Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৩

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৩

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৩
নূরায়েশা মাহনূর

– এই যে মেয়ে, এই বাড়িতে তোমারও কোনো স্থান নেই।
তাজউদ্দীনের কথা শুনে ঘাড় কাত করে ধীর স্থির চোখে তাকালো দৃষ্টি। ধারালো স্বরে জবাব দিলো,
– কোথাও আপনার ভ্রম হচ্ছে। আমার শরীরেও যে শেখ পরিবারের রক্ত প্রবাহিত, সেটা কি ইচ্ছে করে ভুলে গেছেন?
– তেজটা আসে কোথা থেকে তোমার? বাবা নেই, মা নেই, পরিবার নেই। নিজের কোনো সম্মান নেই। একেতো ধর্ষিতা, তার উপর আবার বিয়ের দিন বিয়ে ভেঙে গেছে। এত কলঙ্ক বয়ে নিয়ে এখনো শ্বাস নিচ্ছো কীভাবে? তোমার তো অনেক আগেই মরার কথা ছিল!

বাতাস জমাট বেঁধে এলো। দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো।কয়েক নিঃশ্বাসের সময় ধরে চোখ না সরিয়ে তাকিয়ে থাকলো সে তাজউদ্দীনের দিকে। এদিকে সাইফের পায়ের তলা শূন্য হয়ে গেলো; সামান্য দুলে উঠলো শরীর। কথাগুলোর বিষ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে নিজের কানে শুনেই সাইফের বুক জমে আসছে, তাহলে দৃষ্টির অন্তরে এই শব্দগুলো কতটা বিষাক্ত হয়ে বিঁধছে তা সে কল্পনাও করতে পারছে না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– মরে গেলে তো আপনারই স্বার্থসিদ্ধি হতো, তাই না? কিন্তু শুনে রাখুন, এত উদার দয়ার শরীর আমার নয় যে নিজের মৃত্যু দিয়ে কারো জয় নিশ্চিত করবো। আমি থাকবো, আপনার চোখের সামনেই থাকবো। আর আমার যা প্রাপ্য, তা আমি আদায় করেই ছাড়বো। পারেন তো, বাধা দিয়ে দেখান!
বাক্য ছুঁড়ে দিয়ে দৃষ্টি হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে পা বাড়ালো। তীব্র বাতাসের ধাক্কায় খুলে গেলো তার বিশাল খোপা, ঝরে পড়লো চুলের ঢেউ। কোমর ছাপিয়ে ঝলসে গেলো বাতাসে। ইমন বোঝার আগেই চোখের সামনে থেকে ঘূর্ণিবাতাসের মতো মিলিয়ে গেলো দৃষ্টি।
সাইফের চোখে জ্বলজ্বলে রক্তাভ দৃষ্টি, স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো তাজউদ্দীনের দিকে। কয়েকটি ভারী মুহূর্ত পার হতেই, সেও পদক্ষেপ নিলো। ধেয়ে গেলো সেই দিকেই, যেদিকে হারিয়ে গেছে দৃষ্টি।

আয়নার সামনে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি। দীর্ঘ পনেরো মিনিট ধরে একই ভঙ্গিতে। নড়াচড়া নেই শরীরে বিন্দুমাত্র। খোলা চুলের কিছু গোছা এলোমেলো হয়ে কপালে আছড়ে পড়েছে। কাপড়ের আচল গড়িয়ে পড়েছে কাঁধ থেকে, সরে গিয়ে মেঝেতে নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে, অথচ কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। স্থির চোখের চাহনি আটকে আছে কেবল নিজের প্রতিবিম্বে।

হঠাৎ খট করে খুলে গেলো দরজা। ধীর পদক্ষেপে ভেতরে প্রবেশ করলো সাইফ। তবুও দৃষ্টির চোখে কোনো সাড়া নেই। দরজা বন্ধ করে সোজাসুজি তার দিকে মুখ ফেরাতেই ঠিক সেই মুহূর্তে পাশে রাখা ফুলদানি তুলে এক ঝটকায় ছুড়ে মারলো দৃষ্টি। প্রচণ্ড শব্দে আঘাত খেয়ে আয়নার কাচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। কাচের এই ভাঙা শব্দে সাইফের শরীর কেঁপে উঠলো। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো দৃষ্টি। জ্বলন্ত চাহনি নিক্ষেপ করলো সাইফের চোখে।
দৃষ্টির চোখে চোখ পড়তেই শ্বাস গলায় আটকে গেলো সাইফের। অস্বাভাবিক লাল দুটি চোখ। দীর্ঘ সময় ধরে গোপন কান্নার চাপে যেনো ফেটে রক্ত ঝরবে এখনই। সেই চোখের ভয়াল দহন সাইফের বুক চিরে ভস্ম করে দিলো তাকে। ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো দৃষ্টি।

– আমাকে এখানে কেনো টেনে এনেছেন? ইচ্ছে করেই, তাই তো? আমাকে আবারও গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্যই কি এই আয়োজন আপনার? ভেঙেচুরে টুকরো টুকরো করে দিতেই কি এত প্রয়াস?
শুকনো ঢোক গিলে ফেললো সাইফ। মেয়েটার কণ্ঠ শিউরে ওঠা কোনো অশরীরীর মতো শুনাচ্ছে। কান কেটে বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে এগিয়ে এসে পাঞ্জাবির কলার মুঠো করে চেপে ধরলো দৃষ্টি।
– কেনো আমাকে বিয়ে করেছিলেন আপনি? আমার মতো এক ধর্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করে উদারতার পতাকা ওড়াতে কে বলেছিল আপনাকে?
সাইফ নীরব। সেই নীরবতাকে ঝাঁকিয়ে ভাঙার জন্য আবারো ঝাঁপিয়ে পড়লো দৃষ্টি, কলার টেনে আরও কাছে নিয়ে চিৎকারে ভরিয়ে দিলো চারদিক।

– একদম চুপ থাকবেন না, বলুন! আপনার বাবার ভাষায়, আপনিও কি আমার রূপে পাগল হয়েছেন? তাই তো? কিন্তু শুনুন, এই রূপে কিছুই নেই। এই রূপ অপমানিত, এই রূপ কলঙ্কিত! শুনছেন আমাকে? শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা? শুনতে পাচ্ছেন?
সাইফের চোখে ভেসে উঠলো নিঃশেষ অসহায়তা। এ মুহূর্তে কোন শব্দে, কোন ভঙ্গিতে ভাষা প্রকাশ করবে কিছুই খুঁজে পেলো না সে।
– এই কারণেই আমি আপনাকে এড়িয়ে গিয়েছিলাম। আমার কলঙ্কের ভারে আপনার জীবনটাকে আমি শেষ করতে চাইনি। আপনাকেও কখনো বিয়ে করতে চাইনি। তাহলে কেনো আমাকে বিয়ে করলেন? কেনো?

– কারণ আমি আপনাকে ভালোবাসি। শুধু এই মুখশ্রী নয়, এই সৌন্দর্য নয়! আপনি যেমন, আপনার ভেতর-বাহির মিলিয়ে সম্পূর্ণ আপনিটাকেই আমি ভালোবেসেছি।
শিথিল হয়ে এলো দৃষ্টির আঙুলের আঁকড়ে ধরা চাপ। এতক্ষণ ধরে জমে থাকা কান্নার বাঁধ ভেঙে পড়লো হুড়মুড় করে; বুক ভেঙে ঢুকরে কেঁদে উঠলো সে।
– সেই শুরু থেকেই আপনাকে ভালোবেসেছি আমি। আজও ভালোবাসি। কালও ভালোবাসি, সারাজীবন ভালোবাসবো।
কণ্ঠ রুদ্ধ করে দৃষ্টি শব্দ ছুঁড়ে দিলো আবারও,

– কিন্তু আমি কারো ভালোবাসা চাই না। চাই না আপনারও। সরে যান আমার জীবন থেকে। এই কলঙ্কের বোঝা নিয়ে আমি আপনার প্রাপ্য ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারবো না। সংশয়ের দাগ নিয়ে আমি কখনো আপনাকে ভালোবাসতে পারবো না। চলে যান… চলে যান আমার জীবন থেকে!
সাইফের বুকের ভেতর অজস্র ধাক্কা দিয়ে আঘাত করতে করতে সাইফকে এক পা এক পা করে ঠেলে নিয়ে গেলো দৃষ্টি। যতক্ষণ না পিঠ ঠেকে গেলো দেয়ালে। তারপর তার থেকে সরে গিয়ে হঠাৎ ঝড়ের মতো ঘরের সবকিছু ওলটপালট শুরু করলো। যা সামনে পড়ছে তাই হাতের ঝাপটায় ছুড়ে দিচ্ছে এদিক-সেদিক।
অচেতন ক্রোধের সেই ঝাঁপটায় এক ছোট্ট ভারী শোপিস এসে সোজা আঘাত করলো সাইফের কপালে। আঘাতের খেয়ালই করলো না দৃষ্টি। কপালে হাত রেখে সাইফ সামান্য গুঙিয়ে উঠলো, কিন্তু দৃষ্টির কান্নায় গর্জনরত ঘর সেই শব্দ গিলে নিলো।

রক্ত ফেটে বেরিয়ে এলো কপাল থেকে। গড়গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো মুখ বেয়ে। হাত দিয়ে ব্যর্থভাবে রক্ত থামাবার চেষ্টা করলো সাইফ, অথচ দৃষ্টি কিছুই টের পেল না। কিন্তু দৃষ্টি থেমে নেই। উন্মাদের মতো ঘূর্ণিবাতাস হয়ে উঠেছে সে। বহু বছরের পুঁতে রাখা ক্ষত আজ নতুন করে আগুন ছড়াচ্ছে তার ভেতর। এবার দু’হাতে টেনে তুলতে গেলো ভারী এক বড় ফুলদানি।
তা চোখে পড়তেই সাইফ দৌড়ে গিয়ে পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। নিজের হাতের বাঁধনে পাগল হয়ে ওঠা দুই হাত থামিয়ে দিলো সে।
– এমন করবেন না, বউ… আপনার কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছে না। দয়া করে, একটুখানি থামুন। আপনার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। আপনি অসুস্থ।
নিজেকে মুক্ত করার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দৃষ্টি, অথচ সাইফের বাহুর বল লোহার শিকল। এক চুলও শিথিল হচ্ছে না। চোখের কোণে জমে থাকা বেদনাজল গড়িয়ে পড়ছে অবিরল, ভেতরটায় তীব্র দহন ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিটি শ্বাসে। বক্ষগহ্বরের গভীরে কাঁটার মত বিঁধে থাকা যন্ত্রণা আত্মার শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে দিয়ে সব অনুভূতিকে স্তব্ধ করে তুলছে।

– আমাকে ছেড়ে দিন… ছেড়ে দিন বলছি… মুছে ফেলুন আমার উপস্থিতি আপনার জীবন থেকে। আমার মতো তুচ্ছ আর অর্থহীন অস্তিত্বের জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট করবেন না। দয়া করুন … চলে যান…
বাক্য শেষ হওয়ার আগেই নিস্তেজতা গ্রাস করল তার সমস্ত দেহ। মাথা পিছনে হেলে সাইফের বুকে ঢলে পড়ল, ভঙ্গুর পাখির ডানা হঠাৎ ভেঙে গেলো। পুনরায় চেতনা হারালো দৃষ্টি। সাইফ বিন্দুমাত্র দেরি না করে তাকে বুকে আগলে তুলে নিল, দৃঢ় পদক্ষেপে নিজের কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো। যাওয়ার পথে ঠিক মুখোমুখি হয়ে পড়ল ইমনের সঙ্গে। উদ্বেগ নিয়ে ইমন বলে উঠলো,

– ভাই, আপনার কপাল..
– তোর ভাবির ঘর পরিস্কার করার ব্যবস্থা কর দ্রুত ।
ইমন আর কোনো শব্দ খুঁজে পেল না। মাথা নত করে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। সাইফ তার পাশ ঘেঁষে এগিয়ে গেল। খাটে আস্তে করে শুইয়ে দিল দৃষ্টিকে, তারপর তার শীতল হাত নিজের মুঠোয় বন্দি করে মেঝেতে বসল। সাইফের চোখ থেকে নীরব স্রোতের মতো নোনাজল গড়িয়ে এসে থিতু হলো দৃষ্টির হাতের পিঠে। কান্নায় কাঁপতে কাঁপতে থেমে থেমে উচ্চারণ করল,

– আপনাকে আমি ভালোবাসি, বউ… অগাধ ভালোবাসি। আপনি আমার চাঁদ। চাঁদের বুকে দাগ থাকলেও যেমন মানুষ তাকে পূর্ণ ভালোবাসায় ভরে রাখে, আপনার গ্লানি, আপনার কলঙ্ক নিয়ে আমিও তেমনভাবেই আপনাকে নিঃশেষ ভালোবাসি।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। বাইরে থেকে ইমনের সংযত কণ্ঠ ভেসে এলো। সাইফ ধীরে উঠে এসে একখানা কম্বল টেনে দিল দৃষ্টির গায়ে, তারপর বাইরে পা বাড়াল।
– ব্যান্ডেজটা করে নিন ভাই, অনেকটা রক্ত পড়েছে।
কপালে হাত ছুঁয়ে সাইফ বুঝল রক্ত শুকিয়ে গাঢ় হয়ে আছে। বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল। ইমনও আর কিছু না বলে নিপুণ হাতে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে দিল।

অন্ধকারে নিমগ্ন কক্ষটি হঠাৎ করেই বিদ্যুতের ঝলকে উন্মোচিত হলো। আলো ছড়িয়ে পড়তেই দৃশ্যমান হলো এক বিশাল হোয়াইট বোর্ড। ধীর, স্থির পায়ে কেউ একজন অগ্রসর হলো তার দিকে; পদক্ষেপে কোনো তাড়াহুড়া নেই, তবু প্রতিটি পদ হিসেব কষে ফেলা। বোর্ডের সামনে এসে থামল সে।
সেই বোর্ড ভরা অসংখ্য আলোকচিত্রে। কোনো মুখাবয়ব, কোনো দৃশ্য, আবার কোনো কাগজের টুকরো। চারপাশে রঙিন চিরকুট, তাতে নোট আর দাগ কেটে রাখা শব্দমালা। এখানে-সেখানে গাঢ় মার্কারের আঁচড়, যা কেবল একটি ধাঁধার খণ্ডচিত্র নির্দেশ করছে। অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা প্রতিটি টুকরোকে একত্রে গেঁথে ফেলার প্রচেষ্টা চলছে।
লোকটির দৃষ্টি গভীরভাবে গেঁথে আছে সেই বোর্ডে। শীতল, অনুসন্ধানী, ওজনদার এক দৃষ্টি। প্রতিটি রঙ, প্রতিটি ছবি, প্রতিটি শব্দ তার মনে কোনো সূত্রের জন্ম দিচ্ছে। সে এক অদৃশ্য সমীকরণের যোগসূত্র খুঁজছে।তখনই কক্ষে আরেকটি উপস্থিতি প্রবেশ করল।

– আর কতদিন সময় লাগবে? গোপনে গোপনে খেলা জমছে না আর… এবার কিছু একটা করাই উচিত।
সাদা বোর্ড থেকে নজর সরিয়ে লোকটি ধীরে আগন্তুকের দিকে তাকাল। চোখে গভীর চিন্তার ছায়া, ঠোঁটে সংযত স্বর,
– এখনই নয়… এই মুহূর্তে সামনে আসা মানে বিপদকে আমন্ত্রণ। আমাদের আরেকটু সময় নিতে হবে।
আগন্তুক মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। পাশে রাখা লাল মার্কারটি হাতে তুলে নিল সে, তারপর ঠান্ডা নিপুণতায় গোল বৃত্ত এঁকে দিল মাহির ছবির চারপাশে।
– মেয়েটার সাথে ঠিক কী ঘটেছে, এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি… তবে দেখে মনে হচ্ছে গ্যাং রেপের শিকার।
– হু, আমারও তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু মেয়েটা কীভাবে এই ক্রিমিনালদের সাথে জড়িয়ে পড়ল, সেটাই আমাকে ভাবাচ্ছে।
– হতে পারে, মেয়েটাই এদের গ্যাংয়ের অংশ ছিল। কাজ ফুরিয়েছে, তাই তাকে শেষ করে দিয়েছে।
– খোঁজ চালাতে হবে আরও গভীরে… অনুভব হচ্ছে, কোনো না কোনো সূত্র শিগগিরই হাতে এসে যাবে।
– চল, সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।
এক মুহূর্তে নিভে গেল ঘরের আলো। দেয়াল, বোর্ড, ছবি, চিরকুট সবকিছু ডুবে গেল নিঃশেষ অন্ধকারে। আবারো অদৃশ্যের গহ্বরে মিশে গেল সব অস্তিত্ব।

বিকেলের কোমল বাতাসে দুলছে ছাদখোলা বারান্দার পর্দাগুলো। একপাশে বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছে ইশিতা। আঙুলে মচমচে আচার, চোখ আটকে আছে ফোনের স্ক্রিনে চলমান সিরিজে।
হঠাৎ করেই সেই শান্তি চুরমার করে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল নয়ন আর জিদান। তাড়াহুড়োয় গতি থামাতে না পেরে একজন আরেকজনের উপর গড়িয়ে পড়ল। আচমকা ধুপ শব্দে ইশিতা চমকে উঠে প্রায় লাফিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
– আরে আরে, কি করছেন আপনারা?
কোনো রকমে শরীরের ভার সামলে নিয়ে নয়ন আর জিদান উঠে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ল পাশের বেতের চেয়ারে। বসতে বসতেই নয়ন একগাল হাসি দিয়ে বলল,

– একা একা বোরিং লাগছিলো, তাই ভাবলাম তোমার সাথে একটু গল্প করি।
ইশিতার ভ্রু মুহূর্তেই কুঁচকে উঠল। সে কি তাদের সখী নাকি, যে বসে গল্প করবে! তাছাড়া বাকি সবাই কোথায় হারিয়ে গেল, যে এই দু’জনের এখন তার সাথে গল্প করার অবসর মিলল। সেটাই ভাবতে লাগল সে। তবুও ভদ্রতার খাতিরে ঠোঁট নাড়ল না। এদিকে নয়ন আর জিদান কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে।
– উজান কি ছোটবেলা থেকেই এমন গম্ভীর আর ঠোঁটকাটা নাকি?
নয়নের প্রশ্নে ইশিতা তার দিকে তাকাল, ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে উত্তর দিল,
– উজান ভাই এমনই। তবে মানুষ ভালো।
– উজানের খালাতো বোন দৃষ্টিকে কোথাও দেখছি না, কোথায় সে?
– আপু তাদের বাড়িতে ফিরে গেছে।

জিদান ভ্রু তুলল বিস্ময়ে। এই বাড়ির খুঁটিনাটি তাদের বোধের বাইরে। কে কখন আসে, কে কখন হারিয়ে যায়, কোনো কিছুই ঠিকমতো আন্দাজ করা যায় না। তাছাড়া সবাই এমন এক ধরনের আলগা দূরত্বে থাকে যেন ইচ্ছে করেই দেয়াল তুলে রেখেছে নিজেদের চারপাশে। বিশেষ করে দৃষ্টি সে তো প্রায় অদৃশ্যের মতোই ছিল। এতদিন কেটে গেছে তারা এখানে, অথচ দৃষ্টিকে গুনে গুনে কয়েকবারই চোখে পড়েছে। তাতেও মুখাবয়ব স্পষ্ট দেখার সৌভাগ্য তাদের হয়নি।
– এই নিন, আচার খান।
মুখে হালকা হাসি টেনে আচারের বয়াম থেকে কয়েক টুকরো আচার তুলে এগিয়ে দিল ইশিতা। সেটা হাতে নিতে নিতে নয়ন হঠাৎ বলল,
– তোমার বয়ফ্রেন্ড কি করে?
ধুপ শব্দে আচারের বয়ামটা প্রায় হাত ফসকে পড়তে বসেছিল ইশিতার। কোনোভাবে সেটাকে সামলে নিয়ে অবাক দৃষ্টিতে নয়নের দিকে তাকিয়ে রইল সে। জিদান তাড়াতাড়ি কনুই দিয়ে নয়নের পেটে একটা ধাক্কা দিল, কিন্তু নয়নের চোখে ততক্ষণে কৌতূহল সে ইশিতার উত্তর শোনার অপেক্ষায়।

– মানে?
– মানে, তুমি এত সুন্দর একটা মেয়ে… নিশ্চয়ই প্রেম করো। তোমার বয়ফ্রেন্ড কি করে, সেটাই জানতে চাইলাম। আসলে কার কপাল এত ভালো এটা জানার খুব ইচ্ছে হলো।
– আ… আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই।
– কী বলো! বিশ্বাস হচ্ছে না।
জিদান এবার বিরক্ত হয়ে নয়নকে থামাতে চাইল,
– ও বলেছে নেই, তুই আবার কথা বাড়াচ্ছিস কেন?
– সত্যি বলছ তুমি?
– জ্ব… জ্বী।
বলেই হঠাৎ উঠে দাঁড়াল ইশিতা। তারপর তড়িঘড়ি করে যোগ করল,

– আচ্ছা, আপনারা আচার খান, আমার একটু কাজ আছে… কিছু নোটস লিখতে হবে।
নিজের মোবাইল হাতে নিয়ে প্রায় দৌড়ে চলে গেল সে। ইশিতা যেতেই নয়ন মুখ ঘুরিয়ে জিদানের দিকে তাকাল।
– ভাই, একে যদি পটিয়ে ফেলতে পারি, সেই হবে! মনে হচ্ছে আমার প্রেমের ফুল ফুটতে শুরু করেছে।
– চল শালা, এখান থেকে। উজান শুনলে তোর মাথা ধড় থেকে আলাদা করবে।
বলেই নয়নকে টেনে হিচড়ে সেখান থেকে বের করে নিল জিদান।

– কিছুদিন আপনি বাইরে যাবেন না।
ইমনের কথায় ধীরে ভ্রু বাঁকিয়ে দৃষ্টি তুলল নীলিমা।
– কেনো? আমার তো কলেজ আছে।
– না, আপাতত যাওয়া লাগবে না। ভাই নিষেধ করেছেন। কয়েকটা দিন বিরতি নিন, তারপর আমি নিজেই পৌঁছে দেব।
দড়িতে ঝোলানো জামাগুলো গুটোতে গুটোতে হঠাৎ থেমে গেল নীলিমার হাত। বুকের কাছে কাপড়চাপা দুহাত বাঁধা অবস্থায় অনড় চাহনি নিক্ষেপ করে ইমনের দিকে স্থির হলো।
– বলুন তো, কারণ কী? আবার কিছু ঘটেছে নাকি?
– আমি কিছুই জানি না, শুধু ভাই যা বলেছেন তাই শুনতে হবে।
বলেই রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল ইমন। নীলিমা নীরব রইল, ভেতরের সব প্রশ্ন গিলে ফেলল এক নিশ্বাসে। কিছুক্ষণ ভাবনার অতল গহ্বরে ডুবে থেকে ইমন কণ্ঠে মৃদু বিষণ্ণতা মিশিয়ে বলল,

– ভাবির অন্তরে কত অনন্ত বেদনা জমা আছে, তাই না? এত ছোট্ট প্রাণে এত অসহ্য যন্ত্রণা কীভাবে বহন করে সে!
নীলিমার ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাসের ধোঁয়া ভেসে উঠল।
– নিয়তির পাতায় যা খোদাই হয়ে যায়, তা মানুষের শক্তি দিয়েও মোছা যায় না। কিন্তু আপুর মতো এমন নিষ্ঠুরতম ভাগ্য আর কারো জীবনে না আসুক।
ইমনের দৃষ্টি স্থির হয়ে আটকাল নীলিমার ওপর।আগাগোড়া একবার ভালোভাবে দেখলো। মেয়েটি অদ্ভুত পরিপাটি, নিখুঁতভাবে গুছানো। আগে কখনো এমন করে তাকে লক্ষ্য করা হয়নি। দৃষ্টির মতো অনিন্দ্যসুন্দর না হলেও, তার ঔজ্জ্বল্যে কোনো কমতি নেই। একই ছাদের বাসিন্দা, একই রক্তধারা, সৌন্দর্য যেন উত্তরাধিকারসূত্রে উথলে উঠেছে তার অস্তিত্বে।

কিছুক্ষণ নিরব দৃষ্টিপাতের পর ইমন চোখ ফিরিয়ে নিল। এই সৌন্দর্যে দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকা অঘোষিত পাপ। নিজের চাহনিকে শাসন করে সে ঘুরে দাঁড়াল রক্তিম আকাশের দিকে। বিকেলের প্রান্তরেখা পেরিয়ে গিয়েছে সূর্য, আকাশ জ্বলে উঠেছে লাল আভায়।
নীলিমা কাপড়গুলো গুছিয়ে তুলে নিয়ে একবার আড়চোখে ইমনের দিকে চেয়ে দেখল। তারপর কোনো শব্দ না করেই নীরবে পা বাড়ালো। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই পা থামাল নীলিমা। কানে ভেসে এল এক ঝাঁক সুরের মৃদু তরঙ্গ,

~ কোথায় পাবো বল
কোনখানে তুই…
আকাশের দিকে মুখ তুলে অসংলগ্ন সুরে গুনগুন করছিল ইমন। সুর ভাঙা, তবুও শব্দগুলো মনের গভীরতম স্তর থেকে উঠে আসছে। নীলিমা ধীরে পিছন ফিরল। দূরদৃষ্টিতে আকাশে ডুবে থাকা ইমনের পিঠের রেখা চোখে পড়ল তার।
~ কোথায় তোর দেশ,
আজ যাবোই…

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২২

“মঙ্গল গ্রহে তার দেশ, যাওয়ার ভাড়া আছে!?” ফিসফিস করে নিজেই কথাটা বলে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে নীলিমা মাথা নেড়ে নিলো। তবে ইমনের কান অব্দি পৌছালো না তা। এরপর অদৃশ্য এক গোপন ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে একরাশ অগোছালো অনুভূতি নিয়ে ধীরপায়ে চলে গেলো পথের আঁধারে।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৪