Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৪৫

মহামায়া পর্ব ৪৫

মহামায়া পর্ব ৪৫
তুশকন্যা

“বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। আমি কেন ইচ্ছে করে এমনটা করব? যা আপনার তা তো আমারও, তাই না? আর নিজের জিনিসের ক্ষতি কি কেউ কখনো ইচ্ছে করে করে, বলুন?”
মুখ ফস্কে কথাটা উগড়ে দিয়েই আনায়া থতমত খেয়ে গেল। এটা কি বলে ফেলল। একটু বেশিই হয়ে গেল না? তার সামনের এই মহাপুরুষ কি তার কথার অর্থ বুঝেছে? না বোঝাই উত্তম। আনায়া সবমিলিয়ে কেন যেন আরো বেশি ঘাবড়ে গেল। ততক্ষণে কেনীথ নিজের ভ্রু-যুগল কুঁচকে রমণীর দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে, অস্ফুটে বলেই ফেলল,

“হোয়াট ডু ইউ মিন…?”
কেনীথের কথার ভাবগাম্ভীর্যে আনায়া’র কন্ঠনালী শুঁকিয়ে গেল। মাথার মধ্যে কেবল একটাই চিন্তা—‘পালা আনায়া পালা, আরো কেলেঙ্কারি বাঁধানো আগেই তুই পালা!’
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। কোনো এক উছিলার আশায় মরিয়া হয়ে উঠেছিল সে। যেমনি কেবিনের দরজায় কারো আগমন একইসাথে কন্ঠস্বর শুনতে পেল, ওমনি সে সুযোগ বুঝে হাত-পা গুটিয়ে কেনীথের নাগাল ছাড়ল।
—“ভাই, তোমায় একটু….”
পাভেলের কন্ঠস্বর থেমে গিয়েছে। হাতে থাকা ফাইল আর পা-দুটো হয়েছে স্থির। আচমকা কোত্থেকে যেন আনায়া বেরিয়ে তার দিকেই তেড়ে আসছে। হুট করে এই মেয়ে এখানে কেনো আর এভাবে তার দিকেই তেড়েফুড়ে কেনো আসছে তা কিছুক্ষণের জন্য পাভেলের বোধগম্য হলো না। সে কিছু বুঝতে না পেরে, হঠাৎ চেঁচাতে নিলে—তার পূর্বেই আনায়া তার উপর হুমড়ি খেয়ে না পড়ে কোনোমতে নিশানা মোতাবেক পাশ কাটিয়ে কেবিন ছাড়ল। যাওয়ার পূর্বেই পাভেল বাঁধা দিয়ে কিছুটা ভয়ার্ত গলায় চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে, এভাবে পালাচ্ছো কেনো? ভাই ফোন নাম্বারের ব্যাপারে সব জেনে গেছে?”
আনায়া কোনোমতে তার কানে ফিসফিস করে আওড়িয়ে গেল,

“না, না, ওসবের কিচ্ছু হয়নি। আপনি থাকুন আমি যাচ্ছি….”
হুট করে কি হতে কি হলো পাভেলের বোধগম্য নয়। আনায়া চলে যেতেই সে মুখ তুলে সামনের দিকে তাকাল। কেনীথের ভাবগাম্ভীর্যও তো সুবিধার নয়। তার দিকে এমন ভাবে চেয়ে আছে যেন, তাকেই কাঁচা চিবিয়ে খাবে। কিন্তু আনায়া তো বলল সে যা ভাবছে তেমন কিছুই হয়নি, তবে হয়েছেটা কি?
পাভেল ইতস্তত ভাবে কেনীথের দিকে কয়েকপা এগিয়ে গেল। যন্ত্র মানবের এমন রুদ্ররূপ দেখে সে তার ঝাঁকড়া চুলগুলো সামান্য চুলকে নিয়ে বলল,
“ভাই? সব ঠিক আছে তো?”
কেনীথ একটা আওয়াজও করল না। চোয়াল শক্ত করে পাভেলকে দুদন্ড একনাগাড়ে দেখার পর, হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল। কেবিনের পেছন দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে কেবল বলল,

“কাউকে ডেকে এগুলো দ্রুত ক্লিন করিয়ে নে…”
বলতে বলতেই সে নিজের গায়ের কোটটা খুলে ফেলল। টেবিলের আশেপাশে এভাবে কফি-মগ পড়ে থাকতে দেখে, পাভেল অবাক সুরে বলল,
“এগুলো কিভাবে হলো?’
কেনীথ তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু তৎক্ষনাৎ পাভেল প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“ভাই একটা কথা…বাড়ি থেকে কল এসেছিল!”
হঠাৎ এহেন কথা শুনে কেনীথের ব্যস্ত পা-দুটো থেমে গেল। চোখেমুখের গম্ভীর্য আরেকটু প্রকোপ হলো। সে মুখ ফিরিয়ে প্রথমেই প্রশ্ন ছুড়ল,
“বাড়ির সবাই ঠিক আছে?”
তার উদ্বিগ্ন-স্থির আচরণে পাভেল ইতস্তত করে বলল,
“না,না, সবাই ঠিক আছে। কিন্তু…’
কেনীথ ভ্রুদুটো কুঁচকে পাভেলের দিকে কয়েকপা এগিয়ে এলো। চাপা স্বরে বলল,

“কিন্তু কি?”
পাভেল আর ভণিতা করল না। এতক্ষণ ইতস্তত হচ্ছিল কারণ এই বিষয়ে কথা তুললেই ভাই তার রেগে যায়। কিন্তু এবার বাড়ির লোকজনও যেভাবে পাগলামি করছে, তাতে আর কতদিন টিকবে এই তামাশা!
—“তেমন কিছু না, জানোই তো বাড়ির অবস্থা এখন কেমন।… তোমার নূরজান পাগলামি করছে, মামনিরও একই কথা। জানি তোমার কাছে এগুলো এখন বিরক্তিকর, কিন্তু… আমার মনে হয় এবার তোমারও উচিত তাদেরকে বিষয়গুলো ভালোভাবে ক্লিয়ার করে দেওয়া। দুূদিন পরপর এটা নিয়ে কোনো ঝামেলার তো কোনো মানে নেই, তাই না?”

প্রতিবারের মতো এবারও অঘটন ঘটিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরঘুর করছিল আনায়া। সব কেমন যেন আরো বিগড়ে যাচ্ছে, অথচ কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এরিমধ্যে করিডোর দিয়ে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পথ হারাতে নিলে,আচমকা পেছন হতে চেনা এক কন্ঠস্বরে তার পা-দুটো থেমে গেল।
—“আনায়া! একা একা ওখানে কি করছো?”
আনায়া নজর ফিরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখল ইমানি উৎসুক দৃষ্টিতে তার থেকে কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে আরো একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে; হয়তো তার পি.এ.। আনায়া আশেপাশে দুবার নজর ফিরিয়ে, নিজেকে তৎক্ষনাৎ তটস্থ করল। দ্রুতপায়ে ইমানির দিকে কয়েক-পা এগিয়ে এসে গা ঝাড়া দিয়ে মুচকি হেসে বলল,

“আ…আমি? কিছুই না…আ, যদি কোনো কাজ থাকে তবে বলতে পারেন, আমি করে দিচ্ছি।”
ইমানি সরু দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আনায়ার আপাদমস্তক পরখ করল। সবটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না তার। সে যাক গে, আপাতত সে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিএ আর আনায়ার উদ্দেশ্যে একত্রে বলল,
“লরেন তুমি যেতে পারো, আর আনায়া…তুমি আমার সাথে এসো।”
বলেই সে নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়াল। আনায়াও আর কথা না বাড়িয়ে তার পেছন পেছন ছুটল। একইসাথে ইমানিকে পেছন হতে সে বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। ইমানিকে ঘিরে মাথার মধ্যে নতুন কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যেগুলোর ইতিমধ্যে কোনো উত্তর না পেলে খামখেয়ালি রমনীর মস্তিষ্ক যে শান্ত হবে না তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত।

পুরো কেবিনে ইমানি আর আনায়া দুজন এখন সম্পূর্ণ একা, মুখোমুখি বসা। ইমানি বেশ আয়েসি ভঙ্গিতে নিজের ফাউন্টেন পেনটা আঙুলের ডগায় রেখে ঘুরাচ্ছে আর টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা ফাইলের পাতায় নজর বুলাচ্ছে। আর ওদিকে আনায়া ভেতরে ভেতরে তীব্র এক অস্বস্তি ও কৌতুহলে ছটফট করছে। সে কিছু একটা জিজ্ঞেস করার তীব্র তাগিদ অনুভব করলেও, এই গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে তা উচ্চারণ করা সমীচীন হবে কিনা, ভেবে উঠতে পারছে না।
​তবে ইমানি তার প্রখর ও বিচক্ষণ নজরে মুহূর্তেই আনায়ার এই মানসিক টানাপোড়েন লক্ষ্য করল। সে পেনটা টেবিলের ওপর রেখে অনুচ্চ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
​”তুমি বোধহয় কিছু বলতে চাচ্ছো, আনায়া? ডোন্ট হেজিটেট। কোনো প্রবলেম থাকলে ফ্রাঙ্কলি বলতে পারো।”
​আনায়া সামান্য ইতস্তত করে নিজের ভেতরের জড়তাটুকু কাটানোর চেষ্টা করল। সে পরনের জামাটা সামান্য টেনে-টুনে নিয়ে বিনীত গলায় বলল,

​”না, কোনো প্রবলেম নয়। আসলে একটা পার্সোনাল বিষয়ে ছোট্ট কিউরিওসিটি ছিল…”
​ইমানি নিজের সহজাত গাম্ভীর্য-ভাবমূর্তি বজায় রেখে স্পষ্ট গলায় কিছুটা নমনীয় সুরে বলল,
​”হ্যাঁ বলো, কী বিষয়ে?”
​আনায়া এবার আর কোনো দ্বিধা না রেখে, নিজের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে এক নিঃশ্বাসে জিজ্ঞেস করে ফেলল,
​”মানে… উনি আর আপনার বিষয়ে। আ মানে, পাভেল ভাই আর উনি তো কাজিন কিন্তু… আপনি…”
​কথাটা শেষ করতে গিয়েও যেন আনায়ার গলাটা শুকিয়ে এল। ইমানি কিছুটা কৌতুক মেশানো দৃষ্টিতে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল,
​”তুমি ভি আর আমার কথা বলছো?”
​আনায়া অপরাধীর মতো মাথা ঝাকিয়ে, মৃদু সায় দিল,
“জ্বী!”

​ইমানির ঠোঁটের কোণের সেই মৃদু হাসি এবার কিছুটা তির্যক রূপ নিল। সে চেয়ারের পেছনের অংশে নিজের শরীরটা এলিয়ে দিল। অত্যন্ত দাম্ভিক ভঙ্গিতে পায়ের ওপর পা তুলে, চেয়ারের হাতলে দুহাতের কনুই ঠেকিয়ে, আঙ্গুলগুলো একত্রিত করল। আনায়াকে আপাদমস্তক আর একবার পরখ করে নিয়ে, নিগূঢ় হাসির রেশটুকু ধরে রেখেই বলল,
​”আনায়া! সম্পর্কে ওরা দুজন কিন্তু আমাকে বড় বোন হিসেবেই মান্য করে।”
​আনায়া নিজের সম্মুখে বসে থাকা এই অনন্য রমণীর দিকে চরম বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। ইমানির নিখুঁত অবয়ব আর সতেজ রূপ দেখে সে নিজের সরল কৌতুহল চেপে রাখতে পারল না। একদম সহজভাবে বলে উঠল,
​”আপনি উনার চেয়েও বড়? কিন্তু আপনাকে দেখে তো একদমই মনে হয় না!”
​তার এই অকপট মন্তব্যে ইমানি সূক্ষ্ম শব্দে হেসে উঠল। দাম্ভিক নারীর আভিজাত্যপূর্ণ হাসির রেশটুকু বজায় রেখেই সে প্রত্যুত্তর দিল,
​”না, একচুয়ালি আমি ভি-এর চেয়ে বয়সে বড় নই। আবার খুব একটা ছোটও নই। টাম-এর মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টে ভি আর আমি ক্লাসমেট ছিলাম। আর বয়সের দিক থেকে হিসেব করলে, আমি আর পাভেল সেম এইজের।”

​আনায়ার চিন্তাভাবনায় এবার পুরো জট লেগে গেল। কোনো সমীকরণই সে মেলাতে পারল না। সে অত্যন্ত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
​”তাহলে যে বললেন, আপনি ওনাদের বড় বোন?”
​ইমানি তার সহজাত গাম্ভীর্যের মাঝেও কিছুটা নস্টালজিক হয়ে উঠল। টেবিলের ওপর রাখা মূল্যবান কলমটি আঙুলের ডগায় ঘোরাতে ঘোরাতে সে ধীর স্বরে বলতে লাগল,
​”এর পেছনে একটা বেশ বড়সড় ব্যাকস্টোরি আছে। সবার সাথে অবশ্য পার্সোনাল লাইফের এসব চ্যাপ্টার নিয়ে আলোচনা করাটা আমার পলিসির বাইরে, তবে তোমার ক্ষেত্রে বোধহয় এক্সেপশন রাখা যায়।”
আনায়া তীব্র আগ্রহে অধীর হয়ে চাতক পাখির মতো চেয়ে রইল। ইমানি এবার তার গভীর ও রহস্যময় দৃষ্টি জানালার ওপারে মেলে দিল; যেন বহু বছর আগের কোনো এক ধূসর অতীতে ডুব দিল সে। অতঃপর জানালার ওপার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনায়ার চোখের দিকে তাকাল; নিজের কণ্ঠস্বরে এক মায়াবী আবেশ জড়িয়ে ইমানি বলতে শুরু করল,

​”ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ আগে। ভি আর পাভেল তখন জার্মানির মাটিতে একদম নতুন; মাত্র কয়েকটা মাস হলো তারা এদেশে এসেছে। ভি-এর শরীরে তখনো নানা রকমের শারিরীক অসুস্থতা জেঁকে বসে আছে। একে তো রোগাক্রান্ত শরীর, তার ওপর পরিবার-পরিজন ছেড়ে এই প্রথম তারা এতটা দূরে এসে স্থায়ী হয়েছে।
বাদবাকি আর সাধারণ ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের মতোই ওরাও একটা সাদামাটা বাড়ি ভাড়া করে থাকতে শুরু করেছে। কিন্তু মেইন প্রবলেম ছিল, দুজনের একজনও ঠিকমতো রান্নাবান্না জানত না। ফলে প্রতিদিনের তিন বেলার খাবারই তাদের বাহির থেকে কিনে খেতে হতো। নিজের দেশের লাক্সারিয়াস লাইফ আর অতিরিক্ত সুখের দিনগুলো হুট করে কোথায় যে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিল, তা হয়তো ওদের দুজনের কারোরই বোধগম্য ছিল না।

​এভাবেই একদিন গভীর রাতে, অত্যন্ত বিধ্বস্ত অবয়বে নিজেদের বাসার উদ্দেশ্যে ফিরছিল ভি আর পাভেল। ভি তখন টগবগে যুবক, যেমন বন্য রূপ তেমন তার তেজ,জেদ,দম্ভ! সেদিন ওর পরনে বোধহয় একটা ব্ল্যাক টি-শার্ট আর ব্ল্যাক ব্যাগিপ্যান্ট ছিল। সচারাচর ওকে যেমন দেখা যায়, তেমনই তবে এখনকার চেয়ে অনেক বেশি বদমেজাজি-উগ্র। কাঁধ অব্দি ছোঁয়া লম্বা চুলগুলো বেশ এলোমেলো ও অবিন্যস্ত; মাথায় জড়ানো সাদা একখণ্ড ব্যান্ডেজ। কিন্তু এত কিছুর পরও ওর ভাবমূর্তিতে গম্ভীর্যের কোনো কমতি নেই। ট্রাস্ট মি, আমি আমার জীবনে এতো গম্ভীর মানুষ খুব কমই দেখেছি।
ওদিকে পাভেলের অবস্থা যেন আরও বেশি শোচনীয়। তার কোঁকড়ানো চুলগুলো কাকের বাসা হয়ে আছে; চোখেমুখে তীব্র ক্লান্তির ছাপ।
একচুয়ালি, এদেশেরই একটা পুলিশ লক-আপে সারাদিন আঁটকে থাকার পর ওরা সবেমাত্র ছাড়া পেয়েছিল;যার কারণেই ওদের অ্যাপিয়ারেন্স এতটা রুইন্ড দেখাচ্ছিল বোধহয়।”
ইমানি থেমে আবারও গম্ভীর মুখে বলতে শুরু করল,

​”মাঝরাতের নির্জনতায় ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোর নিচ দিয়ে জনমানবহীন একটা ফাঁকা রাস্তায় দুজন হেঁটে চলেছে। ভি প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে, চিরচেনা সেই গম্ভীর ও রাশভারী রূপ নিয়ে হাঁটছে। মাথায় ব্যান্ডেজ, আর উষ্কখুষ্ক দীর্ঘ চুলগুলো অবিন্যস্ত আকারে বাতাসে উড়ছে। পাভেলেরও একই দশা; গায়ের নেভি ব্লু কালারের টি-শার্টটা একদম আলগা হয়ে গা থেকে খসে পড়ার উপক্রম। তার চোখেমুখে তখন তীব্র বিরক্তি আর জেদের রেখা স্পষ্ট। সে দুহাত অবিন্যস্তভাবে নাড়িয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছে, আর পায়ের ডগা দিয়ে রাস্তার একটা ছোট্ট পাথরকে অনবরত কিক করে সম্মূখে ছুড়ে দিচ্ছে।
​এভাবে আপন খেয়ালে হাঁটতে হাঁটতে, হুট করেই পাথরটি ছিটকে গিয়ে ল্যাম্পপোস্টের এককোণে বিষণ্ণ মনে একা বসে থাকা এক তরুণীর গায়ে লাগল। আঘাতটি বেশ ভালোমতোই লেগেছিল। ফলে সেই বিষণ্ণ তরুণী হুট করেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে বসে থাকা অবস্থাতেই অত্যন্ত চড়া সুরে হুংকার ছুড়ে দিল,

​’ডু ডেমলিশার মিস্টকার্ল!’
এটাকে একটা জঘন্য জার্মান গালি হিসেবে ধরতে পারো।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে এমন একটি জঘন্য গালি আর চিল চিৎকার শুনে পাভেল চমকে ছিটকে দূরে সরে গেল। কোনোমতে ভি-এর গায়ের ওপর আছড়ে পড়া থেকে নিজেকে রক্ষা করল সে। পাভেল চরম বিস্ময় নিয়ে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে থাকা মেয়েটির দিকে তাকাল।
সে দেখল, এক এক্সট্রাঅর্ডিনারি অতিমাত্রায় সুন্দরী মেয়ে এত রাতে এই নির্জন, জনহীন রাস্তায় একা বসে আছে। তার চোখে-মুখে তীব্র ক্ষোভের ছাপ স্পষ্ট। আবার একই সাথে দেখে মনে হচ্ছিল মেয়েটা কিছুক্ষণ আগেই খুব কেঁদেছে।….”
তরুনীর প্রশংসা করতে গিয়েও ইমানির ওষ্ঠকোণে তাচ্ছিল্য ফুটে উঠল,

“…মেয়েটা জার্মান ভাষায় রেগে তাকে ঠিক কী বলল, তা যেন পাভেলের মাথার ওপর দিয়ে গেল। সে কোনো উপায় না পেয়ে পাশে থাকা ভি-এর উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল,
​’ভাই, ও আমাকে কী বলল?’
ভি তখন সম্পূর্ণ নির্বিকার, নির্লিপ্ত কন্ঠে উত্তর দিল,
​’গালি দিয়েছে।’
​একথা শুনে পাভেলেরও ইগোতে লাগল, সে কিছুটা ক্ষেপে গেল। হুট করে সে মেয়েটির দিকে দুপা এগিয়ে গিয়ে বেশ চড়া সুরে ধমকে উঠল,
​’ঐ ছেমড়ী, তুই আমারে ওত্তবড় গালি দিলি কেন?গায়ে একটু পাথরই তো লেগেছে, মরে-টরে তো যাস নি!’
​পাভেল মনে মনে ভেবেছিল, বাংলা ভাষায় উল্টোপাল্টা কিছু বললে এই বিদেশী মেমসাহেব তার বিন্দুমাত্র বুঝতে পারবে না। ভিনদেশে নিজের মাতৃভাষার যথাযথ প্রয়োগ করার,এই এক মস্তবড় সুবিধা। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে, সেই তরুণী নিজের চোখ দুটো ছোট ছোট করে, আধো আধো বাংলা উচ্চারণে তীব্র ক্ষোভের সাথে বলেছিল,

​’হারা-মজাদাআহ্! একে তো গায়ে পাথর মেরেছিস, আবার চাইছিস আমি তোর পীরভোজনা করি?’
হুট করে মেয়েটির কাছ থেকে বাংলা শুনতে পাওয়ায়, পাভেল রীতিমতো বেশ ভড়কে গেল। ভি-এর কানে কানে চাপা স্বরে বলল,
“ভাই, এই মেয়ে তো বাংলা বোঝে। মনে হয় দেশি মাল, কিন্তু দেখতে বিদেশী।”
ভি এবারও সম্পূর্ণ নির্বিকার দাড়িয়ে রইলেও, মেয়েটি পাভেলের কথা ঠিকই শুনতে পেল।তবুও নিজের যথাসাধ্য চেষ্টায় মেয়েটির মেজাজ বোধহয় কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল; সে নিজের বিষন্নতায় আবারও ডুব দিতে মরিয়া। ততক্ষণে হুট করে ভি এবার তার দিকে এগিয়ে গেল। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় মাথা নুইয়ে বসে থাকা মেয়েটিকে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে আপাদমস্তক পরখ করার পর, ভি ভ্রু উঁচিয়ে তাকে সোজা বাংলায় জিজ্ঞেস করল,

“নাম কি আপনার?”
এক দীর্ঘ ছায়া গায়ের উপর পড়তেই, মেয়েটি মাথা তুলে তাকাল। গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ যুবকের আপাদমস্তক ত্যাছড়া নজরে একবার পরখ করেই, দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। চাপা স্বরে বলল,
“ইমানি…নায়রা ইমানি!”
​কাহিনী এই পর্যন্ত বর্ণনা করে ইমানি হঠাৎ থামল। আনায়া বিস্ময়ের সাথে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পিনপতন নীরাবতা বিরাজ করার পর, হুট করেই আনায়া প্রশ্ন ছুড়ল,
“তারমানে ঐ মেয়েটা আপনি ছিলেন?”
ইমানি সামান্য মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। আনায়া বিস্ময়ের সাথে আবারও জানতে চাইল,
“ওনাদের পুলিশ কেনো ধরেছিল?”

—“ঐযে বললাম, অতিরিক্ত রাগ-উগ্রতা। এদেশে কমবেশি সব ফরেনার স্টুডেন্টই নানান জায়গায় পার্টটাইম জব করে। পাভেল কিংবা ভি-ও তার ব্যক্তিক্রম ছিল না। বাড়ি থেকে ওদের জন্য যে টাকাটা পাঠানো হতো, তা কেবলই খাওয়া-খরচা আর পড়াশোনার জন্য। কিন্তু ওদের কিছু বাজে অভ্যাস ছিল। যার জন্য এক্সট্রা টাকাটা ওদের নিজেদেরই ম্যানেজ করতে হতো। এইজন্য দুজন একটা শপে গিয়ে বোধহয় কিছুদিন কাজ করেছিল। কিন্তু সেখানেও বেশিদিন টিকতে পারেনি। শপের মালিকের সাথে বেশ তুমুল এক ঝামেলা হয়। রাগের মাথায় ভি বিষয়টাকে মারামারি’র পর্যায়ে নিয়ে গেলে, শপের মালিক পুলিশ ডাকে। অতঃপর তার অভিযোগ সত্য হওয়ায় দুটো চলে যায় লক-আপে।”
আনায়া চোখ পিটপিট করে ইমানির কথা শুনল। এ কেমন কথাবার্তা, এখন তো মনে হচ্ছে তার মা ভুল কিছু বলেনি। তার স্বামী মহাশয় আসলেই একটা খচ্চর ছিল। অথচ সে তো তাকে ভেবেছিল মহাপুরুষ!
আনায়া গল্পের পরের অংশটুকু শুনতে উৎসুক হয়ে উঠল। মন বলছে, এই তিন বান্দার এক হওয়ার গল্পটা বোধহয় আরো বেশি ইন্টারেস্টিং। যথারীতি আনায়ার উৎসুকমুখী ভাবগতিক দেখে ইমানি নিজের সম্পূর্ণ অতীতটুকু আড়ালে রেখে বাকি গল্পটুকুও বলতে শুরু করল।

তরুনীর নামটা শুনে তৎকালীন ভিভিয়ান এহসান নামক উগ্র-উদ্ভট ছেলেটার মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর হলো না। সে সরু দৃষ্টিতে ইমানিকে আপাদমস্তক একঝলক দেখে নিয়ে, কি যেন ভাবতে লাগল। ঘাড়টা কিঞ্চিৎ কাত করে, পকেটে দু-হাত গুঁজে সে গুরুগম্ভীর রুক্ষ স্বরে বলল,
“সরি!”
ইমানির চোখদুটো সরু হলো। ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো,
“সরি? কিন্তু কিসের জন্য?”
ভিভিয়ান পাভেলের দিকে ইশারা করল। পাভেল বিস্ময়ের সাথে ফিসফিস করল,
“ভাই তুমি কেনো সরি বলছো? গালি তো ও দিয়েছে….!”
পাভেলের কথা যেন শুনেও সে শুনল না। ইমানির দিকে দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা বজায় রেখেই ভিভিয়ান বলল,
“ওর বোঝা উচিত ছিল, আন্টিদের সবসময় রেসপেক্ট করা উচিত!”
—“ইট’স ওকে…আই নো…”

ইমানির কন্ঠস্বর থমকে গেল। বিস্ময়ের সাথে সে নির্লিপ্ত ভিভিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। পাশ থেকে পাভেল বিষয়টা উপলব্ধি করতেই ফিক করে হেসে ফেলল। ইমানি আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। একে তো বেশ উঁচু-লম্বা তার উপর গত কয়েকদিন ঠিকমতো না খেয়ে জিরো ফিগারেরও বেহাল দশা হয়েছে।
ইমানি সটান দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁত কিড়মিড়িয়ে ভিভিয়ান আর পাভেলের দিকে আঙুল তুলে বলল,
“সাহস কি করে হয়, আমাকে আন্টি বলার? আমাকে দেখে আন্টি মনে হয়? অসভ্যের দল! হ্যাভ ইউ এনি আইডিয়া হু আই অ্যাম? একেকটাকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব, ইউরোপে এসে অসভ্যতা…”
—“রান্না করতে পারেন?”

রাগের বুলি আওড়ানোর মূহুর্তে হঠাৎ ভিভিয়ানের নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বরে ইমানি থমকে গেল। এই ছেলেদুটো এমন অদ্ভুত কেনো বুঝতে পারছে না। বিশেষ করে তার সামনে থাকা ছেলেটার হাবভাব তো পুরোপুরি ভিন্নরকম!
ইমানি তৎক্ষনাৎ নিজেকে সংবরণ করে ভ্রু উঁচিয়ে গম্ভীর সুরে বলল,
“হুম, কিন্তু কেনো?”
ভিভিয়ান তার জিভের অগ্রভাগ মুখের অভ্যন্তরের গালের একপাশে স্পর্শ করে কিছু একটা ভাবল। সে ইমানিকে আরেকবার আপাদমস্তক তীক্ষ্ণ-শান্ত দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে অকপটে বলল,
“আমাদের দুজনের জন্য রান্না করতে হবে। এর জন্য মান্থলি হান্ড্রেড ইউরো দেবো। সাথে দুটো আইসক্রিম!”
ইমানির চোয়াল হা হয়ে গেল। রাত-বিরেতে এ সে কাদের দেখা পেয়েছে। নিজের রাগ সামলে,চাপা স্বরে তরুনী হিসহিসিয়ে উঠল,
“হেই ইউ, আমাকে কি ভিখারী মনে হয়? আমি কেনো তোমাদের মতো দুটো নালায়েকের জন্য রান্নাবান্না করব? তাও আবার মাত্র একশো ইউরো আর দুটো আইসক্রিমের জন্য? এমনিতে তো আমি আইসক্রিমই খাই না।”

মেয়ে হয়েও আইসক্রিম না খাওয়ার কথা শুনে পাশ থেকে পাভেল বলল,
“ব্রো, আমার মনে হয় এই মেয়ে দেশী হলেও জাত ভালো না। বলে কিনা আইসক্রিম খায় না। ব্রো তুমি ঠিকই ধরছো, কেমন আন্টি আন্টি হাবভাব!”
তার এহেন কথা সম্পন্ন হতে না হতেই, অকস্মাৎ একটা ছিঁড়ে ফাটা জুতো গিয়ে সোজা পাভেলের মুখের উপর আছড়ে পড়ল। নিঃসন্দেহে তা যে ইমানি এইমূহূর্তেই তার পা হতে খুলে ছুড়েছে সে আর বুঝতে বাকি নেই। পাভেল এতে হতবিহ্বল হলেও, ভিভিয়ান সম্পূর্ণ নির্বিকার। ততক্ষণে ইমানি তার দিকে ফিরে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলতে লাগল,
“তো কি যেন বলছিলেন…রান্না করে খাওয়াবো?”
ইমানির উদ্দেশ্য ছিল নিজের রাগ প্রদর্শন করা। অথচ ভিভিয়ান অত্যন্ত নির্বিকারে ঝাঁকড়া চুলভর্তি মাথাটা নেড়ে উত্তর দিল,
“হুম।”
ইমানি এবার ভাবনায় পড়ে গেল। সে এবার ভিভিয়ানের আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ভাবতে লাগল, এদের মাঝে সন্দেহজনক কোনো ব্যাপার স্যাপার আছে কিনা। নয়তো এগুলো কেমন ছেলে-পেলে।
—“অনেক হয়েছে, আমি এখন কারো সাথে মজা করার মুডে নেই। আপনারা যেতে পারেন, আর আমায় ভিখারী ভাবলে ভুল করছেন। সিচুয়েশন হয়তো খারাপ চলছে, কিন্তু আমি কোনো ভিখারী-টিখারী নই।”
ইমানি নিজেকে সংবরণ করে বেশ ঠান্ডা গলায় কথাটা আওড়াল। অথচ ভিভিয়ান সাথে সাথে প্রত্যুত্তর করে বলল,

—“ভিখারী ভাবছি না, বরং যা ভাবছি তা হয়তো ভিখারির চেয়েও নিদারুণ!”
পাভেল পাশ থেকে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে দেখছে। ইমানি নিজেও অবাক হচ্ছে ভিভিয়ানের কথাবার্তার ধরনে। এই ছেলে মূলত বলতে চাচ্ছেটা কি?
সে ভ্রু-যুগল অতিমাত্রায় কুঁচকে বলল,
“আপনারা কারা বলুন তো?”
—“তেমন কেউই নই, কিন্তু আমাদের কাজ করে দিলে, ফায়দা হয়তো আপনারই হবে।”
ইমানি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবারও ভিভিয়ান পাভেল দুজনকেই আপাদমস্তক দেখল। ছেলেটার কন্ঠস্বর প্রয়োজনের চেয়ে ভারী গম্ভীর! আবার কেমন অদ্ভুতও! কিন্তু সে যা ভাবছে, এই দুজন তো সেই দলের কেউ হতে পারেনা! সে তার অতীত ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছে অল্প কিছুদিন হলো। অথচ তার আগেই এ কোন মুসিবতের দেখা মিলল তা বোধগম্য নয়।
ইমানি কোমড়ে একহাত রেখে কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তার পর শুধালো,
“শুধু রান্না করতে হবে?”

ভিভিয়ান মাথা নাড়ল। ইমানি আরেকটু ভেবে নিয়ে হঠাৎ ইতস্তত করে বলল,
“কিন্তু… আমার এই মূহুর্তে থাকার কোনো জায়গা নেই।তাই হয়তো এটা পসিবল নয়… ”
ভিভিয়ান তার কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল,
“প্রবলেম নেই, আমাদের বাড়িতে তিনটে রুম আছে, চাইলে একটায় থাকতে পারেন।”
তার কথা শুনে ইমানি যতটা না অবাক হলো, তার চেয়েও বেশি অবাক হলো পাভেল। সে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে উঠল,
“ভাই,ভাই, এসব কি বলছো? এই মেয়ে আমাদের সাথে থাকবে? কিন্তু কেনো? লোকে কি বলবে, হোয়াট দ্য হেললল, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে…’
পাভেল একনাগাড়ে কেবল বলেই গেল। কিন্তু ভিভিয়ান সামান্য প্রত্যুত্তরও করল না।যেন সে সম্পূর্ণ একটা যান্ত্রিক মানব। যে কি ভেবে কি পরিকল্পনা করছে, তা কেবল সে নিজেই জানে। অন্যদিকে ইমানি সবটা স্তব্ধ হয়ে দেখার পর, কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে গলা খাকিয়ে বলল,
“উঁহুম, উঁহুম, আমি রাজি। কিন্তু সাথে আরেকটা কথাও জানিয়ে দিচ্ছি, আমি মার্সাল আর্টে ব্ল্যাকবেল্ট পেয়েছি।”
ভিভিয়ান চোখদুটো সামান্য সরু করে বলল,
“তো?”

ইমানি উদাস ঢঙে তাকে একনজর দেখা’র পর, হঠাৎ তেড়ে আসার ভঙ্গিতে কয়েকপা এগিয়ে এসে মুখের কাছে হিসহিসিয়ে উঠল,
“তো যদি মাথায় কোনো উল্টোপাল্টা চিন্তা থাকে, শুরুতেই সাবধান! একেকটার ঠ্যাং ধরে ভেঙে দেবো।”
রমণীর কথায় ভিভিয়ান নিজের দৃষ্টি সামান্য পাশে ফিরিয়ে, অচিরেই এক চিলতে তির্যক হাসল। ইমানি সেই হাসিতে সামান্য দ্বিধান্বিত হলেও বিশেষ একটা গুরুত্ব দিল না।
ততক্ষণে চোখের সামনে এতোবড় অঘটন হতে দেখে পাভেলের ইচ্ছে করছে, সেখানেই গড়াগড়ি করে কাঁদতে। তবে রাস্তা সকল বন্ধ দেখে, সে আর নাটকীয়তা না করলে ইমানির উদ্দেশ্যে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এই মেয়ে, তুমি এখানে একা থাকো? তোমার কি সত্যি সত্যি বাড়িঘর,লোকজন নেই?”
ইমানি উত্তরটা দিতে না চেয়েও দিয়ে ফেলল,
“সবই ছিল, আপাতত কিছুই নেই।”
পাভেল ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে? আপনি আবার খুন-টুন করে এভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে-বেড়ান না তো? সত্যি করে বলেন, আপনি ক্রি-মিনাল ট্রিমিনাল না তো? পড়ে আপনার জন্য পুলিশের চক্করে পড়বো না তো?”
একবার আপনি বলছে তো একবার তুমি। তারউপর এমন বেহুদা প্রশ্ন। ইমানি ভারী শ্বাস ফেলে, বুকে দু’হাত গুঁজে বলল,
“হঠাৎ এমনটা মনে হওয়ার কারণ?”

—“মাইয়া মানুষ ছলনাধারী! সহজে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।”
—“তবে তো আমারও আপনাকে ছ্যাছড়া চোরের মতো ঠেকছে। উঁহু, ছেলে মানুষের উপর বিশ্বাস নেই এইকারণে নয়, আপনার চেহেরাটাই ওমন। সত্যিই কি তাই?”
পাভেল তৎক্ষনাৎ চোখ-মুখ কুঁচকে ভিভিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভাই, রিজেক্ট! এই মেয়েকে ঘরে তোলা ঠিক হবে না। দেখো আমায় কেমন ইনসাল্ট করছে!”
ভিভিয়ানের চোখদুটো ক্রমশই ক্লান্তিতে বুঁজে আসছে। ঔষধ খাওয়ারও সময় হয়েছে। এমনিতেই আজ সারাদিন লক-আপে পার করে, খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম ঘটেছে। আগে অবশ্য সে কখনো এসবের খেয়াল রাখত না। কিন্তু এখন অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটছে। তার মাঝেও কিছু কিছু পরিবর্তন এসেছে। যদিও বেঁচে থাকার তেমন ইচ্ছে-টিচ্ছে নেই, তবুও এক অজানা পিছুটানের কারণে সে আজও বাঁচতে চাইছে।
ভিভিয়ান পাভেলের কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে,হঠাৎ নিজে নিজেই রাস্তায় পা বাড়াল। পেছনে রয়ে যাওয়া দুজনের উদ্দেশ্যে বলল,

“আমার ঘুম পেয়েছে, চললাম!”
তার আচরণে ইমানি আরেকটু অবাক হলো। পাভেলেও ইমানিকে ফেলে নিজের ভাইয়ের পেছন পেছন এগোতে লাগল বিধায়, ইমানিও তাদের সঙ্গ ধরল। প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে ভিভিয়ান চলছে আগে আগে, আর পাভেল কিছুটা পেছনে। পাভেলের পাশাপাশি পা মিলিয়ে ইমানি হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে বসল,
“এই বান্দা কি এমনই?”
ইমানিকে পাভেলের খুব একটা পছন্দ হয়নি। তবে আগ বাড়িয়ে যখন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছে, তখন উত্তর না দিয়েও আর সে থাকতে পারল না। যথারীতি চলতে চলতেই দুজনের টুকটাক গম্ভীর কথোপকথন শুরু হলো।
—“হুম বলা যায়, ভাই এমনই…!”
—“ভাই? তারমানে তোমরা দুজন আপন ভাই?”
—“না, আমরা কাজিন।”
—“ওহ, কিন্তু তোমরা কোন দেশ থেকে এসেছো?”
—“বাংলাদেশ। বাংলা যেহেতু জানো তুমিও নিশ্চয় বাংলাদেশী।”
—“না, আমি হয়তো বাংলাদেশী নই।”
—“মানে? এতো ভালো বাংলা বলো…তবে কি ইন্ডিয়ান… মানে ঐ যে মমতার কলকাতার?”
—“উমম…না, আমি ইন্ডিয়ানও নই।”
—“তাহলে এতো ভালো বাংলা কিভাবে বলো?”

—“আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, কাশ্মির, ইউরোপীয়ান টুকটাক সবই আছে।”
—“বাহ্, ইন্টারেস্টিং! কিন্তু তুমি এখানে…”
পাভেল হঠাৎ থেমে গেল। মনে মনে কিঞ্চিৎ চাপা ভাবনায় ভাবল,
“মেয়েটা সত্যিই অদ্ভুত। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডে এতোগুলা দেশ? অথচ মেয়েটার এখানে কেউ নেই? ভাই কেন যে এই আপদ বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে। না জানি, আবার কোন বিপদে পড়ব।”
মনে মনে এরূপ ভাবনা ভাবলেও, মুখে সে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে অবাক হওয়ার ঢঙে বলল,
“তুমি বললে তোমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডে পাকিস্তানও আছে। তারমানে তুমি তো মনেহয় রাজাকারের বংশধর! আমাদের জাতশত্রু।”
হঠাৎ এহেন কথায় ইমানি ভ্রু কুঁচকে ফেলল,
“রাজাকার? জাতশত্রু মানে?”
—“আরে রাজাকার চেনো না…রাজাকার ছিল একটা…’
পাভেল এবার ইতিহাসের খাতা টেনে বসল। যেখানে তার নিজের ইতিহাসই খাপছাড়া অজ্ঞাত। অন্যদিকে ভিভিয়ান এগিয়ে চলেছে নিজের মতো। এলোমেলো ছায়া তিনটে একটা সময় পর, ধীরে ধীরে একত্রিত হলো; রাতের আঁধারে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তিনটে ছায়া এগিয়ে চলল সমানতালে পায়ে পা মিলিয়ে। যেখানে পাভেল-ইমানি দীর্ঘ আলাপে মত্ত হলেও, ভিভিয়ান রইল সম্পূর্ণ নিশ্চুপ।

বদ্ধ কেবিনে স্তব্ধ হয়ে ইমানির মুখোমুখি বসে আছে আনায়া। কখন যে কতটা দীর্ঘ সময় গড়ালো, সেদিকে দুজনের কারোরই হুঁশ নেই। আনায়া কেবল শুনেই গেল—একের পর এক বিস্ফোরক অতীত-ইতিহাস। তবে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ছিল, এক সময় তিনজনের একত্রে ঘটানো হুলুস্থুল কান্ডকারখানা কিংবা মারামারি করে হাত-পা ভাঙার কেচ্ছা।
এদিকে দীর্ঘক্ষণ অতীতের বিলাপে ডুবে থেকে, ইমানির কথার ধরন হঠাৎ কিছুটা আমোদিত ও একইসাথে রুক্ষ হয়েছে। আনায়া এখনো ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্বাস করতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে, ইমানি যা যা বলল তার সবটাই আসলেই সত্যি কিনা।
ইমানি তার দৃষ্টি এবার পুরোপুরি আনায়ার উপর নিক্ষেপ করল। সামান্য চাপা মুচকি হেসে বলল,
“জানি বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, কিন্তু ঘটনা এইটুকুই নয় আরো অনেক কিছুই আছে। আজ না হয় সেসব থাক, এসব পুরোনো আলাপ অন্য কখনো করা যাবে।
এখন বরং তুমি একটা কাজ করো। তোমার একাউন্ট রেডি করতে কিছু ইনফরমেশন লাগবে। লরেন তোমার কাছে এলে, ওকে সেসব দিয়ে দিও।”
আনায়া কিছুটা ইতস্তত করে বলল,

“কিসের একাউন্ট?”
—“কাজ যেহেতু করছো, স্যালারি তো তোমার প্রাপ্য, তাই নয় কি?”
—“স্যালারি…এখনই?”
—“হুম, এডভান্স হিসেবেই ধরতে পারো।”
আনায়া সামান্য অবাক হলো। তবে সে আর কথা বাড়াল না। ইমানির কাছ থেকে বাদবাকি যাবতীয় সবকিছু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে, অবশেষে সে তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। অন্যদিকে তার চলে যাওয়ার পানে, দীর্ঘ সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণের পর ইমানি ব্যাকচেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে, আঙ্গুলের ডগায় পেন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“সামথিং ইজ গুড, সামথিং ইজ ফিসি। মেয়েটা ভালোই কিন্তু… অসভ্যটা তো সহজে মানবে না।”

এডভান্স সেলারি পেয়ে সে টাকায় কি রেখে কি করবে আনায়া দিশা পাচ্ছে না। শেষে উপান্তর না পেয়ে টাকাগুলো নিয়ে হেডকোয়ার্টার থেকে গ্যালারির দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে একের পর এক জামা-কাপড় দেখার পর, হঠাৎ তার নজর পড়ল একখান গাঢ় র’ক্ত লাল রঙের গাউনের উপর। তবে সমস্যা ছিল, কোমড় বা উদরের দুপাশে সামান্য কিছুটা কাপড়ের অংশ একদমই নেই। এটা গাউনটার ডিজাইনের ভিন্নতা হলেও, পেটের দু’পাশে অতিসামান্য কাপড়টুকু না থাকায় তার কিছুটা অস্বস্তিই হলো বটে। কিন্তু জিনিসটা অতিসামান্য মনে হওয়ায় আনায়া আর এই ব্যাপারে মাথা ঘামালো না।নিত্যন্তই সাদামাটা একটা গাউন, অথচ দাম দেখলেই বোঝা যায় এটা যথেষ্ট এক্সপেন্সিভ।
কিন্তু তাতে কি! আনায়া’র স্যালারির এতো টাকারও তো তার বিশেষ কোনো প্রয়োজন নেই। বরং এই টাকায় একটা পছন্দের জিনিস কিনে নিতে পারলেও, এখানে আটঘাট বেঁধে কাজ করার উছিলাটা অন্তত উসুল হবে।
যেই ভাবনা সেই কাজ। পুরো স্যালারির অধিকাংশই ফুরিয়ে গাউনটা কিনে সে তখন তখনই ট্রায়াল রুমে গিয়ে পড়ে নিল। পড়ার পর আর ইচ্ছে হলো না জামাটা গা থেকে খুলতে। যথারীতি সন্ধ্যার পর হতে বাদবাকি কর্মরত সময়টুকুও সে নতুন গাউনটা পড়েই কাটিয়ে দিল। কিন্তু কোনোভাবেই আর সাহস করে কেনীথের কেবিনের আশেপাশেও ঘেঁষা হলো না তার।

এভাবেই বেলা গড়িয়ে রাত সাড়ে দশটা বাজল। আজকের মতো তার কাজকর্ম সব ফুরাল অবশেষে। যদিও সারাদিনে কোনো কাজের কাজই করেনি আনায়া। তবুও ক্লান্ত এক ভাবমূর্তি নিয়ে সে হেডকোয়ার্টার হতে বেরিয়ে পার্কিং এরিয়ার পথ ধরে এগোতে লাগল।
এই পথে আশেপাশে তেমন কেউই নেই। যদিও গ্যালারির দিকটায় এখনো উপচে পড়া মানুষদের সমাগম। কিন্তু এটা হেডকোয়ার্টার এরিয়া হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই অধিকতর সিকিউরিটির কারণে এদিকটায় অযাচিত মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে।

রাস্তা-ঘাট ফাঁকা পেয়ে আনায়ার মনটা আরেকটু ফুরফুরে হলো। ফর্সা গায়ে গাঢ় লাল রঙের গাউনটা একপ্রকার জ্বলজ্বল করছে যেন। হালকা তুষারপাতের কারণে গাউনের উপর গায়ে আলতোকরে একখান উল্ফের কালো স্কার্ফও জড়িয়েছে। স্কার্ফটাও অবশ্য আজই গাউনটার সাথে পছন্দ করে কিনেছিল সে। যদিও এই স্কার্ফ জড়িয়ে জার্মানির শীত কাটানো সম্ভব নয়; কিন্তু শখ কোথায় মৌসুমের তোয়াক্কা করে!
সত্যিকার অর্থে আনায়ার মন এখন বেজায় খুশি। অত্যধিক খুশিতে গাল-দুটোয় অজান্তেই ছোট-বড় দুইখান টোল পড়েছে। রেশমের ন্যায় কোমল-দীর্ঘ চুলগুলো আলগাভাবে খোঁপা করে বেধেছে বহুক্ষণ আগেই। চঞ্চল মনে হেলে-দুলে লাফাতে লাফাতে কখন যে সেই খোঁপা খুলতে বসেছে,সেদিকেও তার খেয়াল নেই।
আপাতত আনায়া মনে মনে ভাবছে, অবশিষ্ট টাকা-গুলো দিয়ে তার আদতে কি করা উচিত। তখনই হঠাৎ মাথায় এলো, এই টাকাগুলো দিয়ে সে একটা ক্যামেরা কিনবে। হ্যাঁ, একটা ব্যক্তিগত ক্যামেরার শখ ছিল তার। কিন্তু দেশে থাকতে এই জিনিসটাও শখ করে কেনার সাধ্য হয়নি। অবশ্য দেশে তার কোনো শখই কোনোদিন ঠিকঠাক পূরণ হতো না। অথচ এখন দেখো! ভিনদেশে এক উড়ন্ত চঞ্চল চিত্তের লাল রাঙা প্রজাতি রূপে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে।
এমনই এক চপল মূহুর্তে হঠাৎ আনায়ার পা-দুটো থেমে গেল এক জার্মান রমণীর কন্ঠস্বরে,

“এক্সকিউজ মি…আপনি কি এইমাত্র হেডকোয়ার্টার হতে বের হলেন?”
খাঁটি জার্মান ভাষায় বেশ স্পষ্ট করেই প্রশ্ন করল সেই রমণী। আনায়া চোখ পিটপিট করে পাশে তাকিয়ে দেখল, ল্যাম্পলাইট সহ নানান আলোর মাঝে ঝকমকে ওয়েস্টার্ন ড্রেসে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটিকে। হালকা বরফ ঝরা রাতে মেয়েটি বেশ স্টাইলিশ সর্টস ঢঙের শীতের পোশাক-আশাক পড়ে আছে।চোখেমুখেও ভিনদেশীদের ছাপ। কিন্তু আনায়ার বোধগম্য নয়, এই মেয়েটা হঠাৎ তাকে এইকথা কেনো জিজ্ঞেস করল।
আনায়া অতিরিক্ত ভাবল না। সামান্য মুচকি হেসে মেয়েটির অদ্ভুত ইতস্ততবোধ লক্ষ করেই বলল,
“জ্বী, আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?”
—“আ…হ্যাঁ, বলছিলাম…”

মেয়েটি নিজের কথা সম্পন্ন করতে পারল না। তার আগেই হঠাৎ মেয়েটির ফোনে একাধিক মেসেজের নোটিফিকেশন এলো। সেই আওয়াজে মেয়েটি কিছুটা বিরক্ত হয়ে ফোনটা আনলক করে কিছু একটা দেখে নিয়ে আবারও ফোনটা বন্ধ করল।
আনায়াও খেয়াল করল মেয়েটি অস্বাভাবিক রকমের ইতস্তত করছে। কিন্তু তার নজর আঁটকে গিয়েছে ভিন্নকিছুতে। ফোন আনলক করার সাথে সাথেই আনায়া ফোনের ওয়ালপেপারে স্পষ্টত কেনীথের একটা ছবি দেখতে পেয়েছে। যার দরূন এক লহমায় তার ভ্রুযুগল অতিমাত্রায় কুঁচকে গেল।
এদিকে মেয়েটি ফোন হতে নিজের বিরক্তিবোধ কাটিয়ে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“বলছিলাম…ভিকে কি হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়েছে?”
আনায়া চোখদুটো পিটপিট করল৷ একমুহূর্তে জন্য সে ভেবেই নিল এটা তার স্বামী মহাশয়ের কোনো পাগলাটে ফ্যান হবে হয়তো। কিন্তু বিষয়টা মেনেও যেন সে মানতে পারল না। বেগানা এক মেয়ের ফোনে তার স্বামীর ছবি! কি অদ্ভুত! এগুলোও তাকে সহ্য করতে হচ্ছে।
আনায়া আর কালক্ষেপণ না করে, অস্ফুটে শুকনো মুখে মুচকি হেসে প্রত্যুত্তর করল,

—“ভিকে?…না সে তো এখনো ভেতরেই আছে।”
মেয়েটি যেন তার কথায় কিছুটা হতাশ হলো। দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে, এক চিলতে মুচকি হেসে বলল,
“ওহ…থাংক ইউ, আর অসময়ে বিরক্ত করার জন্য সরি।”
বলেই সে পা বাড়াল চলে যেতে। কিন্তু আনায়া কিছু একটা ভেবে হঠাৎ মেয়েটিকে থামিয়ে দিল। নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
“মিস, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড…আপনার নামটা কি বলা যাবে?”
আনায়া নিজেও জানেনা সে হঠাৎ এই প্রশ্ন কেনো করে বসল। ওদিকে মেয়েটিও হঠাৎ নিজের নাম বলতে গিয়ে কিঞ্চিৎ দ্বিধায় ভুগল। পরক্ষণেই সে হাসিমুখে জবাব দিল,
“আমি স্টেলা…স্টেলা স্টিফেন!”

বলেই হয়তো সে আরোকিছু বলার জন্য উদ্যত ছিল কিন্তু তার আগেই হঠাৎ ফোনের কল স্ক্রিণে ভাইয়ের নামটা ভেসে উঠতে দেখেই স্টেলার চোখ-মুখ শুঁকিয়ে গেল। আনায়াও আর সুযোগ পেল না কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার। কারণ ততক্ষণে তার চোখ-মুখ যেন অবাধ আমাবস্যার অন্ধকার ঢেকে ফেলেছে। মন-অন্তরায় কেবল একটা নামই সে আওড়াচ্ছে—‘স্টিফেন, স্টিফেন, স্টেলা স্টিফেন!’
অন্যদিকে স্টেলা দ্রুত ফোনটা রিসিভ করার তাগিদে, আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“আ…আমায় যেতে হবে, ভালো থাকবেন।”
অস্ফুটে এইটুকু আওড়িয়েই সে অপরপ্রান্তের গেটের কাছে অবস্থানরত গাড়িটার দিকে ছুটল।অন্ধকারের ক্রমশই মিলিয়ে যাওয়া ছায়া-টাকে একমনে চেয়ে চেয়ে দেখে গেল আনায়া। সে স্তব্ধ বিমূঢ় হয়ে কেবল একটাই কথা ভাবছে—এটাই কি সেই স্টিফেন? হয়তো সে-ই। মেয়েটাকে কেবল তার খ্যাতিমান স্বামীর ফ্যান বলে মস্তিষ্কে ঠাঁই দিতে ব্যর্থ হলো সে।

এক অদ্ভুত রাগ কিংবা ক্রোধের পাশাপাশি অবাধ অভিমান তার মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ঘটাল। এক মূহুর্তের জন্য এ-ও ভাবতে বসল, মেয়েটা কি তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর? হয়তো বা!
আবার পরক্ষণেই ভাবল, এসব সে কি ভাবছে। নিজেকে অন্যের সাথে সৌন্দর্য দিয়ে বিচার করছে? কিন্তু কেনো? কার জন্য? যে অমানুষটা দেশে বউ রেখে দিব্যি এখানে গার্লফ্রেন্ড-জাস্টফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরে, তার জন্য?
আনায়া একবুক দীর্ঘ শ্বাস টেনে নিল। অদ্ভুতপূর্বক এক ছটফটানিতে তার সর্বস্ব অস্থির হয়ে উঠছে। আনায়া দুহাতে নিজের জামা আঁকড়ে ধরে ভারী-ভারী দুবার শ্বাস ফেলল। এইমূহূর্তে আক্রোশে কেঁদে না ফেললেই হলো।

এই ভাবনায় সে নিজেকে তটস্থ করে পেছনের ফিরল। এইমূহূর্তে সোজা বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু হঠাৎ ধ্যান হটল কেনীথের ছায়ায় নজর পড়ে। বেশ তাড়া নিয়েই হেডকোয়ার্টার হতে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে। এমন মূহুর্তে চোখের সামনে মানুষটাকে দেখে আনায়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
কেনীথ গাড়ি আনলক করে ভেতরে ঢোকার আগেই, আনায়া তাকে থামিয়ে দিয়ে ডাকল,
“শুনছেন! দুটো মিনিট দাঁড়ান প্লিজ!”
কেনীথ থেমে গেল। মুখ ফিরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখল, আঁধারে একটুকরো আলোর মাঝে লাল টুকটুকে এক বিষন্ন প্রজাতির রূপে দাঁড়িয়ে আছে এক সুশ্রী রমণী। চোখের পলকে সেই রমণীকে চিনতে তার খুব একটা দেরি হলো না। তবে কিছুটা অবাক হলো, বিকেল বেলায় একরূপে আর এখন ভিন্ন আরেক রূপে আনায়ার দর্শন পেয়ে। অবশ্য বিকেলে অঘটন ঘটিয়ে মেয়েটা তো আর তার আশেপাশেও আসেনি। কেনীথও আর বিরক্তি নিয়ে তার খোঁজ করেনি; এমনিতেও বেশ কাজের ব্যস্ততার মধ্যে দিয়েই সারাটাদিন অতিবাহিত হয়েছে তার।
তবে এইমূহূর্তে আনায়ার এইরূপে উপস্থিতি কিছুক্ষণের জন্য গম্ভীর পুরুষের অন্তরালে সামান্য এক ভিন্ন অনুভূতি জাগাল। যদিও সে নিজের যান্ত্রিক মনোভাবের জোরে সেই অনুভূতি তৎক্ষনাৎ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলো।

এদিকে আনায়া ঠোঁট চেপে নিজের বিষন্ন অনুভূতিগুলোকে দমিয়ে, কয়েক পা এগিয়ে এলো। কোনো বাছবিচার না করেই সে কম্পিত রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন ছুড়ল,
“একটা কথা বলি? প্লিজ ঠিকঠাক উত্তর দিবেন!”
রমণীর কথার ধরনেই কেনীথের ভ্রু-যুগল কুঁচকে গেল। মনে মনে একমুহূর্তের জন্য ভাবতে লাগল, হঠাৎ এই মেয়ের হয়েছে টা কি? সব তো স্বাভাবিক ঠেকছে না।
ততক্ষণে আনায়া আবারও প্রশ্ন করল,
“স্টেলা নামের একটা মেয়ে এসেছিল, আপনার খোঁজে। আপনি কি তাকে চেনেন?”
কেনীথ সাথে সাথে প্রত্যুত্তর করতে গিয়েও থেমে গেল। খুব অল্পসময়ের জন্য দুদন্ড ভেবে নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ,চিনি।”
আনায়ার ইচ্ছে করল এখানেই হাত-পা ছুঁড়ে কেঁদে ফেলতে। সে নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো চেপে রেখেই, এক পরিপক্ব অর্ধাঙ্গিনীর ন্যায় কন্ঠস্বরে অতিমাত্রায় অধিকারবোধের জোর রেখে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“কিভাবে চেনেন? স্টেলা কি হয় আপনার?”

আনায়ার কন্ঠস্বর সামান্য কাঁপলেও, তা কেঁপেছে অধিক ক্রোধের তোপে। অন্যদিকে কেনীথ তার আচরণে কিছুটা অবাক হলো যেন। কিন্তু মনে মনে এ-ও আন্দাজ করে নিল, নিশ্চিত স্টেলার সাথে আনায়ার কিছু একটা হয়েছে। বিষয়টাকে নিয়ে গুরুতর ভাবনায় ডুববে নাকি খুশি হবে, তা কেনীথ তৎক্ষনাৎ বুঝতে পারল না। তবুও নিজেকে সম্পূর্ণ স্থির রেখে, ঠান্ডা গলায় প্রত্যুত্তর করল,
“দ্যাটস মাই পার্সোনাল ম্যাটার। স্টেলা আমার কি হয়,তা তো আমি কাউকে বলতে বাধ্য নই!”
মুখের উপর এহেন প্রত্যুত্তর পেয়ে, আনায়া নিজের গাউনের দুপাশ আরো শক্ত করে চেপে ধরল। এবার তার সত্যি সত্যিই কান্না পাচ্ছে। আরো দুপা এগিয়ে এসে, কিছুটা চাপা স্বরে হুংকার দিয়ে বলল,
“বাধ্য নন? অবশ্যই বাধ্য আপনি!”

—“রিয়েলি? কিন্তু কিভাবে?”
কিছুটা উপহাসের সুরেই বলল কেনীথ। আনায়া তৎক্ষনাৎ উত্তর দিতে গিয়েও থমকে গেল। কেনীথ এক চিলতে তির্যক হেসে আবারও রুক্ষভাষায় বলল,
“কারো সাহস হয় কি করে, আমার কাছে কোনোকিছু’র কৈফিয়ত চাওয়ার? না ভিকে নিজে কখনো কাউকে কৈফিয়ত দেয় আর না তার কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার অধিকার সে কখনো কাউকে দিয়েছে!”
এক লহমায় আনায়া চুপসে গেল। কিন্তু তৎক্ষনাৎ তেজস্বী কন্ঠে প্রত্যুত্তর করতেও সে ভুলল না,
“আপনি কিন্তু এবার বেশি বেশি করছেন, আপনি নিজেও জানেন আমার অধিকার আছে কি নেই!”
কেনীথ দ্বিতীয় দফায় তাচ্ছিল্যের সহিত ক্ষীণ হাসল। আনায়া সেই হাসিতে আরো বেশি ক্ষিপ্ত ও দ্বিধান্বিত হলো। অথচ কেনীথ অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় জবাব দিল,
“না নেই, কোনো অধিকার নেই।”

আনায়া হয়তো আশা রেখেছি, কেনীথ ভিন্ন কিছু বলবে। অথচ তার একটা কথাই রমণীকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিল। কেনীথ আর কথা বাড়াল না। সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত এক ভাবমূর্তি নিয়ে সে মুখ ফিরিয়ে গাড়িতে চড়ে বসল। মূহুর্তের মাঝেই রমণীর অশ্রুসিক্ত চোখের সামনে দিয়েই হনহনিয়ে চলে গেল সে।
আনায়া সবটাই নিশ্চুপ, বিমূঢ় হয়ে দেখল। হাত-পা এই পর্যায়ে অস্বাভাবিক কাঁপছে। এমনিতেও তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা, তার উপর হাতের কাছে ইনহেলারও নেই। এছাড়া রাত বাড়ার সাথে সাথে তুষারপাতের প্রকোপ যেন বাড়ছে। অথচ গায়ে তেমন শীতনিবারক পোষাকও নেই।
এসব ভাবনার চেয়েও আনায়া কেবল এটাই ভাবছে,

মহামায়া পর্ব ৪৪

“শান্ত হো, কিচ্ছু হয়নি, এইমূহূর্তে প্যানিক করা যাবে না, কোনোভাবেই না।”
বলতে বলতেই সে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু খুব একটা কাজ হয়েও যেন হলো না। আক্রোশে ডানহাতটা নিজের বাম-হাতের উপর বেশ অনেকক্ষণ চেপে ধরে রাখতেই, ডানহাতের নখগুলো ফর্সা ত্বকে খুব তীব্র ভাবে গেঁথে গেল। যা আনায়ার নিজেরও সেদিকে খেয়াল রাখা হলো না। বরং সে তখন দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে চলা কেনীথের গাড়িটার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকার পর, হঠাৎ অদ্ভুত পূর্বক ভঙ্গিতে তির্যক হাসল। চোখ বেয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লেও, আক্রোশে তার কাঁপতে থাকা অবয়বের চাপা কন্ঠস্বর হতে নির্গত হলো,
“ওয়াদা করছি—আপনি আমার না হলে আপনাকে আমি আর কারো হতে দেবো না। জানোয়ার কোথাকার!”

মহামায়া পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here