মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৯
নূরায়েশা মাহনূর
– তুবা আপু, কি করছেন?
হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো ইশিতা। ঘরে তখন সকলেই নিজেদের মধ্যে কী গোপন গুঞ্জনে মত্ত। ইশিতাকে দেখা মাত্রই নয়নের চোখ বিস্ময়ে থমকে গেলো। মেয়েটাকে আজ অস্বাভাবিক সুন্দর লাগছে।
তুবা হাত থেকে মোবাইল নামিয়ে একবার তাকালো তার দিকে। মেয়েটার স্বভাবটাই অদ্ভুত, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ভালো, অকারণে অতিরিক্ত মিশুকে। এই অতিরিক্ত মিশুক স্বভাবটা তুবার চোখে মোটেই সয় না।ঠিক তখনই বারান্দা থেকে ভেতরে এলো আফরা।
– আরে, ইশিতা, বসো না।
ইশিতা ট্রেটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ধীরে ধীরে গিয়ে বসলো তাদের পাশে।
– আপু, আপনারা তো অনেকদিন হলো এসেছেন। উজান ভাই নিশ্চয়ই এতোদিনেও কোথাও ঘুরতে নিয়ে যায়নি, তাই না?
ইশিতার কথাটা শেষ হতেই নয়ন ঝট করে উঠে বসলো।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– হ্যাঁ, নেই নি তো! আসার আগে একেবারে জোর করে টেনে এনেছিলো আমাদের। বলেছিলো, মজা হবে, ঘুরবো, ধুমধাম আড্ডা হবে। আমরাও ভেবেছিলাম ভ্যাকেশনে একটু রঙ লাগবে। আর এখন? এনে আমাদের একেবারে শো-পিসের মতো সাজিয়ে রেখে দিয়েছে!
নয়নের অভিমানের সুরে ঘরে ছড়িয়ে পড়লো হাহাকার। সবাই হতাশ মুখে মাথা নেড়ে সায় দিলো।ইশিতা ধীরে ধীরে চারপাশে তাকালো, একে একে সবার মুখের ভঙ্গি পড়লো। তারপর গালে হাসি টেনে বললো,
– ঠিক আছে, মন খারাপ করার কিছু নেই। আজকে আমরা সবাই মিলে শপিংয়ে যাবো। উজান ভাইকে আমি নিজেই রাজি করিয়ে নেবো।
ব্যস, এতেই কাটা গায়ে নুনের ঝাঁঝ নামলো তুবার বুক জুড়ে। প্রথম দিকে দৃষ্টির উপস্থিতিই তার চোখে ছিলো অসহনীয়, পরে যখন শুনেছে দৃষ্টি বিবাহিত, বিরক্তিটা খানিকটা কমেছিল। কিন্তু এখন? এই ইশিতার হাসিখুশি স্বভাবই তার সহ্যের সীমার বাইরে।
– কী নিয়ে এত আলাপ চলছে?
হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়ালো উজান।
– ওই যে, উজান এসে গেছে!
বলেই ঝটপট উঠে দাঁড়ালো তুবা, সুযোগ খুঁজছিলো। তাড়াতাড়ি বললো,
– উজান, চল আজ আমরা সবাই মিলে শপিংয়ে যাই।
উজান একবারও তার দিকে ভালোভাবে তাকালো না। সংক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিলো,
– আমি যেতে পারবো না, আমার কাজ আছে। তোরা যা।
এরপর চাহনি না ফিরিয়েই ইশিতার দিকে তাকিয়ে বললো,
– ইশিতা, আমার জন্য এক কাপ কফি করে আমার রুমে নিয়ে আয়।
টেবিল থেকে একটা ফাইল হাতে নিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে গেলো সে। মুহূর্তেই তুবা অদৃশ্য অপমানের তাপে দগ্ধ হয়ে গেলো। ঠোঁট কামড়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। ইশিতা সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে চুপচাপ উঠে গেলো, উজানের জন্য কফি বানাতে।
– শুনেন, কতবার বলেছি আপনাকে এইভাবে আমাকে জ্বালাবেন না। তাও লাফিয়ে লাফিয়ে চলে আসেন কেন?
ইমন ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বললো,
– আপনাকে না জ্বালালে আমার পেটের ভাত হজম হয় না, সেই জন্যই আসি।
কথাটা শেষ হতেই নীলিমা হাতে থাকা পানির বোতলটা ছুঁড়ে দিলো সোজা ইমনের দিকে। ইমন চটপট হাত বাড়িয়ে তা ধরে নিলো।
– এইভাবে আস্তে মারলে হবে নাকি? আপনার শরীরে তো একটুও জোর নেই দেখি!
নীলিমার চোখে আগুন জ্বলে উঠলো। কটমট করে তাকিয়ে, গলা উঁচু করে ডাক দিলো,
– খালা! খালা, কই তুমি?
নীলিমার চিৎকার শুনে দৌড়ে এলো রাহেলা।
– কী হইছে নীলু মা?
নীলিমা দাঁত চেপে গর্জে উঠলো,
– খালা, তোমার এই মেন্টাল ছেলেটাকে আমার চোখের সামনে থেকে সরাও। না হলে কিন্তু কান বরাবর এক থাপ্পড় কষে উড়িয়ে দেবো!
ইমন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো,
– এই মেন্টাল কাকে বলছেন? কোন দিক দিয়ে আমাকে মেন্টাল মনে হয় আপনার?
তার কথার মাঝপথেই রাহেলার হাত শক্ত হয়ে গেলো ইমনের কানে।
– এই হতচ্ছাড়া, কতবার কইছি আম্মারে জ্বালাবি না, তাও কথা কানে ঢোকে না?
– মা, ছাড়ো! ব্যথা করছে।
– ব্যথা করার জন্যই তো ধরছি!
মা-ছেলের ঝগড়ার কাণ্ড দেখে নীলিমার মুখে ফুটে উঠলো চাপা হাসি।
– দাও খালা, আরেকটু জোরে দাও। আমি দেখি ভাইয়া উঠেছে কি না।
কথা বলে সেখান থেকে সরে গেলো নীলিমা। নীলিমা চলে যেতেই কিছুক্ষণ পর ইমনের কান ছেড়ে দিলো রাহেলা।
– মা, মাঝে মাঝে মনে হয় আমি তোমার ছেলে না। ওই ভাইবোন দু’জনই তোমার আসল সন্তান।
কথাটা ফেলে দিয়ে রাগ দেখিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো ইমন। রাহেলা এই বাড়ির কাজের মানুষ, আর ইমন কাজের লোকের ছেলে। বাহিরের চোখে দৃশ্যটা এমনই। কিন্তু ভেতরের গল্পটা অন্যরকম।
রাহেলা ছিলো সাইফের মা মুর্শিদার একমাত্র সঙ্গী। বহু বছর আগে যখন মুর্শিদার বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে আসে, তখন সাইফের নানা সতেরো বছরের রাহেলাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলো তার সাথে। সেই থেকে এই বাড়িতেই থিতু রাহেলা।
সময় গড়িয়ে গেছে, কত কিছু ঘটেছে। মুর্শিদাও আর বেঁচে নেই। দৃষ্টির বাবা-মা মারা যাওয়ার প্রায় ৩ বছর আগে চলে গেছে সাইফের মা। সেই থেকেই এই মা-হারা দুজনের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলো রাহেলা।
তার স্বামীও এই বাড়িরই মানুষ, ড্রাইভারের কাজ করতো। তাই দূরে কোথাও যেতে হয়নি তাদের; এই বাড়িই তাদের আশ্রয়। ছোট থেকে ইমনও বড় হয়েছে এখানেই। যদিও কিছু বছর হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছে, পরে সাইফের কথায় হোস্টেল ছাড়তে হয়েছে তাকে। তারপর থেকে সাইফের সাথেই দিন কাটে ইমনের।
– উজান ভাই, আসবো?
– আয়।
ল্যাপটপের পর্দায় চোখ রেখে কাজ করতে করতে ভেতরে ডাকলো উজান। ইশিতা কফির কাপটা তার পাশে রেখে বসে পড়লো।
– কী নিয়ে এত ব্যস্ত তুমি?
– বাবার ব্যবসাটা গুছিয়ে নিচ্ছি। তাই একটু ব্যস্ত।
– কিহ্!
বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকালো ইশিতা। তার ডাকে উজান মুখ তুলে চেয়ে রইলো, ভ্রু খানিক উঁচু করে বললো,
– এত অবাক হওয়ার কী আছে?
– তুমি কি তবে স্থায়ীভাবে দেশে থাকার চিন্তা করছো নাকি?
– কেনো, থেকে গেলে তোদের অসুবিধা হবে নাকি?
– মজা করো না উজান ভাই, সত্যি করে বলো না!
– হ্যাঁ, ব্যবসাটা আবার দাঁড় করালে থাকতে তো হবেই।
– তুমি সত্যি বলছো? আমরা সবাই আবার একসাথে থাকবো?
বলতে বলতে ইশিতার চোখ দুটো টলমল করে উঠলো আনন্দে। উজান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু এক ছোট্ট হাসি দিলো।
– হ্যাঁ।
আর সেই উত্তর শুনে আনন্দে নিজেকে সামলাতে পারলো না ইশিতা; হঠাৎ লাফিয়ে উঠে উজানের হাত দু’হাতে শক্ত করে ধরে ফেললো।
– তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না উজান ভাই, আমি কতটা খুশি হয়েছি। বড় মা তো খুশিতে পাগল হয়ে যাবে নিশ্চয়ই। আমরা সবাই আবার একসাথে থাকবো… কী শান্তি লাগছে ভাবতেই!
উজান থেমে গেলো। সবাই? কিন্তু দৃষ্টি কি থাকবে? আর থাকলেও… দৃষ্টি তো আর তাদের কেউ না। দৃষ্টি তো অন্য কারো স্ত্রী অন্য কারোর সম্পদ। এই ভাবনাটুকুই বুকের ভেতর হালকা এক ব্যথার ঢেউ তুলে দিলো। এই সময়েই ইশিতার ঝাঁকি খেয়ে বাস্তবতায় ফিরলো উজান।
– চলো না, উজান ভাই! এই খুশিতে আজ সবাই মিলে শপিংয়ে যাই।
– না রে, এখন একটু ব্যস্ত আছি। পরে কখনো যাওয়া যাবে।
– চলো না, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ!
বাচ্চাদের মতো নাছোড় আবদার করে উঠলো ইশিতা।উজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকালো তার দিকে।
– ঠিক আছে, যেতে পারি। তবে বেশি সময় থাকা যাবে না।
– ইয়াআআ!
কথাটা শেষ হবার আগেই উচ্ছ্বাস সামলাতে না পেরে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে উজানকে জড়িয়ে ধরলো ইশিতা।অপ্রস্তুত হয়ে গেলো উজান। আচমকা মেয়েলি উষ্ণতা ঘিরে ধরতেই দম বন্ধ হয়ে এলো তার। নিজের হাত দুটো অচেতন প্রতিক্রিয়ায় শক্ত করে মুঠো করে ফেললো; চোখ বন্ধ করে টেনে নিলো এক গাঢ় শ্বাস, নিজেকে আটকাতে চাইলো। মুহূর্ত পর ইশিতা সরে এলো, কিন্তু যাবার আগে দুই হাত দিয়ে উজানের গাল টেনে নিয়ে মিষ্টি স্বরে বলে গেলো,
– তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ!
এরপর খুশিতে লাফাতে লাফাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো সে। তার প্রস্থানমুখের দিকে স্থির তাকিয়ে বসে রইলো উজান। মুহূর্তের ভেতর কী যে ঘটে গেলো, কিছুই বুঝলো না। কিছুক্ষণ পর নিজেই মৃদু হেসে মাথা নাড়লো এবং আবার চোখ নামিয়ে দিলো নিজের কাজে।
সময় গড়িয়ে দুপুরের প্রান্তে। আকাশের গায়ে অস্থির মেঘের আনাগোনা। প্রলয়ের মতো এক বৃষ্টিঝড় দাঁত বের করে তাকিয়ে আছে। কলেজের ছুটি পড়েছে খানিক আগেই। দৃষ্টি তবে বের হলো দেরিতেই; লাইব্রেরির ধুলোমলিন পাতার সঙ্গে কাটিয়ে ফেলা কয়েকটা অতিরিক্ত ক্ষণই তাকে আটকে রেখেছিলো।
গেট পার হতেই থেমে গেলো তার পা। হঠাৎ এক গোপন ইচ্ছের ইশারায় ঘুরে দাঁড়িয়ে বিপরীত পথের যাত্রী হয়ে গেলো সে। গন্তব্য, শহরের কোলাহল পেরিয়ে দূরের সেই নীরব শাপলাবিল।
শাপলাবিলটা তাদেরই সম্পদ। দাদার প্রেমমাখা হাতের ছোঁয়ায় গড়া, দাদির জন্য সাজানো এক জলরঙের বিস্তৃতি। পরে সাইফ সেই সৌন্দর্যে শৃঙ্খলার নতুন বুনন টেনে দিয়েছিলো। বিস্তৃত জলরাশির বুক চিরে নৌকা চলে ধীর গম্ভীর ভঙ্গিতে। পাকা ঘাটের পাশেই বৃত্তাকার বসার মঞ্চ করেছে সাইফ। বৃষ্টিভেজা দিনে এই বিল এক অপার্থিব রূপকথা, জল আর আকাশ মিলে সেখানে একাকার হয়ে যায়।
মনের বিষণ্ণতা দৃষ্টিকে বারবার টেনে আনে এই বিলের প্রান্তরে। সেই কারণেই সাইফ এই স্থানটিকে আরো যত্নে সাজিয়ে তুলেছে। দৃষ্টির দুঃখভোলা একান্ত আশ্রয় বানাতেই সাইফের এই প্রচেষ্টা। ধীরপায়ে হেঁটে, মাঠের ঘাস পেরিয়ে এসে দাঁড়ালো দৃষ্টি বিলের কিনারায়। গোল চাহনির বেঞ্চটিতে গা ভরিয়ে বসলো, কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রাখলো পাশে। চোখ সোজা ছুড়ে দিলো দূরের জলের দিকে, এক নিরবিচ্ছিন্ন ফাঁকা দিগন্ত।
অকস্মাৎ আকাশ ফুঁড়ে গর্জে উঠলো মেঘ, তাণ্ডবের ঢাকের শব্দ। চারদিকে ধেয়ে এলো ঝোড়ো হাওয়ার আক্রমণ; দৃষ্টির পরনের হিজাব উড়তে লাগলো অবাধ পাখার মতো। মুহূর্তেই আকাশ ঢেকে গেলো ঘন মেঘে, দিনের আলো গিলে নিলো কালো অন্ধকার। বাতাসে দুলে উঠলো বিলের বুকভরা শাপলার নরম ডাঁটা, তাদের দোলার ভঙ্গিতে জন্ম নিলো এক অতল সুন্দর দৃশ্য।
দৃষ্টি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো ঘাটের কিনারায়। ঠিক সেই ক্ষণেই আকাশ ছিঁড়ে ঝরে পড়লো বারিধারা। ঝপঝপ শব্দে চারদিক ভিজিয়ে দিলো অঝোর ধারার উচ্ছ্বাস। সেই অঝোর ধারা মুহূর্তেই দৃষ্টির শরীরও ভিজিয়ে দিলো সম্পূর্ণ। ভিজে যাওয়া পোশাক বেয়ে নামতে লাগলো জল । হঠাৎই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো দৃষ্টি। অনেক দিনের বন্ধ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো সেই হাসি। অথচ সেই হাসির ভেতর দিয়েই চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অদৃশ্য ফোঁটা, বৃষ্টি না অশ্রু? কে বলবে! হয়তো এ-ও বৃষ্টিই। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বৃষ্টির জল গাল বেয়ে নামছে, হৃদয়ের গভীর কিছু মুছে দিতে চাইছে। সবকিছু উপেক্ষা করে প্রাণভরে হাসলো দৃষ্টি, শব্দ করে, খোলা গলায় মুক্তির উল্লাসে।
হাসতে হাসতে হঠাৎ ঘুরে তাকাল সে। কিছুটা দূরে মাঠের ভেতর চোখে পড়লো সাইফকে। কখন এলো, কীভাবে এলো বুঝে উঠতে পারলো না দৃষ্টি। ছোট ছোট কয়েকটি শিশু বৃষ্টির পানিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, মাটির কাদায় হেসে খেলে ভিজছে। তাদের মাঝেই সাইফ হাড়ভাঙা দায়িত্বের ভার নামিয়ে ফেলে এক শিশুর মতো, মনের উচ্ছ্বাসে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে অঝোর বৃষ্টিতে।
দৃষ্টি স্থির হয়ে গেলো সেই দৃশ্যের দিকে। অপলক চোখে তাকিয়ে রইলো। কি আশ্চর্য নিষ্পাপ দেখাচ্ছে মানুষটাকে! এক অচেনা উল্লাস, এক অনাবিল উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে আছে তার ভেতরে। কতটা মায়া জমে আছে তার অন্তর্গত প্রাচীরে, সে কি নিজেই জানে? এই মায়া, এই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস যে কারো বুকের গভীরে অদৃশ্য আঁচড়ে দাগ কেটে যায়, সে কি তার সামান্যতম আভাসও পায়? কেউ যে চুপিসারে দগ্ধ হয়, কেউ যে অজান্তেই গলে পড়ে ভেতর থেকে তার কি কোনো ধারণা আছে? না, সে বোঝে না। বোঝার কথাও না।
সাইফের উচ্ছ্বাসে ভিজে আরও প্রশস্ত হলো দৃষ্টির মুখের হাসি। চাহনি আটকে রইলো ওখানেই দীর্ঘ সময় ধরে। মুহূর্তটাকে গিলে নিতে চাইলো নিজের নিঃশ্বাসে। এরপর দৃষ্টি আবার মুখ ফেরালো বিলের দিকে। অঝোর ধারা তাকে ভিজিয়ে দিয়েছে পুরোপুরি; গায়ের পোশাক জল টেনে নিয়ে একেবারে শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। ঠান্ডা জলের ফোঁটাগুলো ধুয়ে মুছে দিচ্ছে তার ভিতর জমে থাকা সব ক্লান্তি, সব অবসাদ।
বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎই সেই স্রোতের মাঝখানে অচেনা এক শীতল স্পর্শে কেঁপে উঠলো দৃষ্টি । পিছন থেকে দু’টি আলতো হাত জড়িয়ে ধরলো তাকে। প্রথম মুহূর্তে বুকের ভেতর শীতল ভয় নেমে এলো, কিন্তু পরক্ষণেই নিস্তব্ধ হয়ে গেলো দৃষ্টি। এ স্পর্শ তার অচেনা নয়। এই ছোঁয়া, এই উষ্ণতার পরিচয় সে অস্থি-মজ্জা দিয়ে জানে। সাইফের হাতের ভেতরেই সে বন্দি এখন।
– এত ভিজলে সর্দি-কাশি ধরে যাবে আপনার।
– আমাকে নিয়ে এত ভাববার দরকার নেই। নিজের জন্য ভাবুন, কাজে দেবে।
বৃষ্টির গর্জনে দৃষ্টির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো খুবই নরম হয়ে। তা শুনে সাইফ মৃদু হেসে উঠলো। থুতনিটা আরও গভীরভাবে গুঁজে দিলো দৃষ্টির ভেজা কাঁধে, সমস্ত পৃথিবীর আশ্রয় ওই একটুকরো অবলম্বনেই।
– আমি আর আপনি আলাদা কবে থেকে হলাম দৃষ্টি? আমার তো মনে হয় না। আমি তো নিজের জন্যই ভাবছি… কারণ, আপনার সঙ্গে যা ঘটে, তার সমস্ত ব্যথা-সুখ তো আমাকেই ছুঁয়ে যায় ।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সাইফের হাত আলগোছে সরিয়ে দিলো দৃষ্টি। কিছু না বলে গিয়ে বসলো ঘাটের পিচ্ছিল সিঁড়িতে। সাইফও কোনো শব্দ করলো না। ধীরপায়ে সিঁড়ি দিয়ে একধাপ একধাপ করে নেমে পড়লো নিচের দিকে। দৃষ্টিকে পাশ কাটিয়ে সোজা ঝাঁপ দিলো বিলে। জলের গা ফুঁড়ে উঠলো এক শীতল ছিটকানি।
হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ালো দৃষ্টি। ততক্ষণে সাইফ সাঁতরে গিয়ে জড়ো করলো বাহারী শাপলার গুচ্ছ, আর বিলের বুক থেকে ছিঁড়ে আনলো সবচেয়ে বড়, রঙে দীপ্ত এক পদ্মফুল। ফিরে এসে সিঁড়ির ধারে রাখলো সব শাপলা দৃষ্টির পাশে। হাঁটু মুড়ে তার চোখের সমান্তরালে এসে এগিয়ে দিলো পদ্মফুলটা।
– নিজের দিকে একটু তাকান বউ… অন্তত নিজেকে ভালোবাসুন। আমাকে ভালো না বাসলেও চলবে, আমি সে অভাবও সয়ে নিতে পারবো।
দৃষ্টি একবার গভীরভাবে তাকালো ফুলটার দিকে, তারপর চোখ ফেরালো সাইফের দিকে। ফুলটা অস্বীকার করার মতো নয় সৌন্দর্যে ভীষণ নিখুঁত। তবুও সে হাত বাড়ালো না। সাইফ হালকা হেসে বললো,
– হিংসে করে নিচ্ছেন না তো? মনে মনে ভাবছেন, ফুলটা সুন্দর। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই ফুলের সৌন্দর্য আপনার কাছে কিছুই না। দেখুন না, ফুলটা কাঁদছে, আপনাকে ছুঁতে চাচ্ছে। নিন, নিন একে।
বাধ্য হয়ে চট করে ফুলটা তুলে নিলো দৃষ্টি। না নিলে সাইফ যে আরও কত কি বলে বসবে, কে জানে! তার এই ভঙ্গি দেখে মিটিমিটি হেসে দৃষ্টির পাশে এসে বসলো সাইফ। শাপলার ডাঁটাগুলো একে একে জোড়া দিতে লাগলো সাইফ খুব মনোযোগে। দৃষ্টি কিছুই বললো না, কেবল দু’গাল জোড়া দিয়ে বসে চুপচাপ দেখলো তার কাজ।
অনেকক্ষণ সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে একটা চুলের মালা বুনে ফেললো সাইফ। আঙুলের নিপুণতায় গাঁথা সেই বুনন দেখে বিস্ময় চেপে রাখতে পারলো না দৃষ্টি। শেষ ফুলটা গেঁথে গোল করে মালাটা বেঁধে নিলো সে, তারপর কোমল যত্নে সেটি দৃষ্টির হিজাবের উপর দিয়ে মাথায় বসিয়ে দিলো। ঠিক যেন কোনো মুকুট। নিকাবের ওপরে ভেজা গালে হাত রেখে, কপালে নত হয়ে রাখলো এক অতি শান্ত চুম্বন।
– পুরো শাপলাবিলের রানী হয়ে গেছেন আপনি।
বলেই হেসে উঠলো সাইফ। সেই হাসি দৃষ্টির অন্তরে অদৃশ্য এক তীর ছুঁড়ে বসলো। অপলক তাকিয়ে রইলো দৃষ্টি। কী অদ্ভুত স্নিগ্ধ হাসি! দৃষ্টি অজান্তে এক হাত তুললো, স্পর্শ করতে চাইল সাইফের গাল। কিন্তু মুহূর্তেই থেমে গিয়ে মুঠো করে নিলো হাতটা।
– আপনি অতিরিক্ত করছেন, ইজতিহাদ ভাই।
সাইফের চোখে খেলা করলো দুষ্টু মায়ার রেখা।
– রানীর জন্য আমি সর্বদা হাজির। শুধু হুকুমটা করুন।
দৃষ্টি নিঃশ্বাস গিলে ফেললো, তারপর নীরব স্বরে বললো,
– ডিভোর্সের ব্যাপারটা কেন সমাধান করছেন না? আর কতকাল এভাবে ঝুলিয়ে রাখবেন? পাঁচ বছর তো পেরিয়ে গেলো।
সাইফের উত্তর অচঞ্চল পাথর,
– পাঁচ বছর নয়, পাঁচশ বছর গেলেও আমি আপনাকে ডিভোর্স দেবো না।
সাবলীল, দৃঢ় কোমল সুরে উচ্চারিত হলো কথাগুলো।
– এইভাবে হয় না, ইজতিহাদ ভাই। আপনার সামনে একটা সম্ভাবনাময় জীবন পড়ে আছে। কেন সেটাকে এমন করে নষ্ট করছেন? আমাকে ডিভোর্স দিন। আপনি নতুন করে বিয়ে করুন, সুন্দর একটা সংসার গড়ে তুলুন।
– সংসার আমি কেবল আপনাকেই নিয়ে করবো, ম্যাডাম। নাহলে আমার সংসার করার কোনো ইচ্ছে নেই।
– সেটা কোনোদিনই সম্ভব না।
বলেই মুখ ফিরিয়ে নিলো দৃষ্টি, চোখ আটকে রাখলো সামনের বৃষ্টিভেজা বিলের দিকে। সাইফ অনেকক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর ধীরে ধীরে উঠে গেলো উপরে। বেঞ্চিতে রাখা কালো চাদরটা তুলে নিয়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে নামলো। দৃষ্টির কাছে বসে আলতো করে চাদরটা মেলে দিলো তার গায়ে। ভিজে চুপসে যাওয়া বোরকার উপর দিয়ে ঢেকে দিলো।
– আর ভিজতে হবে না। চলুন, শরীর খারাপ হয়ে যাবে।
সাইফের কথায় দৃষ্টি কোনো সাড়া দিলো না। একপাশে তাকিয়ে সিঁড়ির ধাপে বসেই হাত নামালো বিলে। হঠাৎই..
– নায়ায়ায়ায়ায়া!
এক তীব্র চিৎকার ছিঁড়ে এলো দৃষ্টির গলা থেকে।মুহূর্তের মধ্যেই সে লাফিয়ে উঠে গিয়ে আঁকড়ে ধরলো সাইফের বুক। বিস্ময়ে জমে গেলো সাইফ। চোখ নামাতেই দেখলো, সিঁড়ির নিচ দিয়ে ভেসে আসছে এক মানুষের নিথর হাত।
এক মুহূর্ত দেরি না করে দৃষ্টিকে শক্ত করে ধরে টেনে তুললো উপরে। দৃষ্টির শরীর কাঁপছে, দাঁতে দাঁত বাজছে শীত আর আতঙ্কে। সাইফ ফোন লাগালো ইমনকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইমনসহ কয়েকজন ছেলেপুলে দৌড়ে এলো সেখানে।
সাইফের নির্দেশে লাশটা তুলে আনা হলো। আর এই সমস্ত বিশৃঙ্খলার মাঝেই সাইফ কোথাও গেলো না। দৃষ্টির দুই হাত তার জামার সাথে আঁকড়ে ধরা, আর সে নিজের দু’হাতে জড়িয়ে রেখেছে তাকে।
কিছুক্ষণ পর পানির গা থেকে টেনে তোলা হলো নিথর দেহটা, একটা মেয়ের লাশ। সারা শরীর জলে ফুলে গেছে, ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে চামড়া। গায়ে-গায়ে জমে আছে অগণিত ক্ষতের চিহ্ন। তীরে তুলে রাখা হলো দেহটা। দৃষ্টি ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো। এক পলক দেখেই বুকের ভেতর থেকে ফেটে এলো স্তব্ধ স্বর,
মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৮
– মা… মাহি আপু!
শব্দটা উচ্চারণ করেই শরীর ঢলে পড়লো, সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেলো তার কাছে। সাইফ তৎক্ষণাৎ ইমনকে ডেকে বললো,
– পুলিশে খবর দাও।
বাকিটুকু ইমনের হাতে সোপর্দ করে দৃষ্টিকে কোলে তুলে নিলো সাইফ। ভেজা শরীরটাকে বুকে চেপে, চলে গেলো সেখান থেকে।
