মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৪
নূরায়েশা মাহনূর
দৃষ্টির চলার পথের শেষ বিন্দুতে আটকে আছে উজানের চাহনি । দু’চোখে লেপ্টে থাকা সেই নীরব নিবেদনটুকু স্পষ্ট দেখে ফেলে অরুনা। তবুও কিছু বললো না। দৃষ্টি পুরোপুরি দৃষ্টিপথের বাইরে যেতেই, হঠাৎই উল্টে বসলো উজান। মায়ের চোখে চোখ রাখলো দৃঢ়তায়,
– মা, একটা অনুরোধ করতে এসেছি আজ।
– বল…
শব্দের সংযমে ভরসা লুকানো সেই ছোট্ট উত্তরটা ফিসফিস করে নেমে এলো অরুনার ঠোঁট থেকে। এখন আর আগের মতো কথার দীর্ঘ দেয়াল গড়ে রাখে না সে। সময়ের অনাহূত রোদে অভিমানের বরফও ধীরে ধীরে গলে পড়ে মাটির গভীরে। অরুনার অভিমানও কিছুটা কমছে।
অরুনার কথার মাঝেই হঠাৎ করেই উজান মায়ের হাতটা চেপে ধরলো । একটা শুষ্ক তৃষ্ণার মতো শব্দবিহীন ঢোক গিলে নিয়ে দগ্ধ গলায় বলে উঠলো,
– মা, আমি দৃষ্টিকে বিয়ে করতে চাই। এইবার কোনো আবেগের ঠোকাঠুকি নয়, নয় কোনো ভুলভ্রান্তির অন্ধত্ব। পূর্ণ মস্তিষ্কে, পূর্ণ আত্মায় আমি তাকে চাই। নিজের বলে চাই। আমি জানি, সেদিন আমি অপরাধ করেছিলাম। কিন্তু এবার… এবার আমি সেই ভুলগুলোকেই শুদ্ধ করতে চাই মা।
অরুনার দৃষ্টি স্থির, কিন্তু চোখের পলকে লুকিয়ে থাকা বিস্ময় কাঁপছে । উজান আরও এক ধাপ এগিয়ে আসেলো। কণ্ঠ আরও নিচু করে বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– প্লিজ মা… এই একটা অনুরোধ রাখো। আমি প্রতিজ্ঞা করছি তার প্রতিটি কষ্টের জায়গায় আমি সুখ লিখে দেবো। তার অভিমানে আমি আদরের প্রলেপ রাখবো। ভালোবাসায় ঢেকে রাখবো তার প্রতিটি ভাঙা স্বপ্ন। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তার ছায়া হয়ে পাশে থাকবো, মা। প্রয়োজনে… ওর পা ছুঁয়ে ক্ষমা চাইতেও পিছপা হবো না আমি…শুধু একবার… আমার এই অনুরোধটা গ্রহণ করো মা…
ছেলের চোখে এমন নিবেদন, এমন অবিচল মিনতি অরুনার ভিতরে শৈত্যপ্রবাহ বইয়ে দিলো । বুকের গহীনে কোথাও একরাশ কষ্টের কুয়াশা জমে উঠলো। কিন্তু তারপরও কিছু সত্য আছে যা ছুরি হয়ে বিদ্ধ করলেও বলা ছাড়া উপায় থাকে না। অরুনা ধীরে, ভারি হাত তুলে রাখলো উজানের মুঠো আঁকা হাতের ওপর। চোখে চোখ রেখে, এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করলো,
– দৃষ্টি… বিবাহিত উজান।
সেই একটি বাক্য বজ্রাঘাত হয়ে ধসে পড়লো উজানের মাথার উপর। শব্দগুলো বাতাস কেটে এসেছে ঠিকই, কিন্তু বুক চিরে গেছে তীক্ষ্ণ ধারালো শিলার মত। দৃষ্টি বিবাহিত? কার সাথে? কবে? জড়ানো কণ্ঠে, শ্বাসরুদ্ধ কষ্টে উজান ফিসফিস করলো,
– কি… কি বললে মা?
মনে হচ্ছে এই কণ্ঠ ওর নিজের নয়, কেউ বুকের ওপর পাথর চেপে রেখেছে। অজানা বিষে দগ্ধ হচ্ছে চারপাশ। অরুনা গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে থমথমে কণ্ঠে বললো,
– হ্যাঁ উজান, দৃষ্টি বিবাহিত। যেদিন তুই ওকে ভরা মজলিশে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলি সেদিনই… আমি ওর বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। আমি আর একটুও অপেক্ষা করিনি। কারণ আমার মেয়ের গায়ে আমি আর কাউকে আঙুল তুলতে দিইনি। নতুন করে তার গায়ে আর কোনো কলঙ্কের দাগ লাগতে দিইনি।
অরুনার প্রতিটি শব্দ পাথর হয়ে উজানের বুকের ওপর এসে পড়ছে । উজানের চোখের পাতায় রক্ত জমে উঠেছে। ঠোঁট কাঁপছে।
– না… না মা… তুমি আমার সাথে মজা করছো, তাই তো? তুমি আমাকে শাস্তি দিতে চাইছো বলে এসব বলছো, তাই না মা? প্লিজ বলো… এটা সত্যি না…
অরুনা কঠিন কণ্ঠে বললো,
– আমি যা বলছি তাই নির্মম সত্যি উজান। এই সত্য মেনে নেওয়া ছাড়া এখন তোর আর কোনো পথ নেই।
অরুনার হাতটা ছেড়ে দিলো উজান। এতক্ষণ আঁকড়ে ধরা সেই আশ্রয়টাই এখন বিষ হয়ে উঠেছে তার কাছে। ভেতরের সব আর্তি, সব চাওয়া কাঁচের মতো ভেঙে পড়ছে তার। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে শুধু শ্বাস নিচ্ছে এক বোবা পুরুষ। গলায় জমে থাকা কষ্টের ভার ঠেলে, সে কোনও মতে উচ্চারণ করলো,
– কার সঙ্গে… কার সঙ্গে দৃষ্টির বিয়ে হয়েছে মা?
– সাইফ… শেখ ইজতিহাদ সাইফ।
– ক…কোন সাইফ?
– চেয়ারম্যান তাজউদ্দীন শেখের ছেলে সাইফ…
দৃষ্টির চাচাতো ভাই।
এইবার শব্দগুলো উজানের মাথার ভেতরে ঘণ্টার মতো বেজে উঠলো। প্রতিটা বাক্য ধ্বংস করে দিচ্ছে তার আত্মার ভিতর। চোখে অন্ধকার নেমে আসছে, চারপাশ ঘুরছে। সে অনেক কিছুই জানতে চাচ্ছে, অনেক প্রশ্নই তার মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু কিছুই বলতে পারছে না। তার সাথে কি এটা অন্যায় হয়েছে? নাকি সে অন্যায় করেছিলো দৃষ্টির সাথে? ভুল তো সে স্বীকার করতে চেয়েছিল…শোধরাতে চেয়েছিল… তবে কেন এতটা নির্মমভাবে সময় তার দিকে পিঠ ফেরালো? একটি সুযোগও কি তার প্রাপ্য ছিল না? একবার, শুধু একবার… ভালোবাসাকে প্রমাণ করার মতো একটি সময়ও সে পেল না?
– মা… তুমি পারলে? পারলে দৃষ্টির বিয়ে দিতে?
অরুনা এবার স্থির তাকালো ছেলের দিকে। মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার।
– কেন পারবো না? বলতো, কেন পারবো না আমি? যে কলঙ্কের গল্প শুনে তুই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলি, সেই একই কলঙ্ক জানার পরেও… সাইফ মাথা নত করে দৃষ্টিকে নিজের বলে গ্রহণ করেছে।
একটু থেমে গভীর শ্বাস নিলো। গলার মধ্যে দলা পাকানো কিছু গিলে নিয়ে আবার বললো,
– সেদিন একবারও কি ভাবলি, মেয়েটার কী হবে? সমাজের চোখে কলঙ্কিত হয়ে পড়া সেই নিষ্পাপ মুখটা কোথায় ঠাঁই পাবে? এত এত কলঙ্কের বোঝা নিয়ে কি করে এই বিষভূমিতে ঠিকে থাকবে মেয়েটা! কি নিয়ে বাঁচবে সে, কোন সাহসে সামনে হাঁটবে? তুই… তুই সেদিন নিজের অহংকারের ঘূর্ণিতে তলিয়ে মেয়েটাকে ভীষণভাবে একা ফেলে চলে গিয়েছিলি। আর ঠিক সেই একলা ভঙ্গুর মানুষটাকেই… সেদিন আগলে নিয়েছিলো সাইফ। কোনো ভাবনা চিন্তা ছাড়াই নিঃস্বার্থ ভাবে নিজের অর্ধাঙ্গিনী বানিয়ে নিয়েছে।
উজান থরথর করে কাঁপছে। বুকের ভেতর চিৎকার করছে হৃদপিণ্ড।
– হ্যাঁ আমি মানছি… আমি তখন অনেক কিছু মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু তাই বলে তুমি…
বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই অরুনার হাত বিদ্যুৎ গতিতে উঠলো। অন্ধকারে বাজ পড়ার মতো শব্দটা ঠাস করে ছড়িয়ে পড়লো ঘরের নিস্তব্ধতায়। উজানের গাল লাল হয়ে উঠলো মুহুর্তেই।
– কী? আমি কী করলাম বল? পাঁচটা বছর… শুনছিস তুই? পাঁচটা বছর পর তুই ফিরে এসেছিস এই বাড়িতে। এতদিনে কত কিছু পাল্টে গেছে। সময় নদীর মতো কেবল বয়ে যায় নি ভাসিয়ে নিয়েছে কত শত সম্পর্ক, কত প্রতিজ্ঞা। প্রতি মুহূর্তে জীবন কেমন উল্টেপাল্টে দিয়েছে দৃষ্টির পৃথিবী, সেটা তোর কল্পনারও বাইরে। আর তুই ভাবছিস, আমি ওকে তোর জন্য আগলে রেখেছি? না উজান, কখনও না। আমি তাকে আমার নিজের মেয়ে ভেবেছি, রক্তের চেয়েও আপন। আর আমার মেয়েকে যে যন্ত্রণায় ফেলে গিয়েছিলি তুই, আমি সেই যন্ত্রণার মুখোমুখি তাকে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে দিইনি। তুই কাপুরুষ…আর সাইফ? সে একজন সুপুরুষ, মেরুদণ্ড নিয়ে জন্মানো একজন পুরুষ, যে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে জানে।
থামলো একবার অরুনা। একটা বড় শ্বাস নিয়ে আবারো বললো,
– দৃষ্টি যতবার ভেঙেছে, সাইফ তাকে ততবার আগলে রেখেছে। দৃষ্টি যতবার নীরবে কেঁদেছে, সাইফ বিনা প্রশ্নে তা মেনে নিয়েছে। দিন গেছে, মাস কেটেছে… সাইফ একফোঁটাও না বদলে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেছে, শুধু অপেক্ষায়। তুই? তুই তো নিজের ভালোবাসাকেই বুঝিসনি। তুই তো সেই প্রথম ঝড়েই ভেঙে পড়েছিলি, ওর হাত না ধরে পিঠ ফিরিয়েছিলি। আজ তুই দৃষ্টিকে চাস? দৃষ্টির মতো মেয়ের কাছে তুই শুধুই ডালভাত… বাজে , মূল্যহীন এক নাম। তুই কখনোই ওর যোগ্য ছিলি না উজান। বেরিয়ে যা! বলছি তুই বেরিয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে!
শব্দগুলো ঝড়ের মতো ছুড়ে দিলো অরুনা। গলায় বজ্রের আঁচড়, চোখে ক্রোধের দাবানল। চিৎকারে ঘরে কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ে, সেই শব্দ শুনেই দৌড়ে আসে মরিয়ম।
– বেগম, বেগম! এইভাবে রাগ কইরেন না! শরীর খারাপ হইবো আপনার…
কিন্তু অরুনার শরীর থরথর করে কাঁপছে। অভিমানে, ক্রোধে, বেদনায় সব মিলিয়ে সে আগুন হয়ে উঠেছে।উজানকে নিয়ে তার কত গর্ব হতো। চেহারায়, গড়নে, চোখে, দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে পুরো বাবার সব ছিল তার মধ্যে। কেবল… স্বভাবে ছিল না। উজান সেই বাবার আদর্শ ভুলে গিয়ে, হয়ে উঠেছে একজন পলায়নপর।
মরিয়ম কী বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। এ মুহূর্তে কিছু বললে তা বিপর্যয়ের আগুনে ঘি ঢেলে দেবে। সে একবার অরুনার দিকে তাকাচ্ছে আবার উজানের দিকে তাকাচ্ছে। অবশেষে, নীরবতার ভার বইতে না পেরে উজান উঠে দাঁড়ালো। এক পা, তারপর আরেক পা, লজ্জা আর পরাজয়ের ওজন টানতে টানতে সে সেখান থেকে চলে গেলো । পিছনে রেখে গেলো, একটা ধ্বংস হওয়া সম্পর্ক, একটা অপূর্ণ ভালোবাসা, আর একজন মা…
তাজউদ্দীনের অফিসকক্ষের বাতাসে থমথমে উত্তাপ। আলোচনার ছায়ায় চাপা পড়ে থাকা শব্দগুলো গলায় কাঁটা হয়ে আটকে আছে। সাইদুলের কণ্ঠে রাগ। এরমাঝেই টুকটাক কথা কাটাকাটিও হয়ে গেছে। এই সময় সাইফ এলাকার এক প্রান্তে ব্যস্ত। ফোন পেয়ে ইমন একের পর এক ডেকে যাচ্ছে তাকে।
– ভাই, সাইদুল এবার পুরা নাটক শুরু করছে…
– আরেহ কিছু হবে না, চল…
স্বভাবসুলভ ধীরস্বরে বলে উঠলো সাইফ। তারপর নিজের হাতে ইমনের পিঠে একটা ঠাস করে চাপড় মেরে হালকা হাসল। ইমন বাইকের চাবি ঘোরাতেই চোখ পড়লো একটা ছোট্ট পুতুলে, চাবির গোছায় দুলে ওঠা সেই স্পর্শে মুখে হাসি ফুটে উঠলো তার।
নীলিমা নিজে হাতে বানিয়ে দিয়েছিল পুতুলটা। সাইফ নতুন বাইক কেনার পর, নিখুঁত যত্নে চাবির রিংয়ে সেটা পরিয়ে দিয়েছিল সে। সাইফও আর সেটা সরায়নি কখনো। পুতুলটা একটা নীরব প্রতিশ্রুতি হয়ে ঝুলে আছে তার প্রতিদিনের যাত্রায়।
প্রতিবার বাইক চালাতে গেলে ইমনের চোখে পড়ে সেই পুতুল, আর মুখে ফুটে ওঠে একরাশ লুকানো আনন্দ।লুকিং গ্লাসে চোখ রেখে সাইফ দেখতে পেল, ইমন মিটিমিটি হাসছে। কল্পনার কারখানায় হয়তো সে এখন সাত পাক ঘুরছে মালা হাতে। পিছন থেকে গম্ভীর গলায় সাইফ বলে উঠলো,
– জেগে জেগে কী বিয়ের স্বপ্ন দেখোস রে শালা? গাড়ি চালা। নাইলে থাপ্রাইয়া বাইক থেইকা ফালায়া দিমু!
ইমন কাঁধ কুঁজো করে হাসলো। গ্যাস দিয়ে বাইক ছেড়ে দিলো দ্রুত গতিতে। কিন্তু মনে মনে ফোঁস করে বলে বসলো,
– আমি আপনার শালা, না আপনি আমার শালা, এইটা আগে ঠিক করেন ভাই!
– বাবা, আসবো?
সাইফের কণ্ঠে ভারসাম্যপূর্ণ স্নিগ্ধতা, অথচ সেই একটুকরো শব্দেই ঘরে উপস্থিত সবাই একসাথে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো দরজার দিকে। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে শেখ ইজতিহাদ সাইফ। চোয়ালে স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস, চোখে স্ফটিকের মতো ধীর আগুন। তার চোখে চোখ পড়তেই সাইদুল ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেই ফেললো,
– এই তো এসে গেছে চেয়ারম্যান সাহেবের গুণধর পুত্র! আসুন আসুন, আপনার জন্যেই তো এই সমাবেশের আয়োজন।
কিন্তু সাইফের চোখের পাতা পর্যন্ত নড়লো না। এক ফোঁটা চাহনিও সে ছুড়ে দিল না সাইদুলের দিকে। মনে হলো সাইদুল ওই ঘরের বাতাসের চেয়েও মূল্যহীন তার কাছে। তার চাহনি স্থির শুধু এক জায়গায় তাজউদ্দীনের চোখে। তাজউদ্দীন চোখের ইশারায় ছেলেকে ভেতরে ডেকে নিলো ।
সাইফ ধীরপায়ে, মাথা উঁচু করে ঘরে প্রবেশ করলো।সাইদুল সেই মুহূর্তে অনুভব করলো এক অসম্ভব অপমান। সবার সামনে তাকে এইভাবে উপেক্ষা করা, তার অহংকারে আগুন ছুঁড়ে দেওয়া…
– বাবা, কী হয়েছে? এইভাবে হঠাৎ জরুরি ডেকে আনলে কেন?
সাইফের কণ্ঠে স্থিরতা। তাজউদ্দীন ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলেন,
– ওনারা… তোমার নামে অভিযোগ এনেছে, ইজতিহাদ। ওনাদের ছেলে, সজল নাকি তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সাইফ এক মুহূর্ত থেমে তাকাল, তারপর ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল,
– তো তাদের ছেলেকে যদি পাওয়া না যায় তার দায় আমার ঘাড়ে আসে কীভাবে? ওনার ছেলে কি শিশু?
এবার পাশ থেকে গম্ভীর গলায় কথায় ছেদ পড়লো,
– মিস্টার সাইফ, এই বিষয়ে সাইদুল সাহেব একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। আমরা সন্দেহ করছি, সজলের ব্যাপারে আপনি হয়তো কিছু জানেন?
কথাটা বলে উঠলো পুলিশের একজন কর্তব্যরত কর্মকর্তা, গলায় কড়াভাব। সাইফ ধীর মাথায় পুলিশের দিকে তাকালো। চোখে বিরক্তির সুক্ষ্ম রেখা। এখানে যে অভিযোগ নয়, নাটক চলছে তা সাইফ জানে। আর এই নাটকের গল্পও সে জানে। তাই জেনেশুনে অভিনয়ে অংশ সে নেবে না।
– দেখুন…
সাইফ থেমে গেলো এক মুহূর্ত। চোখ নামিয়ে ধীরে তাকালো পুলিশ অফিসারের ব্যাজের দিকে। চোখ বুলিয়ে নামটা একবার পড়ে নিলো। আজাদ হোসেন।তারপর একেবারে চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বললো,
– দেখুন আজাদ সাহেব, ওনাদের ছেলের সাথে আমার কোনো ধরনের কোনো সম্পর্ক ছিল না, নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। আর সজল কে? দশ বছরের শিশু? পূর্ণবয়স্ক একটা লোক কোথায় গেল, কী করল, সেটার দায় আমি কেন বহন করবো? যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়, সেখানে তার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার দায় আমার গায়ে লাগানোর মানে কী?
সাইফ এক পা এগিয়ে এলো, গলার স্বর একটু শাণিত হলো,
– আর ওকে মিসিং বলছেন তো? প্রথমেই বলুন কবে থেকে? ঘণ্টা না দিন? না কী আপনারা ভাবছি মিসিং হতে পারে, এই অভিযোগে হাজির হয়েছেন?
আজাদ একটু ধাক্কা খেলো সাইফের যুক্তির সামনে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে পাল্টা কথা ছুড়লো,
– সেদিন… সেদিন কলেজ থেকে সজলকে বহিষ্কার করা হয়েছিল আপনার প্রভাবেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সেই ঘটনার পরদিন তাকে আপনাদের সঙ্গে কলেজের পেছনে দেখা গেছে। বলুন তো, সেখানে আপনারা কী করছিলেন? সজল কেন ছিল সেখানে?
সাইফ এবার থামলো। আগের মতোই স্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো,
– তেমন কিছুই না অফিসার…ওকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিলাম।
সাইফের গলা একটুও কাঁপলো না । বরং কণ্ঠে আশ্চর্য স্বাভাবিকতা।
– আমার ওয়াইফের ইচ্ছে ছিল, মৌমাছির কামড় খাওয়াবে ওকে। কারণ সে তার সাথে অসভ্যতা করেছিল। কিন্তু… সে বেচারি এতটাই কোমল হৃদয়ের যে, শেষ মুহূর্তে আর করলো না। আমরা ওকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। সে চলে গিয়েছিল। তারপর কোথায় গেল, কাকে দেখলো, কী করলো সত্যি বলতে সেটা আমাদের আর জানা নেই।
ঘরের ভেতর নেমে এলো হিমশীতল স্তব্ধতা। আজাদ চুপ করে রইলো মুহূর্ত দুয়েক। চোখের পলকে ধরা পড়লো একরাশ বিস্ময়। এত সহজে, এত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নিজের দোষ স্বীকার? আজাদ নিজের জীবনে অনেক অপরাধী দেখেছে। কেউ ভয় পেয়ে চুপ করে যায়,কেউ ব্যর্থ চেষ্টা করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের।কিন্তু সাইফ? এই ছেলে একটুও ভয় পাচ্ছে না।
– আপনি একটা লোককে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন আর সেটা আবার এমন নির্লজ্জ গর্বের সাথে বলছেন? আপনি জানেন, এর জন্য আপনাকে জেলে পাঠানো পর্যন্ত হতে পারে?
অফিসার আজাদের কণ্ঠে এইবার কিছুটা রাশ টানার চেষ্টা, তবে তা প্রায় নিস্তেজ। সাইফ ভ্রু নাচিয়ে ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দিলো,
– হলে হবে অফিসার। আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। তবে সজলকে যদি খুঁজে পান, আমাদেরও একটু জানিয়ে দেবেন দয়া করে। আমার ওয়াইফের সাথে অসভ্যতা করার দায়ে… ওরও তো কিছুটা সময় জেলের ভাত খাওয়া উচিত, তাই না? অন্তত দু’জন মিলে একটা কামরায় কিছু মূল্যবান সময় কাটাতে পারবো।
সাইফের এমন নির্লিপ্ত, সুতীক্ষ্ণ জবাবে কণ্ঠ আটকে গেল আজাদের। অন্যদিকে সাইদুল তখন থেকেই একদম নীরব। তার মুখে আর আগের ঔদ্ধত্য নেই।সাইফের সেই এক ঘুষির স্মৃতি এখনও গালের হাড়ে কাঁপন তোলে। উপরন্তু চেয়ারম্যানের ছেলে বলে কথা সোজাসাপ্টা কিছু বলতেও সাহস পাচ্ছে না কেউ।তাজউদ্দীন এবার ধীর গলায় ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
– ইজতিহাদ, তুমি কি সত্যিই কিছু জানো না সজলের ব্যাপারে?
সাইফ এবার একটু মাথা নিচু করে চোখে প্রশান্ত নির্লিপ্ততা নিয়ে জবাব দিল,
– না বাবা, আমি এই ব্যাপারে সত্যিই কিছু জানি না।
– শুনেছেন তো, অফিসার? আপনার যদি কিছু জানার থাকে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞেস করুন। আর যদি কোনো প্রমাণ থাকে তাও সামনে আনুন। প্রমাণ ছাড়া এই দেশের আইন কিছুই করতে পারে না, সেটা তো নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে।
তাজউদ্দীনের কণ্ঠে চিরাচরিত ধীরতা, তবে এর নিচে জমে থাকা দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও অবস্থান স্পষ্টভাবে টের পাওয়া গেল। অফিসার আজাদ সামান্য চুপ করে থাকলেন।
এদিকে সাইদুল গলা সাফ করে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই টুং করে তার ফোনে এল এক নতুন মেসেজ। সুর ভেঙে গেল। কথা গিলে ফেলে, মুহূর্তে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রিনে চোখ রাখলো। চোখের ভেতর চকচক করে উঠলো কিছু। আর মুখের হালকা উত্তেজনা রঙ বদলে ভীরু হয়ে গেল। মেসেজটা দেখা মাত্র সে কোনোমতে মোবাইলটা আড়াল করতে চাইলো, লুকাতে চাইলো সেটার অস্তিত্বটাই। কিন্তু অফিসার আজাদ এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নয়। আজাদ শাণিত গলায় বলে উঠলো,
– কী লুকাচ্ছেন, মিস্টার সাইদুল? সজলের ব্যাপারে কি কিছু জানতে পেরেছেন? সোজা করে বলুন মেসেজটা কার কাছ থেকে এসেছে ?
সব চোখ এখন সাইদুলের হাতে ধরা মোবাইলের দিকে।
– না না, তেমন কিছু না… আমার একটা ব্যক্তিগত মেসেজ মাত্র…
সাইদুল গলা কাঁপিয়ে কথাটা বললো। হাতটা অবচেতনেই পকেটের দিকে চলে যাচ্ছিল ফোনটা লুকাতে। কিন্তু তখনই পেছন থেকে গলা ভেসে এলো,
– কেনো মিথ্যে বলছেন, সাইদুল সাহেব?
সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে, সবচেয়ে সোজাসাপ্টা কণ্ঠটা ছুড়ে দিলো ইমন। তার চোখ তীক্ষ্ণ, আর সময় ঠিকমতো ধরার অভ্যেস পুরনো। সাইদুল যখন ফোনটা বের করেছিল, তখনই ইমন পেছন থেকে ঝুঁকে দেখেছিল স্ক্রিন। সেখানে যা লেখা ছিল তা দেখেছিলো ইমন।
– অফিসার, সজলের মেসেজ ছিল ওটা। আমি নিজের চোখে দেখেছি।
ইমন থামলো, তারপর এক ঝলক তাকালো সাইফের দিকে। সাইফ ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা এক হাসি দিল।তাতে উপহাস নেই, আছে প্রশংসার নীরব স্নেহ। চোখের ইশারায় বলল, “গুড বয়।” ইমন সেই ইশারা মাথা নিচু করে বিনয়ের সাথে গ্রহণ করলো।
অফিসার আজাদ আর সময় নষ্ট করলেন না।সাইদুলের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে মেসেজটা পড়তে শুরু করলেন,
“বাবা, আমি ইন্ডিয়া চলে এসেছি। তোমাকে জানাইনি কারণ তুমি আমাকে আসতে দিতে না। এত বড় অপমানের পর আমি আর আগের মতো থাকতে পারতাম না। তাই আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতেই হলো। আসার ব্যাপারে এখন কিছু বলতে পারছি না। আর আমাকে মেসেজ বা কল দেবার চেষ্টা করো না। আমি সবকিছু চেঞ্জ করে ফেলবো। ভালো থেকো।”
পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এলো ঘরে। সাইফ একটু ঠাণ্ডা হাওয়ার শ্বাস ছাড়লো। তার ঠোঁটের কোণে এবার কৌতুক মেশানো তৃপ্তির হাসি। অফিসার এবার সোজা তাকালো সাইদুলের দিকে। কণ্ঠে চাপা ধমক,
– এইরকম অভিযোগ দায়ের করার আগে একবার নিজের ছেলের লোকেশনটা চেক করে নিলেই পারতেন, সাইদুল সাহেব।
– সাইদুল সাহেব, অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার আগে নিজ সন্তানের গতিবিধি, অবস্থান, সত্য-মিথ্যা সবকিছু যাচাই-বাছাই করা আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আপনার এই অযথা অভিযোগের জন্য এখন আমি চাইলে আপনার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে পারি, সেটা নিশ্চয়ই জানা আছে আপনাদের?
গর্জে উঠলো তাজউদ্দীন। চেয়ার থেকে খানিকটা ঝুঁকে এলো। কণ্ঠে প্রবল নিয়ন্ত্রণ ও রোষের সংমিশ্রণ। তার চোখে একজন বাবার ক্ষোভ, যার ছেলেকে ভিত্তিহীন অপবাদ দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। সাইদুল মুহূর্তে চোরের মতো কুঁকড়ে গেলো। এই সময় অফিসার আজাদ সামনের দিকে এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে বললেন,
– সরি স্যার, আপনাদের অকারণে বিরক্ত করেছি। আপনারা ক্ষমা করে দিন, মিস্টার সাইফ।
সাইফ তখন নিজের অভ্যস্ত সৌজন্য রক্ষা করেই বললো,
মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৩
– ইটস ওকে, অফিসার।
চলার আগে আজাদ একটু থামলেন। পা ঘোরাতে ঘোরাতে হালকা করে ফিরে তাকালেন সাইফের দিকে,
– আমরা চলি… ওহ, আরেকটা কথা বলি সাইফ সাহেব…আই লাইক ইউর অ্যাটিটিউড, কিপ ইট আপ।
চোখ টিপে হালকা হেসেও ফেললেন তিনি। সাইফও চোখে-ঠোঁটে ছোট্ট একটা হেসে সম্মতি জানালো। সাইদুল কোনো কথা বলার সাহস পেল না। গলায় গুটিয়ে আসা একরাশ লজ্জা আর অপমানে সে শুধু সঙ্গ দিল আজাদকে। দুজন একসাথে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
