মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৫
নূরায়েশা মাহনূর
ভোরের আবছা আলো তখনও দিগন্তে উঁকি দেয়নি। দৃষ্টির ঘুম ভেঙে গেলো অনির্দিষ্ট এক টানে। চারপাশে আধো অন্ধকার, তবু দূরের কোনো মসজিদের মিনার থেকে ছড়িয়ে পড়ছে আজানের মর্মভেদী ধ্বনি। সেই সুর কর্ণ ছুঁতেই তার পাপড়ি আলগোছে খুলে গেলো।
রাতে কখন ঘুম এসেছে মনে নেই । তবে চোখের কণিকায় জমে থাকা লবণাক্ত জ্বালা প্রমাণ দিচ্ছে বেশিক্ষণ ঘুম হয়নি । ধীরে ধীরে শরীর নাড়াতেই টের পেলো কারো দৃঢ় বাহু তাকে শিকলবন্দির মতো বেঁধে রেখেছে। অন্ধকারের আঁধারে স্পষ্ট মুখাবয়ব ধরা না পড়লেও, ওই পরিচিত উষ্ণতার মানুষটিকে চেনার জন্য দৃষ্টির হৃদয়কে কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
আলতো আঙুলে সাইফের বাঁধন আলগা করলো সে। উঠে দাঁড়িয়ে, শীতল মেঝেতে পায়ের স্পর্শ রেখে চলে গেলো ওয়াশরুমে । ঠান্ডা পানির ধারা মুখে পড়তেই সতেজ হল চোখের ক্লান্তি। পবিত্র ওযু শেষে জায়নামাজ হাতে তুলে নিয়ে নতস্বরে বসে পড়লো প্রার্থনার আসনে।
দীর্ঘ প্রহর জুড়ে শেষ করলো নামাজের প্রতিটি রাকাত। মাঝের বহু দিন অবহেলা ছিলো, তাই আজকে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় নিয়েছে সে। অবশেষে হাত তুলে ধরলো মুনাজাতের জন্য। তার কণ্ঠে কান্নার গুঞ্জনে ভেঙে গেলো সাইফের ঘুম।প্রভাতের আলো তখন জানালার ফাঁক দিয়ে কুসুমিত হয়ে ঢুকছে ঘরে। সাইফের কর্ণগহ্বরে এসে বাজলো দুটি বাক্য,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– আল্লাহ, আপনি তাকে দুনিয়ার সমস্ত সুখ দান করুন। জীবনের অন্তিম প্রহর পর্যন্ত যেন তার ঠোঁটে হাসির রেখা অমলিন থাকে।
এরপরও কিছু বলেছিল দৃষ্টি, কিন্তু ঘুমের আধোছায়ায় সেই শব্দগুলোকে অস্পষ্ট শুনলো সাইফ। দৃষ্টি উঠে দাঁড়াতেই সাইফ পলক না ফেলেই পুনরায় ঘুমের ভানে শুয়ে পড়লো।
জায়নামাজ গুটিয়ে রেখে ধীর পদক্ষেপে সাইফের দিকে এগিয়ে এলো দৃষ্টি। খাটের পাশে বসতেই তার নজর আটকে গেলো সাইফের মুখশ্রীতে। নিদ্রিত মানুষের এমন শান্ত অবয়ব মনে হচ্ছে অপরূপ কোনো শিল্পীর নিপুণ আঁচড়। কী অদ্ভুত নিষ্পাপ লাগছে তাকে! চোখ-মুখের প্রতিটি রেখায় ছড়িয়ে আছে কোমল স্নিগ্ধতার টান, যা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মনকে টেনে নেয়। এটা কি সবার চোখেই এমন ধরা দেয়, নাকি কেবল দৃষ্টির মনেই এ একান্ত মায়ার মরীচিকা? চিন্তার ঢেউ থেমে গেলো হঠাৎ, যখন চোখ থামলো সাইফের কপালে। স্নেহমাখা আঙুলে স্পর্শ করলো ব্যান্ডেজের উপর। মৃদু কণ্ঠে ফোটালো অনুতাপ,
– আমি কতটা খারাপ, তাই না? কিন্তু সত্যি বলছি… ইচ্ছে করে আঘাত করিনি আমি।
কথা শেষ হওয়ার আগেই সাইফ হঠাৎ তার হাত আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে ফেললো। সেই হাত টেনে নিলো নিজের গালের কাছে, শুয়ে পড়লো তার উষ্ণতার উপর। আধো ঘুমে আবৃত কণ্ঠে ফিসফিস করে জানালো,
– জানি আমি।
দৃষ্টি চমকালো । লোকটা জেগে উঠলো কবে? ধরা পড়া চোরের মতো অপ্রস্তুত দৃষ্টি অস্থির চাহনি এদিক-ওদিক ছুঁড়তে লাগলো। সাইফ এবার পিটপিট করে তাকালো তার দিকে। সে চোখের চাহনি বর্শার ফলার মতো ভেদ করলো দৃষ্টির অন্তঃস্থলে।
– এইভাবে নজর দেওয়ার কিছু নেই, আমি আপনারই। লুকিয়ে লুকিয়ে না দেখে… সামনে বসেই দেখতে পারেন।
দৃষ্টি ভেতরে ভেতরে দম ফেলে উঠলো। উফফফ, লোকটা ভীষণ নির্লজ্জ! কখন কী বলতে হয়, সেটার কোনো বোধ নেই কি তার? এতটা লজ্জা না দিলেও চলতো। গলায় খুসখুসে ভঙ্গি এনে আমতা আমতা করে বললো,
– আমিতো আপনাকে ডাকতে এসেছি… আযান হয়েছে অনেকক্ষণ হলো, নামাজ পড়বেন না?
কথা শেষ করেই নিজের হাত টেনে নিতে চেষ্টা করলো, কিন্তু সাইফের শক্ত মুঠো তাকে ছাড়লো না।
– ছাড়ুন।
– ছাড়বো না।
বলে এক ঝটকা টান মেরে টেনে নিলো তাকে। দৃষ্টি মুখ থুবড়ে গিয়ে পড়লো সাইফের প্রশস্ত বুকে। তার পরনের শুভ্র হিজাব এখনো খোলা হয়নি; সেই সাদা আবরণে ফ্রেমবন্দি গোলগাল মুখমণ্ডলটি আলো ছড়িয়ে উঠলো সকালের প্রথম কিরণের মতো।
– আপনাকে আজ কিছুটা বেশিই স্নিগ্ধ লাগছে, সোনা বউ।
মুহূর্তেই রঙ ঢেলে দিলো বাক্যটি। দৃষ্টির ফর্সা গাল রক্তিম আভায় রঙিন হয়ে উঠলো। লজ্জা আচমকাই গোপন প্রাচীর ভেদ করে উঁকি দিলো। সাইফের চোখে এই দৃশ্য নতুন; কারণ, এতোদিন সে পেয়েছে এক নির্লিপ্ত, অনুভূতিহীন দৃষ্টি। ভ্রু খানিক কুঁচকে উঠলো সাইফের। তাতে দৃষ্টির রূপ আরো দীপ্ত হলো। বিস্ময়ের স্বরে সে বললো,
– আহা! লজ্জা পেলে আপনাকে এত অপূর্ব লাগে, জানতামই না। মনে হচ্ছে গালের দুপাশে দুটি টকটকে টমেটো রেখে দিয়েছে কেউ।
দৃষ্টি সাইফের বুকে এক ধাক্কা দিয়ে উঠে বসল,
– দেরি হয়ে যাচ্ছে, আগে নামাজ পড়ে নিন।
বলে পেছন ফিরে হেঁটে চলে গেলো। সাইফ তার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর মাথা চুলকে হেসে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো।
দৃষ্টি এসে থামলো বারান্দার ধূসর প্রান্তে। সকালের নির্মল হাওয়ায় বুক ভরে টেনে নিলো একগাল শ্বাস, প্রতিটি নিশ্বাসে স্নিগ্ধতার তরঙ্গ গলে মিশে যাচ্ছে রক্তে। এ সময়টুকু দৃষ্টির কাছে অপার্থিব। মন চায়, সূর্যের কাঁটা থেমে যাক এই প্রহরে, সারাদিনটা জমে থাকুক ঠিক এমন আলোর কোমলতায়।
চোখ ছড়িয়ে দিলো চারপাশে। বছর কয়েকের ব্যবধানে আঙিনার গাছপালারা বেড়ে উঠেছে বিশাল দেহে, নিরবে গিলে নিয়েছে পুরনো চেনা দৃশ্যগুলো। বাড়ির পেছনের ফাঁকা জায়গাটা এখন প্রগাঢ় সবুজে ঢেকে একেবারে জঙ্গলের রূপ নিয়েছে। যেখানে মানুষের পদচিহ্ন নেই বললেই চলে । অথচ একসময় এখানে ছিল প্রাণবন্ত হাসি, ছুটোছুটি, জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততা।
হঠাৎ মস্তিষ্কে আঘাত করলো গত রাতের স্মৃতি। এই জায়গাটির চারপাশে উঁচু বাউন্ডারি দেয়া। বাইরের কেউ ইচ্ছে করলেও ভেতরে প্রবেশ অসম্ভব। তবু রাতের আঁধারে কে গিয়েছিল সেখানে? দৃষ্টি কি ভুল দেখেছে? কিন্তু সে তো চাক্ষুষ মানুষ, এত বড় ভুল হওয়া সম্ভব নয় সহজে । স্পষ্ট মনে আছে, কাল রাতে কেউ দ্রুত যাচ্ছিল সেই দিকে।
মুখে কোনো শব্দ না করে একরাশ ভাবনা নিয়ে ধীরে ধীরে গুটিগুটি পায়ে ফিরে এলো কক্ষে। সাইফ নামাজ শেষ করে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে তার ভীষণ ঘুম প্রয়োজন। তাই কোনো হিসেব না করেই নিজেকে সঁপে দিয়েছে খাটে । দৃষ্টি চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে ব্যাঙ্কেট টেনে দিলো তার গায়ের উপর এরপর বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
শুকনো পাতার উপর পা পড়তেই মড়মড় শব্দ ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। প্রভাতের বুক চিরে ওঠা সেই শব্দে শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে এলো। দৃষ্টি ধীর, মেপে রাখা পায়ে এগোতে লাগলো বাড়ির পেছনের নির্জন প্রান্তের দিকে। বিশাল বাউন্ডারির ভেতর বন্দি এই বাড়িটা। এক বিস্তৃত মাঠের মতন। যার এই দিকটায় গাছের ছায়া আর সবুজের ঘনত্ব একটু বেশি।
এখানে একসময় একটি চিলেকোঠাসহ পাকা ঘর ছিলো। কিন্তু হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত আগুনে তা ভস্মে পরিণত হয়। সেই দিন থেকে এইদিকে মানুষের পদচারণা কমে আসে। বাড়ির অন্য দিকগুলি যত্নে পরিচ্ছন্ন হলেও, এখানে তেমন কেউই আসে না।
দৃষ্টি চারপাশ ঘুরে দেখতে লাগলো। উঁচু গাছের ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো মৃদুমন্দ ভাবে ঢুকছে। ঠিক তখনই পায়ের কাছে চোখে পড়লো আধখাওয়া এক সিগারেটের টুকরো। নিচু হয়ে তা কুড়িয়ে নিলো হাতে, আঙুলের ফাঁকে ধরে নাকের কাছে নিয়ে একবার শ্বাস নিলো গভীরভাবে। তীব্র তামাকের গন্ধ এখনো জীবন্ত মানে খুব অল্প সময় আগেই কেউ এখানে ছিল, এবং এইটুকুই ফেলে গেছে চিহ্ন হিসেবে।
– ম্যাডাম!
হঠাৎ পেছন থেকে আসা ডাকের ধাক্কায় থেমে গেলো দৃষ্টি। ঘাড় ফেরানোর আগে আঁচলের প্রান্ত দিয়ে মুখটা ঢেকে নিলো দ্রুত। তাকাতেই দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অপরিচিত পুরুষ। বাড়ির পাহারাদার, হয়তো। চেহারায় নতুনত্ব, মনে পড়লো না আগে কখনো দেখেছে। হয়তো তারা চলে যাওয়ার পরই এখানে দায়িত্বে এসেছে। দৃষ্টি ভ্রু কুঁচকালো।
– চিনেন আমাকে?
– কি বলেন, আপনাকে চিনবো না! ভাই তো আপনার পাহারার জন্যই আমাদের রাখছে এখানে।
দৃষ্টি আর কোনো জেরা করলো না। আঙুলের ফাঁকে ধরা আধখাওয়া সিগারেটের টুকরো নিপুণ ভঙ্গিতে ছুড়ে ফেললো একপাশে। পাহারাদারের চোখও সেদিকে গড়িয়ে গেলো। নিজ থেকেই বলে উঠলো,
– মনে হয় পাহারারত কেউই এখানে এসে ফেলে গেছে। আপনার কি কিছু দরকার?
দৃষ্টি তার দিকে একবার সরু, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দিলো,
– না, কিছু লাগবে না। এমনি দেখতে এলাম।
কথা শেষ করেই সে সোজা পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো। দরজার কাছে আসতেই নজরে পড়লো আরও কয়েকজন লোক। হয়তো অন্য পাহারাদার বা কাজের মানুষ। এক মুহূর্ত তাদের দিকে নজর বুলিয়ে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো।
শেখ বাড়ি, প্রথম দেখায়ই চোখে লাগে তার বিস্তার। জং ধরা দোতলা স্থাপনা, যার চারপাশ ঘিরে আছে উঁচু প্রাচীরের বিশাল বেষ্টনী। সবার চোখে এটি চেয়ারম্যানের বাসভবন হলেও ভালোভাবে দেখলে জমিদারি আমলের গাম্ভীর্যই বেশি ভেসে ওঠে।
দৃষ্টির দাদা একসময় এই অঞ্চলের মাতবর ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই এই প্রাসাদোপম বাড়ির জন্ম। সেই সময়কার ইট-চুনের গন্ধ, খোদাই করা দরজার কাঠ, আর অনমনীয় স্থাপত্য আজও বহন করে চলেছে বংশের অহংকার। বংশানুক্রমে বাড়ির বাহ্যিক নকশা অক্ষত রাখা হলেও, ভিতরে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢুকে পড়েছে আধুনিকতার নিপুণ ছোঁয়া। আরামদায়ক আসবাব, আলোকসজ্জার শৈলী, আর সুবিন্যস্ত কক্ষপথের বিন্যাসে স্পষ্ট তার প্রমাণ।
প্রবেশদ্বারের ভেতরেই বিস্তৃত উঠোন, বিশাল খোলা এক মঞ্চ। উঠোনের শেষ প্রান্তে মেইন ফটক, সেখান থেকে দু’দিকে মোড় নেওয়া সিঁড়ি উঠে গেছে বাড়ির দোতলায় । সিঁড়ি পার হলেই ড্রয়িং রুম, ডাইনিং, রান্নাঘর, আর আরও কিছু কক্ষের সারি। এক পাশে তাজউদ্দীনের ব্যক্তিগত ঘর, সাথে তার লাগোয়া অফিস কক্ষ। আপাতত নিচতলায় তাঁর ছাড়া আর কারো স্থায়ী বসবাস নেই।
সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলার প্রথম মোড়ে ইমনের কক্ষ। তার বিপরীতে নীলিমার ঘর; নীলিমার পাশেই রাহেলা বেগমের কক্ষ। এর পরের সারি জুড়ে কয়েকটি কক্ষ। যেগুলো তালাবদ্ধ। অন্যপাশে প্রথমেই দৃষ্টির কক্ষ আর করিডরের একেবারে শেষে সাইফের কক্ষ। এর মাঝখানে আছে দৃষ্টির বাবা-মায়ের ঘর এখন সেটিও তালাবদ্ধ । সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, অতিথিদের জন্য দু’একটি কক্ষ বাদে, দোতলার বেশিরভাগ ঘরই তালাবদ্ধ।
দৃষ্টি সিড়ি বেয়ে দোতলায় এসে কিছুটা দূরে গিয়ে থেমে গেলো একটা কক্ষের সামনে। চোখ ঘুরিয়ে একবার তাকালো সেই কক্ষের দরজার দিকে। কাঠের দরজায় আরামে ঝুলছে তালা । বুকের ভেতর কেমন অদৃশ্য এক ঘৃণা পাক খেয়ে উঠলো। এক তপ্ত, ভারী শ্বাস ফেলে দৃষ্টি মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলো।
লাইব্রেরিতে পা দিতেই ইমনকে দেখে থমকাল দৃষ্টি। এই সময় তার উপস্থিতি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। দৃষ্টিকে দেখেই ইমনের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ধূর্ত ভেলকি হাসি, যা দৃষ্টির কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় করল।
– ব্যাপার কি, এই সময় এখানে?
– এই জ্ঞানের খাজানার দায়িত্ব আমার তাই।
– হাহ! আপনি বইও পড়েন? আমি তো ভেবেছিলাম, শুধু ভাইয়ের চাদর ধরেই টইটই করেন ।
– আপনি কি কোনোভাবে আমাকে অপমান করলেন, ভাবি?
– যাক, বুঝতে পেরেছেন ।
উত্তর শেষ করে দৃষ্টি ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে থামল বইয়ের তাকের সামনে। ইমন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকে দেখল, তারপর নীরবে তার পেছনে গেল।
– সে যাই বলুন, এসব খুচরো কথায় আমার গায়ে আঁচ লাগে না।
দৃষ্টি কোনো উত্তর দিল না, মন দিল নিজের কাজে।আপাতত একটা জুতসই বই বাচাই করছে পড়ার জন্য।
– ভাবি, আপনার পড়া কিছু বই সাজেস্ট করেন না? পড়ে দেখি, আপনার রুচি কেমন।
– আমার রুচি কেমন, সেটা আপনার ভাইকে দেখলেই বোঝা যায়, পুরাই বলদমার্কা ।
বাক্য ছুড়ে দিয়ে সে বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ল হাতে নেওয়া বই নিয়ে। ইমন খানিক হতভম্ব হয়ে রইল। এ নারী সরি, এ রমণী কখনো কোনো কথা সরল পথে বলে না; আর ইমনের ক্ষেত্রে তো নয়ই। শেষমেষ সে-ও বই হাতে নিয়ে বসে পড়ল দৃষ্টির বিপরীতে।
সময় অজান্তেই গড়িয়ে যাচ্ছিল। দৃষ্টি বইয়ের পাতায় নিমগ্ন । ইমনও পড়ছে, তবে মাঝেমধ্যে আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে দেখছে। দৃষ্টির সাথে একটু ভাব জমাতে চাচ্ছে, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ভেস্তে যাচ্ছে প্রতিবারই।
ছেলেবেলা থেকেই দৃষ্টিকে বোনের মত দেখে এসেছে। ইমনের ছোট দৃষ্টি। তাদের বয়সের পার্থক্য মাত্র দুই বছরের হলেও, ইমন সবসময় দূরত্ব বজায় রেখেছে। সাইফ ছাড়া তার কারো সঙ্গে তেমন সখ্যতা ছিল না। কিছু বছর হোস্টেলের ভেতর কাটিয়েছে আবার কিছুবছর দৃষ্টি অন্যত্র চলে যাওয়ায় সম্পর্কের উষ্ণতা আর জাগেনি।
– হ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছেন কেন? কী চাই?
ইমনের চিন্তাধারা ভাঙল দৃষ্টির হঠাৎ উচ্চারণে। বইয়ে চোখ নামিয়ে সে গুনগুন করে বলল,
– এমনি তাকালাম, হুহ্!
দৃষ্টি কোনো প্রতিক্রিয়া দিল না। ঠিক তখনই লাইব্রেরিতে প্রবেশ করল নীলিমা, হাতে চায়ের ট্রে আর চকোচিপসে ছড়ানো বিস্কুটের প্লেট। উজ্জ্বল হাসি নিয়ে ঢুকলেও দৃষ্টিকে দেখেই তার মুখের রঙ বদলে গেল। দৃষ্টি-ও সরু চোখে তাকাল তার দিকে।
– আ… আপু, তুই এখানে?
– এই প্রশ্নটা তো আমার করা উচিত, তুই এখানে? এত ভোরে?
নীলিমার চোখ এবার ইমনের দিকে সরল। সকাল সকাল একসাথে পড়া আর চা খাওয়াটা তাদের একপ্রকার রুটিন হয়ে গেছে। কিন্তু আজকের এই অনাহূত তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি তার অভ্যাসে কাঁটা বিঁধিয়ে দিল। যদিও ইমন আর নীলিমা সারাদিন খোচাখুচিতে মত্ত থাকে, ফাঁকে ফাঁকে ইমন একলা নীলিমাকে বন্ধুর মতো সময় দেয়, সাইফের অনুমতিতেই। নীলিমা কিছু বলার আগেই ইমন ঠান্ডা গলায় বলল,
– আমরা প্রতিদিন পড়তে আসি এখানে।
দৃষ্টি আবারও সরু চোখে দুজনকে পর্যবেক্ষণ করল। তারপর বইয়ে চোখ নামিয়ে শ্লেষমাখা কণ্ঠে বলল,
– আহ! আমি ভেবেছিলাম, আমি একাই সকাল সকাল উঠে পড়েছি। এখন তো দেখছি, পুরো শেখ বাড়িই জেগে উঠেছে।
নীলিমার চাহনি ফের ইমনের দিকে। ইমন শুধু মাথা দুলিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল। নীলিমা দৃষ্টির পাশে গিয়ে বসে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল।
– এই নে, চা খা।
– চা তো আমার জন্য আনা হয়নি। আমি কেন খাব?
দৃষ্টি চোখ তুলে তাকাল নীলিমার দিকে। নীলিমা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
– তো কী হয়েছে, কাপে কি নাম লেখা আছে?
– নিজেদের জন্য এনেছিস, নিজেরাই খা। আমারটা আমি নিজেই বানিয়ে নেব পরে। এখন ইচ্ছে নেই।
নীলিমা চুপ করে গিয়ে একটি কাপ ইমনের দিকে দিল, আরেকটি নিজের হাতে রাখল।
– দেখি, কী বই পড়ছিস এত মনোযোগ দিয়ে?
বলেই নীলিমা বই উল্টে দেখল কভারের নাম “বরফ গলা নদী”। নাম দেখে ইমন হেসে বলে উঠল,
– আরে, এই বইটা আমিও পড়েছি। আর পড়ে কান্নাও করেছি, জানেন ভাবি?
দৃষ্টি চোখ পাকিয়ে তাকাল।
– আমি কিছু জিগ্যেস করেছি?
ইমন গলা নামিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিল, চোর ধরা পড়ে গেছে। দৃষ্টি দুজনকে একবার ভালোভাবে দেখে উঠে দাঁড়াল।
– মনে হচ্ছে, এখানে শান্তিমতো বই পড়া খুবই দুর্লভ ব্যাপার!
সে নীরবতা ভালোবাসে কিন্তু আজকের সকালটা তেমন নয়। উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাতে থাকা বই দিয়ে ইমনের মাথায় একটা বাড়ি দিলো দৃষ্টি ।
– দেখে তো মনে হচ্ছে না, এখানে বই পড়া হয়! মনে হচ্ছে, অন্য কিছুই চলে ।
এই বলে বইটা যথাস্থানে রেখে বেরিয়ে গেল। ইমন মাথায় হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে আসলে কী হলো। নীলিমা তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
– আপু এইমাত্র কী বলে গেল? অন্য কিছু মানে… এই আপু উল্টো পাল্টা কিছু ভাবল না তো?
গোসল সেরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে দৃষ্টি। ভিজে চুলের ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়ছে গলার নিচে। প্রতিদিন এই শাকচুন্নির মতো লম্বা চুল শুকানো তার কাছে যুদ্ধের সমান। হেয়ার ড্রায়ারের গরম বাতাসে চুলের ভাঁজ উড়ে উঠছে, আর সে আনমনে ডুবে আছে কোনো এক চিন্তার স্রোতে।
হঠাৎই নীরবতা চিরে ভুবন কাঁপিয়ে বেজে উঠল সাইফের ফোন। প্রথমবারের তেজ ধ্বনি উপেক্ষা করে দৃষ্টি ফিরে গেল নিজের কাজে। কিন্তু কল কেটে আবারও দ্বিতীয় দফায় গগনবিদারী আওয়াজ ছড়িয়ে পড়তেই বিরক্তিভরে মাথা উলটে চাইল সাইফ। অর্ধেক মনোযোগে হাত বাড়িয়ে ফোনটা কানে তুলল। অপর প্রান্তের কথা শেষ হতেই কোনো প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে কল কেটে দিল। নিজ থেকে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। তারপর আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে বসল। আর সেই মুহূর্তেই চোখ পড়ল আয়নার সামনে।
দৃষ্টির চেহারাটা কেমন কাঠিন্যে গড়া। মনে হয়, ফকফকা রঙের কোনো কাঠের পুতুল। এই মেয়ে এত প্রাণহীন হয়ে থাকে কীভাবে, তা আজও সাইফের বোধগম্য নয়। হাসি, রাগ, বিস্ময় কোনো অনুভূতিই সহজে তার চেহারায় ঠাঁই পায় না। আদৌ কি মানুষ এমন হয়? হঠাৎ কী ভেবে সাইফ বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল। দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল দৃষ্টির সামনে। একপাশের ভেজা চুল চেপে ধরে হঠাৎ বলে উঠল,
– হায় আল্লাহ, বউ, আপনি এই সকাল সকাল গোসল করলেন কেন? আমরা তো রাতে কিছুই করিনি!
দৃষ্টি ঘুরে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল সাইফের দিকে। সেই তাকানোতে সাইফ অজান্তেই গোপনে এক ঢোঁক গিলে নিল। বেশি বলে ফেলেছে কি? তবুও ভেতরের ভয়টুকু চেহারায় প্রকাশ করল না। দৃষ্টি হাতের হেয়ার ড্রায়ারটা তার মুখের দিকে তুলে ধরল। মুহূর্তেই এক ঝাঁপটা গরম বাতাস সোঁ সোঁ করে ঢুকে পড়ল সাইফের নাক-মুখে। সে কাশি দিয়ে উঠল, আর দৃষ্টি ড্রায়ার সরিয়ে আবার মন দিল নিজের কাজে। আয়নায় চোখ রেখে শান্ত গলায় বলে উঠল,
– আপনার কি মনে হচ্ছে না, আপনি একটু বেশি ঘেঁষে যাচ্ছেন? ভুলে যাবেন না, আমি কিন্তু অত ভালো মানুষ নই।
সাইফ ভেতরে ভেতরে এক আকাশ সাহস জমা করে এগিয়ে এল, তারপর দৃষ্টিকে পেছন থেকে জড়িয়ে নিল। থুতনি রাখল তার কাঁধে, আর আয়নার প্রতিবিম্বে চেয়ে চোখ রাখল দৃষ্টির চোখে।
– কাছে না ঘেঁষলে বাচ্চা হবে কীভাবে? আমার কিন্তু দুই জোড়া বেবি চাই। এক জোড়া মেয়ে, এক জোড়া ছেলে। তবে এখন না… আপনি আরেকটু বড় হয়ে নিন আগে।
দৃষ্টি এবার গোলগাল চোখ মেলে ঘাড় কাত করে চাইল সাইফের দিকে। চাহনিটা এতটাই বিদ্ধকারী যে সাইফ হালকা ধাক্কা অনুভব করে এক কদম পিছিয়ে গেল। মুখে হাত চাপা দিয়ে ভয়ের ভান করে বলে উঠল,
মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৪
– আয়ায়ায়া… পুরো তেঁতুল গাছের পেত্নীর মতো লাগছে। আমি তো ভয়ই পেয়ে গেলাম।
দৃষ্টি ফট করে টেবিলের উপর থেকে চিরুনি তুলে ছুড়ে দিল তার দিকে। সাইফ তা এড়িয়ে গিয়ে ভুবনভোলানো একখানা হাসি ছুঁড়ে দিল। দৃষ্টি স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল সেই শুভ্র, একপাটি দাঁতের দীপ্তিময় হাসির দিকে। ভেতরে এক অদৃশ্য আবেশ ছড়িয়ে পড়ল, গোপনে তাকে আচ্ছন্ন করলো। হাসি দিয়েই দৃষ্টি তেড়ে আসার আগে সাইফ হঠাৎই ছুটে চলে গেল। ঠোঁটের কোণে খানিক মুচকি হেসে আবার নিজের কাজে ডুবে গেল দৃষ্টি।
