Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৭

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৭

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৭
jannatul firdaus mithila

কথায় কথায় গাল বরাবর চটাশ চটাশ করে থাপ্পড় বসানো বোধহয় এ লোকের বদঅভ্যেস! তারওপর নিজের ওমন দানবীয় হাতে গলা চেপে ধরা তো আছেই! আগুনের লেলিহান শিখায় স্পষ্ট মুগ্ধ নামক ভয়ংকর যুবকের কঠিন মুখাবয়ব, র*ক্তের ছিটেফোঁটায় যা একেবারেই আবিষ্ট! মাহি কাঁদছে ফুপিয়ে ফুপিয়ে। গালদুটোতে তার যা জ্বলুনি হচ্ছে না! মনে হচ্ছে এই বুঝি কেউ ইচ্ছে করে মেয়েটার গালদুটোতে মুঠোভর্তি লঙ্কার গুঁড়ো মেখে দিয়েছে! আর কন্ঠা? সে-তো এক্ষুণি ফেটেঁ যাবে যে! মুগ্ধ তো ছাড়ছেই না মেয়েটার কন্ঠা। রাগী মানব দাঁতগুলো কেমন কিড়মিড় করছে আর হাতের জোর বাড়াচ্ছে ক্রমশঃ ওদিকে মাহির অবস্থা যে বেগতিক সেদিকে থোড়াই খেয়াল আছে তার? মাহি এবার না পারতে কাশঁছে অনবরত, দু’হাতে ব্যর্থ চেষ্টায় নিজের গলা থেকে মুগ্ধের হাত খানা সরাতে চাইছে, তবে মুগ্ধের ওমন শক্তপোক্ত হাতের জোরের সম্মুখে মেয়েটার সকল চেষ্টাই যেন নিছক মাত্র!

মাহি ধরেই নিলো — আজ আর রক্ষে নেই তার। চোখদুটো তার বুঁজে আসতে গেলেই মুগ্ধ হঠাৎ মেয়েটার কন্ঠা চেপে তাকে ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকানোর সময় অব্ধি পেল না মাহি, তার আগেই অসহায় মানবী ছিটঁকে পড়ল মেঝেতে। মুহুর্তেই মেয়েটার ঠোঁটের ফাঁকফোকর থেকে বেরিয়ে এলো আত্মচিৎকার। সে তৎক্ষনাৎ নিজের কোমর চেপে হাঁপাতে লাগল অনবরত। চোখদুটো ফেটে কান্না বেরুচ্ছে তার। একদিকে নিশ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে, আরেকদিকে কোমর আর পিঠের অসহ্য ব্যাথা! মাহি কাতরাচ্ছে এহেন শারীরিক যন্ত্রণায়। অথচ মুগ্ধ নামক নির্দয় মানব চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দেখছে মেয়েটার এহেন কষ্ট। তার চোখেমুখে বিন্দুমাত্র উদ্বেগের ছাপ নেই, না আছে ব্যাথা উপলব্ধি করবার কষ্ট। সে উল্টো দাঁত খিঁচল মেয়েটার ওমন কাতরানো দেখে। কপালে গোটাকতক বিরক্তির ভাঁজ ফেলে গটগটিয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল মাহির মুখোমুখি। পরক্ষণে একহাঁটু মেঝেতে ঠেকিয়ে হালকা ঝুঁকে মেয়েটার মুখপানে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হিসহিসিয়ে বলতে লাগল,
“ কষ্ট হচ্ছে?”

মাহি কাঁদছে! ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে ঠোঁট কামড়ে ব্যথাগুলো সহ্য করছে কোনরকম। এরইমধ্যে মুগ্ধের ওমন কথার পিঠে তৎক্ষনাৎ জবাব দিতে পারলোনা মেয়েটা, তবে চেয়ে রইল ছলছল চোখে। মুগ্ধ বাঁকা হাসল মেয়েটার এহেন ছলছল চাহনি দেখে। পরক্ষণেই ধীরেসুস্থে কোমরের পেছন থেকে রিভলবারটা বের করে এনে, তার লৌহইস্পাত নলখানা আলগোছে ছোঁয়ালো মাহির ফর্সা ললাটে। এহেন উদ্ভট কান্ডে কান্না ভুলে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল মাহি। লৌহ নলটা ধীরে ধীরে তার কপাল বেয়ে নেমে আসছে গাল বরাবর। মাহির নিশ্বাস জুড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ, আতঙ্কে বুকের মাঝে দ্রিমদ্রিম শব্দ হচ্ছে বেশ। ওদিকে মুগ্ধ কেমন নির্লিপ্ত চোখে চেয়ে আছে মাহির পানে। তার রিভলবারের নল এবার ঠেকেছে মাহির গোলাপি অধরজোড়ার ওপর। তারা কেমন তিরতির করে কাঁপছে! ঠোঁটের ওপরের হালকা খাঁজে বিন্দু বিন্দু ঘামের উপস্থিতি নজর এড়ায়নি মুগ্ধের। সে একপলক সেদিকে তাকিয়ে থেকে ক্রুর হেসে বলল,

“ কি যেন বলছিলি তখন? আরেকবার বলতো!”
ঠোঁটের ওপর চেপে রেখেছে আস্ত একখানা বন্দুকের নল! আবার বলছে কি-না কথা বলতে? মাহি নাক দিয়ে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলছে, চোখের পাতা অনড়। ওদিকে মুগ্ধ এবার সরাসরি তাকালো মাহির চোখের দিকে। অতঃপর একমুহূর্ত দু’জনার চোখাচোখি হলো, ঠিক এর পরমুহূর্তেই ঘটে গেল আরেক কান্ড! মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে নিজের দু-হাটুঁ ভর দিলো মাহির কোমরের দু’পাশে। এক ভিন্ন কায়দায় মেয়েটাকে চোখের পলকে আঁটকে ফেলল নিজের একদম কাছে। তারপর মাহির সিল্কি চুলগুলো আরেকদফা মুঠোয় চেপে, মাথাটা খানিক উঁচুতে তুলে মেয়েটার কণ্ঠনালী বরাবর সজোরে চেপে ধরল রিভলবারের লৌহনল। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক মাহি, প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই কর্ণকুহরে শুনতে পেল মুগ্ধের হিংস্র গর্জন!

“ আমি তোর সো-কলড বয়ফ্রেন্ড কিংবা প্রিয় মানুষ নই, যার সাথে তুই যখন-তখন তর্ক করবি! গলা উঁচিয়ে কথা বলবি। কান খুলে শুনে রাখ জানোয়ারের বাচ্চা, আই এম আ মনস্টার, দি আন্ডারওয়ার্ল্ড শ্যাডো মনস্টার! যার সাথে কন্ঠ উঁচিয়ে কথা বলা তো দূর কি বাত, জাস্ট চোখ তুলে তাকানোর দুঃসাহস দেখালেও সামনের মানুষটাকে ফেলে জ*বা*ই করি, সে-ই আমার সাথেই তোর মতো একটা দেড় ব্যাটারী কি-না খেই খেই করে কথা বলতে আসে? কে বে তুই? তুলে একটা আছাঁড় মারলে নাড়িভুড়ি সব বের হয়ে আসবে এমনিতেই, গাল বরাবর তিন-চারটা কষিয়ে থাপ্পড় বসালে গালটাই খুঁজে পাওয়া যাবে না যার, সেই বান্দীর মেয়ে কিনা আমার সাথে এভাবে কথা বলতে আসে? মরার খুব শখ জেগে থাকলে বল, এক্ষুণি তোকে মেরে দেই! তা না করে শুধু শুধু বাঘের সামনে আফ্রিকানদের মতো উলালা উলালা নাচতে আসিস কোন সাহসে?”
গলার কাছে প্রাণ ঝুলে আছে মাহির। আরেকটু ভয় দেখালে বোধহয় বেরিয়ে আসবে এক্ষুণি! ওদিকে মুগ্ধ মহাশয় মেয়েটার ওমন ভয়ার্ত কাচুমাচু মুখ দেখে ভীষণ আনন্দিত। ছোটখাটো মেয়েটার সারা গা কাঁপছে রীতিমতো, ঠোঁটের কোণ আজও থাপ্পড়ের চোটে ফেটেঁ গিয়েছে খানিকটা। চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়! কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে অনবরত। মুগ্ধ দেখল, কিয়তক্ষন একইভাবে মেয়েটাকে ধরে রেখে আচমকা চোখ টিপলো কেমন! পরক্ষণে ঠোঁট কামড়ে মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে মাহিকে ছেড়ে দিলো আলগোছে। কোমরের পিঠে রিভলবারটা গুঁজতে গুঁজতে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলে ওঠে,

“ ইদুরের সমান একখান মেয়ে অথচ তেজ দেখলে ওহ মাই গড! নেক্সট টাইম লাগতে আসিস, গাল বরাবর চড়াতে চড়াতে একদম বাংলাদেশে ছুঁড়ে মেরে আসব!”
বলেই উঠে দাঁড়ায় মুগ্ধ। দু-কদম পেছাতে পেছাতে ঝাঁঝাল কন্ঠে ফের শুধালো,
“ রাতের জন্য তৈরী থাকবি! টুডে আ’ম হাঙ্গরি।”
মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা মাহি ফোঁপাচ্ছিল এই অব্ধি। তবে যেইনা মুগ্ধের শেষ কথাটা শুনল ওমনি মেয়েটা কেমন আঁতকে উঠল ভয়ে। তক্ষুনি ভাঙা কন্ঠে চেঁচিয়ে বলল,
“ একদম না! প্লিজ আসবেন না। আমার কোমরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে আজকে, ব্যাথায় নড়তে অব্ধি পারছিনা। প্লিজ একটু রহম করুন আমার ওপর।”
চোখ সরু করল মুগ্ধ। বিরক্তি ভরা কন্ঠে তক্ষুনি জবাব দিলো,
“ তোর কোমর ব্যাথা হোক কিংবা শরীর তাতে আমার কি? তুই আজ মরে গেলেও তো আমার হাত থেকে রেহাই পাবিনা, আমার ক্ষুধা যেহেতু বেড়েছে, মেটাতে তো হবেই! সো তৈরী থাক!”
ব’লে আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না মুগ্ধ, তক্ষুনি গটগটিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। এদিকে মাহি বেচারি মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে থেকেই কাঁদছে অনবরত! এ কোন জাহান্নামে এসে পড়ল সে কে জানে!

চকচকে কালো গ্রানাইটের কাউন্টারটপ, বিন্দুমাত্র দাগ নেই তাতে। সিলিংয়ে ঝুলছে স্লিক মেটাল লাইট! মনস্টার প্যারাডাইসের কিচেনটা বড্ড চক্ষু শীতল জায়গা। রান্না প্রেমী নাহলেও এ কিচেনে একবার পা রাখলে যে কারো রাঁধতে ইচ্ছে করবেই! বিশাল এক কক্ষের সমান রান্নাঘর, যার ক্যাবিনেটগুলো গাঢ় কাঠের মসৃণ ফিনিশে তৈরি।
রান্নাঘরের একদম মাঝখানে মার্বেলের তৈরী মাঝখানে একটা বড় আইল্যান্ড টেবিল। যার ওপর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা থাকে ধারালো, ঝকঝকে ছুরির সেট। কিচেনের এক কোণে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি যেমন স্টিল আর কালো ফিনিশের ওভেন, কফি মেশিন, ওয়াইন কুলার সাজিয়ে রাখা। পুরো কিচেন জুড়ে আপাতত কাজ করছেন ১২জন। চারজন ভিন্ন ভিন্ন দেশের শেফ, তারা নিজেদের পছন্দসই আঙ্গিকে রাঁধছে। তাদের সহোযোগিতায় নিয়োজিত বাকিরা। তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে — এতগুলো মানুষ একসঙ্গে কাজ করলেও পুরো কিচেন জুড়ে কেমন অদ্ভুত নিরবতা বিদ্যমান! কারো মুখে তেমন রা নেই। যে যার মতো ব্যস্ত কাজে।

কিচেনের একপাশে বড় ডাবল ডোরের দুটো ফ্রিজ। একটা ব্যাবহার যোগ্য হলেও আরেকটা স্পর্শ করা নিষেধ। সেটা আদৌও কিসের জন্য তা জানেনা অনেকেই। ফ্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক পার্সিয়ান বয়, নাম — ইলিয়াড। গায়ে সাদা একখানা কিচেন এপ্রন, মাথায় পাকশির টুপি। মধ্যবয়সী লোকটার চোখেমুখে এক ভিন্ন উৎকন্ঠা, বারবার এদিক-সেদিক উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখছে কিছু। লোকটার বাহাতের মুঠোয় লুকিয়ে রাখা একখানা ছোট আকারের চাকু। তিনি বারবার এলোমেলো দৃষ্টি ফেলছে এদিক-ওদিক, যেন লুকিয়ে চুরিয়ে করতে চাইছেন কিছু। এদিকে অনেকক্ষণ ধরে কাউন্টার টুলের বসে থেকে ইলিয়াডের এহেন এলোমেলো ভাবভঙ্গি পরোখ করছে লিয়ান। তবে আন্দাজ করতে পারছেনা কিছুই! সে খানিকক্ষণ দোনোমোনো করে অবশেষে এগিয়ে আসে ইলিয়াডের কাছে। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,

“ কি লুকচ্ছো তুমি?”
হকচকায় ইলিয়াড। তক্ষুনি নিজের বাহাতটা লুকিয়ে নেয় এপ্রনের ভেতর। এদিকে তার ওমন হকচকান দেখে ভ্রু গোটায় লিয়ান। সন্দিগ্ধ দৃষ্টি বজায় রেখে আবারও জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ হাতে কী লুকালে? দেখি দেখাও তো হাতটা।”
বলেই লিয়ান উদ্যোত হলো ইলিয়াডের হাত দেখতে। তবে ইলিয়াড লিয়ানের এহেন কান্ডে চটে গিয়ে তৎক্ষনাৎ একহাতে লিয়ানের বুক বরাবর সজোরে ধাক্কা দিয়ে বসে। আচমকা চেঁচিয়ে ওঠে বলে,
“ দূরে সরো! তুমি কে আমার কাছ থেকে কৈফিয়ত চাওয়ার?”
এহেন কান্ডে হতভম্ব লিয়ান। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে — তাদের এহেন চেঁচামেচি দেখে বাকিরা একবার ঘুরে তাকালেও পরক্ষণে যে যার মতো ফের মত্ত হয়েছে নিজ কাজে। হয়তো এখানকার নিয়ম এমনটাই! ওদিকে ইলিয়াড ততক্ষণে প্রস্থান ঘটিয়েছে রান্নাঘর থেকে। কে জানে লোকটার মাথায় আবার জেঁকে বসল! পরে না আবার বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে নিজের প্রাণটাই খুইয়ে বসে বেচারা!

কালো মার্বেলের ঠান্ডা মেঝে, যেখানে হালকা সোনালি রেখার দীর্ঘ লাইন আঁকা। দেয়ালজুড়ে গভীর ধূসর পাথর, মাঝে মাঝে বসেছে ইনবিল্ট লাইটিং! আধুনিক সাজসজ্জায় মন্ডিত বিশাল বাথরুম। যার একপাশে বড় ফ্রিস্ট্যান্ডিং টাব তাও আবার কালো পাথরের তৈরি। টাবের ওপরের দিক থেকে ঝর্ণার মতো প্রবাহিত হচ্ছে পানি। টাবের পাশে কাউন্টারে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন ক্রিস্টালের বোতল, যেথায় দামী দামী সুগন্ধি বাথ অয়েল উপস্থিত। পুরোটা শাওয়ার এরিয়া কাঁচে ঘেরা, যেথায় স্টিল আর কালো ম্যাট ফিনিশের ফিটিংস।
বাথটাবের গায়ে দু’হাত ছড়িয়ে মাথা এলিয়ে বসে আছে মুগ্ধ। চোখদুটো তার বুঁজে রাখা, বলিষ্ঠ পুরুষের দেহটা কেমন টানটান হয়ে আছে। বামহাতের মাসেলে স্পষ্ট একেঁ রাখা পাইথনের ট্যাটু। ঘাড়ের একপাশে সাইড করে একেঁ রাখা ❝ মনস্টার ❞। বাথটাবের গায়ে জড়িয়ে আছে মুগ্ধের শক্তপোক্ত হাত, ডানহাতের উপরাংশের নাকল এরিয়ায় একেঁ রাখা কিসব ভয়ানক ট্যাটু! তার বুক অব্দি ডুবে আছে বাথটাবের ঠান্ডা পানিতে। মাথায় চলছে নানান কুট কাঁচালি! সে এবার কি মনে করে চোখদুটো বুঁজল একটুখানি। মস্তিষ্ক খানিকটা শিথীল হতেই তার বন্ধ চোখের পাতায় আচমকা ভেসে উঠল মাহির কান্নারত লাল হয়ে যাওয়া আদুরে মুখটা। মেয়েটা তার দিকেই তাকিয়ে থেকে কাঁদছে! এহেন দৃশ্য দেখামাত্রই তৎক্ষনাৎ শরীর ঝাঁকিয়ে ওঠে মুগ্ধের। সঙ্গে সঙ্গে চোখদুটো খুলে দাঁত খিঁচল গম্ভীর পুরুষ। অসম্ভব রাগ নিয়ে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,

“ হোয়াট দা ফা*ক! ওকে দেখছি কেনো আবার?”
নিজেকেই করা এহেন প্রশ্নে তৎক্ষনাৎ উত্তর পায়নি মুগ্ধ। কেবল পেয়েছে একরাশ মাথাভর্তি রাগ! সে আর বসলোই না বাথটাবে। তড়িঘড়ি করে কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে নেমে এলো সেখান থেকে। গটগটিয়ে কয়েক-কদম এগিয়ে এসে চুপচাপ দাঁড়াল শাওয়ার স্ট্যান্ডের নিচে। হাত বাড়িয়ে স্ট্যান্ডের সুইচ চাপতেই ওপর থেকে ঝপঝপিয়ে নেমে এলো পানির বহর। মুহুর্তেই সুদর্শন যুবকের সারা গা ফের ভিজে গেল পানির অনিয়ন্ত্রিত স্পর্শে। মুগ্ধ ভিজতে ভিজতেই খানিক এগিয়ে এসে শাওয়ার কাউন্টার থেকে পছন্দসই টম ফোর্ড নেরোলি পোর্তোফিনো বাথ অয়েলটা হাতে নিয়ে, সারা গায়ে মাখতে লাগল। মাখতে মাখতেই তার দৃষ্টি আচমকা গিয়ে ঠেকলো সম্মুখের আয়নার পানে। পুরো দেয়ালজুড়ে আছে আয়নাটা। মুগ্ধের কেন যেন মনে হলো আয়নাটায় হঠাৎ করেই কাউকে দেখা যাচ্ছে। কেউ একজন দু-হাঁটুতে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে, তার সর্বাঙ্গ কেঁপে কেঁপে উঠছে কান্নার জেরে।

মুগ্ধ চোখ সরু করল এবার। ধীরে ধীরে তার অক্ষিপটের সামনে স্পষ্ট হলো ক্রন্দনরত মাহির মুখ। এবারেও মেয়েটা কাঁদছে, কোনো দক্ষ শিল্পীর হাতে আকাঁ নিখাঁদ সৌন্দর্য মন্ডিত অধরজোড়া কাঁপছে তার, ফুলে উঠেছে সামান্য। তার চোখদুটোতে সে-কি ব্যথা! মুগ্ধ স্থির হয়ে গেল একমুহূর্তের জন্য! ভুলে গেল তার অবস্থান। বেভুলার মতো একটুখানি এগুতেই হঠাৎ তার মস্তিষ্ক বেজে উঠল কেমন। চিৎকার দিয়ে ধিক্কার জানালো তাকে তার হঠাৎ এরূপ পরিবর্তনের জন্য। মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ নিজের দৃষ্টি সরায়। তার পরিবর্তিত মুখাবয়বে ফের পরিবর্তন নামলো যেন। শিথিল হয়ে যাওয়া ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে আরেকদফা ভাঁজ পড়ল বিরক্তির। লম্বাটে চোয়ালখানা তার শক্ত হলো পরমুহূর্তেই। হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল আপনাআপনি। সে কটমট দৃষ্টিতে ফের তাকায় আয়নার পানে। সেথায় এখনো মাহির মুখ স্পষ্ট! মুগ্ধ এবার আর নিজের উপচে পড়া রাগগুলোকে ধরে রাখতে পারলোনা বোধহয়। সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে শক্ত হাতে সজোরে ঘুষি বসালো আয়নার মাঝে। মুহুর্তেই স্বচ্ছ কাঁচের আয়নাটা কেমন চৌচির হয়ে গেল ফেটে। পুরো শাওয়ার রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল কাঁচের টুকরো। সেই সাথে রাগী মানবের মুষ্টিবদ্ধ হাতখানাও কেটে গিয়ে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা! চামড়া ফেটে লহু গড়াচ্ছে অনিমেষ। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল মুগ্ধের। সে কেমন কটমট করতে করতে হিংস্র গর্জন তুলল,
“ শি ইজ জাস্ট দা ডটার অফ দেট ব্লা*ডি বাস্টার্ড, নাথিং এলস টু মি! নাথিং মিনস নাথিং।”

“ আসবো?”
কক্ষের দুয়ারে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইছে মেইডেন ইরা। তা দেখে অবাক হলো মাহি। মেঝেতে বসে থেকেই হতবাক কন্ঠে আওড়ায়,
“ হঠাৎ করে অনুমতি চাইছো কেনো মেইডেন? আমায় এতোটাও মান দিতে হবে না! এসো।”
হালকা হেসে ঘরে ঢুকলেন মেইডেন। ঘাড় এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দেখে নিলেন পুরো ঘরের পরিস্থিতি। সময়মত আগুন নিভিয়েছে মেইডরা, নাহলে হয়তো এতক্ষণে পুরো ঘর পুড়ে ছারখার হয়ে যেত। সঙ্গে ফ্রা*ই হতো মেয়েটাও। মেইডেন একটু একটু করে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন মাহির সামনে। একহাত আলগােছে বাড়িয়ে দিয়ে তাড়া দেখিয়ে বললেন,
“ উঠে পড়ো ডিয়ার। নিচে যেতে হবে।”
হতবুদ্ধির ন্যায় মাথা উঠায় মাহি। কাঁদতে কাঁদতে চোখ শুকিয়েছে তার। মুখটা লাল টুকটুকে! এলোমেলো চুলে মেয়েটাকে দেখাচ্ছে বিধ্বস্ত! সে খানিক সময় নিয়ে জানতে চাইলো,
“ নিচে কেনো?”

মেইডেন তৎক্ষনাৎ জবাব দিলেন না। নিজ উদ্যোগে একটুখানি ঝুঁকে এসে চেপে ধরলেন মাহির দুবাহু। মেয়েটাকে ধীরে ধীরে বসা ছেড়ে দাঁড় করাতেই কোমরের ব্যাথায় ককিয়ে ওঠে মাহি। সঙ্গে সঙ্গে ধপ করে বসে পড়ে মেঝেতে। এদিকে তার ওমন বেগতিক অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন মেইডেন, তক্ষুনি অস্থির গলায় বললেন,
“ কি হয়েছে তোমার? এভাবে… এভাবে পড়ে গেলে কেনো?”
কোমর চেপে ককিয়ে যাচ্ছে মাহি। আর্তনাদ করে বলছে,
“ কোমরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে মেইডেন। বোধহয় আর কখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারব না!”
আশ্চর্য বনে গেলেন মেইডেন। মেয়েটা আবার হুট করে এসব বলছে কেন? তিনি তৎক্ষনাৎ ঝুঁকে এলেন মাহির নিকট। মেয়েটার এলোমেলো চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে জানতে চাইলেন,
“ কিভাবে হলো এসব? কে করলো তোমার এ অবস্থা?”
এপর্যায়ে ফুপিয়ে ওঠে মাহি। নাক টানতে টানতে বলে,
“ আর কে! আমার চিরশত্রু।”
মেইডেন বুঝে গেলেন মাহির কথার ভাবার্থ। তিনি কেমন ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে আফসোসের সুরে বললেন,

“ এ-তো কিছুই না মনস্টারের আসল রুপের সামনে!”
অবুঝ মাহি বুঝলোনা এহেন কথার গভীরতা। সে খানিক নাক টেনে আওড়াল,
“ এরচেয়ে ভয়ানক আর কি’বা হতে পারে মেইডেন?”
“ হতে পারে বৈকি! অনেককিছুই হতে পারে। তুমি হয়তো এখনো মনস্টারের হিংস্রতার নাগালে পড়োনি। তবে যেদিন পড়বে, সেদিনই বুঝে যাবে আমার কথা।”
মাহির কৌতূহলী মন! না চাইতেও কেন যেন আগ্রহ দেখালো মনস্টারের হিংস্রতা সম্বন্ধে জানতে,
“ সে আর কি কি করবে আমার সাথে? আরও মারবে আমায়?”
মাহির এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আগ্রহ দেখে ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেললেন মেইডেন। ধীরেসুস্থে পাদু’টো বিছিয়ে বসলেন মেঝেতে। ঘাড় বাকিয়ে একবার সর্তক দৃষ্টি ঘুরালেন দরজার দিকে, তবে কাউকেই তেমন দেখতে না পেয়ে তিনি কেমন ফিসফিস করে জানতে চাইলেন,
“ সেদিন তোমার সাথে কি কি করেছিল মনস্টার?”
সেদিনের ভয়াল রাতের কথা মনে পড়তেই গা শিউরে ওঠে মাহির। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলে বোকা মেয়েটা বলে দেয় সম্পূর্ণ ঘটনা। তা শুনে মেইডেন কেমন হতভম্ব বনে গেলেন যেন। আশ্চর্যান্বিত কন্ঠে হুট করেই শুধালেন,

“ সে তোমায় ভোগ করেনি?”
মাথা নুইয়ে ফেলে মাহি। হালকা নাক টেনে দু’ধারে মাথা নাড়ায় নিঃশব্দে। মেইডেন তখন চেঁচিয়ে ওঠেন সামান্য। তক্ষুনি মেয়েটার কথাকে একপ্রকার দূরছাই করে বলে ওঠেন,
“ ইম্পসিবল! যে লোকের রোজ নতুন নতুন মেয়েদেরকে বিছানায় নেবার অভ্যেস, সেই লোক তোমার সাথে রাত কাটিয়েও তোমায় ভোগ করেনি? এটাও আমায় বিশ্বাস করতে হবে এখন?”
হতবাক মাহি! আকাশ থেকে পড়ল যেন এইমাত্র! মেইডেনের কথা শেষ হতে না হতেই সে কেমন হতবুদ্ধির ন্যায় বলে বসল,
“ রোজ রোজ নতুন মেয়ে বলতে?”
মেইডেন সর্তক হলেন এবার। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে ফের তাকালেন দরজার দিকে। পরক্ষনে নড়েচড়ে বসে চাপা স্বরে মাহিকে বলতে লাগলেন,

“ দি মনস্টার অধীর রায় — যর মধ্যে বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ব নেই। যাকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মোস্ট ওয়ান্টেড রাশিয়ান মাফিয়া বলা হয় সে কিন্তু একজন ওমেনাইজার। এক কথায় নারী*দে*হ লোভী। রোজ নতুন নতুন মেয়েদের ধরে আনা হয় তার জন্য, এ বাড়ির পেছনের যেই মাউন্টেনটা আছে তার চূড়ায় রয়েছে মনস্টারের পেন্টহাউজ। মূলত সেখানেই তার মূল আস্তানা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সকল কাজ, নিজের পাশবিক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ সবটা সেখানেই করে সে। বলতে গেলে এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যেটা মনস্টার করেনা!”
কথা হারিয়ে গেল মাহির। মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে কেন যেন। সে টের পেয়েছে মুগ্ধ নামক পুরুষটা খারাপ। কিন্তু সে যে এতোটা খারাপ, তা হয়তো সপ্নেও আন্দাজ করতে পারেনি সে! মাহি চুপ করে রইলো কিয়তক্ষন। আধো আধো স্বরে আওড়াল,

“ মেয়েগুলোকে ভোগ করার পর কোথায় রাখে সে? তাদেরও কি আমার মতো এভাবেই আঁটকে রাখে?”
তাচ্ছিল্য ভরা হাসি দিল মেইডেন। আহত স্বরে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলতে লাগলেন,
“ সবাই কি আর তোমার মতো ভাগ্যবতী মেয়ে? তাদেরকে স্বয়ং মনস্টার নামক অভিশাপ গ্রাস করেছে। তাদের মধ্য থেকে কাউকে হয়তো ভোগ করে সঙ্গে সঙ্গে অভুক্ত প্রাডার খাবার বানিয়েছে, অথবা পাচার করেছে বিভিন্ন ক্যাসিনোতে। আবার কেউ কেউ তো দিনের পর দিন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, নিজে থেকে প্রা*ণ দিয়েছে অকালে।”
বলেই বেশ বড়সড় এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন মেইডেন। পরক্ষণে তাকালেন হতবাক মাহির পানে। ঠোঁটের কোণে আহত হাসির রেশ টেনে তিনি আলতো করে গালে হাত ছোঁয়ালেন মাহির। হঠাৎ করেই মোটা হয়ে যাওয়া কন্ঠে আওড়ালেন,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬

“ আমারও না তোমার মতো একটা মিষ্টি দেখতে মেয়ে ছিলো। একদম তোমার মতো! নাম ছিল মারিয়া।”
এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরল মাহিরার। মেয়েটা কেমন সন্দিগ্ধ দৃষ্টি তাক করলো মেইডেনের মুখের দিকে। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ এখন কোথায় আছে সে?”
থমকালেন মেইডেন। একমুহূর্ত চুপ থাকতেই মাহি খেয়াল করল মধ্যবয়সী মানুষটার দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। বদনখানি কাঁপছে মৃদুমন্দ। তার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ প্রাডার পেটে!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৮

1 COMMENT

Comments are closed.