Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১
ফারহানা নিঝুম

নিজের সৎ বোনের বিয়েতে গিয়ে নিজেরই বিয়ে হয়ে গেছে জুঁইয়ের। বিয়ের ঠিক কিছুক্ষণ আগেই প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট হাতে এসে দাঁড়ালো জুঁইয়ের সৎ বোন পিহু। এতগুলো মানুষের সামনে এভাবে নিজের কুকর্মের কথা বলেই চলেছে পিহু।
“আমি এই বিয়ে মোটেও করতে পারব না বাবা। আমি মা হতে চলেছি!”
বাক্য শেষ করা মাত্রাই দাবাং হাতের থাপ্পড় পড়ল পিহুর গালে। রাগে দপদপ করে জ্বলছেন আজগর চৌধুরী। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে ওনার।
“ছিহ্,তোর একটুও লজ্জা করছেনা পিহু? এভাবে সকলের সামনে আমার মাথা হেট করে দিতে একটুও লজ্জা করছেনা?”
পিহু মুখের উপর ঠাস করে বলল,
“না করছেনা।”

আজগর চৌধুরী বুঝতে পারছেন না কি করবেন? এমন সময় চোখে পড়ে উনার প্রথম পক্ষের মেয়ে জুঁইকে। জুঁইকে আলাদাভাবে ডেকে বিয়ের জন্য রাজী করায়। জুঁই নাকচ করলে হুমকি ধামকি দিয়েই শেষমেশ বাধ্য করে বিয়েতে রাজি হতে।
পাত্রপক্ষ প্রথম থেকেই ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন পিহুর কর্মকাণ্ড নিয়ে,তার উপর বিয়ের আগ মূহুর্তে এমন খবর শুনে পাত্রের মামুনি জেসমিন বাদশাহ রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।
ধৈর্যশীল জেসমিন বাদশাহ আজগর চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বললেন,
“এসব কি হচ্ছে , চৌধুরী সাহেব? আমার ছেলের বিয়ে নিয়ে ছেলেখেলা করছেন আপনারা? কখনো আপনার বড় মেয়ে তো কখনো ছোট মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইছেন?”
আজগর চৌধুরী কোলকিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না কি করবেন! বিয়েতে যেনো রীতিমতো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এতবড় পরিবারের সাথে বড় মেয়ের বিয়ে হচ্ছিল বলে তিনি কতই না খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু মেয়েটা সবকিছু পন্ড করে দিয়েছে। বাদশাহ পরিবার মতো এত বড় পরিবার এখন সহজে পাওয়া যায়না। যেমন নাম ঠিক তেমনি প্রতিপত্তি।
আজগর চৌধুরী অনুনয় করে বললেন,

“দেখুন আপা আমি সত্যি জানতাম না ওই মেয়ে এভাবে সকলের সামনে আমার নাক কাটবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার ছোট মেয়ে এমন নয়। আপনারা একটিবার ওর কথাটা ভেবে দেখুন।”
জেসমিন বাদশাহ কিছুতেই বিষয়টা মেনে নিতে চাইছেন না। কিন্তু জুঁইয়ের সাথে কথা বলার পর কি ভেবে যেনো রাজী হয়েছেন।
বিয়ের ঠিক আগ মূহুর্তে নতুন বরের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে জুঁই কে। আলাদাভাবে দুজনকেই কথা বলার জন্য অনুরোধ করা হয়।
জুঁই যেনো একটা জলজ্যান্ত কাঠের পুতুল। তাকে যেভাবে নাচানো হচ্ছে, সে সেভাবেই নেচে চলেছে।
“আমাকে বিয়ে না করার রিজন?”

গুরুগম্ভীর কন্ঠে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো আব্রাহাম বাদশাহ । সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে লোকটা। তার ওই হ্যাজেল চোখের দিকে তাকাতে পারছেনা জুঁই। কাঁচুমাচু মুখ করে নত মস্তকে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটাকে দেখতে যতটা স্বভাবিক বলে মনে হচ্ছে আসলে সে ততটা স্বভাবিক নয়। জুঁই অস্বস্তি অনুভব করছে। একটা মানুষের দৃষ্টি কতটা প্রখর হতে পারে এই লোকটাকে না দেখলে জানতে পারত না জুঁই।
দুহাত বারবার একে অপরের সাথে ঘষে চলেছে মেয়েটা। সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ভেতরের অস্বস্তি চাপানোর।
হাতের কব্জিতে ঝুলতে থাকা ঘড়িটায় দ্বিতীয় বারের মতো দৃষ্টি বুলিয়ে আবারো একই প্রশ্ন বলে ওঠে আব্রাহাম বাদশাহ,

“আমাকে বিয়ে না করার রিজন?”
জুঁইয়ের কণ্ঠে অনীহার শীতলতা স্পষ্ট, যেন শুষ্ক হাওয়ায় ভেসে আসা কোনো নিঃশব্দ প্রত্যাখ্যান,
“আমার আপনাকে পছন্দ নয়। আমি আপনাকে চিনি না ঠিকমত।”
কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে নিল, অথচ তার বুকের ভেতরটা অকারণে ধুকপুক করছে। সামনে বসে থাকা আব্রাহাম বাদশাহ উপস্থিতি যেন চারপাশের সবকিছু কেমন গা ছমছমে করে তুলেছে।
আব্রাহামের ঠোঁটের কোণে একটুখানি বাঁকা হাসি টেনে ধীরস্বরে বলল,
“কিন্তু আমার তোমাকে পছন্দ হয়েছে। সেকেন্ড রিজন?”
কথাগুলো ছিল শান্ত, অথচ তার ভেতরে ছিল এক অদৃশ্য দৃঢ়তা যেন প্রত্যাখ্যান তার অভিধানে নেই। সে প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে অভ্যস্ত নয়। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে সে এই প্রত্যাখ্যান মোটেও বরদাস্ত করবে না।
জুঁই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আঙুলের ডগা দিয়ে ওড়নার কিনারা মুচড়াতে মুচড়াতে কণ্ঠে জড়তা নিয়ে বলল,

“আ… আপনি আমার থেকে অনেক বড়।”
এই সরল স্বীকারোক্তি যেন আব্রাহামের কর্ণকুহরে গিয়ে অদ্ভুত এক ঝঙ্কার তোলে। তার হ্যাজেল চোখদুটি মুহূর্তে সংকুচিত হয়ে এলো গভীর, তীক্ষ্ণ, অনমনীয়।
হিমশীতল ,অদ্ভুত মাদকতাময় কণ্ঠে সে উচ্চারণ করল,
“বড় মানুষ, বেশি বেশি ভালোবাসব। নেক্সট?”
কথাগুলো যেন শুধু উত্তর নয় একটি ঘোষণা। এই আব্রাহাম বাদশাহ ঘোষণা করে দিয়েছে সে জুঁইকেই বিয়ে করবে। এমন স্পষ্ট, নির্ভীক জবাবে জুঁইয়ের গাল লালচে আভায় রাঙা হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, তার ভেতরের সব লজ্জা যেন হঠাৎ চিবুকে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। চোখ তুলে তাকানোর সাহস হচ্ছিল না, অথচ না তাকিয়েও সে অনুভব করছিল আব্রাহামের দৃষ্টি তার উপর স্থির, অবিচল। আব্রাহামের ওমন অকপটে বলা নির্লজ্জ কথাখানা কোনো মতেই সহ্য করতে পারল না মেয়েটা।
অবশেষে, অজানা এক দুঃসাহসে ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে গেল,
“আপনি ভীষণ নির্লজ্জ।”
আব্রাহাম বাদশাহ ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। আঙুলের ডগা দিয়ে গাল চুলকে একরকম রহস্যময়, হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলল ঠোঁটে। সেই হাসিতে ছিল একটুখানি দুষ্টামি, আর অদ্ভুত এক নির্ভীকতা। তারপর তীর্যক কন্ঠে বলে,

“ওসব লজ্জা বহন করা মেয়েদের কাজ, আমি না হয় নির্লজ্জই ঠিক আছি।”
জুঁইয়ের হৃদস্পন্দন দ্রুততর হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল এই মানুষটা শুধু কথায় নয়, উপস্থিতিতেও ভীষণ প্রখর। তার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি নীরবতা সবকিছুতেই আছে এক অদ্ভুত টান, যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না, তবুও মেনে নেওয়াও সহজ নয়। ঘোর প্রতিবাদ জানায় সে,
“দেখুন, আমি আপনাকে সত্যি বিয়ে করতে চাইনা! আপনার আমার আপুর সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। এখন হঠাৎ আমার সাথে বিয়ে মানে? আপনি প্লিজ বাইরে গিয়ে সকলকে না করে দিন।”
এমন গুরুগম্ভীর লোককে বিয়ে করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই জুঁই। যে লোকটা সকলের উপর কর্তৃত্ব ফলিয়ে মজা পায় তার মতো মানুষকে জীবন সঙ্গী করবে? কখনো না!
আব্রাহাম দু’পা এগিয়ে এলো জুঁইয়ের দিকে। নিগূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল জুঁইয়ের লালচে মুখশ্রী।

“লিসেন তোমার বোন এমনিতেই আমাদের সাথে খুব বড় অন্যায় করেছে। আমরা চাইলেই তোমাদের উপর মানহানীর কেস করে দিতে পারি। তখন সকলকে জেলে যেতে হবে এত বড় ধোঁকা দেওয়ার জন্য। কিন্তু না সে আমরা করব না। তোমার বাবা অন্যকিছু চাইছেন। তুমি তোমার মতামত জানিয়েছো। আমিও শুনেছি। বাট সরি এখন কিছু করার নেই। আমি কিন্তু ‘না’ শুনতে মোটেও অভ্যস্ত নই। সো কিচ্ছু করার নেই।”
কথাটা বলে হনহনিয়ে প্রস্থান করল আব্রাহাম বাদশাহ।

সে যাওয়া মাত্রই আঁখিহতে টুপ করে একপ্রস্থ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে জুঁইয়ের। বুকের ভেতর ছলকে উঠে তার।
সত্যি কিচ্ছুটি করার নেই। শেষমেশ বিয়ে করতেই হলো তাকে। এই বিয়ের ভবিষ্যৎ কী? জুঁই জানেনা কিচ্ছুটি জানেনা।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২