Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৬

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৬

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৬
Tahmina Akhter

কনে বিদায়ের সময় হয়ে গেছে। বেশিরভাগ বরযাত্রীদের মধ্যে অনেকেই আগেই রওনা হয়ে গেছে। মেঘালয়ের হাত ধরে আফসার সাহেব ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললেন। আলো তার বাবার চোখের পানি দেখে কেঁদে ফেলল নীরবে। মেঘালয় আলোর কান্না দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মেঘালয় আফসার সাহেবের হাত ওপর হাত রেখে আস্বস্ত করে বলল,
— আলোকে সর্বোচ্চ ভালো রাখার চেষ্টা করব। কারণ, সে এখন আমার স্ত্রী।
আলো ওর বাবার সামনে এগিয়ে এসে বলতে পারল না, “বাবা আমি চলে যাচ্ছি।
আজ আমাকে যেভাবে বিদায় দিলে। ঠিক সেভাবে আর কখনোই আমি তোমার বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতে পারব না । জন্মসুত্রে পাওয়া ঠিকানা আজ আমার নাই হয়ে গেছে জীবন থেকে।”
সিতারা বেগমসহ সবার কাছ থেকে বিদায় নিলো আলো। আলোর কান্নার শব্দ নেই অথচ অনবরত গড়িয়ে পরা চোখের পানি দেখে মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
মেঘালয়ের দীর্ঘশ্বাস ফেলার দৃশ্যটুকু দেখে কাব্য মেঘালয়ের কানের কাছে মুখ বাড়িয়ে বলল,

— মেঘালয় তোর বউটা বেশি কান্নাকাটি করছে দেখে মায়া লাগছে তোর ? আহারে, কি দরকার মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়ার? রেখে যাবি?
— লক্ষ টাকা খরচ করে বিয়ে করেছি বউক রেখে যাওয়ার জন্য।
মেঘালয় বিরক্তিকর সুরে কথাটি বলতেই কাব্য তার কনুই দিয়ে মেঘালয়ের পেটে গুঁতো দিয়ে বলল,
— তাহলে ওমন ফোসফাস করে শ্বাস ফেললি কেন? মেয়েরা বিদায় সময় একটুআধটু কাঁদবে। তুই এমন সেন্টি খাচ্ছিস কেন?
— কারণ, আমার বউ কাঁদছে। আমার অর্ধাঙ্গিনী কাঁদছে আর আমি দাঁত বের করে হাসব! তুমি কি এমন কিছু আমার কাছ থেকে এক্সপেক্ট করছো, ভাই!
মেঘালয়ের উত্তর শুনে কাব্য নিজের কপালে চাপড় দিয়ে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— না ভাই। তুই বউ পাগলা। তোর বউ কাঁদতেছে তুইও তোর বউকে কোম্পানি দে। একসঙ্গে গলা ধরে কান্না কর দুজনে মিলে।
কাব্যের কথা শুনে মেঘালয় ইতির দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাবি, একটা সিক্রেট বলি?
ব্যস, কাব্যের হাসি ফুস হয়ে গেল। কারণ মেঘালয় এবার মৌচাকে ঢিল ছুঁড়েছে। ইতি বেশ আগ্রহ নিয়ে মেঘালয়কে বলল,

— হ্যা ভাই, বলুন?
— আপনাদের যখন বিয়ে হলো না, আপনি যখন বিদায়ের সময় কাঁদছিলেন। তখন কাব্য ভাই আপনাকে ব্যঙ্গ করে কাঁদছিল। আমার কথা আপনার বিশ্বাস না হলেও অসুবিধা নেই। আমার কাছে প্রমাণ হিসেবে ছবি আছে। দেখবেন আপনি?
ব্যস, এতটুকু যথেষ্ট ছিল। ইতি চোখ বড় বড় করে তাকালো কাব্যের দিকে। কাব্য এবার মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুই না আমার ভাই! তুই এটা কি করলি?
— যা সত্য তাই বলেছি। ভাবি আমি বাসায় ফিরে আপনাকে ছবিগুলো দেখাব৷
কাব্য এগিয়ে যায় ইতির কাছে। কিন্তু ইতি কাব্যর কাছ থেকে সরে গিয়ে মাহরীনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কাব্য রাগে দুঃখে পারছে না নিজের চুল ছিঁড়ে কাঁদতে।

ওয়েডিং হল থেকে বের হতেই চোখে পরল ফুলে সজ্জিত ঘোড়ার গাড়ির ওপর। আফসার সাহেব, সিতারা বেগম এবং আলো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আশপাশে সব কিছু আজ রুপকথার মত মনে হচ্ছে। মাহরীন এগিয়ে এসে আলোকে একপাশে জড়িয়ে ধরে বলল,
— আমার শখ ছিল মেঘালয় ঘোড়ায় চড়ে বিয়ে করে বউ আনবে আমার জন্য। আজ আমার শখ পূরন হলো আলো। দেখো মেঘালয় তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
মাহরীনের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো আলো। দেখল মেঘালয় সত্যি সত্যি দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ির ওপর। আলো মেঘালয়ের দিকে তাকাতেই মেঘালয় হাত বাড়িয়ে দিলো। আলো এক হাতে শাড়ি উঁচু করে অন্য হাত বাড়িয়ে দিলো।
ব্যস মূহুর্তের মধ্যে পুরো আকাশ জুড়ে আতশবাজি ফোটানোর শব্দ ছড়িয়ে গেল। মাহরীন হাসতে হাসতে দেখল তার ছোট ছেলের স্বপ্নের বিয়ের আয়োজন। কাব্য এগিয়ে এসে মাহরীনের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— এবার আমাদের ফিরতে হবে, মা।

আলোকে বরণ করে ঘরে তোলা হলো। কাব্যের বিয়ের সময় এই বাড়িটা যেভাবে সাজানো হয়েছিল তারচেয়ে দ্বিগুণ সাজে সজ্জিত হয়েছে আজ। পুরো বাড়ি ঝাড়বাতির আলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
আলোকে ড্রইংরুমে বসানো হয়েছে। আশেপাশের ফ্ল্যাটের অনেকেই নতুন বউকে দেখতে এসেছে। বউ দেখে মোটামুটি অনেকেই অসন্তুষ্ট। কিন্তু, অনেকেই আবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
তানিয়া, ইতি সহ মেঘালয়ের কাজিনগ্রুপ হাসিঠাট্টায় মাতোয়ারা। আলো মাথা নীচু করে তাদের কথা শুনছিল। তারপর, ধীরে ধীরে প্রতিবেশীদের ভিড় কমতে শুরু করল। মাহরীন তানিয়া এবং ইতিকে আদেশ করল আলোকে মেঘালয়ের ঘরে রেখে আসতে। শ্বাশুড়ির আদেশ শুনে দুই জা মিলে আলোকে মেঘালয়ের ঘরের দিকে নিয়ে চলল।
যেতে যেতেই তানিয়া আর ইতি আলোকে অনেক কিছু সম্পর্কে বোঝালো। আলো সবটা শোনার পর ইতিকে বলল,

— বিয়ে অনেক কঠিন একটা ব্যাপার, ভাবি৷ আমি এতদিন ভাবতাম অনেক সহজ একটা ব্যাপার।
আলোর কথা শুনে তানিয়া এবং ইতি দুজনেই হেসে ফেলল। দু’জনের তাদের বিয়ের প্রথম দিনগুলোর কথা মনে পরে গেল।
মেঘালয়ের রুমের সামনে এসে তানিয়া এবং ইতি দাঁড়িয়ে গেল। ইতি আলোর হাত ধরে বলল,
—সঠিক জীবনসঙ্গী পেলে এসব ভয় আর মনে থাকবে না আলো। আমিও আগে বিয়ে নামক শব্দটা শুনলে ভয় পেতাম। কাব্যর সঙ্গে যখন আমার বিয়ে হলো। মানুষটার যত্ন, ভালোবাসা। আমার শ্বাশুড়ির কাছ থেকে আদর পেয়ে আমার মনের সকল ভয় কেটে গেল। বিয়ের মত একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকে গেইমের মত করে ভাবলে তুমি জিততে পারবে। কারণ, জীবনের প্রতিটা ধাপ রোমাঞ্চকর, প্রতিটা মূহুর্ত অনিশ্চয়তার। তবুও, মানুষ কদম ফেলে এগিয়ে যায়। ভয়কে জয় করতে পারলে তুমি বিজয়ী হবে।
ইতির আলোর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৫

— তোমাকে কখনো শাসন করব। কখনো ছোটবোনের মত স্নেহ করব। মন খারাপ করবে না, কিন্তু?
মেঘালয়ের ফুলে সজ্জিত ঘরটায় আজ আলোর পর্দাপন হলো। লাল গোলাপ আর রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো খাটের ওপর আলোকে বসিয়ে রেখে বের হয়ে গেল তানিয়া আর ইতি।

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৭