Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২
ফারহানা নিঝুম

বিয়ের পর জুঁই আচম্বিতে কেঁদে উঠলো সকলের সামনে। যাবেনা বলে কতরকম টালবাহানা করে চলেছে। বারবার একই কথা আওড়াচ্ছে,
“যাবোনা। আমি যাবোনা।”
এই অনভিপ্রেত দৃশ্যে আজগর চৌধুরী ধৈর্য্যচুতি ঘটল। ক্রুদ্ধ অভিব্যক্তিতে তিনি জুঁইয়ের বাহু আঁকড়ে ধরলেন দৃঢ়ভাবে।‌ কটুভাবে উচ্চারিত করলেন,
“যাবিনা মানে কি হ্যাঁ?ওরা কতদূর থেকে এসেছে। ঐই শহর থেকে ওই শহর নয়, কোরিয়া থেকে এসেছে। ওনারা কি তোর জন্য বসে থাকবে? নাটক করছিস তুই?”

এই তীক্ষ্ণ তিরস্কারে জুঁইয়ের অন্তর্নীলে বেদনার স্রোত উথলে উঠল; সে অশ্রু বর্ষে ভেঙে পড়ল অথচ কেউ অন্তঃস্থ যন্ত্রনা কেউ উপলব্ধি করতে পারল না।
অপরদিকে জেসমিন বাদশাহ জুঁইয়ের জন্য অন্তর গভীর ভাবে সহানুভূতিতে সিক্ত অনুভব করছেন। পিহুর আকস্মিক সিদ্ধান্তের অভিঘাতে জুঁইয়ের এই করুণ পরিণতি এ কথা অনুধাবন করে তাঁর হৃদয় বিষণ্ণ হয়ে উঠল। জুঁইয়ের চাহনিতে ছিল এক অপার স্নিগ্ধতা ও নির্জন কোমলতা, যা সহজেই হৃদয় স্পর্শ করে।
নিজের বড় ছেলে আব্রাহাম বাদশাহর জন্য একটা বাঙালি মেয়ে চেয়েছিলেন জেসমিন বাদশাহ, ঘরোয়া সংসারি হবে। তবে যদি তার চাকরি বাকরি করার স্বপ্ন থাকে তাহলে সেটাও করতে পারবে। উনি নিজেও তো একজন বিজনেস ওয়ম্যান। একা হাতে সংসার, বিজনেস দুটোই সামলে এসেছেন।‌ ছেলের বউও না হয় এমনি করবে এই ধারণা থেকেই বাংলাদেশে ছেলের বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ইতিমধ্যেই পরিবারের বাকি সদস্যরা এসেছিল বিয়ে উপলক্ষে। শুধুমাত্র বাড়ির তিনজন সদস্য ছাড়া।
জেসমিন বাদশাহ আজগর চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বললেন,
“থাক চৌধুরী সাহেব, আপনি দয়া করে জোর করবেন না জুঁইকে। ও যদি আরো দু’দিন থাকতে চায় এখানে তাহলে থাকুক। আমাদের সমস্যা নেই।”
জুঁই জেসমিন বাদশাহর এমন উদারতা দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলো
সেদিন রাতের ফ্লাইটে বাড়ির বাকি সদস্যরা ফিরে যান। শুধু সে নয় আব্রাহাম বাদশাহ সেও ফিরে যায়। শুধু জেসমিন বাদশাহ বাদে। উনি থেকে গেছেন, একেবারে নতুন বউকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন বলে।

“তুই কি বিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজি জুঁই?”
পিহুর কথায় নাক টানল জুঁইয়ের। শ্বশুর বাড়ি থেকে রাতারাতি চৌধুরী বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে মেয়েটা। মাহিদ আর পিহু একে অপরকে আগে থেকেই ভালোবাসতো। তারা নাকি লুকিয়ে বিয়েও করে নিয়েছে। প্রেগন্যান্ট হওয়ার খবরটা দেওয়ার পরেই জুঁইয়ের বিয়েটা হয়ে যায়। তার বিয়ে হওয়া মাত্রই পিহু আজগর চৌধুরী কে সবকিছু খুলে বলে।
মাহিদ পিহুকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে উদগ্রীব হয়ে উঠে।‌ শেষমেশ বাধ্য হয়ে রাজী হন আজগর চৌধুরী।
জুঁই এখানে থাকবে শুনে দু’দিন পর আবারো ফিরে এলো পিহু।
শুধুমাত্র জুঁইয়ের জন্য। জুঁই বুঝে উঠতে পারেনা পিহু তাকে ভালোবাসে নাকি ঘৃণা করে! মেয়েটা কখনো ভালোবাসা দেখায়, আবার কখনো এত পরিমাণে ঘৃণা দেখাবে যা কল্পনার বাইরে।
পিহুর প্রশ্নে প্রত্যুত্তরে বলল,

“বাবা চায় আমি যাতে বিয়েটা এগিয়ে নিয়ে যাই। কিন্তু বিশ্বাস করো আপু, আমার আব্রাহামকে ভীষণ ভয় লাগে! ভয় পাই আমি। লোকটা কেমন যেনো।”
মূহুর্তের মধ্যে মুখের ভাবভঙ্গি বদলে গেলো পিহুর। তীক্ষ্ণ কটাক্ষে সে বলল,
“তোর ভালো লাগায় না লাগায় কিচ্ছুটি আসে যায়না, জুঁই! তোকে বিয়ে এইজন্য দেওয়া হচ্ছে যাতে আমরা নিজের এই সবকিছু রক্ষা করতে পারি। বুঝতে পারছিস তো কিসের কথা বলছি? ফ্যাক্টরি, বাড়ি এসব কিছু! বাদশাহ ফ্যামিলির সাথে বিজনেস শুরু হলে বাবার কতটা উপকার হবে বুঝতে পারছিস?”
বোনের এই নির্মম সত্যোচ্চারণে জুঁইয়ের অন্তর বিক্ষিত হয়ে গেল। তার সমগ্র সত্তা যেন বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হলো; অপ্রকাশিত বেদনাগুলো গাঢ় স্তরে জমাট বেঁধে রইল। কেউ দেখল না তা।

চারদিন পর…
বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে গাড়িটা যখন ভেতরে ঢুকল, তখনই যেন এক অন্য জগতের দরজা খুলে গেল জুঁই। দু’পাশে সুশৃঙ্খল দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটি গার্ডদের উপস্থিতি জায়গাটাকে আরও গম্ভীর আর করে তুলেছে। গাড়ির চাকা নরম কংক্রিটের পথ ছুঁয়ে ধীরে ধীরে এগোতেই জুঁই জানালার বাইরে তাকিয়ে নিঃশব্দে মুগ্ধ হয়ে রইল।
সামনেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়িটি আধুনিক স্থাপত্যের নিখুঁত ছোঁয়া, কাঁচ আর হালকা রঙের দেয়ালের সমন্বয়ে যেন এক টুকরো স্বপ্ন। বারান্দাগুলো প্রশস্ত, রেলিংগুলোতে সূক্ষ্ম নকশা, আর বড় বড় জানালাগুলো বাইরের আলোকে ভেতরে টেনে নেওয়ার জন্য উদগ্রীব। চোখ দুটো আকারে বড় হলো ঝুমঝুমের। কি সুন্দর দেখতে!
ডান পাশে খানিকটা দূরে আরেকটি দোতলা বাড়ি । একই প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়েও দু’টি বাড়ির আলাদা অস্তিত্ব, আলাদা ব্যক্তিত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারমানে এখানে দু’জন মানুষ আলাদা আলাদা থাকে? তফাতও বেশ অনেকটা। লম্বালম্বিভাবে রাস্তা চলে গিয়েছে। ডুপ্লেক্স বাড়িটার পাশাপাশি দোতলা বাড়িটা মানানসই লাগছে জুঁইয়ের নিকটে।

“মামুনি দেখে যাও কে এসেছে! আমাদের আব্রাহাম ভাইয়ার বউ।”
আব্রাহাম বাদশাহর বউ বাড়িতে এসেছে কথাটা বাদশাহ ভিলায় রীতিমতো ঝঙ্কার তুলেছে। ভেতর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন রাজিব বাদশাহ।
জুঁই আর জেসমিন বাদশাহ একত্রে এসেছে। বাইরে তাদের লাকেজগুলো নিয়ে আসছে কাজের লোকেরা। জেসমিন বাদশাহ জুঁইকে পা থেকে মাথা অবধি অবলোকন করতেই ঠোঁটের কোণে একচিলতে প্রসন্ন হাসি প্রস্ফুটিত হয়।
“জুঁই,মা ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আয় ভেতরে আয়।”
জুঁই কুন্ঠিত পায়ে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল। সামনের মানুষটি ভীষণ আপন জুঁইয়ের কাছে।এই মানুষটি ভীষণ ভালোবাসে জুঁইকে। জেসমিন বাদশাহ, আব্রাহাম বাদশাহর মামুনি। জেসমিন বাদশাহ শুধু একজন স্ত্রী বা মা নন। তিনি হচ্ছে একজন বিজনেস ওয়ম্যান। বাসায় বসে থাকার মতো নারী উনি নন। এক হাতে সংসার অন্য হাতে নিজের ক্যারিয়ার দুটোই সামলে চলেন। জুঁই অবাক হয় এই নারীকে দেখে। একজন নারীর মেরুদন্ড কতখানি শক্ত থাকা প্রয়োজন তা উনিই বুঝিয়েছেন জুঁইকে। কিন্তু আফসোস জুঁই ওতটা সাহসী নয়। জেসমিন বাদশাহর সাথে এ কটা দিন থেকে এটুকু বুঝে গেছে জেসমিন বাদশাহ তাকে কোনো মিথ্যে সহানুভূতি দেখায়নি। উনি সত্যি তাকে আপন করে নিয়েছে।

“আসসালামুয়ালাইকুম।”
রাজিব বাদশার উদ্দেশ্যে সালাম দিলো জুঁই। জেসমিন বাদশাহ মনে মনে ভীষণ খুশি হলেন জুঁইয়ের আন্তরিকতা দেখে। হাত বাড়িয়ে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। জুঁই স্বস্তি পেলো, ভরসা পেলো। মানুষটির মুখের দিকে তাকাতেই মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠে।
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম মা। তুমি এসে গেছো, এখন আমি নিশ্চিত। সকাল থেকে ভাবছিলাম কখন আসবে!”
কথাটা বললেন রাজিব বাদশাহ। এমন সময় বাড়ির বাকি সদস্যরা ধীরে ধীরে যে যার ঘর ছেড়ে বাইরে উপস্থিত হতে লাগলেন।
বাদশাহ বাড়ির দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে রাজিব বাদশাহ।,ছোট ছেলে আজিজ বাদশাহ এবং একটি মেয়ে আয়াত বাদশাহ,যার বিয়ে হয়ে গেছে। রাজিব দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে আব্রাহাম বাদশাহ এবং ছোট ছেলে জুনেদ শয্য বাদশাহ ,এক মেয়ে মেহরিমা যার বিয়ে হয়েছে গেছে।
আজিজ বাদশাহ যিনি ছেলে মেয়ে স্ত্রীকে রেখেই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। আজিজ বাদশাহর এক ছেলে দুই মেয়ে, ঝুমঝুম বাদশাহ , রিমঝিম বাদশাহ এবং রাকিব বাদশাহ। রাকিব যার সাথে বিয়ে হয়েছে মেহরিমার।
বাদশাহ পরিবারের নিজেরদের পারিবারিক ব্যবসা রয়েছে, ছেলেরা ভালো ক্যারিয়ার তৈরি করেছে। কেউ বা পড়াশোনা করছেন। পরিবারের প্রত্যেকের বেশ গর্ব তাদের নিয়ে। কিন্তু একজন আছে যাকে নিয়ে সকলেই ভীত হয়ে থাকে সর্বদা!

সকলের আগমনে যেন ঘর জুড়ে এক মৃদু উৎসবের আবহ নেমে এলো। সেই পরিবেশেই লাজুক হাসি ঠোঁটে মেখে জুঁই একে একে সকলকে সালাম জানালো নম্র, পরিমিত, অথচ অদ্ভুত এক সৌন্দর্যে ভরা তার ভঙ্গি। উপস্থিত প্রতিটি মুখে যেন একসাথে বিস্ময় আর মুগ্ধতার ছাপ ফুটে উঠল; মেয়েটিকে দেখাতেই সবার মনে ধরেছে। তাইতো আজগর চৌধুরী বলা মাত্রই বাকিরা বাড়ির বড় ছেলের বউ হিসেবে নিয়ে আসতে রাজী হয়ে গেছেন ।
ঠিক তখনই রিমঝিম, যেন একঝাঁক কিশোরী উচ্ছ্বাস নিয়ে, ছুটে এসে জুঁইয়ের বাহু জড়িয়ে ধরল। তার চোখে-মুখে দুষ্টু আলো ঝিকমিক করছে, কণ্ঠে আনন্দের ছোঁয়া, আমোদিত চিত্তে বলল,
“উফ্! তাহলে তুমিই আমাদের নতুন ভাবি? আব্রাহাম ভাইয়ের বউ? তুমি কি মিষ্টি গো! আমি তোমার ননদ শুধু আমি না, আরেকজনও আছে, তবে সে এখনো স্বপ্নরাজ্যে। ঘুমোচ্ছে সে।”
রিমঝিমের এমন সহজ, নির্ভেজাল মিশুক আচরণে খানিকটা বিস্মিত হয়ে পড়ল জুঁই। সে ভাবেনি এত দ্রুত, এত সহজে কেউ তাকে আপন করে নেবে। তার মনে জমে থাকা সংকোচ যেন একটু একটু করে গলতে শুরু করল।
ঠিক সেই সময়, ঘরের পরিবেশে এক অদৃশ্য পরিবর্তন এলো। সিঁড়ি বেয়ে ধীর, পরিমিত পদক্ষেপে নেমে আসছে আব্রাহাম বাদশাহ। তার উপস্থিতি যেন নিঃশব্দে চারপাশের সমস্ত কোলাহলকে স্তব্ধ করে দিল। এক হাতে কোট ঝুলছে, অন্য হাতে অদৃশ্য এক আত্মবিশ্বাস যা তার চলনে, ভঙ্গিতে স্পষ্ট। সাদা শার্টের উপর কালো ব্লেজার, পরিপাটি করে সেট করা চুল, গালের হালকা দাড়ির রেখা সব মিলিয়ে যেন এক নিখুঁত পুরুষালি সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি।

তার দিকে তাকাতেই সকলের দৃষ্টি এক বিন্দুতে এসে থেমে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই জুঁইয়ের চোখ গিয়ে মিলল তার চোখে।
সময় যেন হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়ালো। বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন অস্থির ছন্দে বেজে উঠল তীব্র, দ্রুত, অজানা এক অনুভূতির ঢেউ তুলে। এমন সুদর্শন পুরুষ এ যেন বাস্তবের চেয়েও বেশি কিছু। অন্দর মহলে কাল বৈশাখী ঝড় আঁচড়ে পড়ছে কন্যার। এই লোকটা তার স্বামী ভাবতেই হিম শীতল শিলাখণ্ডের ন্যায় জমতে শুরু করল অঙ্গ।
দৃষ্টি নত করল জুঁই। যেন সেই দৃষ্টির ভার আর সহ্য হয় না। পিঠ বেয়ে শীতল এক স্রোত নেমে এলো, আর গাল দুটো ধীরে ধীরে রক্তিম আভায় রঙিন হয়ে উঠল লজ্জা, সংকোচ আর অদ্ভুত এক অনির্বচনীয় অনুভূতির মিশেলে। আব্রাহাম আড়চোখে ওই লজ্জালু মুখশ্রী অবলোকন করে বাঁকা হাসলো। সেকেন্ডের ব্যবধানে হাসি টুকু মিলিয়ে গেল।

“ভাইয়া এই দেখো তোমার হবু বউ চলে এসেছে।”
রিমঝিম দুষ্টু হেসে বলতেই জেসমিন বাদশাহ চোখ রাঙালেন। স্মরণ করিয়ে দিলেন আশেপাশে অন্য পুরুষেরা আছে। রিমঝিম চুপ করে গেল। এমন সময় কর্ণ কুহুতে ধেয়ে এলো কাঠকাঠ একটা কন্ঠস্বর।
“বউ এসেছে তো কি হয়েছে? তাতে পুরো বাড়ি কি এখন মাথায় তুলতে হবে? আর সবচেয়ে বড় কথা যার সাথে বিয়ে হওয়া কথা সে তো ঠকিয়েছে,এখন কে এলো?‌তারই ছোট বোন।”
জুঁই চকিতে দৃষ্টি ফিরিয়ে সেদিকটায় তাকালো। পরণে হালকা বেগুনি রঙের একটা শাড়ি পড়েছেন তারা বাদশাহ। হ্যাঁ উনি আজিজ বাদশাহর স্ত্রী। সর্বক্ষণ গম্ভীর মুখ করে থাকেন তিনি।
তারা বাদশাহর কথায় বিরক্ত হলেন জেসমিন বাদশাহ। জুঁইয়ের কাছাকাছি গিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন,
“বউ যদি জুঁইয়ের মতো হয় ,তাহলে অবশ্যই মাথায় তুলে নাচব।”
তারা বাদশাহর বোধহয় কথাটা পছন্দ হলোনা। কপাল জুড়ে তার গুটি কয়েক ভাঁজ পড়ল। জেসমিন বাদশাহ জুঁইকে সকলের সাথেই পরিচয় করিয়ে দিলো। তারা বাদশাহ খুব একটা কথা বলল না।
আব্রাহাম হাতের উলটো পিঠে ঘড়িটা দেখতে দেখতে বলল,

“আমাকে অফিসে যেতে হবে মামুনি। তোমরা গল্প করো, আমি চললাম।”
জেসমিন বাদশাহ কিছুটা আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“ওমা জুঁইয়ের সাথে কথা বলবি না? মেয়েটা এত দূর থেকে এলো।”
আব্রাহাম কি ভেবে তেরছা চোখে জুঁইয়ের দিকে তাকালো।
ওই চাহনিতে হৃদয় এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাওয়ার উপক্রম। হাত-পা অসাড় হয়ে গেল। এই লোকটা তো তাকে পছন্দ করে না তাহলে বিয়ে কেন করছে? শুধুমাত্র নিজের মামুনিকে খুশি করতে? হ্যাঁ সেটাই তো বলল সেদিন। তার মামুনি চাচ্ছে যেনো লোকটা তাকে বিয়ে করে,তাইতো নিজের অমতে গিয়ে বিয়েটা করেছে লোকটা। নয়তো সে কি আর তাকে পছন্দ করে নাকি?
ভেতরে ভেতরে ভোঁতা যন্ত্রনা সমগ্র সত্তা গ্রাস করল জুঁইয়ের।

বিকেলের মরা রোদ ধীরে ধীরে তমসায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সূর্য্যিমামা বড্ড ব্যস্ত পৃথিবীর অপর প্রান্তে আপন রশ্মিতে উজ্জ্বল করে তুলতে। বাইরে প্রকৃতি আজ বড্ড শান্ত। পুরী বাতাস বইছে। দিগন্ত জুড়ে রঙিন খেলা চলছে। বাগানের ফুলগুলো থেকে মিষ্টি একটা সুবাস বাড়ির ভেতর অবধি ভেসে আসছে। চোখ বুজে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস টানল জুঁই। না ভালো লাগছে তার।খুব ভালো লাগছে।
জুঁইকে একটা রুম দেওয়া হয়েছে থাকার জন্য। রিমঝিম সেই কখন থেকে একনাগাড়ে কথা বলেই যাচ্ছে বলেই যাচ্ছে। জুঁইয়ের বেশ ভালোই লাগছে শুনতে। এখানে আসার পর মনেই হচ্ছেনা সে নিজের বাড়ি ছেড়ে এসেছে।‌বাড়ি? আফসোস যেই বাড়ির জন্য বুকের ভেতর খচখচ করছে অথচ তারা একটিবার ফোন করে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করল না সে পৌঁছেছে কি না?
“ভাবি,চলো তোমাকে নতুন একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।”
নতুন একজনের কথায় কপাল কুঁচকে এলো জুঁইয়ের।আর কার সাথে পরিচয় করাবে? রিমঝিম জুঁইয়ের হাত টেনে ধরল।

“আর কে আছে এ বাড়িতে, রিমঝিম?”
রিমঝিম ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসলো। সতর্ক কন্ঠে বলল,
“এ বাড়িতে আরো দুজন আছে। তাদের সাথেই কিনা তুমি দেখা করো নি? উঁহু চলো আমি দেখা করাচ্ছি।”
জুঁইয়ের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। আর কে আছে এ বাড়িতে? এমনিতেই এ বাড়িতে তারা বাদশাহ কে দেখেই তার আত্মা শুকিয়ে এসেছে। কেমন যেন খিটখিটে মেজাজের। আসার পর থেকেই তীর্যক চোখে কতবার তাকে পরোখ করে তা জুঁই ঢের বুঝতে পেরেছে।
রিমঝিম এক প্রকার ছুটে যাচ্ছে, সাথে তাল মিলিয়ে ছুটতে হচ্ছে জুঁইকে। এমন সময় করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছিল এক একজন। অকস্মাৎ ধাক্কায় পা মুচড়ে যায় জুঁইয়ের। ফলস্বরূপ সেই মানুষটির বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল কন্যা।
রমণীর ভার সামলাতে না পেরে অজ্ঞাত যুবক তাকে নিয়েই মেঝেতে পড়ে গেল। জুঁইয়ের কৃত্রিম উপায়ে গোলাপি রঙা ঠোঁট দুটো ছুয়ে গেল তার বক্ষদেশ। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে রিমঝিম।
জুঁই ঠকঠক করে কাঁপছে। যখন নিজের অবস্থান বুঝতে পারল তখন দমবন্ধ হয়ে আসার উপক্রম।
চোখের সামনে পুরুষটির মুখাবয়ব দেখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে জুঁই।‌ নিখুঁত।এই পুরুষকে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে।
জুঁই মুখ ফসকে বলে ফেলল,

“আপনি সুন্দর।”
এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে জুঁইয়ের মুখ থেকে এমন প্রশংসা বাক্য শুনে সরু নয়ন যুগল বিস্ময়াভিভূত হয়। কপাল জুড়ে দেখা দেয় চিন্তার রেখা। আব্রাহাম ভ্রু নাচিয়ে রহস্যময় কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলে,
“তাই নাকি? তা আপনার বুঝি আমাকে পছন্দ হয়েছে?”
আব্রাহামের শেষ বাক্যে সম্বিত ফিরল জুঁইয়ের। চোখ দুটো ধীর গতিতে বড় আকৃতি ধারণ করল। নিজের অবস্থান বুঝতে পেরে সঙ্কুচিত হয় শীর্ণ বদন। লজ্জায় শিরনত হয়ে এলো। আব্রাহামের ঠোঁটে অদ্ভুত বাঁক খেলে গেল। সে দারুন এনজয় করছে জুঁইয়ের এই লজ্জালু মুখশ্রী।
তড়িঘড়ি করে উঠতে গিয়ে আবারো টাল সামলাতে না পেরে আব্রাহামের উপরেই পড়ল জুঁই। দ্বিতীয়বারের ন্যায় ওষ্ঠোপল্লবের ছোঁয়া পেলো প্রশস্ত বক্ষে, আব্রাহাম।
রিমঝিম ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে চলেছে। লজ্জা তার নিজেরই গাল দুটো মাত্রাতিরিক্ত গরম হচ্ছে। দু’হাতে চোখ চেপে উল্টো ফিরল মেয়েটা।
আব্রাহাম কুন্ঠিত জুঁইকে আরো একদফা লজ্জার সাগরে ডুবিয়ে দিয়ে বলল,

“আপনি আমাকে চুমু দিতে চান,তা সরাসরি বললেই হয় জুঁই।এমন টালবাহানা করার প্রয়োজন ছিলোনা।”
গান দুটো দিয়ে যেনো আগ্নেয়গিরির লাভা নির্গত হচ্ছে। ওষ্ঠোদ্বয় কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে এলো রমণীর। চোখের পাতা কাঁপছে।
আব্রাহামের এমন লাগামহীন কথায় দ্রুত উঠে এলো জুঁই। তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরে পালাতে চাইল বিধিবাম তাও পারল না।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১

ওড়না টান খেতেই যেইনা দু কদম এগিয়েছিল আবার সেই দু কদম পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলো।
আব্রাহাম চাপা স্বরে হাসলো। এই এলোমেলো মেয়েটাকে নাকি সে বিয়ে করেছে। মামুনি বলছে সে নাকি তাকে গুছিয়ে দেবে অথচ তার ঠিক উল্টোটা মনে হচ্ছে। এই জুঁই ফুলকে স্বয়ং আব্রাহামকেই গুছিয়ে দিতে হবে।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩