মেজর কারদার পর্ব ২০
ফিনারা ঝুমুর
টানা বৃষ্টিতে চারপাশের চেনা পৃথিবীটা যেন প্রায় নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। আষাঢ়ের এই বিরামহীন বর্ষণ পেয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবার পুরোদমে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আকাশ চিরে নামা বৃষ্টির পানিতে চারদিকে এক প্রলয়ঙ্কারী ঢল নেমেছে। জলাবদ্ধতা আর আকস্মিক বন্যা সবই যেন তড়তড়িয়ে এগিয়ে আসছে সাধারণ মানুষদের ঘরের দোরগোড়ায়।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে দেশের পার্বত্য আর পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে। কোথাও পাহাড়ধসে মাদরাসা ভেঙে মাটির নিচে চাপা পড়ে শতাধিক নিরীহ শিশু নিহত হচ্ছে, তো কোথাও প্রচণ্ড পানির তোড়ে নদী আর ছড়া থেকে অজ্ঞাত সব মরদেহ ভেসে উঠছে চারধারে। তলতলিয়ে নোংরা পাহাড়ি ঢলের পানি অনবরত ঢুকছে সাধারণ মানুষদের ঘরের ভেতর। তাতে চাপা পড়েছে রান্নার হাঁড়ি-পাতিলসহ চাল-ডালের সকল কিছু। মুহূর্তের মাঝেই গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। নেই কোনো খাবারের সুব্যবস্থা, নেই কোনো জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা। মানুষের এই হাহাকারের মাঝে অবলাগবাদিপশুগুলোও তীব্র বানের জলে ভেসে গিয়ে একে একে মারা যাচ্ছে। চারদিকে শুধু এক মরণ চিৎকার আর ধ্বংসের লীলাখেলা।
ঠিক এমনই এক দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে, বন্যার পানিতে পুরোপুরি ডুবে যাওয়া চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বুক চিরে একে একে প্রবেশ করছে আর্মির জলপাই রঙা আর লাল রঙের দশটি উদ্ধারকারী স্পিডবোট। ইঞ্জিনের গর্জন তুলে ধেয়ে আসা সেই স্পিডবোটগুলোতে রয়েছে দক্ষ উদ্ধারকর্মী দল। কোনোটায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, আবার কোনো কোনোটায় কোমর বেঁধে সরাসরি উদ্ধারকাজে নিযুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস জওয়ানেরা।
ডলু আর সাঙ্গু এই দুই প্রমত্তা নদীর বাঁধ ভেঙে সাতকানিয়ার বুকে আজ এমন প্রলয়ঙ্কারী নরক নেমে এসেছে। বানের তোড়ে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট সব ভেসে গেছে। সাতকানিয়ার প্লাবিত গ্রামগুলোতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত তৎপরতার সাথে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। তেমনই এক দুর্গম ও কোমর-পানিতে ডুবে যাওয়া গ্রামে এসে পৌঁছেছে মেজর শীর্ষ কারদার এবং তার নেতৃত্বাধীন চৌকস উদ্ধারকর্মী টিম।
পালাক্রমে গৃহবন্দী ও চালের ওপর আশ্রয় নেওয়া অসহায় মানুষগুলোকে একে একে উদ্ধার করে স্থান দেওয়া হচ্ছে সেনাবাহিনীর স্পিডবোটে। স্পিডবোটের পাশাপাশি স্থানীয় আরও বেশ কিছু বড় নৌকাও এই উদ্ধারকাজে যুক্ত করেছে তারা। মানুষগুলো তাদের জীবনের সমস্ত সম্বল, গবাদিপশু আর মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে আজ এক নিমেষে নিঃস্ব। শুধু নিজের এবং পরিবারের প্রাণটুকু বাঁচানোর তাগিদে সবকিছু বানের জলেই ফেলে রেখে জবুথবু হয়ে আশ্রয় নিচ্ছে মেজরের এই স্পিডবোটে।
“হারি আপ, জওয়ানস! একটা মানুষও যেন কোনো ঘরের ভেতর বা চালের ওপর আটকে না থাকে। খেয়াল রাখবে, উদ্ধারকাজের সময় কারোর যেন কোনো প্রকার শারীরিক ক্ষতি না হয়। মুভ মুভ!”
ওয়াকিটকির স্পিকার চিরে চারধারে ভেসে বেড়াচ্ছে মেজর শীর্ষ কারদারের সেই গমগমে গম্ভীর গলা। চরম এক পেশাদার কঠোরতার ঠাঁই নিয়েছে সেই আদেশে। লাইফ জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে শীর্ষর জাঁদরেল চোখ দুটো যেদিকেই যাচ্ছে, সেদিকে শুধু পানি আর পানি! চারপাশ জুড়ে শুধু ঘোলাটে নোংরা পানির এক ভয়ঙ্কর স্রোত বয়ে চলেছে।
“স্যার! স্যার –ওদিকে দেখুন, স্রোতের তোড়ে এক মেয়ে ভেসে যাচ্ছে!”
পাশে থাকা এক জওয়ানের আকস্মিক চিৎকারে শীর্ষ চকিতে তাকাল সেই ভাসমান মেয়েটির দিকে। সাঙ্গুর তীব্র পানির টানে কচুরিপানার মতো ভেসে চলেছে এক রমণী, ইতিমধ্যে প্রায় গলা সমান পানির নিচে ডুবে গেছে সে! হাত দুটো ওপরে তুলে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
শীর্ষর স্পিডবোটটি তখনও মানুষে পূর্ণ হয়নি, তবে আর এক সেকেন্ড দেরি হলেও মেয়েটি পানির নিচে তলিয়ে যাবে। শীর্ষ আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে হুট করেই স্পিডবোটের এক্সিলারেটর ঘুরিয়ে স্পিড সামান্য বাড়িয়ে দিল, বানের জলের সেই তীব্র স্রোত কেটে বোঁ বোঁ শব্দে বোট ছুটে চলল সেই মুমূর্ষু মেয়েটিকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচানোর জন্য!
মেডিটেশনের মতো একাগ্রতায় এক হাত ওপরে তুলে রাখা মেয়েটির কাছে মাত্র মিনিট খানেকের ভেতর স্পিডবোট নিয়ে পৌঁছাতেই শীর্ষর চোখে ধরা পড়ল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য! মেয়েটি নিজের জীবন বাঁচাতে হাত বাড়ায়নি, বরং বানের জলের তীব্র স্রোত থেকে আগলে রাখতে নিজের একখানা হাত সোজা আকাশের দিকে তুলে ধরেছে। আর তার সেই কাঁপতে থাকা হাতের তালুর ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে এক ছোট্ট বিড়ালছানা! ছানাটি চরম ভীত চোখে একবার মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে, তো পরক্ষণেই নিচের ওই গর্জে ওঠা ঘোলাটে পানির দিকে তাকিয়ে ভয়ে একেবারে নীল হয়ে যাচ্ছে। নিজের ছোট্ট প্রাণটুকু বাঁচানোর তাগিদে ক্ষীণ ও করুণ গলায় অবিরাম ডেকে চলেছে,
“মেঁউ… মেঁউ…”
শীর্ষ আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে ঝুঁকে পড়ে দ্রুত মেয়েটির হাত থেকে বিড়ালছানাটিকে নিজের শক্ত মুঠোয় ছিনিয়ে নিয়ে স্পিডবোটের নিরাপদ মেঝেতে রাখল। তারপর ক্ষিপ্রতার সাথে মেয়েটির হাত দুটো শক্ত করে ধরে ওকে বোটের ওপরের দিকে টেনে তুলতে চেষ্টা করল। অনেকখানি নোংরা পাহাড়ি পানি পেটে ঢুকে গেছে মেয়েটির, তার ওপর দীর্ঘ সময় বানের জলে ভেসে থাকায় ও কাপড় ভিজে ভারী হয়ে ওর দেহের ওজনও যেন দ্বিগুণ বেড়েছে। শীর্ষ নিজের দুই হাতের সমস্ত শক্তি এক করে মেয়েটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
“ম্যাম, আমার হাত দুটো একদম শক্ত করে ধরুন! একটু শরীরের জোর দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করুন, হারি আপ!”
অর্ধচেতন, প্রায় নিস্তেজ হয়ে আসা মেয়েটি হয়তো মেজরের সেই অভয় দেওয়া গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর বুঝতে পেরেছিল। সে নিজের অবশ হয়ে আসা আঙুলগুলো দিয়ে শীর্ষর চওড়া হাত দুটোকে শেষ সম্বল মনে করে আকড়ে ধরল এবং নিজেকে পানির ওপর ভাসিয়ে ওপরে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করল। দুজনের যৌথ ও মরিয়া চেষ্টায় একসময় মেয়েটিকে টেনেহিঁচড়ে স্পিডবোটের শুকনো মেঝেতে উঠাতে সক্ষম হলো শীর্ষ।
বোটের মেঝেতে শুয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে মেয়েটি নিজের বুকের ভেতরের সমস্ত আকুলতা ঢেলে দিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ ও ভাঙা গলায় বলে উঠল,
“স্যার– ও স্যার! আশেপাশে একটু ভালো করে তাকাবেন, দয়া করে? একটা সিলভারের বড় ডেকচিতে করে আমি ওদের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছি। ওখানে আমার কলিজাগুলো আছে স্যার, আমার বিড়ালের বাকি ছানাগুলো আটকে আছে! ওদেরকে বাঁচান দয়া করে।ওরা এই বানের জলে ডুবে গেলে নির্ঘাত মারা যাবে স্যার, দয়া করুন!”
মেয়েটির নিজের শরীর কাঁপছে, ঠোঁট দুটো ঠান্ডায় নীল হয়ে গেছে, অথচ নিজের জীবন বাঁচানোর কোনো বাড়তি আকুতি নেই তার মাঝে! তার পুরো হৃদয় জুড়ে কেবল ছটফট করছে নিজের ঘরে ঠাঁই পাওয়া কিছু অবলা প্রাণকে বাঁচানোর তীব্র আর্তি। মেয়েটির এই নিঃস্বার্থ মাতৃত্ব আর ভালোবাসা দেখে জাঁদরেল মেজর শীর্ষ কারদারও যেন এটাকে অবহেলা করে ফেলতে পারল না। সে ওয়াকিটকি ও বোটের জওয়ানদের উদ্দেশ্যে ফের বজ্রকণ্ঠে আদেশ দিল,
“স্পিডবোটের চারপাশের পানিতে দ্রুত তীক্ষ্ণ চোখ রাখো সবাই! কোনো হাঁড়ি, সিলভারের বোল বা ডেকচি পানিতে ভেসে যেতে দেখলেই যেভাবে হোক, যেভাবেই হোক সেটাকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করবে। মুভ!”
ওপাশ থেকে সমস্ত জওয়ানদের থেকে একযোগে ‘জি স্যার’ সূচক হ্যাঁ-বাচক আজ্ঞা ভেসে এলো। শীর্ষ স্পিডবোটের গতি সামান্য বাড়িয়ে দিয়ে ঘোলা পানির স্রোত কেটে কেটে কিছু দূর এগোতেই, মেঝেতে পড়ে থাকা মেয়েটি হঠাৎ পানির এক কোণে ইশারা করে মৃদু চেঁচিয়ে উঠল,
“স্যার! ওই যে– ওই যে সেই ডেকচিটা ভেসে যাচ্ছে! দয়া করুন স্যার, ওদের একটু বাঁচান!”
মেয়েটির চোখ দুটো তখন নোনা জলে টলমল করছে, ছানাগুলোকে হারানোর আতঙ্কে বুকটা কাঁপছে। শীর্ষ মেয়েটির সেই জলভারাক্রান্ত, মায়াবী ও আকুল চোখের দিকে তাকাতেই আচমকা ওর চোখের তারায় এক লহমায় ভেসে উঠল বাগেরহাটে ফেলে আসা ওর নিজের সদ্য বিবাহিত বউ মেঘালয়ার সেই মায়াময় ভাঙা মুখখানা! মেঘও তো ঠিক এই মেয়েটির মতোই এক অবলা বিড়ালপ্রেমী, তার বুকেও তো ছটফট করে এমন এক নিষ্পাপ হৃদয়। বানের জলের এই প্রলয়ঙ্ককারী দুর্যোগের মাঝে দাঁড়িয়েও, দূর প্রান্তের মেঘের সেই চেনা মুখটুকু মনে পড়তেই শীর্ষর তপ্ত বুকের ভেতরটা এক অজানা শান্তি ও স্বস্তিতে জুড়িয়ে গেল।
শীর্ষ দ্রুত নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে স্পিডবোটের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দিল ডেকচিটা ভেসে যাওয়ার পানে। ভাগ্য ভালো ছিল, স্রোতের গতি অন্যদিকে ঘোরার আগেই ডেকচিটার একদম নাগালে পৌঁছে গেল বোট। শীর্ষ নিজেই ঝুঁকে পড়ে সেই বড় সিলভারের ডেকচিটা টেনে বোটের ভেতর তুলতেই ওর চোখের মণি জোড়া বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে গেল! ডেকচির ভেতর তাকিয়ে দেখে সত্যই সেখানে বিড়াল ছানা ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই! এক, দুই, তিন করে গুনে দেখা গেল ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দশ-বারোটা হরেক রঙের বিড়াল আর তাদের ছানার ঠাঁই হয়েছে ওই একটা মাত্র ডেকচিতে। সবাই ভয়ে একে অপরকে লেপ্টে ধরে কাঁপছে।
“সামান্য কয়েকটা বিড়ালের বাচ্চার জন্য নিজের জীবনটা এভাবে বাজি রাখলেন আপনি? এত ধকল সহ্য করলে?”
শীর্ষর এমন চরম অবাক করা প্রশ্নে স্পিডবোটের মেঝেতে ভিজে জবুথবু হয়ে পড়ে থাকা মেয়েটির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান অথচ পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে ডেকচির ভেতর থেকে একটা ছানাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ভাঙা গলায় বলল
“আমি জন্ম-এতিম স্যার, এই দুনিয়ায় আমার মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনো ঠাঁই বা আপন বলতে কেউ নেই। এই বন্যায় আমার ঘরবাড়ি সব ভেসে গেছে। এখন আমার বেঁচে থাকার আনন্দ বলতে এই বোবা প্রাণীগুলো ছাড়া আর কেউই নেই এই দুনিয়ায়। ওরাই আমার পরিবার, ওরাই আমার সব স্যার! বানের জলে যদি মরতেই হতো, তবে ওদেরকে বাঁচিয়ে ওদের সাথেই না হয় মরতাম!”
মেয়েটির মুখে এমন নিঃস্বার্থ ও পরম ভালোবাসার বাণী শুনে জাঁদরেল মেজর শীর্ষ কারদার আর একটি কথাও বাড়াল না। বোবা প্রাণীদের প্রতি এই অগাধ টান ওকে মনে মনে এক অদ্ভুত সম্মানের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল।
শীর্ষ নিজের ওয়াকিটকিতে অন্য টিমগুলোর সাথে যোগাযোগ করল। ইতিমধ্যে তাদের স্পিডবোট আর পেছনে থাকা বড় উদ্ধারকারী নৌকাগুলোতে যতগুলো বন্যাকবলিত মানুষের ঠাঁই দেওয়া সম্ভব হয়েছে, সবাইকে নিয়ে তারা ধীরপায়ে রওনা হলো সাতকানিয়ার মূল সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে, সেনাবাহিনীর আরও বেশ কিছু নতুন টিম স্পিডবোট আর লাইফ জ্যাকেট নিয়ে দুর্গম গ্রামগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বিকেলের আলো ফুরিয়ে রাত নামতেই চারপাশের থমথমে বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠতে লাগল। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, রাতে সাতকানিয়া আর পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে আবারও ভারী থেকে অতিভারী বজ্রসহ বৃষ্টির মস্ত বড় আশঙ্কা আছে। যদি সত্যিই আজ রাতে আবারও তেমন মুষলধারে বৃষ্টি নামে, তবে এই বিধ্বংসী বন্যা আবারও এক প্রলয়ের রূপ নেবে হুবহু যেমনটা অতীতে নোয়াখালীর সেই স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার বুকে সাধারণ মানুষকে এক লহমায় নিমিষেই গ্রাস করেছিল!
ড্রয়িংরুমের পুরনো রঙিন টেলিভিশনটায় তখন একের পর এক চ্যানেল জুড়ে কেবল পার্বত্য অঞ্চলের বন্যাকবলিত ট্র্যাজিক খবরগুলোই প্রচার করা হচ্ছিল। বানের পানির সেই হাহাকার আর ধ্বংসলীলার দৃশ্য দেখতে দেখতেই রিমোটের বোতাম চেপে হুট করে একটা বিশেষ খবরের চ্যানেলে এসে থামলেন আলেয়া বানু। টিভির ঠিক পাশেই একটা কাঠের চেয়ারে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে চশমা জোড়া ঠিক করছিলেন সাত্তার মাস্টার। আর সোফার এক কোণায় গুটিসুটি মেরে উদাসীন মনে বসে ছিল মেঘ।
“হ্যাঁ গো বউ! ওটা তোমার আপন বোন পিংকির বড় জায়ের সেই সুপুত্র না? যে কিনা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেজর পদে কর্মরত?”
সাত্তার মাস্টারের সেই চিরচেনা ভরাট ও রাশভারী গলা শুনে এক পলক ওনার দিকে তাকালেন আলেয়া বানু। তারপর টিভির স্ক্রিন থেকে এক মুহূর্তের জন্যও নজর না নামিয়ে অত্যন্ত গর্বিত ও নরম গলায় বললেন,
“হ্যাঁ গো, ঠিক ধরেছো। ও আমাদের শিউলি আপার বড় ছেলে, শীর্ষ কারদার। বড্ড অমায়িক আর রত্ন একটা ছেলে গো। দেখো তো এই ভরা দুর্যোগে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে কীভাবে বানের পানির ভেতর থেকে একের পর এক অসহায় মানুষকে বুকে টেনে উদ্ধার করছে!”
“তা যা বলেছো গিন্নী, একদম খাঁটি কথা। এমন সোনার টুকরো ছেলে আজকালকার দিনে এই সমাজে খুব একটা কই পাওয়া যায় বলো? ছেলেটার নামে কোনোদিন কোনো বাজে কথা কিংবা কোনো অহংকারের কথা কখনো শুনিনি। যখনই টিভি খুলি, খবরে এই কারদার বংশের ছেলের নাম সব সময় প্রশংসায় সবার ওপরেই থাকে।”
সাত্তার মাস্টার বেশ তৃপ্তির একখানা নিশ্বাস ফেলে সায় দিলেন।আলেয়া বানু এবার টিভির দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে কী যেন ভেবে বলে উঠলেন,
“আমাদের মেঘের কপালে যদি এমন একটা সুযোগ্য আর হীরের টুকরো ছেলের সাথে বিয়ে লেখা থাকত, তবে আমি মা হিসেবে অন্তত মরেও শান্তি পেতাম গো!”
সাত্তার মাস্টার মৃদু হেসে ওপরের দিকে হাত তুলে বললেন,
“সবই আল্লাহর ইচ্ছা, আল্লাহ ভরসা!”
ওদিকে ঘরের কোণায় বসে নিজের বাবা-মায়ের এমন অবলীলায় করা কথাবার্তা শুনে মেঘ ভেতরে ভেতরে পুরো হা করে তাকিয়ে রইল ওনাদের দিকে। ওর মনের ভেতর তখন একঝাঁক প্রজাপতি যেন একযোগে ডানা ঝাপটাতে লাগল। ও মনে মনে নিজেকেই ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল,
‘আরে! তোমরা যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে আছ, বিয়ে তো আমার অলরেডি এই পাথর মানব, এই বজ্জাত মেজরের সাথেই হয়ে গেছে! তোমরাই খালি এই অলিখিত সত্যটা জানো না। আহা, আমার কী কপাল! বাবা-মাও শেষমেশ ঘরের কোণের এই চুচু বেড়ালটাকেই নিজেদের জামাই হিসেবে মনে মনে পছন্দ করে বসল!’
নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝেও টিভির সেই উজ্জ্বল পর্দার দিকে তাকাতেই হুট করে মেঘের ওই লালচে হয়ে থাকা চোখের তারায় এক অদ্ভুত ও মায়াবী প্রশান্তি ভর করল। টিভিতে তখন একের পর এক ভাসছে সাতকানিয়ার বুক চিরে স্পিডবোট নিয়ে ঝড়-বৃষ্টির মাঝে ছুটে চলা মেজর শীর্ষ কারদারের লাইভ উদ্ধারের চমৎকার সব ভিডিও ক্লিপ। সেই সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে ভাসছে মেজরের অতীতের বিভিন্ন সফল ও দুর্ধর্ষ মিশনের নিখুঁত বর্ণনা আর ছোট ছোট বীরত্বগাথার ক্লিপ। স্ক্রিনের ওপাশ থেকে নারী সাংবাদিক অত্যন্ত স্পষ্ট ও গম্ভীর কণ্ঠে পাঠ করে চলেছেন—
“রামু বায়া পিলগ্রিম্স তথা রামু জোন ও ১০ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত মেজর শীর্ষ কারদারের এই জাতীয় দুর্যোগে যে অবদান, তা কোনোদিন ভোলার মতো নয়। তিনি যেমন রণক্ষেত্রে সাহসী, তেমনই তীক্ষ্ণ ও প্রখর বুদ্ধির অধিকারী। তারই সুযোগ্য আন্ডারে ইদানীং সফল হয়েছে দেশের অনেক বড় বড় কাউন্টার-টেরোরিজম মিশন। যার একছত্র মানবিক দৃশ্য আজ আমরা এই সাতকানিয়ার প্রলয়ঙ্কারী বন্যায় আশ্রয়হীন, নিঃস্ব মানুষদের দিকে ওনার বাড়িয়ে দেওয়া নিপুণ সাহায্যের হাত দেখেই স্পষ্ট বুঝতে পারছি। যদিও দেশের যেকোনো চরম দুর্যোগে সরকার কর্তৃক সেনাবাহিনী মোতায়েন করাটা এক প্রকার চিরাচরিত নিয়ম, এরপরও ওখানকার প্লাবিত অঞ্চলের অসহায় মানুষগুলোর সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল যেন একা মেজর কারদারই নিজের শক্ত কাঁধে বহন করছেন! তার চোখের তীক্ষ্ণ ও মায়াবী ভাষার দিকে তাকালেই দেশের প্রতি ওনার সেই অগাধ ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ প্রকাশ পাচ্ছে।”
টিভি স্ক্রিনে খবর পাঠের পাশাপাশি বানের জলের সেই তোড় চিরে স্পিডবোটে করে ওই রূপবতী মেয়েটিকে উদ্ধার করার রুদ্ধশ্বাস দৃশ্যটাও বিশদভাবে দেখানো হতে লাগল। আর ঠিক তখনই সোফার কোণায় বসে থাকা মেঘের চোখের মণি দুটো রাগে আর অভিমানে ছোট ছোট হয়ে এলো। সে বড্ড তীক্ষ্ণ ও সন্দিহান চোখে টিভির পর্দার দিকে চেয়ে রইল যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মেয়েটিকে বোটের ওপর টেনে তোলার সুবিধার্থে শীর্ষ আর মেয়েটার হস্তযুগল একে অপরকে বড্ড শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে!
দৃশ্যটা দেখামাত্রই মেঘের বুকের ভেতরটা যেন কেমন এক অচেনা কামড়ে ওলটপালট হয়ে গেল। কেউ যেন ওর নরম বুকে কামারশালা খুলে সপাটে হাতুড়ি পেটাচ্ছে! অবচেতন মনে বিন্দু বিন্দু তীব্র হিংসে আর বিষাক্ত এক অভিমান জমতে লাগল ওর ছোট্ট মনে। নিজের অজান্তেই দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে মনে মনে গজগজ করে উঠল ও,
‘একেবারে বেদ্দপ ব্যাটা একটা! দেখ দেখ, দুনিয়ার মানুষ থাকতে ওই মেয়েটার হাতটা ঠিক কীভাবে নিজের মরদ হাত দিয়ে ধরে রেখেছে! হুহ, ও হাত আর বেশিদিন ভালো থাকবে না কইলাম! আসবে তো একবার আমার কাছে, দেখাবো মজা–হুহ!’
নিজের অবাধ্য মনকে শান্ত করতে না পেরে মেঘ আবারও আলতো করে তাকাল টিভির সেই রঙিন পর্দার দিকে। স্ক্রিনে তখন ভেসে উঠেছে উদ্ধারকাজ শেষ করা জাঁদরেল মেজর শীর্ষ কারদারের একখানা ক্লোজ-আপ গম্ভীর ছবি। মানুষ যে ওমন পাথুরে, গম্ভীর আর রুক্ষ মুখেও কাউকে এক নিমেষে এতটা ভালোবাসতে পারে, কাউকে নিজের চোখের মণি বানিয়ে ফেলতে পারে তা এই খিটখিটে মেজর সাহেবকে সামনাসামনি না দেখলে মেঘ হয়তো কোনোদিন নিজের এই কাঁচা বয়সে বুঝতেই পারত না।
সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের মাঝে মেঘের অবচেতন মনে হঠাৎই ধক করে ভেসে উঠল এক মায়াবী, অলৌকিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যপট,
চারপাশটা নিঝুম, কোনো এক নির্জন মেঠো রাস্তায় একাকী জোছনার আলোয় একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রূপকথার মতো কাপল ডান্স করছে মেঘ আর শীর্ষ! ধোঁয়াটে কুয়াশার ওপার হতে অলক্ষ্যে মৃদু সুরে বেজে চলেছে সেই চেনা মায়াবী গান,
“জানে কাব মেরি নিন্দ উডি,
সোয়ী সোয়ী রাঁতোগ মে…
জানে কাব মেরা হাথ গায়া,
সোনেয়া তেরে হাথোগ মে, আও…”
গানের প্রতিটি তালের সাথে তাল মিলিয়ে শীর্ষ অত্যন্ত আলতো করে মেঘের একখানা হাত ধরে ওকে এক চক্কর ঘুরিয়ে এনে এক ঝটকায় টেনে নেয় নিজের চওড়া ও তপ্ত বুকের একদম কাছে। মেঘের সেই শ্যামলা ও নরম কায়ার কোমরটা নিজের শক্ত দু-হাতে বেঁধে শীর্ষ ওকে এক লহমায় শূন্যে উঁচু করে পরম আবেশে ঘোরাতে থাকে উন্মুক্ত গগনের নিম্নে। শীতের রজনীর গগনটা যেন আজ সেজেছে এক অন্যরকম ভালোবাসার চাদরে। আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে মৃদুমন্দ শ্বেত শুভ্র তুষার কণা! সেই বরফছোঁয়া শীতলতার মাঝেই মেজরের বুকের ওমে লেপ্টে থাকে মেঘ, আর আবারও ব্যাকগ্রাউন্ডে ভেসে আসে সে গানের অন্তরা,
“চাল বাধতে তেরি ওর,
ম্যায় জাব ভি কাদাম উথাতি হুঁ…
জাউ তুঝসে দূর দূর,
তো পাস তেরে আ জাতি হুঁ…”
মেজর কারদার পর্ব ১৯
কাল্পনিক সেই ভালোবাসার ঘূর্ণিপাকে সতেরো বছরের মেঘের পুরো দুনিয়াটা যেন দুলতে থাকে, পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যায় এক লহমায়। কল্পনার সেই গভীর ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরতেই মেঘ নিজের অজান্তেই ঠোঁট কামড়ে, মৃদু ও অস্ফুট শব্দ করে একা একাই বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
“মানুষটা তো হুট করে এসে আমার পুরো মস্তিষ্কে গেড়ে বসেছে। কিন্তু কে জানে মনের অজান্তেই কবে যেন আমার এই ছোট্ট মনটাতেও তার স্থায়ী প্রবেশ ঘটে গেছে!”
