মেজর কারদার পর্ব ৬
ফিনারা ঝুমুর
ভোর হয়েছে। রাতের ম্লান চাঁদ দিগন্তে বিলীন হয়ে আকাশে ডানা মেলেছে লাল-কমলা সূর্যের আভা। পাখির কিচিরমিচিরে কারদার বাড়ির নিস্তব্ধতা ভাঙতেই মেঘের চোখ থেকে ঘুমের ঘোর পুরোপুরি ছুটে গেল। আদো-আদো চোখ খুলে সে বিছানায় তাকাল। নিজের নরম হাতের ওপর একটা বড়, লোমশ আর উষ্ণ পুরুষালী হাতের অস্তিত্ব টের পেয়েও এবার সে এতটুকু ঘাবড়ালো না বা চিৎকার জুড়ল না। কারণ অবচেতন মনেই সে খুব ভালো করে জানে, এই পরম নিরাপদ হাতটি কার।
সে ধীরে ধীরে শোয়া থেকে উঠে বসল। তার হাতের সামান্য নড়াচড়ার মাঝেই হাতটির মালিকের ঘুম ভেঙে গেল। মেঘকে ওভাবে বিছানায় উঠে বসে থাকতে দেখে সাত্তার মাস্টার ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। অত্যন্ত চিন্তিত আর ব্যাকুল মুখে মেয়ের কপালে হাত দিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“এখন কেমন লাগছে তোর, মা? শরীরটা ঠিক আছে তো?”
মেঘ তার বাবার মুখের সেই চিরচেনা ভয়ার্ত আর মলিন ভাবটা দেখে এক চিলতে মায়াবী হাসি হাসল। বাবার শক্ত বাহুটা দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে সেখানটায় নিজের মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“ওহ আব্বু! আমি একদম ঠিক আছি। তুমি শুধু শুধু এতো চিন্তা করো না তো!”
মুখে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে সে বাবাকে ভোলানোর এক আপ্রাণ প্রয়াস চালাল, যাতে বাবা রাতের ওই ঝড়ের কথা ভুলে যান।
সাত্তার মাস্টার মেয়ের মাথায় আলতো করে চুমু খেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“তুই যে আমার মা রে! তোরে এভাবে ছটফট করতে দেখলে এই বুড়ো বাপের চিন্তা তো হবেই।”
মেঘ এবার একটু গাল ফুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“জানি জানি! আমি তোমার মরহুমা আম্মাজান ‘হুররাম আরা’র হুবহু কার্বনকপি তো, তাই তো তোমার এতো পিরিত আমার লাইগা! হুহ!”
বাবার সাথে মেঘের সম্পর্কটা ঠিক চিরাচরিত বাবা-মেয়ের মতো গম্ভীর নয়, বরং একদম বন্ধুর মতো। মেয়ের মুখে নিজের মায়ের নাম আর এই রসাত্মক কথা শুনে সাত্তার মাস্টার নিজের সব কষ্ট ভুলে হো হো করে হেসে উঠলেন।
ঠিক তখনই দরজার পর্দা ঠেলে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন আলেয়া বানু। সারারাত চোখের পাতা এক করতে না পারার ক্লান্তির ছাপ এই দুই মধ্যবয়সী মানুষের চেহারায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মেঘ তার মাকে দেখেই একটু হেসে পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বললেন,
“দেখো আম্মা, তোমার মাইয়া কিন্তু একদম ঠিক অইয়া গেছে গা! হেহে!”
কিন্তু মেঘের ওই হাসিমুখ দেখেও আলেয়া বানুর মনের ভেতরের চিন্তার রেশটুকু কাটল না। তিনি গম্ভীর মুখে চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে মেয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। মায়ের এমন থমথমে ভাব দেখে মেঘ আবার বাবার দিকে চেয়ে একটু চাতুর্যের সুরে বলল,
“দেখছ আব্বা? মোরে সুস্থ দেইখা তোমার আদরের আলো কেমন গোমড়া মুখ কইরা রইছে! মনে কইতাসি আমারে সুস্থ দেইখা উনি একটুও খুশি অয় নাই!”
মেয়ের এমন উল্টো কথার খোঁচা খেয়ে আলেয়া বানু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বরাবরের মতোই খেঁকিয়ে উঠে বললেন,
“এই বেদ্দপ মাইয়া, একদম চুপ থাকবি! আমি মরতাসি নিজের জ্বালায়, আর এই মাইয়া আইসে মোরে খোঁচা দিতে! এই আরু এই, তুই আমারে এতো জ্বালাস কেন রে? আমারে কি তোর মানুষ মনে হয় না? তোর এই পাগলামি আর চিন্তায় চিন্তায় আমি কবে জানি স্ট্রোক করে মরি!”
মায়ের এই কঠিন শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীব্র ভয় আর ভালোবাসাটা এবার মেঘের মনকে ছুঁয়ে গেল। সে মায়ের দিকে ছলছল নয়নে তাকিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলল,
“এইডি কী কও আম্মা? আর মুখ দিয়া এমন কথা কইও না। তুমি, আব্বা আর দুই ভাই ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কেডায় আছে বলো?”
মায়ের দিকে চেয়ে মেঘের চোখ দুটো এবার অশ্রুতে ভরে উঠল। মেয়ের চোখের সেই টলমলে পানি আর কান্নামুখ দেখে সাত্তার মাস্টার আর আলেয়া বানুর কলিজা যেন এক মুহূর্তে ছলাৎ করে উঠল। মেয়ের কান্না সহ্য করার ক্ষমতা তো কোনো বাবা-মায়েরই থাকে না।সাত্তার মাস্টার এবার বউকে ধমক দিয়ে বললেন,
“তুমি এবার চুপ করো তো আলো! মেয়েটা মাত্র সুস্থ হলো, ওরে আর কথা শোনায়া কাঁদিও না।”
মেঘ বাবার বুকে নিজের মাথাটা আরও শক্ত করে এলিয়ে দিয়ে চুপ করে রইল। সাত্তার মাস্টার পরম মমতায় মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। আর ওদিকে আলেয়া বানুও নিজের সব রাগ-ক্ষোভ ভুলে গিয়ে ধীরপায়ে মেঘের একদম কাছে এসে বিছানায় বসলেন। তারপর নিজের দুই হাতের শক্ত বাঁধনে মেয়েকে বুকের মাঝে আগলে নিলেন।
মা-বাবার এই অব্যক্ত, নিঃশর্ত আর আগলে রাখার নিখাদ ভালোবাসা টের পেয়ে মেঘের ঠোঁটের কোণে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। তার ভাঙা মনটা যেন এক মুহূর্তে একরাশ শান্তিতে ভরে গেল। পৃথিবীর সব ঝড়ঝাপটা যেন এই একটি ঘরের ভেতরের ভালোবাসার কাছে এসে এক নিমেষে হেরে গেল।
কারদার বাড়ির সুইমিংপুলের পাশে সকালের মিষ্টি রোদে একহাতে ভর দিয়ে পুশ-আপ করছে শীর্ষ। কেবল একটা ব্ল্যাক সুইমিং প্যান্ট পরা, তার সুগঠিত ও চওড়া অনাবৃত শরীর জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম চকচক করছে। প্রতিবার নিচে নামা আর ওপরে ওঠার সাথে সাথে বুকের আর বাহুর পেশিগুলো যেন ফুঁটে ফুঁটে উঠছে। বাংলাদেশ আর্মির সেই কঠিন ও কঠোর ট্রেনিংয়ের জীবন্ত ফল এই নিখুঁত মাসল আর বডি। একের পর এক ডিশেম-ডিশেম স্টাইলে এক হাতে পুশ-আপ করতে থাকা শীর্ষকে এই মুহূর্তে দেখতে এতটাই মারাত্মক আর আকর্ষণীয় লাগছে যে যেকোনো মেয়ের বুকে ঝড় উঠতে বাধ্য।
এদিকে, দোতলার রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দার রেলিংয়ে থুতনি ঠেকিয়ে এই পুরো এক্সারসাইজ পর্ব গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিল মেঘ। শীর্ষর সেই অবিশ্বাস্য পুরুষালী বডি দেখে তার চোখের সামনে যেন সত্যি সত্যি হলুদ শর্ষে ফুল ফুটতে শুরু করেছে! কী বডি মাইরি!মেঘ হা হয়ে তাকিয়ে থেকে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“ইশ! কি মারাত্মক বডি রে বাবা! না জানি ওনার বউ ওনাকে কিভাবে সামলাবে। ওনাকে সামলাতে যেয়ে না জানি তার বউটাই মরে!”
কথাটা মুখ দিয়ে বের হতেই মেঘ নিজের জিভে কামড় দিয়ে বসল। ধুর, কীসব আজগুবি আর নোংরা চিন্তা মাথায় আসছে! সে নিজের মাথায় একটা চাটি মেরে নিজেকেই নিজে কড়া শাসনে বলল,
“লুইচ্চা ছেমড়ি! সাতসকালে কার কী দেহোস তুই? ওই খিটখিটে বেডায় যদি একবার জানতে পারে তুই ওনারে এইভাবে গিলতাসস, তবে তোরে জ্যান্ত মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে! চোখ আর জবান সামলা মেঘ!”
চটপট ঘরের দিকে চলে যাওয়ার জন্য সে যেই না ঘুরবে, অমনি তার চোখ গিয়ে আটকালো নিচে সুইমিংপুলের একদম কাছে থাকা এক তরুণীর দিকে। মেঘ দেখল, একটা মেয়ে পুলের পাশে দাঁড়িয়ে শীর্ষর ওই সুঠাম শরীরের দিকে কেমন যেন লোলুপ আর হাঁ করা চোখে তাকিয়ে আছে।মেয়ের এমন চাতুর্য দেখে মেঘের ভেতরটা হুট করে জ্বলে উঠল। সে মুখ বাঁকিয়ে মনে মনে বলল,
“শা*লী লুচু কোথাকার! কেমনে লালসা মাখা চোখে ব্যাডারে গিলতাছে দেহো! মাগার মাইয়াডা হের মামাতো বোইন সূচি না সুজি জানিওই নাক-উঁচু মেয়েটা না?”
মেঘ নিজের চোখ দুটো ভালো করে রগড়ে ডলে আবার তাকাল। না, ওর চোখ একদম ঠিক দেখেছে! মেয়েটা আর কেউ নয়, গতকালের সেই ছাদের আড্ডায় রূপের বড়াই করা সূচি। সে এক হাত গালে দিয়ে শীর্ষর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন এখনই পুলের পানিতে ঝাঁপ দেবে।
মেঘ এবার আর নিজের বিরক্তি লুকাতে পারল না। বারান্দা থেকেই নাক কুঁচকে অস্ফুট স্বরে বলল,
“বেদ্দপ ছেড়ি একটা! ঘরে ভাই-বোন নাই? সকাল সকাল বেডার বডি দেখতে আইছে!”
মেঘ খট করে বারান্দার দরজাটা টেনে ঘরের ভেতর ঢুকে যেতেই, ওদিকে নিচে এক ঝটকায় সুইমিংপুলের নীল পানিতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল শীর্ষ। পুলের পানিতে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে সে এক চিলতে শয়তানি হাসি হাসল। আসলে শীর্ষ অনেক আগেই টের পেয়েছিল যে ওপর থেকে কেউ একজন তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, আর সেই ‘কেউ একজন’ যে স্বয়ং মেঘালয়া তাও সে আড়চোখে দেখে নিয়েছে। মেঘকে ইমপ্রেস করার জন্যই মূলত সে এতক্ষণ ধরে এক হাতে পুশ-আপ করার কঠিন ভংগিমা নিচ্ছিল, যাতে তার সিক্স প্যাক বডিটা মেঘ ভালো করে দেখতে পায় এবং তার রূপের মোহে পড়ে! সূচি যে সেখানে দাঁড়িয়ে লালা ঝরাচ্ছিল, সেদিকে মেজরের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপও ছিল না।পুলের পানি হাত দিয়ে সরিয়ে ওপরে তাকিয়ে শীর্ষ মনে মনে এক চরম তৃপ্তি নিয়ে বলল
“পাখি তুমি আকাশে যতই ওড়ো না কেন, তোমার আসল ঠিকানা কিন্তু ঘুরেফিরে এই শীর্ষ কারদারের মন-পাঁজরেই! আমি ব্যতীত আর কোনো পুরুষের দিকে চোখ তুলে তাকানোর ক্ষমতা তোমার নেই, সুইটহার্ট! হাহ!”
পুলের ঠান্ডা পানি থেকে এক ঝটকায় যখন শীর্ষ ওপরে উঠে এল, তখন তার অনাবৃত শরীর বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। সে হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে তোয়ালেটা নিয়ে যেই না নিজের চুলগুলো মুছতে যাবে, অমনি সূচি একদম গায়ে পড়া স্বভাব নিয়ে ওর ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। নিজের দুই হাত একসাথে জড়ো করে, এক গাল কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে সে বেশ আহ্লাদী গলায় বলে উঠল,
“অঙ্কন ভাইয়া! তোমার বডিটা সো এট্রাক্টিভ! একদম লাইক আ হোয়াইট বাটার! আমি –আমি কি তোমায় একটু ছুঁতে পারি?”
সূচির মুখে এমন নির্লজ্জ ও সস্তা কথা শুনে শীর্ষর ফর্সা কপালে মুহূর্তের মধ্যে বিরক্তির গভীর ভাঁজ পড়ে গেল। তার মন মেজাজ এক নিমেষে বিষিয়ে উঠল। সে তোয়ালে দিয়ে ঘাড়টা মুছতে মুছতে সূচির দিকে এক চরম ত্যাছড়া আর অবজ্ঞার চোখে তাকিয়ে অত্যন্ত কর্কশ গলায় উত্তর দিল,
“আমার ফিউচার বউ ব্যতীত আমায় ছোঁয়ার রাইট এই দুনিয়ায় আর কোনো নারীর নেই, সূচি। সো, তোরও থাকার প্রশ্নই ওঠে না। স্টে ব্যাক!”
সূচিকে একপ্রকার জঘন্যভাবে ইগনোর করে, তার মুখের ওপর একরাশ ঠান্ডা বাতাস ছুড়ে দিয়ে হনহন করে বাড়ির ভেতরে চলে গেল শীর্ষ। মেজরের এমন চরম অপমান আর অবহেলা দেখে সূচি রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে নিজের দুই হাত জোরে একটা ঝাড়া দিয়ে, দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“তোমার ওই অহঙ্কারী মুখের বউ তো আমিই হবো অঙ্কন ভাই, দেখে নিও! ফুফিমণি নিজের মুখে তোমার সাথেই আমার বিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে। এই কারদার বাড়ির বড় বউ আমিই হবো। তুমি শুধু আর শুধুমাত্র আমার!”
সূচিও পা দাপিয়ে, রেগেমেগে ভেজা লন পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
এদিকে বাড়ির ভেতরে তখন সকালের নাস্তার টেবিলে এক রাজকীয় আসর বসেছে। মস্ত বড় ডাইনিং টেবিল জুড়ে লুচি, আলুর দম, সুজি আর ডিম পোচের ছড়াছড়ি। পিংকি আর জুবায়ের কারদারের স্ত্রী শিউলি বেগম দুজনে মিলে বেশ হাসিমুখে সবাইকে গরম গরম নাস্তা সার্ভ করছেন। টেবিলে নোমান, অভ্র, আদর, রাহাত আর মেঘও বসেছে।খাওয়ার মাঝেই জুবায়ের কারদার সাত্তার মাস্টারের দিকে তাকিয়ে বেশ আন্তরিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“তা সাত্তার ভাই, আপনার খুলনার স্কুল কেমন যাচ্ছে?”
জুবায়ের কারদারের এমন আপনত্বের প্রশ্নে সাত্তার মাস্টার মুখের খাবার গিলে এক গাল অমায়িক হেসে উত্তর দিলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, আপনার দোয়ায় বেশ ভালোই যাচ্ছে ভাই সাহেব। তবে পরশু থেকে তো আমার স্কুলের ছুটি শেষ, তাই ভাবছি আজ রাতের বাসেই সপরিবারে খুলনায় ফিরে যাবো।”
সাত্তার মাস্টারের এই আকস্মিক প্রস্থানের কথা শোনামাত্রই ডাইনিং টেবিলের এক কোণে বসা মেঘের ওড়না গোছানোর হাতটা থমকে গেল। আর ঠিক তখনই পিংকি বেগম হাতের ডিশটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বেশ অবাক হয়ে বলে উঠলেন,
“সেকি দুলাভাই! আর কিছুদিন থাকবেন না? মাত্র তো বিয়েটা শেষ হলো, বাড়িটা একটু ফাঁকা হতেই আপনারা চলে যাবেন?”
পিংকির কথায় সাত্তার মাস্টার উত্তর দেওয়ার বদলে আলেয়া বানুই মুখ খুললেন। তিনি চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন,
“না রে পিংকি, আর একদম দেরি করা যাবে না। সামনেই তো মেঘের ফাইনাল পরীক্ষা। এখানে আর বেশি দিন থাকলে ওর পড়ার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।”
“তবুও আর কটা দিন থেকে যেতেন আপা! বাড়িটা তো এক্কেবারে ফাঁকা হয়ে যাবে,”
শিউলি বেগমের এমন আকুতিভরা কথায় আলেয়া বানু একটু মৃদু হাসলেন।
“তা কি হয় আপা? নিজের ঘর-বাড়ি ফেলে আর কতদিনই বা এভাবে অন্যের বাড়িতে থাকা যায় বলো?”
শিউলি বেগমও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“তাও ঠিক।”
আজ রাতেই মেঘেরা সপরিবারে খুলনায় চলে যাবে শুনে ডাইনিং টেবিলের সবার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। শুধু একজন ছাড়া সে হলো সূচি। সে যেন মনে মনে এটাই চাইছিল যে এই ‘কালো’ মেয়েটা যত দ্রুত সম্ভব কারদার বাড়ি থেকে বিদায় হোক। নাস্তা শেষ করে একে একে সবাই টেবিল ছেড়ে যে যার মতো চলে গেল।
দুপুরের দিকে কারদার বাড়ির বিশাল ছাদবাগানে একা একা দাঁড়িয়ে আছে মেঘ। ছাদের রেলিংটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে বাইরের মনোরম আবহাওয়া আর গাছপালার দুলুনি দেখছিল ও।প্রকৃতির এই শান্ত রূপ দেখার মাঝেই হঠাৎ করে ওর কানের খুব কাছে এক গম্ভীর কিন্তু চেনা পুরুষালী কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“সুইটহার্ট! খেলাটা যে শেষ হলো না!”
শীর্ষর এমন আচমকা কথা শুনে মেঘ তীব্রভাবে চমকে উঠে ছিটকে পেছনে তাকাল। দেখল, ছাদের দরজার ফ্রেমের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে পকেটে হাত পুরে দাঁড়িয়ে আছে শীর্ষ। তার চোখে এক অদ্ভুত চাতুর্য আর নেশা।মেঘ নিজের ওড়নাটা টেনেটুনে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আড়ষ্ট গলায় বলল,
“দুঃখিত আমি। ওটা আসলে ফ্রেন্ডদের সাথে বাজি ধরে জাস্ট একটা ফান করেছিলাম।”
মেঘের এমন হালকা উত্তর শুনে শীর্ষর ঠোঁটের কোণে এক বিপজ্জনক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এল মেঘের দিকে। এসে একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। তারপর মেঘের মুখের দিকে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ফান করে নিজের হ*ট পিক কোনো অচেনা পুরুষকে দেওয়া কেমন নীতি, শুনি? তোমার এই দুধে-আলতা কায়াটা কি এতটাই ফেলনা?”
শীর্ষর এভাবে আচমকা ঝুঁকে পড়া দেখে মেঘ ভয়ে আর লজ্জায় সিঁটিয়ে গিয়ে রেলিংয়ের সাথে চিপকে গেল। কিন্তু শীর্ষ তাকে পালানোর কোনো সুযোগই দিল না। সে মেঘের দুই পাশে দুই হাত দিয়ে রেলিংটা চেপে ধরল, যা একপ্রকার মেঘকে তার বাহুডোরে বন্দি করে ফেলা। সে সরাসরি মেঘের চোখের গভীরে চোখ রাখল।মেঘ ভয়ে ঢোক গিলে চোখ সরিয়ে নিয়ে আমতা-আমতা করে বলল,
“আসলে—শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে এমন ভুল হয়ে গেছে।”
“কিন্তু আমার তো সেই ভুলটা বেশ ভালো লেগেছে সুইটহার্ট! এখন তো মন চাচ্ছে আরও দেখি! ক্যান আই সি ইও–”
শীর্ষর মুখের বাকি কথাটুকু আর সম্পূর্ণ হতে দিল না মেঘ। সে বিপদ টের পেয়ে ঝট করে নিজের শ্যামবর্ণ কোমল হাতটা দিয়ে শীর্ষর ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল। ভয়ে তার পুরো শরীর কাঁপছে। সে তোতলিয়ে তোতলিয়ে আকুতিভরা গলায় বলল,
“এসব কথা প্লিজ আর মুখেও আনবে না। ওসব ভাবলে নিজের কাছেই নিজেকে বড্ড ছোট ছোট লাগে।”
শীর্ষ কথা বলা বন্ধ করে মেঘের দিকে অপলক চেয়ে রইল। মেঘের হাতের তালুর নরম স্পর্শ তার ঠোঁটে লাগতেই তার ভেতরের পুরুষটা যেন কেঁপে উঠল। মেঘের এই ভয়ার্ত চাহনি, তিরতির করে কাঁপতে থাকা গোলাপী ঠোঁট আর ঘন চোখের পাতার ঝাপটানো দেখে শীর্ষর বুকের ভেতরের হার্টবিট এক ধাক্কায় শতগুণ ফাস্ট হয়ে গেল। তার মনে হতে লাগল, হৃদপিণ্ডটা বুঝি এখনই বুক চিরে বাইরে বেরিয়ে পড়বে।শীর্ষ মেঘের মায়াবী মুখের দিকে চেয়ে মনে মনে এক তীব্র হাহাকার নিয়ে ভাবল,
মেজর কারদার পর্ব ৫
“এভাবে আমার দিকে তাকাস না জান! আমি মরেই যাবো তোর এই অবুঝ চাহনিতে। তোর এই মায়ার আগুনে আমি পুড়ে এক্কেবারে অঙ্গার হয়ে যাবো! উফফফ!”
শীর্ষ যখন মেঘের নেশায় মনে মনে বিভোর, ঠিক তখনই সেই রোমান্টিক পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে ছাদের দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল কারও এক তীব্র, রাগান্বিত আর চাপা আর্তনাদ,
“অঙ্কনন্নন!”
