে নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে গভীর মনোযোগ সহকারে চেয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
আনায়া চোখ দুটো পিটপিট করে, দীর্ঘ ও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল,
”ইশ! বাস্তবে বজ্জাত বেটা তো আমার দিকে ফিরেও তাকায় না, অথচ কল্পনায় সে কত্ত ভালো! দেখলেই ইচ্ছে করে টুপ করে দুটো চুমু খেয়ে আসি।”
যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। ওটা যে তার কাল্পনিক পুরুষ ভিভিয়ানই, এটা আনায়া মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে নিল। এরপর কোনো কিছু না ভেবেই, অনুচ্চ স্বরে গুনগুন করে একটি গানের কলি গাইতে লাগল,
”আপকা হি কেহনা বানতা…আ…
কেহ—দো—না
ম্যায় শার্মা কে কেহ দুঙ্গি…ই…
ম্যায়নে ভি দিল দিয়া…আ……”
হঠাৎ নিস্তব্ধ ঘরে কারও এমন প্রগলভ কণ্ঠস্বর শুনে কেনীথ ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে তাকাল। আনায়ার এমন আলুথালু ভাবগতিক আর উদ্ভট আচরণ দেখে সে নিজেও যেন কূল-কিনারা পাচ্ছিল না যে ঠিক কী ঘটছে এখানে! একটু আগেও তো সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল।
এদিকে কোনো প্রকার পূর্বাভাস ছাড়াই, গাইতে থাকা রমণী টুপ করে ওই বলিষ্ঠ পুরুষের কোল ঘেঁষে চেপে বসল। আকস্মিক এই কাণ্ডে কেনীথ চরমভাবে হতভম্ব হয়ে আড়ষ্টের মতো জমে গেল। আনায়া পরম আস্থার সাথে বলিষ্ঠ পুরুষের ঘাড়-গলা দু-হাত জড়িয়ে ধরে, কিছুটা আয়েশি ভঙ্গিতে গা ছেড়ে তার কোলের উপরেই আধশোয়া হলো; কেনীথের চোখে চোখ মিলিয়ে গুনগুনিয়ে গাইল
‘আঁখোঁ আঁখোঁ কা মসলা…
আচ্ছা—থা
আব লে যাও আপনা বানা কে…
মুঝে মেরি জাআআন…”
আনায়া গান থামিয়ে চাপা উৎসাহের সাথে শুধালো,
”আপনি এখানেও চলে এসেছেন?”
বলা শেষ হতেই তার দৃষ্টি আকর্ষিত হলো টেবিলের ওপর। কেনীথের গলা থেকে একটা হাত আলগা করে, চেরির বোল থেকে একটি তাজা, টসটসে চেরি তুলে নিয়ে প্রথমে তার অর্ধেকটা নিজে কামড়ে খেল। অতঃপর বাকি অর্ধেকটা অতর্কিতে কেনীথের ঠোঁটের কাছে ধরল। কেনীথও এক প্রকার ঘোরের বশে সেই আধা-খাওয়া চেরিটুকুন সাচ্ছান্দ্যে নিজের মুখের ভেতর পুরে নিল। এরিমধ্যে আনায়া খুশিতে তার ঠোঁটখানা কেনীথের র’সে ভেজা ঠোঁটের সাথে মেলাতে গিয়েও হুট করে থেমে গেল। তবুও সামান্য সেই ছোঁয়ার সংস্পর্শে, রমণীর ঠোঁটের এককোণে কিঞ্চিৎ লালচে রস লেগে গেল। ততক্ষণে প্রায় বেঁহুশ হয়ে পড়া আনায়া খিলখিল করে হাসতে হাসতে, এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসের সাথে বলে উঠল,
”জানেন আজ কী হয়েছে? আমি আজ আপনার ফো…!”
আনায়ার কণ্ঠস্বর হুট করেই স্তব্ধ হয়ে গেল, আর কপালে ফুটে উঠল সূক্ষ্ম চিন্তার ভাঁজ। সে কেনীথের কোলের ওপর সামান্য নড়েচড়ে বসে, কৌতূহলী দু-হাতে কেনীথের ঠোঁটজোড়া স্পর্শ করতে লাগল। আঙুলের ডগায় চেরির সেই চটচটে, টসটসে রস লেগে যেতেই আনায়ার বিস্ময়ের সীমা রইল না। মনের গভীরের সন্দেহ দূর করতে সে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে লেগে থাকা রসটুকু নিজের ঠোঁটে অব্দি পুরে পরখ করে দেখল। না, সব তো একদম বাস্তব, জীবন্ত মনে হচ্ছে! কিন্তু তাহলে…?
আনায়া নিজের অবুঝ বিস্ময় আর চেপে রাখতে না পেরে, নির্বিকারে চেরি চিবোতে থাকা কেনীথের ঠোঁট দুটো দু-হাতে টেনেটুনে পরীক্ষা করতে লাগল; কেনীথও একটুও বাঁধা দিল না তাতে। পরমুহূর্তেই থমকে গিয়ে আনায়া বলল,
”এসব কী হচ্ছে! আপনি এটা খেলেন কীভাবে? আপনি তো…!”
আনায়া এবার সরাসরি কেনীথের গাম্ভীর্যে মোড়া তীক্ষ্ণ ও লালচে চোখের দিকে তাকাল; দৃষ্টি মেলাল তার গভীর দু-চোখে। এক রাশ চাপা বিস্ময় আর ভীতি নিয়ে বিড়বিড় করল,
”আপনি না একটু আগেই এখান থেকে বেরিয়ে গেলেন, তাহলে এখানে আবার কী করছেন?”
সে কেনীথের প্রশস্ত, শক্ত বুকের ওপর নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে কথাটি বলল। আনায়া এখনো বুঝে উঠতে পারছে না এটা তার অলীক কল্পনা নাকি নিরেট বাস্তবতা। অথচ, সেই প্রশস্ত বক্ষে কান ঠেকাতেই সে স্পষ্ট এক ক্ষীণ, ধীর হৃদস্পন্দনের ধুকপুকানি টের পেল। তাহলে এসব কী ঘটছে তার সাথে?
ততক্ষণে কেনীথ তার নিজের ভেতরের সকল দ্বিধা ও জড়তা কাটিয়ে তুলতে, গম্ভীর্যের সাথে পাশে মুখ ফিরিয়ে তাকাল।এবং কেবিনের অন্যপাশের আরেকটি দরজা তথা সেকেন্ড ডোরের দিকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ইশারা করল সে।
আনায়া এক মুহূর্তের মধ্যেই বজ্রাহতের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মানে, যা ঘটছে সব সত্যি? সে যার কোলে চড়ে নিশ্চিন্তে বসে আছে, সে কোনো কাল্পনিক পুরুষ নয়—সে রক্ত-মাংসের সত্যিকারের ভিভিয়ান!
তৎসত্ত্বেও, চরম লজ্জাজনক ও অপ্রস্তুত এই মুহূর্তেও ওই চঞ্চল রমণীর মুখ থেকে ফসকে নির্গত হলো,
”এত দরজা থেকে কী লাভ, যদি আপনার মনের দরজাটাই খুলে ভেতরে ঢুকতে না পারি!”
আনায়ার মুখে এমন অস্পষ্ট ও অদ্ভুত প্রলাপ শুনে কেনীথ চরমভাবে ভ্রূ কুঁচকে অবজ্ঞার সুরে আওড়াল,
”হুহ্?”
শব্দটা শোনামাত্রই আনায়ার যেন তন্দ্রা ভাঙল, মুহূর্তেই হুঁশ ফিরে এলো তার। এবার সে আর এক সেকেন্ডও অপচয় করল না। নিজের লজ্জাজনক অবস্থানটা অনুধাবন করতেই, সে এক ঝটকায় কেনীথের কোল থেকে নেমে সোজা মেঝের ওপর ছিটকে পড়ল। দু-হাত পেছনের দিকে মেঝেতে ঠেকিয়ে, সে কেনীথের দিকে কয়েক দণ্ড আতঙ্কিত ও অপরাধী চোখে চেয়ে রইল।
আনায়ার এমন উদ্ভট ও ছিটগ্রস্ত কাণ্ডকারখানা দেখে কেনীথ পুরোপুরি হতবাক। এতক্ষণ ধরে এই মেয়েটা আসলে কী করতে চাইছে?
কেনীথ কিছু একটা বলতে উদ্যত হবে, তার আগেই আনায়া তড়িঘড়ি করে মাথা নুইয়ে আর্তনাদের সুরে বলতে লাগল,
”আ…আমি এটা ইচ্ছে করে করিনি! আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার… আমার…”
আনায়া নিজের বাক্যটি সম্পূর্ণ শেষ করতে পারল না। তার আগেই সে হুলস্থুল করে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। কেনীথকে কোনো কিছু বলার বা করার সুযোগ না দিয়েই, সে টেবিলের ওপর থেকে নিজের ফোনটা এক ঝটকায় তুলে নিয়ে তিরের বেগে কেবিন থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল।
অন্য দিকে, মুখের ভেতরের চেরির বীজটা জিহ্বার ডগায় এনে, দন্তের একপাশে চেপে ধরে কেনীথ একাগ্র চিত্তে মনে মনে আওড়াতে লাগল—
“মেয়েটা একদমই স্বাভাবিক নেই। কিছু তো একটা গন্ডগোল পাকাচ্ছে।”
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর কর্মব্যস্ততার অবসান ঘটিয়ে কেনীথ সবেমাত্র নিজের ঘরে প্রবেশ করেছে। অনান্য দিনের মতো আজকের রাতের ডিনারটাও তিনজনপ মিলে বাহিরেই সেরে এসেছে। ঘরের গুমোট আবহাওয়ায় গা থেকে ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে কেনীথ প্রথমেই ধীর পায়ে বাথরুমের দিকে অগ্রসর হলো।
খানিক বাদে গোসল শেষ করে নিস্তেজ, অবসন্ন শরীরে একটা কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার গলিয়ে নিল। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে পুনরায় বেডরুমে ফিরে এলো। হাতের শুভ্র তোয়ালেটা অবহেলায় বিছানার ওপর ছুঁড়ে দিয়েই কেনীথ তার ফোনটা তুলে নিল।
ঘুমানোর পূর্বে ফোনে বিশেষ কোনো কাজ তার থাকে না। তবে আজ লক-স্ক্রিনে ভেসে থাকা অসংখ্য নোটিফিকেশনের ভিড়ে একটি সুনির্দিষ্ট মেসেজে তার দৃষ্টি আচমকা আটকে গেল। জার্মান ভাষায় সেখানে স্পষ্টাক্ষরে লেখা,
”হাই ভিভিয়ান, কেমন আছো?”
কেনীথ ভ্রূ কুঁচকে ফোনটা আনলক করল এবং প্রেরকের নম্বরটি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করল। সম্পূর্ণ অচেনা, অজ্ঞাত একটি নম্বর। তবে বিস্ময়ের কারণ নম্বরটি নয়; প্রশ্ন হলো, তার অত্যন্ত গোপন ও ব্যক্তিগত এই নম্বরটি এই অজ্ঞাত ব্যক্তিটি জোগাড় করল কীভাবে? কেনীথের নিজস্ব সিকিউরিটি ও প্রাইভেসি টিম তো এতটা অপদার্থ কিংবা নড়বড়ে নয় যে এত বড় গলদ তাদের চোখ এড়িয়ে যাবে! তবে কিভাবে…?
প্রথম দেখায় কেনীথের তীব্র ইচ্ছা ছিল নম্বরটিকে তৎক্ষনাৎ ব্লক করে দেওয়ার। তবে কী যেন ভেবে, পরমুহূর্তেই সে নিজেই জার্মান ভাষায় সংক্ষিপ্ত প্রত্যুত্তর লিখল,
”কে আপনি?”
কয়েক মুহূর্তের জন্য সবকিছু শান্ত-স্থির রইল। কিন্তু সেই নীরবতা ভেঙে পরক্ষণেই আবার টুং শব্দে মেসেজ আগমনের শব্দ হলো। কেনীথের চোখের দৃষ্টি এবার আরও খানিকটা কঠোর ও কুঞ্চিত হয়ে উঠল। কাঁচা জার্মান ভাষায়, কিছু অত্যন্ত অশোভন ও প্রাকৃত শব্দের প্রয়োগ করে সেখানে লেখা,
”জান? সবসময় এতো রাগ করে থাকো কেন, হ্যাঁ? একটুও কি হাসিখুশি থাকা যায় না? মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা যায় না? বাই দ্য ওয়ে, তোমার কি গার্লফ্রেন্ড আছে? আমি অবশ্য গার্লফ্রেন্ড থাকা ঢ্যামনাদের সাথে কথা-টথা বলি না।”
তীব্র বিরক্তি ও অবজ্ঞায় কেনীথের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। কোনো প্রকার উত্তর না দিয়েই সে নম্বরটি ব্লক করার জন্য আঙুল বাড়াল। স্ক্রিনের লাল বাটনটিতে ক্লিক করতে গিয়েও সে হুট করে থমকে গেল। এক ভিন্ন, সংশয়ী ভাবনা এবার তার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। কয়েক দণ্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর, সে ওষ্ঠাধর নাড়িয়ে অনুচ্চ স্বরে বিড়বিড় করল,
”ভিভিয়ান?”
অচিরেই কেনীথের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্রূর ও তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। নিজের ওষ্ঠকোণ দাঁত দিয়ে চেপে ধরে ভাবল—জার্মানিতে তাকে ‘ভিভিয়ান’ নামে সেভাবে কেউই চেনে না। এমনকি পাভেল কিংবা ইমানি, তার এই নামটি জানা সত্ত্বেও কখনো তাকে এই নামে সম্বোধন করে না। অথচ এখানে কত নিখুঁতভাবে কেউ একজন নিজেকে খাঁটি জার্মান প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টায় উল্টোপাল্টা লিখে যাচ্ছে!
তবুও মনের ভেতরের সুপ্ত সন্দেহটুকু শতভাগ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে, সে নম্বরটি তার এক বিশ্বস্ত এজেন্টের কাছে ফরোয়ার্ড করে দিল। মাত্র মিনিট পাঁচেকের ব্যবধানে সেই নম্বরের মালিকের নাম, পরিচয় এবং ছবিসহ যাবতীয় ডিটেইলস কেনীথের ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল।
মহামায়া পর্ব ৪২
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করা সেই চিরচেনা মুখাবয়ব আর আসল নামটা দেখামাত্রই কেনীথ দীর্ঘ ভারী শ্বাস ত্যাগ করল। হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরে, পরমুহূর্তেই সেটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলল। একহাত কোমড়ে ও আরেক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কপালের একপাশে স্লাইড করতে করতে,সে গভীর এক ভাবনায় মত্ত হলো। পরক্ষণেই দাঁতে দাঁত পিষে, রুদ্ধ আক্রোশে বিড়বিড় করে উঠল,
”ইডিয়ট একটা!”

Ajker part ta marattok chilo 😆
Haste haste amr obostha kharap hoye gese🤣🤣🤣🤣🤣
Jai hok next part taratari dio
apuh tmr lekha joss.
but aktu taratari dio next part guli.onk w8 koraio nh plssss
apu next part taratari den plz plz plz 😭😔
apu ajkei next part ta uplod kora jay nhh?
apu pls den nhhh.
onk agroho niye boshe asi.
pls deo nh boinnn