Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ১০

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১০

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১০
নূরায়েশা মাহনূর

সকলের জোরাজোরির উচ্ছৃঙ্খল ভিড়ের মধ্যে অবশেষে গিটারটা হাতে তুলে নিল সাইফ। পুষ্পবিন্যস্ত স্টেজের মগডালে উঠে দাঁড়াল সে ঠিক যুদ্ধভূমির প্রাচীন বীরের মতো। চোখ ঘুরিয়ে একবার চারপাশে তাকাল। চওড়া চোয়ালের নিচে সে চাহনিতে প্রতীক্ষা।
দূরে দাঁড়িয়ে আছে সে, যে তার মুগ্ধতার গন্তব্য, তার মনের পবিত্রতম পীঠস্থান। তবে চোখে চোখ নয়, সেই মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে অন্য কারো সাথে কথা বলছে। এক মুহূর্তের জন্য সাইফের বুক কেঁপে উঠলো। চোখ থেমে রইলো মেয়েটির দিকেই। আঙুল ছুঁলো গিটারের ছত্রভঙ্গ অনুভবের তারে। আর গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো গান,

“এমনও নিদাদের দিনে বিনীত প্রার্থনা গো,
লক্ষ কোটি ভুল আর ত্রুটি করিও মার্জনা গো…”
সাইফের কণ্ঠে ভেসে আসা রক্তঝরা সুর মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে দিলো কলেজের বাতাসে। সামনের সারিতে বসা ছেলেমেয়েগুলো হঠাৎ করে চিৎকার করে উঠলো। কারও মুখে উল্লাস, কারও কণ্ঠে গানের লাইন, আর কারও দৃষ্টিতে নিখাদ বিস্ময়। একঘেয়ে দুপুরটা আচমকা সিনেমার দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
সেই চঞ্চলতার ভেতরেই মাহির চোখে চকচক করে উঠলো এক তীব্র উচ্ছ্বাস। দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে সে আর সামলাতে না পেরে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার দুহাতে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– জলদি চলো দৃষ্টি! সাইফ ভাই গান গাইছে!
দৃষ্টি কিছু বলার আগেই মাহি তার হাত টেনে নিলো। ওর আবেগের রাশটা দৃষ্টির হাত ধরে টান দিচ্ছে। দৃষ্টিকে একটা নিঃশ্বাস ফেলারও অবকাশ না দিয়েই ভিড় ঠেলে সামনে চলতে লাগলো সে।
ইমন দৃষ্টিকে সামনে আসতে দেখে সবাইকে সরিয়ে জায়গা করে দিলো। দৃষ্টির পেছনে পেছনে আসলো আফরা আর তুবা। দৃষ্টি হাওয়ায় হাঁসফাঁস করছে। চারপাশে ভিড়, পেছনে কণ্ঠস্বর, সামনে… এক দুর্বার চাহনি । সে যেদিকেই চোখ ফেরাচ্ছে, সাইফের দৃষ্টির সূচ তাকে বিদ্ধ করেই চলেছে।

“শোনাইবো তোমারে আজ করেছি বাসনা গো,
ঐরাবতের হৃদয় হতে ক্ষুদ্র এ রচনা…”
চারপাশ নিস্তব্ধ, কেবল গলার সুর বয়ে যাচ্ছে শ্রবণেন্দ্রিয় ছুঁয়ে হৃৎপিন্ড পর্যন্ত। সাইফের চোখ-জোড়া এতটাই তীক্ষ্ণ যে দৃষ্টি মনে মনে চাচ্ছে এখন যদি মাটির ভেতরে ঢুকে পড়া যেত! আরেকপাশে দাঁড়িয়ে ইমন দুই হাত পকেটে রেখে ঠোঁটে বক্ররেখা নিয়ে একবার সাইফের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার দৃষ্টির দিকে।
দৃষ্টি একবারও সাইফের চোখে তাকাতে পারছে না। ভিতরে ভিতরে এক অদৃশ্য তাপমাত্রা তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। সাইফের কণ্ঠস্বর তার কর্ণকুহরে ঢুকে বুকের মর্মস্থলে চেপে বসেছে।

“আমি কি করিবো, কোথায় যাবো,
কোন সাধনে পাবো গো…
আরেকটি বার তোমার-ই দর্শন!”
“আরেকটি বার তোমার-ই দর্শন!”
শেষের লাইনটায় সাইফ এমন এক জোরালো আবেগ ছুঁড়ে দিলো গোটা বাতাস কাঁপলো। সঙ্গে সঙ্গে জমে থাকা ভিড় একসাথে গেয়ে উঠলো লাইনটা। হঠাৎ কলেজের পুষ্পসজ্জিত মঞ্চটা একটুখানি হেলাফেলার কনসার্টে রূপ নিলো। হুট করেই আপাত দৃষ্টিতে দেখতে গেলে মনে হবে একটা ছোটখাটো কনসার্টের আয়োজন হয়ে গেছে। সবাই চেঁচিয়ে উঠলো, হাততালি আর বাঁশিতে মিললো উৎসবের রং। গিটারটা নামিয়ে সাইফ একটুখানি সৌজন্য হাসি ছুঁড়ে দিলো ভিড়ের দিকে ।

আফরার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। স্টেজের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে সে। শুভ্র পাঞ্জাবির উপর নিপুণ ভাঁজে গলায় জড়ানো একখানা কালো চাদর। ঘাড় ছুঁইছুঁই লম্বা চুল, তার কিছু অংশ কপালের কোণে বুনে রেখেছে এক স্বেচ্ছাচারী সৌন্দর্য। লম্বা গড়ন। এক আশ্চর্য মায়ায় মোড়া মুখশ্রী। শ্যাম বর্ণ, তবুও আলোর মতো দীপ্ত। চাপা দাড়ির রেখায় সময় আঁকছে তার ব্যক্তিত্ব।
আফরা কিছুক্ষণ বোবা চোখে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ চমকে উঠলো । নিজের উত্তেজনা আর কৌতূহল চাপতে না পেরে গলা নামিয়ে দৃষ্টির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,

– এই লোকটা কে দৃষ্টি? কোনো সিঙ্গার?
দৃষ্টি কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই পাশ থেকে মাহি কথা কেটে দিয়ে বলে উঠলো,
– উনি আমাদের কলেজের সিনিয়র ভাই। এখানেই পড়ালেখা শেষ করেছেন। খুব ভালো গান গায়। আমাদের কলেজের সবার প্রিয় সাইফ ভাই।
বলেই মাহি গর্বে গলাটাকে একটু উঁচু করলো । আর আফরা তার চোখ সরাতে পারছে না সাইফের দিক থেকে। কবিতার মত কোনো অজানা বেদনাসূত্র ঘিরে ধরেছে তাকে। মাহির কথা বিপরীতে ঘোর লাগা কন্ঠে আফরা ফিসফিস করে উঠলো,

– উমম, ইন্টারেস্টিং!
আফরার চোখে কৌতূহল, মুখে এক অচেনা তৃপ্তির হাসি। কথাটা বলতেই পাশ থেকে তুবা চট করে কনুইয়ের একটি নিপুণ গুতো মারলো তার পেট বরাবর।
– আসিফ শুনলে তোর খবর আছে।
ঠোঁটে দমকানো হাসি নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো তুবা। তাদের খুনসুটিতে চারপাশে ফোয়ারার মতো মুঠোমুঠো প্রাণ খেলে গেলেও দৃষ্টি এখনও জমে আছে একটা জড়তার খাঁচায়। সাইফের দৃষ্টি বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। না ছুঁয়ে নয়, চূর্ণ করে দিচ্ছে। তার সেই কৃষ্ণকালো গম্ভীর চোখ দুটো দিয়ে ঝলসে যাচ্ছে দৃষ্টির সত্তা। দৃষ্টি নিজের অস্বস্তিকে গিলে ফেলছে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে। অস্বস্তিতে হাসফাস করতে করতে দৃষ্টি বলে উঠলো,

– আপু চলুন, আমরা ওইদিকে গিয়ে দাঁড়াই।
তখনই আফরা বলে উঠলো,
– কেনো, ভালোই লাগছে এখানে। ছেলেটাকে আরেকটু দেখি।
মজার স্বরে আফরা কথাটা বললেও দৃষ্টি আর সহ্য করতে পারলো না। কোনো উত্তর না দিয়ে আফরার হাত চেপে ধরে টেনে নিয়ে গেলো ভিড়ের বিপরীত দিকে। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখে একটা চাপা অনুরোধ… যাতে আর তাকাতে না হয় সেই চোখে, যে চোখ তাকে একবারেই ভষ্ম করে দিচ্ছে ভিতর-বাহির।

কলেজের আঙ্গিনায় এক টুকরো নরক নেমে এসেছে যেন! মধ্যমাঠে, সবুজ ঘাসের উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে একটা ছেলেমানব। রক্তে ভেজা মুখ, ফোলা চোখ, ছিন্ন ভ্রু, চোয়ালে ঘুষির ছাপ, এবং আশপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শত সহস্র জোড়া কৌতূহলী চোখ। সবাই চুপ, পা-জোড়া জমে গেছে মাটিতে। কেউ এগোচ্ছে না, কেউ রুখছে না।
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকে একেকর পর এক ঘু’ষি হাকাচ্ছে লোকটা। বারবার ছেলেটার মুখ বরাবর আঘাত নামিয়ে দিচ্ছে সে। একটা পশুর মতো, অথবা তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু। হঠাৎই জনতার ভেতর চিড় ধরিয়ে ছুটে এলো কলেজের প্রিন্সিপাল। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে, কিন্তু চোখেমুখে গুরুত্বের দাবী এখনও বেঁচে আছে।

– সাইফ! আর মেরোনা ওকে। আর মারলে ছেলেটা মরেই যাবে!
কিন্তু সেই কথার প্রভাব সাইফের শরীর ছুঁয়ে কোথাও পৌঁছাল না। তার চোখ রক্তাভ, পাহাড় চাপা ক্ষোভের মতো ভয়াবহ। প্রিন্সিপাল ছেলেটাকে টেনে ধরতে চেষ্টা করলেও বয়স আর শক্তির ব্যবধানে তিনি পিছিয়ে গেলেন।
তখনই ইমন আর তার সঙ্গে থাকা দুজন ছুটে এসে সাইফকে কায়দা করে ধরে ফেললো। কাঁধে, কোমরে, হাতের কবজিতে, যেভাবেই হোক আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা। তিনজনে মিলে টেনেটুনে তাকে একটু পেছনে সরালো। কিন্তু পেছাতে পেছাতেও সাইফ রাগে উন্মত্ত গর্জনে চেঁচিয়ে উঠলো,

– ছাড় আমাকে! আজকে এই শু’য়োরের বাচ্চার জান কবজ করে ফেলবো আমি! মেয়েদের সাথে অসভ্যতা আজকে ওর কলিজা ফুঁড়ে বের করবো!
– অনেক মারছেন ভাই আর মারলে মইরা যাইবো!
– ছাড় আমাকে ইমন!
আরও একবার শরীর কাঁপিয়ে উঠলো সাইফের হুংকার। রাগের নোনা ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে কলেজ মাঠের প্রতিটা দেয়ালে। এইবার আর দেরি না করে প্রিন্সিপাল নিজেই সামনে এসে সাইফের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো। দু’হাত উঁচু করে নির্দেশের মতো বললো,

– আর মারতে হবে না সাইফ। বাকিটা আমি দেখছি। ব্যবস্থা নিচ্ছি ওর।
কণ্ঠে দৃঢ়তা থাকলেও চাহনিতে ভেসে উঠছিল সাইফের ভেতরে উথলে ওঠা আগুনের ভয়। তারপর দুজন মিলে কোনোমতে ধরাধরি করে রক্তাক্ত ছেলেটাকে সরিয়ে নিয়ে গেলো।
আর এই সময়… দৃষ্টির পাশ ঘেঁষে কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে আফরা। তার শরীর শীতজ্বরের মতো কাঁপছে। চোখ বিস্ফারিত, ঠোঁট শুকনো। কপাল বেয়ে নামছে ছোট ছোট ঘামের ফোঁটা।
কিছুক্ষণ আগে…

এই একই জায়গায়, অন্য এক আবহ। আফরা আর তুবা হাসছে নিজেদের মতো। দৃষ্টি তখন খানিক দূরে, মাহির সাথে কুশল বিনিময়ে ব্যস্ত। মাহি তাদের কলেজের সিনিয়র। আজ তার কলেজজীবনের শেষ দিন। মাহি দৃষ্টিকে ভালো করেই চেনে। তাই বিদায়ের আগে শেষবারের মতো কথা বলে নিচ্ছে।
এমন সময় দুজন ছেলে হঠাৎ এসে দাঁড়াল আফরা আর তুবার সামনে। চিবুক উঁচু করে একজন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
– এই যে মিস, আপনারা কারা? আগে তো কখনো দেখিনি এই কলেজে!
কিন্তু তুবা আর আফরা অবজ্ঞা নিয়ে পাশ কাটিয়ে হাঁটা ধরলো। আচমকাই ছেলেদের একজন ঝাঁপিয়ে পড়লো। খপ করে ধরে ফেললো আফরার হাত।

– কি করছেন? হাত ছাড়ুন!
আফরার গলা কেঁপে উঠলো রাগে ও বিস্ময়ে।
– কথার জবাব না দিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি? এই কলেজে আমাদের কথায় সবাই উঠবস করে, আর তোমরা আমাদেরই ইগনোর করছো?
আফরা এক ঝাঁকিতে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। চোখে আগুন জ্বলে উঠলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
– আপনি আমাকে স্পর্শ করার সাহস কোথায় পেলেন?
তবু সময় পেলো না রাগকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে। বাক্যটা মুখ থেকে ঠিকমতো ছুটে বেরোনোর আগেই বিদ্যুচ্চমকের মতো এগিয়ে এলো ছেলেটার হাত। একটানে আফরার চিবুক তুলে ধরলো সে।গাল দুটোকে আঙুলের ফাঁকে থেঁতলে ধরল। চোখে স্পষ্ট অপমানের উত্তাপ।
আর সেই দৃশ্যই আগুন ঢেলে দিল দৃষ্টির ধমনীতে।
দৃষ্টির চোখ এক ঝলকে পুড়ে গেল। পরের মুহূর্তেই সে অস্থির পায়ে ছুটে এলো ঠিক সামনে।

– কি হচ্ছে এখানে? ছাড়ুন ওনাকে!
এক ঠেলা দিলো ছেলেটার বুক বরাবর। ধাক্কার অভিঘাতে ছেলেটা খানিকটা হকচকিয়ে পেছালো বটে, কিন্তু পশুর মতোই আবার ঝাঁপিয়ে এলো। এবার তাকে আর সুযোগ দিল না দৃষ্টি। ডান হাতে এক চড় বসালো, ছেলেটার গালে।
ছেলেটা ছিটকে উঠলেও থামেনি। সে আবারো দৃষ্টির দিকে হাত তুলতেই, দৃষ্টি ততক্ষণে উগ্র মেঘে পরিণত হলো। পরপর দুই-তিনটা চড় সে-ই রকম টিপে টিপে মেপে লাগালো।
– নারীর শরীর তোদের জন্য খেলনার মতো? মেয়েছেলে দেখলেই তোদের পিতৃত্ব জাগে? গায়ে হাত দিতে ইচ্ছে করে? মেয়েদের বাপের জমিদারি ভাবিস?
বলতে বলতেই আরেকটা চড় হাকালো। প্রতিটা প্রশ্ন একেকটা তীক্ষ্ণ বর্শা হয়ে বিঁধছে ছেলেটার আত্মঅহমে। তখই সে রাগে উন্মত্ত হয়ে দৃষ্টির হিজাবে হাত তুললো। যেই না হিজাবটা ধরে সজোরে টান দিবে তার আগেই শ্বাপদের ওপর বাজ পড়ার মতো আচমকা ছেলেটার কব্জি চেপে ধরলো সাইফ। মুহূর্তেই তার চোখে-মুখে নেমে এলো গর্জন আর অন্ধকার। তারপর যা ঘটলো, তা কলুষিত পুরুষতন্ত্রের ছেঁড়া মুখোশে কিল-ঘুষির উল্কাবৃষ্টি। একের পর এক উদোম ক্যালানি পড়লো।

আফরার শরীর দৃষ্টির গায়ে এভাবে লেপ্টে থাকতে দেখে সাইফের চোখ সেখানে স্থির হলো এক মুহূর্ত। তারপর ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি চারপাশে ঘুরলো। হাস্যকর এক নিশ্চুপ ভিড়! এই জনসমাগমটা কোনো বিনোদনমূলক নাটকের লাইভ শো দেখতে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকমাত্র। চোখেমুখে বিরক্তি ছুঁইয়ে সাইফ গর্জে উঠলো,
– শো ফিনিশড? তাহলে দয়া করে হেঁচড়ে নিজেদের অস্তিত্বটুকু সরিয়ে নিন এখান থেকে।
তার কণ্ঠের ভারে কারো আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হলো না। নিঃশব্দে সবাই চলে গেলো ভিড় থেকে। ততক্ষণে আফরা একটু সামলে সাইফের সামনে এসে দাঁড়ালো। চোখে একরাশ কৃতজ্ঞতা নিয়ে বলল,

– ধন্যবাদ আপনাকে…
সাইফ থামিয়ে দিলো হাত উঁচিয়ে।
– ধন্যবাদ দেয়ার কিছু নেই। আপনার জায়গায় যদি অন্য কেউ থাকত, একই কাজই করতাম আমি।
এই বলে তার চাহনি এবার ঘুরে গেলো দৃষ্টির দিকে। মুখে একটা চাপা প্রশ্রয়ের রেখা। তারপর আফরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

– ধন্যবাদ দিতে হলে দেন ঐ ম্যাডামকে। কী সাবলীল, কী নিপুণ চটাং চটাং চড়! সাহস তো বটেই, হাতে শার্পনেসও আছে! মনে হচ্ছে এই কাজে খুব পারদর্শী।
একটা মুচকি হাসি ছুঁড়ে দিলো সে। একরাশ সম্মানে ভরে উঠলো তার অন্তর। দৃষ্টি যে এই কাজে পারদর্শী সেটা তার থেকে ভালো আর কে জানে। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পা বাড়াল প্রিন্সিপালের কক্ষের দিকে। আজকে এই ছেলেটার একটা কঠিন বিহিত করেই ছাড়বে।

কলেজের মূল ফটক পেরিয়ে বাইরে আসতেই তুবাদের মুখভঙ্গি দেখে উজান-জিদান-আসিফের চেহারাও মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল। যেসব মুখে কিছুক্ষণ আগেও ভেলভেটি হাসির রেখা ছিল, সেখানে এখন সন্ধ্যাবেলার অন্ধকার নেমে এসেছে।
– কি রে? এমন মুখ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
জিদান আফরার দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো। কিন্তু তার স্বরেও দ্বিধা কেমন অজানা আশঙ্কা ঘেরা কৌতূহল। তুবা এক ধাক্কায় কথা ফাটিয়ে দিলো। মুখে কোনো রাখঢাক নেই, কণ্ঠে খরখরে কাচের টুকরো।
– ভিতরে দুইটা ছেলে অসভ্যতা করেছে। আফরার গায়েও হাত দিয়েছে।
এক মুহূর্তেই আসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে আর স্থির থাকতে পারল না। লাফ দিয়ে উঠে গিয়ে সোজা আফরার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো। চোখে আগুন জ্বলা একরোখা দৃষ্টি। আফরার হাত ধরে বলে উঠল,

– কোন ছেলে? কি করেছে? কোথায় হাত দিয়েছে?
দেখি আমাকে, চোখে চোখ রেখে বল… কোথায় হাত দিয়েছে, বল!
একনাগাড়ে একের পর এক উত্তাল প্রশ্ন ছুড়েই চলেছে আসিফ। প্রতিটা প্রশ্ন একটা করে তরবারি। আফরার হৃদয়ে লেগে বাড়িয়ে দিচ্ছে তার অপরাধবোধের ক্ষত।
তখনই তাকে ধমকে থামিয়ে দিলো উজান।
– আসিফ! চুপ কর।
উজান, এতক্ষণ নীরব আগ্নেয়গিরির মতো দাঁড়িয়ে ছিলো । এরপর আফরার দিকে তাকিয়ে গলাটা আরও কোমল করলো,

– আফরা তুই আমাকে বল… কী হয়েছে?
এইটুকু বাক্যে গলে গেলো আফরার ভেতরে জমে থাকা সব কান্না। দাঁতে দাঁত চেপে এতক্ষণ নিজেকে ধরে রেখেছিল, কিন্তু এবার আর পারলো না। চোখের কোণে থমকে থাকা জল ফুস করে নেমে এলো গাল বেয়ে। দমকে কান্না ভেঙে পড়লো তার গলা। ঠোঁট কাঁপছে, শব্দ আটকে যাচ্ছে গলার ভেতর।
এখানে আসার পর দ্বিতীয় বারের মতো বাহিরে বেরিয়েছে সে। আর এই দুইদিনেই দুবার তাকে এমন অপমানের মুখোমুখি হতে হলো। নিজের ভেতরে গুটিয়ে যেতে যেতে মনে হচ্ছে,সমস্যাটা হয়তো ওর মধ্যেই। হয়তো কিছু একটা আছে ওর চালচলনে, পোশাকে, মুখে… যা এসব ঘটনার কারণ।
কোনো কথার জবাব না দিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো রাস্তার দিকে। এক হাত দিয়ে চোখ মুছছে, আর অন্য হাতে ওড়নার প্রান্ত চেপে ধরেছে। আসিফ পেছন থেকে ছুটে যেতে যেতে আবার প্রশ্নের বন্যা বইয়ে দিলো,

– আফরা! দাঁড়া! প্লিজ বল না কিছু!
ততক্ষণে উজান দাঁড়িয়ে বাকিদের দিকে তাকালো, চোখেমুখে গভীর নিয়ন্ত্রিত রাগের রেখা। ঠান্ডা সুরে বলে উঠলো,
– তোরাও বাড়ি যা।
সবাই নিরবে মাথা ঝুঁকিয়ে রাজি হয়ে গেলো। দৃষ্টিও হাঁটা ধরতেই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ তাকে থামিয়ে দিলো,
– দৃষ্টি, তুই থাক। তোর সাথে আমার জরুরি কথা আছে।
উজানের এমন ডাকে থমকে গেলো সবাই। মুহূর্তেই তুবার মুখে বাজ পড়ার মতো ছায়া নেমে এলো। গাল ফুলিয়ে, কপাল ভাঁজ করে সে তাকালো উজানের দিকে। তার ঠোঁট কাঁপলো একটা চাপা বিরক্তিতে,
– দৃষ্টির সাথে আমিও থাকি?
উজান একটুও সময় না নিয়েই ছুঁড়ে দিলো ক্ষিপ্র জবাব,

– কেনো? আবার একটা ঝামেলা বাধানোর জন্য?তোকে বলেছি বাড়ি যা, সরাসরি মানে সরাসরি। এই জিদান ওকে নিয়ে যা।
কথাটা এত কাঁটাবিশিষ্ট ও খোলামেলা অপমানস্নিগ্ধ ছিল যে তুবার রাগ ঠিক মাথা পেরিয়ে গলায় এসে আটকে গেলো। কিছু না বলে সে ধপধপ শব্দে পা ফেলে সোজা চলে গেলো। সবাই যেতেই, উজান এবার দৃষ্টির দিকে ফিরে তাকালো।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৯

– ছেলেগুলো কে? কোথায় ওরা এখন?
দৃষ্টি ছোট্ট গলায় একটুখানি দম নিয়ে বললো,
– প্রিন্সিপালের রুমে আছে, বোধহয়।
উজান কিছু না বলে সোজা কলেজের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। হেঁটে যেতে যেতে সে শুধু বলল,
– চল, আমার সাথে। দেখি, কোন বাপের ছেলে এত সাহস এনেছে।
আর সেই কথার ভেতরেই ছিল এক অদৃশ্য ত্রাসের প্রতিশ্রুতি। দৃষ্টি কথা বাড়ালো না। মাপা কদমে দূরত্ব বজায় রেখে হেটে চললো উজানের পিছন পিছন।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১১