মহামায়া পর্ব ৪
তুশকন্যা
শীতল মিউনিখের ভোর তখনও অর্ধনিদ্রিত। শহরের ল্যাম্পপোস্টের কমলা আলো ভিজে কুয়াশার আদলে ছড়িয়ে পড়ছে। রাস্তাঘাটে নিস্তব্ধতার ধোঁয়া। শহরের অভিজাত অঞ্চলে দাঁড়িয়ে আছে কালো বর্মে মোড়া এক দানবের ন্যায়, V-Kore ভ্যাম্পায়ার সিরিজের জি-ক্লাস এর মার্সিডিজ জি-ওয়াগন কিংবা SUV।
গাঢ় কালো বডি জুড়ে, রক্তিম স্ট্রাইপ যেন যন্ত্রের গায়ে আঁকা একেক দহনচিহ্ন।কেনীথের কাছে অনেক নামি-দামি কিংবা তার নিজস্ব সিরিজের গাড়ি থাকলেও,তার এই ভ্যাম্পায়ার সিরিজের কালো রঙের মার্সিডিজ জি-ওয়াগন সবচেয়ে প্রিয়। গাড়ির ভেতর হতে বাহির, সর্বত্র তার মনমতো ডিজাইন করা। বাহিরের সম্পূর্ণ অংশ ম্যাট ব্লাক,আর ভেতরের অংশটুকু ডার্ক রেড। এছাড়া মার্সিডিজের লোগোর পাশাপাশি, কালো রঙের তার সিগনেচার ভ্যাম্পায়ার উইং কিংবা V-Kore এর স্পষ্ট লেখনী—সবটাই গাড়ির যথাযথ স্থানে দৃশ্যমান।
বেশিরভাগ সময় কেনীথ এই গাড়িই ব্যবহার করে থাকে। গাড়িটির বিশেষ ডিজাইনের কারণে,এটি আর সকল গাড়ির চেয়ে অত্যধিক পরিমানে মূল্যবান। একইসাথে সাধারণের মাঝেও অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের হওয়ায় বেশ আকর্ষণীয়ও বটে। যার ফলে, এরদিকে বাকিদের মতো নায়রা কিংবা পাভেলেরও বিশেষ নজর রয়েছে। কিন্তু কেনীথের পারমিশন ব্যতীত, তারা এই গাড়ি ছুঁয়ে দেখলেও সর্বনাশ হবে—এমন কান্ড বেঁধে যায়।
তবে আজ এই সুযোগটা নায়রা পেয়েছে। সকাল সকাল তার মনমেজাজ একদম ফুরফুরে। ভোর হতে না হতেই তারা বাড়ি ছেড়ে এক চমৎকার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়েছে। নায়রা চুপচাপ শান্ত-গম্ভীর ভঙ্গিতে ড্রাইভিং করছে। তার পাশের সিটেই কেনীথ গা ছেড়ে দিয়ে বসে রয়েছে।কেনীথের প্রিয় ‘ব্লাড পারফিউম’-এর তীব্র সুবাসে গাড়ির ভেতর ছড়িয়ে আছে তারই অপরূপ উপস্থিতি।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দেখতে অবশ্য বেশ ক্লান্তই মনে হচ্ছে। এই সকাল বেলাতেও চোখে কালোর রঙের সানগ্লাস পড়ে, মাথায় কালোর রঙের হ্যাট দিয়ে মুখটা ঢেকে, আধভাঙ্গা ঘুমে আচ্ছন্ন সে।
এটা নতুন কিছু নয়। তাদের কম বেশি প্রত্যেকেরই একটা বাজে স্বভাব রয়েছে। সারারাত জেগে জেগে নিশাচর প্রাণীর ন্যায়, এটা সেটা করতে থাকে। আর সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমায়। তবে নায়রা বেশ স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তি। সে যেভাবেই হোক না কেনো, সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার এক ভালো অভ্যাস আছে তার।
এদিকে এডভেঞ্চার রাইডিং কমিউনিটি ও পাভেলের প্রিয় বাইক KTM 1290 সুপার ডুকের বিশেষ ভার্সনে চরে ছুটে চলেছে পাভেল। একজন বাইকার হিসেবে তার প্রিয় কাজ হলো, সময়-সুযোগ পেতে না পেতেই বাইক নিয়ে এদিকে সেদিকে বেরিয়ে পড়া। যা সে আজও করছে। নায়রা আর কেনীথ জি-ওয়াগনের থাকলেও, পাভেল সকাল হতেই এভাবে রাইডিং করে চলেছে।
প্রায় ভোর পাঁচটায় তাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। শহরের সীমানা পেরিয়ে তারা ছুটে চলেছে,দক্ষিণমুখী A95 মহাসড়ক ধরে।প্রথম লক্ষ্য ওয়ালচেনসি বা জার্মান ভাষার উচ্চারণে ভালশে্নজি (Walchensee)।ওয়ালচেনসি হলো জার্মানির দক্ষিণাঞ্চল বাভারিয়ায় অবস্থিত একটি হ্রদ।
মিউনিখ থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে নীলাভ বিস্ময়কর এডভেঞ্চার ট্রাভেলিং কিংবা পর্যটনকেন্দ্র সরূপ স্থান এটি।
চারপাশে রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, হাইকিং পথ, ছোট ছোট ভিউপয়েন্ট আছে বিধায়,তা একে সহজেই সাধারণ পর্যটনকেন্দ্র বলা যায়।
কিন্তু পারিবারিক ভাবে এখানে নানান সময়ে, বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ পরিবার নিয়ে বেড়াতে এলেও—কেনীথ,নায়রা কিংবা পাভেলের মতো এডভেঞ্চার লাভারদের জন্য, এটি জার্মানির চমৎকার একটি স্থান। যেহেতু হ্রদটি আল্পস পর্বতের কোলঘেঁষে অবস্থিত। তাই এর চারপাশে হাইকিং, ট্রেকিং, মাউন্টেন বাইকিং, কায়াকিং, ডাইভিং সহ নানান এডভান্সড ট্রাভেলিংয়ের সুযোগ আছে। ফলাফলস্বরূপ,ব্লাডেন ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্বকারী এই ট্রিও ইচ্ছে হলেই,হুটহাট গাড়ি নিয়ে এইসকল জায়গার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে।
এডভেঞ্চার নিয়ে তাদের শখটা বেশ তীব্র। কিন্তু সাধারণ মানুষ হয়েও,কেউ একসাথে এতোকিছু কিভাবে করতে পারে…এ নিয়ে অনেকেরই বেশ কৌতুহল হয়েছে। তবে বাস্তবটা একদমই স্বাভাবিক। কোনো অযৌক্তিক বিষয়বস্তু এখানে নেই।
নায়রা,কেনীথ,পাভেল কিংবা তাদের ব্লাডেন সাম্রাজ্য এক দিনেই রূপকথার মতো গড়ে ওঠেনি। তারা যখন সর্বপ্রথম নিজেদের পরিবার ছেড়ে,এক ভিনদেশে পাড়ি জমায়—তখন তাদের নিজের বলতে কিছুই ছিল না। ভার্সিটির আর সকল স্টুডেন্টদের মতোই,তাদের জীবনযাপন ছিল। কিন্তু তিনজনে একত্রে থাকার পরপরই এদের তীব্র উন্মাদনার দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে।
ভার্সিটিতে অত্যধিক ভালো রেজাল্টের পর, প্রফেসরদের সহায়তায় তারা বিভিন্ন চমৎকার সেক্টরে নিজেদের যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ করতে পেরেছে। রাত-দিনের তীব্র পরিশ্রমের পর, খুব অল্প অল্প করেই তাদের স্বপ্ন গুলো পূরণ হয়েছে।
শুরু হতে এখন অব্দি,তাদের জীবনটা হলো একপ্রকার ছন্নছাড়া। নিজস্ব উম্মদনাই তাদের অগ্রগতির সূত্র।শুরুতে তারা খুব নেশার প্রতি আগ্রহী ছিল। সারাদিন নেশা করে ঘরের কোণায় পড়ে পড়ে থাকত। কিন্তু পরবর্তীতে ধীরে ধীরে নিজস্ব কিছু জেদের বশেই তারা এসকল বদভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু এরপর পরবর্তী জীবনটা যেন আরো বেশি অন্ধকার-আলোর ধোঁয়ায় আবদ্ধ।
যখন যেটা ইচ্ছে হয়, তারা কোনোকিছু না ভেবে সেটাই করে। জীবন মানেই যেন, তাদের কাছে উন্মাদ-উল্লাসের বিষয়বস্তু। এদিকে অবশ্য নায়রা আর পাভেল কিছুটা ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করে বিধায়,সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলছে। নয়তো কেনীথ যেমন ছন্নছাড়া…তাতে সবকিছু ফেলে দিয়ে, ভিন্নকিছু নিয়ে পাগলামি করাটা—তার জন্য খুব বেশি অস্বাভাবিক নয়।
রাস্তায় কুয়াশার আস্তরণ ফুঁড়ে যখন, প্রথম সূর্যের আভা দেখা দিল—তৎক্ষণাৎই দূরের আধার ভেদ করে, উঁকি মা’রল বাভারিয়ান আল্পসের গাঢ় ছায়া। মিউনিখের সমতল পথ পেরিয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় ঢুকে পড়তেই যেন, দম বন্ধ করা সৌন্দর্যের দরজা খুলে গেল। দুই পাশ জুড়ে পাইনবন। মাঝে মাঝে ঝর্নার শব্দ ভেসে আসছে শীতল বাতাসের আদলে।
সম্মূখে কুয়াশার পর্দার আড়াল হতে উঁকি দেয়, সবুজে ঘেরা অনবদ্য উঁচু পাহাড়গুলো। ওয়ালচেনসি, বাভারিয়ার অন্যতম সৌন্দর্যরূপের নীল লেক।যার জলরাশি সকালবেলার আলোয় নীলকান্তমণির ন্যায় দীপ্তি ছড়ায়।
এখানেই গাড়ি থামানোর পরিকল্পনা তাদের। প্রায় নির্দিষ্ট গন্তব্য অব্দি পৌঁছে গিয়েছে। চারপাশে সবুজে ঘেড়া প্রাকৃতিক মাঝে, শুনশাল পিচঢালা ফাঁকা রাস্তা। গাড়ির জানালার কাঁচগুলো খোলা থাকায় তা, শীতল বাতাসের আদলে সম্পূর্ণটা ছেয়ে গিয়েছে। একইসাথে কেনীথের ঘুমটাও বেশ জমছে। নায়রার মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকলেও, পাভেল যেন সবদিক থেকেই সময়টা উপভোগ করছে।
তাদের এই পথচলা কোনো হঠাৎ শখ নয়। অ্যাডভেঞ্চার তাদের অস্তিত্বে গাঁথা এক অভ্যাস। অতীতের অসংখ্য ভ্রমণ তাদের সাক্ষী। সবসময় যে তারা এসবে সফল হয়েছে ব্যাপারটা তা নয়। এমন বহুবার বহু ঘটনা ঘটে গিয়েছে,যেখানে এডভেঞ্চার ট্রাভেলিং করতে গিয়ে নানান ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হসপিটালে দিনের পর দিন পড়ে থাকতে হয়েছে। অথচ তবুও তাদের এসবের নেশা কাঁটেনা। তরুন কালে নেওয়া মারাত্মক সকল ড্রাগস্ এর চেয়েও বেশি যেন,এসবের নেশা বেশি তীব্র।
এমনই এক ঘটনা ঘটে জুগস্পিটজে। জুগস্পিৎস জার্মানির সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলোর মধ্যে একটি।যা ২,৯৬২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এবং এটি ওয়েটারস্টাইন পর্বতমালার অংশ। মিউনিখ থেকে গাড়ি বা ট্রেনের মাধ্যমে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টার মতো সময় লাগে। চারপাশে বরফে ঢাকা পাহাড়, গাঢ় সবুজ উপত্যকা, আর দূরে দূরে ছোট ছোট গ্রাম। শীতকালে তুষারপাতের সঙ্গে বাতাস প্রবল, তাই জায়গাটি অ্যাডভেঞ্চারের জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। শৃঙ্গের চূড়া থেকে সমগ্র এলাকা দেখা যায়। নিচে ঝরনার ন্যায় ছোট নদী, পেছনে উঁচু ঢালু পাহাড়ি অঞ্চল।
অনেকদিন আগের ঘটনা এটি।নায়রা, কেনীথ ও পাভেল সেখানে এক অ্যাডভেঞ্চার ট্রিপে এসেছিল। পুরো এলাকা উন্মুক্ত এবং চূড়ার দিকটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।সমস্ত পথ বরফে ঢাকা। কিছু জায়গা খুব খাড়া। হাঁটতে গিয়ে পা পিছলে যাওয়ার ঝুঁকিটাও অনেক।পাহাড়ের ঢালু এবং তুষারময় পথ, প্রতিনিয়ত তাদের মনোবল পরীক্ষা করে। এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বাতাস প্রবল এবং প্রচন্ড ঠান্ডা, তাই তারা অবশ্যই সঠিক গিয়ার পরিধান করে রয়েছিল। অর্থাৎ পাহাড়ি ট্রেক বা অ্যালপাইন ক্লাইম্বিং—সেফটি হেলমেট, হানেস, ক্র্যাম্পন, ওয়েদারপ্রুফ পোশাক পড়ে থাকা।
কিন্তু তাদের জন্য গাড়ি বা ট্রেনের কোনো সুবিধা ছিল না বিধায়,সবাইকে হেঁটেই চূড়ার দিকে এগোতে হয়। মাঝেমাঝে বরফের ছোট ছোট ঝাপটি আঘাত করে। আবার কখনো খাড়া ঢালে বরফ ভেঙে যেতে থাকে। এই কারণে তারা একে অপরকে ধরে রাখে, সতর্কভাবে পা রাখে। কিছু ছোট ছোট দুর্ঘটনা ঘটে—নায়রা পা পিছলে যায়, পাভেল সামান্য গা ঢুলে পড়ে। কিন্তু কেনীথ নিজের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি, তাদেরকেও ধরে রাখে। পুরো প্রক্রিয়ায় পড়ে থাকা বরফ ও বাতাসের সঙ্গে লড়াই করার অনুভূতি, তাদের অ্যাডভেঞ্চারের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু শেষমেশ পরিণতিটা সে’বার খুব বেশি ভালো হয়নি।
হঠাৎ করেই, একটি অপ্রত্যাশিত ফাটল ধরে বরফ খন্ড নিচের দিকে ধসে পড়ে।তৎক্ষনাৎ একত্রে তাদের পা পিছলে যায়। ভিড় থেকে দূরে,শূন্যের কাছে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ন্যায় অবস্থা। আঘাতের শব্দ, বরফের ফাটলের সাথে তাল মিলিয়ে পিছলে পড়া এবং শীতল বাতাস—সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তেই এক ভয়ঙ্কর এক্সিডেন্ট ঘটে যায়। তাদের তিনজনই আহত হয়, এবং পরবর্তীতে বেশ কয়েকদিন হসপিটালে থাকতে হয়। অথচ এমন বহু ঘটনার পরও, তিনজনের এডভেঞ্চারের প্রতি নূন্যতম নেশা কমেনি।
আবার নউশ্-ওয়ানস্টাইন দুর্গের (Neuschwanstein Castle) কোল ঘেঁষে আঁকাবাঁকা রাস্তায় ছুটে চলা রাতের গল্পও অমলিন। কখনো স্কাই-ড্রাইভিং, আবার কখনো ওয়াটার-ড্রাইভ—হিমশীতল জলে হঠাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়া।প্রতিটি স্মৃতি যেন তাদের অস্তিত্বের মর্মকথা।তারা বাঁচে রোমাঞ্চে, গতি তাদের ধ্যান, আর সীমা অতিক্রম করাই তাদের পূর্ণতা।
আজকের সকালটি সেই পূর্ণতার আরেক অনুবাদ। গাড়ি যখন ওয়ালচেনসির নীল জলের কাছে থামবে, তখন হয়তো কুয়াশার আড়াল ভেদ করে সূর্য উঠবে ধীরে ধীরে। কেনীথেরও হয়তো তখন ঘুম ভাঙবে। সে মুখের উপর হতে, হ্যাটটা সরিয়ে একপলক নায়রায় দিকে তাকাবে। একইসাথে চারপাশে চোখ বুলিয়ে যখন দেখবে,তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যের নিকট এসে পড়েছে… তৎক্ষনাৎ সে হয়তো ভারী শ্বাস ফেলে, নায়রার উদ্দেশ্যে আওড়াবে,
“সমটাইমস আই ফিল লাইক আই শুড বি ডেড। বাট হোয়েনইভার আই সি অল দিস, আই ফিল আই মাস্ট লিভ ফর মেনি মোর ইয়ারস।”
এ কথা কেনীথ প্রতিবারই বলে। মৃত্যুর প্রতি তার অদ্ভুত এক আকর্ষণ রয়েছে। একইসাথে মৃত্যুর প্রতি তীব্র ঘৃণা। সে চায়, তার সাথে দুটোই হোক। সে তীব্র কষ্টে ম’রে যাবে, কিন্তু ম’রবে না। তার কষ্টে বাকিদের কেউ কষ্ট না পেলেও,অন্তত এমন একজন কষ্ট পাবে যাকে সে প্রচন্ড ভালোবাসে। একইসাথে সে ব্যক্তিও যেন তাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। অথচ এমন ব্যক্তি হয়তো এখন অব্দি তার ধোঁয়াশাময় জীবনে আসেনি। অথচ কেনীথ এখনোও সে ব্যক্তির অপেক্ষায়।
মাঝেমধ্যে তার এমন অদ্ভুত চাওয়াতে, সে থমকায়। তার চিন্তাভাবনা স্তব্ধ হয়। সে কি করে, পুনরায় একই অভিশাপের সমুদ্রে ঝাপ দিতে চাইছে? সে কেনোই বা প্রতিবার নিজের অতীত ভুলে যায়? ‘ভালোবাসা’ শব্দটা তো তার জন্য অভিশাপ।
প্রেমিক হিসেবে,সে জীবনে একবারই শুধু একজনকেই ভালোবেসেছিল। তার প্রেমের তীব্রতা এতোই বেশি ছিল যে,হয়তো তার প্রিয়তমার কাছে শেষমেশ আর সে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনি। কিন্তু এই আক্রোশে সে যা করেছিল,তা কি আদৌও ঠিক?
ভালোবাসা হতে প্রতারিত সে হয়েছিল,তাই ভালোবাসা তার জন্য অভিশাপ। কিন্তু সে কি করে, নিজের ক্ষোভ মেটাতে এক অবুঝ প্রাণের জন্য অভিশাপ হলো? কি করে? এই প্রশ্নের উত্তর কেনীথ নিজের কাছ থেকে আজ অব্দি পায়নি।
শুরুতে অতীত ভুলতে তাকে নেশার দুনিয়ায় মত্ত থাকতে হতো। তখন বয়স কম ছিল, নিজের দোষকে দোষ মনে হতো না। বাকিদেরই সে সর্বদা দোষী ভাবত। যে অবুঝ প্রাণের সর্বস্বকে সে ধ্বংস করেছে,তাকেও সে নিজের জীবন ধ্বংসকারী ভেবেছে। কিন্তু এখন তো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজে অভ্যাসগুলোর মাঝে—ড্রাগস্ নেওয়া,অকারণে মাতাল হয়ে মা’রপিট করা, নাইটক্লাবে গিয়ে রাতের পর রাত পড়ে পড়ে ড্রিঙ্কস্ করা… সবই তো ছেড়েছে সে। এখন অবশ্য আগের মতো বাকিদের দোষারপ করতে ইচ্ছে হয়না। কিন্তু ইচ্ছে হয় নিজের সর্বনাশ দেখতে। যেখান থেকে তাকে রক্ষা করার মতো কেউ থাকবে না৷ শুধু নিজের কর্মফল, ভোগ করবে সে।
আনায়ার আজ ঘুম থেকে উঠতে বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। অবশ্য সে ঘুমিয়েছে খুব অল্প সময়। সারারাত তো জেগেই পাড় করল।তবে তার মনের মাঝে যত ঝড়ই উঠুক না কেনো,সেসব দেখার মতো হয়তো এই পৃথিবীতে কারো অস্তিত্ব নেই। সবাই শুধু তার বাহ্যিক আচরণ গুলোই বুঝতে পারে,অন্তরের গহীনের খোঁজ কেউ রাখেনা।
যে কারণে আনায়া সকল আশাই ছেড়ে দিয়েছে। কি এসে যায়, তার ভালো-মন্দে। সকলে যা সিন্ধান্ত নেবে,তাকে শেষ অব্দি তাই করতে হবে। এমনটাই আজ পর্যন্ত হয়ে এসেছে।
আনায়া দেরি না করে নিচে নামল। মায়ের সাথে রান্নায় টুকটাক সাহায্য না করলেও নয়। আর অল্পদিনই এই বাড়িতে…এ পর পৃথিবীর কোন প্রান্তে চলে যেতে হয়, কে জানে! বর্তমানে পড়ালেখা বলতেও কিছু নেই। এডমিশন নিয়েও কোনো চাপ নেই। এক কর্মহীন, ভাবনাহীন সময় পার করছে সে। অথচ কোথাও বিন্দুমাত্র শান্তির দেখা নেই।
নিচে আসতে না আসতেই,তার বাবা তারেক এহসানের দেখা মিলল। সোফায় বসে গম্ভীর্যের সহিত কারো সাথে কথা বলছে। আনায়াকে দোতলা হতে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখেই,তিনি গম্ভীর্যের সহিত আনায়ার দিকে তাকায়। তার দৃষ্টিতে আনায়া থমকায়। যেনো ফোনে তিনি তার বিষয় সম্পর্কিত কোনো কিছু নিয়ে আলাপ করছে।
আনায়া নিজেকে স্বাভাবিক রেখে নিচে নামে। বাবার প্রতি কিছুটা রাগ কিংবা অভিমান থাকলেও,সে ফোনের কথা বলতে থাকা তারেকের দিকে মাথা নুইয়ে আলতোস্বরে সালাম দেয়।এই বলেই সে চলে যেতে নিলে, তৎক্ষনাৎ তারেক এহসান গম্ভীর স্বরে বলল,
“দাঁড়াও!”
কথা বলার মাঝেও,আনায়াকে থামিয়েছে বিধায় সে কিছুটা অবাক হলো। তার কথা মতো, চুপচাপ সে তারেকের দিকে এগিয়ে যায়। ততক্ষণে তারেক হালকা হাসির বিনিময়ে, কলটা কেটে দিয়েছে।
—“বাবা, কিছু বলবে?”
তারেক আনায়ার দিকে কিছুক্ষণ গম্ভীর নজরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আনায়ার পরনে হালকা আকাশী রঙের ঘের যুক্ত আনারকলি। জামার বিভিন্ন অংশে সোনালী রঙের হালকা নকশা করা।মাথায় সাদা-আকাশী ও সোনালী পাড়ের মিশ্রণে তৈরি ওড়নাটা, বড়সড় আকারে ঘোমটা হিসেবে দেওয়া। আনায়া সবর্দা এমন রূপেই চলাফেরা করে। সেটা বাহিরে হোক কিংবা বাড়ির ভেতরে।
এদিকে তারেক এহসান আরো বেশ কিছুক্ষণ তাকে দেখে নিয়ে বলল,
“এদিকে এসে বসো।”
তারেকের এহেন কথায়,আনায়া কিছুটা অবাক হয়।তারা বাবা এভাবে কখনো তাকে নিজের কাছে ডাকে না।যদিও ইনায়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একদম বিপরীত। তবে আনায়া একটুও দ্বিধাদ্বন্দ্বে না জড়িয়ে,সোজা তার বাবার কথামতো, পাশে গিয়ে বসে।
—“তোমার দায়িত্ব আমি আর অল্প কিছুদিনই পালন করব। এরপর তোমার সব দায়িত্ব আমি অন্য কারো হাতে তুলে দেব। পরবর্তীতে সে তোমার কি করবে,না করবে—তা তার ব্যাপার। কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার সব ভালো-মন্দ বিচার আমাকেই করতে হবে।”
আনায়া মাথা নুইয়ে তারেকের কথাগুলো শুনছে। এদিকে তারেক কিছু সময়ের জন্য থামার পর, অনিমেষেই বলে ওঠে,
“এটাই হয়তো শেষবার। যাচ্ছো যখন সাবধানে থেকো। একবারও যেনো শুনতে না হয়, তোমার নামে কোনো অভিযোগ উঠেছে। আমি জানি,তুমি ওমন ধরনের মেয়ে নও। কিন্তু তবুও…ঢাকা থেকে বহুদূরের পথ। সাবধানে থেকো।”
এই বলেই, তারেক এহসান ভারী শ্বাস ফেলে। এদিকে আনায়া সম্পূর্ণ হতভম্ব। সে অবাক চোখে তারেকের দিকে তাকায়। তারেক বিষয়টা বুঝতে পেরে, নিস্পৃহে বলে,
“সাবার বাবা সামিউর খান ফোন করেছিল। অনেক করে রিকুয়েষ্ট করল,তোমাকে যেনো ওদের সাথে পাঠাই।”
এই বলেই তারেক থেমে যায়। পরক্ষণেই আনায়ার উদ্দেশ্যে সন্দিহান স্বরে আওড়ায়,
“তুমি কি ওদের কিছু বলেছিলে?যেন আমাকে সাবার বাবা ফোন করে, বিষয়টা ম্যানেজ করতে পারে।”
আনায়া তারেকের কথায় কিছুটা ঘাবড়ে যায়।এমন কিছু সে না বললেও, সাবা নিজে হতেই বলেছে। যে কারণে সে কিছুটা ইতস্তত স্বরে বলল,
“না বাবা,আমি কিছু বলিনি।আর তুমি না করার পর, এই বিষয়ে কারো সাথে কথাও হয়নি।”
তারেক ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“তাহলে তো তুমি এটাও জানো না যে, তোমাদের ট্রিপের লোকেশনও চেঞ্জ করা হয়েছে। ওরা বান্দরবান নয়, রাঙ্গামাটি যাচ্ছে। ওখানেই সব রিসোর্টের ব্যবস্তা করা হয়েছে। তোমার যেতে কোনো আপত্তি নেই তো?”
আনায়ার বেশ খুশি খুশি লাগছে। যেন নিমিষেই তার মন ভালো হয়ে গিয়েছে। আর সেথায় আপত্তি থাকার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আনায়া বিস্তৃত মুচকি হেসে বলল,
“জ্বী,না!”
তারেক এহসানও যেন মেয়ের কথায় স্বাভাবিক হলো। তবে এক অজানা সংশয় এখনও তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। না চাইতেও,সবসময় এক ভয় কাজ করছে আনায়াকে নিয়ে। সে তার মেয়েকে কখনোই হারাতে চায়৷ পুনরায় মেয়ের কিছু হলে,সে সহ্য করতে পারবে না। কখনোই না!
“চলে এলাম রাঙ্গামাটি! কি নেই এখানে?রাঙ্গামাটির নাম শুনলেই প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীলাভ জলের বিস্তীর্ণ কাপ্তাই লেক আর তাকে ঘিরে থাকা সবুজ পাহাড়ের অবিরাম সারি। পাহাড়ি পথ ধরে রাঙ্গামাটির দিকে এগোতে থাকলে মনে হবে, যেন কোনো অজানা রূপকথার ভেতরে প্রবেশ করছি। শহরের প্রবেশমুখে দাঁড়ানো পাহাড়, লেক আর অরণ্যের মিলিত চিত্র এমন এক শান্তির আবহ তৈরি করে যা একেবারেই অনন্য।
পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথে চলতে চলতে, একসময়ে হঠাৎ চোখে পড়বে অদ্ভুত শান্ত কাপ্তাই লেক। লেকের জল কখনো গভীর নীল, আবার কখনো পান্নার মতো সবুজ হয়ে ঝিলমিল করে ওঠে। বাতাসে ভেসে আসে হালকা শীতলতা। দূরের নৌকা আর কাছাকাছি ভেসে থাকা ছোট ছোট দ্বীপের দৃশ্য একধরনের নির্ভার আনন্দ এনে দেবে মনে।
এছাড়া রাঙ্গামাটির সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক হলো ঝুলন্ত ব্রিজ। পাহাড় আর লেকের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা লাল রঙের এই ব্রিজ, একধরনের চিরচেনা চমৎকার সৌন্দর্য ছড়িয়েছে। ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে দেখা যায় অসীম বিস্তৃত জলরাশি আর দিগন্তজোড়া পাহাড়ি সৌন্দর্য। চারদিকে কেবল সবুজ আর নীলের মেলবন্ধন। মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজ হাতে এক নিখুঁত ছবি এঁকেছে। এখানে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সঙ্গে খেলা করতে করতে অজান্তেই মুছে যায় ক্লান্তি। মনে জেগে ওঠে এক ধরণের শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস।
তবে রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য কেবল প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে আছে পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রার ভিন্নতা, রঙিন সংস্কৃতি আর অনন্য খাবারের স্বাদ। পাহাড়ি গ্রামগুলোতে প্রবেশ করতেই দেখা যায়… চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাদের নিজস্ব রীতি-নীতি। তাদের হাতের বোনা কাপড়, বাঁশের তৈরি সামগ্রী আর পাহাড়ি আচার-সংস্কৃতির রঙিন ছোঁয়া। পাহাড়ি খাবারের বিশেষ স্বাদও একেবারেই ভিন্ন।মসলার তীব্রতা আর প্রাকৃতিক উপকরণের মিশ্রণে তা ভ্রমণের আনন্দে নতুন মাত্রা সংযোগ করে।
আর শান্তি খুঁজতে চাইলে, যেতে হবে রাজবন বিহারে! এখানে প্রবেশ করলেই যেন এক অন্য জগতে প্রবেশ করা যায়।চারপাশের নীরবতা, প্রার্থনায় মগ্ন ভিক্ষুদের স্নিগ্ধ মুখ আর বিহারের সরল সৌন্দর্য এক অদ্ভুত প্রশান্তি জাগিয়ে তোলে! ইট ফিলস্ জাস্ট লাইক হেভেন!
শহরের কোলাহল থেকে দূরে এমন জায়গায় এসে হঠাৎই মনে হবে—অতীতের সব অস্থিরতা যেন মুছে গিয়েছে নিমিষেই। এবং ভেতরে ভেতরে নতুন করে জন্ম নিচ্ছে এক প্রশান্তিময় অনুভূতি।
রাঙ্গামাটি থেকে সাজেক কিংবা অন্যান্য পাহাড়ি গন্তব্যে যাত্রা…আরও এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে যাত্রা শুরু করলে এক পাশে গভীর উপত্যকা, অন্য পাশে সবুজে মোড়া পাহাড়ের চূড়া। কখনো মেঘ এসে ঘিরে ধরে, কখনো আবার সূর্যের আলো পাহাড়ের বুক ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। প্রতিটি বাঁক যেন নতুন এক চমক।প্রতিটি দৃশ্যই যেন নতুনত্বের সূচনা।
দিন শেষে যখন সূর্য লেকের জলে ডুবতে থাকে, চারপাশের নীরবতা ভেঙে শুধু ভেসে আসে পাখির ডাক আর পানির মৃদু তরঙ্গ—তখন মনে হয় রাঙ্গামাটি কোনো শহর নয়, এটা প্রকৃতির আঁকা জীবন্ত ক্যানভাস। পাহাড়, লেক আর মানুষের সরলতায় গড়া এই জায়গা যেন প্রত্যেক ভ্রমণকারীর জন্য রেখে দেয় এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি।”
এক নিমিষেই রাঙ্গামাটির পুরো বর্ননা দেওয়ার পর, ক্ষণিকের জন্য থেমে যায় সায়েম। ঘোরাঘুরির প্রতি তার বিশেষ ঝোঁক। সময়-সুযোগ পেলেই এদিক-সেদিক বেড়িয়ে পড়ে। যথারীতি, পুরো রাঙ্গামাটি নিয়েও যেন তার বিশাল গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ হয়েছে।যারই সামান্য নমুনা সে তার বন্ধুদের জন্য, নিজের বর্ননায় উপস্থাপন করছে।
আনায়া,আলো,শিখা,সাবা,তাজিম,সায়েম, রনক—এই সাত জন মিলে বেড়িয়ে পড়েছে তাদের রাঙ্গামাটি ট্রিপের উদ্দেশ্যে। শুরুতে বান্দরবান গিয়ে পৌঁছানোর নিয়ত থাকলেও,সাবার অতিরিক্ত ন্যাকামিতে রাঙ্গামাটিতে যাওয়ার সিন্ধান্ত নেয় সকলে। কারণ এখানেই সাবার বাবার লোকজন দিয়ে সকল ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে।
আগামী সাত দিনের ট্রিপে,আজ ও আগামীকাল তারা রাঙ্গামাটিতে থেকে, আশেপাশের সকল স্থানে ঘুরাঘুরি করবে। অতঃপর তারা সাজেক গিয়ে নিজস্ব রিসোর্ট হতে পরবর্তীতে বাকিসব জায়গায় ট্যুর দেবে।
এখন প্রায় বিকেল নেমে এসেছে। সকলে তাদের নিজস্ব SUV গাড়িতে করেই, ঢাকা হতে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। সাথে শুধু তাদের পারসোনাল ড্রাইভার রয়েছে। এছাড়া বাকি সব লোকজন নির্দিষ্ট স্থানে।এবারের ট্রিপের বেশিরভাগ এলাহী আয়োজন সাবা’র বাবাই করেছে। ফলে তারেক এহসানকে এ নিয়ে বেশি একটা ভাবতে হয়নি। সাবার বাবার সাথে তার বেশ সখ্যতা রয়েছে।
গাড়িতে সকলেই চুপচাপ বসে রয়েছে। ড্রাইভার এর পাশে বসে রয়েছে সাবা। মাঝের তিনটি সিটে আনায়া,শিখা ও আলো। আলো আর আনায়া জানালার পাশে এবং শিখা দুজনের মাঝে। এবং সবার পেছনের সিটে বসে আছে—সায়েম,রনক ও তাজিম।
সাবা বরাবরের মতোই বেশ স্ট্যাইলিশ হয়ে, জাম্প সুট পড়েছে। ছেলেদের গায়ে স্বাভাবিক পোশাক-আশাক। টিশার্ট, প্যান্টের সাথে কেউ চোখে চমশা তো কেউ মাথায় হ্যাট দিয়ে সেজেগুজে রয়েছে। অন্যদিকে আলো-শিখা দুজনেই কটনের সেলোয়ার-কামিজ পড়লেও,আলোর কামিজের সাথে জিন্সের প্যান্ট পড়া। তবে সবার চেয়ে একদম নমনীয় সাজসজ্জায় সজ্জিত রয়েছে আনায়া। সাদা ও হালকা নীল রঙের কুর্তির সাথে, ঢিলেঢালা সাদা প্লাজো।মাথার ওড়নাটাও বেশ গুছিয়ে কপাল অব্দি টানা।
আনায়া বসে বসে ডার্ক চকলেট খাচ্ছে। আসার সময় ব্যাগ ভর্তি যেন শুধু চকলেটই নিয়ে এসেছে।তার সর্বক্ষেত্রে চকলেট কিংবা আইসক্রিম খাওয়ার প্রতি বিশেষ এক নেশা রয়েছে। কিন্তু আইসক্রিম তার জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে বিধায়,সে সর্বদা ডার্ক চকলেট খেয়েই ক্রেভিংস্ কমায়। অবশ্য তার চকলেট এখন গাড়িতে থাকা কমবেশি সকলেই খাচ্ছে।
এদিকে সায়েমের এতোসব বর্ননা, সকলেই বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনল। সাবার মতো উগ্র মেজাজের মেয়ে সাবাও, এ বিষয়ে ব্যক্তিক্রমী নয়। আনায়ারও বেশ আগ্রহ জমেছে জায়গাটা নিয়ে। তার বুঝ হওয়ার পর স্মৃতিতে, এসব জাগয়া নিয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সবই যেন নতুন লাগছে। অথচ এ-ও মনে হচ্ছে, এটাই তার আসল ঠিকানা। এ শহরে সে আগেও এসেছে। অদ্ভুত এক টান তার সর্বত্রে নানান দ্বিধাদ্বন্দে ফেলে দিচ্ছে।
এরইমাঝে সায়েমের কথা শেষ হতে না হতেই,সাবা বেশ উৎসাহের সাথে বলে উঠল,
“ওয়াউ! বেশ ইন্টারেস্টিং প্লেস!”
সাবার এহেন অভিব্যক্তিতে তাজিম একটুও দেরি না করেই বলল,
“তোর সো কল্ড ডিরিম সুইজারল্যান্ডের থেকেও জোস, তাই না?”
তাজিমের কথায়, সাবা কিছুটা বিরক্ত হলো। সে ভারী শ্বাস ফেলে তীক্ষ্ণ ভঙ্গিতে বলল,
“নেভার! সুইজারল্যান্ডের সাথে এসব চিপ জায়গার তুলনায় হয়না!”
সাবার এহেন কথায় তাজিমের পাশাপাশি সায়েমেরও চোখমুখ কুঁচকে যায়।
“তুলনা হয়না ভালো কথা! যে দেশে থেকে,বাপের টাকায় ফুটানি করো,সে দেশের জায়গারে বলিস চিপ? শা’লী তুই চিপ!”
মনে মনে সায়েম এরূপই কিছু আওড়ায়। তার পরিবার বেশ উচ্চবিত্ত। ফর্সা বলিষ্ঠ দেহের যুবকের ন্যায়, সে দেখতেও বেশ আকর্ষণীয়। তবে পরিবারের সবাই সর্বদা নিজের কাজেই ব্যস্ত থাকে। ছোট বেলা হতেই,তাকে সময় দেওয়ার মতো কাউকেই সে নিজের কাছে পায়নি। যে কারণে,এই ফ্রেন্ড সার্কেলের জন্য ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরাঘুরি করেই তার বেঁচে থাকা। এখন আপাতত দেশ ঘুরছে,কদিন পর হতে বিদেশে যাওয়ার চিন্তাভাবনায় রয়েছে। কিন্তু সবশেষে কেউ তার প্রিয় জায়গা নিয়ে, এরূপ মন্তব্য করুক—তা সে কোনোদিনও পছন্দ করবে না।এছাড়া সে কিছুটা ঠোঁট কাটা স্বভাবের। এমনিতে কথা তেমন বলে না,তবে বলতে শুরু করলে লাইন কোথায় হতে কোথায় চলে যায়—তা আর হুঁশে থাকে না।
যথারীতি তাজিম কিছু বলার আগেই,সায়েম নিজেই সাবার উদ্দেশ্যে বলল,
“এই যে আফুমণি, যে জায়গার সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা নেই—সে জায়গা নিয়ে এসব মন্তব্য করা হতে বিরত থাকুক। নয়তো…”
—“নয়তো কি?…এখানে এসব ছাড়া আর কি আছে শুনি?”
সাবা’র আগ বাড়িয়ে তাচ্ছিল্যের সহিত কথা বলায়, সায়েম কিছুটা বিরক্ত হলেও—শেষমেষ ভারী শ্বাস ফেলে বলতে লাগল,
“আর কি আছে? শোন তাহলে! আমাদের নেক্সট টার্গেট যেহেতু সাজেক ভ্যালি,তবে ওটা দিয়েই শুরু করি।…
রাঙ্গামাটি থেকে সবচেয়ে কাছেই আছে সাজেক ভ্যালি। অনেকেই একে বলে মেঘের রাজ্য। ভোরের বেলা যখন পাহাড়ের মাথায় দাঁড়ানো হয়, মনে হবে পায়ের নিচে যেন কোনো সমুদ্র দুলছে। কিন্তু সে সমুদ্র জলের নয় বরং শুভ্র মেঘের। দুপুরে সেই একই জায়গা হয়ে ওঠে সবুজে মোড়া উপত্যকা।
আর বিকেলের দিকে সূর্য যখন ডুবে যেতে থাকে, তখন আকাশের অগ্নি-রঙ পাহাড় আর মেঘকে রূপকথার ছবিতে রাঙিয়ে তোলে। সাজেক পৌঁছানোর পথটিও ভ্রমণের অর্ধেক আনন্দ কুড়িয়ে নেওয়ার মতো উপভোগ্য। আঁকাবাঁকা রাস্তার একদিকে গভীর উপত্যকা, অন্যদিকে পাহাড়চূড়। পথে মেঘ এসে কখনো মুখে লেগে যায়, কখনো আবার হাতছানি দিয়ে ডাকে দূরের আকাশ।
খাগড়াছড়িও রাঙ্গামাটির কাছাকাছি আরেক বিস্ময়কর স্থান। এখানে আছে আলুটিলা গুহা। যেখানে একবার ঢুকে পড়লে অন্য এক জগতের ন্যায় মনে হবে। ঠান্ডা বাতাস, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, অন্ধকারের ভেতর মশালের আলো—সব মিলিয়ে গুহাটি রহস্য আর রোমাঞ্চে ভরা। খাগড়াছড়ির পাহাড়গুলো রাঙ্গামাটির মতোই সবুজ, কিন্তু ভিন্নতার ছাপ আছে।কোথাও টিলা, কোথাও ঝরনার ধারা।আর সবকিছুর মাঝেই উপজাতি গ্রামগুলোর রঙিন উপস্থিতির নিদর্শন।
আরেকটু দূরেই আছে আমাদের সেই বান্দরবান। প্রকৃতির রঙ এখানে যেন আরও গভীর। নীলগিরি থেকে যখন মেঘ ছুঁয়ে যায়,তখন মনে হয় আকাশ যেন নেমে এসেছে…হাতে ধরা যায় এমন দূরত্বে!
নীলাচলে দাঁড়ালেই অসংখ্য পাহাড়ের সারি একসাথে চোখের সামনে দৃশ্যমান হবে।সবুজ, নীল, ধূসর সহ নানা রঙে তাদের বাহার।এছাড়া বগা লেকের জলে রাতের তারা প্রতিফলিত হয়ে তৈরি করে জাদুকরি আবেশ। আর নাফাখুমের কথা তো না বললেই নয়! তবে এ নিয়ে আমি যতই বলল,ততই কম হবে। নাফাখুম আমার দেখা সবচেয়ে সেরা একটি স্থান!
নাফাখুম বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার, থানচি উপজেলায় অবস্থিত একটি নয়নাভিরাম জলপ্রপাত। যা সাঙ্গু নদীর তীরে অবস্থিত।এবং এটি ’বাংলার নায়াগ্রা’ নামে পরিচিত। যা দেখার জন্য, আমাদের দেশ ছেড়ে কানাডায় যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।”
সায়েম এই বলেই আবার কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নেয়।শেষের কথাটা যে, সাবাকে পিঞ্চ করে বলা,তা আর কারো বুঝতে বাকি নেই। বাকিরা চুপ থাকলেও, তাজিম বিষয়টায় বেশ মজা পেলো। এদিকে সায়েম আবারও চোখ বুজে নেয় আবেশে। সবই যেন তার স্মৃতির দৃশ্যপট হতে উজ্জীবিত হচ্ছে। সে তার ছন্দময় ভাষায়, প্রফুল্লতার সহিত বলতে লাগল,
“নাফাখুমের নামকরণ করা হয়েছে, ‘ঙাফা-খোং’ নামক এই মারমা শব্দ থেকে। যার অর্থ হলো মাছের জলপ্রপাত। নাফা নামের এক ধরনের মাছ স্রোতের বিপরীতে লাফ দিয়ে জলপ্রপাত পার হয়,এবং যা দেখে স্থানীয়রা মাছ ধরে।বাংলাদেশে দ্বিতীয় বড় জলপ্রপাত হিসেবে গণ্য নাফাখুমের বিশাল জলধারা প্রকৃতির এক অনন্য রূপ। চারিদিকে সবুজের সমারোহ এবং নির্মল ও শান্ত পরিবেশ নাফাখুমকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে।
নাফাখুমের সৌন্দর্য বর্ষাকালে বেড়ে উঠলেও, অনেক সময় সাঙ্গু নদীর পানি প্রবাহ বিপদসীমার উপর চলে যাওয়ার কারণে, প্রশাসন থেকে নাফাখুম যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। তাই ভ্রমণ পরিকল্পনা করার আগে অবশ্যই স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক।অবশ্য সারা বছরই অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ নাফাখুম জলপ্রপাত দেখতে ছুটে যায়।
আর মজার ব্যাপার হলো,আমরাও একদম পারফেক্ট টাইমিং এ এখানে চলে এসেছি। শুধু কপাল করে অনুমতিটা পেলেই হলো। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রশাসনের ব্যবস্থা হয়ে গেলেও আনায়া আর সাবার বাবার জন্য এ প্ল্যান ক্যান্সেল হবে।”
সায়েম থেমে যেতেই,তাজিম বলে ওঠে,
“তাহলে এ দুটোকে ঘরে বসিয়ে রেখে চলে যাব।”
এই বলেই সকলে হেসে ওঠে। আনায়া কিছু না বললেও, সাবা বলল,
“জায়গা সুন্দর হলে, আমিও যাবো তোদের সাথে।”
সাবার এহেন কথায়, সকলেই বেশ খুশিই হলো। সাবাকে ম্যানেজ করা গেলে,আনায়াকে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। প্রয়োজনে ট্রিপের সময়সীমাও বাড়ানো যাবে।
এই ভাবনায়, রনক আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“কি রে আনু! তুই যাবি তো! হাতে সময় কম,কিন্তু জায়গাটা বেশ দারুণ। তোর তো আবার এডভেঞ্চার পছন্দ।”
রনকের কথায় আনায়া কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে, ইতস্ততস্বরে বলল,
“ঠিক আছে যাবো,কিন্তু জায়গাটা কি সত্যিই অনেক সুন্দর? একবার এডভেঞ্চার ট্রাভেলিং ম্যাগাজিনে এই নিয়ে পড়েছিলাম আমি। নাফখুম দেখতে এখান থেকে কতদূর যেতে হবে?”
আনায়ার কথা শেষ হতে না হতেই,সায়েম বলতে লাগল,
“নাফাখুম দেখার জন্য বান্দরবান যেতে হয়।নাফাখুম পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটিও অনেক রোমাঞ্চকর। বান্দরবান থেকে থানচি হয়ে,নৌকায় সাঙ্গু নদী ধরে রেমাক্রীর দিকে যেতে হয় এবং সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বা নৌকাযোগে নাফাখুম পৌঁছাতে হয়। এই দুর্গম পথটিও প্রকৃতির অংশ হিসেবে পর্যটকদের মুগ্ধ করে।”
আনায়া কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনার পর, খানিক ভেবে নিয়ে বলল,
“কিন্তু বাবা তো বলেছে,শুধু রাঙ্গামাটিতেই থাকার জন্য। এখানেই লোকজন ঠিক করা আছে। তাই আশেপাশের এরিয়াতে যেনো না যাই।”
আনায়ার কথা শুনে, সবাই চিন্তায় পড়ে যায়। তবে আলো কি যেন ভেবে উঠতেই,বিস্তৃত হাসি মুখে সাবার উদ্দেশ্যে বলল,
“সাবা! তুই যাবি তোওওও!”
আলোর কথা সাবা ঠিকই বুঝতে পারে। সে কিছুটা ভারী শ্বাস ফেলে,গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“হাহ্,আমি বাদবাকিটাও ম্যানেজ করে দেবো।”
ওর কথা শুনে সকলেই আস্বস্ত হয়। যাই হোক, অন্তত আনায়ার জন্য হলেও এক কাজের মানুষ হিসেবে তারা সাবাকে গণ্য করতে পারছে। নয়তো এ মেয়ের সব কাজ ব্যাঘাত ঘটনো ব্যতীত, আর বিশেষ কোনো কাজেই তার দেখা মেলেনা।
এরিমধ্য সাবা পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে সায়েমের দিকে তাকায়। এবং তীক্ষ্ণ নজর চেয়ে থাকার পর, গম্ভীর স্বরে বলে,
“এইটুকুই নাকি এখানে আরো কিছু আছে?”
সাবার কথা শুনে আবারও সায়েমের মেজাজ বিগড়ে যায়। মিনমিন করে আওড়ায়,
“শা’লী এমন ভাব করছে যেনো,সাত-দিনে সবকিছুর গুষ্টি উদ্ধার করবে!”
অথচ নিজেকে শান্ত করে, সে স্বাভাবিক মুখে বলল,
“রাঙ্গামাটির আশপাশে আরও অসংখ্য ছোট ছোট জায়গা আছে। যেমন চন্দ্রঘোনা, শুভলং ঝর্ণা, কিংবা লেকঘেঁষা পাহাড়ি গ্রামগুলো। প্রতিটি জায়গার বাতাস, খাবার, মানুষের হাসি আর দৃশ্যের রঙ সবটাই আলাদা। অথচ সব মিলেই মনে হয় পুরো অঞ্চলটাই যেন এক বিশাল ছবির ক্যানভাস। রাঙ্গামাটি একা নয়! তার চারপাশের এই সাজেক, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান মিলে পাহাড়ি বাংলার রূপ সর্বগুণে পূর্ণ করে তুলেছে।যা কেউ চাইলেও,বস্তা বস্তা টাকা দিয়ে বিদেশের মাটিতে গিয়ে অনুভব করতে পারবে না!”
এভাবেই একেরপর এক বর্ননায়,তাদের দীর্ঘ সফর পরিপূর্ণ হতে থাকে। গাড়ির জানালা গুলো খোলা থাকায়, চারপাশের মনোরম পরিবেশ ও শীতল বাতাসে সবার মন প্রফুল্ল ও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। শুরুতে সাবার নানান রকমের তিক্ত অভিব্যক্তি রইলেও,ধীরে ধীরে সে-ও এই বিষয়টা বেশ উপভোগ করতে লাগল। জানালার পাশে বসা আনায়াও ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।অবশেষ নতুন জীবন শুরু করার আগে,এক দারুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে চলেছে।
কেনীথ বারান্দার ফ্লোরে বসে রয়েছে। হাতে তার স্কেচবুকে ও পেন্সিল। ফ্লোরেও আর্ট করার জন্য ব্যবহৃত ,নানান সব জিনিসপত্রও গুছিয়ে রাখা। তার চোখে-মুখের ভাবগাম্ভীর্য বেশ তীক্ষ্ণ। সম্পূর্ণ মনোযোগ তার ছবি আঁকায়। তবে অদ্ভুত বিষয়,সে বহুক্ষণ হতে শুধু একজোড়া চোখই একে যাচ্ছে। তবুও সেটা শুধুমাত্র বিভিন্ন ধরনের কালচে পেন্সিলের কলাকৌশলে।
কেনীথের চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো। বেশিরভাগ সময় যেমন থাকে, ঠিক তেমনই। চোখে কালো রঙের চিকন ফ্রেমের চমশা। তার পাশেই বারান্দায় রাখা সেই বেলীফুলের গাছ। সবমিলিয়ে আবহটা বেশ সুন্দর। গতকালই তাদের ট্রুর শেষ করে ফিরে এসেছে। হাতেও বেশ কিছু সময় রয়েছে। অফিসের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজও, নায়রাই সামলে নেয়। এদিকে এসব নিয়ে তাকে তেমন ভাবতে হয়না।
চারপাশ হতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বারান্দা হতে দূরের সবুজ ঘেরা পাহাড়গুলো দেখা যায়। সবমিলিয়ে জায়গাটা বেশ উপভোগ্য।
কেনীথের ব্যস্ত সময়ের মাঝেই,আচমকা তার রুমে নায়রা আর পাভেল আসে। দরজা এইসময় খোলাই থাকে,তাই তারা তেমন দ্বিধাবোধ করেনি ভেতরে আসতে। নায়রার হাতে তার ছোট্ট বিড়াল—নুযা। দেখতে পার্সিয়ান বিড়ালের মতো হলেও,জাত ভিন্ন এবং আরো বেশি আকর্ষণীয়। ধবধবে সাদা ও খানিক বাদামী লোমযুক্ত। একইসাথে চোখজোড়া হ্যাজেল রঙের। অনেকটা নায়রার হ্যাজেল ফক্সি আইজের ন্যায়।
কেনীথের রুমের সোফার এককোণায় বসে ছিল কেনেল। একা একাই সে একপ্রকার ঝিমাচ্ছিল। তবে নুযা এসেই,আচমকা নায়রার কোল থেকে নেমে যায়। এবং তৎক্ষনাৎ কেনেলের গা ঘেঁষে গিয়ে বসে পড়ে। এতে কেনেল যেন কিছুটা বিরক্ত হয়। তবুও সে চুপচাপ থাকে।
এদিকে ধীর পায়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করতেই,নায়রা-পাভেলের নজর বরাবরের মতো কেনীথের রুমের একপাশের দেওয়ালে ঝুলানো,সেই বিশাল আকারের পেইন্টিং এর দিকে পড়ে। সেই অর্ধনিমিষে অঙ্কিত,বাচ্চাদের বিশাল দুটো চোখ। এক অদ্ভুত আকর্ষণে বারংবার নজর এদিকেই চলে যায়।
নায়রা বুকে হাত গুঁজে, ছবিটার দিকে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পাভেলও তাই। এরিমধ্য হঠাৎ বারান্দা হতে গম্ভীর নিরেট কন্ঠস্বর ভেসে আসে।
—“কিছু বলার থাকলে এদিকে আয়।”
কেনীথের আওয়াজে দুজনের ধ্যান ভাঙে। এবং তৎক্ষনাৎ দুজন,পেইন্টিং হতে নজর সরিয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। কেনীথকে স্কেচ করতে দেখে,খুব একটা অবাক হয়না তারা। তবে তাদেরকে দেখামাত্রই,কেনীথের স্কেচবুক বন্ধ করার ব্যাপারটা নায়রার চোখে লাগে। কেনীথ নিজের পাশে স্কেচবুকটা সরিয়ে নেবার পূর্বেই, নায়রা দ্রুত তা টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
নিমিষেই কেনীথের চোখ-মুখ কুঁচকে যায়। খানিকটা বিরক্তি নিয়ে আওড়ায়,
“সুইঠি, দিয়ে দে নয়তো…”
কেনীথের কথা শেষ হতে না হতেই,নায়রা স্কেচ বুকটা খুলে লাস্ট ড্রইংটা দেখে। এখানেও একজোড়া চোখ ব্যতীত কিছুই নেই। এমনকি এই স্কেচবুকের সর্বত্র শুধু, বিভিন্ন আকৃতির একজোড়া চোখই অঙ্কিত।
নায়রা কিছুটা কপাল কুঁচকে, বারান্দা হতেই ঘাড় উঁচিয়ে, সরাসরি রুমের পেইন্টিংটার দিকে তাকায়। অতঃপর হাতে থাকা কেনীথের সর্বশেষ স্কেচের দিকে। দুটোকে মিলিয়ে নিয়ে কিছু বলার পূর্বেই,কেনীথের উদ্দেশ্যে পাভেল বলে,
“ব্রো! তোমার এই রহস্য আজ অব্দি সলভ্ করতে পারলাম না। এটা তুমি বারবার কার চোখের ছবি আঁকো?”
কেনীথ মাথা নুইয়ে, এক হাঁটুর উপরে হাত রেখে, সম্মূখের উন্মুক্ত পরিবেশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভাবগাম্ভীর্যে বিশেষ কোনো পরিবর্তন নেই তার। এদিকে পাভেলের কথার উত্তরটা নায়রাই দিয়ে দেয়। সে নিস্পৃহে আওড়ায়,
“এটা সেই একজনেরই আখিঁযুগল।”
নায়রায় কথায় পাভেল কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে ফেলে। তার কথা বোঝার চেষ্টা করে বলল,
“মানে?… কিন্তু এটা তো কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের, আর ওটা তো কোনো এক বাচ্চার…”
পাভেলের কথা শেষ হতে না হতেই,নায়রা আবারও বলল,
“আমার যদি ভুল না হয়, তাহলে এটা ঐ বাচ্চার চোখগুলোরই এডাল্ট ভার্সন। ঠিক বলেছি না, ভি!”
নায়রার তীক্ষ্ণ প্রশ্নে কেনীথ কিঞ্চিৎ চমকায়৷ সে কিছুটা অবাক হয়েই,নায়রার দিকে ফিরে তাকায়। তবে কোনো জবাব না দিয়ে, পরক্ষণেই আবার চুপ হয়ে নজর সরিয়ে নেয়।
এদিকে নায়রা ততক্ষণে স্কেচবুকটা বন্ধ করে, কেনীথের পাশে রেখে দেয়। এবং দুজন মিলে তার পাশেই নিচে বসে পড়ে। অতঃপর কিছু একটা মনে পড়তেই,সে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভি! একটা কথা বলব। ঠিকঠাক উত্তর দিবি।”
কেনীথ পাশে না ফিরেই বলল,
“হু!”
—“কিছুদিন আগে ডাস্টবিনে তোর একটা স্কেচ পেয়েছিলাম। এমনই একটা মেয়ের একজোড়া চোখ। হয়তো তুই আঁকার পর ফেলে দিয়েছিস। দেখে মনে হলো, অনেক বেশি রাগ নিয়ে পুরোটা আঁকার পর দুমড়েমুচড়ে ন’ষ্ট করেছিস।”
কেনীথ চুপচাপ নায়রার কথা শুনছে। পাভেল বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করছে।এদিকে নায়রা খানিকটা সময় থেমে,পরক্ষণেই অকপটে বলতে লাগল,
“আনলেস আ’ম রঙ, দ্যান…তুই আজ পর্যন্ত যতবার এমন চোখ এঁকেছিস, তার সবটাই শুধু একজনেরই মনে হয়েছে। কখনো বাচ্চার, কিংবা কখনো সেই বাচ্চার পরিণত অবয়বে। যার ফলে, তুই বিভিন্ন এঙ্গেলে শুধু চোখজোড়াই আঁকিস। কিন্তু আমার প্রশ্ন এটা নয়। তুই আজ অব্দি কেনো বললি না যে,এটা তুই প্রতিবার কার চোখের ছবি আঁকিস? কে এই মেয়ে? এতোবছর তোর সাথে থেকে এইটুকু তো জেনেছি যে, তোর জীবনে আর কোনো মেয়ের অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই। তাহলে এটা কে?”
কেনীথ এবারও চুপ করে বসে। তার সম্পূর্ণ নজর, সুদূরের পাহাড়চূড়ায়। কিছুক্ষণ থেমে, সে নিস্পৃহে বলল,
“প্রায়ই স্বপ্নে বাচ্চার চোখদুটো দেখতাম—তাই আঁকি!”
কেনীথের এহেন স্বাভাবিক অভিব্যক্তিতেও,নায়রা আর পাভেলের কপাল কুঁচকে যায়। পাভেল সন্দিহান স্বরে আওড়ায়,
“সিরিয়াসলি! মিথ্যে বলছো না তো?”
কেনীথ কোনো জবাব দেয়না। তবে নায়রা এবার বলল,
“আর এই প্রাপ্তবয়স্ক চোখজোড়া! এগুলো কি তুই ঐ বাচ্চার চোখদুটোর কনসেপ্টেই এঁকেছিস? লাইক…বাচ্চাটার প্রাপ্তবয়স্ক রূপে তার চোখজোড়া ঠিক কেমন হবে,এই ভাবনায়?”
নায়রার কথায়, কেনীথ কিঞ্চিৎ মুচকি হাসে। এই কারণেই, তার ‘সুইঠি’কে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। সুইটি’কে অতিমাত্রায় সাজিয়ে সুইঠি বলাটাও তার নিজস্ব ভঙ্গিমা।কিন্তু এটি নায়রার নাম নয়। কিংবা নায়রাও তার রক্ত সম্পর্কিত কেউ হয়।অথচ এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভরসা সে নায়রাকেই করে। তার মতো চাপা, অগোছালো মানুষের ভেতরটাকে যদি একটুও বুঝতে পারে,তাহলে সেটা নায়রা। এক কালের ছন্নছাড়া,অসভ্য ভিকে হতে, বর্তমানে গোছানো ও সভ্য ‘ভি’ শুধুমাত্র নায়রার জন্যই হতে পেরেছে। এক নিশুতি রাতে পথের ধারে পাওয়া আশ্রিতা মেয়েটি যে,এতোবছরের ব্যবধানে কেনীথ কিংবা পাভেলের জীবনে এতো গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠবে—তা হয়তো তারা কখনো কল্পনাও করেনি। কেনীথের বয়সে ছোট কিংবা পাভেলের সমবয়সী হয়েও,নায়রাকে তারা নিজের গার্ডিয়ান হিসেবেই গণ্য করে। এবং সর্বদা বড়বোন হিসেবেই তাকে গ্রাহ্য করে।
কেনীথ চুপচাপ মিটমিট করে হাসছে বিধায়,নায়রার কপাল কুঁচকে যায়। সে আবারও বলল,
“কি ঠিক বলেছি আমি,তাই না?”
কেনীথ ধ্যানে ফিরে,আওড়ায়,
“হু!”
নায়রা আবারও কিছু ভেবে নিয়ে বলল,
“তাহলে ওটা কার চোখের ছবি ছিল? ওই মেয়ে আর এই মেয়ে এক নয়। সবগুলো এডাল্ট ফ্রম তোর আনুমানিক ধারণাতে আঁকা হলেও,ওই মেয়ের চোখজোড়া একদম ভিন্ন ছিল। ওটা কে ছিল, ভি?”
কেনীথের মেজাজ নিমিষেই খারাপ হলো। নায়রা তাকে বোঝে,এটা বেশ ভালো দিক হলেও,নায়রার অতিরিক্ত বোঝাটা তার পছন্দ নয়। একইসাথে, নায়রার ধারনাটাও যে কোনোমতেই ভুল নয়, তা কেনীথও জানে। কিন্তু সে এই প্রেক্ষিতে পুরোনো অতীতের বিষাক্ত স্মৃতিগুলো আর মনে করতে চাইছে না।
এই পৃথিবীতে শুধু একজনই রয়েছে,যাকে সে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে। প্রচন্ড ঘৃণা তার সেই ব্যক্তির প্রতি। যাকে হয়তো সে মৃত্যুর পরও ক্ষমা করতে নারাজ।অথচ এক-সময় সেই ব্যাক্তিই ছিল,তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। যাকে কিনা সে তার নিজের জীবনের চেয়েও ভালোবাসতো।যার মাথার চুল হতে, পায়ের পাতা—সবটাই ছিল কেনীথের প্রিয়। কেনীথ নয়, বরং বলতে হয় ভিভিয়ান কিংবা ভিভানের প্রিয়। আর ভুলবশত গত একরাতে তারই চোখজোড়া কেনীথ বেখেয়ালিতে একে ফেলে। অতঃপর যা ঘটার তাই ঘটে। হুঁশ ফিরতেই শুরু হয় তার পাগলামি। কোনোমতে তার মেডিসিন গুলো খেয়ে, নিজেকে শান্ত করলেও, সম্পূর্ণ স্কেচটা দুমড়েমুচড়ে নষ্ট করে ফেলে।
তাই আর এই বিষয়ে সে কথা বাড়ায় না। এখন ওসব নিয়ে ভাবতে নিলে,মাথায় পুনরায় ব্যাথা শুরু হবে। আবারও প্যানিক করবে সে। ফলে নায়রার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে,কেনীথ পাভেলের উদ্দেশ্যে বলল,
“বাবা, আজও ফোন করেছিল?”
আচমকা এহেন কথায়, নায়রা বুঝে যায়—কেনীথ তার প্রশ্নের বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাচ্ছে না। যথারীতি, সেও ভারী শ্বাস ফেলে চুপ করে যায়। কখনো কিছু বলার থাকলে,কেনীথ নিজেই বলবে। আবার এতো বছরে সে যা বলেনি,তা ভবিষ্যতেও কখনো বলবে কিনা সন্দেহ। ঘটনা যাই হোক,এখানে জোড় করার কিছু নেই। তবে বিষয়টা জোড়ালো। কেননা, পাভেল কেনীথের কাজিন হওয়ার পরও , সে এই বিষয়টা ধরতে পারছে না। অবশ্য সে একটা বোকামিও করেছে,স্কেচটা সে শেষে অপ্রয়োজনীয় ভেবে ডাস্টবিনেই ফেলেছে। পাভেলকে দেখালে হয়তো,কোনো রহস্যের সমাধান হয়েই যেতো। কেননা,তার অতীত যেমন কেনীথ কিংবা পাভেল জানে,তেমনি এই দুজনের অতীত সম্পর্কে নায়রাও অবগত।
এদিকে কেনীথের প্রশ্নের জবাবে,পাভেল ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“সে আর বলতে, পাগল হয়ে গিয়েছে সবাই। অবশ্য হওয়াটাও স্বাভাবিক। কয়েক বছর ধরে সবার চেষ্টাই শুধু তোমাকে একবার দেশে নিয়ে যাওয়া। উদ্দেশ্য কি জানিনা, কিন্তু… ”
কেনীথ কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে ভাবনাচিন্তা করার পর বলল,
“উদ্দেশ্য থাকলে অবশ্যই সেটা ছোটখাটো কিছু নয়। কিন্তু আফসোস, আমাদের পরিবারও আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়—যেমনটা আমরা তাদের কাছে নই।”
এই বলেই কেনীথ তাচ্ছিল্যের সহিত কিঞ্চিৎ বাঁকা মুচকি হাসে। তার হাসিতে পাভেলও মলিনভাবে হেসে ফেলে। নায়রা শুধু বসে বসে, বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টায় রয়েছে।
কিছুক্ষণ সবার মাঝে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করার পর, শেষে পাভেলই বলে উঠল,
“সবচেয়ে বেশি পাগলামি করছে তোমার জান—নূর বেপ্পি! বেচারী পুরো পাগল হয়ে গিয়েছে তোমার জন্য। গতকাল রাতে শুনলাম, বেশ অসুস্থ। আজ নাকি অসুস্থতা আরো বেড়েছে।”
পাভেলের এহেন কথায় কেনীথের কপাল কুঁচকে যায়। সে উদ্বিগ্ন চাহনিতে পাভেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটা আগে বলিসনি কেনো?”
পাভেল কিছুটা ইতস্তত হয়ে বলল,
“আগে বলেই বা কি করব…তুমি তো…”
পাভেলের কথা শেষ হতে না হতেই,কেনীথ বলল,
“যাস্ট শাট আপ! চুপচাপ ফোন লাগা। কথা বলব।”
কেনীথের এই উদ্বিগ্নতায় পাভেল অবাক হলো না। উল্টো নিজের বোকামিতেই,বিরক্ত হলো। কেনীথ বাকিদের বিষয়ে সবসময় বলতে নিষেধ করলেও, অন্তত এই বিষয়টা তার আগেই জানানো উচিত ছিল।
পাভেল দ্রুত বিশেষ নাম্বারটায় ফোন করে। কিছুটা সময় লাগলেও, এক অল্প বয়সী মেয়ে ফোন তোলে। অতঃপর সে কিছু বলে নিয়ে, সরাসরি ফোনটা কেনীথের দিকে এগিয়ে দেয়। এবং শুরুতেই ভেসে আসে কারো কান্নারত আওয়াজ। যার কন্ঠে কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে, তীব্র নমনীয় স্বরে বলল,
“কাঁদছো কেনো, জান! আমায় মিস করছো? তোমাকে নিয়ে আসবো আমি এখানে? তুমি এখানে আসবে আমার কাছে?”
কেনীথের এতো কথাতেও কোনো কাজ হয়না। ওপাশ হতে পুনরায় কান্নারত কন্ঠস্বর ভেসে এসো,
“আমি ম’রে যাই,তারপর তুমি এসো। তার আগে আসার কোনো দরকার নেই। যে খানেই আছো ভালো থাকো!”
—“আহা! এখন এসব ম’রার কথা উঠছে কেনো? এতো পাগলামি করলে চলবে? আমায় এতো ভালোবাসো অথচ…”
কেনীথের কথা শেষ হতে না হতেই, ফোনের ওপর প্রান্তের ব্যক্তিটি বলে,
“বললামই তো! আমি ম’রে গেলে,তারপর এসো। আর তোমাকে বিরক্ত করব না। আর কখনো তোমাকে ফোন করবে জ্বালাবো না। বছরের পর বছর, অনেক জ্বালিয়েছি তোমায়। আর কখনো বলব না, তোমাকে আমার কাছে আসতে। ও দেশেই ভালো থাকো তুমি।”
—“এই জান…”
কেনীথের কথা শুরু হবার আগেই, আচমকা কলটা কেটে যায়। সে এতে বেশ অবাকই হয়। তার নূর-জান কখনোই এমনটা করে না। সে কপাল কুঁচকে, আরো কয়েকবার কল করে।কিন্তু কোনো লাভ হয়না। বারবার কল কেটে দেওয়া হয়।
এদিকে নায়রা কিংবা পাভেলেও বেশ অবাক হয়। যতদূর বুঝতে পারে,পরিস্থিতি এবার সত্যিই বেগতিকে। কিন্তু কেনীথ কি আদৌও কোনো কাজের কাজ করবে? এরইমাঝে কেনীথ এক গভীর চিন্তাভাবনায় মগ্ন হয়। মাথা ঝুকিয়ে, লাল-হলুদ সন্ধ্যার আভাময় আকাশের পানে চেয়ে থাকে।
তার ভাবনা চিন্তার মাঝেই, পাভেল কিছুটা সাহস নিয়েই বলে,
“ব্রো! অনেক বছর তো হলো। এবার একটু গেলে, হয় না?
কেনীথ কিছু বলে না, সে মাথা উঁচিয়ে একপলক পাভেলকে দেখে। এদিকে নায়রাও ততক্ষণে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভি! একটু ভেবে দেখ। এতোবছরে সবকিছুই বদলে গিয়েছে। তোর পরিবারও বদলেছে হয়তো। তারা তোকে আর অপছন্দ করে না। করলে নিশ্চয়, সবাই এতো করে তোকে দেশে যেতে বলতো না। তুই যা করেছিস তা অন্যায় ছিল। তাই তোর পরিবার তোকে ঘৃণা করতো। কিন্তু সেসব ঘটনার প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গিয়েছে। এখনও কি…”
—“ঘৃণা করাটাই স্বাভাবিক। না করাটাই অস্বাভাবিক, নায়রা!”
কেনীথের অভিব্যক্তিতে যথেষ্ট গাম্ভীর্যতা রয়েছে। নায়রা আনমনেই ভারী শ্বাস ফেলে। এদিকে কেনীথ আবারও বলল,
“আই ডোন্ট নিড এনিওয়ান’স লাভ। আই’ম ফাইন রাইট হিয়ার। এখানে আমি যে শান্তি পাই,তা আমি কখনোই দেশে গিয়ে পাব না। সবসময় মনে হবে…আই অ্যাম নাথিং বাট এ সিন্নার, এ ব্যাড ম্যান,এ মনস্টার, আন্সিভিলাইজড…এ বিস্ট ইন ফ্লেশ!”
কেনীথের এহেন কথায় পাভেল কিংবা নায়রা দুজনেরই বেশ হতাশ। আজ অব্দি যেখানে কেনীথ নিজেই নিজেকে পুরোপুরি ক্ষমা করতে পারেনি,সেথায় বাকিরা কি করবে?এরইমাঝে পাভেলও কেনীথের কথার স্বরে আওড়ায়,
“এই পাপের ভাগী তো কোনো অংশে কম, আমিও না!”
এবার নায়রা আরো বেশি হতাশ হয়। এতোক্ষণ কেনীথ ছিল,এবার পাভেলও তাতে যুক্ত হলো। সে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“আহা! পুরনো কথা টেনে কি লাভ? যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। তোরা তোদের শাস্তি ভিন্ন উপায়ে পেয়েছিল। কিন্তু পেয়েছিস তো! তাহলে এখন নিজেদের এতো দোষারোপ করে কি হবে? এর চেয়ে বলি,তোরা দুজন একবার দেশ থেকে ঘুরে আয়। গিয়ে দেখ,এতো বছর পরও পরিস্থিতি ঠিক কেমন রয়ে গিয়েছে। সবাই আগের মতোই নাকি…”
এবারও নায়রার কথা শেষ হবার পূর্বেই কেনীথ বলল,
“আমি এতো বছর দেশে যাইনি শুধু নিজের জন্য। নয়তো অন্যদের ভয় আমি কোনোদিনও করিনি। আমি চাইলেই, দেশের কোথাও না কোথাও সবার থেকে দূরে গিয়ে থাকতে পারতাম। কিন্তু ও দেশের কথা মাথা এলেই যে,আমার সব পুরোনো অতীত মনে পড়ে…এর কি করবো আমি?”
কেনীথের নিজের প্রতি রাগান্বিত হয়ে, এমন অভিব্যক্তিতে নায়রা ভারী শ্বাস ফেলে, নমনীয়তার সহিত বলতে লাগল,
“ভি! এবার তো নিজেকে পুরোপুরি কন্ট্রোল করতে শিখ! আমি জানি তোর সমস্যা রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র মেডিসিনের উপরে আর কতকাল বাঁচবি? আই নো, তোর ভেতরের ভয়টা শুধুমাত্র তোর নিজেকে নিয়েই। তুই সবসময় এটাই ভাবিস,তোর জন্যই সবার ক্ষতি হবে। এইজন্য তুই তোর পরিবারের কাছে ফিরতে চাস না। কিন্তু বাস্তবতা তো এমন নয়। যদি এমনই হতো,তাহলে তুই নিশ্চয় আমাদেরও ভালো থাকতে দিতি না! আমরা কি তোর পরিবারের কেউ নই? যদি আমাদেরও নিজের কেউ ভেবে থাকিস,তাহলে এতোগুলো বছরে আমাদেরও তো তুই কোনো না কোনো ক্ষতি করতি, তাই না? কিন্তু তুই তো এমনটা করিসনি।…ভি! আর কেউ না জানুক,আমরা তো জানি তুই কেমন।”
নায়রা এই বলেই থেমে যায়। এবং পরক্ষণেই সে স্তব্ধ হয়ে, গভীর ভাবনায় মগ্ন কেনীথের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“বেশি না, যাস্ট সপ্তাহ খানেকের জন্য চলে যা দুজন। গিয়ে সবকিছু একবার নিজ চোখে দেখ,নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর। যদি সম্ভব হয় তো ভালো,নয়তো…।যাই হোক, দ্রুতই দুজনে ফিরে আসবি। আবার নতুন করে কয়েকটা এডভেঞ্চার ট্রিপ সহ রেসিং ইভেন্ট,কনসার্ট, ক্লাইন্ট ডিল…সব করতে হবে,সব! যত যাই হোক,আমাদের থেমে থাকলে চলবে না।”
নায়রা এই বলেই,কিছুটা জোরপূর্বক হেসে ফেলে। এদিকে কেনীথ এখনোও তার চিন্তা ভাবনায় আঁটকে রয়েছে। এতো বছরেও যা করার প্রয়োজন মনে করেনি, এখন তাই করা আদৌও উচিত হবে কিনা…সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না। এদিকে পাভেলও আশায় বসে রয়েছে, কেনীথ এবার অন্তত ভালো কিছু বলুক। বিস্ময়কর হলেও যেন,বলে দেয়—সে দেশে একবারের জন্য হলেও, ফিরতে রাজি।
প্রায় দীর্ঘক্ষণ ভাবনা চিন্তার পরও যখন,কেনীথ কিছুই বলল না। তখন নায়রা আর পাভেল বেশ হতাশ হলো। শেষ! আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। এই জনমে হয়তো আর কেনীথকে দেশে ফেরানো সম্ভব নয়।
দু’জনেই যখন একেবারেই আশা ছেড়ে দিয়েছে,ঠিক সে মূহুর্তেই আচমকা কেনীথ পাভেলের উদ্দেশ্যে বলল,
“যাব আমি…!”
তার এইটুকু কথাতেই দুজনের বেশ চমকে ওঠে। পাভেল অবাক স্বরে কিছু বলবে,তার পূর্বেই কেনীথ কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়েই, ঠোঁট ভিজিয়ে নিরেট স্বরে আওড়ায়,
“আগামী দুদিন পর, ফ্লাইটের টিকিট কনফার্ম কর। সর্বচ্চো এক সপ্তাহ থাকব,এর বেশি নয়।”
কেনীথের এহেন কথায়, পাভেলের চোখ উচ্ছ্বাসে চিকচিক করে ওঠে। নায়রাও প্রচন্ড খুশি হয় তার এই মন্তব্যে। তবে পাভেল নিজেকে সামলাতে না পেরে,আচমকা কেনীথকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে, একপ্রকার কেঁদে ফেলে বলল,
“থ্যাংক ইউ ব্রো! থ্যাংক ইউ,থ্যাংক ইউ,থ্যাংক ইউ সো মাচ! থ্যাংকস্ অ্যা লট!”
মহামায়া পর্ব ৩
আচমকা পাভেলের এহেন কান্ডে কেনীথ হতভম্ব হয়ে যায়। তার নজর নায়রার দিকে পড়তেই, সে অকস্মাৎ গা দুলিয়ে প্রাণখোলা হাসিতে মেতে ওঠে। কিন্তু কেনীথের মস্তিষ্ক হতে কোনোমতেই বাজে চিন্তা গুলো সরছে না। সে শুধু ভেবেই চলেছে,আদৌও তার জীবনের শেষ অব্দি ভালো বলতে কিছু রয়েছে নাকি…তার জীবনের শেষটাও খুব খারাপই হতে চলেছে।
